বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
প্রথম পর্বের পর -
সঠিক সময়টা কখন হতে পারে, সেটা নির্ধারণ করার জন্য পুরো এক সপ্তাহ খালা-খালুকে ফলো করি আমি । সঠিক জায়গাটাও সেসময়েই বের করে নিই । নদীর উঁচু পাড় থেকে নিচে নামার সময় একটা ল্যাম্পপোস্টের পাশেই তাঁদেরকে খুন করবো । খুনটা হবে ঠাণ্ডা মাথার খুন, একই সাথে প্রমাণহীন । তাই প্রচুর সময় দেয়া লাগলো আমাকে এর পিছনে । শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে ।
চার ইঞ্চি বাঁট আর পুরো দশ ইঞ্চি উচ্চতার ছুরি কিনে নিই সস্তায় শহরে ফুটপাথের উপর থেকে, বাঁটটা খাঁজ কাটা হলেও ছুরিটা ছিল একেবারেই সাধারণ । দেখতে অনেকটা বাতিল মালের মতই লাগছিল । না, সাথে কোনো রশিদ দেয়নি ।
ছুরিটায় ধার দেয়ার পর থেকেই অবশ্য দারুণ দেখাচ্ছিল । ধার দেয়ানোর জন্যে কোনো দোকানে বা কোনো ফেরিওয়ালার কাছে যাইনি । বাসার পাশে প্রচুর পাথর । ছুরিতে কিভাবে ধার দিতে হয় ভালোমতোই জানা ছিল । তাই ভালোভাবে ঘষেমেজে, ধার দেয়ার পর ছুরিটা দেখে বেশ মুগ্ধ চোখেই তাকিয়ে ছিলাম । আঙ্গুল বোলানোর সাথে সাথেই কেটে যাওয়ায় মুগ্ধতা আরো বাড়ে ।
মাগরিবের আজানের পর পরই ইভাকে এখানকারই একজন কলেজের অধ্যাপকের কাছে পড়াতে নিয়ে যান ইভার বাবা-মা । অধ্যাপক লোকটি খালুর বন্ধু মানুষ । আর উনার বাড়িটাও আমাদের বাড়ির কাছেই । দোতলা বাড়ি । নিচতলায় উনার ছোট ভাই থাকেন, আর দোতলায় উনি আর উনার পরিবার । একটা ঘরে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ান । এসব আগেই জানা ছিল । সেই কয়দিনে আরো নিখুঁতভাবে মিলিয়ে নিই । বিশেষ করে সময়টা বেশী জরুরী ।
হিসেব করে দেখা গেল, ইভাকে নিয়ে ওর বাবা-মা এই ল্যাম্পপোস্টের জায়গাটা পার হতেন, পড়া শুরু হওয়ার পনের মিনিট আগে । আর ইভার পড়া শুরু হওয়ার মিনিট দশেক পর উনারা সেখান থেকে বের হয়ে বাসায় ফেরার পথে আস্তে আস্তে হেঁটে পার হতেন এই জায়গাটা । তাও প্রায় পাঁচ মিনিটের মত সময় লাগে তাঁদের আসতে । তাই আমি ধরেই রেখেছিলাম ইভাকে পৌঁছে দেয়ার সময় থেকে আধঘণ্টা পরই হবে সর্বোত্তম সময় । অর্থাৎ যখন শুধু তাঁরা দুজন অন্যমনস্কভাবে হাঁটতে হাঁটতে আসবেন, সে সময়টাতেই ।
অবশ্য প্রথমেই এই সিদ্ধান্তে আসিনি, একবার মনে হয়েছে ইভাকে যখন তারা নিয়ে আসতে যাবেন, তখনও ছুরি মারা যেতে পারে । কিন্তু সে সময়টাতে সবসময় ইভার বাবা-মা যান না, কখনো কখনো হিমুও যায় । তাই আমি সে ঝুঁকি নিতে চাইনি ।
এরপর ছিল দিন নির্ধারণ করে সেই সন্ধ্যার অপেক্ষায় থাকা ।
হাত দিয়ে উঁচু ঢিবিটার একটা অংশে নরম মাটি সরাতেই হাতে এসে লাগে সেটা । সেই ছুরিটা । হাতে নেয়ার পরপরই যেন গায়ের ভেতরে রক্তের উন্মত্ততা বেড়ে যায় কয়েকগুণে । মাথার খুব গভীরে গিয়েও আঘাত আনে । মুহূর্তের মধ্যেই অসুস্থ বোধ করি... মাথাব্যথা শুরু হয়ে যায়...দ্রুত হাতে ছুরিটা আবার পুঁতে রাখি । কেমন যেন শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, সেদিনের মত...ঠিক সেদিনের মত...
দিনটা ছিল সোমবার । ততদিনে মাঘ মাস । শীতের আচড়ে দগ্ধ সবাই । গায়ে চাদর জড়িয়ে হাতের মুঠোয় ছুরির বাঁটটা চেপে ধরে ধীরে সুস্থে হেঁটে দাঁড়াই সেই ল্যাম্পপোস্টটার কাছেই এক গাছের আড়ালে । মশার কামড় খেতে খেতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠার আগেই আসলো সিনোরিটা...সাথে ওর বাবা,মা । এতদিন ধরে যাঁদেরকে খালা-খালু সম্বোধন করে এসেছি, আর নয় । ভুলটা হয়তো আমারই ছিল তাঁদের সব জানিয়ে দেয়া... কিন্তু কিছু করার নেই, এরজন্যে ওদেরকে মরতেই হবে... মরতেই হবে...আর সেটা আজ রাতেই...
তারা জায়গাটা পার হয়ে যাবার পরপরই ল্যাম্পপোস্টটার সামনে গিয়ে হাতঘড়িটার দিকে তাকাই । ছয়টা চল্লিশ । পনের মিনিটেরও বেশী আগে...যাই হোক । এ রাস্তা দিয়েই তো ফিরবেন তাঁরা । হাত নামিয়ে রাখতে গিয়েই ভ্রু কুঁচকে উঠে আমার । ছায়া...আমার...আমার সামনেই পরছে । তারমানে স্ট্যাব করতে গেলে আমার ছায়াও ওদের সামনে পড়ার সম্ভাবনা আছে । তখন যদি ওরা সরে যায় বা আমাকে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে, তখন! তখন আমও যাবে,ছালাও যাবে । না...কিছু একটা করা দরকার... এই ব্যাপারটা আমার প্ল্যানে ছিল না দেখে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছিল । কিন্তু সময় কম, মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে । যদি এই দিকটায় অর্থাৎ ল্যাম্পপোস্টটার ডানদিকটায় না থেকে বামদিকে সরে যাই আর তারপর পেছন থেকে ছুরি মারি, আমার ছায়া তখন আমার পিছনে পরবে...কিন্তু সমস্যা হল, তখন সামান্য চিৎকারেও পাশের মানুষজন এসে যেতে পারে । ঐদিকটায় এই সমস্যা নেই... কিন্তু আলো...ছায়া ?
উপরে বাল্বের দিকে তাকাই । ওটাকে ফাটাতে হবে । তাহলেই সমস্যা মিটে যাবে । এ রাস্তায় এই সময়ে মানুষজন একেবারেই আসে না । আরো ভালো করে বললে, হিমুদের পরিবারের লোকজন বাদে আর কেউ এই রাস্তা মাড়ায় না । গত বেশ কয়েকদিনে সেটা ভালোমতো জানা হয়ে গেছে আমার । আর তাছাড়া তাঁদের দুজনের উচ্চতাটাও মনে আছে আমার । ভুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই । তাছাড়া আরেকটা ব্যাপার এই সিদ্ধান্তটা নিতে আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল, শীতকাল, অন্ধকারে কুয়াশায় মিশে যাওয়া সহজ হবে । খুব ঠাণ্ডা মাথায় থাকতে হবে, বারবার বোঝাচ্ছিলাম নিজেকে । কোনোভাবেই দৌড়ে পালানো যাবে না । চাদর থেকে নিজেকে উন্মুক্ত করে হাতের ছোরাটার দিকে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিলাম । গত কয়েকটা-দিন এটা বেশ বন্ধুর মত সঙ্গ দিয়েছে আমাকে, আজই তার শেষদিন ।
ছুরিটা নিচে রেখে, ছোটখাটো একটা পাথর ছুঁড়ে বাল্বটা ফাটিয়ে দিতেই চারপাশ ঘন অন্ধকারে ডুবে যায় একদম । বাল্বটা ভেঙ্গে যাওয়ার পর আবছা আলোয় চিকচিক করতে থাকা কাঁচের টুকরোগুলো সরিয়ে ফেলে দেই পাশের ঝোপে । আজ এই জায়গাটায় কোনো ময়লা নেই, শিশিরে ভিজে থাকা পাতা নেই, নেই কোনো মরা কাঠি, ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে রেখেছি বিকালে...আমি আছি খালি পায়ে...যাতে পেছন থেকে আসার সময় একটুও শব্দ না পায় তাঁরা । এটাও আমার পরিকল্পনার অংশ । বাড়তি সতর্কতা ।
সব ঠিকঠাক । আবার হাতঘড়ির দিকে তাকাই । ব্যর্থ চেষ্টা, অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না । বেশ কিছুক্ষণ চোখ রাখার পর সেই অন্ধকারে চোখ সয়ে আসার পর সময় দেখতে পাই । সাতটা দশ । আর বেশীক্ষণ নেই । এসে পড়বেন তাঁরা যেকোনো সময় । সুবিধামত একটা ঝোপের মধ্যে বসে ছোরাটায় হাত বুলিয়ে পরম তৃপ্তিতে আর একই সাথে চরম উত্তেজনায় টগবগ করতে থাকি ।
বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি । দুটো ছায়ামূর্তির অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছে কয়েক গজ দূরেই । আসছে ... ওরা আসছে । আর কিছুক্ষণ, আর কিছু সময় মাত্র...
একদম কাছে এখন । এইতো, ফুটখানেক দূরত্ব । ঠিক এই মুহূর্তে সব যেন এলোমেলো হয়ে গেল । গলায় কি যেন একটা আটকে গিয়ে ভীষণ কাশি পাচ্ছিল, মাথার মধ্যে যেন মল্লযুদ্ধ, নিউরনগুলোর পরস্পর থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাবার পাঁয়তারা ।
কিন্তু আমি শান্ত থাকলাম । নিজের স্থিরতার কথা চিন্তা করে এখন অনেক অবাক হয়ে যাই । কীভাবে পেরেছিলাম সে রাতে ?
আমি বামহাতি হওয়ায় পেছন থেকে ছুরি মারার একটা বড় সুবিধা পেয়েছিলাম, এইই যে, তাতে শরীরের বাম দিকে ছুরিটা বিঁধবে । বুকের বাম দিকটায় ছুরি মারলে সেটা হৃদপিণ্ডে গিয়ে লাগবে । ফলাফল, কয়েক সেকেন্ডেই মৃত্যু । ঠিক ছুরি মারার আগ মুহূর্তে আবার আরেক সমস্যা... হঠাৎ করেই মনে হল কেন আমি এই খুনটা করতে যাচ্ছি ? আদতেই কি এর কোনো দরকার আছে ?? ফ্ল্যাশব্যাকের মত করে খালা-খালুর সাথে কাটানো অনেক সুসময়ের স্মৃতি মস্তিষ্ক আমাকে দেখাতে লাগল । ঠিক তখনই ল্যাম্পপোস্টটার নিষ্প্রভ অবস্থা দেখে অভিযোগের কণ্ঠস্বর শুনে বুঝতে পারি হিমু-ইভার মা’র গলা...যাকে খালা ডাকতাম এতদিন । সকল দ্বিধা ভুলে প্রবল আক্রোশে এবারে তাদের গায়ে থাকা শাল ছিন্ন করে আমূল বিদ্ধ করে দেই ছোরাটা । প্রথমে একজন, তারপর আরেকজন । বহুবার কাদার তালে ছুরি ঢুকিয়ে অভ্যস্ত হাত কোনোরকম বিশ্বাসঘাতকতা করে নি আমার সাথে ।
আর তারপর পূর্ব-পরিকল্পনার কথা ভুলে দৌড়... দৌড়...দৌড় ... দৌড়ে আসা এই উঁচু ঢিবিটাতে । ছুরি দিয়েই ছোট একটা গর্ত খুঁড়ে তাতে সেটা রেখে মাটিচাপা দিয়ে দেই । অথচ আমি ভেবেছিলাম ছুরিটা নদীতে ফেলে দিবো, কিন্তু সেদিন রাতে আমি তা কেন করিনি, বুঝতে পারিনা ।
সেই থেকে আজ অবধি মনে মনে দৌড়ে যাচ্ছি আমি । এই এখনো কেন যেন মনে হচ্ছে ঢিবিটা থেকে ছুরিটা উঠে এসে আমার বুকের উপর চেপে বসবে । দৌড়ানো শুরু করি আমি । দৌড়োতে দৌড়োতেই দূর থেকে দেখি ইভাকে ।
ইভা...আমার সিনোরিটা...
থেমে দাঁড়াই, ওকে ভালোমতো দেখার জন্য । খুব বেশী রোগাটে, শ্যামবর্ণের মেয়েটা, বেশ লম্বা, প্রায় ওর বাবার মতই । ওর চোখে রাজ্যের বিষণ্ণতা । কিন্তু আমি জানি ওর চোখেমুখে একই সাথে থাকে নির্মল বিশুদ্ধতা, পবিত্রতা... কাছে গেলেই মনে হয় যেন পৃথিবীটা খুব বেশী শান্তির, খুব বেশী আনন্দের, খুব বেশী নিশ্চিন্ত থাকার ।
কাছে যেতে যেতেই আবার দৌড়ে যাই, ওকে তাড়াতাড়ি দেখার জন্য । কিন্তু কাছে গিয়ে আর পাই না ওকে । এই একটু আগেই দেখেছিলাম, আর এখন যেন হঠাৎ করেই হারিয়ে গেল । আমার কান্না পেয়ে যায়...বড় হয়েছি, কিন্তু অনুভূতির তীব্রতা কমেনি একটুও । ইভা কেন চলে যায় আমাকে দেখলেই ? ওকে কেন আজও বলতে পারি না, আমি ওকে এতো এতোটা ভালোবাসি ?? ও কি কিছুই টের পায় না ???
সন্ধ্যা হয়ে গেছে । মা হয়তো বাড়ি ফিরে গেছেন এরমধ্যেই । ক্লান্ত কিন্তু যতটা সম্ভব দ্রুত পায়ে হেঁটে যাই হিমুদের বাড়িটার দিকে । বইটা ফেরত দিতে হবে । বইটার নাম ‘ইছামতী’। একটা নদীর নাম । বেশ সুন্দর নাম ।
দরজায় নক করতেই তপু বেরিয়ে এলো । অবাক হওয়ার পালা ! ও এখানে কি করছে ! সে কথা জিজ্ঞেস করতেই তপু বলে, “তো আর কাকে আশা করছিলি ?”
“হিমু কই ?”
“হিমু ? হিমু তো এখানে থাকে না!”
“এখানে থাকে না মানে! এই যে এই বইটা তো আজ সকালেই ওর কাছ থেকে...এই বাসা থেকেই নিয়েছিলাম ।” হাতে থাকা বইটা দেখিয়ে বলি আমি ।
“বইটা তুই এখান থেকেই নিয়েছিলি ঠিক । তবে হিমুর কাছ থেকে নয়, আমার কাছ থেকে । তুই ঘরে আয়... বোস । কথা আছে ।”
প্রায় বিস্ফোরিত চোখেই তপুকে অনুসরণ করি আমি । মনে হচ্ছে যেন কেউ আমাকে কালাহারি মরুভূমিতে এনে ছেড়ে দিয়েছে, সাথে কোনো কম্পাস নেই ।
চিরপরিচিত বসার ঘরের সোফাটায় বসার পরপরই একটা ট্যাবলেট আর এক গ্লাস পানি আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে তপু বলল, “খেয়ে নে । তারপর বলছি ।”
কিছু না বুঝেই ট্যাবলেটটা গিলে নিই ।
“শোন জয়, সবার জীবনেই কোনো না কোনো দুর্ঘটনা আসে । সেইসব দুর্ঘটনার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয় । বাঁচার জন্য সংগ্রাম করতে হয় । অন্তত চেষ্টা করতে হয় । বুঝতে পারছিস আমি কি বলতে চাইছি ?”
দুর্ঘটনা ? হিমুর মা-বাবাকে খুনের কথাটা বলছে নাকি ? আমি ঢোক গিলে নিই সন্তর্পণে । কিন্তু তাদের সাথে তপুর এখানে থাকার কি সম্পর্ক !
কিছু না বুঝেই উপরে-নিচে মাথা নাড়াই আমি । হাতের বইটা টেবিলে রেখে উঠে বেরিয়ে যাই ও বাসা থেকে ।
তারপর বাড়ি ফিরি । বাইরে থেকে তালা দেয়া । তারমানে, মা এখনো বাড়ি ফিরেননি ।
--------------------------------------------------------------------------------------------
(গল্পের বাকি অংশ নাম পুরুষে লেখা হয়েছে)
৬ই জানুয়ারি, ২০১১
সকালের চা’টাও খেয়ে আসতে পারেননি বলে মন মেজাজ বেশ খারাপ হয়ে আছে শফিক সাহেবের । ঢাকায় বড় অফিসারের সাথে খারাপ ব্যবহারের ফলে এতটা বাজে অবস্থায় পরতে হবে, তা কে কবে ভেবেছিল! এই মফস্বল এলাকায় চুরি-ডাকাতি ছাড়া বড় ধরণের কিছু ঘটে না একেবারেই । বসে বসে শুধু চর্বিই বাড়ছিল শরীরে । সে তুলনায় এটা বেশ ভালো কাজই বলা যায় । দু,দুটো খুন একই জায়গায় ।
চায়ের কষ্ট ভুলে বামহাতে সিগারেট ধরিয়ে হাঁটু মুড়ে বসলেন এই অঞ্চলের সি আই ডি স্পেশাল এজেন্ট । গতরাতে খুন হওয়া লাশের থকথকে রক্তগুলোর স্তুপে ভালোমতো চোখ রেখেও কিছু পেলেন না । কাছাকাছি কোনো পায়ের ছাপ নেই । লাশগুলো সরানোর সময় এসবের কথা কেউ ভেবেছিল কিনা তা-ই বা কে জানে । “সবসময়ের অলস, অসতর্ক, মূর্খের দল”—ভাবলেন তিনি ।
উঠে দাঁড়িয়ে আশেপাশে তাকালেন কিছুক্ষণ । জায়গাটা যে বেশ পরিষ্কার এবং সেটা যথেষ্ট অস্বাভাবিক, তাও চোখে পড়লো এবারে । গতকাল সন্ধ্যা থেকে শেষ রাত পর্যন্ত ভালোমতোই শিশির পরেছে, আর সেটা খুনির জন্যে বেশ সুবিধাও করে দিয়েছে । হঠাৎ করেই শফিক সাহেবের মনে হওয়া শুরু করলো, এটা কোনো পেশাদার খুনির কাজ কিনা ।
ভ্রু কুঁচকে ল্যাম্পপোস্টটার দিকে আরো খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে উপরে তাকাতেই চোখে পড়ল ভেঙ্গে থাকা বাল্বের সাথে লেগে আছে কয়েক টুকরো কাঁচ । এটা একটা ভালো সূত্র হতে পারে ।
জুতোর ছাপ পেলে ভালো হত, আশেপাশে নরম মাটি আছে বেশ, একটা না একটা ছাপ তো পাওয়া যাবেই খুনির— এসব ভেবে শফিক সাহেব আরো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন সব । বাল্বের কথা ভুললেন না, এটা কবে থেকে এরকম অকেজো হয়ে আছে, সেটা এখানকার মানুষজনকে জিজ্ঞেস করতে হবে ।
মাথা নিচু করে উঁচু পাড়ের দিকে আস্তে আস্তে যাওয়ার সময় হঠাৎই পড়লো এতক্ষণ ধরে যা খুঁজছিলেন । পায়ের ছাপ! কিন্তু সমস্যা হল, এটা সত্যি সত্যিই পায়ের ছাপ, জুতোর নয় । খালি পায়ে একটা লোক এখান দিয়ে কেন যাবে! পায়ের দিক অনুসরণ করে আরেকটু এগোতেই আর সন্দেহ রইলোনা এটা সেই খুনিরই পায়ের ছাপ । শিশিরও ধুয়ে নিতে পারেনি ছাপগুলো, বুঝাই যায় বেশ চাপ দিয়ে হাঁটা হয়েছিল । পায়ের ছাপের সামনের দিকের অংশগুলো বেশী গভীর আর পেছনের দিকের অংশগুলো অপেক্ষাকৃত কম গভীর । হুমম...হাঁটা নয় তাহলে, খুনি এই পথ দিয়ে দৌড়ে পালিয়েছিল ।
হাঁকডাকের মাধ্যমে সাদা পোশাকের কয়েকজন পুলিশকে ডেকে কাজে লাগিয়ে দিলেন তিনি, এই রাস্তা ধরে এরকম পায়ের ছাপ আরো পাওয়া যায় কিনা সেটা ভালোমতো দেখতে । খুনি একেবারেই আনাড়ি, পায়ের ছাপেই অনেকদূর বোঝা যাবে । তিনি নিজে গেলেন আশেপাশের বাড়িগুলোর মানুষজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে ।
কিন্তু ...
কিন্তু খুন করার মোটিভটা এখনো বোঝা গেল না । মোবাইল ফোন বের করে লাশ দুটোর ছবি যতটা সম্ভব ভালোমতো দেখার চেষ্টা করলেন তিনি । এরা এখানে একটা ডিএসএলআর ক্যামেরা তো দূরের কথা, কোনো ল্যাপটপও জোগাড় করতে পারেনি । সব ঘুষ খেতেই ব্যস্ত ।
অধীনস্থ এক কর্মকর্তাকে ফোন দেন তিনি, “গতকাল রাতে খুনটা হয়েছিল । হ্যাঁ...নদীর পাড়ের কাছে...দু’জন...হুমম ইয়েস, বোথ অফ দেম আর ফিমেল । পাঠিয়ে দিন তো ওদের পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা ।...হুমম...ওকে । আচ্ছা আমি দেখছি ।”
কলটা কেটে আবার ছবিটার দিকে তাকান তিনি । এই দুজনের শত্রু কে হতে পারে ???
--------------------------------------------------------------------------------------------
১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০১৩
দরজার কড়া নাড়া শুনে মা এসেছে ভেবে দরজা খুলে তপুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জয় ।
“তোর হাতে কি এগুলো ?”
“আগে ভেতরে আসতে দে । দেখবিই তো”
তপু জয়ের পড়ার টেবিলের উপরেই খাবার প্লেট রেখে টিফিন ক্যারিয়ার থেকে একে একে ভাত,তরকারী রেখে সাজায় । জয় বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “এগুলো কি?”
“এগুলো খাবার । তোর জন্য ।”
জয় আবার কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই তপু বলে উঠলো, “তোর মা, মানে আন্টি স্কুলের একটা ট্রেনিং এর কাজে সিলেট গিয়েছেন । ফিরতে কয়েকদিন লাগবে । তুই ছিলি না তখন, তাই আমাকে বলে গিয়েছেন তোকে খাবার দিতে ।”
“ওহ...আচ্ছা” এই সংক্ষিপ্ত একটা মন্তব্যের মাধ্যমে সব বুঝে ফেলার ভঙ্গি করে হাত ধুয়ে খেতে বসে যায় জয় । ওর আসলেই বেশ খিধে পেয়েছে ।
জয়কে কোনোদিকে না তাকিয়ে একমনে খেতে দেখে নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তপু । ওদের বন্ধুদের মধ্যে জয় সবসময়ই খুব বেশী সরল প্রকৃতির । স্কুল,কলেজের স্যার ম্যাডামরা সবাই ওর সম্পর্কে বলতেন, “জয়ের মেধা আছে, সাথে কিছু অস্বাভাবিকতাও আছে । একদিন ও নিশ্চয়ই ওর মেধা কাজে লাগাতে পারবে ।”
সেই সামান্য অস্বাভাবিকতার জয়কে এরকম অদ্ভুত অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে তা কে কবে ভেবেছিল!
প্রায় বছর তিনেক আগের এক রাতে তপু,জয়েরই বন্ধু হিমুর বাবা আর মা, হিমুর ছোট বোন ইভাকে এক অধ্যাপকের বাসায় পড়াতে দিয়ে গিয়েছিলেন শহরে কেনাকাটার কাজে । ভেবেছিলেন শহর থেকে ফেরার পথে ইভাকে নিয়ে ফিরবেন । কিন্তু সেদিন সেই অধ্যাপকের ছোট ছেলে হঠাৎই খুব বেশী অসুস্থ হয়ে পড়ায় সব ছাত্র-ছাত্রীদের ছুটি দিয়ে দিয়েছিলেন পড়া শুরুর মিনিট দশেকের মধ্যেই । অন্ধকারে একা একা বাড়ি ফেরার সাহস পায়নি ইভা । কাছেই জয়দের বাড়ি হওয়ায় ইভা সে বাড়িতে গিয়ে জয়ের মার কাছে আবদার জানিয়েছিল ওকে বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার । জয়ের মা সে আবদার রক্ষা করার জন্য বেরিয়েছিলেন ইভার সাথে । আর তার কিছুক্ষণ পরেই, হিমুদের বাড়িতে যাওয়ার রাস্তায় খুন হয় ওরা দুজন । আর খুনি যেন মিলিয়ে যায় হাওয়ায় । তার কোনো হদিস আর পাওয়া যায়নি ।
দুটো মানুষ...খুন...মৃত্যু...
অথচ তার প্রভাব কতদূর বিস্তৃত! ইভার মা সেই শোকে আজ পর্যন্ত আর কথা বলতে পারেন না । ইভার বাবাও মেয়ের মৃত্যুর জন্য বারবার সেই রাতে মেয়ের কাছে না থাকাকে নিজের দোষ হিসেবে ধরে আহাজারি করতে করতে এখন রয়েছেন জীবন্মৃতের মত অবস্থায়... তারা চলে গেছেন গ্রামে । ওদের এই বাড়িটা তপুর বাবার কাছে বিক্রি করে হিমুও হারিয়ে গেছে কোথায় যেন, ওরও আর খোঁজ পাওয়া যায়নি । হিমুদের ঐ বাড়িটার প্রায় সব আসবাবপত্র, লাইব্রেরী থেকে শুরু করে জানালার পর্দা পর্যন্ত সবই তপুদের কাছে বিক্রি করে দিলেও ইভার ঘরের সবকিছু নিয়ে গেছে ইভার বাবা-মা । এ বাড়িতে এখন শুধু তপুই থাকে । কোনোকিছুই পালটায় নি সে । এমনকি ঝুল বারান্দার মাকড়সার জালগুলোও সরায় না । বাড়িটার অবস্থাও ইভার বাবার মত, জীবন্মৃত ।
জয়ের তৃপ্তি সহকারে খাওয়ার দিকে তাকিয়ে তপুর মনে পড়ল, সিআইডির এক অফিসার সে রাতের খুনের ব্যাপারে সন্দেহ করেছিল কিনা এই জয়কে! কিন্তু নিজের মাকে কেন খুন করবে, সে ব্যাপারে কোনোরকম ব্যাখ্যা দিতে না পেরে ক্ষান্ত দিয়েছিলেন অফিসারটি । সেই রাতের মৃত্যু-রহস্যের আজও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি, কেসটা থেকে গেছে অসমাপ্ত । আর এদিকে জয়কে জানানো ওর মায়ের মৃত্যুসংবাদ একেবারেই বিশ্বাস করছে না ও । কোনো একটা অদ্ভুত কারণে তার সব স্মৃতি,চিন্তাভাবনা একটা সময়ে এসে থেমে গেছে । মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা জয়ের এই অবস্থার জন্য স্থায়ী কোনো সমাধানের পথ দেখাতে পারেন নি । নির্দিষ্ট কিছু ঔষধ দিনের পর দিন খেয়ে গেলেও কোনো উন্নতি হয়নি তার ।
জয় এখনো সন্ধ্যা হলেই পথের দিকে তাকিয়ে থাকে ওর মা’র বাড়িতে ফেরার অপেক্ষায় । অথচ, দুই বছর নয় মাস চৌদ্দ দিন পার হয়েছে, জয়ের প্রতীক্ষা আজও শেষ হয়নি ...
------------------------------সমাপ্ত-----------------------------
- সাকিব মাহমুদ
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now