বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২৭
ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতা একটি গ্রাম মাত্র, যেখানে কোন হাট-বাজার নেই, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী কেনা বেচার উপায় নেই। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য যেমন লবন, চিনি, কেরসিন তেল, সাবান, পড়নের বস্ত্র এগুলতো আর জমিতে আবাদ হয় না। অবরুদ্ধ গ্রামবাসীর অনেকের বাড়িতে সাবানের অভাবে গোসল কিংবা কাপড় ধোয়া হয় না, লবনের অভাবে তরকারি রান্না হয়না, চুলোর আগুনে আলু পুড়ে তাতে কয়েকটা মরিচ দিয়ে কোন রকমে ভর্তা বানিয়ে দু’এক সন্ধ্যা চালিয়ে দেয়। অনেকেই বেলা ডুবে যাওয়ার আগে দিনের আলোতে রাতের খাবারটুকু সেরে ফেলে। আর যারা দিনের আলোয় খায়না তারা পাটকাঠি জ্বালিয়ে সেই আলোতে রাতের খাওয়া খেয়ে নেয়। দিয়াশলাইয়ের অভাবে অনেকের বাড়িতে শীতপ্রধান দেশের মত ঘরে কাঠ জ্বালিয়ে আগুন জিইয়ে রাখে। লবনহীন তরকারি, চিনি ছাড়া চা, সাবান ছাড়া গোসল আর আলোহীন রাত। কিন্তু এভাবে আর কতদিন চলবে? এভাবে আর কতদিন বাঁচা যায় ?
আমি পূর্বেই বলার চেষ্টা করেছি যে, ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতারবাসীর মধ্যে যারা শুধু মুসলমান কেবল তারাই অবরুদ্ধ। হিন্দু ধর্মালম্বিরা কিন্ত অবাধে ভারত যাতায়াত করছে। এখানে আরও একটু বলে রাখা প্রয়োজন যে, এ সাম্প্রদায়িক আচরণে অনেক জ্ঞানী-গুণী হিন্দু সম্প্রদায় ভীষণ আহত হয়েছে, এর কঠোর বিরোধিতাও করেছে। তারা মনে করতো যে, এ সাম্প্রদায়িক আচরণের ফলে এক সময় তা ফুঁসে উঠে মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে, যা সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের রূপ ধারণ করতে পারে এমনকি গোটা ভারত-বাংলাশেও ছড়িয়ে যেতে পারে। কাজেই কাঁচা আবেগকে দমিয়ে ফেলাই উত্তম। হয়তো তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এ অবরোধকাল কয়েক দিনের জন্য একটু শিথিলও হয়। তখন শুধু ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা ভারতে যেয়ে লবন, কেরসিন সহ প্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রব্য আনতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো-একটা দশ-বারো বছরের শিশু কতোটুকুই বা ভার বহন করতে পারে? যাওয়া- আসা প্রায় দশ-বারো কিঃ মিঃ রাস্তা হাটাই তারজন্য কষ্টকর তার-ওপর আবার বাজার খরচের ব্যাগ ঘাড়ে। কি অমানবিক পরিস্থিতির উদ্ভব হয় সেখানে, যা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
এ ভাবেও বেশীদিন চললো না, মাস খানেকের মধ্যে আবার কি থেকে যেন কি হয়ে গেল। আজিজুর, ওয়াজেদ, বুলবুল, সাহিবুলসহ আমরা কয়েকজন ছেলে এক সাথে ধাপড়ার হাটের ব্যাচক্যাম্প সংলগ্ন প্রাইমারি স্কুলে পড়তে যেতাম। খাতায় কলমে আমাদের নাম লেখা হয়েছিল কি না, তা জানি না, তবে খুব অল্পদিনের জন্য হরেও আমরা সেখানে ক্লাস করেছিলাম। স্কুলের মাস্টার মশাই মতিলাল লষ্কর আমার শিক্ষাগুরু হিসেবে প্রতিদিনই ভালো মন্দ জিজ্ঞাসা করতেন। কিন্তু সেটাও বেশিদিন স্থায়ী হল না। আমাদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল।
আমার স্মৃতি হয়তো মৃত্যুর পরেও আমাকে জানিয়ে দেবে সে দিনটি ছিল শনিবার, ধাপড়ার হাটবার ছিল সেদিন। মহেদ্রসিং ডিলারের কাছ থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে পরিবার প্রতি সর্বচ্চ এক লিটার করে কেরসিন নিতে পারে সবাই। দু-তিন জন সঙ্গী সহ আমরা কেরসিন নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ালাম। এমন সময় দেখতে পেলাম কতগুলো লোক পতাকা হাতে নিয়ে মিছিল করছে। মিছিলকারি একদল লোকের হাতেছিল ‘বাঘের ছবি সম্বলিত পতাকা’। আর একদল মিছিল কারির হাতে ‘তারা-হাতুড়ি-কাস্তের’ ছবি। শেষের দল মিছিল কারির হাতে কোন পতাকা ছিল তা দেখতে পেলাম না। কি কারণে একজন বয়স্ক বি, এ,এফ আমাদেরকে ডেকে বলল “এই খোকা জলদি ঘর চলে যাও, ভাগ যাও”। আমরাও অন্য খরচ পাতি না নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে রওয়ানা হলাম। দিঘীর পাড় নামে একটি জায়গায় কয়েক জন যুবক আমাদেরকে আটক করে কেরসিনের বোতলগুলো কেড়ে নিয়ে তেলগুলো মাটিতে ফেলে দিল। ওয়াজেদ তেলের বোলসহ দৌড় দিলে তাকে পিটিয়ে ধরতে খুববেশি সময় লাগল না। পালানোর অপরাধে তারা ওয়াজেদকে খুব মারল। তার কান্না দেখে আমরা সবাই কাঁদতে শুরু করি। সাদা ধুতিপড়া একটি ছেলে গয়ে কোন গেঞ্জিও নেই, সে বলতে লাগল-এরা কালসাপ, আজ না হোক কাল ছোবল মারবে।
আমরা ছোট মানুষ তাদের মারের ভয়ে আমাদের প্রাণ গলা অবদি এসে আটকে আছে। আমাদের বাঁচানোর কেউ নেই। এমন সময় দেখলাম দিলিপ দাদাকে একটু দুরে পাশের রাস্তা দিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছে। দিলিপ দাদা আমার বড় ভাইয়ের বন্ধুর মতো, তারা সমবয়সী এক সাথে মেশে, খেলা-ধুলা, গান-বাজনা করে। সে কয়েকবার আমাদের বাড়িও এসেছে। তার পরামর্শে আমরা ধাপড়ারহাট প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হই। প্রাণ বাঁচানোর ভয়ে আমার শরীরে যতটুকু শক্তি ছিল, সেটি আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে আমি দিলিপ দা-দিলিপ দা বলে চিৎকার করি। সৃষ্টিকর্তার সহায় ছিল বলে, আমার গলার আওয়াজ বিদ্যুৎবেগে তার কানে গিয়ে পৌছে যায়। সঙ্গে সঙ্গে সে আমাদের কাছে চলে আসে।
আমাকে দেখে দিলিপ দাদা বলে- কি হয়েছেরে, তোরা এখানে কি করছিস?
ছোট মাথা হলেও ঠিক সেই মুহুর্তে একটা সুবুদ্ধি এসে মাথাটাকে তিনগুণ প্রসারিত করে দিল। হঠাৎ মনে হল এদের বিরুদ্ধে কোন কিছু বলা যাবে না, এদের ক্ষ্যাপান যাবে না, যতক্ষণ না আমরা এখান থেকে ছাড়া পাচ্ছি। তাই বললাম-না দাদা, আমরা বাজার করে বাড়ি যাচ্ছি, এনারা আমাদেরকে ডেকে জিজ্ঞাসা করছে, বাড়ি কোথায়, কোন স্কুলে পড়ি ইত্যাদি।
ও-তাই, তোর দাদা কেমন আছেরে?
আমি মাথা নেড়ে বললাম হ্যাঁ দাদা, ভালো আছে, কারণ এ মুহুর্তে বেশি কথা বলার শক্তি আমার নেই, ভয়ে সমস্ত শরীর কাঁপছিল।
ঠিক আছে তোরা বাড়ি যা, সন্ধ্যা হয়ে এল। তাড়াতাড়ি বাড়ি যাস, নইলে বাড়িতে আবার চিন্তা করবে।
আচ্ছা দাদা ঠিক আছে।
যারা আমাদেরকে ধরে রেখেছে তারা হ্যাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখছিল। তাদের মুখে কোন কথা নেই।
শিকারি বাঘের মুখ থেকে ছাড়া পেলে হরিণ শাবক যেমন এক লাফ দিয়ে তের হাত দুরে যায়, আমাদেরও ঠিক একই অবস্থা হয়েছিল। বখাটে ছেলেদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে আমরা সেই যে দৌড় শুরু করেছিলাম আর সে দৌড় বাড়ি না আসা পর্যন্ত থামেনি। বাড়িতে এসে পরপর দু’গ্লাস পানি খেলাম। হাতে কোন কিছু না দেখে মা জিজ্ঞাসা করে, কেরসিনের কথা। আমি সব ঘটনা মাকে খুলে বলি। শোনার পর মা আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউ-মাউ করে কেঁদে ফেলে। মায়ের কান্না শুনে আশে পাশের সবাই এসে ভিড় জমায় আমাদের বাড়িতে।
গ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বঙ্গেরবাড়ি স্কুল মাঠে শামছুল মাস্টারসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও যুবক ছেলেরা সবাই মিলে একত্রিত হয়ে কি ভাবে এ ন্যাক্কার জনক পরিস্থিতির মোকাবেলা করা যায় সে সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে। ভারত-বাংলাদেশ উভয় দেশের সরকার প্রধানগণ নয়াদিল্লীতে বৈঠকে বসেছে, ‘ইন্দ্রা-মুজিব’ চুক্তি অনুযায়ী ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাকে সরাসরি বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্ত করার জন্য শিঘ্রই বাংলাদেশকে ‘তিনবিঘা’ হস্তান্তর করা হচ্ছে। ইন্দিরা-মুজিব চুক্তিতে তিনবিঘা বাংলাদেশকে স্থায়ীভাবে বন্দোবস্ত দেওয়ার কথা থাকায় তা বাংলাদেশের ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃত হয়ে যায় বলে- জনৈক ভারতীয় নাগরিক কলকাতা হাইকোটে ঐ চুক্তিকে ভারতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী আখ্যায়িত করে চুক্তিটি বাতিলের দাবী জানিয়ে মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ কয়েক দশক মামলা শুনানির পর কলকাতা হাইকোট এবং পরে দিল্লি সুপ্রিমকোট মামলাটি খারিজ করে দেন। চুক্তি অনুযায়ী ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাকে সরাসরি বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে আর কোন বাধা নেই।
তাই“তিনবিঘা সংগ্রাম কমিটি”ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো এ চুক্তি বাঞ্চাল করার জন্য আদা জল খেয়ে লেগে পড়েছে। ধাপড়ারহাট, মেকলিগঞ্জ, চ্যাংরাবান্ধা, ময়নাগুড়ি, জলপাইগুড়ি ও কুচবিহার সহ আশে-পাশের সব এলাকা যেখানে কম-বেশী লোক সমাগম হয়, সেখানেই ‘তিনবিঘা’ হস্তান্তরের বিরুদ্ধে মিছিলে মিছিলে তোলপার করে তোলে তারা।
এমন সময় করিম আলি, শামছুল মাস্টারকে উদ্দেশ্য করে বলে- “তিনবিঘা সংগ্রাম কমিটি” ধাপড়ার হাটে মিটিং করে, আমার ছোট শ্যালক তাদের পাশে যেয়ে মিটিং এর বক্তব্য গুলো শোনে। তারপর সে বাড়ি না গিয়ে সরাসরি আমার বাড়িতে চলে আসে এ সংবাদটি দেওয়ার জন্য। ওদের কথাগুলো শুনে সে খুব ভয় পেয়ে গেছে। “তিনবিঘা সংগ্রাম কমিটি” এর বক্তব্য হলো- ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার বিষয়ে কোন আপোষ নেই। তারা হাট-বাজার করবে ভারতে, খাবে ভারতের, পড়বে ভারতে আর বাংলাদেশে গিয়ে আন্দলন করবে, তিনবিঘার উপর দিযে রাস্তা চাবে এটা হতে পারে না, এ হতে দেয়া যায় না। বিচার বিবেচনা করে, দয়া মায়া দেখিয়ে তাদের সাথে মিলে-মিশে বসবাস করার দিন শেষ হয়ে গেছে। এখনি তাদের দমিয়ে রাখতে না পারলে ‘তিনবিঘা’ কে কোন ভাবে রক্ষা করা যাবে না। চিরদিনের জন্য আমাদের তিনবিঘাকে হারাতে হবে। ‘তিনবিঘা’ হস্তান্তর করা হলে আমরাও একদিন ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার মত অবরুদ্ধ হয়ে যাব। কারণ ঐ তিনবিঘার উপর দিয়ে যাওয়া ছাড়া আমাদেরও আর কোন বিকল্প রাস্তা নাই।
প্রকৃতির নির্মম খেয়াল থেকে বাঁচার এবং একে অপরের জীবন, সম্পত্তি নিরাপত্তার জন্য পারস্পরিক চুক্তিতে উপনীত হওয়ার ফলে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে। বিশ্ব বিভিন্ন রাষ্ট্র, জাতি, উপজাতি, বর্ণ ও গোত্রে বিভক্ত কিন্তু সকলের মূল পরিচয় মানুষ। তাইতো দেশে-দেশে মানুষে-মানুষে এত ভেদ-প্রভেদ থাকা সত্তে¡ও পরস্পরের প্রতি মমত্ববোধ চিরন্তন। মানবাধিকার, জননিরাপত্তাসহ সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্র ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। নাগরিক অধিকার বঞ্চিত, নিপীড়িত অসহায় মানুষগুলো শান্তিতে ঘুমাতে পারত না।
যারা ভারত বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের এবং বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের বাসিন্দা তাদেরও নৈতিক কর্তব্য আছে। আমাদের কর্তব্য হলো আমাদের সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা যেন অযথা বিলম্ব না হয়। আমাদের কর্তব্য বিষয়টিকে রাজনৈতিক দিক থেকে না দেখে মানবিক দিক থেকে দেখা এবং নিজ নিজ সরকারকে ছিটমহল বিনিময়ে পূর্ণ সমর্থন দেয়া। প্রয়োজন হলে নতুন আইন করে হলেও বিনিময় কাজটি ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি অনুসারে বাস্তবায়িত করা। দু’দেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এ ব্যাপারে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসা।
“উনিশ শ’সাতচল্লিশ” সাল থেকে শত শত মানুষের জীবনে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতা সমস্যাটি মূলত ভারতের কারণেই আজও সমাধানের মুখ দেখেনি। ভারতের দিক থেকে উদ্ভূত সমস্যার কারণেই তিনবিঘা করিডর হস্তান্তর করা হয় নি।
ইন্দিরা-মুজিব চুক্তিতে বেরুবাড়ি ও ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার জন্য তিনবিঘা করিডর বিনিময়ের লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের দিক থেকে ত্বরিতগতিতে বাস্তবায়িত হলেও ভারত এই চুক্তি লঙ্ঘন করে এখন পর্যন্ত বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখেছে। ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পর থেকে অনেক আলোচনা হয়েছে, অনেক শীর্ষ বৈঠক হয়েছে, অনেক কূটনৈতিক আশ্বাস এসেছে, কিন্তু কাজের কাজটি কিছুই হয়নি। ফলে সাত দশক ধরে সকল প্রকার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতা অসহায় ও নীরিহ মানুষেরা। যেকোনো বিচারে এটি এখন একটি মানবিক-সংকট। দীর্ঘদিনের মিথ্যার ওপর ভর করে জীবনযাপনের যাতনা কবে শেষ হবে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাবাসীর এটাই প্রশ্ন। এলাকার বাইরে গিয়ে পরিচয় গোপন করে আর তাদের চলা ফেরা করতে হয়। ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতা মানুষের জীবন কাটে বি,এস,এফ এর কড়া নজরদারিতে।
সারারাত এক নিমিষের জন্যও চেখের পাতা দু’টোকে একখানে করতে পারল না শামছুল মাস্টার। রাতে ঘুম না আসলে রাজ্যের সব চিন্তাগুলো মাথার মধ্যে এসে জড়ো হয়, প্রতিটি চুলের গোড়ায় কিলবিল করতে থাকে। অতীতে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা, ভুলে যাওয়া কত ঘটনা, বিশেষকরে কষ্টের মুর্হুতগুলো স্মৃতির পর্দায় জ্বলজ্বল করে ভেসে ওঠে। হৃদয়ের গভীরে চেপে রাখা কত সুখ-দুঃখের কথা যা প্রকাশের পথ খুঁজে পায়না, সেগুলো যেন বুক ভেঙ্গে বেড়িয়ে আসতে চায় আর তাদেরকে দাবিয়ে রাখা যায় না। দীর্ঘদিন যন্ত্রনায় কাঁতর হওয়া মনটাকে আর সান্ত¦না দেয়া যায় না। অসহায় মানুষ গুলোর যন্ত্রনাভরা হৃদয়ের নীরব কান্না তার বুকে বর্শার ফলার মতো বিঁধে, কাল নাগিনীর বিঁষের মতো আস্তে আস্তে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, বিঁষের যন্ত্রনায় কাঁতর হয়ে ছটফট করে কিন্তু কাউকে বলতে পারে না, কাউকে বোঝাতে পারে না। তবুও এতদিনের দুঃখের ধারা আটকে রাখা বাঁধ আজ ভেঙ্গে গেছে, দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া কয়েক ফোটা জল বালিশের উপরিভাগের কিছু অংশ ভিঁজিয়ে দিল।
সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে যদিও বৃষ্টির তেমন জোর নেই কিন্তু বাইরে বের হলেই গা ভিজে যায়। এই বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে রমজান দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। কাইকে না দেখে সে নিজেই ডাকে স্যার বাড়িতে আছেন নাকি?
কে? কে ডাকে?
স্যার আমি রমজান আলি।
ওহ, রজান তুমি? আরে বৃষ্টির মধ্যে বাইরে দাঁড়িয়ে কেন, ঘরে আস। বৃষ্টিতে তো কাক ভেজা হয়ে গেছ দেখছি, এই নাও গামছা মাথাটা মুছে ফেল। নইলে সর্দি জ্বর চেঁপে বসবে, বুঝলে? এমনিতে আমাদের কপাল খারাপ, তার উপর সর্দি-জ্বর ধরলে রাতে পাহারা দেবে কেমন করে?
হ্যাঁ স্যর, সেই জন্যই আসলাম একটা জরুরী বিষয়ে আপনার সাথে পরামর্শ করতে।
কি বিষয় রমজান সেটাত বল? হাতে সময় খুব কম স্কুলে যেতে হবে। আজ অনেক কাজ অছে।
স্যার, আমরা রাতে সারারাত ধরে নিজের জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে গ্রাম পাহারা দেই, নূন্যতম নিরাপত্তা আমাদের মাঝে নেই। আমাদের কোন প্রশিক্ষণ নেই, কোন ভারি অস্ত্রপাতি নেই, শুধু মনের জোর আর দু’চারজন লোক এক সাথে থাকি বলে বুকে বল পাই। শত্রæরা এসে আক্রমণ করলে কিভাবে আমরা তাদের দুঢ়তার সাথে মোকাবেলা করব সে সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণা নেই। এ জন্য আমাদের নূন্যতম নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার জন্য একটা প্রথমিক প্রশিক্ষণ দরকার। আর প্রশিক্ষণ থাকলে সবার মনোবল দৃঢ় হবে, চাঙ্গা হয়ে উঠবে মন। তাতে কষ্ট হলেও রাত জেগে জেগে পাহারা দেয়ার আগ্রহটাও বাড়বে।
কথাটা তুমি একেবারে খারাপ বলনি রমজান, বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা নিয়ে চিন্তা ভাবনা আরও আগে করা উচিত ছিল। যা হোক দেরিতে হলেও বিষয়টা তোমার মাথায় এসেছে এ জন্য তোমাকে অশেষ ধন্যবাদ। তবে প্রশ্ন হল এই প্রশিক্ষণটা দেবে কে? আর কেমন ধরণের প্রশিক্ষণই বা হবে সেটা?
স্যার এটা সম্পূর্ণ আত্মরক্ষা মূলক, অনেকটা কুস্তি-কারাতি প্রশিক্ষণ। কেউ আমাকে আঘাত করলে কিভাবে আমি তার আঘাত থেকে নিজেকে বাঁচতে পারব, এটা হবে সেই ধরণের কৌশল। কেউ যদি সঠিক ভাবে মনোযোগের সাথে এটি রপ্ত করে, তাহলে সে একাই দশজনের সমান শক্তি সঞ্চয়ের সামর্থ রাখবে এটা আশা করা যায়।
খুবই ভালো আইডিয়া তোমার। এভাবে আমরা সবাই মিলে যদি একটু একটু করে চিন্তা করি তাহলে আমাদের সফলতার সাথে টিকে থাকতে পারব। এবার বল, কে দেবে সেই প্রশিক্ষণ? আমরা কোথায় পাব তাকে?
স্যার ওর নাম চান্দু পালোয়ান সে আমার চাচাত ভাই। আমরা এক সাথে বন্ধুর মত করে ছোট বেলা থেকে বড় হয়েছি। গতকাল রাতে গ্রাম পাহারা দেওয়ার সময় হঠাৎ আমার মাথায় এ বুদ্ধিটা আসে। তাই বৃষ্টিতে ভিজে আপনার কাছে এলাম।
খুব ভালো করেছ রমজান, এ জন্য তোমাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবো না। তুমি বিকেলে চান্দুকে নিয়ে স্কুল মাঠে আস। আমি যথাসময়ে সেখানে সবাইকে উপস্থিত হওয়ার ব্যবস্থা করছি। বিষয়টি কি ভাবে কি করা যায়, সবার সাথে আলোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।
পূর্ব-পাড়ার যহের আলি ও লুতফর মুক্তিযোদ্ধাকে বলা হল- তার দল থেকে দশজন যুবককে সঙ্গে করে বিকেলে স্কুল মাঠে আসার জন্য। শুরুতে দশজন ছেলেকে সপ্তাহ ব্যাপি ট্রেনিং করা হবে এতেও যদি কোর্স শেষ না হয়, প্রয়োজনে সময় আরো বাড়ানো হবে।
ন্যাড়া রমজান যথা সময়ে চান্দু পালোয়ান কে সঙ্গে নিয়ে স্কুল মাঠে উপস্থিত হলো। মাস্টার সাহেব উপস্থিত সবার সম্মতিক্রমে চান্দু পালোয়ানকে গ্রামের বর্তমান পরিস্তিতি সম্পর্কে অবহিত করে এলাকার যুবকদের প্রশিক্ষণ দানের জন্য অনুরোধ জানান।
চান্দু পালোয়ানও তাতে সম্মতি দেয়। তবে যেহেতু বিষয়টা দীর্ঘ সময়ের তারও তো সংসার আছে, বোউ-বাচ্চা আছে, সে বিষয়ে একটু বিবেচানা রাখার অনুরোধ জানান। ট্রেনিং শুরু হওয়ার পূর্বে প্রসঙ্গ উঠল খাবারের ব্যবস্থা নিয়ে, এই দশ-বারো জন লোকের সকাল-বিকেলের হাল্কা নাস্তা আর দুপুরে খাওয়া। কি ভাবে তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করা যায়। অনেকে মতামত পোষণ করলেন যেহেতু এটা দীর্র্ঘদিনের ব্যাপার সেহেতু এখানে রান্না করার ব্যাবস্থা করতে পারলে সুবিধা হবে। তাই সিদ্ধান্ত হল-চাল, ডাল, তরি-তরকারি যা কিছু লাগবে সব গ্রামবাসীরাই ভাগাভাগি করে দেবে।
চান্দু পালোয়ান, দশজনের একটি দলকে সাতদিন করে প্রশিক্ষণ দেবে, শর্ত হল এই সাতদিন তাদেরকে স্কুলে থাকতে হবে কারণ সকাল ছ’টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের প্রশিক্ষণ চলবে। প্রথম দিন প্রশিক্ষণ শুরুর আগে, শুরু হয় শারীরিক কসরত। সবাই মনে মনে উসখুস করতে থাকে প্রশিক্ষণ কখন শুরু হবে? কেমন করে করবে সেটা, ছেলেদের কোন উপকারে আসবে কি না ইত্যাদি।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now