বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মায়ের চিঠি

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আলোর পরশ (০ পয়েন্ট)

X ‘আমার প্রিয় পুত্র, অনেকদিন আগের কথা। একজন মা সবচেয়ে ভালো যে সংবাদ পেতে পারে, একজন নারী তার জীবনে সবচেয়ে ভালো যে সংবাদ পেতে পারে, সেই সংবাদ আমিও পেয়েছিলাম। তুমি জানো কি ছিলো সেই সংবাদ? তুমি জানতে চাও কি সেই মুহূর্ত যা আমাকে আমার জীবনের পরম আনন্দে ভাসিয়ে দিয়েছিলো? বাবা, সেটা ছিলো তোমার অস্তিত্বের সংবাদ। আমাকে বলা হয়েছিলো আমার গর্ভে তুমি এসেছো। বাছা আমার, আমি তোমাকে কোনোভাবেই সেই মুহূর্তের কথা বলে বোঝাতে পারবোনা। আমি তোমাকে বোঝাতে পারবোনা সেই মুহূর্তে আমি কতোটা খুশি হয়েছি। আমার গর্ভে তোমার অস্তিত্বের সংবাদ যে আমাকে কিরকম আনন্দের প্লাবনে ভাসিয়েছে সেটা তুমি কোনোদিনও বুঝবেনা। তারপর অনেকগুলো সপ্তাহ কেটে গেল। আমার শরীরে আস্তে আস্তে পরিবর্তন আসতে লাগল। শরীরের এই পরিবর্তনের সাথে সাথে আমি ভয়ও পাচ্ছিলাম। কারণ আমি যা-ই খেতাম তা-ই বমি হয়ে যেত। প্রচন্ড দূর্বলতা এসে আমার শরীরে ভর করতো। তুমি বড় হওয়ার সাথে সাথে আমার শরীরও দিন দিন বড় হতে লাগলো। আমার প্রিয় সন্তান, আমি আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি,- তুমি গর্ভে আসার পর আমার শারীরিক দূর্বলতা, প্রচন্ড ব্যথা, শরীর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া, খেতে না পারা, ঘুমোতে না পারা সত্ত্বেও যতো দিন গড়াচ্ছিলো, তোমার জন্য আমার ভালোবাসা যেন ততোই বেড়েই চলছিলো। আমার গর্ভে যেদিন তোমার অস্তিত্ব টের পেলাম, খোদার কসম সেই দিনই তুমি আমার কাছে প্রিয় হয়ে গিয়েছিলে। আমার ধ্যান-জ্ঞান-স্ব প্নে সবখানে শুধু তুমি আর তুমি। এভাবে দিনগুলো সপ্তাহ আর সপ্তাহগুলো মাসে পরিণত হতে লাগলো। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আমিও যেন ভারি হয়ে গেলাম। আমি এতো বেশিই ভারি হয়ে উঠলাম যে, কোথাও বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম না। বেশিক্ষণ হাঁটতে পারতাম না। এরপর এমন একটা সময় আসলো যখন আমি চিৎ হয়ে ঘুমাতেও পারতাম না। কেনো জানো? কারণ, তোমার ওজন আমার বুকে প্রচণ্ড ব্যথা তৈরি করতো। তাই আমি পাশ ফিরে ঘুমাতাম। তবুও আমার ভিতরে একটা ভয় কাজ করতো। আমি ভাবতাম, পাশ ফিরে ঘুমাতে গিয়ে যদি পেটে তোমার গায়ে কোন আঘাত লাগে? তোমার যদি কোন ক্ষতি হয়ে যায়? সারাক্ষণ এই ভয় আমার ভিতরে কাজ করতো। এই ভয় নিয়েই কতো রাত আমার নির্ঘুম কেটে গেছে তুমি জানো না। বাছা, এভাবেই দিন যতো যাচ্ছিলো, তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা আরো বাড়তে লাগলো। তোমার প্রতি আমি আরো বেশি মনোযোগি, আরো বেশি যত্নশীল হয়ে উঠলাম। তোমাকে একটু ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে আমার তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগলো। আমি নীরবে কান পেতে শুনতাম। তুমি কি কোন শব্দ করছো কিনা, নড়াচড়া করছো কিনা। যখনি তুমি নড়ে উঠতে আমার পেটের ভিতর, ওয়াল্লাহি মনে হতো যেন আমি তখনি মারা যাবো। প্রচন্ড ব্যথায় আমি কুঁকড়ে উঠতাম। আমি যেন নিজের ভিতর নিজেই গুটিয়ে যেতাম। বিশ্বাস করো, মুখের ভিতর কাপড় গুঁজে দিয়ে সেই ব্যথা আমি কতোশতোবার নিজের ভিতরে চাপা দিয়ে দিয়েছি। কাউকে জানতেও দিইনি। কেনো জানো? শুধু তোমার জন্য। এরপর...... একদিন সেই সময়টা এলো। সেই মাহেন্দ্রক্ষণ! সেদিন আমি এমন এক ব্যথা অনুভব করলাম যা আমি এর আগে কখনো অনুভব করিনি। এমন এক ব্যথা যার কারণে আমার মনে হচ্ছিলো আমি বুঝি মারাই যাব। আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে আমি মারা যাব। সেটা এমন এক ব্যথা, এমন এক যন্ত্রণা যা আমি আমার শত্রুর জন্যও কামনা করিনা। সেটা এমন এক ব্যথা যা তোমাকে কোনোভাবেই আমি বোঝাতে পারবোনা। সেই ব্যথাটা অনেক দীর্ঘস্থায়ী ছিলো। ব্যথার পর ব্যথা! চাপের পর চাপ! সেকেন্ডের পর সেকেন্ড, মিনিটের পর মিনিট, আল্লাহ্র কসম, সেই সময়টাকে আমার সারা জীবনের মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছিলো। আমার মনে হচ্ছিলো এই ব্যথা আর কখনোই সারবেনা। ভেবেছিলাম আমি হয়তো এখান থেকে আর কখনোই বেঁচে ফিরবো না। সেই মৃত্যুযন্ত্রণা যখন আমি পার করছিলাম, আল্লাহর শপথ, একটিবারের জন্যও আমি তোমাকে অভিশাপ দিইনি। এক মুহূর্তের জন্যও আমি তোমাকে দোষারোপ করিনি। ওয়াল্লাহি! বরং, সেই তীব্র ব্যথা আর যন্ত্রণার ভিতর দিয়ে যাওয়ার মধ্যেও আমি এক অন্যরকম আশা, আকাঙ্খা নিয়ে তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তোমাকে দেখার জন্য প্রহর গুনছিলাম। তোমাকে একটু ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছের কাছে জগতের সকল যন্ত্রণা, সকল ব্যথা যেন পরাজিত হয়ে গেলো। আমি কখনোই বলিনি যে এই মৃত্যু যন্ত্রণার কারণ হবার জন্যে তোমার জন্মের পরে আমি তোমার উপর প্রতিশোধ নেবো। আমি কখনো বলিনি যে তোমার জন্য দুর্ভোগ, তোমার জন্য দুর্ভোগ। আমি কক্ষনো তোমার প্রতি ঘৃণা বা শত্রুতার একটা শব্দও উচ্চারণ করিনি। বরং ভালোবাসা, আদর আর মায়া ভর্তি এক হৃদয় নিয়ে আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। এবং, তারপর কি হলো জানো? তারপর তুমি পৃথিবীতে এলে। শপথ সেই সত্ত্বার যার হাতে আমার প্রাণ, তোমাকে দেখা মাত্র, তোমার চেহারা দেখা মাত্রই একটু আগের সকল যন্ত্রণা, সকল দুঃখ-ব্যথা যেন নিমিষেই মিলিয়ে গেলো। এতোক্ষণ যে ব্যথা আমার কাছে মৃত্যুসম মনে হচ্ছিলো, সেটা যেন কর্পূরের মতো কোথায় উঁবে গেলো। এবং, আমার দু’চোখে ব্যথা আর যন্ত্রণার যে অশ্রু ছিলো, মুহূর্তেই সেটা আনন্দের অশ্রুতে পরিণত হলো। যখন আমি তোমাকে ধরলাম এবং বুকে টেনে নিলাম, আমি হাসলাম আর বললাম,- ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আলা!’ আল্লাহ্ আমাদেরকে এক মহা আশীর্বাদ দান করেছেন। এক মহা নিয়া’মাত দান করেছেন। প্রিয় সন্তান, কাহিনীর কিন্তু এখানেই শেষ নয়। সেই নির্ঘুম রাতগুলোর গল্প কি তুমি শুনবেনা? তুমি জানো কেনো সেই রাতগুলো আমার নির্ঘুম কেটেছিলো? তোমার জন্যে। কারণ আমার সহ্য হতোনা। একদম আমি সহ্য করতে পারতাম না তোমার এতোটুকু কান্নাও। তোমাকে কোলে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কতো রজনী আমি কাটিয়ে দিয়েছি সে হিসেব আর নাইবা দিলাম তোমায়। দিনের বেলায় তোমার দেখাশোনা করে আমি এতো ক্লান্ত হয়ে পড়তাম, আমি এতোই ভেঙে পড়তাম যে, মন না চাইতেই শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিতাম। কিন্তু, যখনই তুমি আমার পাশ থেকে শব্দ করে উঠতে, আমি হুড়মুড় করে উঠে যেতাম। আমি দিগ্বিদিক শূন্য নয়নে তোমাকে খুঁজে নিতাম। ভাবতাম, আহ! আমার জাদুটার কোন কষ্ট হয়নি তো? আস্তে আস্তে তুমি বড় হতে লাগলে। যখন তুমি হামাগুড়ি দিতে, আমি সেই দৃশ্য দেখে হেসে কুটি কুটি হতাম। যখন তুমি আমার আঙুল ধরে ধরে হাঁটতে শিখছিলে, তখন আমি মনের ভিতর কি যে এক পুলক অনুভব করতাম তা তুমি বুঝবেনা। এবং তারপর... তারপর এমন একটা দিন আসলো যা আমার জন্য সত্যিই কঠিন ছিলো। এটা ছিলো সেই দিন যেদিন তোমাকে প্রথম স্কুলে দিয়ে আসলাম। তোমাকে যখন স্কুলে রেখে আসছিলাম, তখন তুমি কাঁদছিলে। বিশ্বাস করো, তোমার সাথে সাথে আমিও সেদিন কেঁদেছিলাম। কিন্তু, সেই কান্নাকে আমি বাস্তবতার উপর প্রাধান্য দিইনি। আমি জানতাম এখানে তোমাকে পড়তে হবে। কষ্ট হলেও থাকতে হবে, এবং এটাই তোমার জন্য উত্তম। তোমার কল্যাণের কথা ভেবে আমি সেদিন আমার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করেছিলাম। এরপর, বছরগুলো দ্রুতই কেটে গেলো এবং তুমি সেই স্কুলে বড় হয়ে উঠলে। শুধু বড় নও, তখন তুমি স্বনির্ভরও বটে। ততোদিনে তুমি অনেক বড় হয়ে উঠলে। অনেক বড় বলতে অনেক বড়। নিজের ভালো-মন্দ নিজে বুঝতে শিখে গেলে। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে শিখে গেলে। নিজের মতকে নিজেই যাচাই করার মতো বয়সে তখন তুমি পৌঁছে গেলে। এরপর... এরপর তোমার জীবনে এমন এক দিন আসলো যেদিন আমি তোমার জন্য অত্যন্ত আনন্দিত ছিলাম আবার একইসাথে আমার প্রচুর দুঃখও হচ্ছিলো। জানো কোনদিন? আমার প্রিয় পুত্র, দিনটা ছিলো তোমার বিয়ের দিন। যখন তুমি বিয়ে করার মতো কাউকে খুঁজে পেলে, তোমার খুশি দেখে আমার কি যে আনন্দ হচ্ছিলো তা লিখে বোঝাতে পারবোনা। কিন্তু বাবা, একইসাথে আমার অনেক খারাপও লাগছিলো সেদিন। কেন জানো? কারণ, আমার বাছা, যে অল্প কয়েকটা জিনিস এতোদিন আমি তোমার জন্য করতে ভালবাসতাম, এখন থেকে অন্য কেউ সেগুলি তোমার জন্য করে দেবে। আল্লাহু আকবার! আমার এই খারাপ লাগার পেছনে কোন স্বার্থ নেই, কোন দূরভিসন্ধি নেই। বিশ্বাস করো বাবা, তোমাকে খুশি থাকতে দেখলে জগতে আমিই সবচেয়ে বেশি খুশি হই। তোমার আনন্দ, তোমার ভালোলাগা আমাকে অন্যরকম শিহরণ দেয়। আমি তোমার মা! তোমাকে আমি দশটা মাস গর্ভে ধারণ করেছি। এক মৃত্যুসম ব্যথা-যন্ত্রণা আর কষ্ট নিয়ে আমি তোমাকে দুনিয়ার আলো দেখিয়েছি। বুকের দুধ খাইয়ে তোমাকে বড় করেছি। সমস্ত বিপদের সময় তোমাকে বুকে আগলে রেখেছি। পরম যত্নে। নির্ভাবনায়। কিন্তু বাবা, যখন তোমার কাছে নতুন কেউ আসলো, যখন তুমি সঙ্গী হিসেবে নতুন কাউকে পেয়ে গেলে, আমি তোমার কাছে কেমন যেন অবহেলার বস্তু হয়ে গেলাম। ছোট্টবেলায় খেলতে গিয়ে ব্যথা পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে যখন তুমি আমার কাছে আসতে, আমি আমার আঁছল দিয়ে তোমার চোখের জল মুছে দিতাম। বুকে জড়িয়ে ধরে ব্যথার জায়গায় মালিশ করে দিতাম। আজ যখন তুমি বড় হয়ে উঠলে, তুমি আর তোমার ব্যথার কথা আমাকে শোনাও না। আর তুমি কান্নাভেজা চোখে আমার কাছে ছুটে আসো না। আর তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরে, আমার আছলে মুখ লুকোও না। তোমার আনন্দের খবরগুলোও আমি জানতে পারি অনেক পরে। তোমার স্ত্রী, সন্তানরা জানার পরে দরকার মনে করলে তুমি আমাকে জানাও। কখনো কখনো জানতেও পারিনা। বাবা, ভেবোনা আমি আজ অভিযোগের ঝুলি নিয়ে বসেছি। ওয়াল্লাহি, তোমার প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই। আমি তোমার মা। পৃথিবীর কোন মা-ই তার সন্তানের জন্য কোন অভিযোগ বুকে জমা করে রাখতে পারেনা। আমিও রাখিনি। শুধু চাই, তুমি ভালো থেকো, খোকা। ভালো থেকো... 'মায়ের চিঠি'। বই- 'মা, মা, মা এবং বাবা'।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১৩০৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ মৃত্যুর পর মায়ের চিঠি
→ শিশু হারা মায়ের আর্তনাদ চিঠিতে!
→ মায়ের চিঠি
→ মৃত্যুর পরে মায়ের চিঠি !
→ মায়ের চিঠি
→ একটি মেয়ের কাছে মায়ের চিঠি...
→ বিদ্ধাশ্রম থেকে একজন মায়ের চিঠি
→ ছেলের কাছে মায়ের চিঠি

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now