বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
নিঃশব্দ দায়িত্ব
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬। বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের দিন। চারদিকে উৎসবের আমেজ—কেউ বলছে গণতন্ত্রের জয়, কেউ বলছে পরিবর্তনের প্রত্যাশা। রাস্তায় রাস্তায় মাইকে প্রচার থেমে গেছে, পোস্টারের রং শুকিয়ে গিয়েছে, কিন্তু মানুষের চোখে এখনো উত্তেজনার আভা। পরদিন অনলাইনে ফলাফল দেখা গেল—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল পেয়েছে ২০৯ আসন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৯টি, স্বতন্ত্র ৭টি, ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি ৬টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি, গণ অধিকার পরিষদ একটি, অন্যান্য চারটি এবং তিনটি আসন স্থগিত। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পেয়েছে ৪,৮০,৭৪,৪২৯ ভোট, ‘না’ পেয়েছে ২,২৫,৬৫,৬২৭ ভোট। সংখ্যার খেলায় বিজয়-পরাজয়ের হিসাব কষা গেলেও, এক গ্রামের এক ভোটারের গল্প সংখ্যার চেয়ে অনেক বড় হয়ে উঠল।
সকাল থেকেই আমাদের কেন্দ্র ছিল শান্ত। সহকারি প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব ছিল ব্যালট পেপারে সিল-স্বাক্ষর দেওয়া। মাঝেমধ্যে দূরে কোথাও শোনা যাচ্ছিল মাইকের আওয়াজ—কেউ ভোটারদের সচেতন করছে, কেউ ফলাফলের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে। দুপুরের পর হঠাৎ পাশের মসজিদের মাইকে ভেসে এল মৃত্যুসংবাদ। ঘোষণা হলো—গ্রামের মজিবর সাহেবের স্ত্রী মারা গেছেন, আসর নামাজের পর জানাজা। খবরটি শুনে মন ভারী হয়ে গেল। আমি পোলিং এজেন্টদের জিজ্ঞেস করলাম, “কিভাবে মারা গেলেন?” তারা জানালেন, দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন।
মৃত্যু সংবাদ শুনে কেন্দ্রের পরিবেশে এক ধরনের নীরবতা নেমে এলো। ভোটের লাইন ছিল ছোট, কিন্তু শৃঙ্খলাবদ্ধ। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে দরজার সামনে এক ব্যক্তি এসে দাঁড়ালেন। মুখে ক্লান্তি, চোখে লালচে আভা, দাড়ি অগোছালো। তাঁকে দেখেই একজন পোলিং এজেন্ট ধীরে বললেন, “স্যার, এই লোকের স্ত্রীরিই আজ মারা গেছে। আসর নামাজের পর জানাজা হবে।” মুহূর্তে আমার হাতের সিল থেমে গেল।
লোকটি এগিয়ে এলেন। কাগজ বাড়িয়ে দিলেন, কণ্ঠ শুকনো, কিন্তু স্থির। আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। চোখে এমন এক বিষণ্নতা—যেন ভেতরে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, অথচ বাইরে নিস্তব্ধতা। মনে হলো, তিনি শুধু ভোট দিতে আসেননি, এসেছেন এক অদ্ভুত দায়বোধ পূরণ করতে। আমি ভাবলাম, “ভোট কী এত জরুরি?” বাড়িতে তাঁর স্ত্রীর নিথর দেহ, আর তিনি এখানে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগে দাঁড়িয়ে।
ব্যালট পেপারে সিল দিতে দিতে আমার মনে হচ্ছিল, এই মানুষটি হয়তো নিজের শোককে সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছেন। হয়তো ভাবছেন, জীবনে যত দুঃখই আসুক, নাগরিক দায়িত্ব থেকে পিছু হটা যাবে না। অথবা হয়তো এটি ছিল তাঁর স্ত্রীরই ইচ্ছা—“ভোট দিয়ে এসো।” আমরা জানি না। শুধু জানি, শোকের ভার কাঁধে নিয়েও তিনি লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন।
আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করতে চাইলাম, “আপনি এখন কেন এলেন?” কিন্তু জিজ্ঞেস করতে পারলাম না। তাঁর নীরবতাই ছিল উত্তর। ব্যালট নিয়ে তিনি বুথে গেলেন। কয়েক মিনিট পর বেরিয়ে এলেন। কোনো উল্লাস নেই, কোনো স্লোগান নেই—শুধু ধীর পায়ে বেরিয়ে গেলেন। বাইরে তখন বিকেলের আলো নরম হয়ে আসছে। মনে হলো, সূর্যও যেন একটু বিষণ্ন।
কেন্দ্রের ভেতরে আবার ভোট চলতে লাগল। কিন্তু আমার মন বারবার চলে যাচ্ছিল সেই মানুষটির দিকে। তাঁর বাড়িতে এখন হয়তো আত্মীয়স্বজন জড়ো হচ্ছে, কান্নার শব্দ উঠছে, কাফনের কাপড় প্রস্তুত হচ্ছে। আর তিনি সেখানে ফিরে গিয়ে হয়তো স্ত্রীর কপালে শেষবার হাত রাখবেন। এই সংক্ষিপ্ত বিরতিতে তিনি একটি ব্যালটে সিল মেরে এলেন—এ যেন জীবনের প্রতি এক নীরব প্রতিজ্ঞা।
রাতের দিকে ফলাফল নিয়ে আলোচনা শুরু হলো। কেউ বলল পরিবর্তনের সূচনা, কেউ বলল নতুন চ্যালেঞ্জ। কিন্তু আমার কাছে দিনটির আসল ছবি ছিল অন্য। সংখ্যার জয়-পরাজয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে একজন শোকাহত মানুষের দৃঢ় পদক্ষেপ। গণতন্ত্রের বইয়ে হয়তো এ গল্প লেখা থাকবে না, কিন্তু মানবতার খাতায় এটি এক অনন্য অধ্যায়।
আমি ভাবতে লাগলাম, আমরা কত সহজে ভোটের গুরুত্ব নিয়ে তর্ক করি। কেউ বলে, ভোট না দিলেও কিছু যায় আসে না। কেউ বলে, এটি অধিকার নয়, কর্তব্য। কিন্তু সেদিন বুঝলাম—কিছু মানুষের কাছে ভোট দেওয়া মানে শুধু রাজনীতি নয়, আত্মমর্যাদা। শোকের দিনেও তিনি দায়িত্ব এড়িয়ে যাননি। হয়তো এটাই তাঁর জীবনের শিক্ষাও—দুঃখের মাঝেও কর্তব্য পালন।
আসর নামাজের সময় মসজিদের দিকে মানুষ ছুটে গেল। জানাজার জন্য কাতার দাঁড়াল। আমি দূর থেকে দেখলাম, সেই মানুষটি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর চোখে জল, তবুও কাঁধ সোজা। জানাজা শেষে যখন সবাই মাটি দিল, তখন বুঝলাম—জীবনের চূড়ান্ত সত্যের সামনে সব নির্বাচন, সব গণভোট ক্ষণস্থায়ী। তবুও মানুষ বেঁচে থাকতে চায় নিয়মের ভেতরে, দায়িত্বের ভেতরে।
পরদিন যখন ফলাফল দেখলাম, সংখ্যাগুলো চোখে ভাসছিল। কিন্তু সেই মানুষের মুখই মনে পড়ছিল বেশি। গণতন্ত্রের ইতিহাসে বড় বড় নেতাদের নাম লেখা থাকে, কিন্তু আসল শক্তি তো এই সাধারণ মানুষ। যে নিজের ব্যক্তিগত শোকের মাঝেও রাষ্ট্রের কাজে অংশ নেয়। হয়তো একদিন নির্বাচনের আমেজ ভুলে যাব, ফলাফলের সংখ্যা ঝাপসা হয়ে যাবে। কিন্তু ব্যালটের আগে জানাজার সেই দৃশ্য আমার ভেতরে চিরকাল বেঁচে থাকবে।
সেদিন আমি শিখেছিলাম—ভোট কতটা জরুরি, তার উত্তর সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। কখনো কখনো একটি সিল হয়ে ওঠে শোকের মাঝেও জীবনের পক্ষে দাঁড়ানোর ঘোষণা। আর তখন মনে হয়, গণতন্ত্র আসলে কাগজে নয়, মানুষের হৃদয়ে লেখা থাকে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now