বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
পাখা দিয়ে জোরে জোরে নিজেকে বাতাস করছে আবু ফুলান। ইবনে ফুলান বললো, “ওস্তাদ, ক্যামেরা অন হইছে তো!”
.
আবু ফুলান সাথে সাথে পাখা ফেলে মাইক তুলে বললো, “আসসালামু আলাইকুম, প্রিয় দর্শকমণ্ডলী। চারিদিকে বৈশাখ মাসের কাঠফাটা রোদ। কিন্তু জাহান্নামের আগুন তার চেয়েও গরম। তাই দুনিয়ার এই গরমে ভয় না পেয়ে বাঙালিরা মেতে উঠেছে তাদের জানের উৎসব, প্রাণের উৎসব, হাজার বছরের আবহমান বাঙলার অবিচ্ছেদ্য সংস্কৃতি, জঙ্গিবাদ দমনের বিজ্ঞানমনস্ক হাতিয়ার পহেলা বৈশাখ পালনের জন্য। সারা দিন ক্যাটক্যাটে গরমে মিলেমিশে নেচেগেয়ে ঘামে ভিজে ক্যাতক্যাতে হয়ে পালিত হবে এই উৎসব। আর হুজুর টিভির ক্যামেরায় তা ধারণ করার জন্য আপনাদের সাথে আছি আমি আবু ফুলান। ক্যামেরায় আছেন ইবনে ফুলান। চলুন দেখি সাক্ষাৎকার নেওয়ার মতো কাউকে পাওয়া যায় কিনা।”
.
কিছুদূর যেতেই দেখা হয়ে গেলো ‘খান্নাসের হাসি’ এনজিও সংস্থার প্রধানের সাথে। আবু ফুলান বললো, “জনাব এনজিও, আমাদের অনুষ্ঠানে আপনাকে স্বাগতম। সংবাদমাধ্যম থেকে আমরা কিছুদিন আগে জানতে পারলাম অল্প বয়সেই মা হয়ে যাচ্ছে ইলিশ মাছ। এ ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?”
.
“আসলে আমাদের দেশ যে মধ্যযুগীয় বর্বরতায় ফিরে যাচ্ছে, তারই প্রমাণ ইলিশ মাছের মাঝে এই বাল্যবিবাহ প্রথার প্রচলন। ৫ই মে হেফাজতে ইসলাম যে তাণ্ডব চালিয়ে নিরীহ গাছপালা হত্যা করে দেশকে ১৩০০ বছর পিছিয়ে দিলো, তারপর এরকম ঘটনা আমাদের দেশে খুবই স্বাভাবিক।”
.
“ইলিশ সমাজে এই বাল্যবিবাহ প্রথা রোধ করার জন্য আপনার কোনো বিজ্ঞানমনস্ক সাজেশন?”
.
“এভাবে চলতে থাকলে কিছুদিনের মাঝেই ইলিশেরা জনসংখ্যা সমস্যায় পড়ে যাবে। তাই প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে ইলিশ মাছ গণহত্যা করে ভাজি করে খেতে হবে।”
.
“কিন্তু এটা কি নিরীহ ইলিশদের উপর মধ্যযুগীয় বর্বরতা নয়? আমাদের সবার কি উচিত নয় আমাদের মনের ভেতর যে ইলিশ মাছ আছে, তাকে আগে শেষ করা? মনের ইলিশ কর ভাজা, বাঁচবে ইলিশ থাকবে তাজা।”
.
“ওহ শিট! অমুক জায়গায় পান্তা ইলিশ পার্টি আছে। আপনাকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে দেরি হয়ে গেলো, ধ্যাৎ! এই হুজুররাই দেশটাকে পিছিয়ে দিচ্ছে।” এই বলে গ্যাটগ্যাট করে হেঁটে চলে গেলেন জনাব এনজিও।
***
অনুষ্ঠানের পরবর্তী অতিথিকে খোঁজ করতে করতেই আবু ফুলানের সাথে গায়কের চোখাচোখি হলো। তাকে দেখেই দৌড়ে পালাতে নিলো গায়ক। আবু ফুলান তার হাত ধরে ফেললো। গায়ক বললো, “ছেড়ে দে শয়তান। তুই আমার দেহ পাবি, কিন্তু গান শুনতে পাবি না।"
.
আবু ফুলান অভয় দিয়ে বললো, “আরে আমি ওই হুজুর না যে আপনার গান বিকৃত করে। আমি আরেকজন। হুজুর টিভির উপস্থাপক আবু ফুলান। আপনার সাক্ষাৎকার নেবো।”
.
“ও আচ্ছা, তাই বলুন। একটু দ্রুত করুন, প্লীজ। শীঘ্রই বটমূলে যেতে হবে।”
.
“ছিঃ ছিঃ! এসব কাজ টয়লেটে করুন। বট গাছের মূলে ওইসব কাজ করা তো মধ্যযুগীয় স্বভাব। যদিও গাছের জন্য জৈবসারের একটা ব্যবস্থা হয়।”
.
“আহা ওইসব কাজ না তো! বটগাছের নিচে আমরা গানের অনুষ্ঠান করি। গান গেয়ে বৈশাখকে ডেকে নিয়ে আসি। এসো হেএএ বৈশাখ এসো এএসো।”
.
“কেন? আপনারা না ডাকলে কি বৈশাখ আসবে না?”
.
“বিষয়টা তা না। আপনি তো জানেনই শির্ক হলো বাঙালিদের হাজার বছরের সংস্কৃতি। মুশরিকদের অভ্যাস হলো কিছু একটা পেলেই তাকে জীবিত দেব-দেবী সত্ত্বা বানিয়ে পূজা করতে শুরু করা। তো বৈশাখ মাসও তাদের ঐরকম একটা দেবতার মতো। তাকে ডাকা হয়, অমঙ্গল দূর করে দিতে বলা হয়। সেই সংস্কৃতিকেই আমরা আজও টিকিয়ে রেখেছি।”
.
“বাহ! কী চমৎকার। তা হুজুর টিভির দর্শকদের একটা গানের কিছু অংশ গেয়ে শোনান।”
.
“তাপস নিঃশ্বাস বায়ে...”
.
“...জাহান্নামরে দাও মনে করায়ে।” পাশ থেকে বলে উঠলো সেই গান বিকৃতকারী হুজুর। গায়ক বিরক্ত হয়ে “ধুর খেলুম না” বলে চলে গেলো। হাই ফাইভ করলো আবু ফুলান ও অপর হুজুর।
***
“প্রিয় দর্শক, একটু দূরেই দেখতে পাচ্ছেন বাঙালিদের ঢল নেমেছে। সাপ-প্যাঁচা, ইঁদুর-বাদুড়ের মূর্তি...থুক্কু...ভাস্কর্য নিয়ে চলছে মঙ্গল কামনা। আমরা কাছে যেতে পারছি না। কারণ আমাদেরও আযাবের ভয় আছে, ওরাও হুজুর দেখে ভয় পেতে পারে। শোভাযাত্রার ভেতর থেকে আমাদেরকে সময় দিতে রাজি হয়েছেন জনাব কলাবিজ্ঞানী এবং মহামান্য নেতা। স্বাগতম আপনাদের দুজনকেই। প্রথম প্রশ্ন কলাবিজ্ঞানীর কাছে। আচ্ছা এই শোভাযাত্রার বৈজ্ঞানিক উপকারিতাগুলো যদি আমাদের সামনে তুলে ধরতেন।”
.
কলাবিজ্ঞানী বলতে শুরু করলো, “আসলে সব ব্যাপারে বিজ্ঞান টেনে আনা ঠিক না। যে যার ধর্ম পালন করুক, সে স্বাধীনতায় আমি বিশ্বাস করি, যদি না তা ইসলাম ধর্ম হয়।”
.
আবু ফুলান বললো, “ধন্যবাদ। এবার মহামান্য নেতা...”
.
নেতা বলতে লাগলেন, “আসলে এই বছর প্যাঁচা দেবী বাঁশের আগায় চড়ে মর্ত্যে এসেছেন বলেই শান্ডারপুরে শসার বাম্পার ফলন...”
.
“না না, আমার প্রশ্ন ওটা ছিলো না। বলছিলাম, স্বৈরশাসকের পতন কামনা করে সর্বপ্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়। মানে অমঙ্গল বলতে তারা স্বৈরশাসককে বুঝতো। এখন তো দেশে গণতন্ত্রের জোয়ার বইছে। এখন কি তাদের এই শোভাযাত্রা করা আপনার মনে সন্দেহের উদ্রেক করে না?”
.
“এভাবে তো ভেবে দেখিনি! পুলিশম্যান! এক্ষুণি লাঠিচার্জ কর! টিয়ারশেল মেরে কাঁদিয়ে দাও সবকটাকে...”
.
কলাবিজ্ঞানী চেষ্টা করতে লাগলো নেতাকে ঠাণ্ডা করার জন্য। পা টিপে টিপে সরে এলো আবু ফুলান ও ইবনে ফুলান।
***
“প্রিয় দর্শক, আমরা সামনে কয়েকজন ইভটিজার দেখতে পাচ্ছি। চলুন গিয়ে কথা বলি। ইয়ে...জনাব ইভটিজার, আপনারা এসব কাজ করে পহেলা বৈশাখের পবিত্রতা নষ্ট করছেন কেন?”
.
ইভটিজারদের নেতা জবাব দিলো, “আরে কী কও মাম্মা! ইভটিজিং হইলো বাঙালির হাজার বচ্ছরের ঐতিজ্য।”
.
“হাজার বছরের ঐতিহ্য? কীভাবে? হাউ? কাউ?”
.
“আরে দেহো না মাম্মা, হাজার বচ্ছর আগে এক বাঙালী গায়ক গান গাইছিলো ‘ওই বখাটে ছেলের ভিড়ে ললনাদের রেহাই নাই! মেলায় যাই রে! প্যাঁ প্যাঁ প্যাঁ পুঁ পুঁ পুঁ! মেলায় যাই রে!’ আর মাম্মা ইভটিজিং কথাডাই তো ইংলিশে নাইক্কা। ইংলিশে আছে এষ্টকিং (stalking)। তাইলে হইলো না ইভটিজিং আমাগো সম্পত্তি?”
.
“ওহ তাই তো! তাও সাবধান থাকবেন ভাই। জাহান্নামের আযাব কিন্তু ভয়াবহ।”
.
“আরে টেনশন নাই মাম্মা জুম্মার নামায একটা সপ্তায়ও মিস দেই না।”
***
“দর্শক, আমরা এখানে পেয়েছি জনাব বাঙালি মুসলমানকে। তাঁর বক্তব্য হলো আলেমদের মাঝে এত ভেদাভেদ কেন। আলেমরা একমত হলেই তিনি যে কোনো কিছু মেনে নিতে রাজি।”
.
বাঙালি মুসলমান আবু ফুলানের জোব্বা টেনে ধরে বললো, “ওই যে ওইখানে তিনজন আলেম পরস্পরের চুল দাড়ি টানাটানি করতেছে। চলেন ওইখানে যাই।”
.
“হ্যাঁ, চলুন...দর্শক, আমরা দেখতে পাচ্ছি এখানে বাহাস করছেন মাওলানা বতিনী আমিন, শাইখ রাফি ইয়াদাইন এবং মৌলভি নূরনবী। হযরতগণ...”
.
মাওঃ বাতিনী আমিন আবু ফুলানের দিকে ফিরে বললেন, “আগে কও নামাজে আস্তে আমিন কও, নাকি জোরে?”
.
শাইখ রাফি ইয়াদাইন বললেন, “বলো তো একবার রাফউল ইয়াদাইন করলে কয় নেকি?”
.
মৌলভি নূরনবী বললেন, “এই অহাবীদের কথা শুনবা না। সিন্নি আনছো?”
.
আবু ফুলান বিব্রত অবস্থা কাটিয়ে বললো, “আসলে আমরা জানতে চাচ্ছিলাম পহেলা বৈশাখ ও একে ঘিরে গড়ে ওঠা আচারপ্রথাগুলোর ব্যাপারে।”
.
মাওলানা বাতিনী আমিন, শাইখ রাফি ইয়াদাইন আর মৌলভি নূরনবী সমস্বরে বলে উঠলেন, “হারাম! মুশরিকদের অনুকরণ!”
.
আবু ফুলান বললো, “বাহ! সকল আলেম একমত। এবার আশা করি জনাব বাঙালি মুসলমান এই বিষয়টা মেনে নেবেন। জনাব, বাঙালি...”
.
কিন্তু ততক্ষণে বাঙালিকে আর পাওয়া গেলো না। দৌড়ে পালাতে পালাতে সে দূর থেকে বললো, “আমার প্যান্ট নষ্ট!”
***
“ওফ! প্রিয় দর্শক আমাদের আর অনুষ্ঠান চালিয়ে যাবার শক্তি নেই। গরমের কারণে হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। আজকের অনুষ্ঠান এখানেই শেষ করছি। আসসালামু আলাইকুম।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now