বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ব্যাপারটা একই সাথে কিছুটা ভয়ের, অনেক বিরক্তির
এবং প্রচন্ড মেজাজ খারাপের । কোন ব্যাপারটা?
এই যে ছেলেটা প্রতিদিন একই জায়গায় আরও কিছু
পোলাপানের সাথে বসে আমার দিকে তাকিয়ে
থাকে । আর হাসে । আরে এত হাসার কি আছে?
আমারে দেখতে কি জোকারের মত লাগে?
হালকা ভয়ের ব্যাপারটা গত দুই-একদিন ধরে অনুভূত
হচ্ছে । ছেলেগুলার কোন বদ মতলব নাই
তো? শিউর হয়ে বলা যাচ্ছে না । এখন কারো
মুখ দেখে বোঝা যায় না, তার মনের মধ্যে কি
চলছে । যদিও এখন পর্যন্ত খারাপ কিছু বলেনি ।
তবে বলতে কতক্ষণ?
সেদিন কি করল জানেন? যেই ছোট্ট চায়ের
দোকানটাতে বসে থাকে, ঐ দোকানটার ছোট্ট
পিচ্চিটাকে দিয়ে আমাকে একটা চিরকুট পাঠাল । এমন
কিছু আমি আশা করিনি, তাই একটু অবাক হয়েছিলাম ।
তবে চিরকুটটা ঐ ছেলেটার সামনেই তখনই ছিঁড়ে
কুটিকুটি করে ফেলে দিলাম । একবার খুলেও
দেখলাম না । এরকম করে ছিঁড়ার অভিজ্ঞতা আমার
অনেক পুরোনো । আর ছিঁড়ার সময় সেই চিরকুট
দাতার চেহারাটা হয় দেখার মত । কিন্তু আশ্চর্যের
ব্যাপার হল, এই ছেলেটা হেসেছে শুধু ।
অন্যদের মত মুখে কোন রকম দুঃখের চিহ্ন
নেই । আমি অবাক হওয়ার চেয়ে রাগ হয়ছিলাম
বেশী । আমার রাগ দেখেই মনে হয়
ছেলেটার মুখের হাসিটা আরও বড় হয়ে যায় ।
এই ছেলেটার সাথে প্রতিদিন দেখা হয় কলেজে
যাওয়ার সময় । আমি রিচি, একটা সরকারি মেডিকেলে
২য় বর্ষে পড়ি । কলেজ থেকে ফেরার সময়
দেখা হয় না ছেলেটার সাথে । কই থাকে কে
জানে? হয়তো অন্য কোনো মেয়ের দিকে
তাকিয়ে হাস্তেছে । হাবলা...
প্রতিদিনের মত আজও কলেজে যাচ্ছি । কিন্তু
আজকে কাউকেই দেখলাম না । গেল কই কে
জানে? চায়ের দোকানটা পার হয়ে যাওয়ার সময়
পিচ্চিটা এগিয়ে এল । হাতের চিঠিটা আমার দিকে
বাড়িয়ে ধরল । আমি নিলাম ওটা ।
-কে দিছে?
-ভাইজানে ।
আমি টান দিয়ে চিঠিটা ছিঁড়তে যাবো, তখনই পিচ্চিটা
বাধা দিল ।
-আফা খাড়ান, ছিঁড়িয়েন না । ভাইজান কইছে আপনারে
একবার ওইটা পইড়া দেখতে । তারপর ছিঁড়্যা ফেলাই
দিয়েন ।
চলে এলাম ওখান থেকে । চিঠিটা রেখে দিয়েছি ।
পড়ার কোন ইচ্ছাই নাই । আসল উদ্দেশ্য,
ছেলেটার সামনে ওকে দেখাই দেখাই ছিঁড়া ।
আসবে নিশ্চয়ই কালকে । তখনই...।
আমি অবাক হলাম এটা দেখে যে, ছেলেটা পরদিন
আসলো না । এমনকি এর পরদিনও না । আমি আরও
দুইদিন অপেক্ষা করলাম । নাহ্, ছেলেটার কোন
খবর নাই । তখন আমার চিঠিটা পড়ার কৌতুহল হল । হয়ত
বিদায় জানিয়ে লিখেছে । শেষ চিঠি হিসেবে ।
পড়লাম চিঠিটা । পড়ার পর আমার একটু খারাপই লাগল ।
মনে হল, আমি হয়তো ছেলেটাকে একটু
বেশীই খারাপ মনে করেছি । হয়তো একটু
বেশীই ভূল ধারণা করেছি । আমারই বা কি দোষ?
ছেলেটাকে দেখে আমি কিভাবে বুঝবো ওইটা
ভালো নাকি খারাপ?
ছেলেটার সাথে দেখা হলে কথা বলতে হবে ।
কিন্তু কিভাবে হবে? ছেলেটাতো আর আসেই
না । আমার খারাপ লাগা আরও বাড়তেছে । অস্থির
লাগতেছে আমার । ছেলেটা আসে না কেন?
আপনারা হয়ত জানতে চাচ্ছেন কি লেখা ছিল চিঠিতে
। কি পড়ে আমার ছেলেটার জন্য খারাপ
লাগতেছে । চিঠিটাতে আসলে অপ্রত্যাশিত কিছু
লেখা ছিল । যেটা আমি আশা করিনি ।
“আমার মনে তোমার জন্য যে সম্বোধনটা
আসছিলো, ওইটা করার কোন অধিকার আমার আছে
বলে মনে হয় না । তাই করলাম না । আর আমি তো
তোমার নামটাও জানিনা ।
আমার প্রতিদিনের কাজগুলা তোমার অনেক
অপছন্দের হয়তো, কিন্তু আমার তো আর কিছু
করার নেই ।
তবে হ্যাঁ, আর বেশিদিন এটা সহ্য করতে হবে না
তোমাকে । ডাক্তার সময় বেঁধে দিয়েছেন ।
বড়জোর ৩ মাস । আমেরিকার ডাক্তার, কথার একটা
দাম আছে, বুঝতেই পারছো । তোমার আর চিন্তা
করতে হবে না । আমি ক্যান্সারে আক্রান্ত একজন
রোগী ।
তোমার সাথে খুব কথা বলতে ইচ্ছা করে ।
বেশীকিছু চাওয়াটা আমার জন্য অপরাধের সমতুল্য ।
গত কয়েক বছর বিদেশ ছিলাম চিকিৎসার জন্য । কিন্তু
ডাক্তার সময় নির্দিষ্ট করে দেয়াতে চলে এসেছি
। সবকিছু শেষবারের মত দেখব বলে । জানো
আমার আব্বু-আম্মুগুলা খুব ভালো । দেশে আসার
সাথে সাথেই বলে দিয়েছে, আমার যা ইচ্ছা হয়
তাই যেন করি । আমি কি সেই সুযোগ ছাড়তে
পারি? আমি কখনও কোন মেয়ের সাথে তেমন
ভালোভাবে কথা বলিনি । কোন মেয়ে বন্ধু নাই
আমার । তাই থিক করেছিলাম, একটা মেয়ে বন্ধু
বানাব । তোমাকে দেখে ভালো লেগেছে
অনেক । তাই তোমাকে দেখি । কথা বলার সাহস
হয়নি কখনো । তার উপর তুমি যে রাগী ।”
হঠাত করেই শেষ চিঠিটা । ছেলেটা নিজে নামও
লেখেনাই । আমার এটা ভেবেই সবচেয়ে
বেশী খারাপ লাগছে যে, ছেলেটা এই
পৃথিবীতে আর বেশিদিন থাকবে না । তার সময়
এখন নির্দিষ্ট । সে জানে আর মাত্র কয়েকটা দিন
পর সে মারা যাবে ।
তার শেষ কিছুদিনের মধ্যে শেষ ইচ্ছাটা আমি
চাইলেই পূরণ করতে পারি । একটা মানুষের শেষ
ইচ্ছা পূরণ করতে পারাটা মোটেই কম কিছু না ।
একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের বন্ধু হয়ে তাকে
কিছুটা মানসিক প্রশান্তি দেওয়ার মধ্যে একটা আনন্দ
আছে । আমার তাই মনে হচ্ছে ।
বেশ কিছুদিন পর ছেলেয়াকে দেখলাম । সেই
আগের জায়গায় । আগের মত । সেইভাবে হাসছে
।
তবে আজকে একটু অন্যরকম লাগছে । শুকিয়ে
গেছে আগের চেয়ে । আর হাসিটাও আগের
মত প্রাণবন্ত না । সেই সতেজ ভাবটা কমে
গেছে । হাসিটা মলিন ।
আমি ছেলেটার সাথে কথা বলার জন্য এগিয়ে
গেলাম । ওটা দেখে ছেলেটার বন্ধুগুলা দূরে
গিয়ে দাঁড়াল ।
-হাই, কি খবর?
-মনে হয় ভালোই ।
-আপনার চিঠিটা পড়েছি ।
-সত্যি?
ছেলেটাকে দেখে মনে হছে অনেক অবাক
হয়েছে ও ।
-আমি ভাবতেই পারিনি আপনি ওটা পড়বেন ।
-হুম । এতদিন কই ছিলেন? অনেকদিন দেখলাম না ।
-এইতো, কিছুনা । এমনিতেই । মনে হল
আপনাকে একটু বেশীই বিরক্ত করে ফেলেছি
। তাই ভাবলাম একটা ব্রেক দরকার ।
-তাই নাকি? আমি রিচি । আপনি?
এভাবেই শুরু হল । এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিন
কথা হতে লাগল । একসাথে ঘুরলাম অনেক ।
অনেক কিছু জানলাম ছেলেটার সম্পর্কে । ওর
নাম নীল ।
নীলের না-পাওয়া কিছুই ছিল না বলতে গেলে ।
ওর বাবা-মা যথেষ্ট বড়লোক হওয়ায় একমাত্র
ছেলের কোন আশাই অপূর্ণ রাখেননি । কিন্তু
সময়টাকে কিছুতেই কিনতে পারছেন না শত
চেষ্টাতেও ।
নীল অনেক লাজুক বলে কোন মেয়ের
সাথে কথা হয়নি ওর । ওর বন্ধুদের দেখে অবাক
হত ও । কিভাবে কথা বলে ওরা মেয়েদের
সাথে?
এরপর কিছু সময়ের মধ্যে আমাদের খুব ভালো
বন্ধুত্ব হয়ে যায় । নীল ছেলেটা অনেক
ভালো । আমি যতটুকু বুঝেছি আরকি । অনেক কথা
বলে ও । শুনতে ভালোই লাগে । মোবাইল
নাম্বার দেয়ে-নেয়া হয়েছে আমাদের মধ্যে ।
কথা হয় নিয়মিত । একদিন ওর বাবা-মার সাথেও দেখা
করলাম । তাঁদেরকে দেখলে সহজেই বোঝা
যায়, নীল এত ভালো কেন? ছেলেকে হুবহু
নিজেদের মত করে বড় করেছেন তাঁরা ।
তবে এত কিছুর পরও আসল কথা হল, আমার মধ্যে
বেশ কিছু পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি আমি ।
নীলের সাথে কথা বলতে ভালো লাগে
অনেক । ওর সাথে সময় কাটাতে ভালো লাগে ।
ওর কথা চিন্তা করতে ভালো লাগে । কয়েক ঘন্টা
কথা না হলে খারাপ লাগে । যখন তখন দেখা করতে
ইচ্ছা হয় । এবং আরেকটা আশ্চর্যের কথা হল, এই
আমি একবার রাতে কেঁদেছিও । কেন জানেন?
নীল চলে যাবে বলে । আর মাত্র কিছুদিন পর ও
আর আমাদের সাথে থাকবে না বলে । ওর সাথে
দেখা করতে পারবো না বলে । ওর সাথে কথা
বলতে পারবো না বলে । কি যে হয়েছে
আমার, কিছুই বুঝতে পারছি না ।
ও হ্যাঁ, নীল খুব ভালো গাইতে পারে । আমাকে
প্রায় সময় গেয়ে শোনায় । যদিও আমি অনুরোধ
করি গাইতে । কারণ আমার অনেক ভালো লাগে
শুনতে ।
দেড় মাস পর...
কেবিনটার একমাত্র জানালাটা দিয়ে বাইরের রাস্তার
ল্যাম্পপোস্টের হাল্কা আলো ঢুকছে ।
কেবিনের ভিতর এমনিতে অন্ধকার । লাইট বন্ধ ।
একমাত্র বেডটায় নীল শুয়ে আছে । আর আমি
পাশে একটা চেয়ারে বসে আছি । ওর একটা হাত
আমার মুঠোর মধ্যে নিয়ে ।
গত দুইদিন হল নীলকে হাসপাতালে ভর্তি করা
হয়েছে । অবস্থা খুব খারাপ । মৃত্যুর শেষ
প্রান্তে আছে ও । ওর মুখে এখন অক্সিজেন
মাস্ক লাগানো । কৃত্রিম্ভাবে বাঁচিয়ে রাখার বৃথা
চেষ্টা । ডাক্তার ওকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছেন ।
ওর বাবা-মা বাড়িতে গেছেন আমাকে রেখে ।
আমাকে ওনারা অনেক বিশ্বাস করেন । আর আমার
উপর তাঁদের আস্থা আছে । আমি বান্ধবীর সাথে
থাকব বলে এসেছি বাসায় ।
ছেলেটা কি শান্তিতে ঘুমাচ্ছে । আমার ঘুম
আসছে না । অনেক কাঁদতে ইচ্ছা করছে । এত
তাড়াতাড়ি ও চলে না গেলে কি হয়?
আস্তে করে ওর হাতের উপর মাথা রেখে
চোখ বুজলাম । নীলকে সাথে করে আগামী
দিনগুলো কল্পনা করতে খুব ভালো লাগছে । খুব
করে চাইছি যেন আগামী ভোরটা নীল
দেখতে পায় ।
যদি নীলের ঘুম ভাঙ্গে ভোরে, তাহলে আমি
ওকে নিয়ে জানালাটার সামনে দাঁড়াবো । জানালাটার
পর্দা সরিয়ে দেব । একসাথে সূর্যোদয় দেখব ।
নতুন একটা সূর্য দেখব । দেখব নতুন একটা
ভোর । তখন ওর হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে
রেখে ওকে বলব-
“চেয়ে দেখ আকাশের আলোয়
হাতে রেখে হাত
তোমাকে পেয়ে যেন আজ
এল নতুন এক প্রভাত ।”
(সমাপ্ত)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now