বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নতুন জামা

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X নতুন জামা -খিক খিক! কইলাম না লাগত না। -তর চোখ কি কানা নাহি? এট্টু লাইগা গেছে। -কইছে তরে! লাগলে আমারডা লড়ত না? -লড়ছে। তুই দেহস নাই? -ও! হাইরা গেছস দেইকখা ঘাউরামি করতাছস! দে আমার মার্বেল দে। -আমি দিমু ক্যান? তুই ই না দিবি। -তুই দিবি না তো? -না দিমুনা। কি করবি তুই? - দেখাইতাছি … শুরু হয় মুন্না আর রতনের মারামারি। মারামারিতে দুজনের কেউই তেমন ব্যাথা না পেলেও ছিড়ে যায় মুন্নার একমাত্র পুরোনো শার্টটি। আর এর মাধ্যমেই মারামারি আপাতত শেষ হয়। তবে আজ বিকেলেই এদের একসাথে দেখতে পাওয়া যাবে। অন্য কোন খেলায় মত্য। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। অন্য কোন দিন অন্য কোন কারনে দুজনের ঝগড়ার এক পর্যায়ে আবার উঠে আসবে এই ঘটনা “ওই! হেইদিন তুই আমার শার্ট ছিড়া লাইছিলি…। এটাই তাদের বন্ধুত্ব, এটাই তাদের ঝগড়াচক্র। খুব ভয়ে ভয়ে ঘরে ফিরে মুন্না। ঘর বলতে দরজা জানালাহীন ছনের বেড়া দেয়া ছাউনি। দরজা দিয়েই বা কি হবে? ঘরের ভিতর এমন কিছুই নেই যার নিরাপত্তার জন্য আবার দরজা লাগবে। নাহ! মুন্না যতটা ভয় পেয়েছে ততটা ভয়ের কিছু হয়নি। তার পঙ্গু মা শুধু একবারের জন্য বলেছে “কিরে! জামা কই? ” এই একটি মাত্র প্রশ্নের মধ্যেও গুরুত্ব এতটা কম ছিল যে মুন্নাও কোন উত্তর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। শার্টের অবস্থা এতটাই খারাপ যে সেটা সেলাই করেও আর ঠিকঠাক করা সম্ভব না। আর তারপর থেকেই শুরু হল মুন্নার অর্ধউলঙ্গ জীবন…। বন্ধুদের সাথে খেলায় মন বসে না মুন্নার। যদিও তাদের এ সমাজে এমন অর্ধউলঙ্গ কিংবা উলঙ্গ জীবন চোখ বড় করে দেখার মত কোন বিষয় না। বরং সুন্দর জামা পড়া কারো জীবনই বিষ্ময়ের সাথে দেখার বিষয়। মাঝে মাঝেই বয়সের চাইতে ক্ষানিকটা বড়রা দুষ্টামি করে তাদের প্যান্ট টান দিয়ে খুলে মজা করে। যে খুলে সে তো মজা পায় ই যারা দেখে তারাও মজা পায় এবং অদ্ভুতভাবে যার প্যান্ট খুলে সেও মজা পায়। তবুও মুন্না দৌড়ে যায় বড় রাস্তায়। যেখানে সভ্য মানুষদের আনাগোনা। মুন্না তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। সভ্য মানুষগুলোকে নয়। মানুষগুলোর গায়ে সভ্য জামাগুলো। তবে সে খুজে খুজে ছোট ছোট শিশুদের গায়ের জামাগুলোই দেখে। তার খুব ভাল লাগে। ভাল লাগে এসব দেখে স্বপ্ন দেখতে। নাহ! নতুন জামার নয়। পুরাতন কিন্তু সুন্দর একটি জামার। সেটা শার্ট হোক কিংবা গেঞ্জি। সভ্য মানুষদের দেখতে দেখতে ইদানিং মুন্নারও খালি গায়ে ঘুরতে কেমন লজ্জা লজ্জা লাগে। রাস্তার পাশে এখন আর সে দাড়িয়ে থাকতে পারে না। এমনভাবে হাটু তুলে বসে থাকে যেন কেউ সামনে থেকে তার খালি গা স্পষ্ট দেখতে না পায়। হাটার সময় তার ইচ্ছা করে দু হাত দিয়ে যতটা সম্ভব তার খালি গা ঢেকে রাখতে। কিন্তু মুন্না এটা করতে পারে না। ছোট হলেও সে এইটুকু বুঝে যে এটা করলে সবাই তাকে ক্ষেপাবে। এমনকি প্যান্ট খুলে সারাদিনের জন্য উলঙ্গও বানিয়ে দিতে পারে। নিজের ভাবনায় নিজেই অবাক হয় মুন্না। এ রকম ঘটনাতো আগেও ঘটেছে। একবার না বহুবার। কই? কখনোতো এমনটা ভেবে ক্ষানিকটা ভয়ে শিওরে উঠেনি তো! তবে কি মুন্না বড় হয়ে গেছে? নাকি সভ্য? গত কয়েকদিন ধরেই মুন্না একটি স্বপ্ন দেখছে। কেউ একজন এসে তাকে একটি জামা দিয়ে যাচ্ছে। এটিও পুরাতনই। লোকটির মুখটি অস্পষ্ট। অনেক চেষ্টা করেও সে লোকটির মুখ দেখতে পারেনি। কিন্তু বাস্তবে তার এই স্বপ্নটি এখনো পূরণ হয়নি। তাকে কেউ জামা দিয়ে যায় নি। জামা লাগবে কিনা তাও কেউ জিজ্ঞেস করে নি। রাস্তায় এক একটি লোককে দেখে মুন্না ভাবে “এই কি সেই লোক? যে আমাকে জামা দিয়ে যাবে। ” লোকটি পাশ কেটে চলে যাবার পর ভাবে “নাহ! এ সে না। তাহলে কি ঐ লোকটা? ...” কোন সভ্য লোক মুন্নার অর্ধউলঙ্গ জীবন ঘুচাতে আসেনি। আসেনি তাকে সভ্য বানাতে। মুন্নার বাবা ফেরি করে চা বিক্রি করে। হুটহাট করেই একটা নতুন জামা কিনতে পারবে না এটা মুন্না জানে। তবুও প্রচন্ড লজ্জার অপঘাত সইতে না পেরে অথবা সভ্য হওয়ার প্রচন্ড ইচ্ছাতে রাতের বেলা কিছুটা আবেগী স্বরে বলে ফেলে “বাজান! আমারে একটা জামা আইনা দিবা? ” যদিও এ অবস্থায় একটা ধমক দেয়ার কথা তবুও কতক্ষন কি চিন্তা করে মুন্নার বাবা বলল “আইচ্ছা! দিমুনি”। ঐদিন রাতে মুন্নার ঘুম হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু সে ঘুমিয়েছে। আর স্বপ্নে সেই অস্পষ্ট মুখের মানুষটিকে দেখেছে। হ্যাঁ! এটা ছিল তার বাবা। তারপর থেকে আর মুন্নার খালি গায়ে ঘুরতে লজ্জা লাগেনা। ভিতরে ভিতরে ভাবটা এমন যে “এইত! আর কয়ডা দিন। তারপরই আমারো হইব” কোন ছেলের গায়ে সুন্দর জামা দেখলেই ভাবে “আমারডাও মনে হয় এমনি সুন্দর হইব। নাইলে এর থাইকাও সুন্দর” আরো কয়েকটা দিন চলে গেল। মুন্নার বাবা এখনো কোন জামা আনে নি। নাহ! প্রতিদিন রাতে বাড়ি ফেরার পর মুন্না তার বাবাকে জামা এনেছে কিনা জিজ্ঞেস করে বিরক্ত করে না। শুধু মাঝে মাঝে সকালে যাওয়ার সময় জিজ্ঞাস করে “আইজ কী আনবা বাজান? ”। প্রতিবার মুন্নার বাবাও জবাব দেয় “দেহি! ” একদিন সকালে মুন্নার পরিচিত প্রশ্নের জবাবে তার বাবা স্পষ্ট জবাব দেয় “হ বাজান। টেকা জমাই ফেলছি। আইজকাই তর জামা আইনা দিমু” ঠিক সে মূহুর্তে মুন্নার ভেতরের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে যে কেউ ই হিমশিম খাবে। তাই কোন প্রকার জটিলতায় না যাওয়াই ভালো। মুন্না আজ নিজের ইচ্ছাতেই বন্ধুদের সাথে প্যান্ট খুলে নাঁচছে। তার মুখে নেই লজ্জার বিন্দুমাত্র চিহ্ন। বরং এক মধুর আনন্দ ভাসছে তার সারা গায়ে। গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত। পাঠক নিজেই গল্পটার এক সুখী সমাপ্তি ভেবে নিত। অথবা সেই রাতেই মুন্নার বাবাকে দিয়ে মুন্নার গায়ে নতুন জামা পরিয়ে দেয়া যেত। কিন্তু না! শুধুমাত্র গল্পকারের সুবিধা কাজে লাগিয়ে আমরা জীবনের কঠিন সত্যকে এড়িয়ে যেতে পারি না। আর তাই গল্পটাও এখানে শেষ হয় না। সারাদিন মনের আনন্দে ঘুরাঘুরি শেষে বাড়ি ফেরার পর থমকে যায় মুন্না। তাদের বাড়ির সামনে এত মানুষ কেনো? ভীড় ঠেলে সামনে যায় মুন্না। একটা চকির মধ্যে কেউ একজন সাদা কাপড় মুড়ো দিয়ে শুয়ে আছে। কেউ একজন মুন্নাকে সেই মানুষটির পাশে নিয়ে দ্বাড় করায়। মুন্না নিজেই মুখ থেকে কাপড়টি সড়ায়। সারা মুখটি আগুনে ঝলসে গেছে তবুও এটাই যে তার বাবা এটা বুঝতে এতটুকু সমস্যা হয়নি মুন্নার। পাশ থেকে কে যেনো বলে ওঠে “এই পেট্রোল বোমা সবাইরে গিল্যা খাইব”। পেট্রোল বোমা কি জিনিস তা জানে না মুন্না। তবুও এটাই যে তার বাবার এই অবস্থা করেছে সেটা সে জানে। সে তার বাবার কানের কাছে মুখটা নিয়ে ফিশফিশ করে বলে… গল্পটা এখানেও শেষ হতে পারত। মুন্নার মনে কিছুটা সস্তা প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়েই আমরা খুব সহজেই পালিয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু একটি শিশুর সরল চাওয়ার আকুতিকে অপূর্ণ রেখে আরেকটি কঠিন বাস্তবতাকে আমরা এত সহজে এড়িয়ে যেতে পারি না। মুন্না তার বাবার কানের কাছে গিয়ে ফিশফিশ করে বলে “বাজান! নতুন জামা পাইলা কই? আমারডা কই? আমারডা কি আন নাই? কি হইল? কতা কওনা কেন? ও বাজান! বাজান! কতা কও না কেন? ” মুন্নাকে জড়িয়ে তার মা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। মুন্না তার মাকে জিজ্ঞাস করে “মা! বাজানের কি হইছে? বাজান কতা কয় না কেন? ” মুন্নার মা আরো জোরে কেঁদে ওঠে। চিৎকার করে বলে “তর বাজান মইরা গেছে। আর কতা কইব না। কুনদিনও না। ” মুন্নার কপালে কি এক চিন্তার ভাজ ফুঁটে ওঠে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বাবার লাশের দিকে। কিছু একটা বলতে যেয়েও বলতে পারছেনা। আমরা তার এই না বলা কথাগুলো বুঝার বৃথা চেষ্টা করি নি। তার অবস্থাটা নিশ্চই আমাদের কল্পনারও বাইরে। কিছুক্ষন পর ই অত্যন্ত বিষ্ময়ের সাথে দেখা যায়, মুন্নার চোখে মুখে কি এক অদ্ভুত আনন্দ। মুখে কেমন অপরিচিত হাসি। এই হাসির অর্থটা কারোর ই জানার কথা নয়। খুশি খুশি গলায় মাকে জড়িয়ে ধরে মুন্না বলছে “চল মা! আমরাও মইরা যাই। বাজানের মত নতুন জামা পামু। ” ***


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯৩ জন


এ জাতীয় গল্প

→ নতুন জামা
→ নতুন জামা

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now