বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
--------------------
আজকে প্রায় ২ যুগ পরে আমার ডিভোর্সি বউয়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। অবাক লাগছে তাইনা? ডিভোর্সি বউয়ের সাথে আবার কেউ দেখা করতে যায় নাকি?
মাথায় বেশ কিছু চুলে পাক ধরেছে আমার। দাড়ি-গোফও একটু বড় করেই রাখি। এত বছর পর মৌমিতা আমায় দেখে চিনতে পারবে কিনা আমি জানিনা। আগে দাড়ি-গোফ ছিলনা, পাকা চুল ছিলনা আর এখন যে পাওয়ার গ্লাসটা পড়ি এটাও তো পড়তাম না।
মৌমিতাও হয়তো অনেক বদলে গেছে! আমিও হয়তো ওকে চিনব না। বিকেলে সেই উদ্যানে ওর আসার কথা যেখানে ওর সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল।
বসে আছি অনেক বছর পর, সেই হাজার বছরের পরিচিত জায়গাতে। নিজেকে বড্ড বেমানান লাগছে । ইচ্ছা-অনিচ্ছায় করা ভুল গুলো হঠাৎ-ই জলছাপের মত ভেসে উঠছে । প্রতিটা পলকে পলকে যেন পিছনের ভুল আর ছেলেমানুষীর জন্য বদলে যাওয়া জীবনটা আমায় ধিক্কার দিচ্ছে।
আমি পড়াশোনা শেষ না করেই ছোট্ট একটা সরকারি চাকরী শুরু করেছিলাম। আমার চাকরীর দ্বিতীয় বছর আমার সাথে পরিচয় মায়া'র সাথে।
সামনা-সামনি নয় অনলাইনে পরিচয় হয় আমাদের। প্রথেমে বন্ধুত্ব তারপর আমার জীবনের প্রথম প্রেমের সূচনা।কিন্তু আমি ছিলাম ওর জীবনে দ্বিতীয় একজন।ওর প্রথম প্রেমের ব্রেক-আপের সময়ই ওর সাথে আমার পরিচয়। প্রচুর মেন্টালি সাপোর্ট দিতাম ওকে আমি।মূলত ওর হতাশা দূরতে গিয়েই প্রেমে পড়ি আমি। তখন ওর সবে এইচ.এস.সি পরীক্ষা শেষ হয়েছিল, কাজেই প্রচুর অবসর ছিল কিন্তু আমি ছিলাম ব্যস্ত। তবু কখনও বুঝতে দিতাম না। রাত তিনটা-চারটা পর্যন্ত চ্যাট করতাম। অফিসের ডেস্কে মোবাইল লুকিয়ে লুকিয়ে চ্যাট করতাম। এক কথায় আমার ২৪ ঘন্টা ছিল ওর নামেই। প্রপোজ করার এক বছর পর রাজী হয় মায়া। ভালই চলছিল আমাদের কিন্তু বিপত্তি শুরু হতে থাকে যখন ভার্সিটিতে ভর্তি হয়। তখন আর ওর একাকিত্ব ছিলনা তাই আমার প্রয়োজনটাও শেষ হয়ে যায় ওর কাছে। ফ্রেন্ডস-ফ্যামিলি নিয়ে সর্বদা ব্যস্ত। আমার সব কথায় ভীষণ রিঅ্যাক্ট করত। এক সময় বলেই দিল, আমার সাথে ওর সম্পর্ক রাখা পসিবল না।ওর ফ্যামিলি মেনে নিবেনা এই সম্পর্ক। তারপরও ওর হাতে -পায়ে ধরে আরও এক বছর যোগাযোগটা রেখেছিলাম। কিন্তু যতই সময় যাচ্ছিল ততই দূরে সরে যাচ্ছিল মায়া। যোগাযোগটা বন্ধ হয়ে যায় আমাদের। অনেক কষ্টে একদিন ওর 'মা' কে ফোন করি। কিন্তু নিয়তির নির্মমতায় একটু পরই মোবাইলটা মায়া নিয়ে নেয়। যা ইচ্ছা বলেছিল সেদিন। আমি চুপ করে শুধু শুনেছিলাম। আর কোনদিন ফোন করিনি ওকে। কিন্তু ভূলে যেতে পারিনি। ওর ফেইসবুক প্রোফাইলটা দেখতাম নিয়মিত। একাই কথা বলতাম সারাদিন ওর সাথে। প্রচুর স্মোক করতাম।
অমানুষ হতে থাকলাম আমি। একটা মেয়েকে পটানোর মত সব গুণই ছিল আমার। ভাল গান গাইতাম, গিটার বাজাতাম,ড্যান্স করতাম, কবিতা, গল্প লিখে বন্ধু মহল সহ বেশ কিছু অনলাইন গ্রুপে ভালই পরিচিত মুখ ছিলাম আমি।
মায়া'র আগে বা পরে আমি কাউকে প্রপোজ করিনি। কিন্তু মায়া'র চলে যাওয়ার পর আমি অনেক প্রপোজ পেয়েছি। তাদের মাঝে পাঁচ-ছয়জনের সাথে সময় কাটিয়েছি। কথিত প্রেম করেছি। কিন্তু তাদের প্রতি আমার এক সেকেন্ডের জন্যও কোনদিন প্রেম জাগেনি বরং তারা যখন কোন আবেগী ভালবাসার কথা বলত আমি মায়া কে ভাবতাম। সত্যিই বলতে এত মেয়েদের সাথে সময় কাটিয়েও আমি কোনদিন তাদের কাউকে ভালবাসিনি। সারাদিন ঘোরাঘুরি করে রাতের বেলা মায়া কে ভেবেই সিগারেটের ধোঁয়া উড়াতাম। শুধু তুলনা করতাম আমি। আমার হাজার কল্পনার শেষ দৃশ্যটা এমন হত যে, মায়া আমার কাছে ফিরে এসেছে। কিন্তু মায়া কোনদিনও ফিরে আসেনি।
-এই যে শুনছেন?
- হুম, আমাকে বলছেন?
- কেমন আছেন?
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। এত বছর পর যে মানুষটাকে দেখছি এই মানুষটা কি সেই মানুষটা। কন্ঠস্বর, চোখের চাহনি, গালের টোল সব কিছু সেই আগের মতই। শুধু বয়সটা ধরা পড়েছে মোটা ফ্রেমের চশমাটাতে আর গায়ে জড়ানো শালটাতে।
-মৌমিতা!
-কেমন অাছ?
-হুম ভাল আছি। দেখলেন আপনি আমাকে চিনতে পারেননি কিন্তু আমি ঠিকই চিনেছি।
-হুম, কত বদলে গেছ তুমি। কি করছ আজকাল? হঠাৎ এতদিন পর কেনই বা এখানে আসতে বললে?
- আমি একটা কলজের অধ্যাপিকা। আসলে আমার মেয়ের বিয়ে। তার জন্য আপনাকে কার্ড দিতে এসেছি। একমাত্র মেয়ের বিয়েতে তার বাবা যদি না থাকে তাহলে কি হয়? কপাল পোঁড়া মেয়েটা আমার বাবা থাকতেও তাকে মৃত জেনে এসেছে, কোনদিন আদরতো দূরের কথা বাবা বলে ডাকতেই পারেনি।
চশমার নীচে জলগুলো আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। কার্ডটা আমার হাতে দিয়ে দ্রুত চলে গেল মৌমিতা। আমি কোনো শব্দও করিনি। শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম আমার ডিভোর্সি বউয়ের চলে যাওয়া।
গভীর রাত, বিয়ের কার্ডটা বের করে পড়তেছি।
ছেলেটা ডাক্তার। দেখে ভাল লাগল। কিন্তু চোখ বন্ধ হয়ে গেল মেয়ের নাম দেখে।
মেয়ের নাম আয়াত অন্তনীল
বাবার নাম এস এম অন্তনীল।
ভূমিকম্পের আঘাতে লন্ড-ভন্ড হয়ে যাচ্ছে আমার ভিতরটা। তাহলে কি মৌমিতা আর বিয়ে করেনি। আয়াত আমার মেয়ে। কিন্তু আমিতো মৌমিতার প্রেগনেন্সির কথা জানতাম না।
মৌমিতা আমার কততম প্রেম ছিল মনে নেই। ওর সাথে পরিচয় ছিল দুই বছরের। আমার আর মায়া'র সম্পর্কে সব বলেছিলাম।
বলতে গেলে আমি যাদের সাথে প্রেম করেছি সবাইকে আমি আমার আর মায়া'র গল্পটা বলতাম।
মৌমিতার সাথে সম্পর্কের এক মাসের মাথায় হুট করেই আমি গোপনে ওকে বিয়ে করে ফেলি। ভেবেও নিয়েছিলাম মায়াকে ভূলে নতুন করে শুরু করব মৌমিতাকে নিয়ে। বউয়ের ভালবাসার কেমন অদ্ভুত স্বর্গীয় অনুভুতি তিলে তিলে বুঝতেছিলাম আমি।
বিয়ের একমাস, আমাদের ক্লোজ কয়েকজন বন্ধু ছাড়া কেউ জানত না এই বিয়ের কথা। ভেবেছিলাম বাসায় জানিয়ে দেব। নতুন করে শুরু করব। কারণ, ইতিমধ্যে জবের পাশাপাশি আমি একটা রেস্টুরেন্টর ব্যবসা শুরু করেছিলাম আর তার প্রফিট অনেক ভাল ছিল। বন্ধুদের সাথে শেয়ারে ট্রান্সপোর্ট ব্যবসাতেও ইনভেস্ট করেছিলাম। মানে আমি বিয়ের জন্য প্রস্তুত।
অনেকদিন পর মায়া'র এক বান্ধবীর সাথে দেখা হয় আমার রেস্টুরেন্ট। একদম অবাক আমাকে দেখে। আর রেস্টুরেন্টটা আমার জেনে একটু বেশীই অবাক। তবে আমার নতুন জীবন চলার পিছনে এই মেয়েটার দেয়া বাধাঁটাই ছিল সব থেকে বেশী।
কথায় কথায় জিজ্ঞেস করি মায়া কেমন আছে?
কথাটা শুনার পর মেয়েটা যেন আকাশ থেকে পড়ে।
-ভাইয়া, আপনি জানেন না কিছুই?
- কি জানব বলুন, কথা হয়না ওর সাথে কয়েক বছর হয়ে গেছে।
- ভাইয়া, রিয়া আপনাকে কিছু বলেনি?
- নাতো, কেন?
- ভাইয়া, মায়া প্রায় ছয়মাস আগে একটা রোড এক্সিডেন্ট করে। হাসপাতালে নেওয়ার চার ঘন্টা পর মারা যায়। আর মারা যাওয়ার আগে আপনাকে উদ্দেশ্য করে একটা চিরকুট লিখে দিয়ে যায়।
আকাশ ভেঙে পড়ে আমার মাথায়। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই রিয়ার ঠিকানা নিয়ে চলে যায় ওর কাছে। কোন কথা জানতে না চেয়ে শুধু চিরকুটটা নিয়ে বাসায় আসি। জানিনা, কি লিখে গেছে 'মায়া'।
কয়েক প্যাকেট সিগারেট শেষ। চিরকুট খোলার সাহস হচ্ছে না। তবু ভয়ে ভয়ে খোলে ফেললাম-
রাতের নিস্তব্ধতা যেন নিস্তব্ধ করে দিল আমাকে।
" ভূল বুঝনা আমায় কলিজা। পৃথিবীতে আমি শুধু তোমাকেই ভালবেসেছি অন্তনীল। তোমাকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার কারণ হয়তো ছিল কিন্তু তোমায় ভাল না বাসার কারণ ছিলনা কোনদিনও।
খুব ভালবাসি অন্তনীল, খুব ভালবাসি,,,
পারলে মাফ করে দিও"
সব কিছু উলট-পালট হয়ে গেল আমার। পুরনো প্রেম নতুন করে যন্ত্রণা দিচ্ছে আমায়। মায়া'র সাথে ব্রেক-আপের পর কত প্রেম করেছি কতজনকে ধোঁকা দিয়েছি মনে নেই। কোনদিনও কষ্ট লাগেনি। কিন্তু আজ নিতে পারছিনা আমি। কি করব বুঝতে পারছিলাম না।
ফোন করি মৌমিতাকে। সব কথা খোলে বলি-
মৌমিতা জিজ্ঞেস করে, আমি কি চায়?
আমি মুখের উপর বলে দিয়েছিলাম, মুক্তি চায় তোমার কাছ থেকে, আমাকে মুক্তি দাও।
আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দাও। তোমার আমার ব্যাপার আর কেউ জানবেনা কোনদিনও।
ফোন নাম্বার চেঞ্জ করে ফেলি। আমার সাথে যোগাযোগের সব পথ বন্ধ করে দিই। ব্যবসা -চাকরী সব বাদ দিয়ে পরিবারের অমতেই দু-মাসের মধ্যে দেশের বাইরে চলে যায়। এর মাঝে আমি মৌমিতা তো দূরের কথা আমার পরিবার,বন্ধু-বান্ধব কারও সাথে যোগাযোগ করিনি। এই ২২ বছরে প্রায় ভূলেই গেছে আমায় সবাই।
কিন্তু মনে রেখেছিল মৌমিতা। আমার চলে যাওয়ার সময় ও প্রেগন্যান্ট ছিল সেই খবরটাও আমাকে দেওয়ার পথ পায়নি মৌমিতা। কিন্তু আমার সন্তানকে ঠিকই জন্ম দিয়েছে, আমার পছন্দের নামটা রেখেছে, মানুষ করেছে। মাঝখান থেকে আমি কেড়ে নিয়েছি মৌমিতার জীবনের ২২ টি বছর। যার প্রতিটা রাতের হিসাব আমাকে দিতে হবে। স্বামী হয়েছি, বাবা হয়েছি কিন্তু দায়িত্ব পালন করতে পারিনি আমি। আমি ছাড়া আমার মেয়েকে নিয়ে না জানি কত কষ্ট করেছে মৌমিতা।
নেশা চোখে ঘুম ভাঙে সকালে। আজ আমার মেয়ের বিয়ে। আমিও যাব, আমার এক মাত্র মেয়ের বিয়ে! আমি না গেলে কি হবে?
আমিতো যাবই, কিন্তু ঠিক যেভাবে মৃত মানুষ গুলো আমাদের দেখে সেই ভাবেই যাব।
আমি জানি আমার ভূল ক্ষমার যোগ্য নয়।
জানিনা কার অভিশাপ আমাকে এত বড় শাস্তি দিচ্ছে, বিয়ে বাড়ির জ্বলমলে মরিচা বাতি জানিনা আজ এ কোন রক্তাক্ত ইতিহাসের সাক্ষী হচ্ছে।
বড্ড ইচ্ছে হচ্ছে মেয়েটাকে একবার জড়িয়ে ধরে কপালে একটা চুমো দিতে-
ইচ্ছে করছে ২২ টা বছর সংসার জীবন থেকে বঞ্চিত করা আমার বউটার কাছে ক্ষমা চাইতে। কিন্তু কীভাবে সম্ভব আমার পাপ যে বড্ড বেশী।
চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আমার, হাত থেকে চিরমুক্তির বোতলটা পড়ে গেল আমার। ঘুম, খুব ঘুম পাচ্ছে-
চোখ খোললাম আমি, হাতপাতালের বেডে শোঁয়ে আছি।স্বপ্নের মত মনে হচ্ছে সব। আমার মেয়েটা আমার হাত ধরে আছে।
বউটার চোখ ছলছল করছে।
তবে কি আমায় ক্ষমা করে দিয়েছে!
২২ বছর পর কি আমার অভিশপ্ততার সমাপ্তি!!!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now