বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
lলেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
যেদিন বনে এক নতুন মৌচাক তৈরি হলো, সেইদিন থেকেই তার মধ্যে চলতে লাগল নিখুঁত নিয়ম ও কর্তব্যনিষ্ঠার উৎসব। সকালবেলা সূর্যের প্রথম আলোয় যখন ফুলেরা চোখ মেলে, তখনই কর্মী মৌমাছিরা ঝড়ের গতিতে উড়তে থাকে ফুল থেকে ফুলে। কেউ মধু সংগ্রহ করছে, কেউ ফুলের খবর নিচ্ছে, কেউ আবার রাণীর ঘরের ধারে প্রহরা দিচ্ছে। আর রাণী মৌমাছি? তিনি যেন বনের ছোটখাটো এক রাজরানী— দিনরাত রাজ্যের উত্তরাধিকার তৈরির গুরুদায়িত্বে ব্যস্ত।
এই মৌচাকের নাম ছিল “মৌচাক মহল”, যার চারপাশে ছিল নানা ফুলে ভরা এক চঞ্চল রাজ্য। শিমুল, কৃষ্ণচূড়া, সূর্যমুখী আর লাল জবা— সবাই যেন রাজকীয় অতিথি, যারা প্রতিদিন মধু দান করে যায়। কিন্তু একদিন এই শৃঙ্খলাবদ্ধ রাজ্যে ঘটল এক আজব ঘটনা।
বনের এক পাশে ছিল “মানবপুর” নামে এক গ্রাম। সেখানে এক স্কুলশিক্ষক মধুসূদন সাহেব প্রতিদিন তার ক্লাসে গিয়ে বাচ্চাদের বলেন, “শৃঙ্খলা ছাড়া কিছুই হয় না!” অথচ স্কুলে পৌঁছানোর সময় তার নিজেরই কখনো নিয়ম ঠিক থাকে না। একদিন তিনি ফুল তুলতে গিয়ে মৌচাক মহলের সামনে এসে পড়লেন।
মধুসূদন সাহেব হঠাৎ দেখলেন শত শত মৌমাছি কী শৃঙ্খলিতভাবে কাজ করছে— কেউ একে অপরকে ঠেলাঠেলি করছে না, কেউ নেতাকে গালি দিচ্ছে না, কেউ কাজ ফাঁকি দিচ্ছে না। তিনি চোখ বড় বড় করে বললেন,
“বাহ! মৌমাছিরা তো যেন একেবারে আদর্শ নাগরিক!”
তার কথা শুনে এক মৌমাছি, নাম তার মধুমিতা, হাসল টুং করে। সে মানুষের ভাষা বুঝতে পারত না, কিন্তু মানুষের অঙ্গভঙ্গি বুঝে কিছুটা আন্দাজ করতে পারত। সে গিয়ে অন্যদের বলল, “দেখেছো, ঐ যে চওড়া চশমা পরা বিশাল জীবটা! আমাদের রাজনীতি বুঝে ফেলেছে মনে হয়!”
আরেক কর্মী মৌমাছি বলল, “উনি নিশ্চয়ই আমাদের ইউনিয়ন লিডার হতে চান। শুনেছি মানুষরা ক্ষমতা পেলেই চাকরি ফাঁকি দেয়!”
রাণী মৌমাছি শুনে একটু হেসে ফেললেন। তিনি বললেন, “আহা, ওরা মানুষ! ওদের নিয়ম অন্যরকম। ওরা সকালে ঘুম থেকে ওঠে দেরি করে, আর রাতে ঘুমায় ফোনের আলো দেখে। আমরা তো সূর্যের সঙ্গে ওঠি, ফুলের সঙ্গে ঘুমাই!”
এরপর মৌচাকের ভেতর ঠিক হলো— তারা “মানবপুর পরিদর্শন দল” গঠন করবে। উদ্দেশ্য একটাই: মানুষরা শৃঙ্খলার পাঠ নেয় কিনা, সেটা দেখা।
পরদিন সকালে দশজন কর্মী মৌমাছি উড়ে গেল মানবপুর স্কুলের দিকে। তখন সকাল আটটা। ঘণ্টা বাজানোর কথা সাতটায়। স্কুলের গেট খুলে নেই, হেডস্যার তখনও পাঞ্জাবির বোতাম খুঁজছেন। ক্লাসরুমের সামনে বাচ্চারা দাঁড়িয়ে হাসছে— কেউ ক্রিকেট খেলছে, কেউ মোবাইল নিয়ে সেলফি তুলছে, কেউ বলছে, “স্যার আসলে পড়ব।”
মৌমাছিরা হতবাক। মধুমিতা বলে উঠল, “এরা নিশ্চয় ফুলের বদলে ওয়াইফাই থেকে মধু খায়!”
একটু পরে মধুসূদন সাহেব এলেন, মুখে চা কাপ হাতে, চশমা নাকের নিচে, বললেন, “বাচ্চারা, আজ একটু দেরি হয়ে গেল।”
একটা মৌমাছি গুনগুন করে বলল, “স্যার, আপনি যদি আমাদের চাকের মেম্বার হতেন, এতক্ষণে চাক খালি হয়ে যেত!”
তবে সবচেয়ে মজার দৃশ্য ঘটল যখন শিক্ষক ব্ল্যাকবোর্ডে লিখলেন, “শৃঙ্খলা মানেই সফলতা।”
মৌমাছিরা তখন হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল। একজন বলল, “এই কথা বলেই উনি আবার হাই তুললেন!”
দুপুরের পর মৌমাছিরা ফিরে গেল নিজেদের চাকের রাজ্যে। রাণী তাদের দেখে জানতে চাইলেন, “মানুষের শৃঙ্খলা কেমন?”
মধুমিতা একটু লজ্জা পেয়ে বলল, “রাণী মা, ওদের কাজ ভাগাভাগি নেই, ওরা নাকি ‘সভা’ করে বেশি, কাজ করে কম। কেউ বলে, ‘এটা আমার দায়িত্ব না’, কেউ বলে, ‘আজ না কাল করব’। আর কেউ আবার অফিসে গিয়ে কাজের বদলে চায়ের কাপ গোনে!”
রাণী হেসে বললেন, “তবুও ওরা পৃথিবীর রাজা! বুদ্ধি আছে, কলম আছে, ভাষা আছে। কিন্তু হয়তো মধুটা ঠিকমতো বানাতে শেখেনি!”
এরপর থেকে মৌচাকে নিয়ম হলো— প্রতি সপ্তাহে একদিন “মানবপাঠ” হবে। মৌমাছিরা মানুষদের নিয়ে গল্প করে, হাসে, শেখে। তারা ভাবে, মানুষের মতো চিন্তা করলে হয়তো নতুন কিছু শিখবে, তবে আলস্য যেন না আসে!
অন্যদিকে মানবপুর স্কুলেও ঘটল এক বিস্ময়। মধুসূদন সাহেব একদিন লক্ষ্য করলেন— তার টেবিলের পাশে ছোট্ট একটা মৌচাক তৈরি হচ্ছে। তিনি প্রথমে ভয় পেলেন, তারপর দেখলেন সেখানে কিছু মৌমাছি চুপচাপ বসে কাজ করছে। কোনো ঝগড়া নেই, কোনো আওয়াজ নেই। তিনি মুগ্ধ হয়ে গেলেন।
সেদিনই তিনি ক্লাসে গিয়ে বললেন,
“বাচ্চারা, আমরা আজ মৌমাছির কাছ থেকে শেখব— কিভাবে দায়িত্ব নিতে হয়।”
ছাত্ররা হাসল, “স্যার, ওরা তো চিন্তা করে না!”
স্যার মৃদু হেসে বললেন, “ঠিক তাই! কিন্তু ওরা মন থেকে কাজ করে। আমাদেরও তাই করতে হবে— মনের মধু নিয়ে।”
তারপর থেকে স্কুলের নাম বদলে গেল— “মধুচাক বিদ্যালয়।” স্কুলে সকালে ঘণ্টা বাজলে সবাই সময়মতো আসে। কাজ ভাগাভাগি হয়, কেউ ঝাড়ু দেয়, কেউ গাছের যত্ন নেয়, কেউ বই সাজায়। শিক্ষকেরা বলেন, “আজ মৌমাছিদের মতো দিন!”
অন্যদিকে বনের মৌচাকে আবার “মানব পাঠশালা” চালু হলো। মধুমিতা প্রতিদিন রিপোর্ট দেয়— মানুষরা এখন সময়মতো স্কুলে আসে, হাসে, ফুল রোপণ করে।
রাণী মৌমাছি মুগ্ধ হয়ে বললেন, “তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমাদের মধু আর ওদের মন মিলে নতুন এক মিষ্টি সৃষ্টি করেছে।”
বনের পাখিরা গাইতে লাগল—
“মানুষ আর মৌমাছি,
মধুর এক ভালোবাসি।
একজন চিন্তা দেয়,
অন্যজন কর্মে যায়।
একসঙ্গে হলে তবে,
বিশ্ব হবে মধুময়।”
সেদিন থেকে “মৌচাক মহল” আর “মানবপুর” দুই রাজ্য এক আশ্চর্য সেতুতে যুক্ত হলো—
যেখানে বুদ্ধি আর শৃঙ্খলা মিলেমিশে নতুন জীবনের গান গায়।
আর যখনই বনে সূর্যের আলো পড়ে, রাণী মৌমাছি নরম গলায় বলেন,
“দেখো, শৃঙ্খলা শুধু স্বভাবে নয়— হৃদয়ে থাকলেই সে মধু হয়ে ওঠে।”
আর মধুসূদন সাহেব তার নোটবুকে লিখে রাখেন—
“মৌমাছিরা ছোট, কিন্তু তাদের কর্মই সবচেয়ে বড় শিক্ষক।” ????✨
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now