বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
বাইরে ঝুম বৃষ্টি হবে, আর সুশান কি তখন ঘরের মধ্যে চুপচাপ বসে থাকবে? তাহলেই হয়েছে! শুধু মহাভারত না, তারচেয়েও বেশি কিছু অশুদ্ধ হয়ে যেতে পারে!
সেদিন যদি ছুটির দিন থাকে, তাহলে তো কথাই নেই। আর ছুটির দিন না থাকলে? যদি অফিস থাকে? না, তাহলেও কোনো কথা নেই। কাজ-টাজ সব বন্ধ। সে নেমে পড়বে। বৃষ্টিটা যতোক্ষণ স্থায়ী হবে, সুশানও ঠিক ততোক্ষণ বৃষ্টির ভেতর পড়ে থাকবে। ভিজে-টিজে একেবারে জবজবে হয়ে শেষমেষ সে বাসায় ফিরবে। এবং তার সেই অবস্থা দেখে নীহা কি চুপ থাকবে? উঁহু। একদম না। শুরু করে দেবে ঝড়।
ব্যতিক্রম হলো না আজও। বৃষ্টিশেষে ভেজা শরীর নিয়ে বাসায় ঢুকতেই সিঁড়ির উপর সুশানকে দাঁড়া করালো নীহা।
‘এই, খবরদার!’
‘কী খবরদার?’
‘ভেতরে ঢুকবা না বলে দিলাম!’
‘তা আমি কাপড় বদলাবো না?’
‘তার আগে বলো— তোমাকে ভিজতে কে বলেছে?’
‘বৃষ্টি নেমেছে। ভিজেছি। সে কথা আবার কাউকে বলতে হবে কেনো? আজব!’
‘আজব? তোমার লজ্জা নেই? শরম নেই? বুড়ো ধাঙড়! বৃষ্টি হতে দেখলেই মাথা খারাপ হয়ে যায়! বাচ্চাদের মতো নাচতে নাচতে নেমে পড়ো! ক’দিন পরে নিজেই তো বাচ্চার বাপ হবা।’
‘কী!’— আশপাশের কেউ যাতে শুনতে না পায়, এমন স্বর করে মিচমিচ করে হাসতে হাসতে সুশান বললো, ‘আমি বাপ হবো! মানে তোমার পেটে বাচ্চা? আগে বলো নি তো!’
তার কথায় সুর মিলিয়ে রাগীকণ্ঠে নীহা বললো, ‘হ্যাঁ তো! তুমি বাচ্চার বাপ— তুমি জানো না? আর একটা বাচ্চা না তো, আমার পেটে পাঁচটা বাচ্চা। পেট দেখবা— কতো উঁচু হয়েছে?’
‘কই— দেখি দেখি।’
বলেই সুশান সিঁড়ির উপর থেকে উঠতে উদ্যোগ নিলো। সঙ্গে সঙ্গে নীহা চোখ ডাগা ডাগা করে বললো, ‘এই এই! খবরদার! ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকো। খানিক আগে ঘর মুছেছি। তোমার জন্যে আমি ফের মুছতে পারবো না। খবরদার!’
‘আল্লা’! আমি তা কাপড়-চোপড় পাল্টাবো না? বাথরুমে না গিয়ে এখানেই নেংটু হবো নাকি? আজব!’
‘দাঁড়াও!’
নীহা হনহন করে ঘরে চলে গেলো। ফিরেও এলো হনহন করে। তবে ফেরার সময় তার হাতে একটা তোয়ালে। সেটা সুশানের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললো, ‘শার্ট খুলে এইটা দিয়ে আগে গা মোছো। তারপর এইটা পরে প্যান্ট খুলে বাথরুমে যাও। বাথরুমে গিয়ে গায়ে-মাথায় আরো কয়েক মগ পানি ঢালবা।’
সবাই সুবোধ বালক হয়— সুশান হয়ে গেলো সুবোধ বর। শার্ট খুলে গা মুছতে মুছতে বৌকে সে বললো, ‘আচ্ছা।’
.
বৃষ্টি দেখলেই আহ্লাদে গদগদ হয়ে ভিজতে নেমে পড়া অন্তত তার সাজে না, বৃষ্টিভিজলে অবধারিতভাবে যার জ্বর আসে।
সুশানেরও সাজে না। বৃষ্টিতে ভিজলে তার জ্বর আসে না— এমনটা দেখে নি নীহা, আজ পর্যন্ত। তাও সেই জ্বর সঙ্গে সঙ্গে আসে না, আসে রাতের মাঝামাঝি— যখন কোনো ডাক্তার পাওয়া যায় না, ওষুধের কোনো ফার্মেসীও খোলা থাকে না। এবং জ্বরটাও হয় যেমন-তেমন জ্বর না— শরীর কাঁপিয়ে জ্বর, আকাশ-পাতাল জ্বর!
এবং তারপর, ডাক্তার পাওয়া যাক বা না যাক, ওষুধের ব্যবস্থা হোক বা না হোক— নীহার ঘুম উধাও, শান্তি উধাও। সুশানের মাথার পাশে বসে তার জ্বরতপ্ত শরীরটাকে লেপ-কাঁথায় ঢেকে মাথায় জলের পট্টি দিতে দিতে সারারাত জেগে কাটিয়ে দেয় সে।
এবং সেসব রাতে নীহাকে জেগে থাকতে দেখে সুশান সাধারণত যে কথাটা বলে, সেটা হলো— নী, তুমি শুয়ে পড়ো।
কথাটা বললো সে আজও। কথাটাতে নীহার রেগে যাওয়াই সঙ্গত ছিলো— বৃষ্টিতে ভিজতে বারন করলেও সুশান শোনে না। ভেজেই। মানুষ এতো বৃষ্টিপাগল হয়! কিন্তু নীহা সাধারণত রাগে না— অসুস্থ মানুষের উপর রাগ করা যায় না। তবে কোনো কোনো রাতে খুব অভিমান হয়।
নীহা রাগলো না, অভিমান করলো। বললো, ‘তুমি তো চাও না— আমি শুয়ে পড়ি, আমি ঘুমোই।’
‘আচ্ছা তুমি এভাবে বলছো কেনো? আমি কি ইচ্ছে করে জ্বর বাঁধিয়েছি নাকি?’
‘আচ্ছা, আমাকে একটা কথা বলো— আজ পর্যন্ত যতোদিন বৃষ্টিতে ভিজেছো— কোনোদিন কি তোমার জ্বর না এসে থেকেছে? তবুও তোমাকে ভিজতেই হবে! আরে বাবা, বৃষ্টিকে যে শরীর নিতে পারে না, সে শরীরের বৃষ্টি লাগাবার দরকারটা কী?’
‘আচ্ছা যাও, আর ভিজবো না। তুমি শুয়ে পড়ো। তুমি ঘুমোও।’
‘না, ঘুমোবো না। তোমাকে এভাবে রেখে আমি ঘুমোবো না। আমার ঘুম আসবে না।’ একটু থেমে সে আবার বললো, ‘আর তুমি? বৃষ্টি দেখলে আবার ভিজবা না? তাহলে তো হতোই।’
‘সত্যি বলছি— ভিজবো না।’
‘হুঁহ্!’
সুশান আর কোনো কথা বললো না আপাতত, নীহাও না। কিছুক্ষণ পর সুশানই নীরবতা ভাঙলো— ‘নী!’
নীহা বললো, ‘বলো।’
প্রায় প্রার্থনা করে সুশান বললো, ‘আমার মাথাটা একটু নিবা তোমার কোলে? একটু টিপে দিবা? খুব ব্যথা করছে।’
সঙ্গে সঙ্গে নীহার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠলো— শুধু কোল কেনো— তার সবটুকু শরীর, সবটা মন, সেবা-সুশ্রুষা তো সুশানের জন্যই, সেই সুশানই কিনা এইভাবে বলছে, এমনভাবে মিনতি করছে!
তৎক্ষণাৎই কী এক দুর্বোধ্য মায়ায় নীহার চোখ ভিজে এলো। আচ্ছন্ন হয়ে এলো ভেতরটা। পরপরই সুশানের মাথাটা বালিশ থেকে আলতো করে সে তুলে নিলো কোলে। তারপর সুশানের কপালের উপর চলে আসা চুলগুলো সরিয়ে ঠোঁট নামিয়ে ছোট্ট করে একটা চুমু খেলো।
সুশান তার জ্বরাক্রান্ত কাঁপা কাঁপা হাতে নীহার গাল ছুঁয়ে ক্ষীণকণ্ঠে বললো, ‘তুমি আমাকে খুব ভালোবাসো— না?’
শুধু চোখ না— নীহার কণ্ঠও ভিজে এসেছে ততোক্ষণে। কিছু একটা সে বলতে চাইলো। বলতে পারলো না। থেমে গেলো।
সুশান বললো, ‘তুমি যদি কখনো আমাকে ছেড়ে চলে যাও— আমি থাকবো কী করে?’
নীহা বললো, ‘তোমাকে ছেড়ে আমি কোথায় যাবো? তুমি ছাড়া কে আছে আমার? যাবো না, তোমাকে ছেড়ে আমি কখনো কোথাও যাবো না।’
ঠোঁট নামিয়ে সুশানের কপালে আরো একটা চুমু খেলো নীহা। সুশানও নীহার গালে একটা চুমু খেয়ে বললো, ‘নী, আলোটা অফ করো তো— খুব চোখে লাগছে।’
.
ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে অন্ধকারের ভেতর সুশানের মাথার মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে আলতো আলতো করে বিলি কাটছে নীহা। আর এক টুকরো কাপড় বারবার নতুন করে ভিজিয়ে নিয়ে রাখছে সুশানের কপালের উপরে।
সুশানের কী যে ভালো লাগছে! কী যে হয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতরে! কী যে বয়ে যাচ্ছে গভীরে গহীনে! কেউ দেখছে না, কিন্তু এই মধ্যরাতের অন্ধকারে চুপি চুপি তার চোখ দুটো ভরে উঠছে জলে। মৃদু মৃদু উষ্ণ উষ্ণ জলে।
কে বলেছে— মানুষ কেবল কষ্টে কাঁদে, মানুষ কেবল দুঃখে কাঁদে? সংসার যেনোতেনো কোনো জায়গা না— এখানে ভাঁজে ভাঁজে রয়েছে অপ্রাপ্তি, পরতে পরতে রয়েছে শূন্যতা, তবু এখানে জীবনের জন্য তীব্র আনন্দ এবং প্রবল সুখ নিহিত রয়েছে।
মানুষ আনন্দে এবং সুখেও কাঁদে— যদি ভালোবাসা থাকে গভীর গোপনে।
.
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now