বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
মনোজদের অদ্ভূত বাড়ি— পর্ব ২ —শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
X
রাখোবাবু কড়া ধাতের লোক, আদবকায়দার নড়চড় দেখলে খুব রাগ করেন। তাই সে-সময়টায় দুঃখহরণবাবুকে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে হয়। আর ওই এক ঘণ্টায় দুঃখহরণবাবু রাজ্যের ভুলভাল করতে থাকেন। একদিন তিনি ওই অবস্থায় ট্রানস্লেশন করতে গিয়ে ‘তখন হলঘর ভরিয়ে গিয়াছে’ এই বাক্যটার ইংরেজি করলেন ‘বাই দেন দি হল রুম ওয়াজ ফুলফিলড'। এই ইংরেজি শুনে বাবা তাঁর ইংরেজি খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলে বিরক্ত হয়ে তাকালেন। ছেলেমেয়ের সামনে মাস্টারমশাইয়ের ভুল ধরলে, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা কমে যেতে পারে, সেই জন্য বললেন—“দুঃখবাবু, ইংরজিটা ঠিকই আছে, তবে একটু কানে কেমন যেন লাগছে। আর একবার অন্যভাবে করুন।” কিন্তু দুঃখহরণবাবু পা ঝুলিয়ে বসে আছেন যে, তার ওপর রাশভারী রাখোবাবুর কথা শুনে আরও ঘাবড়ে গিয়ে খুব শক্ত ইংরেজিতে বললেন—“দি হল’স ফুলফিলমেন্ট ওয়াজ অ্যাচিভড বাই দেন।”
শুনে রাখোবাবু আর মুখ তুললেন না । দুঃখহরণবাবুও গোলমালটা বুঝতে পারছেন, কিন্তু উবু হয়ে না-বসলে তাঁর মুড আসে না। তাই তিনি ঠ্যাং দুটো জোর-নাচাতে-নাচাতে মুখে ‘হু হুঁ করে একটা শব্দ করে যেতে লাগলেন। দাদা সরোজ, দিদি পুতুল, আর মনোজ চুপিসারে হাসাহাসি করছে।
শীতকাল। বাগানে, খুব ফুল ফুটেছে। সামনের দিকটায় মস্ত মস্ত গাঁদা ফুটে আছে, সেগুলো এত বড় যে দু হাতে মুঠো করেও বেড় পাওয়া যায় না। মোরগ ফুল, পপি, গোলাপ তো আছেই। ফটফটে রোদে প্রজাপতি আর ফড়িং উড়ছে অনেক, পোকামাকড় টি টি করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাগানের অন্য ধারে পালং খেত, ফুলকপি, ওলকপি, ধনেপাতা, বেগুন লাগানো হয়েছে। সেই সবজি খেতে দেহাতি বুড়ো মানুষ রামখিলাওন খুরপি হাতে ঘুরঘুর করছে। যদিও একটা ঠিকে মালী এসে বাগানের কাজ করে যায় রোজ, তবু রামখিলাওন কাজ দেখানোর জন্য বাগানে সব সময়ে কিছু খোঁড়াখুড়ি করবেই। চোখে ভাল দেখতে পায় না, অনেক সময়ে গাছের গোড়ার মাটি খুঁড়ে আলগা করতে গিয়ে শেকড়বাকড় উপড়ে ফেলে। আগাছা তুলতে গিয়ে ফুলগাছ তুলে ফেলে দিয়ে আসে। বকুনি খেলে খুব গম্ভীরভাবে থাকে, যেন এ-সব বকাবকি তার তেমন গায়ে লাগে না। গতবার ঠাকুমার চশমা পালটানো হল, আর রামখিলাওন ঠাকুমার পুরনো চশমাটা চেয়ে নিল। সেই চশমাটা এখন সব সময়ে চোখে পরে থাকে। তাতে যে সে ভাল দেখতে পায় তা নয়। কিন্তু এমন ভাব দেখায় যে খুব ভাল দেখছে। চশমা পরে ইজ্জতও বেড়ে গেছে তার। বাজারের কাছে দেশওয়ালী ভাইদের কাছে চশমা পরে যাওয়ায় সেখানে তার খাতিরও নাকি বেড়ে গেছে। বাড়ির চাকর রঘু তাকে রামু বলে ডাকলে বা তুই-তোকারি করলে সে ভারী চটে যায়।། রঘু তাই তাকে আজকাল ‘রামুবাবু’ বলে ডেকে আপনি-আজ্ঞে করে । কিন্তু সন্ধে হলেই রঘু নানা কায়দা করে রোজ রামুকে ভূতের ভয় দেখাবেই।
আজ দুঃখহরণবাবুর ভুলভাল কিছু বেশি হচ্ছে। দাদা সরোজকে ইতিহাস বোঝাতে গিয়ে তিনি বরাবার ওয়ার্ড মিনিং বোঝাতে লাগলেন, ইতিহাস বইতে দুটাে ব্যাখ্যাও দাগিয়ে দিলেন। পুতুলকে সুদ-কষা বোঝাতে গিয়ে তিনি হুঁশিয়ার করে দিয়ে বললেন, “মুখস্থ যেন ভুল না হয়, আর দাঁড়ি কমা সেমিকোলন সম্পর্কে সাবধানে থাকবে। ” মনোজের ভূগোল-বই খুলেও তিনি গোলযোগ করে ফেললেন, পশ্চিমবঙ্গের কোন কোন জেলায় ধান ও পাট জন্মায় তা বলতে গিয়ে তিনি বারবার ‘নর’ শব্দের রূপ এনে ফেলছিলেন। তাই শুনে রাখোবাবু বিরক্ত হয়ে উঠে পড়লেন। ঘরে গোবরের গন্ধ, পড়ার ঘরে ভুলভাল পড়ানো, কোথায় আর যাবেন! তাই বাগানে পায়চারি করতে-করতে দেখেন, রামু একমুঠো দুৰ্ব্বো ঘাস, কয়েকটা কড়াইণ্ডটি আর একটা গাজর বাগান থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে।
রাখোবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “ওসব কোথায় নিচ্ছিস রে রামু? দেখি, কী তুলেছিস?”
রামু একগাল হেসে হাতের জিনিসগুলো দেখিয়ে বলল, “বুড়ি মা পাঠালেন কিছু ধনেপাতা, কাঁচা লঙ্কা আর একটা মুলো তুলে আনতে৷”
রাখোবাবু রেগে অস্থির । বললেন, “স্টুপিড, কবে থেকে বলছি হাসপাতাল থেকে চোখের ছানি কাটিয়ে আয়। কিছুতেই শুনবি না? কোন আক্কেলে তুই লঙ্কা বলে কড়াইশুটি, মুলো মনে করে গাজর আর ধনেপাতার বদলে গুচ্ছের ঘাস তুললি। আজই চল তোকে হাসপাতালে নিয়ে যাব, চোখ কাটিয়ে আসবি।”
শুনে রামু ভীষণ গম্ভীর হয়ে গেল। রাখোবাবু রাগারগি করতে-করতে ভিতর-বাড়িতে চলে গেলেন। পড়ার ঘরে দুঃখবাবু চেয়ারের ওপর টপ করে উবু হয়ে বসতেই তাঁর চেহারা পাল্টে গেল। মুহুর্তের মধ্যে তিনি ধান ও পাটের জেলা ঝরঝরে মুখস্থ বলতে লাগলেন, সুদকষা জল করে দিলেন, ইতিহাসের সন-তারিখ সুন্ধু আকবরের খুড়তুতো ভাইয়ের নাম পর্যন্ত তাঁর মনে পড়ে গেল।
ঠাকুমা বামাসুন্দরী ডালের বড়ি দিচ্ছিলেন রোদে বসে। একটা কাক তাঁকে অনেকক্ষণ ধরে জ্বালাতন করছে। কাকটার সাহসেরও বলিহারি। এ বাড়িতে ঠাকুরঝি জেগে থাকতে বেড়াল কুকুর কাকপক্ষী ঢুকতে বড় একটা সাহস পায় না। কে কোথাকার এটোকাটা আস্তাকুড় টেনে আনে ঘরে, সেই ভয়ে ঠাকুরঝি লাঠিটি হাতে সারা বাড়ি খোঁড়া পায়ে ডিং মেরে-মেরে ঘুরে বেড়ান। কত কুকুর, বেড়াল, কাকপক্ষী যে তাঁর হাতে রামঠ্যাঙ্গা খেয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। ইদানীং তিনি শুধু লাঠির ওপর ভরসা না-রেখে পেয়ারা গাছের ডাল কাটিয়ে একটা গুলতি বানিয়ে নিয়েছেন । গুলতির যে চামড়ার অংশটুকুতে গুডুল ভরতে হয়, সে-জায়গাটায় চামরার বদলে কযেক পাল্লা ন্যাকড়ার পট্টি লাগিয়ে নিয়েছেন, চামড়া ছুঁতে পারেন না। গুলতি ছুড়ে ছুড়ে ঠাকুরঝির হাতের টিপও হয়েছে চমৎকার। সট সট করে গুডুল ছোড়েন, ঠিক গিয়ে বেড়ালের লেজের লোম খসিয়ে দেয়, কাকপক্ষীর ডানার পালক ঝরে যায়, কুকুরের ঠ্যাং খোঁড়া হয়। এ বাড়িতে আদ্যশক্তি আছেন জেনেও কাকটা ঘুরঘুর করছে। তেল-মাখানো কাসার থালা, টিনের টুকরো রোদে পেতে দিয়েছেন বামাসুন্দরী, ডাল ফেটাচ্ছেন। ডাল ফোটানোতে তাঁর জুড়ি নেই। বারো মাস ডাল ফেটিয়ে তাঁর ডান হাতে বেশ জোর হয়েছে। পাঞ্জা কষলে মেজকাকা ব্যায়মবীর হারাধনও ঠাকুমাকে হারাতে বেগ পাবেন। তা ঠাকুমা ডাল ফেটাচ্ছেন। কাকটা ঘুরঘুর করছে। ডালে কালোজিরে মেশাবেন বলে কালোজিরের পুরিয়াটা পাশেই রেখেছেন। কাকটা এক ছোঁ দিয়ে নিয়ে গেল।
(চলবে...)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now