বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
৩।
কিছুক্ষণ বসে থাকার পর খন্দকার সাহেবও উঠে
দাড়ালেন। ফিরে যাওয়া দরকার। হাটতে শুরু করলেন
তিনি ঝাউবনের মাঝ দিয়ে। সাজেদুল করিমের
কথাগুলো এখনও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তার। কি
অদ্ভুতই না হতে পারে মানুষের জীবন!
অন্যমনস্ক হয়ে হাটতে হাটতে কখন যে
অন্যদিকে চলে এসেছেন বুঝতে পারেননি
খন্দকার সাহেব। হঠাত করে খেয়াল হল, রাস্তা
অচেনা লাগছে তার। কি করা যায়?শেষ পর্যন্ত যা
হয় হোক ভেবে আবার হাটতে থাকলেন তিনি।
কিছুদুর যাওয়ার পরেই গাছপালার ভেতর একটা ফাকা
জায়গার আভাস দেখা গেল। সেদিকটায় এগিয়ে
গেলেন তিনি।
ফাকা জায়গা নয়, আসলে পুরনো এক বাংলোর
সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন খন্দকার সাহেব।
যেটাকে ফাকা জায়গা ভেবেছিলেন, সেটা
আসলে বাংলোর উঠোন। এই বাংলোর কথাই
তাহলে সেই বৃদ্ধ বলেছিল? পায়ে পায়ে সামনে
এগিয়ে গেলেন খন্দকার সাহেব।
বাংলোতে যে কেউ থাকে না, সেটা বাইরে
থেকেই বোঝা যায়। তবে একথা ঠিক, বৃদ্ধ
মিথ্যে বলেনি। এমন অসাধারন গঠনশৈলী খন্দকার
সাহেব আগে দেখেননি। পুরনো আমলের
কাঠের তৈরি বিশাল দোতলা বাড়ি। বাড়ির পিছনে একটা
পুকুরের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আগাছা বেয়ে
উঠেছে সর্বত্র। বিশাল বিশাল সব গাছ বাড়িটার
চারদিকে একটা রহস্যময় পরিবেশ তৈরি করে
রেখেছে। সূর্য ইতিমধ্যে বেশ ভালভাবে
আলো ছড়াতে শুরু করেছে, কিন্তু এই
সকালবেলায়ও বাংলোর আশেপাশে সম্পুর্ন
অন্ধকার। মাঝে মাঝে দু’একফালি সূর্যকিরণ
আলোআঁধারি আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
হাটতে হাটতে বাংলোর সামনে এসে দাড়ালেন
খন্দকার সাহেব, যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে। কিছু যেন
টানছে তাকে। মোহাবিষ্টের মত হাত তুলে
নিচতলার একটা জানালায় ধাক্কা দিলেন তিনি।
ভেবেছিলেন বন্ধ থাকবে, কিন্তু না। ধাক্কা
দিতেই ক্যাচকোচ শব্দ করে জানালাটা খুলে
গেল। ভিতরে উকি দিলেন খন্দকার সাহেব।
ঘোলাটে অন্ধকার ভেতরে। চোখে একটু
সয়ে আসতেতিনি দেখতে পেলেন, পুরনো
আমলের কিছু আসবাব রয়েছে ভেতরে।
সবকিছুর উপর ধুলোর পুরু আস্তরন। দেয়ালের
সর্বত্র মাকড়সার জাল আর ময়লায় ভর্তি। কতদিন ধরে
এগুলো এখানে পড়ে আছে, কে জানে!
তারপরেই হঠাত করে আঁতকে উঠলেন খন্দকার
সাহেব। আলোআঁধারির মাঝে জানালার সামনে এসে
দাড়িয়েছে এক তরুণী!
নিজের অজান্তেই দুই-তিন পা পিছিয়ে এলেন
খন্দকার সাহেব। ভূতপ্রেতে কোনদিনই তার
বিশ্বাস নেই। কিন্তু এই মুহুর্তে প্রচন্ড ধাক্কা
খেয়েছেন তিনি। প্রায় দৌড়ে সরে আসতে শুরু
করলেন তিনি পুরনো বাড়িটার কাছ থেকে।
ফাকা জায়গাটার প্রায় শেষ মাথায় চলে এসেছেন
তিনি, এই সময় তীক্ষ্ণ এক কণ্ঠস্বরের চিৎকার
ভেসে এল তার কানে। ‘শুনুন!’
থমকে দাড়ালেন তিনি। পা দুটো কেউ যেন
পেরেক দিয়ে আটকে দিয়েছে। দরদর করে
ঘামতে শুরু করেছেন তিনি। তারপর, খুব আস্তে
আস্তে তিনি ঘুরে দাড়ালেন।
বাংলোর সামনে এসে দাড়িয়েছে সেই তরুণী।
পরনে সাদা শাড়ী। খন্দকার সাহেব ঘুরে দাড়াতেই
হাত নেড়ে ডাকল সে। ‘এদিকে আসুন।’
একটু দ্বিধা করে ধীর পায়ে হাটতে শুরু করলেন
খন্দকার সাহেব। মাথার ভিতর চিন্তার ঝড় বইতে শুরু
করেছে তার। এই মেয়ে যে ভূতপ্রেত নয়,
সে ব্যাপারে তিনি মোটামুটি নিশ্চিত। নিজের
বোকামির কথা ভেবে নিজের উপরেই রাগ
হচ্ছে তার এখন। কিন্তু মেয়েটা এই জনমানবহীন
পুরানো বাংলোয় কি করছে? ভূত হিসেবে ধরে
নেয়া ছাড়া আর কোন ব্যখাও তো মিলছে না।
ভাবতে ভাবতে মেয়েটার সামনে এসে দাড়ালেন
খন্দকার সাহেব।
‘পালাচ্ছিলেন কেন? আমাকে দেখে ভয়
পেয়েছিলেন?’ মেয়েটার গলার স্বর কেমন
যেন নিষ্প্রাণ।
‘না, মানে, আমি ঠিক বুঝতে পারিনি এখানে কেউ
আছে। হঠাত করে আপনাকে দেখে তাই চমকে
গিয়েছিলাম। এই বাংলোয় কাউকে দেখতে পাব
বলে আশা করিনি।’ জবাব দিলেন খন্দকার সাহেব।
‘ঠিকই বলেছেন। কেউই বলতে গেলে এই
বাংলোর কথা জানে না, আর এখানে মানুষ বসবাস
করার কথা জানা তো আরও পরের ব্যাপার। তবে
আপনাকে পেয়ে ভালই হল। ভিতরে আসুন। গল্প
করি। অনেকদিন কোন মানুষের সাথে কথা বলা হয়
না।’
‘আমি, মানে... ভেতরে আসব?’ কি বলবেন
বুঝতে পারছেন না খন্দকার সাহেব।
‘অবশ্যই। ভয় পাবেন না, আমি ভূতপ্রেত নই।’ একটু
হাসল মেয়েটা। ‘আসুন।’
ঘুরে দাঁড়িয়ে বাংলোর ভিতরে ঢুকল মেয়েটা।
একটু দ্বিধা করে মেয়েটার পিছন পিছন খন্দকার
সাহেবও পা বাড়ালেন। ‘আপনি কি এখানেই থাকেন?’
জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
‘হ্যা।‘ জবাব দিল মেয়েটা। ‘দোতলায় আসুন।
নিচতলাটা আমি ব্যবহার করি না।’
মেয়েটার পিছু নিয়ে সিড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে
এলেন খন্দকার সাহেব। যে রুমটায় তিনি ঢুকলেন
সেটা বেশ পরিস্কার। কিছু সাধারন আসবাব পাতা
ভেতরে। একটা সোফায় বসলেন তিনি। মেয়েটা
বসল তার সামনে। ‘চা খাবেন?’ মাথা ঝাকিয়ে সম্মতি
দিলেন খন্দকার সাহেব।
‘রাবেয়া!’ ডাক দিল মেয়েটা। একটু পরেই
আরেকটা দরজা দিয়ে এক কিশোরী উকি দিল। ‘চা
দিয়ে যা।‘ নীরবে আবার অদৃশ্য হয়ে গেল
কিশোরী, তবে যাবার আগে খন্দকার সাহেবের
দিকে একটা কৌতূহলী দৃষ্টি দিয়ে গেল।
এই প্রথমবারের মত খন্দকার সাহেব মেয়েটাকে
ভালভাবে দেখার সুযোগ পেলেন। এবং বুঝতে
পারলেন, প্রথমবারেই তার ভুল হয়েছিল। এ
মেয়ে কোনভাবেই তরুণী নয়, বরং যৌবনের
প্রান্তসীমায় পৌঁছেছে অনেক আগে। বয়স
চল্লিশের কম হবে না কোনভাবেই। তবে কিছু
কিছু মানুষ থাকে যাদের দেখলে বয়স তাদের
স্পর্শ করে না, এই মেয়ে তাদের একজন। এবং
সে অসাধারন সুন্দরী। যদিও তাকে মেয়ে না
বলে মহিলা বলাই ভাল। চোখের নিচে আর
কপালে সূক্ষ্ম বলিরেখা আঁচড় কাটতে শুরু
করেছে, তবে দূর থেকে দেখে বোঝার
উপায় নেই।
ইতিমধ্যে খন্দকার সাহেব তার প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে
উঠতে শুরু করেছেন। রাবেয়া চা দিয়ে গেল।
চায়ে চুমুক দিলেন তিনি। এত ভাল চা অনেকদিন
খাননি। প্রশ্ন করলেন, ‘কতদিন ধরে থাকেন আপনি
এখানে?’
‘সঠিকভাবে বলতে গেলে একুশ বছর হতে
চলল।’ বললেন মহিলা।
‘সে তো অনেক লম্বা সময়। আমি তো
ভেবেছিলাম কেউ থাকে না এখানে।’
‘আমি খুব একটা বাইরে বেরোই না, আর একান্তই
বাধ্য হলে রাতের বেলায় বেরোই। রাবেয়া
আছে, ওই আমার সব কাজ করে দেয়।’
‘আপনি একাই থাকেন?’
‘হ্যা।’
‘কিছু মনে করবেন না, আপনি একা একজন মহিলা
বনের ভিতর এই জনমানবহীন বাংলোয় কি কারণে
রয়েছেন? খুব কৌতূহল হচ্ছে আমার।’
মহিলা হাসলেন। ‘একটা গল্প শুনুন তাহলে।’
‘বলুন?’
‘ভাবুন তো, কিশোরী একটা মেয়ে। কলেজে
পড়তে পড়তে প্রেমে পড়েছিল এক যুবকের।
পাগলের মত। শেষে বাবা মা কে না জানিয়ে
দুইজন একদিন পালিয়ে গেল অনেকদূরে।
সমুদ্রের ধারে, বনের ভিতর দু’জন সুখের সংসার
পাতল। স্বপ্নের মত দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল।
কিন্তু সুখ বেশিদিন সইল না মেয়েটার কপালে।
ছেলেটা একদিন সাগরে হারিয়ে গেল। শুধু অসহায়
চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কিছুই করার সাধ্য
ছিল না মেয়েটার।‘ একটু থামলেন মহিলা। ‘খুব করুণ
গল্প, তাই না?’
‘আসলেই। কিন্তু অর্থ কি এই গল্পের?’ বললেন
খন্দকার সাহেব।
‘যদি বলি, গল্পের এই মেয়েটা আমি?’ মহিলার দৃষ্টি
দূরে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
‘সে কি, আপনি...’ কথা শেষ করতে পারলেন না
খন্দকার সাহেব, তার আগেই তীব্র হাসিতে
ভেঙ্গে পড়লেন মহিলা। ‘হ্যা, আমি। আর শুনুন,
এটা মোটেই করুণ কোন কাহিনী নয়। অন্তত
আমার জন্য। বিশ বছর আগে ও যখন মারা গেল,
আমি যে কি খুশি হয়েছিলাম তা ভাষায় প্রকাশ করতে
পারব না। কেন জানেন?’
‘কেন?’ খন্দকার সাহেব অবাক।
‘একুশ বছর আগে যখন ওকে ভালবেসে পালিয়ে
এসেছিলাম, তখন মনে হয়েছিল ওকে ছাড়া এক
মুহুর্তও বাঁচতে পারব না। অথচ, এখানে এসে
দেখলাম এক সম্পুর্ন ভিন্ন চেহারা। ওর হাসিখুশি,
উচ্ছল যে চেহারাটা দেখে আমি ওকে
ভালবেসেছিলাম সেটা ছিল শুধু একটা মুখোশ। ওই
মুখোশের আড়ালে একটা পশু বাস করত। প্রচন্ড
অত্যাচার শুরু করেছিল আমার উপরে। দিনের পর
দিন আমাকে ধরে মারত, সামান্য কারণে। মাঝে
মাঝে খেতে দিত না। আমি কোনদিন কিছু বলিনি,
শুধু মুখ বুজে সহ্য করেছি। কারন মুখ খুললেই ওর
অত্যাচারের মাত্রা যেত দ্বিগুন হয়ে। শুধু কেঁদে
কেঁদে ঈশ্বরকে ডাকতাম। এখন বুঝতে পারি,
নিষ্ঠুরতার মাঝেই ও আনন্দ পেত। স্যাডিস্ট ছিল
একটা।’ গলা কেমন ধরে এসেছে মহিলার।
‘আমার পেটে একটা বাচ্চা এসেছিল, জানেন? শুধু
আমার অনাগত সন্তানের দিকে চেয়ে ওর অত্যাচার
সইতাম। ও কিভাবে যেন বুঝে ফেলল। তারপর
একদিন...’ থেমে গেলেন হঠাত।
খন্দকার সাহেব চাপ দিলেন না। একই দিনে
দু’দুটো নাটকীয় ঘটনার মাঝে পড়ে গেছেন
তিনি। প্রথমে ওই সাজেদুল করিম, তারপর এই মহিলা।
তবে তিনি জানেন, একটু পরেই মহিলা আবার শুরু
করবেন। হলোও তাই।
‘আমার বাচ্চাটা জন্ম নিয়েছিল ঠিকই, তবে মৃত
অবস্থায়। ওর অত্যাচারের ফল। আমি প্রায় পাগল
হয়ে গিয়েছিলাম তারপর। একদিন ও আমাকে একটা
ঘরে তালাবন্ধ করে রেখে চলে গেল। দু’দিন
কোন খবর পেলাম না। তিনদিনের দিন সকালবেলা
হঠাত বাইরে হইচই শুনলাম। কিছুক্ষণ পর ঘরের তালা
ভেঙ্গে আমাকে বের করল কিছু লোকজন।
দেখলাম, উঠোনে আমার স্বামীর লাশ। শুনলাম,
সাগরে ডুবে মারা গেছে।
‘আমি নাকি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। সবাই
ভেবেছিল, শোকের ধাক্কা সহ্য করতে পারিনি।
আসলে উল্টোটা। এতই খুশি হয়েছিলাম যে আমার
দুর্বল শরীর সে উত্তেজনা নিতে পারেনি।
‘তারপর থেকে শুরু হল আমার সুখের দিন। একাই
থাকতাম, আর সারাদিন নিজের মনে ঘুরে বেড়াতাম।
যখনই মনে হত, আমার উপর অত্যাচার করার জন্য
সে আর ফিরে আসবে না, বুকের ভেতর যেন
খুশির ঢেউ উঠত।
‘কিন্তু মানুষ কি একা একা থাকতে পারে, বলুন?
কিছুদিন পরেই আমার নিঃসঙ্গ লাগতে শুরু করল।
কেবল বাচ্চাটার কথা মনে পড়ত আমার। মনে হত,
ও থাকলে আমার আর কিছু লাগত না। সারাদিন ওকে
নিয়েই কাটিয়ে দিতে পারতাম।চিন্তাটা ধীরে
ধীরে আমার মনে শিকড় গাড়তে লাগল। আমি
আবার পাগলের মত হয়ে যাচ্ছিলাম।
‘এইসময়, একদিন বিকেলবেলা বনের ভেতর
আমার সাথে এক তরুণের দেখা হল। ছেলেটা
বোধহয় প্রথম দেখাতেই আমার প্রেমে পড়ে
গিয়েছিল। ভাবলাম, একটু মজা করি না কেন? ওর
সাথে পরিচয় হল। ভান করলাম, আমি এখানে থাকি না।
বেড়াতে এসেছি। সারাদিন একসাথে ঘুরলাম আমরা।
সন্ধ্যার সময় যেন ভুল করে চলে এসেছি এমন
একটা ভাব করে ওকে নিয়ে আসলাম আমার
বাংলোর সামনে। ও অবাক হয়ে গেল বাড়িটা
দেখে। আমরা ঠিক করলাম, আজ রাতটা আমরা হব
রাজারানী, আর এই বাংলো হবে আমাদের
রাজপ্রাসাদ।
‘আপনি কি বলবেন আমি জানি। কিন্তু বিশ্বাস করুন,
এছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিল না। একটা
সন্তানের জন্যে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। ওই
ছেলেটাকে দেখে আমার মনে হয়েছিল যেন
আমার যন্ত্রণা দূর করার জন্যেই ঈশ্বর ওকে
আমার কাছে পাঠিয়েছেন।
‘পরদিন সকালে ও বিদায় নিল। বলল, পরদিন ও ফিরে
যাবে, যাওয়ার আগে আরেকবার আমার সাথে
দেখা করতে চায়। বিকেলে একই জায়গায় দেখা
করব বলে ঠিক করলাম আমরা। তবে ওকে কথা
দিলেও তা রাখার কোন ইচ্ছেই আমার ছিল না।
ঝামেলা বাড়াতে চাইনি আমি। বিকেলবেলা ও যখন
বাংলোর সামনে এসে দাড়াল, আমি আমার জানালা
দিয়েই দেখছিলাম ওকে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে
থেকে চলে গেল। আশাহত হয়েছিল বোধহয়
খুব, সেদিনের পর আর ওকে দেখিনি আমি।
‘নয়মাস পরে আমার ছেলের জন্ম হল। চাঁদের
মত ফুটফুটে, নিষ্পাপ একটা শিশু। ওর মুখ দেখে
সব দুঃখ ভুলে গেলাম আমি। ওর বাবার নামটা আমি
জেনে রাখিনি। তবে রাখলেই ভাল হত। অন্তত
আমার সন্তানের নামটা ওর বাবার নামে রাখতে
পারতাম। তাহলে তার প্রতি আমার ঋণ কিছুটা হলেও
লাঘব হত। আমার মাতৃত্বের স্বাদ তো আমি তার
জন্যেই পেয়েছিলাম। কিন্তু তা তো আর হল না।
তাই আমার ছেলের নাম রাখলাম অর্ক।’ থামলেন
মহিলা।
‘কোথায় আপনার ছেলে এখন?’ জানতে চাইলেন
খন্দকার সাহেব।
‘ও ঢাকায় থাকে। হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা
করছে।’ জবাব দিলেন মহিলা।
‘তারমানে তার পর থেকে এই দীর্ঘ সময় আপনি
এখানে একাই ছিলেন? আপনার যদি মনে হয় আমি
অনধিকার চর্চা করে ফেলছি তবে ক্ষমা করবেন,
কিন্তু আপনার জীবনে কি আর কোন পুরুষের
আগমন ঘটেনি?’
এবার মহিলার মুখটা কেমন যেন রক্তিম হয়ে উঠল,
যেন কিশোরী মেয়েদের মত লজ্জা
পাচ্ছেন তিনি।
‘আশ্চর্য, কিভাবে বুঝলেন আপনি? অর্কর বাবার
প্রতি আমি কোন আকর্ষণ অনুভব করিনি, জানেন?
শুধু একটা সন্তানের আশায় ওর সাথে একটু অভিনয়
করেছিলাম মাত্র। ভেবেছিলাম, আমার ছেলে
আমার মতই হবে। কিন্তু না। ও হল ওর বাবার মত।
অবিকল ওর বাবার চেহারা। ওর বাবার সাথে আমার
পরিচয় ছিল মাত্র একদিনের, তার সম্পর্কে কিছুই
আমি জানতাম না। অর্ককে দেখে আমি ওর বাবাকে
চিনলাম। আর সেই প্রায় অচেনা মানুষটাকে
ভালবাসতে শুরু করলাম।
‘ভেবেছিলাম, এ জীবনে আমার আর কাউকে
ভালবাসার শক্তি শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমার
সে ধারনা ভুল ছিল। আপনি হয়ত ভাবছেন এটা শুধুই
আমার কল্পনা, আমি নিজের মত করে একটা
কাল্পনিক চরিত্র তৈরি করে তাকে ভালবেসেছি।
বিশ্বাস করুন, এটা মোটেই তেমন নয়। তার সবকিছু
আমি জানি। এতদিন পরেও যদি আজ তার সাথে আমার
আবার দেখা হয়, তবে আমি তাকে চিনে নিতে
পারব, একটুও অসুবিধা হবে না। এতদিন তাকে আমি
ভালবেসেছি, মরার আগ পর্যন্ত তাকেই ভালবাসব।‘
কথাগুলো বলতে বলতে মহিলার চোখে ফুটে
উঠেছে অপার্থিব এক আভা।
হঠাত করেই যেন সম্বিত ফিরে এল তার। খন্দকার
সাহেবের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘আমার
এসব উল্টোপাল্টা কথা শুনে আপনি নিশ্চয়ই
আমাকে পাগল ঠাউরে বসে আছেন?’
‘না। আপনার কথাগুলোতে অবিশ্বাস করার কোন
কারন খুঁজে পাইনি আমি। তবে কেন জানি মনে
হচ্ছে, আপনার গল্প আপনি শেষ করছেন না।
কোথায় যেন সুর মিলছে না। আমি কি ঠিক
ধরেছি?’ বললেন খন্দকার সাহেব।
‘আপনাকে দেখলে যতটা মনে হয়, আপনি তার
চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান। আন্দাজ করুন তো, কি
লুকাচ্ছি আপনার কাছে আমি?’
‘আসল খটকাটা লাগছে যেখানে, সেটা হচ্ছে
আপনার কথা অনুসারে এখন আপনি সুখী। আর
কোনকিছুর অভাব নেই আপনার। কিন্তু আপনার
চেহারা তা বলছে না। মনে হচ্ছে কোন একটা
ব্যাপার আপনাকে পীড়া দিচ্ছে। সমস্যাটা কোথায়?
দাঁড়ান, বলবেন না... সম্ভবত আপনার ছেলে।
তাছাড়া আর কোন ব্যাপারে আপনি এতোটা উদ্বিগ্ন
হবেন না। ঠিক ধরেছি?
‘ঠিক।’ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মহিলা। ‘অর্ককে
এতদিন ওর বাবা সম্পর্কে কিছু জানতে দিইনি আমি।
জিজ্ঞেস করলে বলেছি ওর জন্মের আগেই
ওর বাবা মারা গেছে। এর বেশি কিছু জানতে চাইলে
আমি চুপ করে থাকতাম।’
‘সমস্যাটা তাহলে কোথায়?’ জানতে চাইলেন
খন্দকার সাহেব।
অর্ক একটা মেয়েকে ভালবাসে। ও আমাকে
জানিয়েছে ওই মেয়েটাকেই বিয়ে করতে চায়।
আমি আপত্তি করিনি, কারন ওর সুখেই আমার সুখ।
মেয়েটার বাবা মা’ও আপত্তি করেনি। কিন্তু তারা
অর্কের পরিবার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান।
তাই অর্ক আসছে আগামী পরশু আমার কাছে। ওর
বাবার পরিচয় জানতে। কি জবাব দেব ওকে আমি?’
দু’হাতে মুখ ঢাকলেন মহিলা।
চুপ করে থাকলেন খন্দকার সাহেব। কি বলবেন
বুঝে উঠতে পারছেন না। শেষ পর্যন্ত জানতে
চাইলেন, ‘এখন তাহলে কি করবেন ঠিক
করেছেন?’
মুখ থেকে হাত সরালেন মহিলা। মৃদু স্বরে
বললেন, ‘শুধু একটাই সমাধান আছে এর।’
‘কি সেটা?’
‘মূল সমস্যা হচ্ছি আমি নিজে। আমি না থাকলেই
সবকিছুর সমাধান হয়ে যায়। অর্ক আর জানতে
পারবে না ওর বাবা কে ছিল।’ মহিলার চোখে বিচিত্র
দৃষ্টি কেমন যেন পরিচিত লাগল খন্দকার সাহেবের
চোখে। এই একই দৃষ্টি তিনি আজ সকালে
দেখেছিলেন সাজেদুল করিমের চোখে।
‘কিন্তু, তার মানে কি? আপনি কি আত্মহত্যা করার কথা
ভাবছেন?’ খন্দকার সাহেব চমকানো গলায় প্রশ্ন
করলেন।
‘এছাড়া আর কি করার আছে আমার?’
‘অদ্ভুত!’
‘কি অদ্ভুত? এটাই একমাত্র সমাধান। অর্ক আমার
একমাত্র সন্তান, আমার সব। ওর সুখের জন্য আমি
এটুকু করতে পারব না? আমি না থাকলে ও কষ্ট
পাবে ঠিকই, কিন্তু ভালবাসা হারানোর কষ্ট ওকে
পেতে হবে না। যে কষ্ট আমি পেয়েছি তা ও
পাক সেটা আমি চাই না।’
চুপ করে থাকলেন খন্দকার সাহেব। কি বলার
আছে তার?
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে বসে থাকলেন।
বাড়ছে অস্বস্তিকর নীরবতা। একসময় মহিলা
বললেন, ‘আপনার সাথে কথা বলে ভাল লাগল।
চলুন, আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।’
খন্দকার সাহেব বুঝতে পারলেন, তার যাওয়ার সময়
হয়েছে। উঠে দাড়ালেন তিনি।মহিলাও উঠে
দাড়ালেন তার সাথে।
বাংলোর গেটের সামনে এসে হঠাত খন্দকার
সাহেব ঘুরে দাড়ালেন। ‘শেষ একটা কথা বলতে
চাই আপনাকে।’
‘বলুন।’
‘আপনার জীবন একান্তই আপনার ব্যাক্তিগত ব্যাপার।
তবুও, আরেকবার ভেবে দেখুন। একজন
মানুষের জীবনের সাথে আরও অনেক মানুষের
জীবন জড়িয়ে থাকে। সে হয়তোবা বুঝতে
পারে না, তবে এটাই সত্যি। আজ আপনি চলে
গেলে যে আর কারও জীবনে তার প্রভাব
পড়বে না, তা কি আপনি জোর দিয়ে বলতে
পারেন? অন্তত আপনার ছেলের মুখের দিকে
তাকিয়ে হলেও, সিদ্ধান্ত বদল করার চেষ্টা করুন।’
‘আমার ছেলের জন্যেই তো এই সিদ্ধান্ত
নিয়েছি আমি, বদলানোর কিছু নেই।’ বললেন
মহিলা।
‘বেশ। আমি তবে আসি।’ ঘুরে দাঁড়িয়ে হাটতে শুরু
করলেন খন্দকার সাহেব।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now