বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অব্যাখ্যেয়

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X ১ আস্তে আস্তে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলাম আমি। খুবই আস্তে। ও যাতে টের না পায়। এখান থেকে ওর পিছনটা দেখা যাচ্ছে। ও দোল চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছে। ওর কথা অস্পষ্ট শোনা যাচ্ছে... কি রে বাবু তুই এত দুষ্টু কেন...খালি নড়াচড়া করিস...লাথি মারছিস নাকি?...তুই কি বড় হয়ে ফুটবলার হবি নাকি?...না না, আমি তো তোকে ডাক্তার বানাব, তারপর তুই আমার চিকিৎসা করবি...তোর অনেক টাকা হবে...তুই আমাকে বেড়াতে নিয়ে যাবি অনেক দূর... আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত এগিয়ে গেলাম। সন্তর্পণে। পা টিপে টিপে। আচ্ছা তুই কার মত দেখতে হবি বল তো...তোর বাবার মত?...না না, তুই হবি আমার মত। আচ্ছা ঠিক আছে, তুই দুজনের মতই হোস, তুই তো আর আমার একার সম্পত্তি না...আচ্ছা তোর চুলগুলো কীরকম হবে...তুই কি খুব কান্নাকাটি করবি?...আচ্ছা তুই আমাকে প্রথম মা ডাকবি কবে?... আমি ওর পিছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওর লম্বা ঘন চুল, পিঠের উপর দোল খেয়ে নেমে এসেছে। যাতে মুখ ডুবিয়ে প্রায়ই অজানায় হারিয়ে যাই আমি। যা আমার অসম্ভব প্রিয় একটা জিনিস। তুই কি সত্যিই সারাদিন উ উ করে কাঁদবি আর আমার কোলে চড়ে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াবি?...তুই কাঁদবি, আমি তোকে কোলে নিয়ে দোলাব...বলতে থাকব বাবু আমার কাঁদে না কাঁদে না...তারপর তোর ঐ মায়াভরা চোখে নেমে আসবে রাজ্যের ঘুম...আয় ঘুম আয়... আমি খুব আস্তে ওর কাঁধে হাত রাখলাম। খুব আস্তে। যেন একটু জোরে স্পর্শ করলেই ওটা মুচড়ে ছিঁড়ে যাবে। ও একটু অবাক হল। শরীরটা একটু কেঁপে উঠল যেন। তারপর পিছনে তাকিয়ে একটু হাসল। ওর অনিন্দ্যসুন্দর মুখটা সকালের সূর্যের মতই প্রতিভাত হয়ে উঠল আমার মনের আকাশে। আমার মনে হল, জগতে আমার আর এর চেয়ে বেশি কিছু পাবার নেই। যেন এই হাসি আমার শ্রেষ্ঠ উপহার। স্পষ্ট অনুভব করলাম, ভিজে আসছে আমার চোখজোড়া। ২ মনোবিজ্ঞানী ডাঃ মিরাজ আহমেদের চেম্বারের সামনে রোগীদের লম্বা লাইন। পুরুষ মহিলা মিলিয়ে অন্তত বিশ জন তো হবেই। মনোবিজ্ঞানীর চেম্বার বলতে আমাদের চোখের সামনে যা ভেসে ওঠে তা এখানে দেখা যাচ্ছে না। রোগীদের কেউই পাগলের মত আচরণ করছে না। কেউই আঁচরে কামড়ে একে অপরকে ক্ষতবিক্ষত করছে না। কেউই হঠাৎ হা হা করে গা কাঁপানো অট্টহাসি দিচ্ছে না। বরং, সবাই যেন কেমন শান্ত, কেমন চুপচাপ। শুধু একজনের মধ্যে কেমন যেন অস্থিরতা। যেন তার এখনই চলে যাবার প্রচণ্ড তাড়া রয়েছে। লোকটা মধ্যবয়সী। চোখে কালো চশমা। কাঁচের আড়ালে তার চোখদুটো ঢাকা পড়ে গেছে। তার হাতে একটি পত্রিকা। ইংরেজি ম্যাগাজিন। সেটার দিকেই ঠায় তাকিয়ে আছে সে। কিন্তু সে পত্রিকাটা পড়ছে না। পাতাও উলটাচ্ছে না। শুধু মাঝে মাঝে অস্থির ভঙ্গিতে হাত নাড়াচ্ছে। একটু পরে ভিতরের রোগী বেরিয়ে এল। সিরিয়ালে পরের জন ভিতরে যাবার জন্য দাঁড়াল। উসখুস করে উঠে দাঁড়াল মধ্যবয়সী লোকটিও। হঠাৎ সামনের দিকে দৌড় দিল সে। সবার সামনের রোগীকে ধাক্কা দিয়ে আগে আগে ভিতরে যাবার চেষ্টা করল। কম্পাউন্ডার ছেলেটা হই হই করে উঠল। আরে আরে কি করেন... মধ্যবয়সী লোকটা থমকে দাঁড়াল। তারপর পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিল সে। সে হাতের সাথে বেরিয়ে এল সাবধানে ধরা পাঁচশ টাকার একটি নোট। এমন ভাবে ধরা, যেন আর কেউ না দেখতে পায়। জিনিসটা দেখেই হঠাৎ চুপ হয়ে গেল কম্পাউনডার। সবাইকে বলে উঠল, ইনি স্যারের আত্মীয়, স্যার বলেছেন আগে যেতে দিতে... ৩ মনোবিজ্ঞানী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করার কয়েক বছরের মধ্যেই বেশ পসার জমিয়ে ফেলেছেন মিরাজ আহমেদ। তার অসংখ্য গুণের মধ্যে একটা হচ্ছে, তিনি কথা বলার সময় বক্তার চোখ দেখে বলে দিতে পারেন কথাটা সত্যি না মিথ্যা, এমনকি কতটা সত্যি বা মিথ্যা। এই গুণটা রোগী দেখার সময় তার অনেক কাজে লাগে। সাধারণত যারা তার কাছে আসে, তারা পুরোপুরি সত্যি কথা বলে না। বিশেষ করে যারা Confession এর জন্য আসে। হয়তো অনেক বছর আগে একটা পাপ কাজ করেছিল, কাউকে ধোঁকা দিয়েছিল, বা রেপ করেছিল, সে অনুতাপে এখনও সে দগ্ধ হয়। অনুতাপ শুধু মনকেই আঘাত করে না, দেহেও ফেলে নানা উপসর্গের ছাপ। ব্যস, পেটের কথা মনোবিজ্ঞানীকে বলে নিজেকে হালকা করতে ছুটে আসে নানা বয়সের নানা পেশার মানুষ। কিন্তু পুরো সত্যিটা এতই লজ্জাজনক যে, একান্ত গোপনেও তা বলা সম্ভব হয় না। কিন্তু রোগীর চোখ দেখেই ব্যাপারটা প্রায় জলের মত বুঝতে পারেন মিরাজ। ব্যস, চিকিৎসা বা উপদেশ দেয়াটাও হয়ে যায় পানির মত সহজ। ঠিক একারণেই তিনি সবসময় রোগীর খোলা চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলেন। রোগীরা চশমা পরে থাকলে খুলতে বাধ্য করেন। কিন্তু আজ? তার সামনে যে লোকটি বসে আছে তার চোখে চশমা। শুধু চশমা না, কালো চশমা। শুধু কালো হলেও হত, এটা একেবারে ঘুটঘুটে কালো। এমন না যে মিরাজ তাকে চশমা খুলতে বলেন নি। বলেছেন। কিন্তু লোকটা কোন উত্তরও দেয় নি, চশমাও খোলে নি। ঠায় বসে ছিল ওভাবে। -কি হল, চশমাটা খুলুন। আরে কি ব্যাপার, চশমা খুলছেন না কেন? তবু লোকটা বসে ছিল। নির্বিকারভাবে। মিরাজের মনে হচ্ছিল তিনি লোকটিকে দেখছেন না, বরং লোকটিই তাকে দেখছে। শুধু দেখছে না, হয়তো চামড়ার আবরণ ভেদ করে তার মনটাকেও চমৎকারভাবে পড়ে নিচ্ছে। আজ পর্যন্ত সবসময় রোগীকেই তার ব্যক্তিত্বের কাছে হার মানতে হয়েছে। সবসময়। কিন্তু আজ? মিরাজ নিজেই যেন লোকটির ব্যাক্তিত্বের সামনে অসহায় হয়ে এতটুকু হয়ে যাচ্ছেন। তার মুখটা কে যেন আটকে দিয়েছে শক্তিশালী ডাক্ট টেপ দিয়ে। শেষ একটা চেষ্টা করলেন মিরাজ। -ভাই, চশমাটা খুলুন। এবার লোকটা টেবিলে হাত রেখে সামনে ঝুঁকে এল। মুখটা হয়ে গেল অস্বাভাবিক রকম নিষ্ঠুর। নিজের অজান্তেই একটু পিছিয়ে গেলেন মিরাজ। কপালে জমে উঠল একবিন্দু ঘাম। লোকটা মাথা নাড়ল। ডান থেকে বামে। আবার বাম থেকে ডানে। স্পষ্ট ইঙ্গিত। না। মিরাজ হাল ছেড়ে দিলেন।ধরা গলায় বললেন, আচ্ছা, লাগবে না...আপনার সমস্যাটা... লোকটা আবার পিছিয়ে চেয়ারে হেলান দিল। হাঁফ ছাড়লেন মিরাজ। যেন অনেক বড় একটা ঝামেলা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তারপর লোকটা কথা বলা শুরু করল। খুব আস্তে। খুবই আস্তে। ভালোভাবে শোনার জন্য মাথাটা আগিয়ে দিলেন মিরাজ। ৪ -আপনি বলছেন একটা গোটা প্লেন কেনার সামর্থ্য থাকার পরও আপনি সবসময় লঞ্চে আসা যাওয়া করেন? -হ্যাঁ। -কেন বলুন তো। -কারণ লঞ্চে গেলে সেই রাতে আমি একটা সুন্দর স্বপ্ন দেখি। -সুন্দর স্বপ্ন? কি দেখেন সেই স্বপ্নে? -আমি দেখি যে আমার গর্ভবতী স্ত্রী বসে বসে তার অনাগত সন্তানের সাথে কাল্পনিক কথা বলছে। -তাই? কোথায় আপনার স্ত্রী? -নেই। -মানে? তিনি কি মারা গেছেন? -আমি অবিবাহিত। -মানে?... মোটা কাঁচের চশমাটা নামিয়ে রাখলেন মনোবিজ্ঞানী, তাহলে আপনার স্ত্রী...? -আমি যাকে স্বপ্নে দেখি তাকেই আমার স্ত্রী বলে ধরে নিয়েছি। -আই সি... রাজ্যের অবিশ্বাস নিয়ে মধ্যবয়সী লোকটার কালো কাঁচের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন মনোবিজ্ঞানী মিরাজ আহমেদ। সেই কাঁচে লোকটার চোখের কোন প্রতিফলন পড়ছে না। তাই লোকটা সত্য বলছে না মিথ্যা বলছে, বিন্দুমাত্র আন্দাজ করতে পারছেন না তিনি। এই ঘটনা তার জীবনে এই প্রথম। ৫ -এটাই কি আপনার সমস্যা? আবার শুরু করলেন ডাঃ মিরাজ। -কোনটা? -এই যে ক্রমাগত একই স্বপ্ন দেখা? তাও আবার শুধু লঞ্চে যাবার দিন রাতে? -না। -না? কোন থৈ পাচ্ছেন না মনোবিজ্ঞানী, এটা আপনার সমস্যা না? -I said, No. -তাহলে আপনার সমস্যাটা কি? -আপনার কাছে কি সবাই শুধু সমস্যা নিয়ে আসে? -হ্যাঁ... -কেন, আমি তো জানতাম এইসব সাইকিয়াট্রিস্টদের কাজ হচ্ছে রোগীর সাথে ফাও আড্ডা দিয়ে হাজার হাজার টাকা পকেটে পোরা। চোখ কটমট করে লোকটির দিকে তাকালেন মিরাজ। কিন্তু লোকটি কি ভাবছে এটা বোঝার কোনও উপায় নেই। -ওভাবে তাকাচ্ছেন কেন? Have I said something wrong? মিরাজ তার উথলে ওঠা রাগটা কোনমতে সামলে নিয়ে বললেন, আপনি ঠিক কেন এসেছেন জানতে পারি? -আগে আমার প্রশ্নের জবাব দিন। এবার আর মিরাজ তার রাগ সামলাতে পারলেন না। ঝট করে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। লোকটি বসে বসেই বলল, Any problem? -Get out. লোকটি বসেই রইল। নির্বিকার। -I said get out. -আপনি কি সব রোগীদের সাথেই এভাবে ব্যবহার করেন, মি. ... কিছুক্ষণ সময় নিয়ে লোকটি কথা শেষ করল... মিরাজ? মিরাজ রাগে ফুস্ঁতে লাগল। Just... এবার কালো চশমা পরা লোকটিও উঠে দাঁড়াল। -Stop it!!! মিরাজ চমকে গেল। তার একটু আগের তেজ মিইয়ে যেতে লাগল। -বসুন!! কথাটায় জোর ছিল। আরও কি একটা যেন ছিল। মিরাজ হঠাৎই আবিষ্কার করল যে সে লোকটার কথামত বসে পড়েছে। ৬ -Sorry. আসলে প্রতিদিন এত রোগী দেখি যে মাথাটা সবসময় গরম হয়ে থাকে। যাক গে, আপনার সমস্যাটা বলুন। ...মিরাজ নিজেই বিশ্বাস করতে পারল না এই কথাগুলো তার মুখ দিয়ে বেরিয়েছে। -আমার কোন সমস্যা নেই। -তো কেন এসেছেন এখানে? লোকটা কিছুক্ষণ চুপ থাকল। যেন কি বলবে গুছিয়ে নিচ্ছে। -আমি আপনার কাছে কেন এসেছি শুনবেন? -বলুন। সেটাই তো এতক্ষণ ধরে জানতে চাচ্ছি। -আমি চাই আপনি এমন কিছু করুন যাতে আমি স্বপ্নটা প্রতিদিন দেখি। -কি? আমি...প্রতিদিন? -হ্যাঁ, প্রতিদিন। প্রতিরাতে ঘুমের মধ্যে। কি, পারবেন? -মানে...এখনও তো...হঠাৎ কথা খুঁজে না পেয়ে থেমে যান মিরাজ। -মানে পারবেন না। -মানে...এটা তো...কোন কথাই খুঁজে পান না তিনি। -অসম্ভব, না? -তা তো বটেই... -ঠিক এই শব্দটাই আমি আশঙ্কা করেছিলাম। অসম্ভব। ঠাণ্ডা মাথায় ভাবেন মিরাজ। লোকটা কি পাগল? নাকি সে মিথ্যাবাদী? নাকি দুটোই? একে তো তার স্বপ্ন দেখার ব্যাপারটা বিশ্বাসযোগ্য না, তার উপর আবার সে যে ধরণের আবদার নিয়ে এসেছে...নাহ, লোকটার মাথা ঠিক আছে তো? একটু থেমে লোকটা আবার বলে, আপনি তো জানেন আমার অনেক টাকা। আপনি যদি আমার কাজটা করতে পারেন তাহলে আমি... এবার মিরাজ বললেন, না মিস্টার, কিছু কিছু জিনিস টাকা দিয়েও কেনা যায় না। আপনি একটা অসম্ভব আবদার করেছেন। (মনে মনে বললেন, শালা পাগলের প্রলাপ!) আবার কিছুক্ষণ নীরবতা। -কিছুতেই কি সম্ভব না? এবার মিরাজ গুছিয়ে কিছু ভালো সাজেশন দেবার চেষ্টা করলেন...লোকটা যেভাবে ধরেছে..., আপনি এক কাজ করতে পারেন, প্রতিদিন ঘুমের আগে তার কথা ভাবতে পারেন... -সেটা কি আমি করে দেখিনি ভেবেছেন? -তাহলে তো আর পথ দেখিনা... আবার কিছুক্ষণ নীরবতা। এবার লোকটি হাল ছেড়ে দেবার ভঙ্গি করে বলল, ওকে, বুঝলাম আপনি পারবেন না। আগে কেউই পারে নি, আপনি কেন পারবেন? যাই হোক, আপনার কি কোন প্রশ্ন আছে? নাহলে আমি উঠতাম। চিন্তার ঝড় বয়ে যায় মিরাজের মস্তিষ্কে। এক মুহূর্তের জন্য লোকটাকে সুস্থ মনে হয় তার। কিন্তু পরমুহূর্তেই চিন্তাটা দূর করে দেন তিনি। এই শালা বদ্ধ পাগল। এর থাকার জায়গা পাগলাগারদ। কিন্তু তবুও লোকটার কথাগুলো ভেবে দেখেন তিনি। সে যা চেয়েছে...তা অসম্ভব। সে চেয়েছে ইচ্ছামত স্বপ্ন দেখতে, প্রতিরাতে একই স্বপ্ন দেখতে, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন বিজ্ঞানী স্বপ্ন মানুষ কেন দেখে সেটাই স্পষ্ট করে বলতে পারেন নি। স্বপ্ন কি সেটা নিয়েও মানুষ এখনও ধন্দের মধ্যে আছে। সে তুলনায় ইচ্ছামত স্বপ্ন দেখা? একদম ফাঁকা বুলি। এখন পর্যন্ত পুরো পাগলের প্রলাপ। আরে, লোকটা তো উঠে যাচ্ছে! কিন্তু কিছু কিছু প্রশ্ন এখনও ঘুরপাক খাচ্ছে অভিজ্ঞ মনোবিজ্ঞানীর মাথায়...দীর্ঘদিনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা বারবার তার কানে ফিসফিস করে বলছে, তুমি কিছু একটা মিস করছ...কিছু একটা তুমি বুঝতে পারছ না... -হ্যাঁ অবশ্যই...হঠাৎ বলে ওঠেন মনোবিজ্ঞানী, ঝট করে ছুড়ে দেন প্রশ্নটা, আপনার কোন প্রিয় নারী কি লঞ্চ দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল? লোকটা অন্য দিকে তাকিয়ে ছিল। প্রশ্নটা শুনেই ঝট করে মাথা ঘুরাল। এ কথা আপনার মনে হল কেন? -না মানে...বলুন না সত্যটা। মৃদু হাসলেন মিরাজ। উত্তর না দিয়ে উঠে দাঁড়াল লোকটা। উলটো ঘুরল। মনোবিজ্ঞানী বুঝতে পারলেন, একদম ঠিক জায়গায়ই আঘাত করেছেন তিনি। আনন্দে লাফিয়ে উঠতে ইচ্ছা হল তার। হাঁটতে শুরু করল লোকটা। পিছন থেকে ভেসে এল আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠের আওয়াজ, বলবেন না? চেয়ার আর দরজার মাঝামাঝি গিয়ে লোকটা আবার থমকে দাঁড়াল। তারপর একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার ঘটল, লোকটা খুলে ফেলল নিজের কালো চশমাটি। তারপর মনোবিজ্ঞানীর দিকে তাকাল সে। এরকম দৃষ্টির সাথে মিরাজ অপরিচিত। সম্ভবত সে দৃষ্টিতে অলৌকিক কিছু ছিল, যার ফলে মিরাজকে চোখ নামিয়ে নিতে হল। অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে রইল লোকটা। অনেকক্ষণ। তারপর খুব শান্ত স্বাভাবিক স্বরে বলল, হ্যাঁ। চোখ তুললেন মিরাজ। মুখে তার বিজয়ের হাসি। -জানতে পারি, কে সে? অনেকক্ষণ বিরতি নিয়ে লোকটা উত্তর করল, না, পারেন না। লোকটা আবার হাঁটা শুরু করল। ঐ অবস্থাতেই বলল, আমি তবে আসি, মি. মিরাজ। আপনার সাথে পরিচিত হয়ে খুশি হলাম। আপনি বুদ্ধিমান। লোকটা দরজার হাতল ধরার ঠিক আগমুহূর্তে মিরাজ তার সহজাত অনুমানশক্তির উপর ভরসা করে আরেকটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন... একটা শেষ প্রশ্ন করতে পারি? লোকটা জবাব না দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। হাতটা দরজার হাতলে। -আচ্ছা, সে কি প্রেগন্যান্ট ছিল? লোকটা ঐভাবেই দাঁড়িয়ে থাকল আরও অনেকক্ষণ। মনোবিজ্ঞানীর মনে হল সে হয়তো সঠিক উত্তরটি দেবে না। কিন্তু এবারও সম্ভবত ঢিলটা সঠিক জায়গায় লাগিয়েছেন বলেই মনে হল তার। তাই উত্তর পাবার উত্তেজনায় ছটফট করতে লাগলেন তিনি। অবশেষে ভারী কণ্ঠে উত্তর এল। মিরাজের মনে হল, এ কণ্ঠ এই জগতেরই নয়, এটা অন্য কোন জগত হতে অন্য কোন সময় হতে আসছে... না। ও অবিবাহিত ছিল। কে-ই বা ওকে বিয়ে করত? সত্যটা জানলে কেউ ওকে বিয়ে করত না। কেউ না। সত্যটা শুনবেন? তাহলে শুনুন। প্রেগন্যান্ট হওয়াও ওর পক্ষে সম্ভব ছিল না। ইন ফ্যাক্ট, ডাক্তার বলেছিল ও কোনদিন মা হতে পারবে না। ৭ সেদিন থেকে ত্রিশ বছর পর। বাসায় নিজের প্রিয় টেবিল চেয়ারে বসে চিন্তা করছিলেন মিরাজ। তার প্রিয় স্ত্রী মৃত হয়েছে আজ এগার বছর, কিন্তু মরার পর তিনি স্ত্রীকে স্বপ্নে দেখেছেন একবার। মাত্র একবার। তার যদি সত্যিই ইচ্ছামত স্বপ্ন দেখবার বা দেখাবার সামর্থ্য থাকত, তবে তিনি প্রতিদিন স্ত্রীকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন। কতভাবেই না চেষ্টা করেছেন তিনি। প্রতিরাতে ঘুমাবার আগে স্ত্রীকে স্মরণ করেছেন। কারণ তিনি জানতেন, ঘুমানোর আগে কোনকিছু নিয়ে তীব্র ভাবে চিন্তা করলে সেটা স্বপ্নে দেখার সম্ভাবনা থাকে। মাঝে মাঝে ঘুমের আগে স্ত্রীর ফটোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতেন তিনি। যদি ছবির মানুষটিকে স্বপ্নে দেখা যায়! মুহূর্তের জন্য হলেও! মাঝে মাঝে ঘুমের আগে স্ত্রীর সাথে কথা বলতেন তিনি। মনে মনে। অনেকক্ষণ। মনে মনে কথা বলে স্ত্রীর কাছ থেকে স্বপ্নে দেখা দেবার প্রতিশ্রুতি আদায় করতেন তিনি। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি যার রাখার কথা, সে রাখত না। প্রতিদিন যার দেখা দেবার কথা, সে কেন যেন পালিয়ে পালিয়ে বেড়াত। কখনই দেখা দিত না। মাঝে মাঝে মেজাজ খারাপ হয়ে যেত মিরাজের। চরম মেজাজ খারাপ। বাড়ির পাশের কুত্তাটিকেও তিনি মাসে একবার স্বপ্নে দেখেন, তাহলে স্ত্রীকে দেখতে পান না কেন? তার মানে কি এই যে কুত্তাটাকে নিয়ে তিনি স্ত্রীর চেয়ে বেশি ভাবেন? এই মেজাজ খারাপ হবার ব্যাপারটা কাউকে বলতেও পারতেন না তিনি। সবাই যে হাসাহাসি করবে! বলবে যে পাগলের কামড় খেয়ে খেয়ে নিজেও পাগল হয়ে গেছে শালা! নিজের কথা চিন্তা করে হঠাৎ অবাক হয়ে যান মিরাজ। কি আশ্চর্য ছেলেমানুষি এই বুড়ো বয়সেও খেলা করে তার মধ্যে! কিন্তু কি লাভ হল এসব করে? হল কিছু? তার স্ত্রী তো সেই ফ্রেমের ছবি হিসেবেই বিরাজ করছেন এখনও। একবারও তো এলেন না স্বপ্নে। একবারও তো দেখা দিয়ে বললেন না, ছেলেমেয়েদুটোকে তোমার হাতে রেখে পাড়ি দিলাম পরপারে, তা তাদের কিভাবে রেখেছ তুমি? মানুষ করেছ? একবারও তো স্বপ্নে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন না, এখন কে তোমার চুলে বিলি কেটে দেয়? সকালে ওষুধ খেতে মনে থাকে তো?... স্বপ্নচারিণী যে তিনি কেন হলেন না...বলা মুশকিল। এবার হঠাৎ ত্রিশ বছর আগের সেই আধপাগল মানুষটার কথা মনে পড়ে মিরাজের। হঠাৎ কাঁচের মত পরিষ্কার হয়ে কিছু স্মৃতি ফুটে ওঠে তার চোখের সামনে। মনে পড়ে যায় সব। আশ্চর্য, সেই অদ্ভুত লোকটা তো তা-ই চেয়েছিল যা তিনি এখন চাচ্ছেন! সে তো আবোলতাবোল কিছু চায় নি! অথচ সেদিন লোকটা চলে যাবার পর তিনি তার কথা মনে করে কি হাসিটাই না হেসেছিলেন! মনে মনে মানুষটার একটা পাগল ইমেজও তো তৈরি করেছিলেন! তার সেদিনকার কথা তো তিনি ময়লা ঝাড়ার মত করে উড়িয়ে দিয়েছিলেন...কে জানত সেই পাগলামিতে আজ তাকেও পেয়ে বসবে? হঠাৎ বুকটা মুচড়ে ওঠে তার। কাউকে পানি আনার জন্য ডাক দিতে গিয়েও থেমে যান। বাসায় তার সাথে কেউ থাকে না। ছেলেমেয়েরা বিদেশে, নিজেদের ক্যারিয়ার আর সংসার নিয়ে ব্যস্ত। হঠাৎ তার কিছু হয়ে গেলে কেউ জানতেও পারবে না। কেন যেন সেই লোকটার কথা অবিশ্বাস করতে আর মন সায় দেয় না তার। মনে হয়, লোকটা আসলে ঠিকই স্বপ্নটা দেখত। এবং স্বপ্নটা এত সুন্দর ছিল যে সে বারবার তা দেখতে চাইত। সত্যিই চাইত। সেজন্যেই সে সেদিন মনোবিজ্ঞানীর চেম্বারে এসেছিল। সে সেদিন কোন মিথ্যা বলে নি। মিরাজের আরও মনে হয়, একটা পাশবিক ইচ্ছা হয়, জীবনে যা অর্জন সবকিছুর বিনিময়ে পেতে ইচ্ছা করে একটাই জিনিস...যদি স্বপ্নে 'তাকে' দেখা এ জন্মে আর সম্ভব না-ই হয়ে থাকে, তবে সর্বশক্তিমান যেন মিরাজকেও 'তার' মত তুলে নেন, পরম মমতায় পৌঁছে দেন সেই অচিন দেশে, যেখানে থাকবে না কোন ভয়-ভীতি-শঙ্কা-উদ্বেগ, থাকবে না ক্লেদাক্ত ক্লান্ত জীবনের ছোবল, থাকবে না ফিরে আসার তাড়া, যেখানে হবে 'তার' সাথে দেখা, যেখানে তিনি আর তার 'সে' পরম ভালবাসায় বাস করবেন অনন্তকাল। অনেক বছর ধরে অসংখ্য মানুষের সমস্যার সমাধান করে এক সাগর ভালবাসায় সিক্ত হওয়া এককালের জনপ্রিয় ডাঃ মিরাজ আহমেদ স্পষ্ট অনুভব করলেন, ভিজে আসছে তার চোখজোড়া। -শোয়াইব মোহাম্মদ


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ অব্যাখ্যেয়

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now