বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -১৮
দু’তিন দিন হয়ে গেলো আবিয়ার জ্বরটা কোন ভাবেই কমে না, দিনের বেলায় যদিও একটু কমে কিন্তু রাত যতো বেশী হয় জ্বর ততোই বাড়ে। এই গরমেও রহিমা নিজের সন্তানের মতোকরে আবিয়াকে আঁচলের তলে নিয়ে বুকের তাপ দিয়ে রাতে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। রহিমা মনে মনে ভাবে যে, সেদিনের মারের ধকলে তার রুহু উড়ে গেছে বোধয় নইলে জ্বর সারবে না কেন? নূরল মুন্সিকে একবার খবর দিয়ে আনাতে হবে দু’একবার ঝাড়-ফুক করে একটা তাবিজ কবজ করে নিলেই হয়তো সব সেরে যাবে। রহিমা মোহনকে বলে- আড়ত থেকে আসার সময় সে যেন নূরোল মুন্সিকে সঙ্গে নিয়ে আসে।
এশার নামাজ বাদ নূরল মুন্সি মোহনের সঙ্গে বাড়িতে আসে। নূরল মুন্সিকে রহিমার ঘরে নিয়ে যায় মোহন। রহিমা বলে ভাইসাব, দু’তিনদিন থাকি আবিয়ার জ্বরটা ক্যানেভালা সারে না। মোর মনে হয় কোন ভয়-টয় পাইচে, এ্যাকনা ভোলো করি দেখেন তো কি ব্যাপার।
নূরল মুন্সি আবিয়ার হাতটা ভালো করে নেড়ে-চেড়ে তার নাড়ি পরীক্ষা করলেন, তারপর বামহাতে হারিকেনটা নিয়ে উঁচু করে ধরে আবিয়ার জিহŸার তলা, চোখের মণিসহ সব ঠিক ঠাক আছে কি না তা ভালোভাবে নিরীক্ষণ করলেন। সবইত ঠিকঠাক আছে তাহলে জ্বর পড়ছে না কেন? হয়তো কোন খারাপ আঁচড় (খারাপ জিন) লেগেছে তাকে। নূরল মুন্সি একটু চিন্তায় পড়ে গেলেন। তারপর রহিমা আর আবিয়াকে দেখানোর জন্য চোখ বন্ধকরে একটা ধ্যানে পড়ার মতো ভাব নিলেন। কিছুক্ষণ পর মাথা তুলে একা একাই বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন-আজ-কালকার মেয়েরা যা হয়েছে, সাঁঝ-সন্ধ্যা নেই, রাত-বিরাত নেই, যখন যেখানে মন চায় নির্লজ্জের মতো ধেইধেই করে ঘুরে বেড়ায়। চুল বাঁধা নেই, মাথায় কাপড় নেই, কোন পর্দা পুশিদা নেই, যা মন চায় তাই করে বেড়ায়। মুরুব্বীদের কোন কথা শোনে না। তাদের তো এরকম হবেই। চোখে-মুখে একটা ভীষণ বিরক্তির ভাব নিয়ে আবিয়ার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন, জেনার চেয়েও জঘন্য কোন-ঘৃণিত ও গর্হিত কাজ সে করে বসেছে। এরপর মুন্সি সাহেব এক গøাস পানি নিয়ে অনেক্ষণ ধরে দম বন্ধকরে অধিক বাতাস বুকে জমা করে তিন বার ফু-দিয়ে সেই পানি গোটা ঘরে ছিটিয়ে দিলেন এবং বিসমিল্লাহ বলে আবিয়াকে এক ঢোক পরিমান পানি খাইয়ে দিয়ে বাকি পানিটা তার পুরো শরীরে ছিটিয়ে দিলেন। একশিশি সরিষার তেল নিয়ে একই ভাবে দোয়া-কালাম পড়ে তিনবার ফু দিয়ে রহিমাকে বললেন- ভাবিজান, তেলটা পায়ে লাগাবেন না আল্লাহর কালাম এতে কবিরা গোনা হবে, দিনে তিন চার বার হাতে, মুখে, বুকে ভালো ভাবে মালিশ করে দিবেন। দেখবেন দু’এক দিনের ভিতরে জ্বর সেরে যাবে ইনসা আল্লাহ। ভয়ের কোন কারণ নেই ভাবিজান আমি তো আছি। ছোট ভাবিসাহেবার গায়ে খুব খারাপ একটা জিনের আঁচড় লেগেছে। যা হোক সে বেটা যত খারাপ জিনই হোক না কেন কিছুই করতে পারবে না।
ঠিক আছে ভাবিসাব, তেলপোড়াত থাকলোই এর পরেও যদি কোন সমস্যা হয় তাহলে কষ্টকরে একটু খবর দিলে এ বান্দা এসে হাজির হয়ে যাবে ইনসা আল্লাহ। আমি তাহলে আসি ভাবিসাব আছ্ছালামু আলাইকুম।
রহিমা চুপ করে মুন্সির হাতে একটা একশত টাকার নোট গুঁজে দিলে মুন্সি সাহেব মুচকি হেসে বললেন- না না ভাবিসাব, এসবের কি দরকার ছিল?
নূরল মুন্সি চলে গেলে মোহন তার শার্টের পকেট থেকে ঔষধগুলো বের করে আবিয়ার কাছে রেখে বলে- বুবু, আমি ডাক্তারের কাছে গিয়ে আপনার জ্বরটা কেন সারছে না সেটা বললাম, সব শুনে ডাক্তার নতুন করে একটা প্রেসক্রিপসন করে দিল। এখানে এ্যান্টিবায়োটিকও দেয়া আছে। ডাক্তার বলেছেন ঔষধ গুলো অবশ্যই নিয়ম মাফিক খেতে হবে। এ্যান্টিবায়োটিক কোন ভাবেই মিসকরা যাবে না। আর নিয়ম মাফিক ঔষধ খেলে জ্বর কেন জ্বরের বাপেও সারতে বাধ্য হবে।
আমি তাহলে আসি বুবু।
ডাক্তার নিয়ম মাফিক ঔষধ গুলো খেতে বলেছেন কিন্তু সে নিয়মটা কি? কখন কোন ঔষধ খেতে হবে সেটাইতো জানলাম না।
ও আচ্ছা বুবু, আমি ভুলে গিয়েছিলাম বলতে- কোন ঔষধের পর কোনটা খেতে হবে, অনেকটা মাথা নিচেু করে আবিয়াকে বলে দিচ্ছে মোহন। আর আবিয়ার ঔষধ খাওয়ার নিয়ম জানার চেয়ে মোহনের কথা বলার ভঙ্গিটাই তাকে বেশী আকৃষ্ট করে, তাই সে-সেদিকটাই বেশী মনোযোগী।
মোহন ভাই, আপনার সময় আছে, একটু বসা যাবে কি?
হ্যাঁ বুবু বলুন, আমি আড়ত থেকে চলে এসেছি আর যাব না।
আচ্ছা মোহন ভাই, আপনার দুলাভাইয়ের আড়ত ছাড়া আর কি কি ব্যবসায় আছে?
না বুবু, এখন আড়ত ছাড়া অন্যকোন ব্যবসায় নাই।
কেন, তার সুদের ব্যবসায়?
না বুবু, গতো দু’তিন মাস থেকে তিনি সেটা আর করেন না। কে যেন তাকে বলেছেন যে, সুদের ব্যবসায় বাদ না দিলে তার ঘরে কোন দিনই আল্লাহর রহমত আসবে না। আর আল্লাহর রহমত না আসলে সন্তান আসবে কিভাবে? যারা সুদ খায় তাদের ওপর আল্লাহর গজব নাজিল হয়। এই জন্য একটি সন্তানের আশায় তিনি সুদের ব্যবসায় বাদ দিয়েছেন।
আহারে বেচারা! এখােেনও স্বার্থ?
আচ্ছা মোহন ভাই, আপনি না পাটগ্রাম গিয়ে স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন?
হ্যাঁ বুবু হয়েছিলাম কিন্তু সেখানে থাকতে পারিনি। দুলাভাই তাতে রাজি ছিল না। কারণ সংসার, ব্যবসায় সবই তো আমাকে সামলাতে হয়।
ও আচ্ছা। তাই বলে পড়া শোনা বাদ দিয়ে সংসার?
অনেকটা বাধ্য হয়েই বুবু, বাইরে যেয়ে পড়া লেখা করতে হলে অনেক খরচ আছে, আর আমাকে সেটা দেবে কে?
কেন? আপনার দুলাভাইয়ের তো আর টাকা পয়সার অভাব নাই। আপনার পড়া-শোনার খরচ আর ক’টাকাই বা হত?
কি যে বলেন বুবু? উনি বলেন,-যে পড়ালেখা শিখেছিস তাতে অনেক হয়েছে। এটাই বা ক’জন পারে। খাতাপত্র লেখালেখি আর ব্যবসায়ের হিসাব পত্র ঠিক ঠাক ভাবে করতে পারলেই হল। আমি পড়া শোনা করলে তার এ বিশাল সয়-সম্পত্তি কে দেখবে? আমিত সেই ছোটবেলা থেকেই এখানে আছি, তিনি আমার বাবার মতো, তার কথা ফেলি কি করে বলুন?
ও আচ্ছা বুঝেছি।
ইতোমধ্যে কাঁপতে কাঁপতে আবিয়ার গায়ে জ্বর এসে যায়, আবিয়া বলে-মোহন ভাই, কিছু মনে না করলে ঐ কম্বলটা একটু আমাকে দিনতো? খুব ঠাÐা লাগছে কেন জানি, হয়তো আবার জ্বরটা এসে গেলো। আপনার ডাক্তার বাবুতো খুব লেকচার মেরেছেন, একদিনও নাকি জ্বর থাকবে না। আবারও যে গায়ে জ্বর আসলো?
মোহন মাথানত করে বলল- এখনো তো এ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া শুরুই হয়নি বুবু? আগে ঔষধগুলো খান, তারপর না হয় সে কথা বলা যাবে। তবে তিনি যাই বলুন না কেন, আপনার সুস্থতা আসা ভীষণ জরুরি।
কেন? ভীষণ জরুরি কেন?
বারে, আপনি এ বাড়ির নতুন বোউ আর অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকবেন, সেটা কি করে হয়?
কি যে বলেন মোহন ভাই, নতুন বোউ। যার বিয়েই হলো না জীবনে সে আবার বোউ হয় কিভাবে? হাসি পায় শুনে, সম্প্রদান কারকের সপ্তমী বিভক্তির মতো নিঃশ্ব আমি। অব্যক্ত দুঃসহ যন্ত্রনায় কুঁকড়ে যাই, অসহায় চোখ কষ্টে ভেজে ইচ্ছেমত। ইচ্ছে-অনিচ্ছার মাঝেও জীবনের দুঃস্বপ্নগুলোকে নিয়ে বয়ে বেড়াই প্রতিটি মুহুর্ত। শেষ বিকেলের ধুসর আলো, গোধুলির সাথে মিশে যখন একাকার হয়ে যায় তখন নিজেকে ভাবি শুকতারার পতনে কেবল বাঁচিয়ে রাখার গল্পে। প্রতিটি পলে, প্রতিটি মুহূর্তে এক মুঠো রোদ্দুরের প্রত্যাশায় জীবনের স্বাদ খুঁজি। সময়ের বিরুদ্ধে এখন বৈরিতা আমার, অচল আধুলির মতো নিস্প্রাণ হয়ে স্বীয় অস্তিত্বের ভাঙ্গনে ভাঙ্গছি প্রতিনিয়ত। টুকরো টুকরো হয়ে যায় দেহ মন- মননশীলতা। অবেলায় ঝরে পড়া বকুলের অব্যক্ত অপলাপ, স্মৃতির মায়াজালে থকথকে প্রলেপ, জীবনের পিছুটান লোভাতুর মনে আঁচড়ে পড়ে বারংবার।
একটা নারীর জীবনে পান থেকে চুন খসলেই সমাজে নির্যাতিত হয়, নিপীড়িত হয়, নিগৃহীত হয়। সমাজ ব্যবস্থায় সুরক্ষার নামে নারীদের বাধা দেওয়া হয় মত প্রকাশে। অনিচ্ছুক নারীকে প্রতিনিয়ত বাধ্য করা হয়, তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে যেকোনো কাজ করতে। নারীকে সবসময়ই কারো না কারো অধীনে থাকতে হয়। কখনো পিতার, কখনো স্বামীর, কখনোবা পুত্রের। যতোদিন পর্যন্ত মানিয়ে নিতে পারে ততোদিনই নারী ভালো। কিন্তু মানিয়ে নিতে না পরিলেই বিপদ।
তীব্র অনাচারে গড়ে ওঠা নারী প্রতিবাদ সেটা বাইরের পরিবেশ হয়তো খানিকটা সহনীয় হবে কিন্তু অন্দরের অসহনীয় মানসিক যাতনা, কষ্টকর দিনযাপনের কাহিনী চার দেয়ালের ভিতরেই গুমরে গুমরে দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে যাবে তখনও। কারণ আমাদের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় নারীকে সংকুচিত করা বা নারীর ইচ্ছেকে মূল্য না দেওয়া এ সমাজ সেটাই বুঝতে পারে না।
অথচ নারী নিজের প্রয়োজনের কথা ভেবে, নিজের সুখ-শান্তি- সমৃদ্ধি, চাহিদার কথা মাথায় রেখে মানুষ গড়েছে সমাজ, নির্মাণ করেছে পরিবার, অসংখ্য ধরা-অধরা সম্পর্কের সুতোয় জড়িয়ে নিয়েছে নিজেকে। চিরকাল মানুষ বিশ্বাস করতে চেয়েছে সে পরিবারের মধ্যে, দলের মধ্যে, সমাজের মধ্যে বেঁচে থাকতে চায়। সেখানে প্রতিটি মানুষই স্বমহিমায় উজ্জ্বল। মর্যাদায় সম্মানে ভেদাভেদ থাকার কথা নয়। কথাগুলো আনমনে বলতে বলতে আবিয়া আবেগ প্রবণ হয়ে পড়ে তার দু’চোখ দিয়ে গড়িয়ে কয়েক ফোটা গরম অশ্রু।
আবিয়ার কথা শুনে মোহন স্তব্ধ হয়ে যায় ক্ষণিকের জন্য। তার মাথায় যেন আসমান ভেঙ্গে পড়ে। সুবোধ বালকের মতো মাথা নিচু করে নির্বাক হয়ে মনে মনে ভাবে-কে এই মেয়ে? সে পুর্নজন্মে বিশ্বাসী নয় বলে এটা ভাবতেও পাচ্ছে না যে, এটা কোন গর্ভজাত মহীয়সী রমণীর আত্মা মাত্র। একটা মানুষের পেটে কতটা বিদ্যের বুদ্ধির জোর থাকলে, কতটা ভাষার উপর দখল থাকলে-এমন কঠিন শব্দের গাথুনিতে শুদ্ধ বাক্য বের হতে পারে? এ কোন সাধারণ ঘরের মেয়ে হতে পারে না। বিদ্যা বুদ্ধি আর ভাষাজ্ঞানের শুদ্ধচর্চায় যথেষ্ট দখল না থাকলে এতো মাধুর্যপূর্ণ ছন্দময় শব্দের প্রয়োগ অসম্ভব। কারণ সবাইতো আর কাজী নজরুল নয়। তবে আজ থেকে তার সেই বিশ্বাসের পুর্নজন্ম হলো এই ভেবে যে- সবাই কাজী নজরুল না হলেও কেউ যে হবে না, সে কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
গভীর রাত ক্রমে আরও গভীর হতে চলেছে, কিন্তু আবিয়ার চোখে ঘুম নেই, এ পাশ ওপাশ করে কতোবার ঘুমাতে চেষ্টা করল, কিছুতেই কিছু হল না। চারিদিকে অথৈ অন্ধকার, কোথাও কোন সাড়া-শব্দ নেই। মাঝে মাঝে ঝিঁঝি পোকাগুলো দলবেঁধে একই সাথে ডেকে উঠছে। দূরের বাঁশ বাগানের কোন উঁচু গাছের ডালে বসে নিঃসঙ্গ পাখিটা তার স্বজাতি গলায় বোউ কথা কও, বোউ কথা কও বলে-অবিরাম ডেকেই চলেছে। হয়তো সে নিঃসঙ্গ স্ত্রী পাখিটার চোখেও ঘুম আসছে না, আমার মতো অজানা কোন কষ্টকে বুকে নিয়ে আলোর প্রহর গুনছে। বারান্দায় বসে চারদিকে তাকিয়ে দেখে রাতভোর হতে চলেছে। আকাশে রুগ্ন ও মৃতপ্রায় একফালি চাঁদ তার চিরপ্রতিদ্ব›দ্বী আঁধারকে তাড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে। হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই মসজিদে আজান পড়বে। দূরের কোনো মন্দিরে ঝনঝন করে বেজে উঠবে পুজোর ঘণ্টা। সারারাত ঘুম আসল না আবিয়ার। জীবনে এই প্রথম একটা নিদ্রাহীন রাত কাটলো, কি যে ভয়ঙ্কর কষ্ট নির্ঘুম রাত কাটানো। তবুও রাত শেষ হয় না। আলোর ভোর আসে না। মনে হয় ভোরের আলো ফুটলে অন্ধকারের সাথে তার মনের কষ্টগুলো হয়তো সরে যাবে। জীবনটা আবার নতুন করে আলোয় আলোয় ভরে উঠবে।
বিয়েটা মানুষের জীবনে কি জঠিল, কি কঠিন, কি সাংঘাতিক একটা ব্যাপার। সে সত্য হোক আর মিথ্যা হোক তাতে কিছু আসে যায় না। দু’জন নর-নারী একত্রে থাকবে, একই ঘরে, একই বিছানায়। পুরুষের ভোগের সামগ্রি হয়ে, সেখানে নারীর কোন কৈফিয়ত চলবে না, কোন মতামত থাকবে না। পুরুষটি যা চাবে, যেভাবে চাবে, নারীকে তাই করতে হবে। একজন পুরুষ সে যে বয়সেরই হোক না কেন, জোয়ান কিংবা বুড়ো, শারিরীক সামর্থ থাক আর না থাক। সে পুরুষ, বিয়ের মন্ত্র পাঠের অধিকারে সে স্বামী, দেবতুল্য তার উপর কোন কথা চলবে না। বছরে বছরে তাদের সন্তান আসবে, সে কোথা থেকে আসে আসুক তাতেও কিছু আসে যায় না। স্বামী-স্ত্রী তারা এক সঙ্গে থাকবে, চিরকাল থাকবে, যতোদিন বেঁচে থাকবে, একই সাথে, একই ঘরে, একই বিছানায় থাকবে এটাই অমোঘ বিধান।
বিয়ের রাতে সে অজ্ঞান হয়ে বিছানায় পড়ে ছিল এটাই তার অপরাধ। তার দেহটাকে দেবতুল্য স্বামী রাতে ভোগ করতে পারে নাই তাই সে ঘুম থেকে উঠে মারতে মারতে অজ্ঞান করে দেয়। অথচ তারই বিছানায়, তার পাশে স্ত্রী নামের যে বস্তুটি অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে, সে বেঁচে আছে না মরে গেছে একটি বারের জন্য তার হদিশ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে নাই। তার কাছে শরীরটাই আসল, শরীরটাই মুখ্য। এ রকম গরিব ঘরের দু’চারটা মেয়ে মরে পড়ে থাকলেও তার কিছু আসে-যায় না। আবিয়া মরে গেলে কালকে হয়ত সে আবিয়ার মতো আর একটা নতুন আবিয়ার খোঁজে বেড়িয়ে পড়বে। হয়তো সে গভীর রাতে গুণ্ডা-পাণ্ডা নিয়ে আবার নতুন কোন আবিয়ার বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হবে। তারপর ঘুমের ঘোরে তাকে তুলে নিয়ে এসে নিজের বিছানায় সারারাত তার দেহটাকে উপভোগ করবে।
সকাল বেলা আড়তে যাওয়ার আগে প্যান্ট-সার্ট পড়ে প্রতিদিনের মতো আজও মোহন রহিমার ঘরে যায়। কিন্তু সে ভুলে গেছে যে রহিমার ঘরে এখন তার সাথে আবিয়াও থাকে। মোহনের উপস্থিতি টেরপেয়ে আবিয়া ঘুমের ভান করে চোখ বন্ধ করে থাকে।
মোহনও আবিয়াকে তার বুবুর বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে যায়, তাই সে কোন প্রকার শব্দ না করে নীরবে বের হয়ে আসার জন্য পা বাড়ায়।
এমন সময় আবিয়া ডাকে মোহন ভাই? কিছু বলবেন?
না বুবু, আড়তে যাচ্ছিতো তাই বোড় বুবুর কাছে এসেছিলাম, সংসারের টুকিটাকি লাগবে কি না।
বাহ! আপনিতো বেশ সংসারি মানুষ দেখছি। অনেক দায়-দায়িত্ব আপনার মাথায়।
তবে দেখতে বেশ ভালোই লাগে ছেলেরা যখন দায়িত্ব নিয়ে একটু গার্জিয়ান গার্জিয়ান ভাব দেখায়।
আবিয়ার কথায় মোহন ভীষণভাবে আঘাৎ পেল, তার মুখে যেন কালবৈশাখের কালো মেঘ এসে জমাট বেঁধে রইলো। চোখ দু’টো যেন কেমন ঝাপসা হতে লাগল।
মোহনের এ অবস্থা আবিয়ার চোখকে ফাঁকি দিতে পারল না। আবিয়া এক লাফে বিছানা থেকে নেমে মোহনের হাতদু’টো ধরে বিছানায় বসাল। তারপর থুঁতনিতে হাত দিয়ে মোহনের মুখটা তুলে বলল-মোহন ভাই আমার দিকে তাকান। বিশ্বা করেন, কথাগুলো কিন্তু আমি আপনাকে মনে করে বলি নি। হঠাত আমার বেলাল ভাইয়ার কথা মনে হলো সেই অভিব্যক্তি থেকেই বলেছি। আমি জানি না কি মনে করে যে, আপনি এতোটা কষ্ট নিজের গায়ে মেখে নিলেন।
কথা বলা শেষ হতে না হতেই আবিয়ার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া এক ফোটা গরম অশ্রæ এসে মোহনের মুখে পড়ল, অমনি সে চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর স্বাভাবিক হয়ে বলল-সত্যি বুবু, আমি ভেবেছিলাম যে, আপনি আমাকে তাচ্ছিল্য ভেবে অপমান করছেন।
আবিয়া অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে বলে- মোহন ভাই, আপনাকে তাচ্ছিল্য ভেবে অপমান করব সে স্পর্ধা আমি পাই কোথায়? তার আগে যেন আমার মৃত্যু হয়।
এবার মোহন অনেকটা ঘাবড়ে গেল, পরিস্থিতিটা স্বাভাবিক করার জন্য সে বলে-বুবু সকালের ঔষধটা কি খেয়েছেন?
মোহন লক্ষ্য করল আবিয়া কথা বলতে পাচ্ছে না, তার চোখ শ্রাবণের বর্ষার পানিতে টইটুম্বুর হয়ে ভরে যাওয়া পুকুরের মতো কেবল উছলে পড়ার অপেক্ষায় আছে। কোনভাবে সে স্বাভাবিক হতে পাচ্ছে না। পুরুষদের ওপর প্রভাব খাটার জন্য সুষ্টিকর্তা নারীদেরকে হাতিয়ার হিসেবে এ চোখের অশ্রæটাই দিয়েছেন।
মোহন আবারো বলে-বুবু, সকালের ঔষধটা কি খেয়েছেন?
ঔষধ খাওয়ার কথাটা মোহন পরপর দু’বার উচ্চারণ করায় আবিয়া মাথা নিচু করে হেসে ফেলে। তারপর বলে-মোহন ভাই আমার মতো একটা ভাগ্যহত মেয়েকে নিয়ে আপনার এতটা দুঃচিন্তা করার কোন মানেই হয়না। আবিয়া নিজে গিয়ে পানির গøাস এনে মোহনের সামনে ঔষধ খাচ্ছে আর তার দিকে তাকাচ্ছে। হঠাত মোহনের সাথে চোখা-চোখি হয়ে যাওয়ায় সে আবারও হেসে ফেলল।
এবার মোহন একটু লজ্জাই পেল-মাথা নিচু করে সে বলল-মিনুকে বললেই তো সময়মত ঔষধ খাওয়ার কথাটা বলে দেয় বুবু।
আরে না মোহন ভাই আমার মনে ছিল কিন্তু বিছানা ছেড়ে ওঠার ইচ্ছে করছিল না। খুব ক্লান্তি লাগছিল।
আচ্ছা আপনার জ্বরটা কি কমেছে?
হ্যাঁ মোহন ভাই, অনেকটাই কম মনে হচ্ছে, তাছাড়া আপনার ডাক্তার বাবু যেভাবে
গ্যারান্টি সহকারে বলেছেন তাতে জ্বর না কমে কি তার নিস্তার আছে। গতকাল তো ভেবে ছিলাম যে, আমি বোধয় মরেই যাব।
আরে না বুবু , জ্বরে কেউ মারা যায় এমন নজীর খুব কমই আছে।
আমার বেলায় এর ব্যাতিক্রম হবে, কারণ আমার মত একটা হতভাগী মেয়ে মরে গেলে পৃথিবীতে অন্তত একটা আসন ফাঁকা হবে। সৌভাগ্যবানদের বেঁচে থাকার অনেক সুবিধা হবে।
তাই না কি? নিজে মরে গিয়ে সৌভাগ্যবানদের বাঁচার দায়িত্বটা আপনাকে কে দিয়েছে বলুন তো?
মোহন ভাই, নিজের ক্ষত-বিক্ষত জীবন নিয়ে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আত্ম উপলব্ধি দ্বারাই এটা অনুমিত, এ কাউকে শিখিয়ে দিতে হয় না।
না বুবু, আমার সেটা মনে হয় না। আর আপনার এমন কিছুই হয় নাই, যার জন্য এতোটা ভেঙ্গে পড়তে হবে
মোহন ভাই, যে কলি ফুল ফোটার আগেই ঝরে যায়, সেটি মাটিতে পড়ে থাকলে পচে যেতে কতক্ষণ?
আর যদি মটিতে পড়ে না যায়, তাহলে তো আর পঁচে যাওয়ার কোন সম্ভাবনা থাকবে না, তাই না?
মাটিতে না পড়লে শুকিয়ে যাবে, সেটাই বাস্তবতা। সূর্যের প্রখর রোদ কখনোই তাকে ছাড়বেনা।
মাটিতেও পড়বে না, শুকিয়েও যাবেনা, প্রকৃতির ¯েœহ মমতায় আজীবন সজীব ও সতেজ হয়েই থাকবে, এটাই আমি বিশ্বাস করি।
সে আপনি যাই বলেন না কেন মোহন ভাই, বাস্তবতা তো আলাদা জিনিস। সে কখনো আমার পিছু ছাড়বে না। জন্মের পর থেকেই আমি দেখেছি, আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। পৃথিবীতে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য, আনন্দ-উৎসব সম্ভোগ করা আমার কাজ নয়, আমার কাজ সবকিছু সহ্য করা, জীবনের সকল তামাশাকে বুঝে নেওয়া।
কথা গুলো বলতে বলতে- আবারো আবিয়ার চোখের কোণে অশ্রæ জমে যায়, মোহন যেন দেখতে না পায় সে জন্য একটু দূরে গিয়ে পরনের ওড়না দিয়ে চোখ মুছে ফেলে আবিয়া।
নারীর প্রতি বৈষম্য কোনোদিনও শেষ হওয়ার নয়। বিশেষ করে গ্রাম অঞ্চলে নারী মানে নারীই, পূর্ণাঙ্গ মানুষই নয় তারা। যতোই জাতপাত মুক্ত করতে চায় সে, ততোই সমাজের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে যায় নারী। শ্রেণিভেদে নারীর যে অবস্থান, সেখানে কেউ-ই ভালো নেই। নারীর প্রতি যেমন হয় ব্যাপক মানসিক নির্যাতন, তেমনি শারীরিক নির্যাতনও কম হয় না। স্থুল-সূক্ষ্ম খোঁচা থেকে শুরু করে সব আয়োজন সেখানে উপস্থিত থাকে। স্ত্রী হলো স্বামীদের স্থায়ী সম্পদ, তাকে যা ইচ্ছে তা-ই করা যায়, যেভাবে ইচ্ছে ব্যবহার করা যায়। অনেকেই বলতে পারেন, তাহলে নারী এমন ঘর কেন করবে? কিন্তু কিই বা করার আছে তার? সামাজিক রোষানল থেকে রেহাই পেতে তাকে সব মুখ বুঁজে সহ্য করতে হয়। তবুও কেউ কেউ প্রতিবাদ করলে পরিবার ও সমাজের চোখে সে হয় উচ্ছৃঙ্খল বেয়াদব আর ভ্রষ্টা নারী হিসেবে গণ্য হয়।
সময় যায়, মেনে নিতে নিতে জীবনও যায় কিন্তু সমাধান আসে না। মেয়েটি সহ্য করতে করতে এক সময় সে ক্লান্ত হয়ে জীবন ছেড়ে দেয় নিয়তির হাতে। ততো দিনে সে বুঝে যায়, শখ আহ্লাদ আদর ভালোবাসা তার জন্য নয়, প্রাণটা নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে আছে, এটাই ঢের। অনেকটা বেঁচে থাকতে থাকতে মরে যাওয়া অথবা মরার মতো বেঁচে থাকা। কারণ ততদিনে প্রতিবাদ করার শেষ শক্তিটুকুও নিঃশেষ।
শারীরিক মানসিক নির্যাতন হয় তাদের নিত্যসঙ্গী।
মোহন আর স্থির থাকতে পারে না। সে আবিয়ার খুব কাছে গিয়ে বলে- বুবু, ভাই বলেন, আর বন্ধু বলেন আমিতো আপনার পাশে আছি, সুখে-দুখে, আনন্দ-বেদনায় যখনই ডাকবেন আমাকে পাশে পাবেন, আমি কথা দিলাম।
না মোহন ভাই, এখানে ্ভাই কিংবা বন্ধুত্বের প্রশ্ন নয়, প্রশ্নটা জীবনের, বাঁচা মরার প্রশ্ন। জীবনের শুরুতেই যখন সর্বনাসের শনিচক্র আমার পিছু নিয়েছে, এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
এমন সময় মিনুর মা এসে নাস্তা দিয়ে বলে- ছোট আম্মা চা খাবেন না কি এক গøাস দুধ দিয়া যাইম।
না খালা, আর কোন কিছুই লাাগবে না, মুই রান্না ঘরোত যাবার নাগচু।
ছোট আম্মা তোমার না জ্বর, রান্না ঘরোত আসির নাগবে না। তোমার কি দরকার হয় মিনুক কন দিয়া যাবে এলায়।
মোহন আর আবিয়াকে তার ঘরে দেখে রহিমাও আসে। রহিমা আবিয়ার কপালে হাত দিয়ে দেখে তার জ্বর নাই। সে আনন্দে তার চোখ দু’টো জ্বল জ্বল করে ওঠে। মোহনের দিকে তাকিয়ে রহিমা বলে- মোহন আবিয়ার কপালোত একনা হাতখান দিয়া দেখতো মোরতো মনে হবার নাগচে জ্বর আর নাই, সারি গেইচে।
বড় বুবু সাথে থাকাতে মোহনের সাহস বেড়ে যায়, এবার সে আবিয়ার কাছে যেয়ে কপালে হাত দিয়ে দেখে সত্যি সত্যি জ্বরটা সেরে গেছে। মোহন বলে বুবু, ডাক্তার এন্টিবায়োটিক ঔষধ দেওয়ায় ফলে জ্বরটা সারি গেইছে কিন্ত ঔষধ বন্ধ করা যাবে না। এন্টিবায়োটিকের সাত দিনের যে ডোজ দেওয়া আছে সেটা খ্যায়া শ্যাষ করির নাগবে। তা নাহইলে কয়দিন পর জ্বর আরোও ফিরি আসিবে। ছোট বুবুর ঔষধ খাওয়ার কথা মনে থাকে না, সকালে, দুপুরে আর রাইতোত তুই এ্যাকনা মনে করি দিসতো। মোহনের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে আবিয়া বলে-না বুবু- মোহন ভাই এ্যাকনা বেশি করি কবার নাগচে। আইজ সকালে বিছানা থাকি উঠির মন চাইছিলো না তাই সকালের ঔষধটা খাইতে এ্যাকনা দেরি হইচে, সেই জন্য মোহন ভাই তোমাক অমোন করি কবার নাগচে।
রহিমা তাদের দু’জনার পাল্টা-পাল্টি অভিযোগের কথা শুনে মনে মনে হাসে। অনেক দিন পর আজ আবিয়ার মুখ থেকে কি সুন্দর কথা বের হচ্ছে, মনে হয় যেন কথার খই ফুটছে। রহিমা একদৃষ্টে আবিয়ার দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবে কি সুন্দর পরীর মতো চেহারা, কি সুন্দর ব্যবহার আর তায় কিনা এই বুড়াটার সাথে ঘর করিবে। হায় আল্লাহ! অয় কি পাপ করিল তোর কাছোত যারজন্য তুই অর ফুলের মতো জীবনটাক একেবারে দোজখ বানে দিলু। ওয় কিভাবে ওই জোলধা বুড়াটার সাথে রাইত কাটাবে।
নারী জীবনের স্বর্থকতা হলো সুবোধ সঙ্গী হিসেবে একজন যোগ্য পুরুষ তার পাশে থাকা। সুখে-দুঃখে, আনন্দ-বেদনায় এক সাথে থেকে জীবন পারি দেওয়া। সোনার পালঙ্ক আর মখমলে সাজানো বিছানা তারা চায় না। তারা চায় যোগ্য সঙ্গীটি সব সময় তার পাশে থাক। দিনের আলোয়, অমাবশ্যার অন্ধকারে কিংবা পূর্ণিমার অ¤øান জোৎ¯œায়-সবসময় অজগর সাপের মতো সে তার শরীরে পেঁচিয়ে থাক। তাকে ভালোবাসুক, পৃথিবীর শ্রেষ্ট ভালোবাসায় ভরিয়ে দিক তার জীবন। ধন-সম্পত্তি, টাকা-পয়সা, সোনার গহনা কোন কিছু কাম্য নয়। যোগ্য পুরুষটির হাত ধরে সে নির্দ্বিধায় বেড়িয়ে যেতে পারে পৃথিবীর অপরপ্রান্তে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now