বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ফাতিমার হঠাৎ এই প্রশ্নে আহমদ মুসা মুখ তুলে তাদের দিকে তাকাল। তারপর মুখ নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, ‘নিতে পারি। কিন্তু একটা সমস্যা আছে।’
‘কি সমস্যা?’ বলল ফাতিমা।
‘সমস্যা হলো তোমরা দু’জন বিবাহিত নও।’ আহমদ মুসা বলল।
ফাতিমা ও যায়েদ দু’জনের মুখেই বিস্ময় ফুটে উঠল তারপর লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল মুখ।
সংগে সংগে কথা বলতে পারল না তারা। একটু পর ফাতিমা বলল, ‘আপনার কথা বুঝলাম না ভাইয়া। বিয়ের সাথে আমাদের প্রস্তাবের সম্পর্ক কি!’
‘অনধিকার চর্চার জন্যে মাফ করো বোন। আমি তোমাদের দু’জনের মধ্যেকার বিয়ের কথা বলছি। তোমাদের দু’জনের মধ্যে বিয়ে না হয়ে থাকলে কিংবা বিয়ে না হলে তোমরা দু’জনে যেমন একত্রে এভাবে কাজ করতে পার না, তেমনি তোমরা দু’জনে বিবাহিত হলেই শুধু তোমরা একত্রে আমার সাথে কাজ করতে পার।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এর কারণ কি ভাইয়া?’ ফাতিমাই বলল আবার।
‘ইসলামের বিধান অনুসারে যাদের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ নয়, এমন ছেলে মেয়েরা বিবাহ ছাড়া এভাবে মেলামেশা করতে পারে না। এমনকি ইচ্ছাকৃতভাবে নিভৃতে দু’জনের মধ্যে কিছুক্ষনের জন্যেও দেখা হওয়া নিষিদ্ধ।’
‘নিষিদ্ধ? মানে হারাম?’ বলল ফাতিমা।
‘হ্যাঁ, তাই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কারণ?’ বলল ফাতিমা।
‘কারণ শয়তান মানুষকে খারাপ পথে টেনে নেবার জন্যে সদা প্রস্তুত। আর ইসলাম সকল অঘটনের পথ বন্ধ করতে চায়।’
‘বুঝেছি।’ লাজ রাঙা মুখে বলল ফাতিমা।
একটু থেমেই আবার বলে উঠল, ‘কিন্তু ভাইয়া আমি ও যায়েদ এমন নিভৃতে অনেক বসেছি, মিশেছি।’
‘কিছু ঘটেনি। কিন্তু ঘটবে না এমন কথা কি নিশ্চিত করে বলা যায়? আর ব্যতিক্রম তো থাকতেই পারে। কিন্তু আইন হয় সকলের জন্যে। সকলকেই সেই আইন মানতে হয়। ব্যতিক্রম যারা, তাদেরকেও।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তাহলে তো আমরা এতদিন অপরাধ করেছি ভাইয়া। কিন্তু আমাদের কি দোষ? আমাদের জার্মানীতে মুসলিম পরিবারে এমন মেলামেশা আছে।’ ফাতিমা বলল।
‘আপনি কি ইসলামের সকল বিধিবিধান মেনে চলেন ভাইয়া?’ বলল যায়েদ।
‘পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে অনেক সময়ই পারি না। কিন্তু মানার ইচ্ছা আছে, চেষ্টা আছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আমাদেরও তাই করা উচিত। কিন্তু ভাইয়া আপনি যে বিষয়ে প্রস্তাব করেছেন, সেটা নিয়ে আমি কখনও ভাবিনি। যায়েদ ভেবেছে কিনা জানি না।’ বলল ফাতিমা।
যায়েদের মুখে সলজ্জ হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘আমি ভাইয়ার কাছে মিথ্যা বলব না। মিস ফাতিমা আমাকে মাফ করুন, আমি তাঁকে নিয়ে ভেবেছি।’
‘কিন্তু আমার অজ্ঞাতে সেটা, আমাকে কিছু বলনি কখনও।’ বলল ফাতিমা লজ্জায় লাল হয়ে।
‘দুঃখিত, ভাবনাটা কখন যে আমার মনে এসেছে বলতে পারব না। যখন ভাবনাটা আমার জন্যে সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে, তখন বিষয়টা বার বার আমি তোমাকে বলতে চেয়েছি, কিন্তু তুমি একে কিভাবে নেবে তাই বলতে সাহস পাই নি।’
‘তাহলে তুমি আমাকে ভয় কর দেখছি?’ ফাতিমার ঠোঁটে লজ্জা ও হাসির মিশ্রণ।
‘কারণ, সত্যিই তোমার প্রতি আমি দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম।’ বলল যায়েদ মুখ নিচু করে।
‘ও, এই কারণেই অপ্রয়োজনেও তোমাকে আমার কক্ষে আসতে দেখেছি।’ বলল ফাতিমা। তার কন্ঠে শাসনের সুর।
‘আমি দুঃখিত ফাতিমা আমার দূর্বলতার জন্যে।’ বলল যায়েদ নরম কন্ঠে।
ফাতিমা হেসে উঠল। বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘ভাইয়া, আল্লাহ আমাদের মাফ করুন। আমরা ধরা পড়ে গেছি। আমি বিয়ের কথা ভাবিনি বটে, কিন্তু শুধু যায়েদ নয়, আমিও দেখছি ওর প্রতি দূর্বল হয়ে পড়েছিলাম। আমি ওর ঘরে যাইনি বটে, কিন্তু আমি মনে মনে চাইতাম ও আমার ঘরে আরও বেশি আসুক। আমি আরও স্বীকার করছি ভাইয়া। আপনার কথাই ঠিক। কিছু ঘটেনি বটে, কিন্তু সব কিছুই ঘটতে পারতো। আমি আপনার প্রস্তাবে রাজী ভাইয়া। এখন ওর মত জিজ্ঞাসা করুন।’ ফাতিমার শেষের কথাগুলো কান্নাজড়িত আবেগে রুদ্ধ হয়ে পড়েছিল।
যায়েদ মুখ তুলে বলল, ‘অন্যায় অবাঞ্চিত গোপন দূর্বলতার জন্যে আল্লাহ আমাদের মাফ করুন। অবাধ মেলামেশারই এটা স্বাভাবিক পরিণতি ছিল। ভাইয়া, আপনি ঠিকই বলেছেন এই অবস্থা অব্যাহত থাকা আর এক মুহূর্তও উচিত নয়। ফাতিমাকে ধন্যবাদ। ফাতিমা কি ভাববে এজন্যে আমার রাজী থাকার কথা বলতে পারিনি। আমি আনন্দের সাথে আমার মত দিচ্ছি।’
যায়েদ থামতেই ফাতিমা বলে উঠল, ‘আনন্দ শব্দ যোগ করার কোন দরকার ছিল না। ভাইয়া সম্মতির কথা জানতে চেয়েছেন, কোন বিশেষণ নয়।’
‘স্যরি। তবে এটা খারাপ বিশেষণ নয়, ভাল বিশেষণ।’ যায়েদ বলল।
‘প্যারিসের লোকদের ঘরোয়া বুদ্ধি মোটা শুনেছিলাম। আজ প্রমাণ পেলাম। আমাদের ‘বনে’ ব্যক্তির লজ্জাশীলতা এখনও আছে, প্যারিসে তা নেই।’ বলল ফাতিমা।
‘দেখুন ভাইয়া, ফাতিমা প্যারিস তুলে কথা বলছে। বন আর জার্মানীর কথা আমরা কম জানি না।’ কৃত্রিম ক্ষোভ ফুটে উঠল যায়েদের কন্ঠে।
ফাতিমা কিছু বলতে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা বাধা দিয়ে বলল, ‘বিয়েটা বন-প্যারিসের মধ্যে হচ্ছে না, হচ্ছে ফাতিমা ও যায়েদের মধ্যে। তাদের কালচার শুধুই বন ও প্যারিস ভিত্তিক নয়।’
থামল আহমদ মুসা। থেমেই আবার বলে উঠল, ‘তাহলে তোমরা তোমাদের অভিভাবকদের সাথে কথা বলো। শুভ কাজ সত্ত্বরই হয়ে যাওয়া উচিত।’
বলে আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘মাগরিবের সময় হয়ে গেছে। তোমরা যাও অজু করে এস। দু’জনেই আমার সাথে নামাজ পড়বে।’
ওরাও আহমদ মুসার সাথে উঠে দাড়িয়েছে। আনন্দের সাথে ওরা চলল অজু করার জন্যে।
ঘুম ভেঙ্গে গেল আহমদ মুসার।
একটা শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেছে।
কিসের শব্দ?
ধীরে ধীরে চোখ খুলল আহমদ মুসা।
ঘর অন্ধকার। কিন্তু দক্ষিনের দেয়াল জোড়া নীল পর্দার মধ্যে দিয়ে বাইরের নগর রাতের নিস্তব্ধতা এসে ঘরের দক্ষিণ প্রান্তের স্বচ্ছতা কিছুটা ফিঁকে করে ফেলেছে।
আহমদ মুসা চোখ খোলার পর তার চোখ আশপাশটা ঘুরে এসে প্রথমেই সোজা গিয়ে নিবদ্ধ হলো দক্ষিণ দেয়ালের পূব প্রান্তের তার বরাবর পর্দার উপর। চোখ পড়তেই আটকে গেল সেখানে তার চোখ। পর্দা নড়ছে।
কেন নড়ছে? দক্ষিণে গোটাটাই কাঁচের দেয়াল। কোন ফাঁক নেই। বাতাসের প্রবাহ প্রবেশের কোন সুযোগ নেই। তাহলে নড়বে কেন পর্দা?
নড়ে উঠা পর্দা আবার স্থির হয়েছে।
আহমদ মুসা চোখ সরায়নি পর্দার সেই অংশের উপর থেকে।
মুহূর্তকাল পরেই পর্দা ধীর গতিতে আবার দুলে উঠল এবং সেই সাথে একটা চলন্ত ছায়ামূর্তি পর্দা ঠেলে বেরিয়ে এল।
ঘরের অন্ধকারে ছায়ামূর্তিটিকে আরও গাঢ় অন্ধকার দেখাচ্ছে। অন্ধকারের মধ্যে আহমদ মুসা দেখল ছায়ামূর্তিটির ডান হাত কোমর পর্যন্ত উচুঁতে প্রসারিত। দেহটি সামনের দিকে একটু বেঁকে আসা।
লোকটির ডান হাতে রিভলবার এবং সে আক্রমণাত্মক ভংগিতে পা পা করে অতি সাবধানে তার বেডের দিকে এগিয়ে আসছে।
বুঝল আহমদ মুসা কি ঘটতে যাচ্ছে।
শক্ত হয়ে উঠল আহমদ মুসার দেহ। তার চোখ দু’টি স্থির নিবদ্ধ লোকটির উপর।
আস্তে আস্তে আহমদ মুসা তার ডান হাত বালিশের তলায় নিল। কিন্তু হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ল কার রিভলবারটা জ্যাকেটের পকেটেই রয়ে গেছে। গত রাতে বাইরে থেকে ফেরার পর রিভলবারটা রীতি অনুসারে পকেট থেকে বের করে বালিশের তলায় রাখা হয়নি।
মনটা খারাপ হয়ে গেল আহমদ মুসার। যেদিন প্রয়োজন সেদিনই তার এ ভূলটা হয়ে গেছে।
লোকটি এগিয়ে আসছে।
শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ঘুমের ভান করে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আহমদ মুসা। যেহেতু ওর হাতে রিভলবার, তাই সে দূরে থাকতে প্রতিরোধ বা প্রতিআক্রমনের চেষ্টা করে লাভ নেই।
লোকটি খাটের কাছাকাছি পৌঁছে খাট ঘুরে আহমদ মুসার পেছন দিক থেকে সামনের দিকে অগ্রসর হলো। খাটের পশ্চিম পাশ দিয়ে আহমদ মুসার মাঝ বরাবর আসার পর লোকটি বাম হাত থেকে ডান হাতে রিভলবারটি নিল এবং লোকটির ডান হাত ঢুকে গেল তার পকেটে। বেরিয়ে এল সাদা রঙের কিছু একটা নিয়ে।
আহমদ মুসা বুঝল ওটা একটা সাদা রুমাল। সাদা রুমাল কেন? মনে প্রশ্নটা জাগার সাথে সাথেই আহমদ মুসা বুঝল, নিশ্চয় ঐ রুমালের ভেতর রাখা আছে ক্লোরোফরম ক্যাপসুল। হাতের চাপে ওটা ভেঙে নিয়ে রুমাল নাকে চাপার সেকেন্ডের মধ্যেই একজন মানুষ সংগা হারিয়ে ফেলে।
লোকটির পরিকল্পনা বুঝে খুশি হলো আহমদ মুসা। এখন আহমদ মুসা নিশ্চিত যে, সে প্রথমেই গুলী করবে না।
লোকটি আহমদ মুসার ডান পাশ ঘুরে তার মাথার পেছনে আসছিল। তার রিভলবার ধরা বাম হাতটি তখন আহমদ মুসার ডান বাহুর উপরে। রিভলবারের নল আহমদ মুসার দেহকে তাক করে নয়, বুকের উপর দিয়ে সমান্তরাল।
আহমদ মুসা বুঝতে পারল, লোকটি মাথার পেছনে দাঁড়িয়ে তাকে ক্লোরোফরম করতে চায়। যাতে আহমদ মুসার ঘুম ভাঙলেও হাত দিয়ে আক্রমন করার উপযু্ক্ত সুবিধা না পায়।
তার আগেই তার হাতে যে সুবর্ণ সুযোগ এসেছে তার সদ্ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিল। এমন একটি নিরাপদ সুযোগেরই সে অপেক্ষা করছিল।
সিদ্ধান্তের সাথে সাথেই কাজ।
আহমদ মুসার ডান হাত বিদ্যুত বেগে উঠে এল এবং আঘাত করল লোকটির রিভলবার ধরা বাম হাতে।
রিভলবার তার হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল।
আহমদ মুসা তার দেহটাকে একটা পাক দিয়ে মেঝেয় নেমে দাঁড়াল। কিন্তু আহমদ মুসা স্থির হয়ে দাঁড়াবার আগেই লোকটি আহমদ মুসার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
আহমদ মুসা সরে দাঁড়াবার সুযোগ পেল না। সে পড়ে গেল মেঝের উপর এবং তার দেহের উপর এসে পড়ল লোকটি।
লোকটি এসে পড়ার সাথে সাথেই আহমদ মুসা তাকে কঠিনভাবে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ফেলল, যাতে সে এ্যাকশনে যাবার সুযোগ না পায়। তারপর আহমদ মুসা লোকটির পাল্টা কিছু শুরু করার আগেই নিজের দেহটায় একটা মোচড় দিয়ে লোকটিকে নিচে ফেলল। তারপর তাকে কাবু করার জন্যে আহমদ মুসা তার বুকে উঠে বসার জন্যে দেহটাকে একটু গুটিয়ে নিতে গেল। তার ফলে স্বাভাবিকভাবেই আহমদ মুসার দেহের চাপ কিছুটা লুজ হয়েছিল মুহূর্তের জন্যে। এই সুযোগই কাজে লাগাল লোকটি। সে দেহটাকে একটা প্রচন্ড ঝাঁকুনি দিয়ে আহমদ মুসাকে ছিটকে ফেলে আবার সে আহমদ মুসার উপর চেপে বসল।
কিন্তু সেও আহমদ মুসাকে সামলাতে পারল না। আহমদ মুসা আবার লোকটিকে ফেলে দিয়ে তার উপর চড়ে বসল।
ঠিক এই সময় অন্ধকারের ভেতর থেকে একজন এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল আহমদ মুসার উপর।
আহমদ মুসার উপর ঝাপিয়ে পড়া এই লোকটি দক্ষিণ দেয়ালের পশ্চিম পাশ দিয়ে কাঁচ কেটে ভিতরে প্রবেশ করেছিল। আহমদ মুসার নজর শুধু পুব দিকে নিবদ্ধ ছিল বলে পশ্চিম দিক দিয়েও যে আরেকজন ঘরে প্রবেশ করছে সেটা দেখতে পায়নি।
লোকটি এতক্ষন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে শত্রু-মিত্র চেনার চেষ্টা করেছে। নিশ্চিত হয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়েছে আহমদ মুসার উপর।
আহমদ মুসা ছিটকে পড়ল পাশেই। আকষ্মিক এই আক্রমনের জন্যে প্রস্তুত ছিল না আহমদ মুসা। ঘাড়ে আঘাত পেল সে।
ছিটকে পড়ার পর নিজেকে সামলে নিতে একটু দেরী হলো আহমদ মুসার। নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। এ সময় ওরা দু’জন এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর।
আহমদ মুসা চিৎ হয়ে আছড়ে পড়ল আবার।
আছড়ে পড়ার পর আহমদ মুসা অনুভব করল তার ডান হাত গিয়ে পড়েছে একটা শক্ত ধাতব জিনিসের উপর। হাত নেড়ে পরীক্ষা করে আনন্দিত হলো আহমদ মুসা ধাতব জিনিসটি একটি রিভলবার। আহমদ মুসার মনে পড়ল এই রিভলবারটিই প্রথম লোকটির হাত থেকে ছিটকে পড়েছিল।
ওরা দু’জন এসে চেপে বসেছিল আহমদ মুসার উপর। ক্লোরোফরমের গন্ধ আবার পেল আহমদ মুসা। বুঝল, ওরা তাকে সংগাহীন করার চেষ্টা করছে।
আহমদ মুসা তার ডান হাত সক্রিয় করল। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, রিভলবার ব্যবহার না করে উপায় নেই।
ডান হাতটা টেনে এনে আহমদ মুসা প্রথম গুলীটা করল তার উপর চেপে বসা একজনের বুকের পাঁজরে ঠেকিয়ে।
লোকটা বুক ফাটা চিৎকার করে তার বুকের উপর থেকে উল্টে পড়ল তার পাশের লোকটির উপর।
আহমদ মুসা আর ঝুঁকি নেয়া ঠিক মনে করল না। দ্বিতীয় লোকটির হাতে রিভলবার থাকতে পারে। সে এবার রিভলবার ব্যবহারে মরিয়া হয়ে উঠবে।
ইতিমধ্যে পাশের লোকটি চিৎকার করে উঠেছে, ‘কুত্তার বাচ্চা গুলী করেছ। তোমাকেও মরতে.....’
লোকটি কথা শেষ করতে পারল না। আহমদ মুসার রিভলবার শব্দ লক্ষ্যে পর পর দু’বার অগ্নিবৃষ্টি করল।
লোকটি চিৎকার করারও সুযোগ পেল না। নিরব হয়ে গেল।
উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। কক্ষের আলো জ্বেলে দিয়ে সোজা টেলিফোনের কাছে গেল। টেলিফোন করল হোটেল সিকুরিটিকে। বলল, ‘আমার ঘরে দু’জন লোক ঢুকে আমাকে আক্রমন করেছিল। দু’জনেই নিহত হয়েছে। আপনার আসুন, পুলিশে খবর দিন।’
সংগে সংগেই হোটেল সিকুরিটির লোকেরা এসে গেল। দশ মিনিটের মধ্যেই এসে গেল পুলিশ। এল গোয়েন্দা বিভাগের লোকজনও।
পুলিশের হাঙ্গামা শেষ হতে সকাল ৮টা বেজে গেল। পারিপার্শ্বিক সব তথ্যাদি পাওয়ার পর পুলিশ আহমদ মুসার বক্তব্য গ্রহন করেছে। প্রথমত, প্রমাণিত হয়েছে লোক দু’জন হোটেলের সম্মুখ দরজা দিয়ে বৈধভাবে প্রবেশের কোন রেকর্ড নেই। দ্বিতীয়ত, প্রমাণিত হয়েছে অসৎ উদ্দেশ্যে তারা লাইলন কর্ড ব্যবহার করে পেছন দেয়াল বেয়ে আহমদ মুসার ঘরে প্রবেশ করেছে। লোক দু’জনের জুতার তলায় হোটেলের দেয়ালের পিংক রং পাওয়া গেছে। তৃতীয়ত, গোয়েন্দা পুলিশের মাইক্রো এক্সরে ক্যামেরায় দক্ষিণ দেয়ালের যে গ্লাস কেটে ওরা দু’জন প্রবেশ করেছিল, তাতে তাদের আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে। চতুর্থত, ক্লোরোফরম লোক দু’জনই বহন করেছে তার প্রমাণ তাদের পকেট থেকে পাওয়া গেছে। সর্বশেষ আহমদ মুসার হাতে যে রিভলবার আছে তাতে নিহত দু’জনের একজনের হাতের আঙুলের ছাপও পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে, আহমদ মুসা নির্দোষ এবং লোক দু’জন আহমদ মুসাকে কিডন্যাপ করতে এসেই নিহত হয়েছে। তাদের মোটিভ হিসেবে রেকর্ড করেছে, স্পুটনিক ঘটনায় অপহৃতদের দু’জন আত্মীয় আহমদ আবদুল্লাহ (আহমদ মুসা)সহ এসেছেন স্ট্রাসবার্গে স্পুটনিকের ব্যাপারে খোঁজ নিতে এবং স্পুটনিকের ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তাদের আক্রমনের এরা শিকার হয়েছে।
পুলিশ এই কেসকে ডাকাতি ও অপহরণ করার চেষ্টার মামলা হিসেবে গ্রহন করে আহমদ মুসাকে সব সন্দেহ ও দায় থেকে অব্যাহতি দিয়েছে এবং পুলিশবাদী কেস হিসেবে একে গ্রহন করা হয়েছে।
আহমদ মুসার কক্ষকে পুলিশ সীল করল। হোটেল কর্তৃপক্ষ আহমদ মুসাকে হোটেলের সর্বোচ্চ তলায় একটা অধিকতর নিরাপদ কক্ষ বরাদ্দ করল।
পুলিশ চলে যেতেই ফাতিমা কামাল আহমদ মুসাকে বলল, ‘ভাইয়া, বেয়ারা আপনার সুটকেস আপনার ঘরে নিয়ে যাক। আপনি এখন আমার ঘরে চলুন। ওখানে যায়েদ অপেক্ষা করছে। অনেক জরুরী কথা আছে।’
বলেই, ফাতিমা কামাল বেয়ারাকে আহমদ মুসার সুটকেস তার কক্ষে নিয়ে যাবার নির্দেশ দিয়ে আহমদ মুসার হ্যান্ড ব্যাগটা হাতে তুলে নিয়ে হাঁটতে শুরু করে বলল, ‘আসুন ভাইয়া’।
আহমদ মুসা তার সাথে হাঁটতে শুরু করল।
ফাতিমা কামালের ঘরে এসে বসল সবাই।
আহমদ মুসা বসতেই যায়েদ বলে উঠল, ‘আল্লাহর হাজার শোকর যে, তিনি ভয়ংকর ঘটনা থেকে আপনাকে রক্ষা করেছেন, আমাদেরকেও সাহায্য করেছেন।’
‘আমার কিন্তু এখনও স্বপ্ন মনে হচ্ছে যায়েদ। অন্ধকার রাত। দু’জন লোক টার্গেট করে দেখে শুনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু যারা আক্রমন করল তাদেরকে তাদেরই রিভলবার দিয়ে হত্যা করা হলো। এ যেন জগতের শীর্ষ এক গোয়েন্দা কাহিনী।’ বলল ফাতিমা কামাল।
‘তুমি ঠিকই বলেছ ফাতিমা। আশায় আমার বুক ভরে উঠেছে। আমাদের জন্যে যা অসম্ভব, আমাদের জন্যে যা অকল্পনীয়, সেটাই আমাদের এই নতুন ভাইয়ার জন্যে খুবই সাধারণ। আল্লাহ তাঁকে পাঠিয়েছেন আমাদের মহাসংকটে। বুক আমার ভরে উঠেছে আশায়।’ বলল যায়েদ।
‘একজন গোয়েন্দা অফিসার কি মন্তব্য করেছেন জান। বলেছেন, ‘আটঘাট বাধাঁ ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচা অসম্ভব ছিল। মি.আহমদ আবদুল্লাহ নিশ্চয় অসাধারণ লোক।’ বলল ফাতিমা কামাল।
‘এই জন্যেই বিপদ তাঁর উপর এসে চেপে বসেছে। নতুন বিপদও আসন্ন।’ যায়েদ বলল।
‘কি বিপদ?’ সংগে সংগেই প্রশ্ন করে উঠল ফাতিমা কামাল। উদ্বেগে তার দু’চোখ কপালে।
‘ঐ বিপদের কথাই তো তোমাকে বলেছি। ভাইয়াকে এখনই আসতে বলেছিলাম সে কথা বলার জন্যেই।’ বলল যায়েদ।
‘বল তাড়াতাড়ি।’ ফাতিমা কামাল বলল।
‘রাতে ঘটনার খবর পাওয়ার পর থানা কর্মকর্তার সাথে পুলিশের যে বড় অফিসার, সহকারী পুলিশ কমিশনার এসেছিলেন, তিনি আমার পরিচিত। আমার এক বন্ধুর বড় ভাই। ভোর পর্যন্ত তিনি এখানে ছিলেন। তারপর চলে যান। দশ মিনিট আগে আমাকে টেলিফোন করে ভয়াবহ খবর দিলেন। সেটা হলো, পুলিশ কমিশনার হঠাৎ উল্টে গেছেন। তিনি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন সুযোগমত কোন রেকর্ড বা সাক্ষী না রেখে ভাইয়াকে গ্রেপ্তার করতে। তিনি মনে করেন, ভাইয়াকে যারা অপহরণ করতে গিয়েছিল তাদের পেছনে সাংঘাতিক বড় কোন পক্ষ আছে, হতে পারে তারা স্পুটনিক ধ্বংস ও এর ৭জনকে অপহরণ করার সাথে জড়িত। তিনি আশংকা করেন পুলিশ ভাইয়াকে ধরে নিয়ে গিয়ে ঐ পক্ষের হাতে তুলে দিবে।’ থামল যায়েদ।
সংগে সংগেই ফাতিমা কামাল বলে উঠল, ‘কিভাবে পুলিশ গ্রেফতার করবে? পুলিশের স্পট ইনভেস্টিগেশন রিপোর্টের (SIP) যে কপি ভাইয়াকে পুলিশ দিয়েছে তাতে তাকে সব সন্দেহ থেকে মুক্ত করা হয়েছে।’
‘বললাম তো, পুলিশ তো আইনের মাধ্যমে গ্রেপ্তার দেখাবে না। কোন রেকর্ড বা সাক্ষী না থাকে এমনভাবে কথা বলার জন্যে তাকে তুলে নিয়ে এবং তারপর গায়েব করবে।’ বলল যায়েদ ফারুক।
‘ফরাসী পুলিশের একজন শীর্ষ অফিসারকে এইভাবে মুহূর্তে পাল্টে ফেলল, এই পক্ষটা আসলে কে?’ ফাতিমা কামাল বলল।
যায়েদ ফারুক কিছু বলল না।
আহমদ মুসার ঠোঁটের কোণে কেবল এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘চিন্তা করো না ফাতিমা। নিশ্চয় শীঘ্র তাদের পরিচয় দিনের আলোতে বেরিয়ে আসবে। সে পর্যন্ত ধৈর্য্য ধর।’ বলল আহমদ মুসা শান্ত কন্ঠে।
‘আল্লাহ সেটা করুন, কিন্তু তার আগে তো মহাবিপদ। সব তো শুনলেন ভাইয়া, আমরা এখন কি করব?’ ফাতিমা কামাল বলল।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘চিন্তার কিছু নেই। শত্রুরা এসব করে আমাদেরই সাহায্য করছে।’
‘কিভাবে ভাইয়া?’ দু’চোখে কপালে তুলে প্রশ্ন করল যায়েদ ফারুক।
‘শত্রুরা আমাদেরকে চেনে, আমরা তাদের চিনি না। তারা এ্যাকশনে না এলে আমরা এ্যাকশনে যাব কি করে?’ বলল আহমদ মুসা।
‘বুঝলাম। তারা এ্যাকশনে এল। সেই পরিমাণে এ্যাকশনে যাবার ক্ষমতা কি আমাদের আছে? তার উপর দেখছি পুলিশ ওদের সহযোগিতা করবে বলল।’
‘এটা নতুন কিছু নয়। পুলিশের একটা গ্রুপ নিশ্চয় ওদের সহযোগিতা করে আসছে। তা না হলে স্পুটনিক মামলাটা এগুচ্ছে না কেন?’
‘ডবল বিপদ। এখন তাহলে আমাদের কি করণীয়? বুঝা যাচ্ছে, পুলিশ এখন ওঁৎ পাতছে আপনাকে ধরার জন্যে।’ উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল ফাতিমা কামাল।
‘এত উদ্বিগ্ন হবার কিছু নেই বোন। হোটেল কর্তৃপক্ষকে আমি এখনি জানিয়ে দিচ্ছি। হোটেলে কক্ষ আমার ঠিকই থাকবে। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে আমি বাইরে থাকব।’ শান্ত কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
‘আমরা কোথায় যাবো?’ জিজ্ঞেস করল ফাতিমা কামাল।
‘তোমাদেরকে হোটেল ছেড়ে দিতে হবে। তোমরা তোমাদের আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে উঠবে। অথবা বাড়ি চলে যাও।’ বলল আহমদ মুসা।
‘না ভাইয়া। আত্মীয়রা এমনিতেই বিপদের মধ্যে আছে। তাদের বিপদ বাড়াতে চাই না। আপনাকে সে খবর তো এখনও বলিনি। আমাদের দু’জনের আত্মীয়ের বাসা আজ রাতে তন্ন তন্ন করে সার্চ করা হয়েছে। অন্যান্য...............’
কথা শেষ করতে পারলো না যায়েদ। আহমদ মুসা তার কথার মাঝখানে বলে উঠল, ‘তোমাদের দু’জন আত্মীয় মানে আব্দুল্লাহ আল ফারুক ও কামাল সুলাইমানের বাসা?’
‘জি ভাইয়া।’ বলল যায়েদ।
‘কারা সার্চ করেছে, পুলিশ?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘পুলিশ নয়। অন্য কেউ। বাড়ির সবাইকে ক্লোরোফরম করে অঢেল সময় নিয়ে তারা বাড়িতে কি যেন খুঁজেছে। প্রতিটি সুটকেস, ব্যাগ, কাপবোর্ড, ড্রয়ার, আলমিরাসহ বাড়ির প্রতিটি ইঞ্চি জায়গা তারা সার্চ করেছে। এমন কি সোফা, চেয়ারের গদিও তারা ফেঁড়ে দেখেছে।’ বলল যায়েদ।
‘অন্য পাঁচজনের বাসা?’ আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল।
‘খবর জানতে পারিনি। তবে আরও জানতে পেরেছি, আব্দুল্লাহ আল ফারুক ও কামাল সুলাইমানের বন্ধু বান্ধব ও আত্মীয় স্বজন যারা স্ট্রাসবার্গে আছেন, তাদের বাসাও এভাবে সার্চ করা হয়েছে।’ বলল যায়েদ।
‘বল কি?’
বলে আহমদ মুসা অল্প কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, ‘কোন অতিমূল্যবান দলিল বা কোন প্রমাণ তারা হাত করতে চায়। কিন্তু সে দলিল বা প্রমাণ কোথায় আছে তা তারা জানে না। আমার মনে হচ্ছে, অন্য পাঁচজনের বাড়ি ও তাদের বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় স্বজনের বাড়িও আজ রাতে সার্চ করা হয়েছে।’
থামল আহমদ মুসা। কিন্তু তার কপাল তখনও কুঞ্চিত। ভাবছে সে। আবার সে বলা শুরু করল, ‘এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আমার তিনটা জিনিস মনে হচ্ছে-এক, ৭জন যাদের অপহরণ করা হয়েছে তাদের ইন্টেরোগেট করেও কোন এক মূল্যবান দলিলের হদিস বের করতে শত্রুরা পারেনি। অবশেষে নিজেরাই দলিল উদ্ধারে বের হয়েছে। দুই, সবকিছু সমেত স্পুটনিক অফিস পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও কোন অতি গুরুত্বপূর্ণ দলিল বা প্রমাণ এখনও অক্ষত আছে যা স্পুটনিক অফিসের বাইরে কোথাও সরিয়ে রাখা হয়েছিল। তিন, আমার মনে আশা জাগছে, এই দলিল হাত করার পূর্ব পর্যন্ত অপহৃতদের শত্রুরা হত্যা করবে না।’ থামল আহমদ মুসা।
ফাতিমা ও যায়েদ হা করে তাকিয়ে আছে আহমদ মুসার দিকে। ফাতিমার দু’চোখের কোনায় অশ্রু চিক চিক করছে।
দু’জনেই কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।
প্রথম তাদের নিরবতা ভাঙল ফাতিমা। বলল, ‘ভাইয়া, আল্লাহ আপনার কথা মঞ্জুর করুন। তারা বেঁচে আছেন, একথা সত্য হোক।’ কান্নায় ভারী হয়ে গেল ফাতিমার কন্ঠ।
‘ভাইয়া, আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। আপনার মত সাহসী, শক্তিমান ও তীক্ষ্ণধী সংগ্রামী মানুষের আমাদের প্রয়োজন ছিল। আল্লাহ তা পূরণ করেছেন।’
বলে একটু থেমেই আবার বলা শুরু করল, ‘ভাইয়া, বাড়ি সার্চ করা থেকে আপনি যে তিনটি জিনিস বের করে আনলেন, তার প্রতিটি অক্ষর আমার কাছে সত্য মনে হচ্ছে। ভাইয়া বলুন, এখন আমরা কি করতে যাচ্ছি। আমরা তিনজনেই তো একটা বাড়ি নিতে পারি।’
‘না, তোমরা এক সাথে বাড়ি নিতে পার না। তোমরা...........’
আহমদ মুসাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে মাঝখান থেকে যায়েদ বলে উঠল, ‘ভাইয়া, আমি ও ফাতিমা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। দু’জনের পরিবারকেও জানিয়েছি। এখন আপনার অনুমতি হলেই আমরা বিয়ে করতে পারি।’ লজ্জা সংকোচে বিব্রত কন্ঠ যায়েদের।
লজ্জা এসে ছেয়ে ফেলেছে ফাতিমার মুখে। রাঙা হয়ে উঠেছে তার মুখমন্ডল। নত মুখে সেও বলে উঠল, ‘ভাইয়া, ও ঠিকই বলেছে।’
‘আমার অনুমতি কেন?’ আহমদ মুসা বলল।
‘ভাইয়া, আপনাকেই আমরা প্রকৃত অভিভাবক মনে করছি। আপনি যেভাবে আমাদের কল্যাণ কামনা করেছেন, যেভাবে আপনি আমাদের ব্যক্তি জীবনের দিকে তাকিয়েছেন, খোলামেলা পরামর্শ দিয়েছেন, সেভাবে আমাদের পরিবার আমাদের দিকে কখনও তাকায়নি।’ বলল যায়েদ।
‘তবু আমি তোমাদের পরিবারের কেউ নই। পরিবারের অনুমতি তোমাদের অবশ্যই নিতে হবে। তোমরা পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার মাধ্যমে তাদেরকে দায়িত্বশীল করে তুলতে হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কিন্তু সব মুসলমানই তো ভাই ভাই এবং একটি পরিবারের মত।’ বলল ফাতিমা কামাল।
‘হ্যাঁ, ইসলাম এটা বলেছে। কিন্তু সেই সাথে পারিবারিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করতে বলেছে এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া প্রথম কর্তব্য বলে উল্লেখ করেছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ঠিক আছে ভাইয়া। আমরা পরিবারকে জানিয়েছি মানে তাদের অনুমতিও নিয়েছি।’ বলল ফাতিমা।
‘ধন্যবাদ। তাহলে যায়েদ তুমি প্যারিসে তোমার দু’একজন নিকটতম লোকদের নিয়ে জার্মানির বনে ফাতিমার বাড়িতে যাও। সেখানেই বিয়ে অনুষ্ঠিত হোক।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ভাইয়া, তাহলে আপনাকে যেতে হবে। সবাই খুশি হবে।’ বলল ফাতিমা।
‘পরে যাব। তোমাদের দু’জনের শুধু নয়, স্পুটনিকের ৭জনের পরিবার সম্পর্কে আমার দারুণ আগ্রহ। পরিবারগুলোকে আমি দেখতে চাই, তাদের কথা শুনতে চাই। কি করে এই ঐতিহাসিক ও সেকুলার পরিবারগুলো থেকে স্পুটনিকের জন্ম হলো, তা জানার আমার ইচ্ছা অসীম। এই পরিবারগুলো একদিন মুসলিম বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে, মুসলিম উম্মাহর বর্তমান বিপর্যয়ের জন্যে এই পরিবারগুলো বিরাটভাবে দায়ী। সেই পরিবার থেকেই আবার স্পুটনিকের জন্ম কেমন করে হলো তা আমি জানতে চাই।’ থামল আহমদ মুসা। আবেগে তার কন্ঠ ভারী হয়ে উঠেছিল।
ফাতিমা ও যায়েদের বিস্ময় ও শ্রদ্ধামিশ্রিত চার চোখ নিবদ্ধ ছিল আহমদ মুসার উপর। বলল, ভাইয়া, চাচাতো ভাই কামাল সুলাইমানের পরিবর্তন কিভাবে হলো সেটা আমাদের কাছে বিস্ময়। মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের উত্তর পুরুষ কামাল সুলাইমান কামাল আতাতুর্কের মতই ইসলামের প্রতি ক্রিটিক্যাল ছিল। নিউইয়র্কের টুইন (লিবার্টি ও ডেমোক্রেসি)টাওয়ার ধ্বংসের জন্যে মুসলমানরা যখন অভিযুক্ত হলো, তখন সে ইসলাম ও মৌলবাদী মুসলমানদের গালিগালাজ করার ব্যাপারে অন্যান্যা জার্মানদের চেয়েও অগ্রণী ছিল। তারপর হঠাৎ করে তার পরিবর্তন ঘটল। শুধু তার পরিবর্তন নয়, গোটা পরিবারকেও সে পরিবর্তন করে ছেড়েছে। আমার সাথে দেখা হলেই বলতো, ‘হাসবি কম। মনে রাখবি তুই মজলুম মুসলিম জাতির একজন সদস্য।’ মাঝেই মাঝেই আরও বলত, ‘জানিস মুসলমানদের উপর আজ যে যুলুম চলছে তার জন্যে মুসলমানরা দায়ী নয়, দায়ী একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। যারা মুসলমানদের ঘর বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছে, যারা তাদের সহায় সম্পত্তি কেড়ে নিয়েছে, তারাই পুলিশ সেজে চুরি ডাকাতির অভিযোগে মুসলমানদের গ্রেফতার করছে এবং নিজেরা চুরি ডাকাতি ও খুন জখম সংঘটিত করে মুসলমানদের ফাঁসিতে লটকাচ্ছে।’ থামল ফাতিমা। কান্নায় রুদ্ধ হয়ে উঠেছিল তার কন্ঠ।
আহমদ মুসা সংগে সংগে কথা বলল না। তারও মুখ গম্ভীর হয়ে উঠেছে।
যায়েদের মুখ নিচু।
আহমদ মুসাই নিরবতা ভাঙল। বলল, ‘আলহামদুল্লিাহ। কামাল সুলাইমান ‘কামাল’ না হয়ে ‘সুলাইমান’ হয়েছেন।’
‘বুঝলাম না ভাইয়া।’ বলল যায়েদ।
‘অর্থ হলো কামাল সুলাইমান তুরষ্কের মোস্তফা কামাল না হয়ে তুরষ্কের ওসমানীয় খিলাফতের ‘সুলাইমান, দি ম্যাগনিফিসেন্ট’ হয়েছেন। সুলাইমান দি ম্যাগনিফিসেন্ট (১৪৯৪ খৃঃ-১৫৬৬খৃঃ) তুর্কি খিলাফতের সবচেয়ে সফল শাসক। গোটা ভূমধ্যসাগরে তার নৌবাহিনী ছিল অপ্রতিরোধ্য।’
কথা শেষ করে একটু থামতেই আহমদ মুসা আবার বলে উঠল, ‘ইতিহাসের এসব কথা থাক। এস, বর্তমান নিয়ে ভাবি।’
ফাতিমা কামাল চোখ মুছে বলল, ‘আপনিও আমাদের সাথে ‘বন’ এ যাবেন, একথা এখনও বলেননি।’
‘না বোন এ সময় নয়। শত্রুরা অনেক কাছাকাছি এসেছে। এ সময় দূরে সরা যাবে না। ওরা আমাদের বাড়িতে ঢুকেছে, এখন আমরা ওদের বাড়িতে ঢুকতে চাই।’ বলল আহমদ মুসা নরম কন্ঠে।
‘তাহলে ‘বন’ থেকে ওদের আসতে বলি। যায়েদও বলুক তার পরিবারকে আসার জন্যে। বিয়ে স্ট্রাসবার্গেই হবে।’ ফাতিমা বলল দৃঢ় কন্ঠে।
‘ফাতিমা ঠিকই বলেছে। এটাই হবে।’ বলে একটু থামল যায়েদ। একটু ভেবে নিয়ে আবার বলল, ‘তাহলে বাড়ি নেয়ার কি হবে? আজ এ মুহূর্তেই তো আপনার হোটেল থেকে সরা দরকার ভাইয়া।’
‘ঠিক আছে। একটা বাড়ি আজই ঠিক করে ফেল। লোকেশন যাতে নিরিবিলি ও নিরাপদ হয়। বাড়িটার এক অংশে আমি থাকব। অন্য অংশে বিয়ের পর তোমরা থাকবে।’
‘তাহলে ভাইয়া, আমি বাড়ির খোঁজে বের হচ্ছি। উঠব, অনুমতি দিন।’
‘ঠিক আছে, আমিও বের হচ্ছি। চল।’
বলে আহমদ মুসা উঠে দাড়াল।
‘কিন্তু বাইরে তো পুলিশ ওঁৎ পেতে আছে।’ এক সাথে বলে উঠল ফাতিমা ও যায়েদ। তাদের কন্ঠে প্রতিবাদের সুর।
‘শুধু পুলিশ কেন, ওরাও ওঁৎ পেতে থাকার কথা।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তাহলে বেরুবেন কেন?’ দুজনেই আবার বলে উঠল।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘পুলিশ এবং ওরা জানে আমি হোটেলে আছি। এই অবস্থায় বাইরে যাওয়া ও ভেতরে থাকা এক কথাই। পুলিশ পক্ষে থাকলে হোটেলের ভেতরটা ওদের জন্যে আরও সুবিধাজনক।’
বলে আহমদ মুসা সোফায় সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘তোমরা চিন্তা করো না। আল্লাহ আছেন।’
উঠে দাড়াল আহমদ মুসা।
যায়েদও উঠে দাড়াল। বলল, ‘আপনি এগোন ভাইয়া, আমি আমার রুম থেকে আসছি।’
যায়েদ সালাম দিয়ে কক্ষ থেকে বেরুবার জন্যে হাঁটতে শুরু করল।
আহমদ মুসাও।
নিরব ফাতিমা। উদ্বিগ্ন তার দু’চোখ। শূন্য দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকল ওদের যাত্রা পথের দিকে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now