বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
নারী সমিতির তিনজন সদস্যা, দক্ষিণ কলকাতার একটা বাড়িতে বসে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিল। তিনজনেরই বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই, তাদের কথাবার্তা আশে পাশের কারো শোনার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবুও তারা নিম্ন কন্ঠে কথা বলছিল। আর থেকে থেকে জানালার বাইরে আলোছায়ার দিকে নজর রাখছিল।
বাড়িটা নমিতা চাকলাদারের। সেই বাড়ির একতলার ঘরে নমিতা তার দুই সমবয়সী বান্ধবীর সাথে গুরুগম্ভীর কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলছিল। তাদের বন্ধুত্ত অনেকদিনের নয়। তারা তিনজনই বিভিন্ন নারী সমিতি শাখার সদস্যা। মাত্র বৎসরাধিক কাল আগে অল ইন্ডিয়া ওমেন কনফারেন্সের এক আলোচনা সভায় তাদের পরিচয় ঘটেছে।
সর্বপ্রথম নিস্তব্ধতা ভাংল তনিমা চৌধুরী। কিছুটা গলা চড়িয়ে তনিমা বললো, "তোমার এই মতবাদ আমি মানি না নমিতা। একে আমি কুসংস্কার বলব, মানুষের মৃত্যুর পরে আত্মার অস্তিত্ব থাকে বলে আমি বিশ্বাস করিনা। আর যদি থাকেও তাহলে ঐ আত্মা মানুষের অপকার বা উপকার কিছুই করতে পারেনা।" কিছুটা উষ্মার স্বরে জাগরী জোয়ারদার প্রতিবাদ জানিয়ে বললো, "এটা তোমার ব্যক্তিগত অভিমত হতে পারে তনিমা, কিন্তু জেনে রেখো এই পৃথিবীর বহু গন্যমান্য ব্যক্তি প্রেতলোকে বিশ্বাসী। এই ব্যাপারে বিভিন্ন জায়গায় উচ্চস্তরের গবেষণাও চলছে।"
বাড়ির মালিক নমিতা এবার মুখ খোলে। গম্ভীর গলায় বলে,"ব্যাপারটাকে অত সহজ করে দেখোনা তনিমা, এই ফ্ল্যাটে প্ল্যানচেটের আসরে আমি নিজেই ভূত নামিয়েছি। অবশ্য ভূত মানে মৃতের আত্মা।" খুক করে হেসে তনিমা জবাব দেয়," প্ল্যানচেট কথার আসল অর্থ কি জান? প্ল্যানচেট কথাটার অর্থ হচ্ছে - প্ল্যানড চিট। মানেটা বুঝতে পারছো তো?"
এবার জাগরী রুখে দাড়ায়। সে বলে,"তুমি এসব কি বলছ তনিমা? প্ল্যানচেট করে যারা আত্মা নামান তারা শুধু প্রেতত্ত্বেই বিশ্বাসী নন, মানুষের মৃত্যুর পর আত্মার অস্তিত্ব, আত্মার রুপান্তর নিয়েও তারা অনেক রিসার্চ ওয়ার্ক করছেন।" নমিতা জাগরীর কথার সাথে যোগ করে, "দেখ তনিমা, লোকের মতামত ভিন্ন হতেই পারে। তাই বলে যে কোনো শাস্ত্র বা মতামত ভালো করে না জেনে সমালোচনা করা অনুচিত।"
নমিতা চাকলাদারের কাজের লোক মালতী এসে সকলের জন্য চা, বিস্কুট রেখে চলে গেল। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে নমিতা পুনরায় বলতে শুরু করে," প্ল্যানচেটে বসতে হলে চিন্তার আবর্জনা ঝেড়ে ফেলে শান্তমনে বসতে হয়। যেকেউ মিডিয়াম হতে পারেনা। যাদের মন কোমল আর প্রেতত্ত্বে বিশ্বাসী, সেরকম একজনকে মিডিয়াম করতে হয়।" কথার মাঝে বাধা দিয়ে তনিমা বলে ওঠে," এসব আমার জানা আছে। প্ল্যানচেট কখনো না করলেও আমি জানি যে - যার আত্মাকে আনতে হবে তার ছবি দেখে বা তার মুখ মনে করে তার কথা একাগ্রভাবে চিন্তা করতে হবে, একটা তেপায়া চক্র সবাইকে ছুয়ে থাকতে হবে, আত্মা মিডিয়ামকে ভর করলে মিডিয়ামের মধ্যে তার লক্ষন প্রকাশ পাবে।"
কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ থাকার পর তনিমা আবারো মন্তব্য করে," আসল কথা হচ্ছে তোমরা আগে থেকেই এসব হাস্যকর বিষয়ে বিশ্বাস করে বসে আছ। তাই মিডিয়াম একটু নড়লেই তোমরা ধরে নাও যে মিডিয়ামের মধ্যে আত্মা ভর করেছে। এটা এক ধরণের উৎকট মানসিক ব্যাধি মনোবিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন হ্যালুসিনেশন।"
জাগরী তনিমার কথায় ক্ষেপে গিয়ে বলতে থাকে, " কি বললে .....মানসিক ব্যাধি? তোমার কি জানা আছে এই প্ল্যানচেটের কত বিবর্তন ঘটেছে? আমি বেশ কিছুদিন ইজেপ্টে ছিলাম। সেখানকার ফ্যারাওরা বিশ্বাস করতেন, এই জীবনের পরে আরেক জীবন শুরু হয়। ফ্যারাওরা মারা গেলে গুপ্ত গুহার ভেতরে পিরামিডের মাঝখানে তাদের কবর দেয়া হত। তাদের সংে রাণী, দাসদাসী, পুরোহিত সবাইকে জীবন্ত সমাহিত করা হত। কারন, তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী ফ্যারাওরা আবার নবজন্ম লাভ করে রাণীসহ সবাইকে নিয়ে জীবন যাপন করবেন। সবার সব বিশ্বাসই তোমার কাছে মিথ্যা তাইনা, তনিমা? কিছুক্ষণ আগে তুমি বললে প্ল্যানচেট মানে প্ল্যানড চিট। কথাটা আমার মনে খুবই আঘাত করেছে।"
সংকুচিত কন্ঠে তনিমা উত্তর দেয়, "জাগরী, তনিমা তোমরা আমায় ভুল বুঝ না। আমি আসলে মুখের কথায় কোনো কিছুই বিশ্বাস করিনা, হাতে -কলমে প্রমাণ পেলে আমি অবশ্যই বিশ্বাস করবো।" জাগরী উত্তরে বললো, "ঠিক আছে আমি প্রমাণ করে দেবো মৃত্যুর পরে আত্মার অস্তিত্ব আছে কিনা, আর সেই আত্মা কতটা ভয়ংকর হতে পারে। তনিমা তুমি তোমার আড়াই বছরের ছেলেটাকে নিয়ে আসবে। আমি আমার থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত তিন বছরের বোনপোকে আনব। প্ল্যানচেট করে আত্মা এনে তার সাহায্যে দুজনের দেহের রক্ত ও মজ্জা বদলে দিয়ে প্রমাণ করে দেবো, আত্মার অস্তিত্ব আছে। তুমি আবার ভয় পেয়ে পিছিয়ে যেওনা।"
জাগরীর শেষের কথাটায় খোঁচা অনুভব করে তনিমা জেদের সুরে বলে," ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়ার স্বভাব আমার নেই। তাছাড়া, আমার এসবে বিশ্বাস নেই। তোমরা দিনক্ষণ ঠিক করে আমাকে জানাবে, আমি আমার ছেলেকে সুস্থ শরীরে এনে সুস্থভাবেই ফিরিয়ে নিয়ে যাবো। তোমার চ্যালেঞ্জ আমি গ্রহণ করলাম। তুমি আত্মা ডেকে কিছুই প্রমাণ করতে পারবেনা।"
নমিতা এর আগে কখনও এরকম বিপদে পড়েনি।অজানা আশংকায় তার বুক দুরুদুরু কাঁপছে, উৎকন্ঠায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তবুও ক্যালেন্ডার দেখে বললো, " আগামী শনিবার অমাবস্যা আছে। সেইদিন ঠিক রাত আটটার সময় প্ল্যানচেটের আসর বসবে।"
শনিবার তনিমা আর জাগরী দুটো বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে হাজির হল। পাশাপাশি দুটো বিছানায় বাচ্চা দুটোকে শুইয়ে দেয়া হল। তারা উঠে বসতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই জাগরী সম্মোহিত করে ছেলেদুটোকে ঘুম পাড়িয়ে দিলো। এবার জাগরী প্ল্যানচেটের আসরে বসে পড়ে। তার ডানদিকে তনিমা আর মাঝখানে নমিতা। নমিতা মিডিয়াম। তার সামনে একজনের ছবি। তার সামনে বৃত্তাকার তেপায়া টেবিল। আর তার ডানপাশে ফুলস্কেপ কাগজ আর লম্বা পেন্সিল। নমিতার অনুরোধে সবাই তেপায়া টেবিলে হাত দিয়ে থাকে। ধূপের আর সেন্টের মিষ্টি গন্ধ ঘরের বাতাস ভারী করে তুলেছে।
গমগমে গলায় নমিতা বলতে থাকে, " সামনের ছবিটা তোমরা ভালো করে দেখো। ছবিটা নারীমুক্তি আন্দোলনের পথিকৃৎ পুষ্পিকা চৌধুরীর।তোমারা একমনে ওনার মুখটা স্মরণ কর। তিনি কিছুদিন আগেই দেহ ত্যাগ করেছেন। আজকে আমরা তার আত্মাকে নিয়ে আসবো। তিনি আমার ওপর ভর করলে, প্ল্যানচেট করে যে আত্মা আনানো যায় সেটা প্রমাণ হয়ে যাবে। আর কেউ কোনো কথা বলবে না।" ঘরের মধ্যে পিনড্রপ সাইলেন্স নামলো।
ছেলেদুটোর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে, তারা গভীরভাবে ঘুমিয়ে পড়েছে। আর তারা তিনজন পুষ্পিতার কথা চিন্তা করছে। হঠাৎ টেবিলটা নড়ে উঠলো। তনিমা মনেমনে ভাবলো, নিশ্চয়ই জাগরী বা নমিতা কোনো চালাকি করছে। তাই সে টেবিলটা জোর করে ধরে রাখতে চাইল কিন্তু পারলো না। নমিতা বলে উঠলো, "পুষ্পিতাদি আপনি কি এসেছেন? আমরা আপনাকে স্মরণ করছি। আপনি দয়া করে কোনো সংকেত দিন।"
কিন্তু নমিতার কথা শেষ হতেই অদ্ভুত শব্দ হতে লাগল। হঠাৎ করে ঝড়ো হাওয়া এসে সব লন্ডভন্ড করে দিতে লাগল। নমিতা আতংকিত হয়ে বললো, " সর্বনাশ হয়ে গেছে। পুষ্পিতার জায়গায় কোনো মারাত্মক অশুভ আত্মা এসে গেছে।" বজ্রকঠিন কন্ঠে জাগরী বললো, "এই আত্মা আমার আহবানে এসেছে। এইবার আমি প্রমাণ দেবো যে আত্মার অস্তিত্ব আছে, আর আত্মা যা খুশি করতে পারে।"
হঠাৎ নমিতার দেহ কাঁপতে থাকে। জাগরী প্রশ্ন করে,"পিশাচসিদ্ধ শর্মিষ্ঠা ডাইসন আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি। আপনি তো জানেন আমি কেন এই বাচ্চাদের এখানে এনেছি, দয়া করে সেটা প্রমাণ করার ব্যবস্থা করুন।" একটা অজানা আশংকায় তনিমার সারা দেহ ভয়ে শিউরে ওঠে। কিছুক্ষণ পরে তনিমার ছেলে মৈনাক ককিয়ে কেঁদে উঠলো আর জাগরীর বোনপো সুমিতের গলা থেকে ঘরর.....ঘরর আওয়াজ ভেসে আসতে লাগল। নমিতার গলা থেকে খুবই করুন শব্দ হচ্ছে।
ছেলের কান্না, নমিতার গলার শব্দ আর চারদিকের ঝড়ো হাওয়া দেখে তনিমা ভাবলো,"এসব কি হচ্ছে? এরকম অবস্থায় আর কিছুক্ষণ থাকলে আমি পাগল হয়ে যাবো। এক্ষুনি মৈনাককে নিয়ে চলে যেতে হবে।" মৈনাকের কান্না করুন থেকে অসুস্থ রোগীর মত হয়ে গেল। ক্ষীণ কন্ঠে বললো, "মা আমার কষ্ট হচ্ছে। বাড়ি নিয়ে চল।" আর সুমিত নীরোগ সুস্থ কন্ঠে বললো, "মাসি আমাকে চকোলেট দাও, আমি খাবো।"
জাগরী ঘরের আলো জ্বালিয়ে দিয়ে বলে," সুমিতের থ্যালাসেমিয়া সেরে গেছে। তার রক্ত, হাড়, মজ্জা সমস্ত কিছু বদলে গেছে। আমি আত্মার অস্তিত্বের চরম প্রমাণ দিয়েছি, তনিমার দেয়া চ্যালেঞ্জের আমিই বিজেতা " অন্যদিকে তনিমার ছেলের শরীরে থ্যালাসেমিয়ার সমস্ত লক্ষন ফুটে উঠেছে। তনিমা ছেলের অবস্থা দেখে কান্নায় ভেংে পড়লো। নমিতা সবকিছু দেখে অস্থির ভাবে বলে উঠলো, "না, না এসব আমি চাইনি। কেন তুমি একটা বাচ্চার সাথে এমনটা করলে?"
জাগরী কোনো উত্তর না দিয়ে অট্টহাসির রোল তুলে বোনপোকে নিয়ে চলে গেল। অন্যদিকে, তনিমার আহাজারি আর মৈনাকের কান্নায় চারপাশ ভারী হতে লাগল।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now