বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
অর্পিকে আদালতে হাজির করা হলো।
মুখটা কেমন হয়ে গেছে। আজ থেকে ১৫ দিন আগে মেয়েটা কি ছিল আর আজ কি হলো? মা বসে চোখের পানি ফেলছেন আর মেয়েটির দিকে চেয়ে আছেন। আদালতের কাজ শুরু হলো।
অর্পিকে একের পর এক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মেয়েটি যা সত্য তাই বলছে।
আদালতের সবাই তাকিয়ে আছেন অর্পির দিকে। বৃত্তের মা ও সেখানে আছেন।
এবার বিচারক সাহেব রায় দিবেন, সবাই তাকিয়ে আছেন! কি রায় আসবে?
বিচারক সাহেব, প্রথমে সুহানের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে, তারপর অমিকে গ্রেফতার করা হুকুম দিলেন। তারপর বললেন,
"আইনি সহায়তা না নিয়ে অর্পি বৃত্তকে খুন করেছে, এটা খুবই জগন্যতম অপরাধ। তাই আদালত ৩০২ দ্বারা মোতাবেক অর্পিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের হুকুম দিচ্ছে! "
অর্পি রায় শুনে হাহাহা করে হাসা শুরু করল। তারপর চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে উপরের দিকে চেয়ে বলল,সুহান আমিও আসছি, আর তোমাকে একা থাকতে হবে না । একদিন বলেছিলাম, তোমাকে ছাড়া কখনও থাকতে পারবো না ! তোমার সেটা মনে আছে নিশ্চয়! তুমিই বল, আমি কি করে এখানে একা থাকবো?? তুমি জানো, এই কয়েকদিন তুমি ছিলেনা, আমি কত্ত কষ্টের মধ্যে ছিলাম তুমি ভাবতেও পারবেনা। আমরা কত স্বপ্ন দেখতাম মনে আছে? সেটা বাস্তব হতে দিলোনা, তোমার বন্ধু বৃত্ত। তোমাকে খুন করে দিল । সে চেয়েছিলো তোমাকে খুন করে আমাকে পেতে! পায়নি। আজ তোমার খুনিকে আমি নিজ হাতে খুন করেছি, প্রতিশোধ নিয়েছি। বিচারক সাহেব কি বলছেন শুনছো? হাহাহা আমি খুব খুশি! আমি নিজেই চাইছিলাম আত্মহত্যা করে তোমার কাছে চলে আসতে! আত্মহত্যার মত কঠিন কাজ আমার করতে হয়নি। বিচারক সাহেব সেটার দায়িত্ব নিয়ে নিলেন। কিছু দিনের মধ্যেই তোমার কাছে চলে আসছি। সেখানে এসেই না হয় আমাদের মনে আঁকা স্বপ্নগুলো পুরণ করবো! পুলিশরা অর্পিকে টেনে টেনে হাজতে নিয়ে যাচ্ছে । সে উপরের দিকে থাকিয়ে এসব কথা বলছে। বৃত্তের মা খুশিতে কান্না করছেন!
আজ তার ছেলের খুনির ফাঁসির রায় হয়েছে। অর্পির মা মেয়ের রায় শুনে জ্ঞান হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম! কোনো রকম ভাবে এখনও সজ্ঞানে আছেন। নির্লিপ্ত ভাবে মেয়েকে নিয়ে যাওয়াটা দেখছেন।
এইদিকে পুলিশ অমিকে ধরে এনে জেলে রাখল।
আজ শুক্রবার।
রাত ১২ টা ১ মিনিটের সময় অর্পির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে!
অর্পির মা আসলেন দেখা করতে।
সাথে তার বাবাও আসছেন। তিনি গতকাল বিদেশ থেকে দেশে এসেছেন। দুপুর ২ টার পর অর্পির সাথে সাক্ষাৎ করানো হলো।অর্পিকে দেখে মা ও বাবা দুজনেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
অর্পি তাদের কে শান্তনা দেয়। তারা কিছুটা শান্ত হয়। তারপর অর্পি মা-বাবাকে বলে,
তোমরা কোনো চিন্তা করোনা। একদিন তো মরতে হবেই। সবাইকে এই পৃথিবী ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমাতে হবে। এতে ব্যতীত হওয়ার কিছু নেই । আমার কপালে যা লিখা ছিল তাই হয়েছে । অর্পির মা-বাবা শুধুই চোখের পানি ছাড়ছে।
সময় শেষ এবার তাদেরকে চলে যেতে হবে।
অর্পিকে শেষবারই মা-বাবা জড়িয়ে ধরলেন।
হাউমাউ কান্নাকাটি করতে লাগলেন। একটা মেয়ে যে এখনও জীবনটা আসলে কি? সেটাই শিখতে পারেনি, তার আগেই তাকে দুনিয়া থেকে চলে যেতে হবে! মা-বাবা কিছুতেই মানতে পারছেনা সেটা। অর্পির চোখে দুফোটা জল দেখা গেল ।
মা-বাবা কে নিজের বাহু থেকে ছাড়িয়ে বলল, আমি একটা অনুরোধ করব, তোমরা রাখবা?
হুম বল...
মা তুমি তো জানই, সুহানের পরিবারে সে একাই উপার্জন করতো । এখন তো সে নাই তার বাবাও নাই । তার মা আর ছোট বোনটি বেঁচে থাকার জন্য খাবার কিভাবে পাবে?
আমি জানি মা, আমাকে হারিয়ে তোমরা অনেক কষ্টে থাকবে। তাই বলছি, মা, বাবা তোমরা ওদেরকে এখানে নিয়ে আসো। আর বাবুনি কে পেলে তোমরা আমার জন্য যে কষ্ট পাবে, আমি বিশ্বাস করি তার চেয়ে কিছুটা হলেও অবকাশ পাবে।
কারণ বাবুনিটা দেখতে একদম আমার মত মা! আমি ওর ছবি দেখেছি। প্লিজ বলনা তোমরা আমার কথাটি রাখবে কিনা?
আমার হাতে রেখে বল!
অর্পির মা বাবা দুজনেই তার হাতে হাত রেখে তার কথাটি মেনে নিলেন।
অর্পি খুশি হয়ে মা বাবাকে জড়িয়ে ধরে জীবনের শেষ আলিঙ্গন করে বিদায় দিল। অর্পির মা বাবা বারবার ফিরে ফিরে তাকাচ্ছেন। অর্পি চোখের জলে ভেসে ভেসে শেষবার মা বাবাকে দেখছে। দরজার পাশে দাড়িয়ে আবার অর্পির মা-বাবা পেছনে তাকালেন। এটাই বুঝি তাদের শেষ দেখা! আর কি এই চঞ্চল মেয়েটাকে পাওয়া যাবে? যে মাকে ছাড়া একদিন ও থাকতে পারে না । বাবা একদিন ফোন না দিলে সারাটা দিন কেঁদে কাটিয়ে দেয় । কে এতো যত্ন করে মাকে ওষুধ খাওয়াবে? কে এতো ভালো করে মায়ের পা টা টিপে দিবে? রাতে কে মায়ের কপালে একটা চুমু দিয়ে মাকে ঘুম পাড়িয়ে নিজে ঘুমাতে যাবে? কে বলবে, পাপ্পা কিছু খাইছো? কে বলবে পাপ্পা একটা পাপ্পি দাওনা? কে বলবে, পাপ্পা I miss you?
যে মেয়েটি আলো ছাড়া ঘুমাতে পারতো না! বলতো মা আমার অন্ধকার ভয় করে! সে আজ কবরে একা অন্ধকারে ঘুমাবে কি করে?
মা-বাবা দুজনেই এসব ভাবছেন, আর কাঁদছেন। অর্পি নির্বাক হয়ে মা-বাবাকে দেখছে। চোখে পানি নেই! চোখের পানি যে শুকিয়ে গেছে, নয়তো কতই কাঁদতো সে?
দরজা লাগিয়ে দিয়ে অর্পির মা-বাবাকে বাহিরে আনা হলো। অর্পি উপরের দিকে চেয়ে একটা জোরে নিঃশ্বাস নিল।
রাত ১১.৫০।
আর মাত্র ১০ মিনিট । তারপর অর্পিকে জেনে শুনে পরপারে যেতে হবে ।
ধীরে ধীরে ফাঁসির মঞ্চে নেয়া হচ্ছে অর্পিকে! ১১.৫৫ মিনিটা।
অর্পিকে ফাঁসির মঞ্চে তোলে! কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে রাখা হলো । গলায় রশি!
অর্পির চোখ বাঁধা কিন্তু তারপরও সে বুঝতে পারছে, সামনে সুহান দাঁড়িয়ে! অর্পিকে ডাঁকছে, চলে আসো বাবু, তাড়াতাড়ী আসো! তোমাকে ছাড়া যে আমি থাকতে পারছিনা!
১২.০১ মিনিট।
কাপড় ছেড়ে দেওয়াতে জল্লাদ রশিতে টান দিলেন, অর্পিকে ঝুলানো হলো।
৫ মিনিট পর অর্পির লাশকে নামিয়ে আনা হয়েছে। এম্বুলেন্সে করে পাঠিয়ে দেয়া হলো অর্পির বাসার ঠিকানায়! এখন আর মা-বাবার চোখে জল নেই। খোদার লীলাখেলা কেউ বোঝার ক্ষমতা নেই তারা এটা মেনে নিয়েছেন।
বেলা ২টার সময় অর্পির জানাজা শেষ হলো। অর্পিকে দাফন করে সবাই বাড়ীতে ফিরে এলেন।
অর্পির বাবার কিছু ভালো লাগছেনা, তিনি ছাঁদে গেলেন। ফুলের বাগানে কাছে গিয়ে চেয়ে আছেন। এই বাগান মেয়েটির অন্যতম পছন্দ ছিল। প্রতিদিন বাগানে আসা তার একটা কর্তব্য হয়ে দাড়িয়েছিল। আজ ফুল গাছগুলো কেমন মরা মরা হয়ে গেছে। কয়েকদিন তাদের রাণীকে পায়নি তো তাই!
অর্পির মা শুয়ে আছেন, ঘুম লাগছে না। অর্পির বাবা বললেন, ঘুমাও! না হলে শরীর খারাপ করবে?
কিভাবে ঘুমাবো? আজ আমার পায়ে খুব চিনচিন করছে, আমার অর্পি তো এসে টিপে দিলোনা! আজ আমার মাথাটা ঘুরোচ্ছে, অর্পি তো এসে আমার মাথাটা বুকের মধ্যে চেপে ধরল না!
আজ আমার কপালটা বড় খালি খালি লাগছে, অর্পি এসে চুমু দিয়ে"শুভ রাত্রি " বলল না! আমার কি ঘুম আসবে?
বলনা তুমি, আমার মেয়েটা আসেনা কেন?
অর্পির বাবা কি বলবেন? নিজের স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করলেন। নিজের ও তো মেয়ে, তার কি কম কষ্ট হচ্ছে?
দুজনই এভাবেই অর্পির বিভিন্ন স্মৃতি একজন আরেকজনকে বলে সারাটা রাত কাটিয়ে দিলেন ।
আজ অর্পি মারা যাওয়ার ১০ম দিন।
অর্পির মা-বাবা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে অর্পির স্মৃতি ভুলতে লাগলেন।
অর্পির কথা রাখতে আজ তারা দুজনই সুহানের বাড়ীতে যাচ্ছেন। সুহানের গ্রামের ঠিকানাটা সুহান আগে যে বাসায় থাকতো ঐ বাসা থেকে নিয়ে নিলেন।
২ঘন্টা গাড়ী ভ্রমনের পর তারা পৌঁছে গেলেন সুহানের গ্রামে।
গিয়ে প্রথমে দেখা করলেন সুহানের গ্রামের মাতবর সাহেবের সাথে। উনাকে নিয়েই গেলেন সুহানের বাড়ীতে। আরো একটা মর্মান্তিক খবর শুনলেন! সুহানের মা ও নাকি পাগল হয়ে গাড়ী এক্সিডেন্ট করে মারা গেছেন। গরীব চাচা বাবুনিকে দেখাশোনা করছেন। মর্মাহত হলেন অর্পির মা-বাবা।
তারা বাবুনিকে দেখার জন্য অনুরোধ করলেন মাতবরের কাছে। চাচা ভাতিজিকে আনতে গেলেন, ছোট মেয়েটি এখনও বিছানায় বসে বসে কাঁদে। কোলে করে নিয়ে আসলেন।
অর্পির মা বাবা দুজনই অবাক!
বাবুনি দেখতে সত্যিই তো অর্পির মত!
অর্পির মা বাবুনিকে জিজ্ঞাসা করলেন মা তোমার নাম কি?
বাবুনি : আমার তিনটা নাম।
অর্পির মা : তিনটা! কি কি?
বাবুনি : মা আদর করে ডাকতেন, মামনি, আব্বু ডাকতেন বুড়ি মা, আর ভাইয়া টা ডাকতো বাবুনি।
অর্পির মা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন বাবুনির দিকে, তিনি বাবুনিকে কোলে তুলে নিলেন।
তারপর বললেন, আজ থেকে আমি তোমাকে মামনি বলে ডাকবো, তাহলে কি তুমি খুশি হবে?
তুমি তো আমার মা না! তাহলে মামনি ডাকব কেন? আমার মা তো আমাকে মামনি বলে ডাকতেন ।।
কপালে চুমু দিলেন, আর বললেন, আজ থেকে আমি তোমার মা। আমি তোমাকে মামনি বলে ডাকবো কেমন?
অর্পির বাবা তখন বলে উঠলেন, আমিও তোমাকে বুড়িমা বলে ডাকবো!
বাবুনি এবার হেসে দিন, হাসিটাও একদম অর্পির মত!
অর্পির মা-বাবা সুহানের চাচা ও মাতবরের কাছে অনুরোধ করলেন বাবুনিকে যেন তাদের কাছে দিয়ে দেয়। সুহানের চাচা অভাবে সংসারে বাবুনিকে বোঝা মনে করলেন। তিনি বাবুনিকে দিয়ে দিলেন।
বাবুনি অর্পির মা -বাবার সাথে বসে আছে গাড়ীতে! দুজনের মাঝখানে বসা। কিছু বিস্কুট ছিল তাদের কাছে, সেগুলো বাবুনিকে দিলেন। বাবুনি খুশি হয়ে দুজনের কপালে দুইটা চুমু দিলো! একদম অর্পি মত চুমু! দুজনই জড়িয়ে ধরলেন বাবুনি কে। তারপর খুশি হয়ে অর্পির মা বললেন, মামনি তুমি কি খেতে পছন্দ কর?
লাফ দিয়ে বলে উঠল চকলেট! তারপর আবার মনমরা হয়ে বলল, জানো মা...
আমার ভাইয়াটা না খুব পঁচা! কতদিন থেকে আমাকে চকলেট দেয় না।
অর্পির বাবা বললেন, আজ থেকে আমি তোমাকে প্রতিদিন চকলেট দিবো! এবার খুশি ।
সত্যি দিবা।
হ্যা সত্যি সত্যি সত্যিই দিমু।
তুমি আমার ভালো পাপ্পা, উম্মাহ।
অর্পির মা-বাবা দুজনই হেসে উঠলেন। এই কয়েকদিনের মধ্যে এই প্রথম হাসলেন। বাবুনিই তাদের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনলো। এভাবেই হয়তো তারা বাবুনিকে নিয়েই সারাজীবন কাটিয়ে দেবে। ভালো থাকুন বাবুনি। ভালো থাকুক তার নতুন পরিবার।
(খোদা হাফিজ)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now