বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নিশাচর রোদ্দুর—০১

"রূপকথা " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X _ নিশাচর রোদ্দুর সংগ্রহিত…… গায়ের এই কোনা হইতে ওই কোনা পর্যন্ত দমকা বাতাসের মতন খবর ছড়াইয়া গেলো। জমিদার মদন রায়ের কন্যা পদ্মাবতী মাতুল গৃহে যাইবার নিমিত্তে বাহির হইয়াছিল ঠিকই কিন্তু পৌছাইতে পারে নাই। পথিমধ্যেই পাটুতলির ময়দানে বিশু ডাকুর দলের হামলায় পালকিবাহকের দল কোনোক্রমে জান বাঁচাইয়া পলাইয়াছে। গোটা দশ লস্কর যারা সাথে ছিলো তাদের নাকি বিশু একাই নিজ হাতে আচ্ছা করিয়া দলাই মলাই করিয়া দিয়াছে। তাহার উপর আবার পদ্মাবতীকে তুলিয়া লইয়া গিয়াছে তাহার হুতুমভূতের জঙ্গলের আড্ডায়। পাইক চাঁদু কোনোমতে ছুটিয়া আইসা জমিদার বাড়িতে খবর পৌঁছাইয়া দিলো। জমিদার মদন রায়ের হুহুংকারে মুহূর্তের মধ্যেই লাঠিয়াল বাহিনী তৈয়ার হইয়া গেল। এমন সময় নায়েব চিত্তবাবু জমিদার মশায়ের কানে কানে কহিলেন, ‘ জনার্দন- কে দেকা যাচ্চে না যে।’ জমিদার মশাই তাকাইয়া দেখিলেন তাই তো। জনার্দন কই? বলিতে না বলিতে জনার্দন তাঁহার সেই কথিত তেল চকচকে তাগড়া লাঠিখানা কাঁধে ফালাইয়া হাজির। সকলেই বিস্ময়ের সাথে নড়িয়া চরিয়া বসিলো। পেছনে সনাতন-কেও দেখি দেখা যায়। সনাতন জনার্দনের পুত্র তথাপি কদাচিৎ সে পিতার সহিত জমিদার বাড়ি আসে। সেটাও খুব প্রয়োজন না হলে নয়। সেই গতবার রথের মেলায় যখন পাশের গাঁয়ের জমিদার প্রতাপ সিং-এর লাঠিয়াল দলের হামলায় মেলায় হুলুস্থুল তখন সনাতন একখানা লাঠি লইয়া সতেরো লাঠিয়ালের মহড়া দিয়াছিল। জমিদার মদন রায় পরদিনই সনাতনকে ডাকাইয়া লাঠিয়াল বাহিনীতে ভর্তি করাইতে চাইলেও সনাতন ক্ষমা চাইয়া প্রস্তাবে সায় দেয় নাই। আবার সেই যেবার বংকাই শা ডাকুর লোকে জমিদার মদন রায়ের সম্বন্ধী হিরু রায়ের জোতখানায় হামলা চালায় সেই সময় এই সনাতনের লাঠির ঘায়ে পালানোর সময় বংকু তাহাকে মন্ত্রধারি কইয়া গিয়াছিল। তখন তো জমিদার-বাবুর ডাকে সনাতন আসেও নাই। অনেকেই বলে সনাতনের ভীষণ জেদ। সেই যে জমিদার বাড়ি হইতে তাহাকে একবার পদ্মাবতীর চুল টানিবার জন্যে চাবুক মাইরা তাড়ানো হইলো তাহার পর হইতে সে আর ওমুখো হয় না। তবে জমিদার মশাইয়েরও বলিহারি। কতই বা তখন বয়স হইবে পদ্মা আর সনাতনের। দশ কি এগারো। ছোট্টবেলায় খেলাচ্ছলে কত কিছুই ত ঘটে। কিন্তু জমিদারের মেয়ে বলে কথা। তাহার চুল ধরিয়া টান কি আর যে সে অপরাধ। রাম রাম। —x—*—x— জনার্দন হাঁক ছাড়িল, “তোরা সব যার যার বাড়ি যা।” সকলেই এর ওর মুখ দেখিতে লাগিল। জমিদার মদন রায় রোষকষায়িত লোচনে জনার্দনের দিকে তাকাইয়া হুংকার ছাড়িলেন, “কি বলছিস এসব? তুই জানিস না কি ঘটেছে।” জনার্দন নত মস্তকে প্রণাম সারিয়া নম্র স্বরে কহিল, “জমিদার মশাই। আপনি মা বাপ। যাহা আপনি বলিবেন, যাহাই আপনি করিবেন; তাহাই আইন। কিন্তু আমি জানি এখন আপনি আর আপনার মধ্যে নাই। কারণ এই স্থলে আপনার নিজ কন্যাই বিপদাপন্ন। এক্ষণে আপনি স্থির মস্তিষ্কে ভাবিতে পারিবেন বলিয়া আমার মনে হয় না।” মদন রায় গর্জন করিয়া বলিলেন, “তুই কি বলিতে চাস?” জনার্দন ঈষৎ হাসিয়া কহিল, “গুহ্য কথা সকলের সামনে বলিলে তাহা আর গোপন রয় কি? আমি বলি কি, সকলকেই ফেরত পাঠাইয়া দিন। আমি এতটুকু নিশ্চয়তা দিতেছি আজ প্রভাতের সূর্যকিরণ রায় বাড়ির চৌকাঠ পেরোনোর পূর্বেই পদ্মাবতী আপনার সম্মুখে থাকিবে।” জমিদার মশাই কিয়তক্ষন নিস্তব্ধ রইলেন। জনার্দন আজ ৩০ বৎসর ধরিয়া জমিদার বাড়ির একান্ত বিশ্বস্ত নোকর। তাহার পিতা সুদীপ রায়ের আমল হইতেই। আততায়ীর হাতে যখন তিনি মারা যান তখন জনার্দন গুঁরগাও গিয়াছিল এক বিশেষ কাজে। লোকে বলে তাহা না হইলে জমিদার বাড়িতে ঢোকার সাধ্য কোনও বাপের বেটার ছিল না। পরদিন খবর পাইয়া ফেরত আসার ঘণ্টা তিনেকের মধ্যেই জনার্দন আততায়ীদের রিতাবগঞ্জের হাট হইতে খুঁজিয়া বাহির করিয়া বল্লম দিয়া পুরোই এফোঁড় ওফোঁড় করিয়া দিয়াছিল। এ হেন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য লোকের কথায়ও আজ তিনি দ্বিধায় ভুগলেন। অবশ্য এই স্বাভাবিক। পদ্মা তার প্রাণ। তার স্ত্রী কঙ্কাবতী তিন বৎসর পূর্বে কালাজ্বরে ভুগিয়া হঠাৎ চলিয়া বসিল। সেই হইতে পদ্মার পিতা ও মাতা দুই-ই তিনি। এক ঈশ্বর জানেন পদ্মা এখন কোথায় কেমনে আছে। জনার্দনের কথায় তাহার সম্বিত ফিরিল। “সময় ক্ষেপণ করিবেন না জমিদার মশাই। রাত যে বহিয়া চলিল। আজ কি আপনি এই আমাকেও বিশ্বাস করিতে পারিতেছেন না?” দাঁতে দাঁত চাপিয়া কোনোক্রমে জমিদার সাহেব কহিলেন, “তোরা সবাই ফেরত যা। কিন্তু জনার্দন আজ যদি কোনও ভুলচুক করিস তবে তোর ৩০ বৎসরের দেনা-পাওনা আমি নিজ হাতে মিটাইয়া দিবো।” জনার্দন মৃদু হাসিয়া বলিল, “যথাআজ্ঞা হুজুর।” —x—*—x— জমিদার মদন রায় হতবাক হইয়া জনার্দনের দিকে তাকাইয়া রইলেন। এই নরাধম কি বলিতেছে। এর কথায় তিনি কি তার জীবনের সব চাইতে বড় ভুল করিয়া বসিলেন। তিনি ৫০ জনের লাঠিয়াল বাহিনীকে ফেরত পাঠাইলেন। সে সমস্যা নয়। ডাকিলে তাহারা আবার আসিবে। কিন্তু, জনার্দন এ কি বলিতেছে। “হুজুর আমার কথায় সায় দিতে ভয় পাইতেছেন। কিন্তু আমি জানি হুজুর। সাধারণ সময় হইলে আপনিও এই কথাই বলিতেন।” মদন রায় ধরা গলায় বলিলেন, “সে আমি বুঝি জনার্দন। কিন্তু এ যে আমার পদ্মাবতী। ওর কিছু হলে আমার যে মরেও শান্তি নেই রে। পরকালে কঙ্কার কাছে আমি কি বলিব। আশেপাশের দশ গাঁয়ে যার নামে বাঘে গরুতে এক ঘাঁটে জল খায় সেই মদন রায় তার একমাত্র কন্যাকে রক্ষা করিতে পারিল না। লোকে যে ছি ছি করিবে।” নায়েব মশায় বিচক্ষণ লোক। এতক্ষণ চুপচাপ কথা শুনিয়া যাইতেছিলেন। এইবারে মুখ খুলিলেন। “হুজুর। আপনি শান্ত হউন। আসুন আরেকবার জনার্দনের পরিকল্পনা শুনিয়া লই। আমার মতে এর চাইতে উত্তম কিছু এই মুহূর্তে করা সম্ভব না।” জনার্দন পুনরায় শুরু করিল, “সনাতন একাই যাইবে। আমি জানি আপনি শুনিয়া মানিতে চাইবেন না। আমাকেই হয়তো যাইতে বলিবেন। কিন্তু এই মুহূর্তে আমার চাইতে সনাতনের যাওয়াটাই উত্তম। আমার বয়স হইয়াছে। ৪ ক্রোশ দৌড়াইয়া হুতুমভূতের জঙ্গলে গিয়া ২০-৩০ ডাকাতের মহড়া একই সাথে লওয়া সনাতনই ভালো পারিবে। আপনি হয়তো প্রত্যয় যাইবেন না তবে সনাতন এখন লাঠিতে আমি কেন আমার গুরু শ্রী শ্রী শংকর মাঝির সাথেও পাল্লা দিতে পারিবে। আমার পুত্র, শিষ্য ও একজন লাঠিয়াল হিসাবে আমি ওর উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস রাখি। এই মুহূর্তে বিশুর চরদের নজর এড়াইয়া গাঁ হইতে বাহির হইয়া পদ্মা-মাকে যদি কেউ ফিরাইয়া আনিতে পারে তবে সে সনাতন।” সনাতন মাথা নিচু করিয়া একটু দূরে দাঁড়াইয়া ছিলো। জমিদার মদন রায় এতক্ষণ সেই দিকেই এক দৃষ্টিতে তাকাইয়া ছিলেন। এইবার তিনি সনাতনকে ডাকিয়া কইলেন, “বাপধন এই দিকে আসো।” সনাতন আগাইয়া আসিল। সনাতনের কাঁধে হাত রাখিয়া তিনি জিজ্ঞাসিলেন, “বাপ আমি আর কারো নয়, তোমার নিজ মুখ হইতে শুনিতে চাই। তুমি আমার পদ্মাকে আমার কোলে ফিরাইয়া দিতে পারিবে তো।” সনাতন হো হো হাসিতে সকলকে চমকাইয়া দিলো। জনার্দন গর্জাইয়া কহিল, “বেয়াদব। চোপরাও।” সনাতন মুহূর্তে থামিয়া জনার্দনের দিকে ফিরিয়া বলিল, “বাপু, এইভাবে চলিলে আর থামিবেই না। তুমি তোমার লাঠিখানা বরং এদিকে দাও। আমি এই গেলাম আর এলাম।” —x—*—x— অন্ধকার শুনশান রাত। হাল্কা হিম হিম হাওয়া বহিতেছে। এরই মধ্যে সনাতন ছুটিয়া চলিতেছে। গা বাহিয়া টপটপাইয়া স্বেদ বাহিয়া পড়িতেছে। খুব যে কষ্ট হইতাছে তা নয়। সাধারণ মানুষ হইলে এই চার ক্রোশ পথ এই লাঠি হাতে লইয়া দৌড়াইতে পারিত না। মুহূর্ত হইতে কাল ক্রমে ঘণ্টা পার হইলে এই লাঠির ওজনই গন্ধমাদন-সম লাগে। কিন্তু সনাতন অন্য ধাতুতে গড়া। তার শরীর মন এখন এমন ভাবে গড়িয়া উঠিয়াছে যে লাঠি তাহার হাতে আসিলে যেন সেই লাঠির অস্তিত্ব বিলীন হইয়া যায়। সেই লাঠি তখন তার দেহর একটি অংশ। একদিনে ইহা হয় নাই। ইহা গত সতেরো বৎসরের সাধনার ফল। সনাতন হঠাৎ থামিয়া গেলো। তাহার ইন্দ্রিয় শক্তি অন্য দশজনের চাইতে ভিন্ন। অনেক কিছুই সে আগাম বুঝিয়া যায়। সনাতন বাতাসে কান পাতিল। হ্যাঁ। ওই তো। শোনা যাচ্ছে। পাতার মৃদু শব্দ। সনাতন খানিকটা অবাক হইলো। এখনো ক্রোশখানেক পথ বাকি। এইখান হইতেই প্রহরা। তাহার ঠোঁটের কোণে নিষ্ঠুর হাসি ফুটিয়া উঠিল। ঘাটিতে পৌঁছানোর পূর্বেই কিছু নরাধমের জান মাটি করিতে হইবে। মন্দ নয়। অন্য কেউ দেখিলে প্রত্যয় যাইতো না। হঠাৎ করিয়া আঁধারের মাঝে আঁধার হইয়া সনাতন হারাইয়া গেলো। কিছুক্ষণ চারিপাশে নিস্তব্ধতা খেলা করিল। পরমুহুর্তেই ধুপ-ধাপ কিছু শব্দ, হালকা হুটোপুটি, ফোঁসফোঁস শব্দ। পর-মুহূর্তেই দেখা গেলো সনাতন সেই একই গতিতে ছুটিয়া যাইতেছে। তাহার লাঠির গায়ে হালকা কালচে দাগ, নাকি আঁধারের মায়াজাল। সনাতনের কোনও হেলদোল নাই। সে দাঁতে দাঁত চাপিয়া ছুটিয়া চলিতেছে। তাহার লক্ষ্য এখন একটাই। কথা সে কাউকে দেয় নাই। কিন্তু সে নিজের মনে মনে জানে। আজ রাত পার হইলে পদ্মার ফিরিয়া আসা না আসার আর কোন মূল্যই রহিবে না। সমাজ বড়ই নিষ্ঠুর। তাহার কিছু নিয়ম ধনী আর গরীবকে একই কাতারে দাঁড় করাইয়া দেয়। যেভাবেই হোক সকাল হইবার পূর্বেই পদ্মাকে ফিরাইয়া আনিতে হইবে। সনাতন আচমকাই থামিল। হুতুমভুতের জঙ্গল শুরু হইয়া গিয়াছে। সে বিড়ালের মত মন্থর পায়ে আগাইয়া চলিল। যেন বহুবার এই পথে গিয়াছে। কোন এক আশ্চর্য যাদু মন্ত্রবলে পলক পড়িবার পূর্বেই সে দেখিল সামনেই নিতাই সন্ন্যাসীর গুহা। ইহাই নাকি বিশুর আস্তানা। সনাতন লাঠিটা দৃঢ়মুষ্ঠিতে চাপিয়া ধরিয়া লড়াইয়ের হাঁক ছাড়িল, “হা রে রে রে রে রে…………” @প্রথম পর্বের সমাপ্তি@


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ নিশাচর রোদ্দুর—০১

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now