বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
বাল্টিমােরের কনভেনশন সেন্টারে এইমাত্র আলবার্তো গার্সিয়া তার পেপারটি উপস্থাপন শেষ করেছেন। ওভারহেড প্রােজেক্টরের সুইসটি অফ করে তিনি হলভর্তি দর্শকদের দিকে তাকালেন।
বিজ্ঞানীদের কনফারেন্সে বক্তব্য শেষ হবার পর সাধারণত ছােট একটি সৌজন্যমূলক করতালি দেয়া হয় কিন্তু এবারে একটি বিস্ময়কর নীরবতা বিরাজ করল। এই সেশনটির সভাপতি সেন্ট জন বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃদ্ধ অধ্যাপক বব রিকার্ডো প্রথমে করতালি দিতে শুরু করলেন এবং গ্যালারীর প্রায় দুই হাজার শ্রোতা হঠাৎ করে চেতনা ফিরে পেয়ে করতালিতে যােগ দিল। দেখতে দেখতে করতালির প্রচণ্ড শব্দে হলঘরটি ফেটে যাবার উপক্রম হল কিন্তু তবুও সেটি থেমে যাবার কোনাে লক্ষণ দেখা গেল না, বরং একজন-দু'জন করে সবাই দাঁড়িয়ে গিয়ে উরুগুয়ের একটি অখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের অখ্যাত বিজ্ঞানীকে সম্মান দেখাতে শুরু করলেন। বিজ্ঞানীদের কনফারেন্সে সাধারণত সাংবাদিকরা থাকেন না কিন্তু জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারদের এই বার্ষিক কনফারেন্সে আলবার্তো গার্সিয়া যে পেপারটি উপস্থাপন করবেন তার কথা কিভাবে জানি বাইরে প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল, কাজেই আজ এখানে হলভর্তি সাংবাদিক। ফটো তােলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সাংবাদিকদের ক্যামেরা ফ্ল্যাশ জ্বলতে শুরু করল, এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি ধরে রাখার জন্যে শ্রোতাদের অনেকে তাদের ক্যামেরা বের করে ছবি তুলতে শুরু করলেন।
বৃদ্ধ অধ্যাপক বব রিকার্ডো শেষ পর্যন্ত উঠে দাঁড়ালেন, তাকে নির্দিষ্ট সময়ের মাঝে সেশনটি শেষ করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। যদি এখনই তিনি নিয়ন্ত্রণটুকু হাতে না নিয়ে নেন সেটি সম্ভব হবার কথা নয়। বব রিকার্ডোকে উঠে দাঁড়াতে দেখে শ্রোতারা তাদের করতালি থামিয়ে একজন একজন করে নিজের চেয়ারে বসে পড়লেন, সাংবাদিকদের দলটি ঠেলাঠেলি করে আরাে সামনে এসে ভিড় করে দাঁড়াল। বব রিকার্ডো কি বলেন শােনার জন্যে সবাই নীরব হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে।
বব রিকার্ডো উপস্থিত শ্রোতাদের দিকে তাকিয়ে একটি নিশ্বাস ফেলে কোমল গলায় বললেন, "আলবার্তো গার্সিয়ার নাম আমাদের মতাে কয়েকজন ছাড়া কেউ জানত না। কিন্তু আজ থেকে পৃথিবীর সব মানুষ আলবার্তোর কথা জানবে। আজকের কনফারেন্সে সে যে পেপারটি উপস্থাপন করেছে আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে সেটি অত্যন্ত সাদামাটা একটি টেকনিক্যাল পেপার, কোষ-বিভাজনের সময় মানব-ক্রোমােজমের টেলােমিয়ারকে অক্ষত রাখার প্রক্রিয়া। কিন্তু একটু খুঁটিয়ে দেখলেই দেখা যাবে সে শুধু টেলােমিয়ারকে অক্ষত রাখেনি, টেলােমারেজ প্রক্রিয়াটি বিশ্লেষণ করেছে এবং সফলভাবে মানবকোষে ব্যবহার করেছে। আমরা তার তথ্য থেকে জানতে পেরেছি আলবার্তোর সাদাসিধে একটি ল্যাবরেটরিতে একটি পেটরি- ডিশে মানবদেহের ত্বকের কয়েকটি কোষ বিভাজন করছে যাদের থেমে যাওয়ার কোনাে সম্ভাবনা নেই।” বব রিকার্ডো বার্ধক্যে শীর্ণ হয়ে যাওয়া তার হাতটি সামনে তুলে ধরে বললেন, “আমাকে বার্ধক্য এবং জরা আক্রান্ত করেছে, কারণ প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী আমার দেহের কোষগুলাে তাদের হিসেবমত একশ থেকে দুশবারের মতাে বিভাজন করে থেমে পড়েছে। মঞ্চে দাঁড়ানাে আলবার্তো বলছে থেমে পড়ার প্রয়ােজন নেই। আলবার্তো গার্সিয়া মানবজাতির পক্ষ থেকে সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি খুঁজে বের করেছে। সে আজ আপনাদের সামনে ঘােষণা করেছে মানুষকে বার্ধক্য স্পর্শ করবে না।" বব রিকার্ডো হঠাৎ থেমে গেলেন, কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে বললেন, “প্রকৃতপক্ষে আলবার্তো মানুষকে অমরত্ব দান করেছে।”
হলঘরটিতে হঠাৎ এক ধরনের চাঞ্চল্য দেখা গেল, একসাথে অনেকে কথা বলতে শুরু করল, অনেকে প্রশ্ন করার জন্যে উঠে দাঁড়াল।
বব রিকার্ডো হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “আমি জানি আপনাদের সবার ভিতরে অসংখ্য প্রশ্ন জমা হয়েছে, আমার নিজের ভিতরেও আছে। কিন্তু আজকে আমাদের হাতে সময় নেই, আমি এখানে মাত্র অল্প দু-একটি প্রশ্ন গ্রহণ করতে পারব। কে প্রশ্ন করতে চান?"
উপস্থিত বিজ্ঞানীদের অনেকেই হাত তুলে প্রায় দাঁড়িয়ে গেলেন, বব রিকার্ডো তাদের একজনকে সুযােগ দেয়ার জন্যে উঙ্গিত করছিলেন কিন্তু তার আগেই কমবয়সী একজন তরুণী হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল; অনুমতির অপেক্ষা না করেই বলল, "প্রফেসর রিকার্ডো আমরা সংবাদপত্র থেকে এসেছি, আপনাদের বৈজ্ঞানিক আলােচনা আমরা কিছুই বুঝব না। সেটি কি পরে করা যায় না? আপাতত আমাদের কৌতুহল মেটানাের জন্যে কি একটি-দুটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না?"
বব রিকার্ডো একটু হাসার চেষ্টা করে বললেন, "কি প্রশ্ন?"
তরুণীটি আরাে একটু এগিয়ে এসে বলল, "আমি ডক্টর গার্সিয়ার কাছে জানতে চাই তিনি কেন এই আবিষ্কারটি করেছেন?"
আলবার্তো গার্সিয়াকে একটু বিভ্রান্ত দেখা গেল, তিনি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তরুণী সাংবাদিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, "কেন?"
"হ্যাঁ, কেন?"
আলবার্তো গার্সিয়া একটু বিষন্ন মুখে বললেন, “টেলােমারেজ নিয়ে আমার অনেকদিনের কৌতুহল। আমাদের ল্যাবরেটরিতে সেরকম সুযােগ-সুবিধে নেই, তাই যেটুকু পেরেছি সেটুকুই করেছি। মানবকোষকে কিভাবে অনির্দিষ্ট সময় বিভাজন করতে দেয়া যায় সেটি বিজ্ঞানীমহলের দীর্ঘদিনের কৌতুহল। আমি সেই কৌতুহল থেকে কাজ করেছি।”
"কিন্তু মানুষ যদি অমর হয়ে যায়, তাদের যদি মৃত্যু না হয়—"
আলবার্তো গার্সিয়া হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, "আমি একজন বিজ্ঞানী, আমি শুধু বিজ্ঞানের কৌতুহল নিয়ে কাজ করেছি। এই তথ্যের কারণে মানবসমাজে কি প্রভাব পড়বে সে-সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।"
তরুণী সাংবাদিক উৎকষ্ঠিত মুখে বলল, "কিন্তু এখন আমরা সেটাই শুনতে চাই। মানুষ যদি অমর হয়ে যায় এই পৃথিবীর কি হবে? সমাজের কি হবে?"
আলবার্তো গার্সিয়া মাথা নাড়লেন, বললেন, "আমি জানি না।” একমুহূর্ত চুপ করে থেকে তিনি বব রিকার্ডোর দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললেন, “হয়তাে প্রফেসর রিকার্ডো এ ব্যাপারে আপনাদের কিছু-একটা বলতে পারবেন।
সাংবাদিকরা সাথে সাথে বব রিকার্ডোর দিকে ঘুরে গেল, "প্রফেসর রিকার্ডো, আপনি কি কিছু বলবেন?”
বব রিকার্ডো কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “ভবিষ্যত অনুমান করা খুব কঠিন, কিন্তু তােমরা যদি আমাকে চাপ দাও আমি চেষ্টা করতে পারি।”
"আমরা চাপ দিচ্ছি প্রফেসর রিকার্ডো।”
বব রিকার্ডো একটু হেসে কথা বলতে শুরু করলেন, কথা শুরু করার সাথে সাথে তাঁর মুখের হাসি মিলিয়ে সেখানে একটি থমথমে গাম্ভীর্য চলে এল। প্রায় নীচুগলায় বললেন, "মানুষের অমরত্বের জন্যে মােহ দীর্ঘদিনের। এই অমরত্বের লােভে সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে অনেক অন্যায় অনেক পাপ করা হয়েছে। দেবদেবী বা ঈশ্বর মানুষকে যে-অমরত্ব দিতে পারেনি, আমাদের বিজ্ঞানীরা মানুষকে সেই অমরত্ব দেয়ার আয়ােজন সম্পনড়ব করেছে। এখনও সেই কাজ পূর্ণ হয়নি কিন্তু আমার হিসেবে আগামী শতাব্দী থেকে মানুষ আর বার্ধক্যের কারণে মৃত্যুবরণ করবে না।”
বব রিকার্ডোকে বাধা দিয়ে একজন সাংবাদিক জিজ্ঞেস করল, "তাহলে কিসে তাদের মৃত্যু হবে?"
"রােগ, শােক, একসিডেন্ট, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, হত্যাকাণ্ড। কিন্তু পৃথিবীর হিসেবে সেটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র। মানুষের যদি মৃত্যু না হয়, দেখতে দেখতে এই পৃথিবীতে জনসংখ্যার এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটবে। এই পৃথিবীতে থাকবে শুধু মানুষ আর মানুষ। আজ থেকে হাজার বছর পর এই পৃথিবীতে পদচারণা করবে সহস্র বছরের যুবা, তাদের চোখে কী থাকবে স্বপ্ন না হতাশা আমি জানি না, তাদের বুকে কী থাকবে, ভালােবাসা না ঘৃণা সেটাও আমি জানি না। আমার বয়স সত্তুর, আমি এখনাে আমার শৈশবকে স্মরণ করতে পারি, সহস্র বছরের মানুষ কি তার শৈশবকে স্মরণ করতে পারবে? আমার মনে হয় পারবে না। তাদের স্মৃতিতে কোনাে আনন্দ নেই, তাদের সামনে ভবিষ্যত নেই, কোনাে স্বপ্ন নেই। বেঁচে থাকার কোনাে তাড়না নেই। তাদের সমাজে কোনাে শিশু নেই, কোনাে ভালােবাসা নেই তাদের কথা চিন্তা করে আমি শিউরে উঠছি।”
একজন পৌঢ় সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে আপনি কি মনে করেন ড. আলবার্তো গার্সিয়াকে পৃথিবীর ইতিহাস ভালােভাবে স্মরণ করবে না?"
বব রিকার্ডো বিষন্নমুখে মাথা নেড়ে আলবার্তো গার্সিয়ার দিকে তাকালেন, বললেন, "আমি দুঃখিত আলবার্তো। কিন্তু আমার ধারণা মানব সভ্যতাকে ধ্বংস করার জন্যে পৃথিবীর ইতিহাস এককভাবে তােমাকে দায়ী করবে। তুমি হবে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অভিশপ্ত বিজ্ঞানী।
আলবার্তো গার্সিয়া ফ্যাকাশে মুখে বব রিকার্ডোর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বি:দ্র: নিচে শেষ পর্ব দেওয়া আছে। ভালো লাগলে কমেন্ট করবেন।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now