বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অভিশপ্ত স্পেনসার কোর্ট

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মুহাঃ এ.এস শেখ (০ পয়েন্ট)

X ।। অভিশপ্ত স্পেনসার কোর্ট ।। লেখেছেনঃ- priya banerjee ইংলন্ডের সাউদাম্পটন শহরের একেবারে কোনের দিকে তিনতলা বাড়িটা। বাড়িটা যে কত পুরনো তার ঠিক নেই। ও বাড়ির বাসিন্দারাও আজ আর কেউ নেই। বংশপরম্পরায় যদি কেউ থেকেও থাকে তো সে যে কস্মিনকালে এখানে পাও মাড়ায় না তা আর আজ বলার অপেক্ষা রাখে না। রোদে-বৃষ্টিতে, তুষারপাতে বাড়ির গায়ের আসল রংটাই হারিয়ে গেছে আজ। গা দিয়ে ভগ্নপ্রায়, মরচে ধরা জলের পাইপ, আধভাঙা দরজা, ওপরের বন্ধ জানলাগুলোর কাঁচ একটাও আস্ত নেই। পায়রা, বাদুড় আর চামচিকের নিশ্চিন্ত আস্তানা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘরগুলো। তিনতলার পরেই ছাদ আর সেই ছাদের দেওয়াল ফুঁড়ে বেরিয়েছে বুনো গাছ। এরকম হতশ্রী চেহারার বাড়ি যে এই একবিংশ শতাব্দীতে এরকম একটা অভিজাত শহরে থাকতে পারে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। হতকুৎসিত চেহারার এই তিনতলা বাড়িটির নাম স্পেনসার কোর্ট। কবে কে এর এই নাম দিয়েছিল তা আজ আর জানার উপায় নেই। স্পেনসার কোর্টকে ঘিরে এলাকায় বলতে গেলে গোটা ইংলন্ডেই নানারকম কানাঘুষো শোনা যায়। অনেকেই ওটাকে হন্টেড হাউস বা হানাবাড়ি বলে। কিন্তু কেন? এ ব্যাপারে কেউ অবশ্য সঠিকভাবে কোনও আলোকপাত করতে পারে না। শুধু পাড়ার এক শতায়ু পার এক বৃদ্ধের কথায় ওই বাড়িতে শেষ যিনি মালিক ছিলেন, জ্যাক স্পেনসার, তিনি ছিলেন প্রবল 'মাইসোগ্নিস্ট' বা নারীবিদ্বেষী। পাড়ায়, এলাকায়, শহরে যেখানে যত নারী বা মেয়ে দেখতেন ফুসলে ফাসলে ধরে নিয়ে এসে ওই বাড়িতে খুন করে জবাই করতেন। যুবতী বা পূর্ণবয়স্কা মেয়েদের সাথে প্রেম বা বন্ধুত্বের নামে ডেকে এনে বা নাবালিকাদের সাথে দাদা, কাকা সেজে ভাব জমিয়ে বিস্কুট চকোলেটের লোভ দেখিয়ে বা ঐ ধরনের যে কোনও কিছুর লোভ দেখিয়ে বাড়িতে ডেকে এনে জবাই করতেন। তারপর একদিন কি হল.......... একদিন ঐ বাড়ি থেকে পচা দূর্গন্ধ আসতে এলাকার লোক পুলিশ ডেকে বাড়ির ভেতর গিয়ে জ্যাক স্পেনসারের পচা গলা লাশ দেখতে পায়। কি করে তার মৃত্যু হয়েছে তা এলাকার লোক তো বটেই, পুলিশের কাছেও একটা মস্ত বড় ধাঁধাঁ। এই ঘটনার পঞ্চাশ বছর পরেও পুলিশ এই রহস্যময় খুনের কোন কিনারাই করতে পারে নি। তবে জ্যাক যে একজন মারাত্মক লেডিকিলার ছিল তা তার টেবিলে হেলায় পড়ে থাকা ডায়েরী থেকে জানতে পারে পুলিশ। ডায়েরী টাও বড় রহস্যময় ভাবে টেবিলে পড়ে ছিল। একেবারে হাট করে লেখা পাতাগুলো খোলা যেন জ্যাক স্পেনসার মৃত্যুর ঠিক আগে তার কুকর্মের কথাই লিখছিল তারপরই এসেছিল রহস্যময় মৃত্যু যার জন্য সে ডায়েরীটা বন্ধ করারও সময় পায় নি। তার ডায়েরী থেকেই পুলিশ ঐ বাড়ির বাগান, সিঁড়ি, ঘরের দেওয়াল এমনকি উঠোন আর গ্যারেজ এর মেঝে খুঁড়ে প্রচুর কঙ্কাল উদ্ধার করে। এর পর থেকেই বাড়িটি সম্পূর্নভাবে পরিত্যক্ত আর লোকমুখে হানাবাড়ি নামে পরিচিত হয়ে যায়। কেউ অবশ্য কোনওদিন ভয়ের কিছু দেখেনি কিন্তু মানুষের সংস্কারই এমনি। কোথাও সিরিয়াল কিলিং সঙ্ঘটিত হলেই সেই জায়গা লোকের মনে এক অজানা অনুভূতির জন্ম দেয়। তদুপরি সবাই এটাও লক্ষ্য করেছে ঐ বাড়ির সামনে পোষা কুকুর নিয়ে হাঁটলে কুকুরগুলো বাড়িটার দিকে তাকিয়ে হিংস্রভাবে গর্জাত। যেন তারা ভয়ানক কোনও অস্তিত্ব টের পেত। চেঁচাতে চেঁচাতে তাদের মুখ দিয়ে রীতিমত ফ্যানা উঠত। এইসব দেখে এলাকাবাসীর ভয় আরও বেড়ে গেল। স্পেনসার পরিবারের যারা কাছে দূরের আত্মীয় ছিলেন তাঁরাও এখানকার সাথে সম্পূর্ণভাবে সম্পর্ক ত্যাগ করেন। মাঝে কেটে গেল পঞ্চাশটা বছর। ডিসেম্বরের প্রবল শীতের রাত। অবিশ্রান্ত তুষারপাত হচ্ছে। এক ভবঘুরে প্রায় ভিখারি যুবক রাতে কোথাও আশ্রয় না পেয়ে ঠিক করে ঐ পরিত্যক্ত স্পেনসার কোর্টে রাতটা কাটাবে। বাড়িটি যে অভিশাপগ্রস্ত তা লোকমুখে সেও শুনেছে কিন্তু শীত বড় বালাই। সে যদি এই প্রবল তুষারঝরা রাতে কোথাও আশ্রয় না নেয় তো সে হয়তো মারাই যাবে। সে ঠিক করে যদি মরি তো আরাম করেই মরব। অন্তত বরফের তলায় ঢাকা তো পড়বে না শরীরটা। ভবঘুরে যুবকটির নাম ছিল রেহ্যাম। সে স্বভাবেও দারুন সাহসী ছিল হয়ত তার অভাব অনটনই তাকে সাহসী করে তুলেছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত ঐ সাহসই তার কাল হয়েছিল। ভাঙা দরজা দিয়েই সম্ভবত সে ঐ হানাবাড়ির ভেতর প্রবেশ করেছিল কারন পরদিন সকালে দরজাটা প্রায় খোলা অবস্থায় দেখা গিয়েছিল। ঠিক মাঝরাতে প্রচণ্ড চেঁচামেচির শব্দে এলাকার সবার ঘুম ভেঙে যায়। শীতের রাত উপেক্ষা করে সবাই বেরিয়ে এসে দ্যাখে সেই পরিত্যক্ত স্পেনসার কোর্ট থেকে বিস্রস্ত পোশাকে আর বিধ্বস্ত চেহারায় রেহ্যাম নামের লোকটি বেরিয়ে আসছে। সবাই যখন উদ্বিগ্ন ভাবে তাকে ঘিরে ধরল সে তখন রীতিমত হাঁফাচ্ছে। ভাল করে কথাই বলতে পারছে না। উন্মাদপ্রায় হয়ে অস্ফুট স্বরে অসংলগ্নভাবে যা বলল তা থেকে বোঝা গেল সে বলছে- "ওরা.....ওরা... ..ওরা......আসছিল....... ভয়ংকর......... বলতে বলতে অজ্ঞান হয়ে গেল সে। তারপর সে প্রায় এক বছর মানসিক হাসপাতালের বাসিন্দা ছিল। প্রায়ই চিৎকার করে উঠত- " ঐ ঐ ওরা আসছে.......ওরা আসছে...... লোকটি ঠিক এক বছরের মাথায় মারা যায়। এই ঘটনার রেশ লোকের মনে অনেকদিন রইল। এতদিন এমনিই লোকে ঐ বাড়ির ভেতর কখনো যেত না এমনকি দিনের বেলাতেও না। তদুপরি রেহ্যামের ঘটনার পর ঐ বাড়ির সামনে দিয়েও কেউ যেত না। আগে আগে পাড়ার ছোট ছেলেমেয়েগুলো বাড়ির সামনের গাছপালা ঘেরা রাস্তায় খেলত কিন্তু ঐ ঘটনার পর বাড়ির সামনের রাস্তাটাও সুনসান হয়ে গেল বরাবরের মতো। এরপর একদিন ঘটল সেই ঘটনা। এতদিন লোকে কিছু দেখেনি বা শোনেনি কিন্তু মার্গারেটের অভিজ্ঞতা সবাইকে নড়িয়ে দিল। মার্গারেটদের বাড়ি স্পেনসার কোর্টের একটু কাছে। এক দুপুরে পোষা কুকুরটাকে খুঁজতে খুঁজতে স্পেনসার কোর্টের সামনের রাস্তায় এসে পড়ে। তার পোষা কুকুর রকি একটু বাইরে ঘুরতে গিয়েছিল। তাকেই খুঁজছিল সে। যেইমাত্র সে স্পেনসার কোর্টের সামনের রাস্তায় এসেছে ঠিক তখনি পরিত্যক্ত স্পেনসার কোর্টের ভেতর থেকে তার প্রিয় রকির আর্তনাদ শুনতে পায় সে। যেন কেউ তার ঘাড়টা মটকে দিচ্ছে। মার্গারেটের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। সে ঠিক করল, তার নিজের বিপদ হয় হোক কিন্তু প্রাণপ্রিয় রকিকে সে ঐ অভিশপ্ত বাড়ি থেকে উদ্ধার করবে। যেমন ভাবা, পাঁচিল টপকে সে বাড়ির চৌহদ্দির ভেতর ঢুকে পড়ে। তারপর কি করছে না ভেবেই শব্দ লক্ষ্য করে ছুটতে থাকে ঐ বাড়ির ভেতর। ভেতরে ঢুকে এদিক ওদিক খুঁজতে থাকে, রকির নাম ধরে ডাকতে থাকে কিন্তু আর সাড়া মেলে না। চারপাশ নিস্তব্ধ নিঝুম। খুঁজতে খুঁজতে মার্গারেট তেতলার একটি ঘরে প্রবেশ করতেই তাকে চমকে দিয়ে ঘরের দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়। পাগলের মত ছুটে এসে হতভম্ব মার্গারেট দরজা ধাক্কাতে থাকে কিন্তু দরজা আর খোলে না। পাগলের মত চিৎকার করতে থাকে মার্গারেট কিন্তু বাড়ি আর তার আশপাশ জনহীন হওয়ায় কেউ ওর ডাক শুনতে পেল না। হতাশ হয়ে যখন মার্গারেট কাঁদতে শুরু করেছে হঠাত সে টের পেল ঘরের আবহাওয়াটা কেমন বদলে যাচ্ছে। এই ভরা গ্রীষ্মেও ঘরের তাপমাত্রা মনে হচ্ছে যেন হিমাঙ্কের নীচে নেমে গেছে। প্রচণ্ড শীতে আর অজানা আতঙ্কে জবুথবু হয়ে এককোনে সিঁটিয়ে বসে রইল মার্গারেট। কিছুক্ষন পর দেখল ঘরটা এবার সাদা সাদা কুয়াশায় ভরে উঠছে। দরজার তলা দিয়ে পুঞ্জ পুঞ্জ কুয়াশা ঢুকে ঘরটাকে তার চোখের সামনে থেকে প্রায় অদৃশ্য করে ফেলছে। সেই কুয়াশায় তার দম আটকে আসতে লাগল। কোনওমতে সাহস সঞ্চয় করে সে আবার আপ্রান চেষ্টা শুরু করল বাইরে বেরোবার। নিদারুণ ভয়ে সে কাঁদতে লাগল। দরজার হাতল ধরে টানাটানি করছিল সে হঠাত সে দেখতে পেল কুয়াশার ভেতর থেকে আর একটা কুয়াশামোড়া শীর্ন সাদা হাত তার হাতটাকে ধরেছে। এটা দেখার পরই সে অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়ে যায়। এদিকে অনেকক্ষন হয়ে গেলেও মেয়ে ফিরছে না দেখে তার মা বাবা চিন্তা শুরু করেন। পোষা কুকুর রকি ফিরে এসেছে অথচ মার্গারেট ফিরল না! রকি তাঁদেরই প্রতিবেশীর বাড়িতে, ঐ প্রতিবেশীদেরই কুকুরের সাথে লুকিয়ে ছিল। অগত্যা তাঁরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। খুঁজতে খুঁজতে তাঁরা সেই স্পেনসার কোর্টের সামনে এসে পড়েন। তখনি মার্গারেটের বাবা দেখতে পান বাড়ির পাঁচিলের এই ধারে মার্গারেটের এক পাটি জুতো হেলায় পড়ে আছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপারটা বুঝে পুলিশে ইনফর্ম করেন। পরে পুলিশ এসে পরিত্যক্ত স্পেনসার কোর্টের ভেতর থেকে অচৈতন্য মার্গারেটকে উদ্ধার করে। প্রায় নয় মাস মানসিক হাসপাতালে কাটিয়ে সুস্থ হয়ে মার্গারেট সবাইকে তার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা বলে। এর পর থেকেই স্পেনসার কোর্ট সারা ব্রিটেনে হন্টেড হাউস হিসেবে চিরস্থায়ী কুখ্যাতি লাভ করে। এই খবর একসময় দেশের প্রখ্যাত প্রেত বিশেষজ্ঞদের কানেও পৌঁছয়। সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা স্পেনসার কোর্টে সরেজমিনে তদন্ত করতে আসবেন। সংস্থাটির নাম প্যারানর্মাল রিসার্চ এজেন্সি। তাঁরা এর আগেও দেশ এমনকি পৃথিবীর যে কোনও দেশের কোনও হন্টেড প্লেসের খবর এলেই সে সব জায়গায় ইনভেস্টিগেট করতেন। রেহ্যামের ব্যাপারটা আগেই শুনেছিলেন, এবার মার্গারেটের ব্যাপারটা তাঁদের কানে আসতেই তাঁরা আর বিলম্ব করলেন না এ ব্যাপারে তদন্ত করতে। তাঁরা স্পেনসার কোর্টে ইনভেস্টিগেট করে যাবার পর রিপোর্টে তাঁরা কি বলেছিলেন এখানে তাঁদের জবানীতে তুলে ধরা হল:- ১২ ই মে, ২০০০। আমরা এখন দাঁড়িয়ে আছি স্পেনসার কোর্টের সামনে যা বিগত ৫০ বছরেরও বেশী সময় ধরে পরিত্যক্ত। আমরা এই এলাকার সবচেয়ে প্রবীণ বাসিন্দা মিঃ চার্লস হিউজের কাছ থেকে যা জানতে পেরেছি তা হল এই স্পেনসার কোর্ট নারী হত্যার এক প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল স্পেনসার পরিবারের শেষ বংশধর জ্যাক স্পেনসারের আমলে। তিনি ছিলেন প্রবল নারীবিদ্বেষী যা থেকে মেয়েদের হত্যার এক সাইকো ডিজিজে আক্রান্ত হন তিনি। বাচ্চা থেকে বুড়ি কেউ তাঁর হাত থেকে রেহাই পায় নি। এই বাড়িতেই চলত নৃশংস হত্যালীলা এবং গণ কবর। সেই দুরাত্মা জ্যাকের মৃত্যু ঠিক কিভাবে হয়েছিল তা আজও এক রহস্য। তবে আমরা মনে করছি বাড়ির ভেতর ঢুকলেই এই রহস্যের সমাধান করতে পারব আমরা। " রিপোর্টে এর পরের লেখাগুলো অতীত কাল ব্যবহার করে লেখা হয়েছে অর্থাৎ ঐ অভিশপ্ত বাড়িতে ইনভেস্টিগেটের পর কি অভিজ্ঞতা হয়েছিল তা তুলে ধরা হয়েছে। " প্রথম ঘরটায় ঢুকেই আমরা দোতলার ঘর থেকে কিছু অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম। মনে হল কেউ কাওকে কিছু দিয়ে আঘাত করছে আর ভিক্টিম মহিলা চাপা আর্তনাদ করছে। আমরা শব্দ অনুসরন করে দোতলায় উঠলাম। দোতলার ঘরগুলো তন্নতন্ন করে খুঁজলাম কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না। তবে মনে হচ্ছিল আমাদের পেছু পেছু কারা যেন নি:শব্দে অনুসরন করছে। বাইরে গরম আবহাওয়া থাকলেও এই বাড়িটির আবহাওয়া অস্বাভাবিক রকম শীতল। উপরন্তু আমাদের কারোর ফোনের নেটওয়ার্ক কাজ করছে না। টাওয়ার নেই। এর যুক্তিসংগত কোনও ব্যাখ্যাই আমাদের কাছে নেই। আমাদের যন্ত্রের কাঁটাও দ্রুত এদিক ওদিক করছে। হ্যাঁ, অর্থাৎ এখানে অশরীরীর বাস আছে। হঠাত আমাদের দলের মধ্যে যে সবচেয়ে পেছনে ছিল সেই নিক ভয়ার্তভাবে আর্তনাদ করে উঠল। আমরা তার দিকে টর্চের আলো ফেলতেই তার ভয়ে পান্ডুর হয়ে যাওয়া মুখটা দেখতে পেলাম। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। চোখদুটো যেন কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আমাদের অনেক চেষ্টার পর একটু স্বাভাবিকতা ফিরে পেয়ে নিক বলল, ওকে পেছন থেকে কে যেন জোরে ধাক্কা দিয়েছে একটু আগে। অথচ ওর পেছনে আর কেউই ছিল না। আমরা যখন নিকের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা নিয়ে ভাবছি সেই সময় হঠাত আমাদের চমকে দিয়ে ঘরের দরজাটা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। আমরা দৌড়ে দরজার কাছে গিয়ে প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলাম ওটা খোলার কিন্তু একচুল ফাঁক করতে পারলাম না। আমরা যখন হাল ছেড়ে দিয়েছি সেই সময় আমাদের অবাক করে দিয়ে দরজার কপাটদুটো আস্তে আস্তে খুলতে লাগল, সেই সঙ্গে শোনা যেতে লাগল একটা ভারী পুরুষকন্ঠে বিদ্রুপাত্মক হাসির শব্দ। অনুমান করে নিতে কষ্ট হল না এই কণ্ঠস্বর পঞ্চাশ বছর আগে মৃত জ্যাকের। আমরা বন্ধ ঘরটার বাইরে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম তখনি ওপরের সিঁড়ি থেকে শোনা গেল একটা অদ্ভুত শব্দ। মনে হল যেন অনেকগুলো বাচ্চার ভীতসন্ত্রস্ত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে আর্ধেক নেমে আবার ওপরে উঠে গেল। তাদের জুতোপরা পায়ের চকিত শব্দে এমনটাই মনে হল। আমি সেদিকে দৌড়ে গেলাম কিন্তু সিঁড়িতে কাওকে দেখা গেল না, এমনকি ছায়াও না। আমি বুঝলাম ওরা হল সেই হতভাগ্য বালিকাদের আত্মা যারা একদা জ্যাকের হাতে নির্মমভাবে খুন হয়েছিল। তাই টিমকে বললাম " কুইক, ওপরে চল"। সবাই জ্বলন্ত টর্চ হাতে আমার অনুসরন করে তিনতলায় এল। এখানে আরও কিছু ভয়াবহ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলাম। তিনতলার পুরো ফ্লোর জুড়ে রক্তের সরু সরু রেখা আঁকিবুঁকি কেটেছে যেন কেউ বস্তাবন্দী লাশ এখান থেকে ওখানে সরিয়েছে। আর......আর......ওকি! ঘরের দরজাগুলো সমানে খুলছে আর বন্ধ হচ্ছে.....খুলছে আর বন্ধ হচ্ছে। গোটা স্পেনসার কোর্ট জুড়ে সোঁ সোঁ করে জোর হাওয়া বইছে। আশ্চর্য! বদ্ধ এই তিনতলায় এই জোর বাতাস কোত্থেকে আসছে! হাওয়া তো নয় যেন শত শত নারীর করুন গোঙানি আর দীর্ঘশ্বাস। ভূমিকম্পের মতো কাঁপছে বাড়ির দেওয়ালগুলো সেই সঙ্গে রক্তমাখা আঙুল দিয়ে অদৃশ্য কেউ বা কারা যেন লিখছে - ' মুক্তি চাই......মুক্তি চাই', কখনো লেখা ফুটে উঠছে- ' ওহ গড, সেভ মি'......বোধহয় মৃত্যুর আগে কোনও হতভাগিনী এমনটাই লিখেছিল। কখনো সক্রোধে কেউ লিখছে- ' ছাড়ব না......ছাড়ব না কাউকে......' টর্চের আলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমরা দেওয়ালে অশরীরীদের লেখাগুলো পড়ছিলাম। অক্ষরগুলো থেকে রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। তিনতলার ঘরগুলোয় ঢুকে ঢুকে দেখছিলাম দেওয়ালে দেওয়ালে সুস্পষ্ট রক্তের দাগ, রক্তমাখা পুরুষালি থাবার চিহ্ন। অথচ আমরা জানি দিনের বেলা যখন এসে পরীক্ষা করেছিলাম তখন দেওয়ালে এই দাগগুলি অতি অস্পষ্ট ছিল কিন্ত এখন মনে হচ্ছে যেন সদ্য খুন করে কেউ দেওয়ালে হাত মুছেছে। প্রত্যেক রাতে এমনি করেই কি সেই পঞ্চাশ বছর আগের জঘন্য পাপানুষ্ঠানের পুনরাভিনয় ঘটে চলেছে এই বাড়িতে! খুনি জ্যাক কি শেষপর্যন্ত এই হতভাগিনীদের আত্মার হাতেই প্রান হারিয়েছিল! কত কি ঘটতে লাগল আমাদের চোখের সামনে! কতজনের অস্পষ্ট মূর্তি আমাদের চারপাশ দিয়ে আনাগোনা করতে লাগল। বালিকার মূর্তি, কিশোরীর মূর্তি, যুবতী, মহিলা এমনকি বৃদ্ধার মূর্তিও দেখতে পেলাম। তবে রক্তমাংসের শরীর নয় কারোরই, সবারই দেহ যেন ধোঁয়া দিয়ে গড়া। ধবধবে সাদা পেঁজা পেঁজা মেঘ দিয়ে গড়া অবয়ব সকলের। কখনো একটি রাশভারী পুরুষের মূর্তিও দেখতে পেলাম। সম্ভবত সেই লেডিকিলার জ্যাক। আমাদের ওপর জ্বলন্ত চক্ষুদুটি বুলিয়ে দেখে নিল একবার। কখনো শূন্য থেকে আমাদের দিকে উড়ে আসতে লাগল ভাঙা চেয়ার, কিচেনের ভাঙা মরচে ধরা বাসন কোসন, ভাঙা শিশিবোতল, কত কি। এবার আমার গ্রুপের জনসন বলল- " স্যর, কেস জটিল হয়ে উঠছে। আর এখানে থাকা ঠিক নয়, চলুন বেরিয়ে যাই"। আমি দাঁতে দাঁত চেপে ওকে বললাম- " তোমরা যেতে চাইলে যেতে পার কিন্ত আমি এর শেষ দেখেই ছাড়ব" ওরা কি ভাবল কে জানে ওরা শেষমেশ বসেই রইল। রাত তিনটে নাগাদ সবকিছু শান্ত হয়ে গেল। চারদিকে পিনপতন স্তব্ধতা গ্রাস করল আমাদের। আমরা বসেই রইলাম অভিশপ্ত বাংলোয়। ধৈর্যের প্রহর যেন শেষই হয় না। তবু আমরা বসে রইলাম জানি আরও কিছু ঘটতে চলেছে। আধঘণ্টা পর হঠাত ঘরের দেওয়ালে ফুটে উঠল এক পুরুষের বিশাল কালো ছায়া। ছায়াটা দেখামাত্রই নিক আর জনসন আমায় খামচে চেপে ধরে কাঁপতে লাগল। ছায়াটা কয়েক সেকেন্ড মাত্র স্থায়ী রইল তারপর যেমন করে হঠাত উদয় হয়েছিল ওরম করেই হঠাত বিলীন হয়ে গেল কোথায়। কেটে গেল আরও কিছুটা সময়। এবার হঠাত আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠল ঘন কালো অন্ধকারের একটা বিরাট অমানুষিক মূর্তি। মূর্তিটা এতই লম্বা মনে হল সাধারণ মানুষের চেয়ে ফুটখানেক লম্বা তো হবেই। আমরা ভয়ার্ত বিস্ফারিত চোখে ওকে দেখছিলাম। যেন কালো কম্বলে ঢাকা একটা অমানুষিক মূর্তি। স্থির হয়ে যেন আমাদেরকেই লক্ষ্য করছে। কাঁপা কাঁপা হাতে ওর ওপর টর্চের আলো ফেললাম, চমকে উঠলাম। কি অসম্ভব পান্ডুর ওর মুখটা যেন বাসি মড়া একটা। কিন্তু চোখদুটো বন্য জিঘাংসায় ভরা। ওহ গড, এই মূর্তিই কি সেই ঘৃন্য খুনী জ্যাকের অভিশপ্ত আত্মা! নিক আর জনসন তো গোঁ গোঁ করতে করতে আমার চোখের সামনে অজ্ঞান হয়ে গেল। আমি তবু শক্ত হয়ে বসে রইলাম। মনকে বোঝালাম এই সময় ভয় পেলে মৃত্যু অবধারিত। প্রেতাত্মারা বায়বীয় হয়, মানুষের ক্ষতি করার কোনও ক্ষমতা এদের থাকে না কিন্তু মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে হার্টফেল করিয়ে এরা মেরে ফেলার ক্ষমতা রাখে। ঠিক করলাম চোখ দুটো বুজে বসে থাকি কারন বেশীক্ষণ এর দিকে তাকিয়ে থাকলে যে কোনো সময় হার্টফেল করতে পারে আমার। তাই চোখদুটো মুদেই বসে থাকলাম। কাটতে লাগল সেকেন্ডের পর সেকেন্ড....মিনিটের পর মিনিট.....প্রতি মূহর্তে ভয় হচ্ছিল এই বুঝি বরফশীতল দুটো হাত সজোরে চেপে ধরল কণ্ঠনালীটা!...... মাঝে মাঝে চোখ পিটপিট করে মূর্তিটার গতিবিধি দেখছিলাম। হ্যাঁ, মূর্তি এখনো সেইভাবেই দাঁড়িয়ে আছে......আবার চোখদুটো মুদে ফেললাম। কতক্ষণ ছিলাম জানি না একসময় ভোর হয়ে এল। পাখিদের কিচিরমিচির অভিশপ্ত রাত্রির অবসান ঘোষনা করল। কি যে মধুর অনুভূতি হচ্ছিল বলে বোঝাতে পারব না। আমি বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। জেগে উঠে দেখলাম আমার হাতের টর্চ একভাবে জ্বলছে। সঙ্গীদুজনেরও চেতনা ফিরেছে। তারাও উঠে বসেছে। যখন অভিশপ্ত স্পেনসার কোর্ট ছেড়ে বেরিয়ে আসছি তখন আমাদের চেহারা দেখলে যে কেউ বলবে আমরা বিগত কয়েকদিন ঘুমোইনি। একেবারে বিধ্বস্ত চেহারা যাকে বলে। রিপোর্ট এখানেই শেষ। রিপোর্ট টি লিখেছিলেন প্যারানরমাল এক্টিভিটি এন্ড রিসার্চের ডিরেক্টর মিঃ জন হার্কার। পৃথিবীর অন্যতম হন্টেড হাউস হিসেবে স্পেনসার কোর্ট এখন রীতিমতো দর্শনীয় স্থান। ( শেষ)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ অভিশপ্ত স্পেনসার কোর্ট

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now