বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
১
সারাদিন পর বাসায় এসে কলিং বেল প্রেস করার
আগে শুনি বাসার ভেতর থেকে তীব্র
চেঁচামেচির শব্দ আসছে। “তুই রাধা, তুই না সখি?
কোমর দুলিয়ে হেঁটে দেখা গাধা, তোর লম্বা
বেনী থাকবে বুঝিস না কেন? জোরে গান
গাইবি, কৃষ্ণের ডান পাশে থাকবি তুই মোটি”। আমি
এত সব উদ্ভট কথা শুনে হতচকিত হয়ে কলিং বেল
প্রেস করলাম আর সাথে সাথেই বাসার ভেতরের
সব হট্টগোল থেমে গেলো। আর ছোট
ভাগ্নী বহ্নি কাঁচুমাচু মুখে দরজা খুলে উঁকি দিলো।
আমি গম্ভীর মুখ করে, থমথমে গলায় বললাম-এত
হৈ চৈ কীসের? (ভাগ্নিদের সাথে মাঝে মাঝেই
বেশ কড়া ভাব ধরে থাকি আমি) বহ্নি আমার দিকে
তাকিয়ে মিনমিনে গলায় বলল-ছোটকু, আমরা তো
রাধা-কৃষ্ণ নাটকের রিহার্সেল করছিলাম। স্কুলে
যেমন খুশি তেমন সাজো তে প্লে হবে। আমি
বহ্নির কথার কোন উত্তর না দিয়ে ঘরে ঢুকে
দেখি আমার বড় ভাগ্নি আনিকা, আমাদের উপর তলার
বৌদির মেয়ে পৃথিলা, তার ছোট ভাই নীল সবাই
একসাথে সোফায় চুপচাপ বসে আছে। একেক
জনের চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে যতটা
লক্ষ্মী ভাব নিয়ে এরা সবাই বসে আছে ততটা
লক্ষ্মী এরা কেউই না, বরং এদের প্রত্যেকের
মাথার ওপরে অদৃশ্য দুটো লাল শিং আছে যা কিনা
এদের কাজ কর্ম দেখলেই বোঝা যায়।
আমি আগের মত থমথমে গলায় বললাম-রাধা আর
কৃষ্ণ কে কে হবে?
এমন সময় পৃথিলা ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে কিছুটা
তোতলাতে তোতলাতে বললো-আ-আমি রাধা
হবো ছোটকু। আর ব-বহ্নি হবে আমার সখী
বিশাখা। কৃষ্ণ হবে আমার এক বান্ধবী। আর আনিকা
আমাদের গা-গাইড মানে আমাদের প্লেতে সব
ধরণের সাহায্য করবে ও।
আমি আমার কমলা-কালো ফ্রেমের চশমাটা ডান
হাতের তর্জনি দিয়ে একটু ওপরের দিকে ঠেলে
দিয়ে আগের মত গম্ভীর হয়েই বললাম- গুড।
কোন সাহায্য বা পরামর্শ লাগবে আমাকে বলো।
পৃথিলা জোর করে মুখে একটু হাসি এনে মাথা
নাড়লো। আমি এরপর আমার ঘরে ফিরে আসি।
পেছন থেকে আবার চেঁচামেচির শব্দ শুরু হয়।
এর মাঝে পৃথিলা আর আনিকার উত্তেজিত স্বর
ভেসে আসতে শুরু করে-বহ্নি এতো মটু কেন
তুই? আরে রাধার সখী তো অনেক ঢঙ করে,
তোকে ঢঙ শিখতে হবে। গন্ডার কোথাকার।
পৃথিলার পরিবার আমাদের বাড়ির ঠিক উপর তলার বাসিন্দা
হয়েছিলো আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগে।
তখন পৃথিলার বয়স হবে তিন কি চার। আর ওর
ছোট্ট ভাইটা তখন বৌদির কোলে। আমার দুই ভাগ্নির
সাথে খেলাধুলা করে সে বড় হয়েছে।
ছোটবেলা থেকেই ওর পাকা পাকা কথা শুনে সবার
কান ঝালাপালা হত। আমার ভাগ্নি আনিকা এমনিতেই বিচ্ছু
আর তার সঙ্গী হয়েছিলো পৃথিলা। ছোটবেলা
থেকেই আমাকে যমের মত ভয় পেত পৃথিলা।
হয়ত আমার গম্ভীর মুখ দেখে, থমথমে গলা
শুনে, কুঁচকে যাওয়া ভ্রু দেখে সে ভীত
হতো। আমার ভাগ্নিরাও সেই ভয়কে আরো
কয়েকশ গুন বাড়িয়ে দেওয়ার জন্যে আমার রাগ
নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের চাপা মারতো। যেমন-জানিস
পৃথি, আমার ছোটকু একদিন অনেক রাগ করে
চিৎকার দিয়েছিলো, তখন ঠাশ করে রান্নাঘরের
ব্লাবটা ফেটে গেছে। আমার ছোটকুর রাগ এতই
বেশি যে রেগে গেলে তার চেহারা বোম্বাই
কাঁচামরিচের মত লাল হয়ে যায়। নাক আর কান দিয়ে
দৈত্যর মত ধোঁয়া বের হয়...এমন করে নানা
কাহিনী ফেঁদে আমাকে বলা যায় পৃথিলা আর ওর
ছোট ভাই নীলের কাছে আলিফ লায়লার কোন
দৈত্যই বানিয়ে ফেলেছিলো আমার ভাগ্নিগুলো।
আমিও এসব শুনে বা দেখে মজা পেতাম। সারাক্ষণ
দুষ্টমি করা বাচ্চাকাচ্চা আমাকে দেখেই ভয়ে হিমশিম
খাচ্ছে এই ব্যাপারটা একটা অন্যরকম বিনোদন
দিতো আমাকে।
২
আমার ভাগ্নিদের কান্ড কারখানা নিয়ে অনেক কিছু
লিখেছি আমি আমার ফেসবুকের স্ট্যাটাসে,
ব্লগে, ডায়েরীতে আরো বিভিন্ন জায়গায়।
পৃথিলাও কিন্তু কম যায় না। সে তার কিছু নিজস্ব
কর্মগুনে আমার ভাগ্নিদের প্রিয় বান্ধবী হয়ে
উঠেছিলো। আজ তাদের নতুন আর পুরনো কিছু
কাহিনী লিখে যাবো।
আমার বড় ভাগ্নি আনিকা বাংলা একদম পড়তে চায়না।
তাকে একবার জোর করে একটা রচনা মুখস্ত
করতে দিয়েছিলাম। সময় বেঁধে দিয়েছিলাম ১৫
মিনিট। ১৫ মিনিট পর এসে দেখি বইয়ের পৃষ্ঠাই নাই।
আমি তো পুরাই টাস্কি,একটু আগেও বইতে পৃষ্ঠা
ছিল,কই গেলো। চিল্লাপাল্লা করছি, এমন সময়
আমার ছো ভাগ্নী বহ্নি ওভেন থেকে চাবানো
এক দলা কাগজ এনে বলল- “এই যে আপুর রচনার
পৃষ্ঠা” আমি দেখি কৃষিকাজে বিজ্ঞানের তখন
দফারফা অবস্থা। আনিকাকে রেগেমেগে রাম ধমক
দিয়ে জিজ্ঞেশ করলাম এমন কাজ করেছে
কেন? সে নির্বিকারভাবে উত্তর দিলো রচনা
মুখস্ত হচ্ছিলো না, তাই চাবায়ে গেলার চেষ্টা
করছিলাম।
আমাদের বাসার সব খাবারের মাঝে সবসময় কিঞ্চিত
সমস্যা থাকে। যেমন বিস্কুটের টিনের প্রায় সব
বিস্কুট একটু একটু খাওয়া,কেকের চারপাশে পোড়া
সাইডটা নাই,সসের বোতলে মেওনিজ মিক্স করা।
এক রাতের মধ্যেই দু লিটার কোকের স্বাদ
পানশে হয়ে যাওয়া,কারণ কোকের সাথে
মেশানো থাকে পানি, লবন, সয়া সস,সিরকা ও
লেবুর রস। (কোক খেয়ে সেটার পরিমানটা ঠিক
রাখার জন্যে আনিকার কোক বানানোর
রেসিপ),কফি মিক্সের মিনিপ্যাক গুলোতে শুধু চিনি
(কারন কফিও আনিকা খালি খালি খায়),ম্যাগি নুডুলসের রাশি
রাশি প্যাক আছে কিন্তু নুডুলস নাই,রান্না করা মাত্রই
মুরগীর রান নাই,সসেজ ১০ টা ভাজা হলেও
টেবিলে দেবার সময় ৮ টা থাকবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
এসব কাজ আনিকা একাই করে। বহ্নির কাজ হল
আনিকাকে হাতে নাতে ধরিয়ে দেওয়া।
পৃথিলার কান্ড হলো- কয়েক বছর আগে
থেকেই সে তার ফ্রকের উপর লাল একটা ওড়না
পেঁচিয়ে শাড়ির মত করে পরে আয়নার সামনে
গিয়ে সিনেমার ডায়লগ দিতো ও অভিনয় করতো।
-“এক চুটকি সিন্দুর কি কিমাত,তুমি কেয়ে জানো
অভয় (হিন্দি সিরিয়েলের ভ্যাম্পায়ার নায়কের নাম)।
তুম স্রিফ মেরি
হোওওওওওওওওওওওওওওও...মেরি মেরি
মেরি। পৃথিলার কান্ড কারখানা দেখে বা শুনে আমার
তখন অজ্ঞান হবার অবস্থা হতো।
আমাদের বাসায় রোজ দুপুরে ঠক ঠক করতো
পৃথিলা, কলিং বেল দিলে সবাই টের পেয়ে যাবে
তাই। ওর ঠক ঠক করা শুনেই আনিকারা বলে দিতে
পারতো কোনটা পৃথিলা বা কোনটা পৃথিলার ছোট
ভাই। আমি যদি কখনো দরজা খুলতাম তখন পৃথিলা বিষম
খেয়ে বলতো- ছো-ছোটকু। আপনাদের
বাসায় পেঁয়াজ আছে? মা গোটা চারেক পেঁয়াজ
চেয়েছে। সে বাজার থেকে পেঁয়াজ
আনলেই ফেরত দিয়ে দিবে। আমি বেশ কিছু
পেঁয়াজ দিয়ে দিতাম। তারপর বলতাম- বৌদিকে বলো
ফেরত দিতে হবে না। পৃথিলা পেঁয়াজ নিতে নিতে
ঘরের ভেতরে উঁকিঝুঁকি দিয়ে আনিকাদের
খোঁজার চেষ্টা করতো। তারপর খুঁজে না
পেয়ে বিরস মুখে চলে যেত। ঠিক পনেরো
মিনিট পরেই আবার ফিরে এসে বলতো।
-বাজার থেকে পেঁয়াজ আনা হয়েছে। মা তাই কিছু
পেঁয়াজ আপনাকে দিয়ে যেতে বলেছে।
আমি সিরিয়াস মুখ করে রেখেই ওর ডাহা মিথ্যে
কথাগুলোকে মেনে নিতাম। পেঁয়াজগুলো আবার
গিয়ে রেখে আসতাম। এভাবে আলু, শশা,
তেজপাতা, ডিম, আদা, রসুনসহ অনেক কিছু
পনেরো বা বিশ মিনিটের জন্যে ওদের বাসায়
যেতো তারপর আবার আমাদের বাসায় ফিরে
আসতো। এই কাহিনী ততক্ষণ চলতো যতক্ষণ না
আমি নিজে থেকে বলতাম-বাসায় এসে বসো...
আনিকা আর বহ্নি তোমার জন্যে অপেক্ষা
করছে। নিমিষেই মুখে দুশ ওয়াটের বাতির মত
ঝকঝকে হাসি নিয়ে পৃথিলা বাসায় চলে আসতো।
সঙ্গত কারণেই আনিকা আর পৃথিলা ছিলো জানি
দোস্ত। পৃথিলা স্কুল শেষ করে বাসায় এসে
নাকে মুখে কোনক্রমে খাবার গুঁজেই আমাদের
বাসায় চলে আসতো আনিকার সাথে গল্প করবে
বলে। মূলত স্কুল, ঘুম, খাওয়া, পড়ালেখা করা আর
বাথরুম যাওয়া বাদে বাকি প্রায় সবটুকু সময় সে
থাকতো আমাদের বাসায়। আমার বোন বলতেন-
আমার তিন মেয়ে, “আবপৃ”- মানে আনিকা, বহ্নি,
আর পৃথিলা।
দুপুরের ঘুম, বিশ্রাম, ছবি আঁকা, সব কিছু বাদ দিয়ে
সারাদিন গুজগুজ করে গল্প করতে দেখলেই আমি
কড়া চোখে তাকাতাম ওদের দিকে। আর তাকালেই
কাজ হয়ে যেত। পৃথিলা মিনমিনে ভয়েসে হালকা
তোতলাতে তোতলাতে বলতো-ছ-ছোটকু,
আমার মা একটু বাইরে গিয়েছেন তো তাই আমি
এখানে থাকতে এসেছি। আমি থমথমে গলায়
বলতাম-এই দুপুরে গল্প না করে তিনজনে ঘুমাও।
আমি বিকেলে তোমাদের কে চটপটি বানিয়ে
খাওয়াবো। ওরা তিন জনেই তখন বিছানায় শুয়ে
ফিসফিস করে গল্প করতো। আর আমার পায়ের
শব্দ শুনলেই মরার মত ঘুমের ভান করতো। বহ্নি
তো মাঝে মাঝে অতি অভিনয় করতে গিয়ে মৃদু
নাক ডাকার শব্দও করে ফেলতো।
পৃথিলা তখন চোখ বন্ধ রেখেই ফিসফিস করে
বলতো- এই গন্ডার, নাক ডাকবি না, ছোটকু
সন্দেহ করে ফেলবে। গাধা...শুধু ঘুমের ভান
কর...বেকুব...একটু ভালোমতো অভিনয়ও
করতে পারিস না। অপদার্থ কোথাকার। ঘুমা, প্লিজ
...... মানে ঘুমাস না ভান কর, সত্যি সত্যি ঘুমের
অভিনয় কর।
বহ্নি ফিসফিস করে বলতো- সত্যি সত্যি আবার
ঘুমের অভিনয় করে কেমনে? পৃথিলা চাপা গলায়
বলতো-তুই একটা বেকুব...তুই গন্ডার... আমি
ওদের কথা শুনে, কির্তিকালাপ দেখে আনমনেই
হাসতাম। নিজের ছেলেবেলা মনে পরে
যেতো। আমি আর আমার সবচেয়ে প্রিয়
বান্ধবী কতদিন এভাবে আম্মু চোখ ফাঁকি দিতে
চেয়েছিলাম...এক সময় আমিও স্কুল থেকে
এসে এভাবেই গল্প করার জন্যে আঁকুপাঁকু করতাম।
আমার চোখে পৃথিবীটা তখন কত সুন্দরই না
ছিলো।
৩
যাই হোক, আমার ভাগ্নীরা আর পৃথিলা সবাই
অগ্রণী স্কুলে পড়তো। একসাথে স্কুলে
যাওয়া আবার একই সাথে তাদের ফিরে আসা। তবুও
তাদের গল্প ফুরায় না। স্কুলে যেমন খুশি তেমন
সাজো-র প্লে হবার দিন ভোর ছয়টায় উঠে আমি
বহ্নি আর পৃথিলাকে ঘুম ঘুম চোখে খুব যত্ন
করে সাজিয়ে দিলাম। পৃথিলার আঁকা আঁকা নাক, মুখ,
চোখ মেক-আপের সত্যি আরো বেশি সুন্দর
হয়ে গেলো। ক্লাস এইটে পড়া তের, চৌদ্দ
বছরের মেয়েটার রুপ যেন প্রসাধনীর ছোঁয়ায়
ফুলের মত ফুটে উঠলো। পৃথিলা আর বহ্নিকে
সাজিয়ে দিয়ে আমি নিজেই থ হয়ে গেলাম। বাচ্চা
বাচ্চা মেয়েগুলোকে কেমন বড় লাগছে।
নাচের মেয়েদের মত টানা কাজলে কেমন মায়া
মায়া লাগছে ওদের চোখ। টার্সেল দেওয়া লম্বা
বেণীতে গাঁদা ফুলের মালা পরিয়ে দেওয়ার
আমার নিজেরই চোখের পলক পড়ছিলো না।
পৃথিলা নিজেকে আয়নায় দেখে মুগ্ধ। বার বার খালি
বিড়বিড় করে বলছে, থ্যাঙ্কু ছোটকু...
থ্যাঙ্কুউউউ। আমি অনেক যত্ন করে ওদের
প্লের ফাইনাল স্ক্রিপ বুঝিয়ে দিলাম। সবকিছু গুছিয়ে
দিলাম।
সেদিন বাসায় এসে শুনি স্টেজে ওঠা মাত্রই নার্ভাস
হয়ে পৃথিলা আর বহ্নি সব ভজঘট করে
ফেলেছে। প্লের মাঝে বহ্নির মাথার লম্বা
বেণী খুলে গিয়ে স্টেজে হুটোপুটি
খেয়েছে তা দেখে পৃথিলা প্লের মাঝখানেই
মাইক রেখে বেণীর পেছনে ছুটোছুটি শুরু
করে দিয়েছিলো। আর ভুলভাল সব ডায়লগ বলে
সব মিলিয়ে একটা খিচুড়ি স্ক্রিপ্ট বলে এসেছে।
স্কুলের সবাই নাকি হাসতে হাসতে শেষ ওদের
কান্ড দেখে। এতকিছুর পরেও ওরা সেকেন্ড
হয়েছে। কীভাবে যে হয়েছে আল্লাহই
জানে। আমরা সবাই ধারণা করলাম ওদের উদ্ভট কাজ
কর্ম দেখিয়েই ওরা সেকেন্ড হয়ে গিয়েছে।
সেকেন্ড হওয়ার পর ওদের ভাব দেখে মনে
হচ্ছিলো ওরা বুঝি বিশ্বজয় করে ফেলেছে।
আনিকার কাছ থেকে একদিন জানতে পারলাম, পৃথিলা
বড় হয়ে আমার মত হতে চায়। বড় হয়ে সে
ছোটকু হতে চায়। সে আমাকে অনেক ভয় পায়
আবার একই সাথে অনেক পছন্দও করে। জানতে
পারলাম আমার মত করেই সে রবিন্দ্র সঙ্গীত
শোনে। পৃথিলার প্রিয় রঙ ছিলো গোলাপি, আমার
উজ্জ্বল রঙ প্রিয়। হলুদ, কমলা রঙ আমার
ভালোলাগে জানার পর থেকে তারও নাকি এই
রঙগুলো ভালোলাগে। কোন কিছু জেনে খুব
অবাক হয়ে গেলে ও নাকি আমার মতই চোখ বড়
বড় বলে শকিং! আনিকার চশমা পরে মাঝে মাঝে
সে আমাকে নকল করে দেখায়। আমার মতই নাকি
ও চুল পনিটেল করে বেঁধে রাখে। আমি আনিকার
কাছ থেকে সব শুনে ঘর কাঁপিয়ে হাসি। এরপর
থেকে প্রায়ই লক্ষ্য করি, পৃথিলা আসলেই আমার
মত করে চুল বাঁধে। আমি কথা বললে বা আমি
হেঁটে চলে গেলে খুব মন দিয়ে লক্ষ্য
করে। আমার ওর ছেলেমানুষি দেখে মায়া লাগে।
মাঝে মাঝে তাই ওদের সবাইকে নিয়ে বাসায় পার্টি
দেই। বাসায় বানানো একগাদা খাবার, সাথে
জোরসে মিউজিক, কিছু কুইজ খেলা, ফটোবাজি
সব কিছু নিয়ে হয় পার্টি। পৃথিলাকে মাঝে মাঝে
আফসোস করতে শুনি, ওর ছোটখালা কেন
ছোটকুর মত নয়।
গত বছর আমার জন্মদিনের দিন সন্ধ্যায় হাতে
বানানো একটা কার্ড পাই আমার ঘরের দরজার নিচ
দিয়ে। তাতে লেখা-
“হ্যাপী বার্থডে ছোটকু,
ইউ আর দ্য বেস্ট আন্ট উই হ্যাভ এভার সিন...
পৃথিলা ও নীল”
এ বছর থেকে আমার ভাগ্নিদের সাথে আর
পৃথিলার সাথে আমার সখ্যতা আরো বেড়ে যায়।
আমি হয়ে যাই ওদের ছোটকু বন্ধু। পৃথিলা
আমাকে একটু যেন কম ভয় পায় আর আরেকটু
যেন বেশি ভালোবাসে। আমি সদ্য বড় হতে থাকা
আমার ভাগ্নীদের সাথে ঝুম বৃষ্টিতে অনর্গল
ভিজি, ওদেরকে নজরুল জয়ন্তীতে ছায়ানটে
গানের অনুষ্ঠানে নিয়ে যাই, আমার লেখা গল্প
ধরে ধরে পড়াই, আকাশে মেঘ করলে লেবু
দেওয়া রঙ চা বানিয়ে, মাটির কাপে করে ওদের
প্রিয় বিস্কুটসহ একেকজনের হাতে ধরিয়ে দেই।
একটু একটু করে আমার বয়স কমতে থাকে। আমিও
তেরো, চৌদ্দ বছরের কেউ হয়ে যাই।
সারাদিনের ব্যস্ততার পরেও আমার বাসায় এসে
কখনো ক্লান্ত লাগে না।
[Visit my site bdonlinereads.blogspot.com]
৪
মাসখানেক আগে রাত ন’টার দিকে দেখি আমার
বোন, ভাগ্নীরা আর পৃথিলা খাওয়ার রুমে বসে
বসে প্ল্যান করছে এবার ডিসেম্বরে আমাদের
আর ওদের ফ্যামিলি মিলে কক্সবাজার বেড়াতে
যাবে। আমাকে দেখে পৃথিলা চকচকে চোখে
বলে- ছোটকু আমরা সবাই মিলে বেড়াতে যাচ্ছি।
আমি একটা হালকা হাসি দিয়ে নিজের রুমে চলে
আসি। আমার দুই ভাগ্নী ডিসেম্বরে ঘুরতে যাওয়ার
উত্তেজনায় সারারাত ঘুমাতে পারে না।
পরদিন সকালে ভাগ্নীদের পড়তে বসিয়ে আমি
আমার রুমে বসে নিজের এসাইনমেন্টের কাজ
করছি। এমন সময় নীল ছুটতে ছুটতে এসে
হড়বড় করে কী কী বলে আমার
ভাগ্নীদেরকে নিয়ে গেলো ওদের বাসায়।
আমি ভাবলাম হয়ত বৌদি কিছু রান্না করেছেন বা পৃথিলা
কোন ছবি এঁকেছে বা কিছু করেছে তাই
ওদেরকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রায় বেশ
অনেকক্ষণ হয়ে যাবার পরেও আনিকারা ফিরে না
আসায় ওদের খোঁজ করতে গিয়ে দেখি পৃথিলা
জ্ঞানহীন আর ওর বাবা ওকে কোলে তুলে
হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন। অনেকদিন থেকেই
পৃথিলার হার্টে খুব ছোট্ট একটা ফুটো ছিলো।
শ্বাসকষ্ট হলে ইনহেলার নিতে হতো ওকে।
সেদিন সকালে ইনহেলার শেষ হয়ে
গিয়েছিলো। আর নেবুলাইজার কাজ করছিলো না।
পৃথিলার ঠান্ডা লেগেছিলো। নিঃশ্বাস নিতে না
পেরে এক সময় জ্ঞান হারায় ও। ওর বাবা ওকে
দ্রুত স্কয়ার হসপিটালে ভর্তি করান।
আমাদের চোখের সামনে দিয়ে পৃথিলা অচেতন
দেহ চলে যায়। ঘন্টাখানেক পর আমরা জানতে পারি
পৃথিলা কোমায় চলে গিয়েছে। ওকে আইসিইউ-
তে রাখা হয়েছে।আমি হাসপাতালে যেতে
কখনোই পছন্দ করি না। হাসপাতালের মধ্যে
কেমন যেন একটা বিষাদ আর মৃত্যু ঘ্রাণ থাকে।
আমি তাও পৃথিলাকে দেখতে, ওর খবর জানতে
হাসপাতালে গেলাম। আমি যে পাশে বসে আছি তার
ঠিক অন্য পাশের কেবিনের তিন বছরের একটা
ছেলে মারা গেছে। ছেলেটার নাম জুবায়ের।
ছেলেটার মা বিলাপ করে কাঁদছে। মানুষের মৃত্যুর
কান্না যে কত ভয়ংকর হতে পারে; আমি অনেকদিন
পর সেদিন আবার উপলব্ধি করতে পারলাম। আমার
বুকের ভেতরটা ধুকপুক ধুকপুক করতে থাকলো।
আমার মনে হচ্ছিলো আমার হৃৎপিণ্ডটা কেউ
টেনে ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে। পৃথিলার বাবা একটু পর
পর হাঁটু ভেঙে মাটিতে বসে পড়ছেন, আমার
ভাগ্নীগুলো কাঁদছে। আমার বুক কেঁপে ওঠে।
আমার মনে পরে কতদিন আমি পৃথিলাকে ভর
দুপুরে বাসায় ঢুকতে না দিয়ে জোর করে ওকে
ওর বাসায় ঘুমাতে পাঠিয়ে দিয়েছি। কতদিন ইচ্ছে
করে ওর সামনে আমি কপট রাগের ভঙ্গী করে
রেখেছি। কতদিন গুজগুজ করে আনিকার সাথে
গল্প করার জন্যে বকা দিয়েছি। আমার মনে হয়
আমিও বুঝি হাঁটু ভেঙে পড়ে যাবো। আমার মনে
হয় নিজেকে যতটা শক্ত মনের আর বাস্তববাদী
বলে আমি দাবী করি আমি তেমন নই। আমার মনে
হয় আমি আইসিইউতে গিয়ে পৃথিলাকে বুকে
জড়িয়ে ধরে বসে থাকি। আমার মনে হয় আমার
একটা ভাগ্নী জীবন আর মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা
লড়ছে। আমি হাসপাতালের শক্ত দেয়াল ধরে
নিজেকে প্রতিনিয়ত সামলে নেয়ার চেষ্টা
করতে থাকি।
৫
আমার লেখা “বন্ধু” গল্পটি পড়ে আমার আম্মু
আমাকে বলেছিলেন- সঞ্জনা মা, তোমার
এখনো তীব্র কষ্ট, অপঘাতে মৃত্যু, জরা, ব্যাধি,
আর অন্ধকার জগত নিয়ে লেখার সময় হয়নি। তুমি
তোমার মনের আলোকিত অংশটুকু তোমার
লেখায় আনো, তোমার স্বপ্ন, আমাদের
দেশের জন্যে তোমার ভালোবাসা, মানুষের
উন্নতির জন্যে নতুন কোন উদ্যোগ নেওয়া,
ছকের বাইরে করা অভিনব কাজ, তারুণ্য, তোমার
ভালোলাগা, ভালোবাসা নিয়ে লেখো। কষ্ট,
বেদনা, অন্ধকার, মৃত্যু আর পার্থিব সব কিছু নিয়ে
লেখার জন্যে তো বাকি জীবন পরে আছে।
এখন পৃথিবীকে যতটা সুন্দর লাগছে এভাবে,
এরকম করে আর লাগবে না মা। তুমি এই সুন্দরের
কথা লিখো......পৃথিলা কোমায় যাওয়ার পর আমি
অনেকবার আম্মুর কথাগুলো ভেবেছি। মনে
মনে বলেছি এই ছোট্ট মেয়েটার তো এই
পৃথিবীকে ভালো করে দেখাই শুরু হয়নি। তবে
তাকে কেন এই অন্ধকার জগতের কষ্ট সইতে
হচ্ছে। কেন?
পৃথিলা কোমায় ছিলো প্রায় দু সপ্তাহ। এ
দিনগুলোর মধ্যে প্রায় প্রতিদিন আমার বোন
পৃথিলাকে দেখতে গিয়ে হাসপাতালে দীর্ঘক্ষণ
বসে থাকতো। আমার বোন যে কীনা
আসলেই পৃথিলাকে তার সন্তানের মত
দেখেছিলো প্রতিদিন নামাজে ঝরঝর করে
কাঁদতো। আমিও কাঁদতাম তবে আমি নিঃশব্দে কাঁদতাম।
আমার বোন কাঁদতো প্রার্থনায়, যেন পৃথিলা সুস্থ
হয়ে যায় এই, আর আমি কাঁদতাম একটা আতঙ্কে,
একটা ভয়ে। কারণ আমার এক ডাক্তার বন্ধু আমাকে
আগেই বলেছিলো পৃথিলার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা
অতিক্ষীণ, যদি কোন মিরাকেল হয় তবেই শুধু
সম্ভব। আমি মন থেকে চাইতাম যেন কোন
মিরাকেল হয় কিন্তু আমার মস্তিষ্ক সব সময় ভয়ে
থাকতো। কারণ আমার মস্তিষ্ক বুঝে গিয়েছিলো
যে ফুল ঝরে যেতে শুরু করেছে তার কুড়ি
হওয়া ততটাই অসম্ভব যতটা অসম্ভব আবার আগের
মত পৃথিলাকে ফিরে পাওয়া।
“ক্লিনিক্যালি ডেড” এ শব্দটার মানে আমি বুঝি না।
আর বুঝতে চাইও না। শুধু জানি এই শব্দটা শোনার
পরদিন থেকে আমাদের এলাকা আর আমাদের
আশে পাশের সব এলাকার মসজিদ, মন্দির, গির্জা
আর এতিমখানায় আমার বোন পৃথিলার নামে দোয়া
চেয়ে গেছে। আর সব ধর্মের মানুষের
কাছে আকুতি করে গেছে তারা যেন পৃথিলার
জন্যে দোয়া করে। আমার বোনের বিশ্বাস
ছিলো আল্লাহ অবশ্যই এই ছোট্ট মেয়েটাকে
আরো অনেক দিন বাঁচতে দিবেন। একটা
মিরাকেল অবশ্যই হবে। অগ্রণী স্কুলের
এসেম্বলিতে শত শত মেয়েরা আর শিক্ষকেরা
পৃথিলার জন্যে দোয়া করতে শুর করলো।
আমাদের এলাকার মাঝ বয়সী মুদি দোকানদার লিটন
মামা, আমাদের বাড়ির দারোয়ান সবাই পৃথিলাকে
দেখতে হাসপাতাল গেলো...আমার ভাগ্নীগুলো
মাত্র কয়েকদিনের মাঝেই শুকনো পাতার মত
বিষণ্ণ হয়ে গেলো। তারা আর আইসক্রিম খায় না,
গল্প করে না, মুভি দেখে না, চকলেটের
জন্যে আবদার করে না। পৃথিলা ফিরে এলেই
কেবল তারা আবার আগের মত সব করবে।একদিন
খাবার টেবিলে বসে আমার বোন আমার
ভাগ্নীদেরকে বললো- তোমার মনে মনে
পৃথিলাকে ডাকো। ওকে ডেকে বলো-এই পৃথি
তুই ফিরে আয়...তুই না আসলে আমরা ভালো
থাকতে পারবো না। তোমরা এখনো অনেক
নিষ্পাপ। তোমাদের ডাক ও ফেলতে পারবে না।
আমি দেখলাম বহ্নির চোখ ভিজে এসেছে।
আনিকার মুখ কেমন যেন পাথরের মত শক্ত হয়ে
আছে।
৫-ই অক্টোবার পৃথিলা আমাদের সবাইকে ছেড়ে
চলে গেলো। সেদিনও আকাশে রোদ
উঠেছিলো, অল্প স্বল্প মেঘ ছিলো,
আমাদের বাড়ির সামনের আম গাছটায় রোজকার মত
কিছু শালিক ডেকেছিলো। আমার বোন অন্য সব
দিনের মতই অফিস যাবার আগে পৃথিলার জন্যে
প্রার্থনা করে গিয়েছিলো, আনিকা- বহ্নি মনে
মনে অসংখ্যবার পৃথিলাকে ডাকছিলো, আমি সেদিন
বিষন্ন মনে আমার বাসায় বসে ছিলাম। এখন আর
ভরদুপুরে পৃথিলা দরজা ঠকঠক করে না তাই ভাবছিলাম।
ভাবছিলাম মাত্র দু সপ্তাহে সবকিছু কেমন বদলে
গেছে। আমাদের বাড়িটাকে এখন কেমন শূন্যতার
ভরা মনে হয়।
পৃথিলার আমার মত হতে পারেনি। যদি পারতো
তাহলে এতদিনে ও বেঁচে থাকতো। আমি
বেঁচে থাকতে ভালোবাসি। আমি রোজ সকালে
একই সূর্য বারবার দেখে বিরক্ত হইনা। প্রতিদিন
আমার কাছে এই পৃথিবী নতুন লাগে। পৃথিলা আমার
মত হতে পারেনি, যদি পারতো তবে কখনোই
আপনজনদের ছেড়ে চলে যেতে পারতোনা।
আমি চোখ বন্ধ করলেই পৃথিলার চেহারা মনে
করতে পারি। আঁকা আঁকা চোখমুখ। আমি যেই
চোখে কাজল লাগিয়ে দিয়েছিলাম, গাঁদা ফুলের মালা
দিয়ে চুল বেঁধে দিয়েছিলাম। আমি কান পাতলেই
মনে হয় ও আমাকে ডাকছে। এখনো আমাকে
কিছুটা ভয় পায় তো তাই ছোটকু বলতে গিয়ে
হয়ত বলে ফেলে “ছো-ছোটকু”। মধ্যরাতে
আমার যদি কখনো ঘুম ভেঙে যায়, তাহলে আমার
মন হু হু করে কেঁদে ওঠে। মনে হয় কোথায়
চলে গেছে পৃথিলা? ও কী খুব একা? ওর কী
ভয় করছে। আমার মনে হয় আমি দুনিয়া ভেঙে
ওকে খুঁজে বের করে আনি। আমার বুকের
ভেতরে ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখি।
আমি আম্মুকে কথা দিয়ে কথা রাখতে পারিনি। আমি
আবার কারো চলে যাওয়ার কথা লিখতে বসেছি।
আমি হারিয়ে যাওয়া এক মেয়ের কথা লিখতে
বসেছি। যে কিনা ঠিক ঠিক আমার মতই হতে
চেয়েছিলো......ঠিক আমার মত......
খুব ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি মানুষ মরে
গেলে আকাশের তারা হয়ে যায়। আকাশের হাজার
হাজার তারার মাঝে পৃথিলা নামের তারাটি আমি খুঁজে
বেড়াই। পৃথিলা নামের এক অভিমানী তারাকে আমি
অনেক অনেক বেশি ভালোবাসি......
-একুয়া রেজিয়া-
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now