বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শরৎ এর আকাশটা আমার খুব বেশী প্রিয় । আর নদী-পাড়ে বসে ওপাড়ের কাশবনটা দেখতেও বেশ ভালো লাগে । তার সাথে মন খারাপ করা একটা অনুভূতির মিশ্রণ । মন খারাপ ভাবটা এমনি এমনিতে না আসলে জোর করে নিজের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়া যেতে পারে । আজ আমার মন এমনিতেই খানিকটা বিষণ্ণ । কারণটা হয়তো খুব ছোট । বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘ইছামতী’ বইটা পড়ছিলাম । শেষের দিকে কিছু পৃষ্ঠা নেই বইটার । পুরনো,সেলাই-হীন,ক্ষয়ে যাওয়া বই । পৃষ্ঠাগুলো ছিঁড়ে হারিয়ে গেছে হয়তো কোথাও । হিমুকে জিজ্ঞেস করতে হবে উপন্যাসটার শেষের দিকে কি ঘটেছিল । তবে সেটা পরের কাজ । আমি এখন নাহয় সর্বোন্দ্রীয় দিয়ে অনুভব করি এই বিকেল বেলা । নদী-পাড়ের প্রকৃতি, সবুজ ঘাস, নাম না জানা পাখিগুলোর ডাক, খেয়াঘাটে লাগিয়ে রাখা নৌকার প্রাচীন মাঝিটির মুখে তামাক টানার গুড়গুড় শব্দ; লোকটাকে মনে হচ্ছে জাদুঘরে লটকে রাখা কোনো চিত্রকরের হাতে আঁকা ছবি থেকে উঠিয়ে আনা হয়েছে ।
আমি যে জায়গাটাতে আধশোয়া হয়ে আছি, এখানে খুব প্রয়োজন না পড়লে কেউ আসে না । চারদিকে ঝোপঝাড়, পুরু ঘাস । পোকামাকড়ের অভয়ারণ্যও বটে, সে কারণে পুরোপুরি শুয়ে পরতে পারছি না । আমার পেছন দিকে বাঁশের ঝাড় রয়েছে একটা । মাটি থেকে কয়েক ফুট উপরে ওগুলোর গোঁড়া । নিচের মাটি সরে গেছে, আমার জন্য সুবিধা করে দিয়েছে । হঠাৎ বৃষ্টি হলে ওখানটায়, ঐ প্রাকৃতিক গর্তের মাঝে আশ্রয় নিতে পারবো, কাদায় জামাকাপড় নোংরা হবারও উপায় নেই । আকাশ অবশ্য বেশ পরিষ্কার । শেষ বিকেলের রবি দিনের সর্বশেষ রৌদ্র-প্রতাপ দেখিয়ে নিচ্ছে । চারপাশে ঘন সবুজ প্রকৃতি । চোখে নেশা লাগিয়ে দেয় যেন । দিনের পর দিন দেখেই আসছি, তবু পুরনো হয়ে যায় নি জায়গাটা । হিমুরা শহর থেকে এসে বাড়ি বানিয়েছিল এই নদী-পাড়ে । কতো হাসিখুশি একটা পরিবার, কত আনন্দে মাতিয়ে রাখতো চারপাশ! আর প্রতিদিন নতুন করে মুগ্ধ হতো এই বিপুল সবুজ দেখে । অথচ ওরা এখন আর এখানে আসে না । জায়গাটা পুরনো হয়ে গেছে তাদের কাছে । হুট করে যে ভালোবাসা তীব্র হয়ে যায়, তা মিলিয়ে যেতেও সময় লাগে না বেশী । অথচ আমি এখনো এই নদী-পাড়, গাছপালা, ঝোপঝাড় সবকিছু আগের মত করেই ভালোবাসি । আমি জানি, আমি ভালোবাসতে জানি...
প্রৌঢ় সূর্যটার দিকে চোখ রাখি বাঁশঝাড়টার মাঝ দিয়ে । সে দিক অনুসরণ করতে গিয়ে চোখ পড়ল একটা বাড়ির ছাদের উপর । ঐ বাড়িটাও খুব পরিচিত । কত দিন গল্পের বই পড়েছি ঐ ছাদের চিলেকোঠায় শুয়ে, এমনই কোনো শরতের রাতে টেলিস্কোপে দেখেছি কালপুরুষ, সপ্তর্ষি... শুনতাম গ্রীক মিথলজিতে রূপান্তরের গল্প, যে, প্রাচীন গ্রীকরা বিশ্বাস করতো এই কালপুরুষ আসলে দেবী আর্টেমিসের ছয় সখী আর এক বন্ধু । এরকম নানা গল্প-কথা,দর্শন,বিজ্ঞান,ইতিহাস, রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা, কবিতা আবৃত্তি, কখনো কোরাসে গাইতাম গান । বাড়িটা হিমুদের । বহুদিন যাওয়া হয় না সে ছাদে । অযত্ন অবহেলায় শ্যাওলা জমে গেছে সে ছাদের রেলিং এ । এতদূর থেকেও বেশ বোঝা যাচ্ছে । মনটাই খারাপ হয়ে গেল...এবারে খুব বেশী ।
আধশোয়া থেকে উঠে দাঁড়াই । পাঞ্জাবীর হাতায় উঠে আসা গুবড়ে পোকাটায় সজোরে টোকা দিয়ে দূরে ফেলে দিই । দাঁড়ানোয় এবারে বেশ খানিকটা দূরে নদীর মাঝখানে বালু-তোলা স্টিমারটা দেখা গেল । সে স্টিমারটার কর্মচারীদের মধ্যেও নেই কোনো প্রাণ-চাঞ্চল্য । সৃষ্টির আদি-লগ্ন থেকেই যেন তারা একাজ করে আসছে । প্রত্যেককেই ক্লান্ত দেখায়, মুখের ভাবেও নেই কোনো বিকার । সবাই একসাথে থেকেও যেন কিছুই নেই । ওরা সবাই নিঃসঙ্গ, ওরা সবাই ক্লান্ত । ঠিক যেন আমারই মত ।
একেবারে পাড়ে বসে নিচে পা ঝুলিয়ে দিলাম এবার । কোনো আনন্দের গান গাইতে ইচ্ছা করছে । অথবা কবিতা...নাহয় নিতান্ত একটা ছড়াই ? কিন্তু মনে পড়ছে না কিছুই । নিজের উপর মেজাজ খারাপ হচ্ছে খুব । হাতের কাছে কিছু ঢিল কুঁড়িয়ে নিয়ে ছুঁড়ে মারলাম নদীতে । বৃষ্টির ফোঁটার মত শব্দ করে ডুবে গেল সেগুলো । আমার কানে লেগে থাকল কেবল শব্দটা । ঝর,ঝর,ঝর একটা শব্দ । মাথার খুব ভেতরে গিয়ে যেন বাজে, শুনতে ভালো লাগে । তখন আমার মনে পড়ল ছোটবেলার খেলাটার কথা । যতটা সম্ভব নদীর পানির সমান্তরাল করে ঢিল ছুঁড়ে মারা । ঢিলটা তখন একবারেই ডুবে না গিয়ে পানি ছুঁয়ে ছুঁয়ে উপরে উঠে আসবে । এরকম কয়েকবার করার পর একসময় ডুবে যাবে । কিশোর বয়সে এ খেলাটা খেলতাম আমি,হিমু আর হিমুর বাবা ।
হিমু । আমার বন্ধু । আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ।
হিমুর বাবাকে সবসময় নিজের বাবার মতই মেনে এসেছি । আর হিমুর মা, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মায়াবতী সে মা ।
আমার বাবা মারা গিয়েছিলেন লেদকাটার মেশিনে চাপা পরে । আমি তখন খুব ছোট, বেশ মনে পড়ে দৃশ্যটা । বাবার পেটের নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে এসেছিল, আর শরীরটা যেন কয়েক দস্তা শিরিষ কাগজের মত হয়ে গিয়েছিল, উপরে রক্তিম তরলের প্রলেপ । কারখানার লোকজন মা’কে লাশটা দেখায়নি, আমি লুকিয়ে গিয়ে দেখে ফেলেছিলাম ।
আমার মা । হয়তো দুনিয়ার সবচেয়ে নিকৃষ্টতম মা । মা’কে নিয়ে লেখা কত গল্প, কত গান শুনি! অথচ আমার মা’কে সবসময় আমার কাছে বিভীষিকার মত লাগতো । মা আমাকে কখনো খাইয়ে দিয়েছেন কিনা মনে পড়ে না, কখনো মাথায় হাত রেখে গায়ের জ্বর মেপেছেন কিনা মনে পড়ে না, মনে পড়ে না শেষ কবে আমার সাথে একটুও ভালো করে কথা বলেছেন । মাকে আমার একদম ভাল্লাগে না । হিমুর মা’র মত যদি আমার মা হতেন!
খেয়াঘাটের মাঝি উঠে দাঁড়িয়েছে । কেউ এসেছে নদী পেরোতে । আজকাল কেউ সহজে নৌকায় নদী পেরোতে আসে না । কাছেই খুব সুন্দর একটা ব্রীজ বানানো হয়েছে মাস-খানেক আগে ।
মাথা উঁচু করে তাকিয়ে দেখি দুজন কমবয়সী ছেলে । শেষ বিকালে ছোটখাটো এডভেঞ্চারে এসেছে হয়তো । স্বাভাবিক, আমরাও আসতাম । আমি,হিমু,পিয়াল,তপু । হিমুকে অদ্ভুত লাগতো তখন । নানারকম দেশের ইতিহাস, নানা ভাষার সাহিত্য,মাথামুণ্ডু-হীন দর্শন নিয়ে কথা বলতো । কিন্তু তবুও বাড়ি ফেরার পর হিমুর ওসব কথাবার্তা মাথায় ঢুকে বসে থাকতো, ভাবাতো খুব ।
মা চাকরী নিয়েছিলেন কাছেই, একটা প্রাইমারী স্কুলে । স্কুল শেষে দুটো বাড়িতে পড়াতে যেতেন, ফিরতে ফিরতে সূর্য লম্বা ডুব দিত নদীতে । আর এসে ধমকাতেন আমাকে, কখনো মারতেনও । এখনো সেই রুটিন অব্যাহত আছে । মারটা অবশ্য দেন না ।
গল্প-উপন্যাসে কষ্ট করে চলা পরিবারগুলোর ছেলেমেয়েরা ক্লাসে ফার্স্ট হয় সবসময়, আমি হতে পারিনি । মা’র মার খেয়ে কখনো কখনো হাতজোড় করে প্রার্থনা করতাম যাতে উপন্যাসের চরিত্র হয়ে যেতে পারি । ছোটবেলার ফ্যান্টাসি...
উঠে দাঁড়াই এবার । ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়েই পাড় ধরে হাঁটি । সদ্য শেষ হওয়া বর্ষার নরম কাদা থেকে পা বাঁচিয়ে সাবধানে হাঁটতে থাকি । দেড় মাস আগেও এ পুরো অংশটাই ছিল পানির নিচে । ভেজা মাটির খপ্পর থেকে সহজে রেহাই পাওয়া যায় না তাই ।
হিমুর সাথে ঘনিষ্ঠতার সপ্তাহ-খানেকের মধ্যেই ওদের বাড়িতে যাই । হিমুর মা,বাবা আর হিমুর চেয়ে বছর দেড়েকের ছোট বোন, ইভা । বাসার খুব কাছেই হওয়ায় ওদের বাড়িতে নিয়মিত আনাগোনা ছিল আমার । একটা সময় এমন হল যে, নিজের বাসা আর হিমুদের বাড়িটার মধ্যে খুব একটা পার্থক্য করতে পারতাম না । আর হিমুর চেয়ে বেশী বন্ধু হয়ে গেলাম ওর বাবা,মা’র সাথে । মধ্যবয়স্ক হিমুর বাবার সাথে ফুটবল খেলতে গিয়ে অনায়াসে ল্যাঙ মারতাম, ও বাসায় হিমুর মা’র হাতের রান্না খেয়েছি বহুবার, ইভার চুল টেনে দৌড়ে পালিয়েছি প্রায় প্রতিদিনই । আর হিমুর সাথে নদীর ওপাড়ে নিত্যদিনের এলান কোয়ার্টারমাইন হয়ে ঘুরে বেড়ানো তো আছেই । এতো উচ্ছ্বাস,আনন্দের মাঝে অপ্রাপ্তিটা মূলত বাড়ি ফেরাতেই । সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে বাড়ি ফিরে মা’র জন্য অপেক্ষা । একসময় মা ফিরেন, আমরা একসাথে বসে খাই । মা আমার লেখাপড়ার খোঁজ নেন, ঝাড়ি দেন, স্কুল থেকে বেতন-ভাতা না পেলে সে রাগ আমাকে মেরে মেটান । তারপর মা কাঁপা কাঁপা হাতে সেলাইয়ে বসে যান, আমি বসি সুর করে পড়ায় । মা’র ঝিমুনি এলে হিমুদের বাড়ি থেকে ধার করে আনা বই, পাঠ্যবইয়ের উপরে নিয়ে ধরে অনায়াসে গিলতে থাকি । কখনো কখনো মা’র ঝিমুনিটাই গাঢ় ঘুমে পরিণত হয় । এলোমেলোভাবে শুয়ে থাকতে দেখে আমার সেই জঘন্য মা’কে প্রচণ্ড ভালোবাসতে ইচ্ছে করে...
কাদামাখা পথ পেরিয়ে এখানে শক্ত মাটি । জায়গাটা একটু উঁচুও । পলিমাটির কালো কালো গর্তগুলো বিশালাকার ফোস্কার মত দেখাচ্ছে । এজায়গাটা থেকে আরেকটু দূরেই থাকা দেবদারু গাছের সারিটা দেখা যায় । ওখানে দুপুরের প্রখর রোদের সাথে মুফতে লিলুয়া বাতাস পাওয়া যেত । হিমুর মা, মানে খালার খালি গলায় গান, ত্রয়ীর মানে আমি,হিমু আর খালুর তর্কযুদ্ধ প্রবল প্রতাপে চলতো ছুটির দিনগুলিতে । কেবল চুপচাপ থাকতো ইভা । এখনো কান পাতলে যেন সেই সব নীরবতা ভঙ্গকারী পাপী কলরবগুলো প্রাচীন প্রেতাত্মার মত ভেসে ভেসে বাজতে থাকে এখানে । আর কেউ শুনতে না পেলেও, আমি ঠিকই শুনতে পাই তা...
আমরা বড় হই । আমরা বলতে আমি,হিমু,ইভা । খালু,খালা বা আমার মা, বড় হন না । উনাদের বয়সটাই বাড়ে শুধু, প্রকৃতির নিয়মানুবর্তিতায় । আমাদের নিয়মতান্ত্রিক হাস্যোচ্ছ্বলতায় ভাঁটার টান পড়ে । নাক আর ঠোঁটের মাঝের শুকনো রোঁয়ার মত লোমগুলোর সঙ্গী হয় দু’গালে চাপ চাপ, সদ্য গজানো দাঁড়ি । মনোজগতে বিরাট না হলেও অনেকটাই পরিবর্তন আসে, টের পাওয়া যায় তা । সেই বয়সে এসে যেন খালার করা সমাজসেবা মূলক কাজগুলোর কিছু কিছু বুঝতে পারছিলাম । পৃথিবীর হাওয়া-জল-নির্মলতায় বড় হয়ে নির্জীব পদার্থ হয়ে থাকাটা আমাদের কাজ নয়, এই পৃথিবীর প্রতিও আমাদের কিছু দায়িত্ব রয়েছে, কিছু কর্তব্য আছে --- খালাম্মার এসব শক্ত শক্ত কথাগুলোর গূঢ় অর্থগুলো একটু একটু টের পাওয়া শুরু করেছিলাম । যার ফলে ঈদ-পূজোয় আমাকে পাওয়া গেল রেললাইনের পাশের বস্তি গুলোয় খালাম্মা আর হিমুর সাথে, জামাকাপড় বিতরণে । কি যে আনন্দ! কত ভালোলাগা!!
আমার বদরাগী মা প্রায় কোনোকাজেই এর আগে কখনোই আমাকে বাঁধা দেননি বা নিষেধ করেননি । এবার করলেন । একদিন হয়তোবা আমাকে মারার উদ্দেশ্যেই ঘরের বাইরে থেকে আটকে পাশের শিমুল গাছের কচি ডাল পাড়তে গেলেন । মার খেয়ে অভ্যস্ত আমি, তাই ব্যাপারটা আমলে না নিয়ে কারণটা জানার ব্যাপারে বেশী আগ্রহী ছিলাম, মারটা কেন খেতে যাচ্ছি ?
মা ঘরে এসে প্রথমেই এক দফা আমার পিঠে চাবুকের মত ডাল দিয়ে বানানো বেতটা দিয়ে মারা শেষে আমাকে বললেন বামহাত উপরে উঠাতে, উঠাই । উনি দেখালেন আমার শার্টের বামপাশটার বেশ ভালোরকমেই ছেঁড়া অংশটুকু । তারপর আমাকে আনতে বললেন আমার একমাত্র জুতোজোড়া । খুঁজতে হয় না, সহজেই বোঝা যায় এটা বহুবার মুচির হাতুড়ি-বাটালের হাত ঘুরে এসেছে । মা এরপর আমাকে বুঝাতে চাইলেন, যে ছেলের নিজেরই এই অবস্থা, সে করছে গরীবদের সাহায্য, এটা কি যৌক্তিক কিনা । তারপর তিনি বলতে চাইলেন, কিভাবে হিমুর বাবা,মা আমাকে এভাবে পক্ষান্তরে অপমান করছেন । আর এসব বলার সাথে সাথে মহা ক্ষিপ্ত অবস্থায় হাতের বেতটা আমার পিঠে ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে একসময় কেঁদে ফেললেন । সেদিনের পুরো ব্যাপারটাই আমার কাছে বিস্ময়কর ছিল । মা কখনই এতো কথা আমার সাথে বলেন নাই, আমার কখনই মনে হয় নাই হিমুর বাবা-মা আমাকে অপমান করছেন, আর তারচেয়েও বড় কথা... মা’কে সেদিনের আগে কোনোদিন কাঁদতেও দেখিনি । চমকের পর চমক!
তারপর আর কিছু হয়নি । মা একসময় স্বাভাবিক হয়ে গেলেন । সব ভুলে আমিও আবার চলে যাই হিমুদের বাড়িতে । খালার পাশে পাশে ঘুরঘুর করতে থাকি । খালুর সাথে বসে দেশ পাল্টানোর আলাপ করি । হিমুদের লাইব্রেরী ঘরে গিয়ে একটার পর একটা বই পড়তে থাকি । কিন্তু পরিবর্তনটা হল অন্যভাবে । চঞ্চল হলেও চুপচাপ থাকি, এরকম একটা কথা প্রচলিত আছে আমার নামে । সেটাকে আরো ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে থাকলাম । বয়ঃসন্ধিকালে যে এতো যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে, সেটা কে কবে ভেবেছিল!
দেবদারু গাছগুলোর কাছে পৌঁছে গেছি । সূর্য আরো নেমে এসেছে । দিগন্তের সাথে মিলিয়ে যাবে খানিকক্ষণ বাদেই । সেখান থেকে উঁচু ঢিবির মত জায়গাটায়, আর তারপরের কিছুক্ষণ পরেই আমাকে যেতে হবে হিমুদের বাড়িতে । ওটাই মোক্ষম সময়...
খালার সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে তুমুল সমর্থন দিলেও খালু নিজে কখনোই আসতেন না আমাদের সাথে । সেটা নিয়ে খালা আর খালুর মাঝে খুনসুটি লেগে যেত আমাদের সামনেই । আমি আর হিমু এসময় কখনো পক্ষ নিতাম খালার, আবার কখনো খালুর । তবে যেদিন বা যখন আমরা খালুর পক্ষ নিতাম, সেদিন খালা কপট রাগ দেখিয়ে আমাদেরকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ সম্বোধন করতেন । আমাদের তা শুনতেও বেশ ভালো লাগতো । বয়স্কদের ছোটদের মত আচরণ দেখার চেয়ে বেশী আনন্দ আর নাই । পাগলদের প্রতি হয়তো তা-ই বেশী আকৃষ্ট হয় শিশুরা... আমরা অবশ্য আর শিশু নই । বড় বড় লাগে এখন নিজেদের । খুব বড় ভাবতেও খারাপ লাগে না । কৈশোর-যৌবনের সেই দোটানাময় সময়কালে খালা-খালুর সেইসব স্মৃতিগুলো রাতে স্বপ্নের মধ্যে এসেও দেখা দিত । আর তাতেই হল সর্বনাশ । আমার মাঝে নিষিদ্ধ ঘোষিত প্রেমিক-ভাব এসে গেল । বেশিদূর যাওয়া লাগে নি । ছোটবেলা থেকে একসাথে বেড়ে ওঠায় আর মনস্পটে ভালোমতোই আঁচড় ফেলে রাখায়, আমি ভালোবাসতে শুরু করি হিমুরই ছোটবোন ইভাকে...
কিছুক্ষণ আগেই শেষ করা ইছামতী বইটার কথা মনে পড়ছে । বইটার একজন চরিত্র, অনেকটা সন্ন্যাসীর মত । লোকটা সন্ন্যাস-ব্রত নিয়েও ছিলেন, কিন্তু একসময়ে তার সাথে বিয়ে দিয়ে দেয়া হল একই পরিবারের তিন বোনের সাথে, একসাথেই । উপন্যাসটার প্রেক্ষাপট এদেশে নীলচাষের সমসাময়িক ছিল । গল্পে আরো অনেক চরিত্র থাকলেও আমাকে আকৃষ্ট করেছিল ঐ সাধু লোকটাই । ইসলাম ধর্মের মারফতি,সুফিবাদ, হিন্দুধর্মের সন্ন্যাসী, বৌদ্ধভিক্ষু, বাউলদের প্রতি খালু আর হিমুর বেশ আগ্রহ । তা দেখে আমার মাঝেও তার প্রভাব পড়েছে । আহমদ শরীফ থেকে শুরু করে রাহুল সাংস্কৃত্যায়ন পর্যন্ত কিছু কিছু বই আমিও পড়েছি । পড়েছিলাম মনসুর বিন হাল্লাজের কথাও । কিন্তু মূল ব্যাপারটা হল, পুরো ইছামতী বইটাতে সন্ন্যাসী লোকটার সন্ন্যাসব্রতের চেয়ে বেশী ভালো লেগেছে, পরিবারের প্রতি তার অচেতনভাবে আকর্ষণের বর্ণনা । পতির প্রতি পত্নীর প্রেম । ছেলের প্রতি বাবার ভালোবাসা । সত্যি বলতে কি, পুরোটা জুড়ে আমি কেবল ইভাকেই কল্পনায় সাজিয়েছি । ওর মনকে যদি মানানো যেত...
এসব ভাবতে ভাবতেই ঝট করে সরিয়ে নিলাম আমার পা । মাথানিচু করে হাঁটি বলে গোবরটা চোখে পড়েছিল, নাহলে প্রায় মাড়িয়েই ফেলেছিলাম! হঠাৎ করেই মনে পড়ল, আমার এই মাথানিচু করে হাঁটা নিয়েও খালা কিছু কিছু কথা বলেছিলেন ।
কোনো এক খামখেয়ালী বর্ষার বিকালে বৃষ্টিতে ভিজে হিমুদের বাড়িতে এসে শুনলাম, আজ সবাই বৃষ্টিবিলাস করবে । সবাই বলতে আসলে খালু আর হিমু । খালা বা ইভা, কারোরই বৃষ্টিতে ভেজার শখ নেই । তাই ওঁদের সাথে সাথে আমিও এখনকার শ্যাওলা পড়া, আর তখনকার সেই চমৎকার ছাদে উঠে যাই । বৃষ্টিতে ভেজা শেষে চিলেকোঠায় দাঁড়িয়ে থাকা খালা আমাকে ডাকলেন । কোনোরকম ভণিতা ছাড়াই জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি হীনম্মন্যতায় ভুগি কিনা । খানিকটা হলেও চমকে উঠি । খালা সেটা লক্ষ্য করলেন । তারপর বললেন আমি নাকি এতক্ষণ ধরে ছাদের একটা কোণে থেকে চুপচাপ হিমু আর খালুর দিকে তাকিয়ে ছিলাম । মোটেও ওদের সাথে আনন্দে ভিজতে পারিনি । আমি আরো অবাক হয়ে যাই । কারণ, আমার মনে হচ্ছিল এই সারাটাক্ষণ জুড়ে আমি এতো লাফালাফি,উচ্ছ্বাসে ফেটে পরলাম...আর আমি নাকি একদমই নড়াচড়া করিনি! খালা কি আমার সাথে কোনোরকম
মজা করছেন আমার সাথে ?
উনার মুখ দেখে অবশ্য তেমন কিছু মনে হয়নি । বেশ সিরিয়াস । তিনি আমাকে নিচে ডেকে নিয়ে তোয়ালে দিলেন । জেরা করার ভঙ্গিতে তাঁর সামনে একটা চেয়ার রেখে আমাকে বসতে বলেন । ইভাকে ভালোবাসার কথা বুঝে ফেললেন কিনা এটা ভেবে ঘামতে ঘামতে আমি বসি তাতে । তিনি জিজ্ঞেস করেন, আমি ওরকম মাথা নিচু করে হাঁটি কেন সবসময় । গত প্রায় দুই বছর ধরে আমি একেবারেই হাসতে ভুলে গেছি, সেটাও বা আমি খেয়াল করেছি কিনা । আমি এমন জীবন্ত মূর্তির মত হয়ে যাচ্ছি কেন, এসব ।
আমি বোকার মত মাথা চুলকোই । মনে মনে অবশ্য বেশ ঝড় উঠে গেছে । গত দুই বছর ধরে আমি ‘জীবন্ত মূর্তি’ হয়ে আছি ! কিন্তু কেন ? তাহলে আমি যে উচ্ছ্বাস, আনন্দ নিয়ে ঘুরি, ফিরি এসব কি কেউ দেখতে পায় না ? এ কীভাবে সম্ভব ! নাকি খালা অন্য কিছু সন্দেহ করছেন, যেটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এসব কথা দিয়ে বলতে চাইছেন ? শেষেরটাই বেশী যৌক্তিক মনে হল । খালা আমার উত্তরের জন্য তাগাদা দিলে আমি একটু উশখুশ করে বয়োসন্ধিকালীন সময়ের উপরে দোষ চাপিয়ে দিলাম ।
খালা এরপর সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলে আমি সেই আদি, অকৃত্রিম ভয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকলাম । কিছুক্ষণ বাদেই তিনি আমাকে বলেন এ নিয়ে পরে কথা হওয়ার কথা । আমি তা মেনে নিয়ে মাথা নামিয়ে ত্রস্তপায়ে পালাই ।
তার ঠিক পরের দিনই হিমুকে শহরের দিকে ইভাকে টিউটরের কাছ থেকে আনার জন্য পাঠিয়ে দিয়ে আমাকে নিয়ে বৈঠকে বসা হল । বৈঠকের জায়গাটা ছিল এই এখানেই, নদীর পাড়ে দেবদারু গাছগুলোর নিচে । উনারা আগে থেকে কি আলাপ করে এসেছিলেন, জানা ছিল না আমার । তাই অন্যমনস্ক হয়ে মাথা নিচু করে ছিলাম চুপচাপ । একসময় খালু নানারকম কথা বলে আমাকে হাসানোর চেষ্টা করে শেষে বললেন, “জয়, তোর এই অবস্থাটাকে বলে ডিপ্রেশন । তোর মত বয়সে আমারও এরকমই ছিল । আর আমি তখন কি করেছিলাম শোন…কোনোকিছু না ভেবেই ঝপ করে প্রেমে পড়ে গেলাম তোর খালার উপর । তারপর দেখ! উপদ্রবের মত ভালোবাসি বলে তোর খালা বিরক্ত হলেও শেষমেশ ঠিকই আমার সাথে টিকে গেছে । এমনটাই হয় জানি । বুঝাই যাচ্ছে তোর একজন দেবী দরকার, সেটাই তোর সমাধান”--- হ্যাঁ । বিজ্ঞ বিচারকের মত রায় দেয়ার ভঙ্গিতে ঠিক এই কথাগুলোই বলেছিলেন খালু । আমার হার্টবিট বোধহয় তখন একশ চুয়াল্লিশে । তবুও চেষ্টা করলাম, চেহারায় লাজুক ভাব আনতে । খালা ঠাট্টাচ্ছলেই জিজ্ঞেস করলেন, আছে নাকি আমার তেমন কেউ । আমিও কোনোকিছু না ভেবেই বোকার মত বলে বসলাম যে আছে একজন । খালু তখন ছোট বাচ্চাদের মত খুশিতে উদ্ভাসিত হয়ে বললেন আমি নাকি অর্ধেক কাজ প্রায় করেই ফেলেছি । তারপর জিজ্ঞেস করলেন আমি মেয়েটিকে এ বিষয়ে কিছু জানিয়েছি কিনা । আমার না সূচক উত্তর শুনে তিনি আমাকে আশ্বাস দিলেন হয়ে যাবে সব, অত ভেবে কাজ নেই । আরো বললেন, গম্ভীর হয়ে না থেকে হাসিখুশি হয়ে থাকতে । চেষ্টাচরিত্র করে তখন এক হাসির মুদ্রা ঠোঁটে ফুটিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টায় লিপ্ত হয়ে যাই ।
বেশ ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে এখন । গাছগুলোর নিচে বসতে ইচ্ছে করলেও উপায় নেই । এইতো আরেকটু সামনের ঐ উঁচু ঢিবিটা দেখা যাচ্ছে, ক’দিন আগেই ওখানটায় মাটি খুঁড়েছিলাম । কি একটা দিন যে ছিল! ওখানটায় গিয়ে বসা যাবে ।
আমাদের জীবনটা ঠিকঠাক নাকি পুরাটাই বোকামি নাকি ব্যর্থতার ব্যাপার, সেগুলো পত্রিকার সাময়িকীগুলোর জন্যই নাহয় বরাদ্ধ থাক, নিজের ব্যাপারে বারবার অসহায় বোধ করেছি আমি । ভুল করেছি...বার বার ।
ইভাকে ভালোবেসে ফেলাটাও কি ভুল ছিল না ?
উত্তর যখন অজানা, তখন তা নিয়ে আর তর্ক করতে আগ্রহ পাই না । হয়তোবা ভুল । তেমন এটাও হয়তোবা ভুলই ছিল যে, দিনের পর দিন আমি খালা,খালুর কাছে ইভাকে নিয়ে আমার মাঝে যা যা অনুভূতি আসে সব বলে ফেলতাম । অবশ্যই ইভার নাম গোপন রেখে । আমি ওর নাম দিয়েছিলাম ‘সিনোরিটা’। কখন ইভা একবারের জন্য হলেও হেসে আমার দিকে একটু তাকিয়েছিল, কখন আমার মনে হয়েছে পূর্ণিমার রাতে নদীর ধারে ইভার হাত ধরে চুপচাপ বসে থাকব, কখনোবা ওর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রাণভরে কাঁদতে পারবো – এসবই বলতাম তাঁদের কাছে - সংকোচে, দ্বিধায়, লজ্জায় । কেন যেন মনে হত তাঁরা আমার এইসব কথাগুলো শুনে বেশ আনন্দ পেতেন ।
“কাঁদবি ? কাঁদবি কেন ?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন খালা ।
আমি উত্তর দেইনি । দিবো কি ! উত্তর তো আমার জানা নেই... কাঁদতে ইচ্ছে হত, তাই বলতাম ।
তরুণ হিমু এখন অনেকটাই অজানা,অচেনা । আমাদের সকলের কাছেই । ছোটবেলার এডভেঞ্চারের ভূত আমার মাথা ছেড়ে অনেক আগেই বেরিয়ে গেলেও হিমু আকৃষ্ট হয়েছে তাতেই । বৈষয়িক ভাবনা নেই দেখে কিছুটা অসন্তুষ্ট হলেও খালা যেন একটু প্রশ্রয়ই দিতেন হিমুর এই স্বভাবকে । আর খালু তো প্রকাশ্যে বলেই বেড়াতেন হিমু যদি মার্কো পোলো হয়ে যায় তাতে তিনি বরং গর্বিত বোধ করবেন । সহজেই অনুমেয়, হিমু তাই বাইরে বাইরেই থাকতো বেশীরভাগ সময় । লেখাপড়া আর রাতে ঘুমানো বাদে বাকি সময়টা আমার তাই কাটতো হিমুদের বাড়িতেই । খালা,খালুকে সঙ্গ দেয়ার জন্য তো অবশ্যই । আমার নিজের সঙ্গ লাভের জন্যেও বটে । আমার মা ততদিনে অনেকটাই পার্শ্বচরিত্রে; কেন কে জানে ।
ব্যাপারটা ঘটল আচমকাই । খালু একদিন বলে বসলেন আমি নাকি অনেক রোমান্টিকতা দেখিয়ে ফেলেছি, এখন সেটা সিনোরিটাকে জানানো উচিত । খালুর কথার উত্তরে কি জবাব দেবো তা ভাবতে না ভাবতেই খালা আমাকে চেপে ধরলেন “মেয়েটা কে রে ? সত্যি করে বল ”— তা বলে । স্বভাবতই পুরনো ভয়টা জেগে উঠলো, তাঁরা কি কিছু জেনে ফেললেন ?
মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা । একদিকে খালার দেয়া তাগিদ, অন্যদিকে খালুর বলা কথা...দুটোই মাথায় ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছিল । সিদ্ধান্ত নিলাম, ইভাকে আমি জানাবো...জানাবো আমার সকল অনুভূতি...আমার নির্ঘুম রাতের যন্ত্রণাক্লিষ্ট হাহাকারের বর্ণনা ।
মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে নিচ্ছিলাম, যা বলা দরকার তা মনে মনে শতবার রিহার্সাল করছিলাম । মনের ভিতরেই বাঁধ সাধলো আরেক জায়গায় । ব্যাপারটার পরিণতি নিয়ে । আমি যদি ইভাকে সবকিছু জানাই, ও হ্যাঁ বা না বলার আগেই খালা-খালুকে জানাবে । এটা ভাবতেই সেই পৌষ মাসের শীতল হাওয়া যেনো বহুগুণে আমার গায়ে এসে লাগলো । এতদিন ধরে বন্ধুর মত করে খালা-খালুর সাথে যেসব কথা বলে এসেছি, তারা যখন জানবে যে সেই মেয়েটা আর কেউ নয়,তাদেরই মেয়ে... তখন যত উদারই হোন, এটা কি মেনে নিবেন ? কোনোভাবেই না ! আমি তো কোনো কমেডি মুভিতে অভিনয় করছি না । আমি তো কোনো মহাযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক নই । আমি তো...একেবারেই সাধারণ একটা মানুষ ... যার বাবা লেদকাটা মেশিনে মাংসপিণ্ড হয়ে মারা যায়, যার মা তাকে মারধর করে নিজের অভাবের রাগ মেটান, যার একমাত্র জুতোজোড়ায় মুচিদের অজস্র গালিগালাজ আর সৃজনশীলতা, পরীক্ষায় কখনই ভালো ফল না পাওয়া...
আমি তাহলে কি করবো এখন ? কি করা উচিত ??
এজন্যেই বহুবার নিজেকে জিজ্ঞেস করে গেছি, ইভাকে ভালোবাসাও কি আমার অন্যতম বড় ভুল নয় ?
অন্তত সেদিন মনে হয়নি । সেসময়ে মনে হয়নি । সেই মুহূর্তে মনে হয়নি ।
ইভা আমাকে মেনে নিতো কি নিতো না, তার পিছনে মনে মনে অজস্র ‘না’ উত্তর পেলেও আশাবাদী ছিলাম । মনের ভেতর একটা তাড়না ছিল, আমার ইভাকে পেতেই হবে, তা যে করেই হোক । একথা ভাবতে গিয়ে হুট করেই একটা চিন্তা এলো মাথায় । একটা কাজ করতে হবে । একেবারেই ছোট্ট একটা কাজ । সেটা করলেই হয়তো ইভাকে আমি আমার ভালোবাসার কথা বলতে পারবো । ইভা রাজি হবে । আমরা সুখী হবো । বছর-খানেক বাদে আমরা বিয়ে করবো । আমাদের বাচ্চা হবে । পাখির মত কিচিরমিচির করে বেড়াবে ওরা । হিমুর বাবা-মা’র মত করে আমরাও এই নদী-পাড়ে একটা বাড়ি বানাবো । আমরা সুখী হবো । সত্যিই খুব বেশী সুখী হবো... বললাম না, আমার তখন একেবারেই মনে হয়নি যে ইভাকে ভালোবাসা আমার কোনো ভুল ছিল না ?
আমার সিদ্ধান্তটা ছিল, হিমু-ইভার বাবা-মা’কে অর্থাৎ আমার সাথে এতোটা কাল ধরে বন্ধু সুলভ আচরণ করে আসা, বলা ভালো আমার প্রিয় বন্ধুও, সেই খালা-খালুকে আমি খুন করবো । ওরা না থাকলে ইভা কখনই আমার বিত্ত-বৈভবের অভাবের কথা ভেবে অরাজি হবে না । আর তাছাড়া...তাছাড়া, ওরা অনেক কিছু জেনে গেছেন । ওরা বেঁচে থাকলে আমাকে সারাটা জীবন নর্দমার কীটের মত ভাববেন, বিয়ে তো দূরের কথা, ইভাকে ভালোবাসার কথা জানলে ওদের বাড়িতেও আর কখনো যাওয়া সম্ভব হবে না । বাবা যখন লেদকাটা মেশিনে চাপা পড়ে মারা যান, সেই স্মৃতি আমার মনে আছে, সেই দিনের দুঃখ, ভয়াবহতার সবটুকু আমি টের পাই...যে আমার জীবনসঙ্গিনী হবে, ও ও সেটা টের পাবে, ও আমাকে বুঝবে, আমি যেমন অনুভব করি, ইভাও তা অনুভব করবে । ইভা তখন আমার অসহায়তা টের পাবে । আর হ্যাঁ, ও তখন আমাকে ভালোও বাসবে । যে আমি ওকে এতোটা ভালোবাসি, ও সেটা বুঝবে না তা কি হয় ?
সুতরাং...
আমি...তাঁদেরকে...খুন...করবো...। তাঁরাই ইভা আর আমার মাঝের বাঁধা । হ্যাঁ...হ্যাঁ... তাঁরাই...
হাঁপিয়ে উঠেছি প্রায় । উচ্চতাটা ব্যাপার না জানি । খুব সম্ভবত মনের ভয় থেকেই । এই উঁচু জায়গাটার প্রতিই আমার ভয় এসে গেছে । কেমন যেন কবরের মত দেখায় । তবুও আসি । হয়তোবা নিষিদ্ধ আকর্ষণেই ।
আমার সর্বশেষ সিদ্ধান্তটা কি সঠিক ছিল ?? জানি না । এটার উত্তরও আমি আজ পর্যন্ত জানতে পারিনি ।
[চলবে...]
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now