বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
উখিয়ার জালিয়া পালং জায়গাটি বঙ্গোপসাগরের পাড় ঘেঁষে। গত বছর জালিয়া পালং-এ একটি পুরনো বাড়ি কিনেছে রাগীবের বন্ধু ইয়াসির ।
বাড়িটি রহস্যময় এবং অভিশপ্ত বলে দূর্নাম আছে । বিয়ের ছ’মাস পর সে বাড়িতেই মোহনাকে খুন করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে রাগীব।
জালিয়া পালং-এর ওই বাড়ি ঘিরে অনেক অপমৃত্যুর কথা শোনা যায়। ইয়াসির ওর বউ কে নিয়ে একবার ও বাড়িতে গিয়েছিল ।
দু দিনও ওই অভিশপ্ত বাড়িতে থাকেনি লীনা। বাথরুমে কী যেন দেখেছিল। মোহনাকে খুন করার জন্য ঠিক এ ধরনের বাড়িই এখন দরকার রাগীবের।
নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি। ঝলমলের রোদের ভিতর কক্সবাজার-টেকনাফ হাইওয়ে ধরে ছুটে চলেছে একটি ২০১০ সালের কালো রঙের টয়োটা প্রাডো ।
ড্রাইভিং সিটে বসে রাগীব। দেখলেই বোঝা যায় ফুরফুরে মুডে আছে সে।
সবই পরিকল্পনা মতো চলছে। এখন ইয়াসিরের জালিয়া পালং-এর ‘নার্গিস ভিলায়’ পৌঁছে বাকি কাজ শেষ করবে।
ইয়াসিরের সঙ্গে রাগীবের বন্ধুত্ব দীর্ঘদিনের । রাগীব যখন মোহনাকে নিয়ে জালিয়া পালং যেতে চাইল, তখন ইয়াসির বলেছিল, অসুবিধে নেই। সোজা চলে যা।
ও বাড়িতে একজন কেয়ারটেকার আছে। নাম রউফ মিঞা।
আমি ওকে ফোন করে দেব। ওই সব ব্যবস্থা করে দেবে। ইয়াসির-এর বাবা জয়নুল শিকদার কনটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ।
কনটেক্স গ্রুপের বাইং হাউজ পরিচালনা করে রাগীব।
চট্টগ্রাম থেকে আজ সকালে রওনা হয়েছে। কক্সবাজার অতিক্রম করার সময় ক্রর হাসল রাগীব। লায়লা কলাতলির কাছে ‘সি কুইন’ হোটেলে উঠেছে।
আজ ভোরেও লায়লার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। মোহনা তখন চট্টগ্রামের হোটেলের রুমে ঘুমিয়ে ছিল। মোহনাকে খুন করার সময় লায়লাও কাছাকাছি থাকতে চায়। ব
িয়ের তিন মাস পর লায়লার সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্কে জড়িয়ে যায় রাগীব । ঢাকার গুলশানের একটা পার্টিতে লায়লার সঙ্গে রাগীব-এর পরিচয় ।
সেই পার্টিতে রাগীবকে দেখে অস্থির হয়ে ওঠে লায়লা। একে ঠিক প্রেম বলে না, বলে infatuation ... এরই মধ্যে দু’জনার সম্পর্ক গভীর হয়ে উঠেছে।
লায়লার জন্যই এখন মোহনাকে মরতে হবে। লায়লার বয়স পঁচিশের মতো।
গায়ের রং কিছুটা শ্যামলা হলেও টানটান সুন্দরী। লায়লার বাবা বাংলাদেশি হলেও মা ইরানি । লায়লা পড়াশোনা করেছে লন্ডনে। চৌকশ মেয়ে। টেনিস খেলে।
রাগীবের পাশের সিটে ঝিম মেরে বসে ছিল মোহনা ।
ফরসা মুখে কালো সানগ্লাস। চোখ রাস্তায়। কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কে আজ যানবাহনের দীর্ঘ সারি থাকলেও ঠিক যানজট নেই। ডানে মোড় নিল রাগীব।
বেলা একটার মতো বাজে। দূর থেকে টিলা চোখে পড়ে। রাস্তা ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে। রাগীব গাড়ির স্পিড কমিয়ে আনে। দু’পাশে ঘন বাঁশঝাড়।
নাড়িকেল আর সুপারি গাছের ফাঁকে ফসলের মাঠ। রাস্তার দু’পাশে কলাগাছ আর পানের বরজও চোখে পড়ে।হঠাৎ রাস্তার বাঁ পাশে তাকাতেই মোহনার বুক ছ্যাঁত উঠল। রাস্তার পাশে একটা স্কুল। স্কুলের সামনে একটা টি স্টলে।
টিস্টলের বেঞ্চে বসে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুর সঙ্গে কথা বলছে ইজাজ। মোহনা জানে ইজাজ এখন উখিয়ার জালিয়া পালং-এ থাকে ।
একটা প্রাইমারি স্কুলে পড়ায়। রাগীব যখন বলল, আমরা উখিয়ার জালিয়া পালং-এ যাব। তখন ভবিতব্যের কথা ভেবে কেঁপে উঠেছিল মোহনা।
মনে হয়েছিল ইজাজের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। ইজাজ কবি। ও সমুদ্র ও পাহাড় ভালোবাসে। জালিয়া পালং জায়গাটা সমুদ্রের পাড়ে। এখানে ছোটখাটো পাহাড়ও আছে।
... ইজাজ ঢাকা শহরকে মৃত ঘোষনা করে শহরটাকে এড়িয়ে চলে। বছর খানেক আগে অবশ্য একবার বই ছাপাতে গিয়েছিল ঢাকায়।
৩০০ পৃষ্ঠার ‘অরণ্য ও সমুদ্রের দিনলিপি’ বইটি লিখেছিল জালিয়া পালং-এর নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে। শাহবাগে বইটির প্রকাশনা উৎসবে ইজাজের সঙ্গে পরিচয় মোহনায়।
সবার সামনেই সরাসরি মোহনার চোখের প্রশংসা করেছিল ইজাজ। তার পর থেকেই ভয়ানক উতলা হয়ে উঠেছিল মোহনা; ইজাজের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হয়ে উঠেছিল।
মোহনার বাবা ইজাজের বইটির অকুন্ঠ প্রশংসা করলেও ভবঘুরে কবির হাতে মেয়েকে তুলে দিতে রাজি হননি। আজকাল বাংলাদেশি সমাজে পাত্র হিসেবে বাউন্ডুলে কবিদের চেয়ে বাইং হাউজের অধিপতিদের চাহিদাই বেশি। বিয়ের আগে ইজাজের সঙ্গে শেষবার দেখা হয়েছিল মোহনার । ইজাজ তখন বলেছিল: তোমাকে আমি খুঁজব মোহনা। সারা জীবন। তোমার আমার বিরহ সাময়িক। এর অন্য কোনও মানে আছে ... একদিন ঠিকই বুঝতে পারবে। কথাটা শুনে মোহনা কেঁপে উঠেছিল।
রাগীব চারপাশে তাকিয়ে স্পিড কমিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। জালিয়া পালং-এর মতো এমন প্রত্যন্ত একটি এলাকায় ইয়াসির কেন বাড়ি কিনেছে? খেয়াল? ওর তো পয়সার অভাব নেই। লীনা ভয় পাবার পর বাড়িটি বিক্রি করে দিতে চাইছে। ক্রেতা পাচ্ছে না। এর আগে বাড়ির মালিকানা ছিল একজন সৌদি প্রবাসী ব্যবসায়ীর ।
বাথটাবে তার এক ছেলের মৃত্যু হয়। যে বাড়িতে অপমৃত্যু স্বাভাবিক ঘটনা সে বাড়িতে আরও একটি অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটলে কারও মনে সন্দেহ জাগবে না। রাগীব ক্রর হাসে।
বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। বেশ উঁচু দেয়াল। কালো রঙের গেটা। দেয়ালে মার্বেল পাথরে লেখা: ‘নার্গিস ভিলা।’ দু’পাশে ইউক্যালিপটাস গাছ। রাগীব হর্ন বাজাল । একজন মাঝবয়েসি কালো মতন লোক গেট খুলে দিল। ভিতরে চমৎকার বাগান। তারপর সাদা রঙের দোতলা বাড়ি। দেখলেই বোঝা যায় অনেক পুরনো। অন্তত পঞ্চাশ ষাট বছরের পুরনো তো হবেই । পাকিস্তান আমলে তৈরি বলে মনে হল। স্থানীয় কোনও ধনী লোকের খেয়াল। বাড়ির পিছনেই সমুদ্র সৈকত। সৈকতে চোরাবালি। আগামীকাল মোহনাকে ওখানেই মৃত পাওয়া যাবে ... যদি সাগরের ঢেউ ওকে ফিরিয়ে দেয়। রাগীব শ্বাসরোধ করে হত্যা করবে মোহনাকে ।
লোকটা গেট বন্ধ করে আবার দৌড়ে এসেছে। গাড়ি থেকে নেমে রাগীব জিগ্যেস করে। তুমি রউফ মিঞা?
লোকটা মাথা নাড়ে। বয়স চল্লিশ-এর বেশি বলে মনে হয় না। মাথায় সাদা টুপি। কালো ভাঙাচোরা মুখে কাঁচাপাকা দাড়ি। পরনে সাদা ময়লা ফতুয়া আর উঁচু করে পরা চেক লুঙি। কাঁধে গামছা। এতবড় বাড়ির কেয়ারটেকার হিসেবে লোকটাকে ঠিক মানায় না।
আমরা যে আসব জান?
হ। সার। জানি। ছোট সারে ফোন করছিল।
একতলার ড্রইংরুমটা বেশ বড়। পুরনো আমলের আসবাবপত্র। মেঝেতে রংচটা কার্পেট।
ঢাউশ কালো সোফা। দেয়ালে বাঘের ছাল আর হরিণের মাথা টাঙানো। ওপাশের দেয়ালে অল্প বয়েসি একটি মেয়ের বেশ বড় একটি ছবি।
সাদা কালো। শাড়ি আর গয়না পরা।
মেয়েটির চোখের দৃষ্টি এতই জীবন্ত যে মোহনা চমকে ওঠে। ডাইনিং রুমটিও বেশ বড়। অবশ্য ডাইনিং রুম না-বলে ডাইনিং হল বলাই ভালো।
বড় টেবিল একসঙ্গে কুড়ি পঁচিশ। ঘরজুড়ে কেমন পুরনো গন্ধ।
বেডরুম দোতলায়। রউফ মিঞাই সুটকেস নিয়ে এল দোতলায় ।
বিশাল বেডরুম। মাঝখানে পুরনো আমলের একটি পালঙ্ক। জানলা ঘেঁষে একটা ইজিচেয়ার।
পুরনো আমলের একটা ড্রেসিং টেবিল। দোতলার বসার ঘরের পাশে সমুদ্রমুখি বিশাল বারান্দাটিকে টেরেস বলাই ভালো। লোহার কারুকাজ করা রেলিং। নীচে বাগান। দেয়ালে ছোট একটা গেট।
গেটের ওপাশে সিঁড়ি নেমে গেছে সৈকত অবধি ।
নভেম্বরের রোদে ঝিকমিক করছে সমুদ্র । টেরেসে কয়েকটা বেতের চেয়ার । ওরা ওখানেই বসল। রোদের আঁচ মিষ্টি লাগছে। রউফ মিঞা চা নিয়ে এল। মোহনা অবশ্য চা খেল না। একবারে গোছল সেরে ভাত খাবে । রাগীবকে বলল, তুমি বস। আমি গোছল সেরে নিই। সারা চিটচিট করছে।
ওকে। বলে রাগীব চায়ে চুমুক দেয়। মোহনা বাথরুমে চলে যায়। একটু পর রউফ মিঞা কাপ নেওয়ার জন্য ফিরে এল। রাগীব জিগ্যেস করে, নীচে সৈকতে যাওয়ার গেটের চাবি তোমার কাছে আছে তো?
হ সার। আছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now