বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সন্ধ্যার সময় কাদম্বিনী প্রশ্ন করিলেন, কী খেয়ে এলি রে কেষ্ট?
কেষ্ট সলজ্জ নতমুখে কহিল, লুচি ৷
কী দিয়ে খেলি ?
কেষ্ট তেমনিভাবে বলিল, রুইমাছের মুড়োর তরকারি, সন্দেশ, রসগো…
ইস্! বলি মেজ ঠাকরুন কার পাতে মুড়োটা দিলেন?
হঠাৎ এই প্রশ্নে কেষ্টর মুখখানি পান্ডুর হইয়া গেল ৷ উদ্যত প্রহরণের সম্মুখে রজ্জুবদ্ধ জানোয়ারের প্রাণটা যেমন করিয়া উঠে, কেষ্ট'র বুকের ভিতরটায় তেমনি ধারা করিতে লাগিল ৷
দেরি দেখিয়া কাদম্বিনী কহিলেন, তোর পাতে বুঝি?
গুরুতর অপরাধীর মতো কেষ্ট মাথা হেঁট করিল ৷
অদূরে দাওয়ায় বসিয়া নবীন তামাক খাইতেছিল ৷ কাদম্বিনী সম্বোধন করিয়া বলিলেন, বলি, শুনলে তো?
নবীন সংক্ষেপে হুঁ বলিয়া হুঁকায় টানা দিলেন ৷
কাদম্বিনী উষ্মার সহিত বলিতে লাগিলেন, খুড়িয়ে আপনার লোক, ব্যবহারটা দেখ !
পাচুগোপাল আমার রুইমাছের মুড়ে বলতে অজ্ঞান, সে কি তা জানে না? তবে কোন আক্কেলে তার পাতে না দিয়ে বেনাবনে মুক্তো ছড়িয়ে দিলে? বলি হাঁরে কেষ্ট, সন্দেশ-রসগোল্লা খুব পেট ভরে খেলি? সাতজন্মে কখনো তুই এ সব চোখেও দেখিস নি ৷ স্বামীর দিতে চাহিয়া বলিল, যারা দুটি ভাত পেলে বেঁচে যায়, তাদের পেটে লুচি-সন্দেশ কি হবে! কিন্তু আমি বলছি তোমাকে, কেষ্টকে মেজগিন্নি বিগড়ে না দেয় তো আমাকে কুকুর বলে ডেকো ৷
নবীন মৌন হইয়া রহিলেন ৷ কারণ, স্ত্রীর বর্তমানে মেজবউ তাহাকে বিগড়াইয়া ফেলিতে পারিবে, এরূপ দর্ঘটনা তিনি বিশ্বাস করিলেন না ৷ তাঁহার স্ত্রীর কিন্তু স্বামীর উপরে বিশ্বাস ছিল না, বরং ষোলো আনা ভয় ছিল ৷ সাধাসিধা মানুষ বলিয়া যে কেহ তাঁহাকে ঠকাইয়া লইতে পারে ৷ সেইজন্য ছোটভাই কেষ্ট'র মানসিক উন্নতি অবনতি প্রতি সেই অবধি তিনি দৃষ্টি পাতিয়া রাখিলেন ৷
পরদিন হইতেই দুটো চাকরের একটাকে ছাড়ানো হইল, কেষ্ট নবীনের ধান-চালের আড়তে কাজ করিতে লাগিল ৷ সেখানে সে ওজন করে, বিক্রি করে, চার-পাঁচ ক্রোশ পথ হাঁটিয়া নমুনা সংগ্রহ করিয়া আনে, দুপুরবেলা নবীন ভাত খাইতে আসিলে দোকান আগলায় ৷ দিনদুই পরে একদিন তিনি আহার নিদ্রা সমাপ্ত করিয়া ফিরিয়া গেলে, সে ভাত খাইতে আসিয়াছিল ৷ তখন বেলা তিনটা ৷ কেষ্ট পুকুর হইতে স্নান করিয়া আসিয়া দেখিল, দিদি ঘুমাইতেছেন ৷ তাহার তখনকার ক্ষুধার তাড়নায় বোধ করি বাঘের মুখ হইতেও খাবার কড়িয়া আনিতে পারিত, কিন্তু দিদিকে ডাকিয়া তুলিবে, এ সাহস হইল না ৷
রান্নাঘরের দাওয়ায় একধারে চুপটি করিয়া দিদির ঘুম ভাঙার আশায় বসিয়াছিল, হঠাৎই ডাক শুনিল- কেষ্ট?
সে আহ্বান কী স্নিগ্ধ হইয়ায় তাহার কানে বাজিল ৷ মুখ তুলিয়া দেখিল, মেজদি তাঁহার দোতলার ঘরের জানালা ধরিয়া দাঁড়াইয়া আছেন ৷ কেষ্ট একটিবার চাহিয়াই মুখ নামাইল ৷ খানিক পরে হেমাঙ্গিনী নামিয়া আসিয়া, সুমুখে দাঁড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ক-দিন দেখি নি তো? এখানে চুপ করে বসে কেন, কেষ্ট?
একে ক্ষুধায় অল্পেই চোখে জল আসে, তাহাতে এমন স্নেহার্দ্র কন্ঠস্বর! তাহার দুচোখ টলটল করিতে লাগিল ৷ সে ঘাড় হেঁট করিয়া রহিল, উত্তর দিতে পারিল না ৷
মেজখুড়ি মাকে সব ছেলেমেয়েরা ভালোবাসিত ৷ তাঁহার গলার স্বর শুনিয়া কাদম্বিনীর ছোটমেয়ে ঘর হইতে বাহিরে আসিয়া চেঁচাইয়া বলিল, কেষ্টমামা, রান্নাঘরে তোমার ভাত ঢাকা আছে, খাও গে , মা খেয়ে দেয়ে ঘুমোচ্ছে ৷
হো
হেমাঙ্গিনী অবাক হইয়া কহিলেন, কেষ্টর এখনো খাওয়া হয় নি, তোর মা ঘুমোচ্ছে কী রে-- হাঁ কেষ্ট, আজ এতো বেলা হলো কেন?
কেষ্ট ঘাঁড় করিয়াই রহিল ৷ টুনি তাহার হইয়া জবাব দিল, কেষ্টমামর রোজ তো এমনি বেলাই হয় ৷ বাবা খেয়ে দেয়ে দোকানে ফিরে গেলে তবে তো ও খেতে আসে ৷
হেমাঙ্গিনী বুঝিলেন, কেষ্টকে দোকানের কাজে লাগানো হইয়াছে ৷ তাহাকে বসাইয়া খাওয়ানো হইবে এ আশা অবশ্য তিনি করেন নাই; কিন্তু একবার এই বেলার দিকে চাহিয়া, একবার এই ক্ষুধা-তৃষ্ণায় আর্ত শিশুদেহের পানে চাহিয়া, তাঁহার চোখ দিয়া জল পড়িতে লাগিল ৷ আঁচলে চোখ মুছিত মুছিতে তিনি বাড়ি চলিয়া গেলেন ৷ মিনিট -দুই পরে একবাটি দুধ হাতে ফিরিয়া আসিয়া, রান্নাঘরে ঢুকিয়াই শিহরিয়া মুখ ফিরিয়া দাঁড়াইলেন ৷
কেষ্ট খাইতে বসিয়াছিল ৷ একটা পিতলের থালার উপর ঠান্ডা শুকনা ড্যালা পাকানো ভাত ৷ একপাশে একটুখানি ডাল ও কী একটু তরকারির মতো ৷ দুধটুকু পাইয়া তাহার মলিন মুখখানি হাসিতে ভরিয়া উঠিল৷
হেমাঙ্গিনী দ্বারের বাহির আসিয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন ৷ কেষ্ট খাওয়া শেষ করিয়া পুকুরে আঁচলাইতে চলিয়া গেলে একটিবার মুখ বাড়াইয়া দেখিলেন, পাতে গোনা একটিও ভাত পড়িয়া নাই ৷ ক্ষুধার জ্বালায় সে সেই অন্ন নিঃশেষ করিয়া খাইয়াছে ৷
হেমাঙ্গিনীর ছেলে ললিতও প্রায় সেই বয়সী ৷ নিজের অবর্তমানে নিজের ছেলেকে এই অবস্থায় হঠাৎই কল্পনা করিয়া ফেলিয়া কান্নার ঢেউ তাঁহার কণ্ঠ পর্যন্ত ফেনাইয়া উঠিল ৷
তিনি সেই কান্না চাপিতে চাপিতে বাড়ি চলিয়া গেলেন ৷
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now