বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শুভ যে বাড়িতে লজিং থাকে তাঁর পাশের বাড়িতেই সিলেট এলাকার জকিগঞ্জের সেলিম মিয়া লজিং থাকে। সেলিম মিয়া দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। মানবিক শাখায় পড়ে। কলেজে এলাকায় যেমন ছাত্র/ছাত্রী আছে তেমনি বাংলাদেশের অনেক জেলার ছাত্র/ছাত্রীও আছে। সন্দীপ, কুড়িগ্রাম, সিলেট, শরিয়তপুর প্রভৃতি এলাকার ছাত্রও এখানে আছে। বাঞ্ছারামপুরের হান্নান, সাভারের সাকিল, আড়াই-হাজারের জিয়া তো ক্লাসমেট। শুভ একদিন সেলিম মিয়ার বাসায় গেলে কয়েকটা উপন্যাস দিল পড়তে। শুভ উপন্যাস পড়তে খুব পছন্দ করে। সেলিম মিয়ার বই পেয়ে খুবই খুশী হল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রেমের উপন্যাস, আরো দুটি বইও প্রেমের উপন্যাসই। বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় কনকলতা নাম লিখা। দু একদিনের মধ্যে সব উপন্যাস পড়া শেষ করে আবার সেলিম মিয়াকে বই ফেরত দিল। সেলিম মিয়া বলল, “ছোট ভাই এত তাড়াতাড়ি বই পড়া শেষ করলে কিভাবে?” শুভ জানাল বিকেল একটা বই পড়ে শেষ করা এবং রাত দশটার পর আরেকটি বই পড়ে শেষ করে তারপরে ঘুম। সেলিম মিয়া বলল, “তুমি তো বই পোকা”। শুভ বলল, “সেলিম ভাই, বইয়ের শেষ পৃষ্টায় কনকলতা নাম কেন?” সেলিম মিয়া হেসে জানাল, বইগুলো সব কনকলতার। কনকলতা তাকে উপহার দিয়েছে। শুভ বলল, “কনকলতাটা কে?”। সেলিম মিয়া জানাল, কনকলতা হলো সেলিম মিয়ার ক্লাস-মেট। মানবিক বিভাগেই পড়ে। তার মানে দুজন একসাথেই লিখা পড়া করে। শুভ বলল, বাড়ি কোথায়? সেলিম মিয়া জানাল পালপাড়ায়। পালপাড়া মানে কনকলতা হিন্দু! বিস্ময়ের সাথে প্রশ্ন করল শুভ। সেলিম বলল, “হ্যাঁ। কনকলতা হিন্দু। কনকলতা আমাকে ভালবাসে।“ শুভ বলল, আপনি উনাকে ভালবাসেন কি না? সেলিম মিয়া দ্রুত রিপলাই দিল, “আমিও কনকলতাকে ভালবাসি।“। শুভ বলল, “হিন্দু –মুসলমানের প্রেম হয়? সমাজ মেনে নিবে?” সেলিম মিয়া শুভকে কয়েকটি হিন্দু-মুসলিম বিয়ের উদহারণ দিলো। অনেক উপন্যাসে প্রেম-কাহিনীর উদহারণ দিয়ে শুভকে বুঝাল। কারোর বাবা-মা এই প্রেম বা বিয়ে মানবে না তাও যানে সেলিম মিয়া তবে তারা যদি জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে কারো বাঁধাই সমস্যা হবে না বলে জানাল সেলিম মিয়া। সেজন্য তারা বিয়ে করবে চাকুরীরি পর।
কলেজে তাড়াতাড়ি যেতে হলে পাল পাড়ার ভিতর দিয়ে যেতে হয়। এতে প্রায় পাঁচ/ছয় মিনিট সময় বাঁচে। পাল পাড়া দিয়ে কলেজে গেলে পালদের মাটি দিয়ে হাড়ি-পাতিল বানানোর দৃশ্যও দেখা যায়। বাংলাপিডিয়া থেকে পাল বা কুমারদের কাজ সম্পর্কে জানা যায়, “কুমার বা কুম্ভকার বিশেষ ধরনের মাটিকে পাত্র তৈরির উপযোগী করে গৃহস্থালির তৈজসপত্র, খেলনা ইত্যাদি নির্মাণকারী একটি পেশাজীবী শ্রেণি। কুমার বা কুম্ভকার হলো এদের বর্ণ নাম। অতীতে মৃৎশিল্প একচেটিয়াভাবে হিন্দুদের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। মাটি দ্বারা নির্মিত গৃহস্থালির অসংখ্য তৈজসপত্রের মধ্যে রয়েছে কলসি, হাঁড়ি, জালা, সরাই/ঢাকনা, শানকি, থালা, কাপ, বদনা, ধূপদানি প্রভৃতি। মাটি নির্মিত নানারকম খেলনা এবং তাল, কলা, কাঁঠাল কিংবা আম ইত্যাদি পণ্য আধুনিক মেলা বা উৎসবে জনপ্রিয় শিল্পপণ্য হয়ে উঠেছে।
প্রাচীন কিংবা আধুনিক যুগের সব কুমাররাই মাটি দ্বারা তৈজসপত্র নির্মাণে সাধারণ কৌশল অবলম্বন করে থাকে। প্রথমে ভূমি থেকে মাটি সংগ্রহ করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে তাকে হাত ও পায়ের সাহায্যে বা কাঠের অথবা পাথরের পিটনা দিয়ে থেতলে পাত্র তৈরির উপযুক্ত করে তোলা হয়। এসব কাজের সুসংবদ্ধ ধাপগুলি হচ্ছে কাদামাটি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, উৎপাদনের জন্য মাটিকে প্রস্ত্তত করা, পাত্রের আকার ও আকৃতি প্রদান করা, সূর্যের তাপে পাত্রটিকে শুকানো এবং সবশেষে তা আগুনে পোড়ানো ও প্রয়োজনে তাতে রং লাগানো।
প্রাচীনকালে কেবল মাটির সাথে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় পানি মিশিয়ে এবং অতিরিক্ত কোনো উপাদান ব্যবহার না করেই জিনিসপত্র তৈরি করা হতো। এক ধরনের নিখাদ কাদামাটিকে ছোট ছোট খন্ড করে গোলাকার পাত্র বানানো হতো। অনেক সময় কাদামাটিকে বিভিন্ন প্রাকৃতিক বস্ত্ততে রেখে আকৃতি প্রদান করা হতো। কুমারের চাকা তুলনামূলকভাবে অনেক পরের আবিষ্কার। আজকের দিনের কুমারেরা প্রায় সবাই চাকা ব্যবহার করে থাকে। অনেক এলাকায় এ চাকাকে বলা হয় চাক। চাকের মাধ্যমে তারা মাটির পাত্রাদির প্রয়োজনীয় বিভিন্ন আকার দিয়ে থাকে।
রোদে শুকানোর পর তা পাঞ্জা বা চুলাতে পোড়ানো হয়। মাঝখানে ক্ষুদ্র কীলকবিশিষ্ট চাকাটির আকার একটি ক্ষুদ্র গোল চাকতির ন্যায়। মাটিতে বসে একজন কুমার এর চারপাশে অনায়াসে হাত ঘোরাতে পারে। চাকটি ঘোরাতে ঘোরাতে যখন পাত্রটি কাঙ্ক্ষিত আকৃতি ধারণ করে তখন একে সরিয়ে ফেলা হয় এবং শুকানোর জন্য একপাশে রাখা হয়। গোলাকার গলাবিশিষ্ট সব পাত্রেরই ঘাড় ও কাঁধ চাকার সাহায্যে নির্মাণ করা হয়, কিন্তু দেহের কাঠামোটি নির্মিত হয় হাত দ্বারা। শক্ত মাটি ভিতরে রাখা হয় এবং বাইরে থেকে একটি কাঠের পিটনা দিয়ে পিটিয়ে প্রয়োজনমাফিক আয়তন ও আকৃতি প্রদান করা হয়।
কুমাররা তৈজসপত্র তৈরিতে বেলে ও কালো এঁটেল এ দু ধরনের মাটি ব্যবহার করে থাকে। বেলে মাটির সঙ্গে এঁটেল মাটির অনুপাত ১:২ করে মেশালে শক্ত ও উন্নতমানের মৃৎপাত্র তৈরি করা যায়। লাল রঙের তৈজসপত্র তৈরিতে ভাওয়ালের লালমাটি ব্যবহার করা হয়। সাদা কিংবা কালো রঙের তৈজসপত্র তৈরিতে একই ধরনের মাটি ব্যবহার করা হয়। কালো পাত্র তৈরির ক্ষেত্রে চুলাকে কিছু সময় ঢেকে রাখা হয়। এক্ষেত্রে অনেক সময় চুলার আগুনে খৈল পোড়ানো হয়।
অনেক কুমার তাদের পাত্রের রং নির্বাচন কিংবা চাকচিক্যময় করতে পারে না। তারা পাত্রটি পুড়ে তৈরি হওয়ার পর তাতে রং লাগিয়ে নেয়। লাল সিসা থেকে লাল রং, আর্সেনিক থেকে হলুদ, দস্তা থেকে সবুজ এবং বিভিন্ন রাসায়নিক যৌগের মিশ্রণে কালো রং তৈরি করা হয়। মাটির তৈজসপত্র ছাড়াও অনেক কুমার ইট, টাইলস, মূর্তি, পুতুল ও খেলনা প্রভৃতি তৈরি করে।
গ্রামীণ জনপদে কুমারদের কারখানা একটি দর্শনীয় বিষয়। একই ছাদের নিচে দেখা যায় চুলা, গুদামঘর ও বসবাসের ঘর, দরজার সামনের খোলা জায়গাটুকু ব্যবহূত হয় কাদামাটি তৈরির স্থান হিসেবে। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ফরিদপুর, বগুড়া প্রভৃতি জেলা নিপুণ মৃৎশিল্পের জন্য বিখ্যাত। বর্ষাকালে এ সকল স্থান থেকে নদীপথে সারি সারি নৌকা মাটির তৈরি জিনিসপত্র বোঝাই করে পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহে ছড়িয়ে পড়ে।
এক সময়ের বাংলায় কুমারগোষ্ঠীর উপবর্ণগুলির মধ্যে ছিল বড়ভাগিয়া, ছোটভাগিয়া, রাজমহালা, খাটাইয়া প্রভৃতি। ঐতিহ্যগতভাবে বিষ্ণু হলেন এ বর্ণের প্রিয় দেবতা। তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি সমমর্যাদাসম্পন্ন হিন্দু শ্রেণির উৎসবাদি থেকে খুব বেশি ভিন্ন নয়। এ বর্ণের সামাজিক মর্যাদা মোটামুটি সম্মানজনক। এরা নবশাখ দলের সদস্য হিসেবে পরিগণিত। ব্রাহ্মণ শ্রেণি এদের হাতের পানি গ্রহণ করে। কুমারদের পেশা পারিবারিক ঐতিহ্যনির্ভর এবং নারী-পুরুষ সম্মিলিতভাবে কাজ করে।
বাংলাদেশে মৃৎশিল্প ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে চলছে। প্রাচীন শিলালিপি ও পুরাকীর্তিতে প্রাপ্ত বিভিন্ন নিদর্শন থেকে জানা যায়, এদেশে উন্নত ও গুণগতমানের মৃৎশিল্প বর্তমান ছিল। পরবর্তী সময়ে শৈল্পিক নৈপুণ্য ও সৃজনশীল ডিজাইনমন্ডিত মাত্রা যুক্ত হয়ে মৃৎশিল্প বিভিন্ন জাদুঘর ও চারু প্রদর্শনীতে স্থান করে নেয়। সময়ের আবর্তনে অন্যান্য বস্ত্ত, যেমন প্লাস্টিক বা ধাতুনির্মিত পণ্যের উদ্ভব ও ব্যবহার মৃৎশিল্পের ব্যাপক অবক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে গ্রামীণ এলাকায় শুধু দরিদ্ররা মাটির তৈরি সাদামাটা ধরনের সস্তা তৈজসপত্র ব্যবহার করে। শহরের ধনীরা তাদের ড্রয়িং রুমের শো-পিস ও গৃহের অভ্যন্তরীণ ডেকোরেশনে মাটির পণ্যাদি ব্যবহার করে থাকে। [গোফরান ফারুকী]”
অনেক সময় পাল পাড়া দিয়ে কলেজে যেতে নিষেদ করে মুরুব্বীগণ। সেলিম মিয়া এবং শুভ একসাথে পালপাড়ার ভিতর দিয়ে কলেজে যাচ্ছে। শুভ যেতে রাজী ছিল না কিন্তু সেলিম মিয়া বলল, আজ কনকলতা কলেজে যাবে না তাই এক নজরে তাকে দেখে যাবো এবং তোমাকেও দেখাব। শুভ বলল, “আমার সংকোচ করছে।“ শুভকে নির্ভয় দিয়ে পাল পাড়া দিয়েই হাটা শুরু করল। একটু যাবার পরই সেলিম মিয়া বলল, ঐ যে মেয়েটা ডাবগাছে নিচে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর কাছে গিয়ে এই চিঠিটা দিবে এই বলে একটা রঙ্গীন বাজকর কাগজ দিল শুভকে দিল। শুভ এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে নির্জন এলাকা। অদূরে একজন বয়স্ক মহিলা মাটি দিয়ে বানানো কলসীতে রঙ দিচ্ছে। তারপর শুভ সেলিম মিয়ার কাগজ নিয়ে মেয়েটিকে দিল। মেয়েটি শুভকে কোন প্রশ্ন না করে শুভর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। শুভ হাত থেকে কাগজটি দিল। মেয়েটি বলল, একটু দাড়াও। শুভ দাঁড়িয়ে রইল। একটু পরেই একটা উপন্যাস নিয়ে এসে বলল, এটা তুমি সেলিমকে দিবে। শুভ কিছু না বলে চুপচাপ চলে আসল এবং একটু দূরেই আবার সেলিম মিয়ার সাথে দেখা হলো। শুভ সেলিম মিয়াকে বইটি দিল। শুভ বুঝতে পারলো, কনকলতা শুভকে চিনে অথবা সেলিম মিয়া ও কনকলতা শুভকে নিয়ে আগেই কথা বার্তা বলে রেখেছে। কয়েকদিন সেলিম মিয়া শুভকে একটা উপন্যাস দিল। শুভ রাতে উপন্যাস পড়েছে। পরেদিন বিকেল বেলা এই উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করল সেলিম মিয়া এবং শুভ। সেলিম মিয়া জানাল এই উপন্যাসের ভিতরেই নাকি চিঠি দিয়েছিল। শুভ ভুলেও জানতে পারেনি যে বইয়ের ভিতরে চিঠি আছে। বইটি ছিল প্রেমের ট্র্যাজেডি কাহিনী। এরপর থেকে কদাচিৎ শুভর মাধ্যমে কনকলতা এবং সেলিম মিয়া বই আদান প্রদান করেছে। শুভ সেলিম মিয়া থেকে প্রায়ই বাংলা বই,ইংরেজি বই, গল্পের বই অথবা ম্যাগাজিন হাওলাত নিতো। একদিন একটি ম্যাগাজিনে মিতালী করার ঠিকানা পেল। মেয়ের নাম মিনু চাকমা, নানিয়ারচর, রাঙ্গামাটি। শুভ চাকমা মেয়ের ঠিকানা পেয়ে খুবই আগ্রহী হয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং অচেনা মেয়েকে জানার কৌতুহলে চিঠি লিখল মিনু চাকমাকে।
প্রিয় মিনু চাকমা,
প্রীতি ও শুভেচ্ছা নিবেন। আমি আপনার সাথে মিতালী করতে চাই। আমি আপনার বন্ধু হয়ে চলতে চাই। আশা করি আমাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে আপনাদের সাংস্কৃতি,ধর্ম,কর্ম এবং সমাজ ব্যবস্থা জানিয়ে উত্তর দিবেন। আমি আপনার উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম।
ইতি
শুভ।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now