বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
এইত কিছুদিন আগে মারা গেলাম। কিছুদিন মানে কতদিন জানিনা। জানবইবা কিভাবে? বেঁচে থাকার সময়ে সময়ের হিসাব আর বর্তমানেরটার হিসাব এক না। আমার কিছুদিন হয়তবা ব্যস্ত পৃথিবীর কয়েকঘন্টা। আগে, মানে মৃত্যুর আগে, সেকেন্ডের কাঁটাটা শুধু সামনেই এগুতো। আর এখন সময় আস্তে আস্তে একটু এগোয়, কখনো থেমে যায়। ইচ্ছে হলে পিছিয়েও যায়। মাঝে মাঝে খুব দ্রুত ছোটে, কখনো খুব ধীরে, শামুকের মত, বিরক্তি ধরে যায়। 'শালার সময়।' মনে মনে একটা গালি দিই।
আমি যেদিন মারা গেলাম সেদিন বেশ সুন্দর হাওয়া ছেড়েছিল শহরটায়। ভীষন আপন লাগছিল ইট-কাঠের খাঁচাটাকে। হাতের মুঠোয় রাখা ছোট্ট একটা চড়ুইয়ের মত মায়া মায়া গন্ধ তার। দেখলেই চোখের আরাম হয়। অথচ বেশ কিছুদিন ধরেই আকাশে প্রচন্ড রোদ ছিল। বাইরে বেরুলে গা পুড়ে যায় অবস্থা। জানালা দিয়ে বাইরে বেশিক্ষন তাকিয়ে থাকা যায় না, চোখ করকর করে উঠত। আকাশে আর বাতাসে পিপাসার্ত কাকদের নীরব আহাজারি। সে সময়টুকু ছিল কৃষ্ণচূড়াদের জন্য বড় অসময়। কেউ রোদের ভয়ে চোখ তুলে তাকাচ্ছিল না তাদের দিকে। অবহেলিত কৃষ্ণচূড়ারা উদাস মনে বেঁচে ছিল গাছে গাছে।
অথচ আমি মারা যাওয়ার খানিক পর থেকেই শহরটা মায়ার শহর হয়ে যায়। রোদটা মাখনের মত নরম হয়ে আসে। সূর্যটা পৃথিবীর সাথে তার শত্রুতা ভুলে গিয়ে মুচকি হাসা শুরু করল। খালিচোখে দেখলে মনে হতে পারে আমার মৃত্যুর সাথে সাথে শহরটা অভিশাপমুক্ত হয়েছে। যদিও কথাটা ঠিক না হয়ত। আমার মনে হয় না আমি অভিশপ্ত ছিলাম।
কিভাবে মারা গেলাম তা আমার কাছেও খুব একটা পরিষ্কার না। রাতে সবার সাথে একসাথে বসে রাতের খাওয়া সারলাম, রুমে গিয়ে একটা বইয়ের দু'পৃষ্ঠা ওল্টালাম, একটা গানের তিন লাইন শুনলাম, কিছু ভাল্লাগছিল না। ইদানিং ঘুমরা দেরিতে আসে, ঘুমপাড়ানী মাসী-পিসীর ব্যস্ততা বেড়েছে হয়ত। শেষরাতে ঘুমাতে গেলাম। চোখের পাতায় আবছা ঘুম। সকালে বোধহয় একটু তাড়াতাড়িই ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। ঘুম থেকে উঠে দেখি মারা গেছি। এরকম হঠাৎ করে মানুষ মারা যায়! না মরলে বিশ্বাস করতাম না।
মারা যাওয়ার ব্যাপারে আপনার যথেষ্ঠ অভিজ্ঞতা না থাকলে, প্রথমদিকে আপনি ভড়কে যেতে পারেন। আমিও ভড়কে গিয়েছিলাম। এটা অনেকটা হতাশার মত গ্রাস করে নেয়। তবে প্রাথমিক ধাক্কাটা কেটে যাওয়ার পরই আমি মুগ্ধ হলাম। জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সকালটা দেখে মুগ্ধ হলাম। প্রথমেই মনে হল- সকালটা এত সুন্দর কেন? চারিদিক অদ্ভুত মায়া মায়া। আমার বারান্দা দিয়ে দূরের একটা ... গাছ দেখা যায়। গাছের কচি সবুজ পাতাগুলো সূর্যের আলোতে মিটিমিটি হাসছে। তাদের ফাঁকফোকর দিয়ে সূর্যের কয়েক টুকরো লুটোপুটি খাচ্ছে পায়ের কাছে। বাইরের রাস্তাটা নদীর মত। যেন শান্ত একটা নদী। এখুনি নদীর বুকে টুপটাপ বৃষ্টি নামবে মনে হচ্ছে। কি অদ্ভুত মায়া নিয়ে বসে আছে পৃথিবী। অথচ অন্যান্য দিন হয়ত চোখেই পড়ত না। ঘুম থেকে উঠেই অফিসে দৌড়ানোর তাড়া থাকলে কারইবা চোখে পড়বে? আজকে আমার তাড়া নেই। মৃতমানুষদের তাড়া থাকে না। আমি চোখ ভরে সকাল খেতে থাকলাম।
মা হয়ত ঘুমাচ্ছেন। ফজরের নামাজের পরের গাঢ়, শান্তির ঘুম। তাকে জাগাবো কিনা ভাবলাম। মাকে গিয়ে বলব যে আমি মারা গেছি? তবে চোখ খুলেই এরকম একটা খবর শোনা উচিৎ হবে না বোধহয়। হার্টবিটের গন্ডগোল হয়ে যেতে পারে। তাই তাকে আর জাগাতে গেলাম না। ঘুমাচ্ছে, ঘুমাক। তাছাড়া মৃত্যু কোন কোন খুশির খবর না যে ঢাকঢোল বাজিয়ে বলে বেড়াতে হবে। আর এখন জানলেও জানবে, পরে জানলেও জানবে- একই কথা। এইসব ভাবতে ভাবতে রাস্তায় নেমে এলাম। বাইরে বৃষ্টির মত কুয়াশা পড়ছে। হাতের ছাপওয়ালা পাতলা নীল টিশার্টটা পড়ে আছি বলে হালকা শীত শীতও করছে। যেন শীতের সকাল।
রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কম। দানবগুলো এখনো ঘুমাচ্ছে হয়ত। পিচঢালা কালো রাস্তায় শিশিরের প্রলেপ দেয়া। বাতাসে জলের গন্ধ ভাসছে। বৃষ্টি নামতে পারে। যদিও আকাশে খুব একটা মেঘের আনাগোনা নেই, নীল রঙের আধিক্য সেখানে। নরম রাস্তার পাশের ফুটপাত দিয়ে হেঁটে চলি সামনে। ফুটপাতের বাম পাশের লাগোয়া গাছগুলোর শাখা বাতাসের প্রশ্রয়ে দুলতে থাকে, হেসে কুটিকুটি হয়। যেন খুব মজার কোন কথা শুনে মুখে শাড়ির আঁচল দিয়ে হাসছে তরুনীর দল। কুয়াশার কারনে সবুজ পাতাগুলো আরো সজীব, আরো সবুজ হয়ে আছে।
মাঝে মাঝে দু'একটা গাড়ি পাশ দিয়ে হুশহাশ বেরিয়ে যাচ্ছে। তাদের যাত্রীদের নিশ্চয়ই ভীষন তাড়া আছে। দেরি হলেই লোকসান হয়ে যাবে। আমার মাঝে মাঝে ইচ্ছে করছিল, একটা একটা করে গাড়ি থামাই। থামিয়ে তাদের আকাশ দেখাই, সবুজ দেখাই। বাতাসের কথা শুনে গাছ কিভাবে হেসে ওঠে নিজ কানে শুনুক। কচি ঘাসের ডগার উপর ঘাসফড়িং কিভাবে ধ্যান করে দেখুক তারা। কিন্তু পরক্ষনেই এই চিন্তা বাদ করে দিলাম। পাগল বলে পুলিশে দিলে হয়ত মৃতমানুষ হয়েও পার পাবো না। ইদানিং নাকি তাদের মানিব্যাগের স্বাস্থ্য ভালো না। স্যালাইন দিয়ে রাখতে হচ্ছে।
ঢাকার পার্কগুলো ছোট হয়ে আসছে। সাথে সাথে আকাশটুকুও। আকাশ ছোট হলেও শহরের পার্কের পেশাদার বাদামবিক্রেতাদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। একটা পার্কের মর্যাদা নির্ভর করে তার বাদামওয়ালাদের উপর। বাদাওয়ালা হচ্ছে পার্কের শোভা। ফ্রান্সের শোভা যেমন আইফেল টাওয়ার, পার্কের শোভা হচ্ছে বাদামবিক্রেতারা। প্রেমিক-প্রেমিকারা এখন আর বাদাম খেয়ে প্রেম করে না। চাইনিজের নরম লজ্জিত আলোয় তারা প্রেম করে। তাই বাদাম ব্যবসার অবস্থা ভালো না। দেশের বাদামশিল্প আজ হুমকির মুখে। তবে আমার সামনের বাদামবিক্রেতাকে দেখে সেই কথা মনে হয় না। তার পরনে ফুলহাতা শার্ট, প্যান্ট। প্যান্টের হাঁটুর কাছে একটা তালি আছে যদিও। পায়ে জুতা। তার একপাটির মাথা দিয়ে তার বুড়ো আঙ্গুল উঁকি দিচ্ছে। এটা নিয়ে সে যথেষ্ঠ বিব্রত অবস্থায় আছে। একটু পরপর আঙ্গুল জুতার ভেতরে নেয়ার চেষ্টা করছে। তাতে খুব একটা সুবিধা হচ্ছে না। একটু পরপর মাথা বের করে পার্কের আকাশ দেখছে। তার যে মালিক তাকে নিয়ে বিব্রত, তাতে কোন পরোয়া নেই।
'স্যার, বাদাম নিবেন?'
'না'
'নিতে পারেন স্যার। ভালো বাদাম, খাইলে বাড়িঘর ভুলে যাবেন। পার্কেই পড়ে থাকবেন দিন-রাত। আমারে দেখলেই ডাক দিবেন, মফিজদ্দীন বাদাম দিয়ে যাও।'
লোকটা বেশি কথা বলে। তবে তাতে করে মফিজদ্দীনের নাম জানা গেল। তার জুতার অবস্থা দেখে মায়া লাগছে। কিছু বাদাম কিনতে পারলে হয়। কিন্তু উপায় নেই।
'আমার কাছে টাকা নেই মফিজদ্দীন'
'পরে দিয়েন তাহলে। পাঁচ টাকার দিই? দিনের পরথম কাস্টমার'
'পরেও টাকা থাকবে নারে। আমি মারা গেছি। মরা মানুষের টাকা-পয়সা থাকে না।'
শুনে মফিজদ্দীনের চোখ ছোট হয়ে আসে চাইনিজদের মত। কপালে ভাঁজ পড়ে।
'মারা গেছেনতো বাদামের দিকে চাইয়া থাকেন কেন? শুধুশুধু এতগুলান কথা বলাইলেন।'
সে দুপদাপ পা ফেলে অন্য দিকে হেঁটে যায়। বেচারার দিনের প্রথম কাস্টমারই মরা মানুষ। মফিজদ্দীনের কপালে আজকে খারাপি আছে। মরে যাবার জন্য এইপ্রথম আমার একটু আফসোস হল। আর কখনো খোসা ছাড়িয়ে কুটুস করে বাদাম খাওয়া হবে না। কখনো কখনো ভুলে বাদামের খোসাশুদ্ধ মুখে পুরে দেয়া হবে না।
বাসে ভীষন ভীড়। পা রাখারও জায়গা নেই। মোট সংরক্ষিত সিট বারটা- মহিলাদের জন্য নয়টা আর মৃতদের জন্য তিনটা। তিনটা সিটেই মৃত প্যাসেঞ্জাররা বসে ছিল উদাস উদাস চোখ মেলে। তিনজনের মধ্যে একজনকে আমার পুরোপুরি মৃত মনে হল না।
ভার্সিটি গেলাম। কুইজ ছিল একটা। কম্পিউটার আর্কিটেকচার। কিছুই পড়িনি অবশ্য। জাস্ট দেয়ার জন্যই দেয়া। আর যদি কারোরটা দেখার সুযোগ মিলে তাহলেতো পাঙ্খা। ক্লাসের সবার মুখে একই কথা। 'কখন মারা গেলি?','কিভাবে মারা গেলি?' এক ফ্রেন্ড আফসোস করল। আমি মারা গেছি সেজন্য না। নিজে এখনও বেঁচে আছে বলে। বেঁচে থাকা মানেই- ক্লাস, ল্যাব,কুইজ ইত্যাদি ইত্যাদি। আমিও চিন্তা করে দেখলাম কথা মিথ্যা না। মরে গেছি ভেবে নিজেকে কিছুটা হালকাও মনে হল। ক্লাসে স্যার আসলেন। খাতা দিচ্ছিলেন একজন একজন করে। আমি খাতা নেয়ার জন্য হাত বাড়ালাম। স্যার বললেন,'তুমি কবে মারা গেছ?'
সঠিক উত্তর জানা নেই। বললাম,'গতকাল রাতে।'
স্যার বললেন তাহলে আমার কুইজ দেয়ার দরকার নাই। বাসায় যেয়ে রেস্ট নিতে। আমি বেরিয়ে পড়লাম। আসার সময় দেখি আফসোস করা ফ্রেন্ডটার চেহারা কান্না কান্না হয়ে গেছে। বেচারা হয়ত কেঁদেই ফেলবে।
বিকেলে গেলাম ফারিয়ার সাথে দেখা করতে। ও রেগে ছিল।
'তোমার ফোনে রিং হয়। রিসিভ করো নাই কেন?'
'আমিতো মারা গেছি। রিসিভ করবো কিভাবে?'
'আজিব! মারা গেলে ফোন রিসিভ করা যায় না নাকি?'
আমি চুপ করে গেলাম। কথা বলা মানেই ফারিয়াকে আরো রাগানো। ও চোখ তুলে আমাকে ভালোভাবে দেখল।
'সত্যিই মারা গেছ তুমি? কবে?'
'কাল রাতে'
'তাহলেতো আমাদের ব্রেকআপ হয়ে গেছে। তাই না?'
'হু তাই'
ফারিয়াকে দুঃখী বা বিষ্মিত কিছুই মনে হয় হল না। যেন আমি মারা গেছি- এটা নিতান্তই স্বাভাবিক ব্যাপার। পাঁচ বছরের রিলেশনের ইতিও কোন আহামরি ব্যাপার না। আমি আবার মারা যেতে চাইলাম। রাত হয়েছে। বাসায় ফিরতে হবে।
রাস্তায় হাঁটছি। আমার মৃত্যতে কারো কোন দুঃখ নেই। দুঃখতো পরের কথা; বিষ্ময়ও নেই। বেঁচে থাকলে মনটা বেশ খারাপ হত। মৃত মানুষের মনই নেই; খারাপ হবে কি। এখন একটা সিগারেট টানতে পারলে মন্দ হত না। বুক ভরে নিতাম নষ্ট নিকোটিনে। একটা টঙের দিকে এগোলাম। সিগারেট কিনব।
দোকানদার সরুচোখে তাকিয়ে আছে। 'আপনে কি মারা গেছেন?'
'হু। কাল রাতে।'
'তাইলে আপনে সিগারেট দিয়া কি করবেন? মারা গেলেতো বিড়ি খাওয়া যায় না।'
'কিছু করব না। ফালাইয়া দিব'
'সিগারেট বেচুম না। মরা মাইনষের কাছে সিগারেট বেচি না।'
সারাদিন বেশ ভাব ধরে ছিলাম। ভাব ধরে ছিলাম- মরে গেছি তাতে কি। কিন্তু টঙের ব্যাপারটায় নতুনকরে উপলব্ধি হল- আমি মারা গেছি। আসলেই মারা গেছি। ভরা পূর্নিমার ফিনকি দিয়ে পড়া জ্যোৎস্না আমি দেখব; কিন্তু জ্যোৎস্নারা আমাকে ছুঁবে না। অকৃতজ্ঞের মতো আমাকে উপেক্ষা করে মাটিতে পড়বে। তারা ভুলে যাবে তাদের জন্য লেখা আমার কবিতার ঋণ।
মৃতরা কাঁদে না; কাঁদতে পারে না। চোখ দিয়ে অশ্রু না গড়ালেও যে কেউ দেখলে বুঝত আমি কাঁদছি। একজন মৃত মানুষ কাঁদছে।
®+....?
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now