বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
নিমন্ত্রণ
পিপলুদের বাড়ির সবাই আজ খুব ব্যস্ত।
ঘর ভর্তি হয়ে গেছে মানুষে। সবাই ছোটাছুটি করছে। এত মানুষ যে গায়ে গায়ে ধাক্কা লেগে একটু পর পর কেউ না কেউ মেঝেতে পড়ে যাচ্ছে। পড়ে গেলেও আজ তারা রাগ করছেনা। হাসিমুখে উঠে দাঁড়িয়ে আবার ছোটাছুটি করে কাজ করছে। তাদের বাড়িতে অনেকদিন পর আনন্দিত হওয়ার মত ঘটনা ঘটেছে। আনন্দের সময় দু’চার বার পড়ে গেলে এমন আহামরি কিছু হয়না।
বাসার সবাই তো দারুন খুশি। তাদের খুশিতে যোগ দিতে এসেছেন দূরে থাকা আত্নীয়-স্বজনেরা।ঢাকার ছোট ফুপু, সিলেটের মেঝ খালা শেষ মুহূর্তে দেখা গেল সবাই হাজির হয়েছেন। আনন্দ ভাগ করে নিলে আরো বাড়ে, তাই পিপলুদের বাড়ির আনন্দ আজ অনেকগুণ বেড়ে গেছে।
পিপলুর ছোট খালা বাড়িতে পা রেখেই গান ধরেছেন, তিনি খুব ভালো গান জানেন। পিপলুর দাদীজান খাটে বসে, পানের বাটা হাতে নিয়ে সেই গানে তাল দিচ্ছেন। ছোট ছোট মেয়েরা রঙ্গিন জামা পড়ে ঘরের মাঝে ছোটাছুটি করছে।উৎসব বলে আজ বড়রা তাদের ধমক দিয়ে কথাও বলছেন না। যে যার ইচ্ছা মত ঘুরে বেড়াচ্ছে। নানা রঙয়ের কাগজ আর ফুল দিয়ে ঘর সাজানো হয়েছে খুব সুন্দর করে। সাজিয়েছেন পিপলুর ছোট চাচা। তিনি চারুকলায় পড়েন। যারা চারুকলায় পড়াশুনা করে তারা সুন্দর করে ছবি আঁকতে, ঘর সাজাতে পারে।
এমন এক ব্যস্ততার দিনেও সবার নজর পিপলুর দিকে। ছোটফুপু এসে তাকে শেরওয়ানী পরিয়ে দিলেন।তিনি এটা ঢাকা থেকে পিপলুর জন্য উপহার এনেছেন। কি চমৎকার দেখতে সেটা। যে দেখবে তারই পছন্দ হয়ে যাবে। একদম টকটকে লাল গোলাপের মত দেখতে। বড়চাচী সেই শেরওয়ানীর সাথে ম্যাচিং করা জুতো এনে দিয়েছেন। জুতোজোড়াও বড় সুন্দর দেখতে। এত কিছু হচ্ছে তাকে ঘিরে কিন্তু পিপলুর তেমন ভাল লাগলনা। পিপলুর দাদীজান এসে অনেকক্ষন তার মাথায় হাত রেখে বিড়বিড় করে দু’আ পড়লেন। পিপলু তার মাথা নোয়ালো, সে জানে দাদীজান তার গায়ে-মাথায় এখন ফুঁ দেবেন। প্রতিদিন দেন। তখন ওর খুব ভালো লাগে। আজ তার কিছুই ভালো লাগছেনা। দিনটা অবশ্য অন্যদিনগুলোর মত না। আজ দিনটা অন্যসব দিনের থেকে আলাদা। আজ পিপলুর বাবার বিয়ে।
বিয়ে বাড়িতে লোকজনের নজর বরের দিকে থাকার কথা হলেও হাসানের দিকে কারো তেমন নজর নেই। সবাই ব্যস্ত পিপলুকে খুশি করতে। ছেলেটার যেন কিছুতেই মন খারাপ না হয় তাই দেখছে সবাই।বাবা বা মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে ছেলেমেয়ের জন্য অদ্ভুত তো বটেই। ছোট্ট মানুষটা যেন উল্টাপাল্টা কিছু ভেবে একা একা কষ্ট না পায়। কেউ না কেউ তাই সারাক্ষন তার সাথে লেগেই আছে।
এই আদর-যত্ন পিপলুর জন্য নতুন কিছুনা। তবুও আজ সবাই একটু আলাদা খেয়াল করছে তার। যেমন, সে বেশিরভাগ সময় নিজের হাতেই খায় আজ তাকে খালা খাইয়ে দিলেন। কিন্তু এত কিছু করেও তেমন লাভ হচ্ছেনা। পিপলুর মন খারাপ লাগছে, খুবই খারাপ।বাসায় এত লোকজনও তার পছন্দ হচ্ছেনা। এই যে বুড়ো মত সাদা শাড়ি পড়া এক মহিলা তার গালে থ্যাবড়া করে চুমু দিয়ে গেলেন এটাও তার ভালো লাগেনি। সে তো বড় হয়ে গেছে এখন। বাবা আর দাদীজান বাদে আর কেউ তাকে চুমু খেলে সে সাথে সাথে তার গাল মুছে ফেলে।
আর একজন পিপলুকে চুমু খাওয়ার কাজটা খুব ভালো করতেন। তিনি পিপলুর আম্মু। হুটহাট তাকে বুকে চেপে ধরে আদর করতেন। আম্মু আদর করলে সে কখনো রাগ করেনি। বরং তার কি যে ভালো লাগত,আম্মুর গায়ের সাথে মিশে থাকতে, আম্মুর গায়ের গন্ধ কি যে মিষ্টি। কতদিন তার আম্মু তাকে পিপলু সোনা বলে ডাকেননা। আর কখনো ডাকবেননা।
পিপলুর ইচ্ছা করছে ছাদে চলে যেতে। ছাদে গিয়ে খানিকক্ষন কেঁদে আসে। সেখানে নিশ্চয়ই এত মানুষ নেই। দেখা গেল সে উপায়ও নেই, ছাদেও নাকি লোক গিজগিজ করছে। একফোটা জায়গা নেই। খবরটা এনে দিয়েছে পিপলুর ফুপাতো ভাই টিটু। পিপলুর মন খারাপ দেখে তারও ভীষন মন খারাপ লাগছে।
হাসান তার ঘরে বসে আছে। সে একটু নিরিবিলি কোথাও বসতে চায়। তার কোন আশা সে দেখতে পাচ্ছেনা। দেখা যাচ্ছে ঘরে তার জন্য কোন জায়গাই নেই। নিজের ঘরেও সে বসতে পারছেনা এমন অবস্থা। শেষে ঠেলেঠুলে লোকজন বের করে দিয়ে সে একটু স্থির হয়ে বসেছে।
ঘরটা আগে ‘তাদের’ ছিল। এই তো কিছুদিন আগেও ছিল। কিছুদিন? উঁহু, দুই বছর কি কিছুদিন হয়? হয়না। কিন্তু হাসানের চোখের সামনে সব ভাসে। এত স্পস্ট, একদম ঝকঝকে ছবির মতো। মনে হয় কাল কি পরশুর ঘটনা। লাজুক একটা মেয়ের সাথে তার বিয়ে হয়েছে। ঘরের আবছা নীল দেয়ালে তাদের দুজনে বিশাল এক ছবি ফ্রেমে বন্দী হয়ে আছে। তার আর নিপার বিয়ের ছবি। ছবিতে মেয়েটা তার লজ্জা ভুলে হাসানের বাম হাত আঁকড়ে ধরে হাসছে। এত প্রানবন্ত সে হাসি, এত জীবন্ত। ছবির দিকে তাকালেই মনে হয় এখনই হাসির শব্দ শোনা যাবে।
এই ঘরের সব কিছু তাদের দুজনের পছন্দে সাজানো হয়েছে। গুছিয়েছে নিপা নিজের হাতে আর হাসানকে বাধ্য করেছে তাকে সাহায্য করতে। মেয়েটার মাথায় কিভাবে কিভাবে যেন ‘ ভাগাভাগি’ শব্দটা ঢুকে গিয়েছিল। তারপর শব্দটা স্থায়ী হয়ে গেছে, এখন করো দুজন মিলে সব! নিপার ছেলেমানুষীগুলোই হাসানকে মায়ায় ভরিয়ে দিয়েছিল। ভালবাসার দেয়াল তুলে সে কেমন করে হাসানকে ফেলে, পিপলুকে ফেলে চলে গেল। মাঝে মাঝে হাসানের নিপার উপর রাগ করতে ইচ্ছা হয়, কিন্তু এই মেয়েটার উপর কেউ রাগ করে কখনো থাকতে পারেনি। তার প্রচন্ড অভিমান হয়। হাসানের ধারনা সে আসলে একটা বাজে স্বপ্ন দেখছে, ঘুম ভাঙলেই দেখবে সে বিছানায় ঘুমাচ্ছে। তার পাশেই নিপা, বাচ্চাদের মত গুটিশুটি দিয়ে ঘুমোচ্ছে। কিন্তু তা হয়না, প্রতিটি মানুষকেই জীবনের কিছু সময় দুঃস্বপ্নের মাঝেই কাটাতে হয়।
পিপলুর মায়ের জায়গায় অন্য কোন মেয়েকে বসানোর কথা হাসান এক মুহূর্তের জন্যও ভাবেনি। সময় তার নিয়মে কেটে গেছে। আরো কাটবে। এক সময় জীবনে কেটে যাবে। ছোট্ট একটা জীবন ফুরিয়ে যেতে সময় লাগবেনা।
কিন্তু দেখা গেল জীবন ফুরিয়ে যাবার ব্যাপারটা আসলে এত সহজ না। অসহ্য একটা যন্ত্রণা নিয়ে সে বেঁচে আছে। তখনকার চার বছরের পিপলুর জন্য সে বেঁচে আছে। নিপার দেওয়া সবথেকে বড় উপহার ফেলে সে পালাতে পারল না।জন্ম-মৃত্যুর ব্যাপারটা কোন ভাবেই মানুশের হাতে নেই। চাইলেই কেউ মরে যেতে পারেনা। জীবনে চলুক জীবনের মত। কিন্তু জীবনে নিপার রেখে যাওয়া যায়গা অন্য কাউকে দেবার চিন্তার সামান্যতম অবকাশটুকুও ছিলনা। ছেলের সাথেই তার পুরো জীবনটা কেটে গেলে কি খুব খারাপ কাটতো?
সমস্যা দেখা দিল যখন একটা সুযোগ নিলেন দুই বেয়ান। তাদের নাতির জন্য। হাসানের মা এবং শাশুড়ি, তাঁরা যে এমন কিছু চিন্তা করে রেখেছেন সেটা কেবল কয়েকদিন আগে টের পেয়েছে হাসান। হাসানের রাগ,ঝগড়া এই দুই মায়ের ইমোশনাল ব্লাকমেইলের কাছে হেরে গেছে। তখন হাসানের নিজের মত বলে আর কিছু থাকেনা।
বিয়েতে নীলুরও আপত্তি কম ছিলনা। লেখাপড়া শেষ হয়নি, নিজের পায়ে দাঁড়ানো দরকার। এ জাতীয় ‘গুরুত্বহীন’ কথায় সাধারনত কারো মন গলে না। নীলুর বাসার লোকেরও গলেনি। সকাল-বিকাল নীলুও হাসানের মতোই ঝগড়া করেছে সবার সাথে। মন আর মেজাজ দুটোই পাল্লা দিয়ে খারাপ হয়েছে তার। সবার প্রতি কি দারুন এক অভিমানে একসময় সে আর কোন কথাই খুঁজে পেল না।
বিয়েবাড়ির ভিড় এই রাতে এসে আরো বেড়েছে। আত্নীয়-স্বজনের সাথে এখন পাড়া-প্রতিবেশী জড়ো হয়েছেন তারা আসছেন,যাচ্ছেন। পান, মিষ্টি খাচ্ছেন। তারপর নতুন বউ নিয়ে আলোচনা,সমালোচনা করে বাড়িতে হাটা দিচ্ছেন। কম বয়েসী মেয়েরা ঠোঁটে লিপস্টিক, গালে রুজ মেখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের ভয়ংকর লাগছে দেখতে। খিলখিল হাসির শব্দে বাড়ি মুখর। সবাই বর-বউয়ের আশেপাশে থাকার চেষ্টা করছে। ছবি তোলা, নতুন বউ নিয়ে আহ্লাদী সব চলছে। কিন্তু এই সব আনন্দ থেকে একজন উধাও।
পিপলু যখন একদম ছোট তখন তার মা তাকে ছাদে বেড়াতে নিয়ে যেতেন। মায়ের কোলে, গায়ের গন্ধে সে গুটিশুটি মেরে পড়ে থাকত। ইস, মায়ের গায়ের গন্ধটা কেমন মিষ্টি। কি যে ভালো লাগত পিপলুর। তার মা ছাদের এ মাথা-ও মাথা হেটে বেড়াতেন আর গুণগুণ করে গান গাইতেন। কি গান তা পিপলুর মনে থাকার কথা না তবু কি যেন আবছা মিষ্টি সুর তার কানে বাজে।
যখন সে আর একটু বড় হয়ে হাঁটতে শিখেছে তখন মার হাত ধরে, বাবার হাত ধরে এসেছে। মা কখনো গান শুনিয়েছেন, বাবা শুনিয়েছেন গল্প। কাটুমের বাড়ি, ডালিমকুমার আর ঈশপের গল্প শুনিয়েছেন।
রাতে হত তারার গল্প। পাটি পেতে, বালিশ দিয়ে মা সুন্দর বিছানার মত করে দিতেন। বাবা-মা প্রতিযোগিতা করতেন কে কত তারার নাম বলতে পারে। মা এত বেশি তারার নাম জানতেন যে বাবা বেশিরভাগ সময় হেরে যেতেন।কিন্তু হেরেও বাবা হাসতেন।বড়দের এই ব্যাপারগুলো পিপলু ঠিক বুঝতে পারেনা। সেও তার বাবা-মায়ের সাথে হাসিতে যোগ দিত। অনেক জোছনা হলে মা চাঁদের গান চাইতেন। জোছনা হলে অনেক আনন্দ হয় মনে, তখন গান গাইতে হয়। মায়ের গান শুনতে শুনতে কতদিন পিপলু ঘুমিয়ে পড়েছে।
মন খারাপ হলেই তাই পিপলু ছাদে চলে আসে। চেনা একটা গন্ধ বাতাসে মিশে আছে এখানে, তার মায়ের গায়ের গন্ধের মত। কিন্তু রাতে তো সে কখনো একা আসেনি, আজই প্রথম। বাসার সবাই নিশ্চয়ই খুঁজবে তাকে। বাবা,দাদীজান,ছোট ফুপি সবাই বলবে, পিপলুসোনা,চাদের কণা চোর-পুলিশ খেলছ বুঝি? তারা চকলেটের কথা বলবেন, আইসক্রিম খেলে গলা ব্যথা হবে সেটাও বলবেন না আজ। কিন্তু পিপলু সাড়া দেবেনা। নিচেও নামবেনা। সে খুবই রাগ করেছে। সবার উপর তার রাগ হচ্ছে। বাবা, এত ভালোবাসেন যে নানীয়া তাঁর উপরও সে রেগে আছে। নতুন একটা মেয়ে নিয়ে এল সবাই মিলে। মেয়েটা নাকি তার নতুন মা। আচ্ছা, মা কেমন করে নতুন পুরান হয়! মা তো তার একটাই। এখন এই মেয়েটা তাদের ঘরে ঘুমোবে আর পিপলু, সে কোথায় ঘুমোবে? নতুন মা নাকি ভালো হয়না, তাদের স্কুলে পড়ে বাপন,তার জন্য তার বাবা নতুন মা নিয়ে এসেছিলেন। সেই মা বাপনকে নাকি একটুও ভালবাসেনা। সে রোজ স্কুলে মন খারাপ করে আসে।পিপলুদের বাড়ি আসা নতুন মেয়েটা যদি তার সাথেও এমন করে? তাহলে সে চলে যাবে, কোথায় যাবে জানেনা কিন্তু এমন কোথাও যাবে যেখানে তাকে কেউ খুঁজে পাবে না।
পিপলুকে খোঁজা হচ্ছে। ও মাঝে মাঝে অদ্ভুত সব জায়গায় লুকায়। কাজেই খাটের তলা, আলমারী আর সোফার পিছনে, বাথরুমে সব জায়গায় খোঁজা হয়েছে। আদর করে কতবার ডাকা হয়েছে। কিন্তু পিপলুর সাড়া নেই।
হাসানের মনে হল সে জানে তার ছেলেটা কোথায় থাকতে পারে। ইস,এতক্ষন কেন যে তার মাথায় আসেনি ! আজ পুরো দিনে ছেলেটাকে একবারও কাছে টেনে আদর করেনি সে। নিশ্চয়ই খুব অভিমান করে আছে তার বাচ্চাটা। আহারে, ছোট্ট একজন মানুষ একা একা না জানি কত কষ্ট পাচ্ছে। এত খারাপ লাগছে হাসানের।
ছয় ব্যাটারির টর্চ হাতে ছাদে উঠে এল হাসান। পুরো ছাদ অন্ধকার। লাইটটা কি নষ্ট হয়ে গেল নাকি! এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে তার ছেলে একা এখানে বসে আছে? করছেটা কি সে এখানে? হাসান টর্চ জ্বাললো। মুহুর্তে আলোতে ছাদ সয়লাব হয়ে গেল। ছাদের সামনের অংশ খালি। তার ছেলেটা গেল কই! হঠাত ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ শুনতে পায় সে। লেবু গাছের পিছন থেকে কি আসছে না শব্দটা? হাসান ছুটে গেল সেদিকে।
টিনের ড্রামটায় হেলান দিয়ে পিপলু জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে।কান্নার শব্দটার মাঝে কি গাঢ় অভিমান। ছেলেটাকে প্রচন্ড অসহায় দেখাচ্ছে। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসানের বুকটা হাহাকার করে উঠলো।এইটুকুন একজন মানুষ একা একা অন্ধকারে বসে কাদছে। নিশ্চয়ই খুব ভয় পেয়েছে সে। তবু কাউকে ডাকেনি, বসে আছে এখানে। কেমন বাবা সে! নিপা থাকলে এমন একটা ঘটনা কখনোই ঘটতেই পারত না। সে তার ছেলেকে রেখেছিল চোখের পাতায়। আর হাসান এসব কি করল?
কাছে এসে ছেলেকে কোলে তুলে নিল হাসান। পাখির পালকের মত হালকা একটা শরীর। তবে কি সে তার ছেলের যত্ন নিতে পারছেনা?
বাবার গলা জড়িয়ে ধরে আছে পিপলু,শব্দ করে কেঁদে উঠছে একটু পর পর। কান্নার দমকে তার ছোট্ট শরীরটা কাপছে। আহারে, কি গভীর অভিমান জন্মেছে ছোট্ট হৃদয়টায়। ছেলেকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিল হাসান।
বিয়ে,সংসার জাতীয় ব্যাপারগুলো নিয়ে প্রতিটি মেয়েরই নিজের কিছু স্বপ্ন থাকে। শ্বশুড়বাড়ি নিয়ে স্বপ্ন। অদ্ভুত হলেও সত্যি নীলুর মাঝে এসব কাজ করেনি কখনো। কোন কিছু নিয়েই তার বাড়াবাড়ি নেই। বরং পুরো ব্যাপারটা তার কাছে আদিখ্যেতা মনে হয়। কাজেই ধরে বেধে তাকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া ছাড়া তার বাবা-মায়ের আর কিছু করার ছিলনা। মেয়েকে তো আর তাঁরা মহিলা সন্ন্যাসী হওয়ার জন্য ছেড়ে দিতে পারেননা।
হাসানের সাথে নীলুর বিয়েটা তাই হুট করেই হয়েছে।আগেভাগে জানালে মেয়ে পালাতেও পারে তাই তাকে শেষ সময়ে জানানো হয়েছে। হাসান বা নীলু দুজনের কেউই নতুন সম্পর্কে নিজেদের জড়াতে প্রস্তুত নয়। নীলুর বাবা-মা তাদের অবিবাহিত মেয়ের বিয়ে বিবাহিত ছেলের সাথে কেন দিলেন সেটা তার মাথায় ঢোকেনি। প্রথমদিন তার মা তার পড়ার টেবিলের উপর হাসানের পাসপোর্ট সাইজের একটা ছবি এনে রাখলেন। নীলু ছুঁয়েও দেখল না। কিন্তু পরের দিন কিভাবে যেন সেই ছবি তার হাতে চলে এল। স্যুট-টাই পড়া গম্ভীর ধরনের একজন মানুষ,কেমন বোকা বোকা লাগছে নীলুর কাছে। সে বুঝতে পারেনা পাসপোর্ট সাইজের ছবিগুলোতে মানুষকে এত বোকা বোকা লাগে কেন! সে এখন পর্যন্ত যত মানুষের পাসপোর্ট সাইজের ছবি দেখেছে সবাইকে কেমন হাঁদা দেখাচ্ছিল। তার নিজের ছবিও এমন কিছু ভালো আসেনি। দেখলেই তার মাথা ধরে যায়।
নীলুকে বিয়েতে কোনভাবেই রাজি করানো যাচ্ছেনা। সে কিছুতেই এই ছবির মানুষটাকে বিয়ে করতে পারবেনা। একজন মানুষের ছবি ভালো আসেনি বলে তাকে কেউ বিয়ে করবেনা এটা এমন কিছু জোরালো যুক্তি নয়।সেটা নীলু খুব ভালো জানে। এসব কথা ধোপে টিকবেনা। পুরোপুরি না মেশা পর্যন্ত একজন মানুষ ভালো কি খারাপ বোঝা সম্ভব না, তবু নীলুর কিছু ভালো লাগেনা। বিয়ে-টিয়ে জাতীয় ব্যাপারগুলোকে সে ঠিক বুঝতে পারেনা।
ওদিকে নীলুর মা কোন ভাবেই এই ছেলেকে হাতছাড়া করতে রাজী নন।নীলুর যেমন হাসানকে পছন্দ নয় নীলুর মার ঠিক ততটাই তাকে পছন্দ হয়েছে।কারণ-টারণ নিয়ে তিনি মাথা ঘামান না। শুধু জানেন এই ছেলের সাথে সাথে বাউন্ডুলে মেয়েটার বিয়ে দিতে হবে। টাকা-পয়সা-বাড়ি সব জীবনে দরকার কিন্তু জীবনসঙ্গীকে হয়ে হবে ভালো মানুষ। নয়ত দীর্ঘ সময়ের পাশাপাশি থাকা হয় গ্লানিময়, ক্লান্তিকর। হাসানের সম্পর্কে তিনি যা যা জেনেছেন তাতে হাসানকে তাঁর ভালোমানুষ ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি।
তবে একটা ব্যাপার নিয়ে তিনি সামান্য চিন্তিত বোধ করছেন। ছেলেটার আগে একটা বিয়ে ছিল। একটা ছেলেও আছে। এটা তার কাছে কোন সমস্যাই মনে হয়নি।সংসারে এমন হতেই পারে। যা হবে তা তো কপালেই লেখা আছে। যা হবে, যা হয় সব পূর্বনির্ধারিত। এসব নিয়ে এত ঘ্যানঘ্যান করে হবেটা কি তিনি বুঝতে পারেননা। ছোট্ট একটা জীবন মানুষের, এত ভেবে শুধু সময় নষ্ট। যা কপালে আছে তা মেনে নিলেই হয়। সেটা তিনি বুঝলেও তার মেয়েকে কে বোঝাবে?
হাসানের ছেলেটাকে তিনি দেখেছেন। তাঁর সাথে কথাও হয়েছে। অনেকদিন পর এত মিষ্টি আর শান্ত বাচ্চা তিনি দেখলেন। বড়দের মত গম্ভীর হয়ে বসে আছে। দেখে এত মজা লাগছিল তার। বড় মায়া লাগছিল তার। এমন একটা শিশু মা ছাড়া বড় হবে এটা ভাবতেও তাঁর কষ্ট হচ্ছিল। তাঁর নীলু এই চমৎকার শিশুটির মা হবে ভাবতেই ভালো লাগছে। কিন্তু নীলু রাজি হচ্ছে কোথায়! তবে পিপলুকে যদি সে একবার দেখে তবে রাজি হবে। বাচ্চাদের নীলু খুব পছন্দ করে। এই সুযোগটা তিনি মা হিসেবে কাজে লাগাতেই পারেন। তাতে দোষের কিছু নেই।
পিপলুদের বাসায় বউ-বর ঘিরে মেয়েলী উৎসব যখন শেষ হয়েছে তখন রাত গভীর হতে চলেছে। হাসানের মা সবাইকে তাড়া দিয়ে শুতে পাঠিয়ছেন। আনন্দগুলোর কোনটাই পিপলু উপভোগ করতে পারেনি, হঠাত উঠা জ্বরে সে কাহিল হয়ে তার দাদীর ঘরেই ঘুমিয়ে পরেছে।
হাসানের ঘরটা খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। একদম নতুন ভাবে।ঘরে পা দিয়েই হাসান চমকে গেল! এসব কি? এগুলো কখন করা হয়েছে? ঘরটা এভাবে বদলে দিয়েছে আর সে তখন কোথায় ছিল? এই ঘরের সব কিছু তেমনই সাজানো ছিল যেমন নিপা সাজিয়ে রেখে গেছে। হাসানের মনটা এত খারাপ হল যা বলার মতো না। কাকে সে কি বলবে! যাকে সব বলা যায়, এইরকম মানুষটা তো হারিয়েই গেছে।
নীলু চুপচাপ বসে আছে। ঘরে ঢুকেই হাসানের চমকে উঠাটা তার নজর এড়ায়নি। এত চমকে গেল কি দেখে সে! ফুল, রঙ্গিন কাগজ দিয়ে ঘরটা কি সুন্দর করে সাজিয়েছে, এসব কি তার পছন্দ হলনা? কেমন আসহায়ের মতো চারপাশে তাকাচ্ছে! হঠাত করেই নীলুর মলে হল সে হাসানের চমকে উঠার কারণটা সে বুঝতে পেরেছে, ঘরটা বদলে দেওয়া হয়েছে কি কোন কারণে? সম্ভবত হয়েছে। নীল ঠিক করে ফেলল কালই হাসানকে জিজ্ঞেস করে ঘরটা আগের মত করে সাজিয়ে দেবে। আহা বেচারা,কেমন শুকনো মুখে বসে আছে।
নীলু ভালো করে হাসানের দিকে তাকালো, ফর্সা পাঞ্জাবিতে তাকে খুব ভালো মানিয়েছে! কেমন শান্ত একটা মুখ। দেখেই তাকে হৃদয়বান মানুষ মনে হচ্ছে। আর নীলু না জানি কি কি ভেবেছে এই মানুষটাকে নিয়ে! তার নিজেরই লজ্জা লাগছে এখন।
ঘরের মাঝে আক্ষরিক অর্থেই পিনপতন নিরবতা। হাসান বা নীলু কেউই কোন কথা বলছেনা। দুজন মানুষ মুখোমুখি চুপ করে বসে থাকলে এমন অস্বস্তি হয় সেটা সে আগে কখনোই টের পায়নি।
নাহ,এভাবে আর কতক্ষন! নীলু আস্তে আস্তে বলল, ‘ পিপলু কি ঘুমিয়ে পড়েছে?’
হাসান অন্যমনষ্ক ছিল, সে চমকে উঠল। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘ হ্যাঁ, ওর শরীরটা খারাপ হয়েছে’।
‘ মন খারাপ হলেই ওর শরীর খারাপ হয় তাইনা?’
হাসান অবাক হল, ‘ আপনি বুঝলেন কেমন করে?’
নীল উঠে দাঁড়িয়ে শাড়ি ঠিক করতে করতে বলল, ‘কিভাবে বুঝলাম? কারণ ওর মন খারাপ হওয়ারই কথা। আমরো এমনই হয়। যাই হোক, চলুন ওকে নিয়ে আসি। সে বাবা মায়ের মাঝে ঘুমোবে এটাই তো স্বাভাবিক,তাইনা?’
হাসানের কেমন যেন লাগছে, এই মেয়েটার কথাগুলো এমন কেন! এত মায়ায় ভরা। তার মনে হচ্ছে অনেক দূরে দেশ থেকে যেন নিপাই কথাগুলো বলে যাচ্ছে। হাসান নড়াচড়া করতে ভুলে গেল।
নীলু অনেক রাত অব্দি জাগে। মারাত্মক রকম ইনসমনিয়া তার। না ঘুমিয়ে রাত পার করা মানুষগুলোই রাতের ঘুমের মর্ম বোঝে। কিন্তু নীলুর ঘুম আসা না আসা নিয়ে তেমন মাথা ব্যথা নেই।তার কাছে বরং রাতের নিস্তব্ধতাটা দারুন লাগে। একা থাকার সময়গুলো সে দারুন উপভোগ করে। একদম নিজের মত করে। লেখকদের সাথে দূর পাহাড়-সাগর-জংগলে ঘুরে বেড়াতে অসাধারন লাগে।
পিপলু ঘুমোচ্ছে, হাসান আর নীলুর মাঝখানে। হাসানের গাঢ় নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। সে মনে হয় সারাদিনের ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পরেছে। আহা,ঘুমাক। নীলু জেগে বসে আছে। তার ভালো লাগছে। দুজন ঘুমন্ত মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে সে রাত পার করে দিতে পারবে। পিপলুর কপালে-গলায় হাত দিয়ে মাঝে মাঝে দেখছে জ্বরের অবস্থা। পিপলুর নিষ্পাপ মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকতে তার অসম্ভব ভাল লাগছে। সে ঝুঁকে পিপলুর কপালে চুমু খেল। পিপলু সাথে সাথে চোখ মেলে তাকালো।
নীলু হেসে বলল, ‘ পিপলু সোনার ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলাম?’
পিপলু কি বলবে বুঝতে পারছেনা। সে তো আজ তার দাদিজানের ঘরে ঘুমিয়েছে। তাকে এই ঘরে কে নিয়ে এল? বাবাই হবেন। এই তো বাবা পাশে ঘুমোচ্ছেন। আর নতুন মেয়েটা কি সুন্দর করেই না তাকে পিপলুসোনা ডাকল। একদম তার মামনির মতো শোনাল ডাকটা। তার সাড়া দিতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু সে চুপ করে থাকল।
নীলু আবার বলল, ‘পিপলুসোনা, আমার না ঘুম ভাঙলেই খিদে পায়, মন খারাপ হলেই জ্বর হয়। তোমারও কি খিদে পায়? পেলে চলতো খেয়ে আসি’।
নীলুর বাড়িয়ে দেওয়া হাতের দিকে কিছুক্ষন চুপ করে থাকিয়ে থাকল পিপলু। শিশুরা কেমন করে যেন ভালবাসা টের পায়। আসল-নকল মায়া ধরতে পারে। সে নীলুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। নীলুর দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ গলায় বলল, ‘ তোমাকে আমি কি ডাকব? নতুন মা?’
ছোট্ট শরীরটা আঁকড়ে ধরল নীলু।
‘ নতুন মা? উঁহু, মায়ের কি নতুন-পুরনো হয়,বোকা ছেলে? শুধু মা। বুঝেছে?’ পিপলুর মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিল নীলু।
পিপলুও নীলুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘার নাড়লো, সে বুঝেছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now