বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
বুধবার ... ১৭ই জ্যৈষ্ঠ
কাল থেকে সেমেস্টার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হবে কনকের। পড়তে পড়তে মাথাটা জ্যাম হয়ে গেছে। ঘড়ির দিকে তাকালো কনক। রাত ১২.৪৫। বাসার নিচের রাহুলের চা-পান-বিড়ির দোকানটা প্রায় ২টা পর্যন্ত খোলা থাকে। নাহ, এক কাপ গরমা গরম চা আর সাথে একটা বিড়ি না টানলে আর পড়া এগুবে না। কনক চুপিসারে দরজাটা খুলে নিচে নামলো। বাবা টের পেলে পিঠের চামড়া আস্ত রাখবেন না।
.
পর পর দুই কাপ চায়ের সাথে তিনটা সিগারেট পুড়িয়ে কনকের মাথাটা এবার একটু ফ্রেশ লাগলো। হুম, এখন রুমে গিয়ে একদম ভোর পর্যন্ত পড়া যাবে। রাহুলকে চা আর সিগারেটের দাম পরিশোধ করতে গিয়ে কোনার বেঞ্চটার দিকে চোখ পড়লো কনকের। আরে, লোকটা পাগল নাকি? এই গরমের মধ্যেও পুরো শরীরে চাদর মুড়ি দিয়ে বসে আছে। এমনকি মাথাটাও এমন করে ঢেকে রেখেছে যে, মুখটা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।
.
কত রকম পাগল যে আছে ঢাকা শহরে! কনক ভাংতি টাকাগুলো রাহুলের কাছ থেকে ফেরৎ নিয়ে বাসার দিকে হাঁটা শুরু করলো। হাঁটতে হাঁটতে কনকের বার বার মনে হচ্ছিলো পেছনে কে যেন আসছে। কয়েকবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েও কাউকে দেখতে পেল না কনক। গেটে নাজমুল চাচা আগের মতই নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। বাসার গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকে সিঁড়ির কাছে আসতেই কনক তার ঘাড়ের কাছটায় ঠাণ্ডা কোন কিছুর স্পর্শ অনুভব করলো। তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধারালো কি যেন ঘ্যাঁচ করে ভেতরে ঢুকে গেলো। প্রচণ্ড ব্যথায় কনক 'মা গো' বলে চিৎকার দিয়ে ওঠার আগেই একটি শক্তিশালী স্যাঁতস্যাঁতে হাত ওর মুখ পেঁচিয়ে ধরলো।
.
কনকের কাছে মনে হল ওর শরীর থেকে সবটুকু শক্তি কে যেন কেড়ে নিচ্ছে। কনকের শরীরটা নিস্তেজ হয়ে আসছে। এখন আর চিৎকার করার মত শক্তিও নেই শরীরে। কনকের মুখ চেপে ধরা সেই আততায়ীও সেটা বুঝতে পেরেছে। ধীরে ধীরে কনকের শরীরটা ছেড়ে দিলো সে। উর্দু রোডের ৬৬ নম্বর বাড়ীটার সিঁড়িতে কনকের নিথর দেহটা ঘাড় আর গলার মাঝামাঝি জায়গায় দুটো ছোট ছোট গর্তের মত দাগ নিয়ে একাকি পড়ে রইলো।
.
.
বৃহস্পতিবার ... ১৮ই জ্যৈষ্ঠ
দিদার মিয়া মিটফোর্ডের রাস্তার একটা অন্ধকার গলিতে একটা ঠেলা গাড়ীর উপর শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। আজ তার মনটা খুব খারাপ। আজ বৃহস্পতিবার, তার বাড়ীতে যাবার দিন। কিন্তু অনেক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যেতে পারেননি। দিদার মিয়া সারাদিন মৌলভীবাজার, ইমামগঞ্জ, চকবাজার আর মিটফোর্ডের বিভিন্ন দোকানের মাল টানার কাজ করেন। ঢাকায় একাই থাকেন। পরিবারের বাকী সবাই থাকে নরসিংদীতে। প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে বাড়ীতে গিয়ে শনিবার ভোরে ফিরে আসেন।
.
ছেলেটার স্কুলের বেতন দেয়া হয় না দুই মাস ধরে। আগামী মাসে ওদের পরীক্ষা, সেটার ফিসও দিতে হবে। বাড়ীতে যাওয়া আসা বাবদ বেশ কিছু টাকা খরচ হয়ে যায়। তাই দিদার মিয়া প্রতিটা পাই পয়সা জমাচ্ছে। হাজারখানেক টাকা জমিয়ে একবারে বাড়ীতে যাবে। কিন্তু মনটাতো আর এসব মানতে চায় না। তাই একটা বন রুটি, কলা আর এক কাপ চা খেয়ে গলির মধ্যে এই ঠেলা গাড়ীটার উপর শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখছে।
.
হঠাৎ কেন জানি আকাশটা অন্ধকার হয়ে এলো। কে জানি তার শরীরের ওপর উঠে আসছে। তারপর দিদার মিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘ্যাঁচ করে তীক্ষ্ণ দুটো দাঁত ছুরির ফলার মত দিদার মিয়ার গলার কাছটায় ঢুকে গেলো। দিদার মিয়া নিজেকে ছাড়ানোর জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে গেলো, কিন্তু কোন লাভ হল না। ছটফট করতে করতে একসময় দিদার মিয়ার শরীরটাও নিস্তেজ হয়ে এলো। গলির বাইরে মিটফোর্ডের রাস্তায় সারারাত অনেক ভিড় লেগে থাকে। অনেক দোকানপাটও খোলা থাকে। আশেপাশে এত মানুষজন থাকার পরেও হতভাগ্য দিদার মিয়ার কথা কেউ জানতে পারলো না।
.
.
শুক্রবার ... ১৯শে জ্যৈষ্ঠ
মৌয়ের অনেক ভয় করছে। রোকনের সাথে থাকলে সময় যে কোনদিক দিয়ে চলে যায়, মনেই থাকে না। এতক্ষণ দুজনে টিএসসিতে বসে ছিলো। তারপর মোবাইলে স্বপ্নার কল আসায় হুঁশ ফিরেছে। রাত দশটা বেজে গেছে। মৌ বদরুন্নেসার হোস্টেলে থাকে। রাত আটটার পর গেট বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু স্বপ্না ওর জন্য ব্যবস্থা করে রেখেছে। বদরুন্নেসার পাশের গলিটার ভেতরে একটা চোরা গেট আছে। মৌ পোঁছে স্বপ্নাকে ফোন দিলেই ও এসে খুলে দিবে। দারোয়ান মামার কাছ থেকে অনেক কষ্টে চাবিটা ম্যানেজ করেছে।
.
উফ... এই শুক্রবারেও এত্ত জ্যাম রাস্তায়, তাও আবার এত রাতে? ঢাকা মেডিক্যালের মোড়টায় এসে মৌ রিকশা থেকে নেমে গেলো। এই জ্যামের মধ্যে রিকশায় বসে থাকার কোন অর্থ হয় না। এইটুকু পথ হেঁটেই চলে যাওয়া যাবে।
.
গলির ভেতরটায় একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার, কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছে না মৌ। মোবাইলটা ব্যাগ থেকে বের করে আলো জ্বাললো। আর আলো জ্বেলেই চমকে উঠলো। তার ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে কেমন সুচালো চেহারার একটা লোক। রক্তশূন্য ফ্যাকাসে মুখ। চোখা নাক, পাতলা ঠোঁট। চোখ দুটো এত লাল যে মনে হচ্ছে চোখ দিয়ে আগুন গোলা বেরিয়ে আসবে। এই গরমেও পুরো শরীরটা চাদর দিয়ে ঢাকা। মৌ লোকটাকে সরে যেতে বলবে ঠিক তখনই লোকটা মৌয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার গলায় সুচালো দাঁত দুটো বিঁধিয়ে দিলো।
.
.
শনিবার ... ২০শে জ্যৈষ্ঠ
চকবাজার থানায় ব্যাপক তোলপাড় চলছে। কাছাকাছি এলাকার মধ্যে এতগুলো হত্যাকাণ্ড ঘটে গেলো, অথচ কোন সাক্ষী সাবুদ পাওয়া যাচ্ছে না। কোন ক্লু নেই। উপর মহল থেকে ফোনের পর ফোন আসছে। কিন্তু একটা হত্যাকাণ্ডেরও কোন মোটিভ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। হত্যা করতে কি অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে, ফরেনসিক রিপোর্টে তাও ধরা পড়েনি। শুধু একটা ব্যাপারেই মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। সেটা হল, প্রতিটা মৃতদেহের গলার কাছে দুটো ছোট ছোট ফুটো। ধারণা করা হচ্ছে, রক্তশূন্যতাই প্রতিটি মৃত্যুর কারণ। কিন্তু এত রক্ত গেলো কোথায়?
.
.
রবিবার ... ২১শে জ্যৈষ্ঠ
আশাদের বাড়ীটা আজিমপুর কবরস্থানের ঠিক উল্টো দিকে। আশারা থাকে তিন তলায়। আশার রুমের জানালাটা দিয়ে পুরো কবরস্থানটা পরিষ্কার দেখা যায়। আশা এ বছর ইন্টার পরীক্ষা দিবে, তাই অনেক রাত জেগে পড়াশুনা করে। তারপর ফজরের নামাজটা পড়ে একবারে ঘুমাতে যায়। মাঝে মাঝে পড়তে পড়তে হাঁফিয়ে উঠলে জানালার ধারে বসে একটু বাইরেটা দেখে। বিশেষ করে ভোর হওয়া দেখতে তার খুব ভালো লাগে।
.
গতকাল ফজরের আযানের একটু আগে আশা একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখেছিলো। আপাদমাস্তক চাদর মুড়ি দেওয়া একটা লোক চুপি চুপি কবরস্থানে ঢুকে তারপর হঠাৎ বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিলো। আশার মনে হয় এর আগেও এই ধরনের একটা লোককে দেখেছিলো। সময়টাও বেশ মিলে যায়। কিন্তু লোকটা কোথায় যায়, এতদূর থেকে ঠিক ঠাহর করা যায় না।
.
আজ আশা বেশ আটঘাট বেঁধেই জানালার ধারে বসেছে। হাতে ছোট ভাই রাহাদুলের খেলনা দূরবীনটা। বিদেশ থেকে রফিক ভাইয়া পাঠিয়েছে। খেলনা হলেও দূরবীনটা বেশ শক্তিশালী। আর একটু পরেই ফজরের আযান দিবে। হঠাৎ আশার চোখে পড়লো লোকটা গুটি গুটি পায়ে কবরস্থানে ঢুকছে।
.
আশা উঠে গিয়ে রুমের বাতি নিভিয়ে দিয়ে চোখে দূরবীনটা লাগিয়ে বসলো। লোকটা ধীরে ধীরে একটা কবরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আশা দেখলো, কবরটার এক পাশে একটা গর্তের মত দেখা যাচ্ছে। তারপর আশাকে অবাক করে দিয়ে লোকটা সেই গর্তটা দিয়ে ভিতরে ঢুকে যেতে লাগলো। আশা ভেবে পেলো না, এত বড় একটা মানুষ কিভাবে এত ছোট একটা গর্ত দিয়ে ঢুকতে পারে! ধীরে ধীরে লোকটার পুরো শরীরটা গর্তের ভেতর ঢুকে গেল, শুধু মাথাটা বাইরে। তখনই লোকটা ঘাড় ঘুরিয়ে ঠিক আশাদের বাসার জানালাটার দিকে তাকালো।
.
এতদূর থেকেও আশা লোকটার লাল টকটকে চোখের আগুন ঝরানো দৃষ্টি অনুভব করতে পারছিলো। ভয়ে দূরবীনসহ আশার হাত কাঁপতে লাগলো। লোকটা আশার দিকে তাকিয়ে কেমন জানি একটা অপার্থিব হাসি দিলো। আশার মনে হল, সে এক্ষুণি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাবে। ঠিক তখনই পাশের মসজিদে ফজরের আযান দিয়ে দিলো। আযান শুরু হওয়া মাত্রই সেই লোকটি তার মাথাটা সুড়ুৎ করে কবরটার ভেতরে ঢুকিয়ে ফেললো। আর কবরের গর্তটাও কেমন করে যেন আপনা আপনি বুজে গেলো।
.
আশা আর পারলো না। জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো। পরদিন সকালে জ্ঞান ফেরার পর গত রাতে কেন সে মেঝেতে ঘুমিয়েছে, সেটা কিছুতেই মনে করতে পারলো না!
.
.
##আহসানুল হক শোভন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now