বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নিষ্ঠুর পিতা

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Suborna Akhter Zhumur (০ পয়েন্ট)

X আজ কদিন ধরে নীতা অসুস্থ তাই কাজে যেতে পারছেনা। নীতা লোকের বাসায় কাজের লোক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু সেদিন বাড়ি ফেরার পথে তার এক্সিডেন্ট হওয়ায় এতদিন সে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। কাল সে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে, কিন্তু কোনো কাজই সে করতে পারছে না। এমনকি হাটাচলা ও ঠিক ভাবে করতে পারছেনা। এদিকে চাল, ডালসহ প্রায় সবকিছুই ফুরিয়ে এসেছে। কী করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। আজ তার অবস্থা দেখে পাশের বাড়ির বশির ভাই এসে বলে গেছে,"ভাবী আপনি তো এই শরীর নিয়ে কাজে যেতে পারবেন না কিন্তু সংসার চালাতে তো টাকার প্রয়োজন আছে। তাই আমি বলি কি, আপনি স্বপ্নকে আমার সাথে দিয়ে দিন। আমি যে কারখানায় কাজ করি ওকে সেখানে একটা কাজ দিয়ে দেব। আর ওখানকার নাইট স্কুলে ওকে ভরতি করে দেব। দিনে কাজ করবে আর রাতে পড়াশুনা করবে, মাসে মাসে টাকা পাঠাবে। আপনার আরো কোন চিন্তাই করতে হবে না। আমার প্রস্তাবটা ভেবে দেখবেন।" নীতার মন কিছুতেই সায় দেয়না একমাত্র ছেলেকে হাতছাড়া করতে, সে ঠিক করে অসুস্থ শরীর নিয়েই কাজে যাবে তাতে তার যতো কষ্টই হোক না কেন। তাহলে, ছেলেটা অন্তত তার চোখের সামনে থাকবে সেটাই অনেক। কিন্তু ছেলেটা ভীষণ মা ভক্ত, তাই তার মা অসুস্থতা নিয়েও কাজে যাবে এটা সে মেনে নিতে পারেনা। অনেক কষ্ট করে মাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজী করে সে বশিরের সাথে চলে যায়। আর তার মা বুকে পাথর বেধে, চোখের পানিতে ছেলেকে বিদায় দেয় আর দোয়া করে যাতে তার ছেলে যেখানেই থাকে যেন খুব ভালো থাকে। আজ তার স্বামীর কথা খুব মনে পড়ছে। সে তাদেরকে টাকাপয়সা পাঠালে স্বপ্নকে সে কিছুতেই দূরে চোখের আড়াল করতো না। লোকটা গত তিন বছরে একবারের জন্যেও তাদের কোনো খোঁজখবর নেয়নি। অনেকেই বলছে সে নাকি শহরে আরেকটা বিয়ে করেছে। অনেকেই তাকে পরামর্শ দিয়েছে যাতে সে তার স্বামীর মুখোমুখি হয়ে অন্তত ছেলেটার প্রাপ্য অধিকারটুকু দাবী করে, কিন্তু সে যায়নি। আর যাবেই বা কেন যে মানুষটাকে ভালোবেসে সে তার বাবাকে ছেড়ে, বাবার প্রাসাদতূল্য বাড়ি ছেড়ে, আয়েশি জীবন ছেড়ে এই ভাংা টিনের ঘরে এসেছিল সেই মানুষটাই তো তার কথা, ছেলেটার কথা একবারের জন্যেও ভাবেনি। আজ থেকে দশ বছর আগে ঐ মানুষটার সাথে তার ভার্সিটিতে আলাপ হয়। নীতা তার থেকে তিন বছরের জুনিয়র ছিল। বন্ধুত্ত থেকে তাদের সম্পর্ক ভালোবাসায় পরিনত হয়। তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। স্বপ্নের বাবা ছিল একজন চাষীর ছেলে। তার বাবা তার পড়ার খরচ যোগাতে একে একে সমস্ত জমিজমা বিক্রি করে একেবারে পথে এসে দাড়ায়। আর এমন একটি পরিবারে মেয়ের বিয়েতে নীতার বাবা কিছুতেই মত দেননি। ফলে নীতা এক কাপড়ে তার মনের মানুষটার হাত ধরে বেড়িয়ে আসে। বিয়ের কিছুদিন পরেই শ্বশুর মারা যায়, এক বছরের মাথায় সে মা হয়। সংসারের খরচ বেড়ে যাওয়ায় স্বপ্নের বাবা শহরে অল্প বেতনে চাকরী নেয়। বেতন কম থাকায় নীতাকে আর স্বপ্নকে সেখানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়না। কারণ শহরে বাসাভাড়া অনেক বেশী। কয়েকমাস পরপর বাড়ি ফিরতো। যে কদিন সে থাকতো সেই দিনগুলো যেন খুব দ্রুত কেটে যেত। ধীরেধীরে মানুষটা বদলে যায়। একপর্যায়ে টাকা পাঠানো, বাড়িতে আসা দুটোই বন্ধ করে দেয়। বাধ্য হয়ে নীতা চাকরী খুজতে শুরু করে। ইন্টার্ভিউয়ে টিকে গেলেও টাকার জন্য চাকরীগুলো হাতছাড়া হয়ে যায়। একান্ত নিরুপায় হয়েই সে বাবার কাছে টাকা চাইতে যায়। নাতীর মুখ চেয়ে নীতার বাবা টাকা দিতে রাজী হলেও বাধ সাধে বড় ভাই। সে বাবাকে সাবধান করে দেয় যে নীতাকে একটা টাকা দিলেও সে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে আর নীতাকে বলে দেয় দরকার হলে সে যেন ভিক্ষা করে খায়, এই বাড়ির ত্রিসীমানায় যেন আর কোনোদিন তার ছায়া না পড়ে। বাধ্য হয়েই নীতা লোকের বাসায় কাজ নেয় তার, ছেলের খাওয়ার খরচ এবং ছেলের পড়ালেখার খরচ চালাতে। বশির স্বপ্নকে নিয়ে ঢাকায় পৌছে গেছে। একটা দোকানের সামনে দাড়িয়ে পরিচিত একজনের সাথে কথা বলছে। স্বপ্ন অবাক হয়ে বড় বড় গাড়ি, বাড়ি দেখতে দেখতে নিজের অজান্তেই বশিরের থেকে অনেক দূরে চলে আসে। হঠাৎ হুবহু বশিরের মত একই রকমের শার্ট পড়া এক লোককে বশির ভেবে তার পিছন পিছন যেতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পর একটা গাড়ির সাথে ধাক্কা লেগে জ্ঞান হারায়। চোখ খুলে সে নিজেকে একটা বিছানায় আবিষ্কার করে। এক মহিলা খুব যত্ন করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। মহিলাটি হৃদয় সাহেবের স্ত্রী নুপুর। নূপুরের কাছে স্বপ্ন সবকিছু খুলে বলে কিন্তু নূপুর বশিরের ঠিকানা জানতে চাইলে সে বলতে পারানা। কারণ, তার জানা নেই। বিকালবেলা হৃদয় অফিস থেকে ফিরলে নূপুর তাকে বলে,"শোনো, আজ শপিং থেকে ফেরার পথে আমার গাড়িতে একটা ছেলের এক্সিডেন্ট হয়। বেশী আঘাত পায়নি। তাই হসপিটাল থেকে ব্যান্ডেজ করেই ছেড়ে দিয়েছে, বাসায় নিয়ে এসেছি"। "এসব উটকো ঝামেলা বাসায় টেনে আনার কি দরকার ছিল? যেখান থেকে এসেছে সেখানে পাঠিয়ে দিলেই হতো"। নূপুরের কথা শুনে জবাব দেয় হৃদয়। "আসলে ছেলেটা কাজের জন্য এসেছে একজনের সাথে, কিন্তু লোকটার ঠিকানা ওর জানা নেই। ছেলেটার মুখটা অসম্ভব মায়াবী, চোখ ফেরানো যায় না। আমাদের তো কোনো বাচ্চা নেই , তাই আমি ঠিক করেছি ওকে এখানে রেখে নিজের সন্তানের মত লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করবো আর মাস শেষে কিছু টাকা ওর বাড়িতে পাঠিয়ে দেবো। তুমি অমত কোরোনা"। নূপুরের মা না হতে পারার কষ্টটা বুঝতে পেরে হৃদয় আর কিছু বলেনা। রাতে খাবার টেবিলে স্বপ্নকে দেখে হৃদয় চমকে ওঠে, আর স্বপ্ন অস্ফুট স্বরে ডেকে ওঠে "বাবা"। বাবা ডাক শুনে হৃদয় ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে রেগে বলে,"খবরদার! আমাকে বাবা বলে ডাকবি না, একটা রাস্তার ছেলে হয়ে তোর সাহস হয় কি করে আমাকে বাবা ডাকার"। তার এই রাগী রুপ দেখে নূপুর অবাক হয়ে বলে,"আসলে ওর বাবাতো অনেক বছর ধরে ওদের খোঁজখবর নেয় না, আর ওর বাবার সাথে হয়ত তোমার চেহারার কোন মিল আছে তাই ভুল করে বাবা বলে ডেকেছে। তাতে তোমার এতো রিয়্যাক্ট করার কি আছে?" হৃদয় না খেয়ে সেখান থেকে চলে আসে। আর স্বপ্ন ভাবতে থাকে তারতো কোনো ভুল হয়নি, এই সেদিনও মাকে বাবার ছবি নিয়ে কাঁদতে দেখেছে। তাছাড়া, বাবার আদর, ভালোবাসা সবি তার মনে আছে। তাহলে, বাবা কেন তাকে চিনতে পারলো না সে কি তার ছেলেকে ভুলে গেছে? রাতে চুপিসারে স্বপ্নের কাছে গিয়ে হৃদয় ওকে সাবধান করে দেয় যাতে তাকে আর বাবা বলে না ডাকে। আর যদি ভুলেও কখনও ডাকে তাহলে পিটিয়ে মেরে ফেলবে বলে হুমকি দেয়। স্বপ্ন সেই রাতে ঘুমাতে পারেনা কাঁদতে কাঁদতে সকাল হয়ে যায়। আর নূপুর ভাবছে, যে মানুষটা কখনো কারো সাথে খারাপ ব্যাবহার করে না সে স্বপ্নের সাথে কেন এইভাবে আচরণ করছে, যেন সহ্যই করতে পারছেনা। প্রতিদিন স্বপ্নের প্রতি হৃদয়ের রাগ দেখে নূপুর একদিন বলেই ফেলে,"তুমি ওর সাথে এমন ব্যাবহার করছ যেন মনে হচ্ছে ছেলেটা তোমার কোনো চুরি হাতেনাতে ধরেছে। তাই ওকে তাড়াতে চাইছো, যাতে ও কারো কাছে প্রকাশ না করতে পারে।" নূপুরের কথা শুনে হৃদয়ের মনে ভয় জাগে নূপুর সবকিছু জেনে গেল না তো। না আর রিস্ক নেয়া যাবেনা। অনেক কষ্ট করে,বড়লোকের মেয়েকে হাত করে সে এই জায়গায় এসেছে। সত্যিটা প্রকাশ পেলে এই সম্পত্তি, টাকা-পয়সা সবকিছু হাতছাড়া হয়ে যাবে।আসলে হৃদয় যেখানে চাকরী করত সেই মালিকের মেয়ে নূপুর। বড়লোকের সুন্দরী মেয়েকে ভুলিয়ে হৃদয় নিজের স্ত্রী, সন্তানের কথা গোপন করে তার প্রেমের জালে ফাসায়।একমাত্র মেয়ের সুখের কথা ভেবেই মেয়ের জেদের কাছে হার মেনে নূপুরের বাবা তার সাথে নূপুরের বিয়ে দেয়। বিয়ের পর মেয়ের যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সেকথা ভেবেই মেয়েকে ফ্ল্যাট, গাড়ি এসব কিছু দিয়ে দেন। আর হৃদয়কে আরো উঁচু পোস্টে চাকরী দেন। এরমধ্যে একদিন নূপুর বাবার বাসায় গেলে হৃদয় ঠিক করে এই সুযোগটাকেই কাজে লাগাতে হবে। সে স্বপ্নের জন্য শার্ট, প্যান্ট কিনে এনে স্বপ্নকে বলে এগুলো পড়ে নিতে, তাকে নিয়ে বেড়াতে যাবে। বাবার কথা শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে তক্ষুনি স্বপ্ন নতুন জামা কাপড় পড়ে ফেলে আর ভাবে ,"না! বাবাতো আমায় ভুলে যায়নি, এখনো আগের মত ভালোবাসে হয়ত পরিচয় দিতে কোনো অসুবিধা আছে। আনন্দের আতিশয্যে স্বপ্ন বাবাকে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকে,"বাবা আমরা কোথায় বেড়াতে যাচ্ছি? কখন ফিরবো? বাবা চলনা মায়ের কাছে যাই, মা তোমাকে দেখলে খুব খুশি হবে।" অন্যদিকে, হৃদয় তখন ভাবছে, কাজটা ঠিক ভাবে করা যাবে তো? সন্ধ্যার সময় তারা রেললাইনের কাছে পৌছায়। হৃদয় ভালোভাবেই জানতো এইসময় এখানে কেউ থাকবে না। আর একটুও দেরি না করে সে স্বপ্নকে রেললাইনের সাথে শক্ত করে বাধতে শুরু করে। বাবাকে এরকম করতে দেখে স্বপ্ন অবাক যায়।কিছুতেই বুঝতে পারেনা তার বাবা ঠিক কি করতে চাইছে। দূর থেকে ট্রেন আসার শব্দ আসছে। এইবার সে বুঝতে পারে যে তার বাবা কেন তাকে এখানে বেধে রেখেছে। সে বারবার অনুরোধ করতে থাকে, "বাবা দয়া করে আমাকে ছেড়ে দাও। আমি আর কোনোদিন তোমাকে বাবা বলে ডাকবো না, আমি বাড়ি চলে যাবো মায়ের কাছে। আমাকে মায়ের কাছে যেতে দাও, আমি মরে গেলেও কখনো তোমার কাছে আসবো না।" কিন্তু তার কথাগুলো তার বাবার কানে পৌছায় না। কারণ, ছেলেকে বেধে রেখেই সে চলে যায়। স্বপ্ন বাবার ছায়াটুকু মিলিয়ে যেতে দেখে। আর ভাবে, তার মা কি কোনদিন জানতে পারবে তার একমাত্র ছেলের সাথে কি হয়েছে? তার ছেলে বেচে আছে নাকি মরে গেছে? হয়ত, ছেলের হারিয়ে যাওয়ার কথা শুনে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসাবে। আর কিছু সময়ের অপেক্ষা। তারপরেই ট্রেনটা ক্ষতবিক্ষত করে দিয়ে যাবে ছোট্ট একটা শরীর আর ছোট্ট একটা হৃদ্য়। যেখানে তার বাবার জন্য অফুরন্ত ঘ্রিনা, অভিমান আর মায়ের জন্য একবুক ভালোবাসা ছিল।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১১৬ জন


এ জাতীয় গল্প

→ নিষ্ঠুর পিতা

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now