বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সেই থেকে কমল সাবধান হয়েছে। বাসায় তো অনেকদিন আগেই খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলো অফিসেও দু’একটির বেশি খায়না। অফিস থেকে আসার আগে ভাল করে ব্রেথ ফ্রেশনার মুখে দিয়ে বাসায় ফেরে।
বউ যদিও পুরোপুরি বিশ্বাস করেনা। তারপরও বাসায় এ নিয়ে ঝামেলা আগের মত হয় না। মেয়েরা বড় হচ্ছে, তাদের সামনে এসব বিষয়ে কথা বলেনা পারুল। সন্দেহ হলে কথা বন্ধ করে দেয়। কমলের তখন দম বন্ধ হয়ে আসে। কথা বলার জন্যে বেশি চপাচাপি করলে পারুলের মুখ দিয়ে এমন সব ভাষা বের হতে থাকে যে কমলের নিজেরই কান চেপে ধরতে ইচ্ছে করে। সে সব কথার শ্লীলতম বাক্যটি হচ্ছে, ‘ঠগ, প্রতারক বিশ বছর ধরে আমার সাথে প্রতারনা করে আসছে। এখন মেয়ে গুলোরও সব্বোনাস না করে ছাড়বে না’।
অনেকদিন পর পারুলকে নিয়ে বেরিয়েছিলো কাল।সন্ধ্যায় বিয়ের দাওয়াত। গিফট টিফট কিনে পারুল বিঊটি পার্লারে গেলো। গাড়িতে বসে থাকতে থাকতে বোরড হয়ে গিয়েছিল কমল। কতক্ষণ লাগে কে যানে। সিগারেট খাবার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল। আজকাল ব্রেথ ফ্রেশনার দিলে কাজ হয় না। বরং ব্রেথ ফ্রেশনারের গন্ধ পেয়েই পারুল ফুঁসতে থাকে। তার চেয়ে বরং ঝালমুড়ি, কিম্বা সিঙ্গাড়া টিঙ্গাড়া খাওয়া ভালো। প্রথম ধাক্কায় সিগারেটের গন্ধ উবে যায়। ফুটপাথে এক ঠেলাওয়ালাকে সিঙ্গাড়া ভাজতে দেখে কমল সাহস করে সিগারেট কিনে ফেললো একটা। সিগারেটটা ঠোঁটে নিয়ে, দড়িতে ঝুলানো আগুনে ধরিয়ে একটি টান দিয়ে মুখ তুলেই দেখে সামনে পারুল দাঁড়িয়ে।
সদ্য বিউটি পার্লার থেকে বেরুনো পারুলের ফর্সা মুখটায় মুহুর্তেই শরীরের সমস্ত রক্ত এসে জমা হয়েছে। কোন কথা না বলে, গাড়ির দিকে না গিয়ে সে অন্যদিকে হাটা ধরেছে। কমল সিগারেট ফেলে হন্তদন্ত হয়ে তার দিকে ছুটলো। পারুল কোন কথা শুনতে চাইছিলো না। কমল বলল, গাড়িতে ওঠো, পারুল হিস হিস করে উঠলো, ‘আমি তোমাকে চিনি না’। অসহায় ভঙ্গিতে হাত বাড়লো কমল চেচিয়ে উঠলো পারুল, ‘খবরদার আমার হাত ধরবা না’। কয়েকজন পথচারি দাঁড়িয়ে আছে মজা দেখার ভঙ্গিতে। কমলের মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছিল। তখন রাস্তার লোকজনের দিকে নজর পড়লো পারুলের। সে মাথা নিচু করে গাড়িতে গিয়ে বসলো। পথে আর কোন কথা হলনা দু’জনের।
বাসায় ঢুকেই চেচিয়ে উঠলো পারুল। মেয়ে দু’টি ভয় পেয়ে কাঁদতে লাগলো। পারুল বলল, ‘কান্দস ক্যান, নেশা খোরের মেয়ারা, বাপ হইছে নেশা খোর, তগো এত কান্দন আসে ক্যান? বাইরায় যাইবার ক’ তগো বাপরে। বাইরা!
ছোট মেয়ে জারাহ কাঁদতে কাঁদতেই বলল, মেয়া বল কেন? ঠিক করে বল। আরও রেগে গেল পারুল, আমারে ভাষা শিখাইস ! যার বাপ রিক্সাওলার মতন দড়ি দিয়া সিগারেট ধরায়, তার মেয়া আমারে ভাষা শিখায়। তার হাতের পাঁচ আঙ্গুলের ছাপ বসে গেলো জারাহ’র গালে।
একটু পর থমথমে নিরবতা নেমে এলো বিয়ের দাওয়াতে আর যাওয়া হলনা। রাতে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়লো বাচ্চারা।
সকালে অফিসে এসে পারুলকে ফোন দিয়েছিল কমল। সেই ফোন অনেকক্ষণ বেজে থেমে গিয়েছে পারুল ফোন ধরেনি। পরে ছোট মেয়ে একবার ফোন ধরেছিল, কাঁদতে কাঁদতে বলেছে, ‘বাবা তুমি স্মোক করেছো? আই হেইট ইউ’। কমল একবার আমতা আমতা করে বলতে গিয়েছিলো, ‘না, করিনি’। মেয়ের কাছে মিথ্যা বলতে ইচ্ছে হয়নি, বলেছে, ‘ বাবা একবার করেছিলাম’। মেয়ের তাতে রাগ কমেনি। বলেছে, ‘আমি আমার সব ফ্রেন্ডসদের বলি, মাই বাবা’জ নাইস হি ডাজন্ট স্মোক । আর তুমি ! ছি বাবা !
ঠিক সে সময় কান্ট্রি ম্যানেজারের সালাম পেয়ে তার রুমে ঢুকে গিয়েছিলো কমল। কান্ট্রি ম্যানেজার যখন বললেন, সিলেটে নতুন প্রজেক্ট শুরু করার জন্যে তিনি একজন অভিজ্ঞ লোক খুঁজছেন।কমলের মনে হল, তার জন্যে এর চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারেনা। কান্ট্রি ম্যানেজারের অফিস থেকে বেরিয়েই সে সিলেট প্রজেক্টে বদলির জন্যে আবেদন করেছে।
কান্ট্রি ম্যানেজার আব্দুল হক বেশ কয়েক বছর ধরে কমলকে চেনেন। কমলের বাচ্চাদের কথাও তিনি জানেন। ক’দিন পর ঈদ। এই সময় কমলের বদলির আবেদন দেখে বিস্মিত হলেন তিনি। কমল বলল, ‘ হক ভাই কোন সমস্যা নেই। ওরা ঢাকায়ই থাকছে।
– আমরা আর একটু জুনিয়ার কাউকে পাঠাতাম। আমি না থাকলে হেড অফিসও তো আপনাকেই সামাল দিতে হয়।
– দরকার লাগলে আমি মাঝে মাঝে ঢাকায় চলে আসবো, কিন্তু সিলেটে প্রজেক্টটা ঠিকমত হওয়াওতো জরুরি।
– তারপরও আপনি ভাবির সাথে একটু আলাপ করে দেখেন। আপনাকে পাঠাতে পারলে তো আমিই খুশি হব। আপনার মেয়েদের স্কুলের কথা ভেবে সরাসরি বলিনি। আমাকে কাল জানালেও চলবে।
– যেতে হবে কবে?
– কাল পরশু যেতে পারলে ভালো। সামনের সপ্তায় নেদারল্যান্ডের একটা টিমের আসার কথা, তার আগে একটু গোছ গাছের ব্যাপার তো আছে।
বাসায় ফিরে প্রথমে দেখা হল বড় মেয়ে রুপার সাথে। দরজা খুলেই নিজের ঘরের দিকে পা বাড়িয়েছিলো সে। কমল বলল, খাওয়া দাওয়া হয়েছে?
মেয়ে তার উত্তর না দিয়ে বলল, আগে মামমামকে সরি বলো?
– মা কোথায়?
– ঘরে।
– আমাকে ঢুকতে দেবে?
– তুমি কী মাম মাম কে ভয় পাও?
– পাই ই তো।
– তাহলে মাম মামের কথা শোননা কেন?
মায়ের পাশে বই নিয়ে বসে ছিল জারাহ। বাবার দিকে একবার তাকিয়েই আবার বইএর মধ্যে ডুবে গেল সে। পারুলের মাথার চুলে তেল ঘসছিল নয়নের মা। তারমানে মাথা ধরেছে। কমল সরি বলতে চাচ্ছিল নয়নের মা’র সামনে বলতে সংকোচ হল । এই আর এক জ্বালা, যখন একাএকা বউএর রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করবে, তখনই কোথা থেকে কাজের লোক গুলো এসে ঘিরে ধরে। পারুলের এই সবের বালাই নেই।সে কারো দিকে না তাকিয়ে বলল, ‘তোর নেশাখোর বাপরে ঘরের বাইরে যাইতে ক’।কঠিন একটা উত্তর কমলের মুখে চলে এসেছিল, জারাহ’র কথা ভেবে আর সে সব না বলে ড্রইং রুমে থানা গাড়লো।
একটু পর নয়নের মা বলল, ভাইজান টেবিলে খানা লাগানো আছে, ‘আপা আপনাকে খেয়ে নিতে বলেছে’। নয়নের মা’র মুখে শুদ্ধ ভাষা শুনে আরও মেজাজ খারাপ হল তার। পুরো রাগটা ঝাড়লো তার উপর দিয়ে, ‘আপনার আপারে বলেন আমার আর খাওয়া দরকার নেই। আমি কালই সিলেট চলে যাচ্ছি।জবাব দিলো পারুল, ‘এহনই বারাইবার কন’।
এরপর আর কথা না বাড়িয়ে দরজা বন্ধ করে সোফার উপর গা এলিয়ে দিলো কমল। পেট ক্ষুধায় চোঁ চোঁ করছে, কিন্ত টেবিলে যেতে ইচ্ছে করছে না। পারুল খায়নি সে জানে। এখন বললেও খাবে না। আগে এরকম হলে পাঁজা কোলে করে এনে চেয়ারে বসিয়ে দিতো কমল। একটু পরই পারুলের রাগ গলে পানি হয়ে যেত। এখন সেটা হবে না। মেয়েদের জড়িয়ে ফেলবে পারুল। এটাকে কমল ভয় পায়।
‘রাগারাগি হয়েছে, হতেই পারে। তাই বলে মেয়েদের এর মধ্যে জড়াবা ক্যানো? কথা বলবা না কেন?কতক্ষণ কথা বলবা না?’ পারুল এসব প্রশ্নের উত্তরও দেবেনা। হয় গল্পের বই নিয়ে বসে যাবে, নয় কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকবে।মেয়ে দু’টি কিছুক্ষণ আশে পাশে ঘুরঘুর করবে। তাতেও যদি কাজ না হয়, তারা নিজেদের ঘরে গিয়ে বই খুলে বসবে। বাবার দোষে যদি ঝগড়া না বেধে থাকে, রুপা মাঝে মধ্যে বাবার কাছে এসে ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে কথা না বলতে ইশারা করবে। কিন্তু ছোটটি দূর থেকেই বাবার দোষ খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে। হয়তো দেড় দুইদিন চলে যাবে নিঃশব্দে। রাগের সময় পারুলের গায়ের জোর বেড়ে যায়। হাতের কাছে যে কোন জিনিষ ভেঙ্গে ফেলতে পারে।
কমল নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ। কতকটা সবার্থপরও। সংসার কিভাবে চলে সে জানেনা। মাসের শুরুতে পারুলকে টাকা দিয়ে দেয়, পারুল সেইটাকা দিয়ে সংসারটাকে ঠিকঠাক মত টেনে নিয়ে যায়। আবার মাসে দু’মাসে কিছু টাকা কমলের হাতে তুলেও দেয়। সব কিছু বিবেচনা করলে, পারুল বঊ হিসাবে পারফেক্টের কাছাকাছি। রাগটা সামাল দিতে পারলে সে হয়তো পৃথিবীর সেরা বউ হয়ে যেত, কিন্তু কমল গত বিশ বছরেও পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারেনি শুধু তুচ্ছ সিগারেটের জন্যে।
বাতি নিভিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলো কমল। ঘুম এলোনা। কবে পারুল তার সাথে কী কী দুর্ব্যবহার করেছিলো। মনে পড়তে লাগলো। রাত তিনটের দিকে ঘুমিয়ে পড়ার আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, সিলেটই চলে যাবে। কত লোকই তো বিদেশে থাকে। আর এতো সিলেট, প্লেনে উঠলে আধ ঘন্টা।নিজেকে অনেক বঞ্চিত করেছে সে।সিলেটে কেউ কিছু বলার থাকবেনা।
লেখক: সাইদুল (৭৬-৮২)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now