নিদ্রা আংটি "রূপকথা " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)
X
নিদ্রা আংটি
-অধরা চৌধুরী মেঘলা
রাজা মশাই কহিলেন,
“কি বল বাছা?
কথা কি সাঁচা?
খুলে দাও খাঁচা
হোক তবে নাচা!”
নাচিতে নাচিতে কন্যার পরান যায় যায়। তবুও রাজা
মশাইয়ের মন ভরিতেছে না। হঠাৎ করিয়া কন্যার মাথায়
দুষ্টবুদ্ধি খেলা করিল। সে মন্ত্র আওড়াইতে
লাগিল, “সর্প রেঙ্গম রাজ্য সঙ্গমচ পট্টধ্বজ
মন্ত্রনত, হাওয়া যটত মানব র্ক্রফ্চতট চট্টএত”।
পরপর তিনবার এক নিশ্বাসে মন্ত্রখানা পড়িবা মাত্র
কন্যা মানব খোলস ছাড়িয়া সর্প রানীর খোলসে
উপনীত হইবে।
যেই ভাবনা সেই কাজ,গরিব চাষীকন্যা সর্প রানী
হইয়া গেল।
রাজা এই ঘটনা চোখের সামনে ঘটিতে দেখিয়াও
বিশ্বাস করিতে পারিতেছেন না।
“আহা মরি মরি
কত সুন্দরী
থামিয়ে দাও নাচা
আদেশ দিলুম রাজা।”
সর্প রানী নাচ থামাইয়া দিল। রাজার সামনে এগিয়ে
করজোড়ে কহিল,“হে রাজা,কি অপরাধে আমাকে
এই খাঁচায় বন্দী করেছেন জানিতে পারি কি?”
মন্ত্রী মহাশয় রাজার উত্তরের অপেক্ষা না করিয়াই
কহিলেন,“ওহে মূর্খ সাপিনী,তোমার সাহস
দেখিয়া অবাক হইতেছি। তুমি জাঁহাপনার কাছে তাহার
কাজের কৈফিয়ত চাহিতেছ?”
“অপরাধ নেবেন না জাঁহাপনা,আমি কে যে কৈফিয়ত
চাহিব? আমি কেবল আমার অপরাধ খানা জানিবার ইচ্ছা
প্রকাশ করিয়াছি।” মাথা নিচু করিয়া সর্প রানী জবাব দিল।
গোটা মন্ত্রীসভা জুড়ে নীরবতা বিরাজমান।
সকলে বুঝি অপেক্ষার প্রহর গুনিতেছে। রাজামশাই
কখন এই বেয়াদব নারীর গর্দান নেবার হুকুম
দেবেন। এহেন বেয়াদবী রাজা কোনকালেও
মার্জনা করেন নাই।
রাজামশাই নীরবতা ভাঙ্গিলেন,
“কোথায় সকল প্রজা?
ঢাক ঢোল বাজা
গরু খাসি কাট
আজি আনন্দেরই হাট।”
রাজার এহেন আদেশে সকলে ভাবিল রাজামশাই বুঝি
এবার গরু-খাসি কাটিয়াই গর্দান নেবার অনুষ্ঠানের
আয়োজন করিবে।
সেনাপতি তাহার হলুদ বর্ণের দন্ত বিকশিত করিয়া
প্রশ্ন করিয়াই বসিল,“জাঁহাপনা, গর্দান কর্তনের
মঞ্চখানা কোথায় বসাইব?”
এইবার রাজা মশাই রেগেই জবাব করিলেন,
“গর্দান কার?
মূর্খ তোর!
ফের আবার
যদি বকিস বারবার!”
নিজের গর্দান কর্তনের এহেন আলোচনা শুনিয়া
সর্প রানী বেশ খানিকটা ভয় পাইলেন। তাহার ইচ্ছা
করিতেছিল এহেন কথা বলবার জন্য রাজা এবং তাহার
সেনাপতির গায়ে বিষদাঁত ফুটাতে। কিন্তু এমতাবস্থায়
ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করাকেই যথোপযুক্ত বলে
মনে হল তাহার।
হঠাৎ তাহার ধ্যান ভাঙ্গিল রাজার কথা শুনিয়া।
“রাজ্য জুড়ে প্রজা সকল
করো নিমন্ত্রণ
বিবাহ করিব তাই
করো আয়োজন।”
সর্প রানী অবাক হইয়া খেয়াল করিল রাজার মুখখানা
কেমন হাস্যোজ্জ্বল! খুশি যেন তাহার
ধরিতেছে না।
জাঁহাপনা সুপুরুষ। অল্প কদিনে রাজ্যখানা কেমন
সুশৃঙ্খল ভাবে চলিতেছে। তাহার মত গুণী
লোককে বিবাহ করিতে কোন মেয়েরই
আপত্তি থাকিবার কথা নহে। তবুও মূহুর্তেই কি যেন
মনে করিয়া সর্প রানীর হাসি-লাজে মেশানো
মুখখানা শুকিয়ে আমসত্ত্ব হইয়া গেল।
“কন্যা তোমার নাম কি?
সর্প মুকুটের কাম কি?
এই মুকুট ফেল দেখি
রাজমুকুটে মানায় কি?”
মনের কথা ব্যাক্ত করিবে কোন উপায়ে?
ভাবিতে ভাবিতে সর্প রানী দিশেহারা|তার অন্ধকার
মুখখানা দেখিয়া রাজা কহিয়া উঠিল,
“রূপবতী কিছু তো কহও ,
করিও নাকো একটু ছলও,
বিবাহে কি অসম্মত?
আমি নই মনপূত?”
সকল ভয় দ্বিধা অতিক্রম করিয়া কন্যা কহিল,“মহারাজ
মার্জনা করিবেন|আপনি বিবাহের জন্য সুপাত্র
বটে,তবে আমি সুপাত্রী নহি।” রাজসভার সকলে
সমস্বরে প্রশ্ন করিল,“কেন কেন কেন?”
রাজকন্যা জবাব করিল,“আমি সর্পরাজার অবিবাহিতা
স্ত্রী সর্প রানী। আমাকে বিবাহ না করিয়াই
সর্পরাজ স্ত্রীর মর্যাদা দিয়াছেন।”
রাজসভার সকলের মুখ-ছিদ্র বড় হইতে দেখিয়া
সর্প রানী জবাব করিল ,“শৈশবকালে একদা এক
সর্প আমার ঠোঁটে দংশন করিয়াছিল। নবীনগর
রাজ্যের মন্ত্র-সুরা ওঝা ওই বিষ নামাইতে ব্যার্থ
হয়। কিন্তু আমার মৃত্যু না হইয়া আমি ধীরে ধীরে
সর্পের মত আচরণ করিতে আরম্ভ করি। একদা
আমি বুঝিলাম আমার চেহারাখানাই কেবল মানব
সম্প্রদায়ের,অন্যথায় আমি সর্প। অতঃপর রাজপুকুরে
মরিবার হেতু নিয়া ডুবিয়া গিয়াছিলাম। হঠাৎ বুঝিতে পারিলাম
আমার শরীরখানা সরলরৈখিক হইয়া যাইতেছিল। তদুপরি
গোটা শরীর জুড়িয়া অসংখ্য পা গজিয়াছে এবং হাত
দুইখানা লুপ্ত হইয়াছে। অতঃপর আমার অজান্তেই আমি
আবার সাঁতরাইয়া ডাঙ্গাতে চলিয়া আসি।
রাজ্যের সবথেকে বড় তন্ত্র সাধকের শরণাপন্ন
হইয়াছিলেন আমার বাবা। তিনি বাবাকে কহিয়াছিলেন সাত
সমুদ্দুর তের নদী যেথা মিলিয়াছে সেথা
তলদেশে একখানা পাথরের প্রসাদ রইয়াছে। সেথা
ঘুমন্ত রাজার ছোট কন্যা ঘুমাইয়া রইয়াছে। তার
হাতের কড়ে আঙ্গুলের আংটিখানা আমার অনামিকাতে
ঢুকাইলেই আমি বিষমুক্ত হইব।
আমার পিতা সেই আংটি আনিতে গিয়া হারাইয়া গিয়াছে।
তাহার পর হইতে আমি এই রাজ্যে থাকিতেছি আমার
নতুন পিতার কাছে।”
“চিন্তিত হইয়োনা তো
আমার আছে ডুবুরী শত
নামাইয়া দিব সেথা
আংটি পাব হেথা।”
হাসি হাসি মুখে বলিল রাজা।
কিন্তু তাহার হাসিমুখখানা মলিন হইতে বিন্দুমাত্র সময়
লাগিলনা। যখন সর্প রানীকে কহিতে
শুনিলেন,“জাঁহাপনা,অপরাধ মার্জনা করিবেন। ঐ
আংটিখানা আনিতে পারিবে কেবলই দুজন পুরুষ। আমার
পিতা অথবা পতি।”
চিন্তার রেখা গভীর হতে দেখা যাইতেছে রাজার
কপালে।
২.
চতুর্দিকে পানির বুদবুদের দরুন চোখে দেখিতে
খুবই অসুবিধা হইতেছে রাজা মশাইয়ের। অদূরেই
একখানা পাথরের প্রাসাদ দেখিতে পাইতেছেন
তিনি। তাহার সাথে আসিয়াছে পোষা ভুত কল্লাকাটা।
কিন্তু কল্লাকাটা ভেতরে যাইতে পারিবেনা,তাই
উহাকে বাইরে রাখিয়াই রাজামশাই ভিতরের দিকে
আগাইয়া গেলেন।
রাজা মশাই ভাবিয়াছিলেন দরজার সম্মুখে দুজন
প্রহরী দাড়াইয়া থাকিবে। কিন্তু তাহা নাই দেখিয়া
আশাহত হইলেন। অতঃপর ঘুরিয়া ফিরিয়া দেখিয়া আরো
খেয়াল করিলেন যে এই প্রাসাদখানা তাহার প্রাসাদের
মত নহে। গোটা প্রাসাদে গোটা তিনেক মানব।
দুইজন জীবন্ত,আর অন্যজন ঘুমন্ত নাকি মৃত
বোঝা যাইতেছে না।
জীবন্ত পুরুষটার সহিত বাতচিত করিয়া রাজা জানিতে
পারিলেন ঘুমন্ত কন্যাটি তাহারই। আর অপর জীবন্ত
মহিলাটি এই প্রাসাদের রাণী। গল্প করিতে করিতে
রাজা মশাই জানিতে পারিলেন ঘুমন্ত রাজার জীবন
কাহিনী। উহা একেবারে তাহার সাথে মিলিয়া যায়। এই
ঘুমন্ত রাজার পত্নীও একদা সর্প রানী ছিলেন।
তাহাকে মানবী করিবার লাগি তিনিও প্রাণের ঝুঁকি
লইয়াছিলেন। আহা বেচারা ঘুমন্ত রাজার লাগিয়া বড্ড
আফসোস হয় রাজা মশায়ের। বেচারাকে এখন
কন্যার জইন্যে এই পানির তলে বসবাস করিতে
হইতেছে।
রাজামশাই ঘুমন্ত রাজাকে শুধাইলেন,
“ভ্রাতা,কি সেই হেতু
যাহাতে তব কন্যা মৃত?
কহিয়া ফেল আমায়
করি কিছু উপায়।”
ঘুমন্ত রাজা কহিলেন,“অচিনপুর রাজ্যে মেঘশাল
পর্বতের পাদদেশে এক উপাসকের বাস!তাহার
শরীরের বাইশ ফোটা রক্ত দিয়ে দুপুর দুইটা বাইশ
মিনিটে কন্যাকে দুই দিন স্নান করাইলে কন্যা সুস্থ
হইয়া উঠিবে।
কিন্তু উহা আনিতে আমি কিংবা আমার স্ত্রী কেহ
যাইতে পারিবে না। একজন যুবক রাজ শাসককে
যাইতে হইবে।”
ঘুমন্ত রাজা আরো কহিলেন,“একজন কেবলমাত্র
একবার ওই মহাসাধকের নিকট রক্ত চাহিতে পারিবে।
অন্যথায় হিতে বিপরীত হইতে পারে। আমি একদা
ওইখানে গিয়াছিলাম।”
রাজামশাই ভাবিলেন আনিয়াই দেই,কি বা হইবে
আনিলে?বরং ঘুমন্ত রাজা খুশি হইয়া আংটিখানা দিয়া
দিবেন।
রাজামশাই এই সমুদ্রের তলদেশে ঘুমন্ত রাজার
জীবনকাহিনী শুনিয়াও কিছুই বুঝিলেন না। তদুপরি তিনি
কল্লা কাটার সাহায্য গ্রহণ করিয়া এক শিশি ভর্তি রক্ত
আনিতে সক্ষম হইলেন।
অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার ঘটিল আজ
রাজামশাইয়ের সাথে। তিনি রক্তের শিশিখানা ঘুমন্ত
রাজার হাতে তুলিয়া দিতেই ঘুমন্ত রাজা খুশি হইয়া
একখানা আংটি রাজামশাইয়ের হাতে তুলিয়া দিলেন।
কহিলেন,ইহা আমার কন্যার কড়ে আঙ্গুলের আংটি।
ইহা তোমার হবু স্ত্রীর অনামিকাতে পরাইয়া দিও।
অতঃপর রাজামশাই রাজ্যে ফিরিয়া আসিলেন এবং সর্প
রানীর অনামিকাতে আংটিখানা পড়াইয়া দিতেই তাহার
শরীর থাকিয়া বিষ নামিয়া গেল,অতঃপর সে
মানবীতে রূপান্তরিত হবার পরেই তাহাদের বিবাহ
সম্পন্ন হইল।
***সাতখানা বছর পরে,,,
আজ রাজকুমারী ছয় বছরে পদার্পণ করিল।
অপরদিকে আজই রাজা রানীর সপ্তম বিবাহ
বার্ষিকী। বিশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন গোটা
রাজবাড়ি জুড়িয়া! ছোট্ট রাজকুমারী আজ এখনো
ঘুম থাকিয়া জাগে নাই। রাজামশাই উহার জন্যে একখানা
সুন্দর আংটি গড়াইয়াছেন। যে আংটিখানা রানীর
অনামিকাতে এখনো জাজ্বল্যমান। সেই গড়নের
একখানা আংটি হাতে কন্যার কামরার দিকে হাঁটিয়া
যাইতেছেন রাজামশাই, কন্যার ঘুম ভাঙ্গাইতে। মনে
মনে তিনি ভাবিতেছেন কি বলিয়া একটু আলাদা ভাবে
কন্যাকে জাগাইবেন-
“শুভেচ্ছা লও মাগো,
হইল প্রভাত জাগো।
আনিয়াছি উপহার
ভালবাসা লও আমার...”
কিন্তু রাজামশাই কি জানেন দরজার ওই পারে তাহার
জন্য কি অপেক্ষা করিতেছে?
ফের আরো একজন ঘুমন্ত রাজা তৈরি হইবে কি?
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now