বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
অভিমানী সেই মেয়েটি
___ হৃদয় মাহমুদ।
:
:
:
__নাম কি?
__ অথৈ।
নাম শুনেই সবাই হাসতে লাগলো। মেয়েটি বিচলিত হয়ে পড়লো। এমনিতেই আসতে চাইছিলো না। মা-বাবা জোর করে শাড়ি পড়ালো। কোন মতে একটু সেজে নিলেও চোখের পানিতে মুছে গেলো। গা কাঁপছে , এত মানুষ আবার অচেনা, কোন মতেই এদের সামনে আসবে না। এক রকম ভয় লাগিয়ে চাচাতো বোন লিলিকে সঙ্গে দিয়ে পাঠালো। ঘোমটাটাকে লম্বা করে লিলির হাত চেপে নিচের দিকে চেয়ে আছে। লিলির ভাষ্যমতে "অথৈ যতক্ষণ সেখানে বসা ছিলো ততক্ষণই ওর সারা শরীর ভুমিকম্পনের মত কেঁপেছে "। তারপর শুরু চারিদিক থেকে প্রশ্নের ছোড়াছুঁড়ি। একজন জিজ্ঞেস করলো "অথৈ মানে কি জানেন ''? অন্যজন জবাব দিলো "অথৈ মানে যার ঠাঁয় নাই "। আরেক জন দাঁত কেলিয়ে বললো "এটা কোন নাম হলো নাকি "? আবার হাসতে শুরু করলো। মেয়েটি পাশে বসা লিলির হাত টিপে বোঝাতে লাগলো সে নার্ভাস। একে তো তার নাম নিয়ে মজা করছে, তার-উপরে সামনে বসা আছে পুরুষ মহিলা মিলে গোটা পনেরো জন মানুষ। এই প্রথম এত্তগুলো মানুষের সামনে বসে সওয়াল-জওয়াব দিচ্ছে। যেনো আগেই বাদ দেওয়া ভাইবা বোর্ডের নির্বাচক মন্ডলির অসামঞ্জস্য প্রশ্ন। তাই ভয়ে হাত-পা কাঁপছে, শুরুতেই দম বন্ধ হয়ে আসছে।
__ কিসে পড়?
__ উচ্চ মাধ্যমিকে প্রথম বর্ষ।
এবার বললো "কি বলছো? তোমাকে তো দেখে মনে হচ্ছে সেভেন/এইটে পড় "।
__ কোন গ্রুপ?
__ কমার্স।
একজন মুচকি হেসে জবাব দিলো "এই নামে তো কোন গ্রুপ নাই। নতুন হয়েছে বুঝি "?বলেই আবার হাসতে শুরু করলো। আরেক জন বললো "দেখো, এটাকে কমার্স বলে না, এটা হচ্ছে ব্যবসায় শিক্ষা শাখা "। শুরু থেকে ক্রমান্বয়ে এরা মজা করেই যাচ্ছে। অথৈ আরো বেশি ভেঙ্গে পড়েছে! লিলির কাছেও ব্যাপারগুলো খারাপ লাগছে। সে ভাবছে "এরা কি সত্যি যাচাই করছে নাকি মজা নেওয়ার জন্য আসছে "। আবার প্রশ্ন ;
__ কলেজের নাম?
__............. সরকারি কলেজ।
__ রান্না করতে জানো?
__ জানি।
একজন প্রশ্ন করে বসলো "বলতো কি কি জানো "। অথৈ চুপ করে আছে। এবার লিলি জবাব দিয়ে বসলো। তাদের অযৌক্তিক সব প্রশ্নে বারবারই লিলির মন চাইছিলো উচিত জবাব দিয়ে শিক্ষা দিয়ে দিতে। কিন্তু জেঠু আর এলাকার মুরব্বীদের কারনে তা সহ্য করে গেছে। বদনাম হয়ে যাবে ভেবে চুপ ছিলো। কিন্তু ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেলো। লিলি অথৈর হাত চেপে ধরে দাঁড়িয়ে গেলো "আপনারা কিসব বাজে প্রশ্ন করছেন বলুন তো? কি কি রান্না করতে জানে সবকিছুর রচনা বলবে নাকি। আপনাদের উচিত এক এক করে প্রশ্ন করবেন আর সে জবাব দিবে। সেই প্রথম থেকেই সব শুনে যাচ্ছি। হাসা ভালো কিন্তু সব পরিবেশে হাসি অভদ্রতা। একটি মেয়ের প্রশ্নের জবাবে হাসা মানে ওকে সরাসরি তিরস্কার করা। আপনাদের কোন কথায় কেউ যদি হাসে আপনাদের কাছে কেমন লাগবে বলুন "? আর কোন প্রশ্নের সুযোগ না'দিয়ে
লিলি কথাগুলো শুনিয়ে অথৈকে নিয়ে ভিতরে চলে গেলো। এদিকে পাত্র পক্ষরা রেগে গিয়ে আর কোন কথা ছাড়াই চলে গেলো।
.
অথৈ ভিতরে গিয়ে খুব কাঁদলো। মেয়েটিকে অপমান করা হয়েছে যার জন্য মা-বাবাকে বকলো "আমি বারবার বলেছি এখন বিয়ে করবোনা, পড়াশুনা করবো। তাছাড়া আমি কালো (প্রকৃতপক্ষে কালো ধরা যায়না পর্সা শ্যাম বর্ণ), খাটো (এতটা খাটোওনা উচ্চতা ঠিক ৫ফুট), গরীব (গরীব বলতে নিম্ন মধ্যবিত্ত)। তাই আমাকে কেউ পছন্দ করবে না জানি। তারপরও তোমরা আমাকে বাধ্য করলে "। মা-বাবা কথা দিলো আর এমন হবেনা পড়ালেখা করাবে।
.
কিছুদিন না' যেতেই আরেক পক্ষের আগমন। ঘটক অথৈর মা-বাবাকে লোভ দেখিয়ে বশ করে ফেললো।
কি আর করা সেই আগের মতই মা-বাবার জোর যবর দস্তিতে রাজি হয়ে গেলো। বাবা বললো "এটা আমাদের শেষ অনুরোধ মা। আর কখনো বলবো না। শেষ বারের মত কথাটা রাখো মা "। সেই লিলিকে সাথে নিয়ে ড্রইং রুমে উপস্থিত হলো! এরা দেখা মাত্রই চুপসে গেলো কোনো প্রশ্ন করলোনা। শুধু ফিসফিসানিতে বুঝা গেলো কালো। এদের থেকে কালো বর্ণের অপবাদ পেলো।ঘটকের মাধ্যমে সরাসরি কালো বলে পছন্দ হয়নি জানিয়ে দিলো। কোন সম্মানও করলো না। অথৈর মনটা খারাপ হয়ে গেলো। ভিতরে গিয়ে কাঁদলো। বাবা-মার সাথে রাগারাগি করলো। তারাও নিরুপায় কি আর করা। গরীবের মেয়ে কোনো মেয়েকে পাত্রস্থ করলেই বাঁচে।
.
পাত্র পক্ষ দেখে অপছন্দ করাটা যে কোন মেয়ের জন্য খুব অপমান জনক। এর উপরে যদি কোন প্রকার সম্মান না' করে খুব খারাপ লাগে। কারন সকলে জিজ্ঞেস করে কি দিলো, কেমন সম্মান করলো? তখন সবার সামনে জবাব থাকে না। এটা একটা গ্রাম্য প্রেস্টিজও বটে। আশপাশের লোকেরা পরে তিরস্কার করে কথা বলে। এটা প্রতিটা পরিবারের জন্যও দারুন অসম্মানের বিষয়। তাই অথৈ কষ্ট পেয়ে কেঁদেছে।
.
একবার একপক্ষ প্রত্যাখ্যান করেছে খাটো দেখে। দাঁড়াতে বলে মুখের উপরেই বলে দিলো মেয়ে খাটো হবে না। যদিও এমন কথা সরাসরি বলা ঠিক না। মেয়েটি সবার সামনে লজ্জা পেলো। সত্য হলেও সামনা সামনি কারো ব্যক্তিত্বের দূর্বলতা নিয়ে কথা বলা বা আলোচনা করা ঠিক না। কথা সত্য তারপরও এমন কথা গায়ে বাজে। প্রত্যেক বারই এমন অপমান হয় আর ভিতরে গিয়ে কাঁদে। আর কারো সামনেই যাবেনা, বাবার কথাও শুনবে না। কিন্তু বাবার কথা না' শুনে পারেনা। কেউ দেখতে আসলেই বাবার অনুরোধে সেই অপমান হওয়ার জন্য এসে যায় । তবে তখন আর সে ভয় পেতো না। সবার অপমান শুনতে শুনতে সাহস বেড়ে গেলো। আগের মত সাথে কারো দরকার হয়না, শরির কাঁপেনা, জবাব দিতে ভয় পায় না । তবে সারাক্ষণ ঘরের মধ্যে থাকে লজ্জায় বের হয় না। এত লজ্জা সহ্য করার মত নয়। বের হলেই সবাই জিজ্ঞেস করে কি বললো, কি দিলো? যার কোন জবাব নেই।
.
প্রতিবারই তার বাবা-মা আবেগী ব্ল্যাকমেইল করে পাত্র পক্ষের সামনে যেতে বাধ্য করতো। যদিও মেয়েটির ইচ্ছা নেই বারবার মানুষের কাছে হেয় হওয়া, তিরস্কৃত হওয়া, প্রত্যাখ্যান হওয়া। অথৈর মনোবলও ছোট হয়ে গেলো কারন প্রতিবারই পাত্রপক্ষের সামনে অপদস্থ হতে হচ্ছে। এক একবার অপমান হয়ে মরে যেতে মন চায়। বেশ কয়েকটা পরিবার তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে তাই আর কারো সামনে যেতে চায় না। মনে মনে বিয়েই করবেনা ভেবে নিলো। তার বাবাও প্রতিবার অপমান হয়ে মেয়েকে শান্তনা দেয় আর কখনো এমন হবে না। তারপরও তাদের মনের ভিতর মেয়েকে নিয়ে একটা দুশ্চিন্তা থেকে যায়। কারন সে একটা মেয়ে বড় হয়েছে। বিয়েতো দিতেই হবে। তাই তারা কাউকে না' করতে পারেনা।
.
একপক্ষ দাঁড়াতে বললে চুপচাপ দাঁড়ালো। হাটতে বললে জবাব দিয়েই বসলো "আমি বাজারের গরু নাকি যে হালচাষ করবেন। হাটতে হবে, নাচতে হবে, গান গেয়ে শুনাতে হবে? "বলেই চলে গেলো। তখন আর কাউকে ভয় পেতো না । আরেক পক্ষ প্রশ্ন করা শুরু করলো " কিসে পড়েন, কত সালে মেট্টিক দিয়েছেন, পয়েন্ট কত, বাক্যটার ইংরেজি করুন"? ইত্যাদি প্রশ্ন শুনে অথৈও পাল্টা জবাব দিতে থাকলো। এক্সকিউজ মি "আপনারা কি পাত্রী দেখতে এসছেন নাকি চাকুরির ভাইবা নিচ্ছেন? যান উঠেন, আপনাদেরকে আমার পছন্দ হয়নি "। বলেই উঠে গেলো।
.
তারপর থেকে পুরোপুরি ভয় কেটে গেলো। কেউ দেখতে আসলেই নিজে নিজে সেজে সামনে চলে যেতো। বিতর্ক করতে ভালো লাগতো। একবার একপক্ষ নিজের হাতে ঠিকানা লিখে দিতে বললে জবাব দিয়ে বসলো "কেনো, ঠিকনা অন্য কেউ লিখে দিলে হবে না বুঝি "? "না, আপনার হাতের লিখা কেমন তা দেখার জন্য " প্রশ্নের জবাবে বললো "ওহহ আমার হাতের লিখা সুন্দর হলে নাম্বার দিবেন বুঝি "? একপক্ষ কোনো প্রশ্ন করার আগেই সে বলে দিলো "দেখুন আমি কালো, খাটো, এই এই পড়াশুনা, এটা জানি সেটা জানি " ইত্যাদি বলার পর তারা আর কোনো কিছু জিজ্ঞেস না' করেই চলে গেলো। উপাধি দিয়ে গেলো আদব-কায়দা শিখে নি।
.
এরুপ প্রায় পঁঞ্চাশটা পরিবার এলোগেলো। রাগে ক্ষোভে অথৈ সিদ্ধান্ত নিলো জীবনে বিয় করবে না যতকাল বাঁচে। বিয়ের প্রতি, পুরুষদের প্রতি তখন থেকেই মনের মধ্যে ঘৃণার জন্ম নিলো। যারাই আসতো পছন্দ করলেও সে নিজ থেকেই নিষেধ করে দিতো বিয়ে করবেনা। বিয়ে করা অবেহেলিত নির্যাতিত মেয়েদের পাশে দাঁড়াবে। এক পক্ষ অথৈকে পছন্দ করলো। এখানে পাত্রের বাবা-মা আর এক বোন ছাড়া আর কেউ ছিলো না। বুঝা গেলো অত্যন্ত ভদ্র পরিবার।
__ মা আপনার নাম কি? (পাত্রের বাবা)
__ জি! অথৈ।
পাত্রের বোন কৌশলে অথৈকে নিয়ে হেঁটে হেঁটে চুল, উচ্চতা সবকিছু দেখে নিলো। এই একটা পরিবার যেকিনা ভদ্রভাবে প্রশ্ন করলো আর অথৈও ঠিকঠাক জবাব দিলো। তখন অথৈ অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়তো। তাদের পছন্দ হলো। অতঃপর পাত্রের মা জিজ্ঞেস করলো "মা আপনার কি বিয়েতে অসম্মতি আছে "? অথৈ সরাসরি "অসম্মতি আছে " জানিয়ে দিলো। "কেনো "? প্রশ্নের জবাবে বললো "আপনাদের সব ঠিক আছে তবে আমি বিয়ে করবো না "।তারপর থেকে এভাবেই সব সম্বন্ধ নিজ থেকে প্রত্যাখ্যান করতো। চির কুমারী অথৈ আজকে প্রায় বৃদ্ধ। এখনো সেবা করে যাচ্ছে অবেহেলিত মেয়েদের নিরলসভাবে। নিজের জীবন যৌবন উৎসর্গ করে দিয়েছেন তারই প্রতিষ্ঠিত ''নির্যাতিতদের আশ্রম " নামক সেবা প্রতিষ্ঠানে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now