বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নীরব চিৎকার

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X "নীরব চিৎকার" লিখেছেন -জর্জিনা পার্কার জিনা । ভ্যাপসা গরম|কেমন যেন অস্বস্তিকর|চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম|একটু ঠান্ডা বাতাসের জন্য মনটা আকুলিবিকুলি করতে থাকল|নেট দিয়ে ঘেরা খুপড়িমত বারান্দাতে ঢুকতেই নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসল|এটাকে আর যাই বলা হোক না কেন বারান্দা বলা চলে না|বারান্দা হতে হবে বিশাল|চারদিক থেকে খোলামেলা আর বাতাসে পরিপূর্ণ|বারান্দা ছেড়ে ঘরে এসে দাঁড়ালাম|ইচ্ছে হচ্ছে মফস্বলের এই দোতলা বাড়ির বদ্ধ এই ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে যেতে|কিন্তু চাইলেই তো আর সব সম্ভব নয়|পড়ার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালাম|ছোট বোনটা একমনে খসখস করে কাগজে লিখে চলেছে|ফ্যানের হালকা বাতাসে মেয়েটার ঝরঝরে চুলগুলো উড়ছে|এই মেয়েটার চুল সব সময় ওড়তে থাকে|আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালাম|আমার ছোট ছোট চুলগুলো কখনই উড়ে না|কীভাবে যেন সবসময় মিইয়ে থাকে|হয়তবা ঋতুর চুলগুলো ওর মতই উচ্ছ্বল|আর আমার গুলো আমার মতই নির্জীব! আবারো ওর সামনে এসে দাঁড়ালাম|মেয়েটা অনেক দ্রুত লিখতে পারে|কিন্তু আমি পারিনা|এমন অনেক কিছুই আছে যা এই মেয়েটা পারে অথচ আমি পারিনা!বড় বোন হওয়া সত্ত্বেও আমি ওর সাথেই পড়ি,একই ক্লাসে!কাল একটা পরীক্ষা আছে|পরীক্ষার পড়াই পড়ছে ও|পাশ করাটা বলতে গেলে বাধ্যতামূলকই!যদিও আমার ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই|করলেও চলে না করলেও চলে|আসলেই কি আমার বাধ্যবাধকতা নেই নাকি অক্ষমতা নামক কোনো অশরীরি বস্তু আমায় সব কিছু থেকে দূরে রাখে? পড়া পড়তে পড়তেই আমার দিকে মুখ তুলে তাকাল ঋতু, -কিরে কিছু বলবি? আমি মাথা নাড়ালাম|এটাকে বলে না বোধক মাথা নাড়ানো| আমার উত্তর দেখে মেয়েটা আর কিছু বলল না| শুধু এক টুকরো হাসি উপহার দিল|আমি যতবারই এই মেয়ের হাসি দেখি ততবারই অবাক হই|ওর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ওর হাসি|আমার হাসিটা ওর হাসির মত সুন্দর নয়|অথবা সুন্দর হলেও সেটা কারো চোখে পড়ে না|সবার ধারণা আমি না বুঝেই হাসি| আর যে হাসির অর্থ নেই সে হাসির সৌন্দর্যও চোখে পড়ে না|সবার ধারণা কিন্তু ভুল|আমার হাসির ও অর্থ আছে|"আমি না বুঝে হাসি"এটা বুঝানোর জন্যই ওভাবে হাসি|তবে হ্যা আমার হাসি শুধু একজনের কাছেই ভালো লাগে|তিনি হলেন আমার বাবা| সবাই ভাবে আমি বোকা,অবুঝ|কিন্তু না|আমি বোকাও নই আমার অবুঝও না|সব বুঝেও না বোঝার ভান করি|এভাবে সবার সামনে অভিনয় করতে আমার ভালো লাগে|ভালো থাকার অভিনয়! বোকা সাজার অভিনয়! আমার অস্থিরতা দেখেই বোধহয় ঋতু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল|তারপর আমার হাত ধরে টেনে খাটে এনে বসাল, -কিরে ভালো লাগছে না?শরীর খারাপ লাগছে? কোনো উত্তর দিলাম না|ওর উচ্ছ্বল চোখের সাথে নিজের মৃত সাগরের মত চোখ দুটোর তুলনা করতে থাকলাম|আচ্ছা আমি যে এভাবে প্রতিটি সূক্ষাতিসূক্ষ বিষয় নিয়ে ওর সাথে নিজেকে তুলনা করি ও ও কি একই ভাবে তুলনা করে?নাকি ওর সেটার প্রয়োজন ই হয় না? মেয়েটা এবার কাঁধ ধরে ঝাকাল আমার| -কিরে উত্তর দিচ্ছিস না কেন?মায়ের জন্য খারাপ লাগছে? মনে মনে হাসলাম আমি|এই ছোট বোনটারও ধারণা আমি ছোটদের এখনও মা বাসায় না থাকলে মন খারাপ করে থাকি|কিন্তু না|আমি তো এখন অনেক বড়| আচ্ছা এই মেয়েটা কি জানে,আমিও যে মনে মনে হাসতে পারি|বোধহয় না| আমার একটা ডায়েরি আছে|আমি আমার মনের সব কথা সেখানে শব্দ আকারে সাজাই|কিন্ত খুব গোপনে|সবার কাছ থেকে লুকিয়ে|আমার মত একটা ডায়েরি ঋতুর ও আছে|ডায়েরির ব্যাপারে আমার মত এত সতর্ক নয় ও|একদিন ওর ব্যাগ ঘাটতেই পেয়ে গেলাম|পুরো ডায়েরির পাতা জুড়ে শুধু একজনের কথাই লেখা|আরিফ ভাইয়ের কথা!কি অদ্ভুত!আমার মত এই মেয়েটাও আরিফ ভাইকে নিয়ে লেখে!তবে আমি বেশি কিছু তার ব্যাপারে লিখিনি|মাত্র দুদিন লিখেছিলাম|আর বাকি সব কথাই আমার আর আমার বাবাকে নিয়ে| আরিফ ভাই বাসায় এলে সবাই ই খুশি হয়|তবে ঋতুর খুশি হওয়ার মাত্রাটা যেন বেশি ই|আরিফ ভাই আসলেই সে পড়ালেখা বাদ দিয়ে তার সাথে গল্প করতে চলে যায়|কি যেন নিয়ে খুব হাসে ওরা| হাসতে হাসতে এলিয়ে পড়ে|কিন্তু আমি সামনে গেলেই সব চুপ|আর তখনই হয়ত আরিফ ভাই আমার গাল টেনে বলবে,"কিরে কেমন আছিস?"জবাবে আমিও হেসে মাথা নাড়াই! মাস দুয়েক আগের কথা|আরিফ ভাই একদিন আমাদের বাসায় আসলেন|হলুদ পান্জাবী পরে|এই বিদঘুটে রঙটাতে শুধু একজনকেই মানাতে পারে| আর তিনি হলেন আরিফ ভাই|একটু পর দেখলাম ঋতুকে বাসন্তী রঙের শাড়ি পড়ে আরিফ ভাইয়ের সাথে বের হতে|ওদের বের হতে দেখেই অস্থির হয়ে পড়লাম|রাগে শরীর কাঁপছিল আমার|ঘরে এসেই আস্তে আস্তে ঋতুর সব জিনিস নষ্ট করতে থাকলাম|সব শেষে তুলে নিলাম ওর সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা|বেগুনি মলাটের একটা ডায়েরি|আরিফ ভাইয়ের দেয়া ডায়েরি|যেখানে শুধু আরিফ ভাইয়ের কথা লেখা আছে|ব্লেড দিয়ে প্রতিটি পাতা কুচিকুচি করে ফেললাম|তারপর আগুন ধরিয়ে দিলাম|একটা পৈশাচিক আনন্দে মনটা ভরে উঠল|হাসতে থাকলাম আমি|পৈশাচিক আনন্দের হাসি| তারপর অধীর আগ্রহে বসে রইলাম ঋতুর ফেরার অপেক্ষায়|সন্ধ্যার দিকে ফিরে আসল ও|হাতে এক গোছা চুড়ি|বুঝলাম আরিফ ভাই কিনে দিয়েছে| ভেতরের রাগটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল| নিজেকে সামলে রেখে বাবার ঘরে বসে রইলাম একটা ঝড়ের অপেক্ষায়|কিন্তু না কোনো শব্দ পেলাম না ওঘর থেকে|প্রতিদিনের উচ্ছ্বল মেয়েটা আজ একদম চুপ|যার বইয়ের একটা পাতা ছিঁড়লেও ঘরে তান্ডবলীলা হয়ে যেত সেখানে আজ এমন ঘটনার পরও কিছু হল না কেন চিন্তা করতে লাগলাম|আমার চিন্তায় বাঁধা দিয়ে ফোলা ফোলা চোখে সামনে এসে দাঁড়াল ঋতু|হাতে এক গোছা চুড়ি|চুড়িগুলো আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল , -এটা তোর জন্য|আরিফ ভাই দিয়েছে! আমি চুড়ি গোছা নিলাম না|ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে বসে রইলাম|আমি একটা হিংসুটে মেয়ে! হিংসুটে মেয়েরা কারো ভালো দেখতে পারে না|আমিও দেখতে পারিনা|এজন্যই তো আমি এমন করি|ঋতুর ক্ষতি করি|ঋতুকে আমি একদম সহ্য করতে পারিনা|এদিক থেকেও ওর সাথে আমার পার্থক্য!আমি কোনো দোষ ছাড়াই ওকে কষ্ট দেই|আর আমি কোনো দোষ করলেও ও কিছু বলেনা|এমনকি ভয়ংকর কোনো দোষেও! একবার আরিফ ভাই ঋতুর ছড়ানো চুলের প্রশংসা করেছিলেন|সেটাও আমার সহ্য হয়নি|সেদিন রাতেই সবাই ঘুমিয়ে যাবার পর আমি ঋতুর লম্বা চুলগুলো ছোট করে ফেললাম|পরদিন সকালে যখন মায়ের হাতে চড় খেলাম তখনও খারাপ লাগেনি| বরং এটা ভেবে আনন্দ হচ্ছিল যে আর কোনোদিন ও আরিফ ভাই ঋতুর চুলের প্রশংসা করবে না|সেদিনও ঋতু আমায় কিছু বলেনি|আর অন্যদিকে আমি আরিফ ভাইয়ের আসার অপেক্ষায় রইলাম|দুদিন পর যখন আরিফ আমাদের বাসায় আসলেন ঋতু তখন ভূত দেখার মত চমকে উঠল| ঋতুর এই অবস্থা দেখে হেসে উঠলেন আরিফ ভাই|তারপর বললেন, -ছোট চুলে তো তোকে আরো সুন্দর লাগছে!একদম বাবলি বাবলি! তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, -একদম ঠিক করেছিস|ঋতু কে এভাবেই বেশি সুন্দর লাগে! সেদিন রাতে আমার চুলগুলো ও কেটে ফেললাম!কিন্তু কেন যেন কেউ আর আমাকে বাবলি বাবলি লাগে বলল না!বরং পাগল ভাবতে শুরু করল!মা ও জানি কেমন কেমন করতে লাগল|হয়তবা তার ধারণা হয়েছিল তার এই বাক প্রতিবন্ধী মেয়েটি আস্তে আস্তে মানসিক রোগীও হয়ে যাচ্ছে! হ্যা আমি বাকহীন! সবাই আমার কাছ থেকে দূরে সরে গেলেও একজন আগের মতই ছিলেন আর তিনি হলেন আমার বাবা|আমার অনুভূতি প্রকাশের একমাত্র জায়গা| ধৈর্য ধরে আমার সব কথা বুঝে বাবা! আমি সব শুনতাম,সব বুঝতাম!কিন্তু বলতে পারতাম না| এই একটি অক্ষমতা ই ছিল আমার আর এই একমাত্র অক্ষমতাই আমার আর ঋতুর মধ্যে বিস্তর পার্থক্য এনে দিল|অন্ততপক্ষে আমি তা-ই মনে করতাম! ঋতুর রেজাল্ট বরাবরই ভালো ছিল|ঠিক হল ওকে ঢাকায় ভর্তি করানো হবে|ভর্তি কোচিং সংক্রান্ত খবর নিতে ঢাকা যাবে বলে ঠিক করলেন বাবা| প্রতিদিন রাতেই বাবা আমাকে ঘুম পাড়াতে আসতেন| যাবার আগের রাতেও আসলেন|এসেই জিজ্ঞেস করলেন, -তোর জন্য কি আনব রে? আমি হেসে ঋতুর লাল ব্যাগটার দিকে আঙুল তুললাম|ঋতুর মত একটা লাল ব্যাগ চাই আমার! বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, -আচ্ছা ঠিক আছে! পরদিন বাবা চলে গেলেন|এর মধ্যে অবশ্য আমাদের ফোনে দুবার কথা হয়েছে| ঠিক কথা নয়|আমি শুধু শুনেছি আর বাবা শুধু বলেছে!তৃতীয় দিন বাবার ফিরে আসার কথা ছিল|বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল কিন্ত বাবা আর আসে না|আমি বারবার মাকে গেটের কাছে নিয়ে চললাম আর প্রতিবারই মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আশ্বাসের হাসি দিলেন|মধ্যরাত হয়ে এল অথচ বাবা ফিরলেন না| ভোর রাতে খবর নিয়ে আসলেন আরিফ ভাই| মুখোমুখি সংঘর্ষে বাস খাদে পড়ে গেছে|সেই বাসটায় যেটাতে আমার বাবা ছিল|আমার অনুভূতি প্রকাশের একমাত্র জায়গা!সবাই কাঁদল!কাঁদলাম না শুধু আমি!আমি কেন কাঁদব?বাবা আমায় কাঁদতে মানা করেছে|আমি বাবার ভালো মেয়ে|বাবার সব কথা শুনি আমি|তাইতো আমি কাঁদলাম না| এই প্রথম ঋতুর কান্নায় আমি খুশি হলাম না|বরং মনের মধ্যে থাকা ঘৃণা নামক চারাগাছটা হঠাৎ করেই শাখা প্রশাখা গজিয়ে বিরাট গাছে পরিণত হল|বারবার মনে হচ্ছিল ঋতুর জন্যই এসব কিছু হয়েছে|মনে মনে শুধু একটা সুযোগ খুঁজছিলাম|এমন একটা সুযোগ যার পরই ঋতুর সাথে আর কোনোদিনই আমার নিজেকে তুলনা করতে হবে না,আর কোনোদিন কারো জন্য মায়ের হাতের চড় খেতে হবে না,আর কেউ কখনো হাসতে হাসতে আরিফ ভাইয়ের গায়ে ঢলে পড়বে না,আর কারো জন্য আমার প্রিয় মানুষকে হারাতে হবে না! বাবার মৃত্যুর পর এটা আমাদের প্রথম বিকেল|পুরো বাড়ি জুড়ে নিঃস্তব্ধতা!ঋতুকে খুঁজতে ছাদে উঠে এলাম|ওই তো মেয়েটা ছাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে!আচ্ছা এখন একটা ধাক্কা মারলেই তো ওর ইহলীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে তাই না?আর সেই সাথে আমার যন্ত্রনারও!নিঃশব্দে ওর পিছনে এসে দাঁড়ালাম|দুটো হাত বাড়িয়ে দিলাম ওর পিঠ বরাবর!তারপর জোরালো এক ধাক্কা!মাত্র কয়েক সেকেন্ড পরেই একটা আর্তচিৎকার আর ইটের বাঁধানো রাস্তায় কিছু পড়ার শব্দ!তারপর সব চুপ! থরথর করে শরীর কাঁপছে আমার!চারপাশ থেকে যেন একটাই নীরব চিৎকার ভেসে আসতে লাগল,"হিংসুটে!হিংসুটে ! হিংসুটে!"


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ নীরব চিৎকার

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now