বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
৭
‘সাহিবা, শোন মা।’ ডাকল ড. মাহজুন মাজহার সাহিবা সাবিতকে।
সাহিবা সাবিত তার সামনে দিয়ে যাচ্ছিল।
সাহিবা সাবিত ঘুরে দাঁড়িয়ে পিতার দিকে কয়েক ধাপ এগিয়ে বলল, ‘বলুন বাবা।’
‘আজ ভালো লাগছে শরীরটা?’ জিজ্ঞেস করল মেয়েকে ড. মাহজুন মাজহার।
‘হ্যাঁ বাবা, ভালো।’ বলল সাহিবা সাবিত।
‘কিন্তু মা, মুখটাকে তোমার খুব বিষণ্ণ লাগছে।’ বলল সাহিবার বাবা।
‘ও কিছু নয়, রাত জেগে পড়েছি তো এই কারণে।’
কথাটা বলেই সাহিবা সাবিত ভাবল, এই মিথ্যা বলাটা তার ঠিক হয়নি।
‘আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে মা?’ জিজ্ঞাসা ড. মাহজুন মাজহারের।
‘না বাবা, আজ যাব না। ড. আজদা টেলিফোন করেছিল, সে আসছে। আমার স্টাডির একটা বিষয় নিয়ে তার সাথে আলাপ করতে চেয়েছিলাম তো।’ বলল সাহিবা সাবিত।
‘তোমার কাছে শুনেছিলাম, ডিজিপি মাহির হারুন গত রাতে আমাকে বললেন সেদিনের কথা। তিনি বললেন ঘটনাটা অলৌকিকের মত। আবার ড. আজদার কাছে ঘটনাগুলোর কথা শুনেছি, সেগুলোও বিস্ময়কর, অলৌকিকের মতই। সত্যিই বিস্ময়কর এই আবু আহমদ আব্দুল্লাহ। আমি ডিজিপি মাহির হারুনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তার কোন পরিচয় তারা উদ্ধার করতে পেরেছেন কিনা। তিনি বললেন, তার ব্যাপারে অনুসন্ধানের সুযোগ আমাদের নেই। স্বয়ং পুলিশ প্রধান তাকে সম্মান করে, সমীহ করে। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীর সাথে নাকি তার সম্পর্ক। আল্লাহই পাঠিয়েছেন আমাদের বিপদের সময় তাকে।’
রাঙা হয়ে উঠেছিল সাহিবা সাবিতের মুখ। কিন্তু তার বুকের মধ্যে তখন বেদনার ঝড়। কতকটা রোদ-বৃষ্টির মত অবস্থা। তার পিতা থামলে বলল সে, ‘সাধারণ বিবেচনার বাইরে উনি বাবা। ওরা মনে হয় আল্লাহর বিশেষ সৃষ্টি। পরার্থেই ওদের জীবন। বাবা, আমাদের রক্ষার স্বার্থে উনি নিজেকে ওদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন নিজের মৃত্যু অবধারিত জেনেও। এই কুরবানীর কোন পরিমাপ হয় না বাবা।’ অপ্রতিরোধ্য এক উচ্ছ্বাসে ভেঙে পড়ল সাহিবা সাবিতের কণ্ঠ। চোখ তার ভিজে উঠেছে অশ্রুতে।
ড. মাহজুন মাজহার তাকিয়েছিল তার মেয়ের দিকে। সাহিবা সাবিতের আবেগের উত্তাপ, অশ্রুর স্পর্শ তার হৃদয়কেও ছুঁয়ে গেল। এই আবেগ ও অশ্রুর মধ্যে ড. মাহজুন মাজহার একটা নতুনত্বের প্রকাশ দেখে চমকে উঠল।
এ সময় সিঁড়ি দিয়ে দু’তলায় উঠে এল ড. আজদা।
সাহিবা সাবিত চোখ মুছে ‘আসি বাবা’ বলে ছুটে গেল ড. আজদার দিকে।
সাহিবা সাবিতের দিকে নিবদ্ধ ড. মাহজুন মাজহারের চোখে উদ্বেগের একটা ছায়া নামল।
সাহিবা সাবিত ড. আজদাকে স্বাগত জানিয়ে তার হাত ধরে তাকে নিয়ে চলল তার নিজস্ব স্টাডি রুমে।
তারা স্টাডি রুমে গিয়ে টেবিলে না বসে মুখোমুখি এক সোফায় গিয়ে বসল।
‘তোমাকে বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। আমি ভেবেছিলাম, তুমি যখন আমাকে ডেকেছ তখন নিশ্চয় সুস্থ্। কিন্তু...।’
‘থাক এসব কথা আজদা। আমি ভালো আছি। এস, কাজের কথায় আসি।’ ড. আজদার মুখের দিকে না তাকিয়ে মাথা নিচু রেখে কথাগুলো বলল সাহিবা সাবিত।
ড. আজদা তার নত মুখের দিকে মুহূর্তকাল চেয়ে থেকে স্নেহের সুরে বলল, ‘সাহিবা, তোমার কাজের কথা বল।’
সাহিবা সাবিত মুখ তুলল।
বলল, ‘ধন্যবাদ আজদা। আমার পিএইচডি থিসিসের যে অংশ নিয়ে আমি এখন কাজ করছি, সেটা তুরস্কের জাতিদেহে কুর্দিদের অবস্থান নিয়ে। এ ব্যাপারে তোমার একটা দৃষ্টিভংগি আমি জানতে চাই। এর সাথে আছে তুরস্কের এই পূর্ব আনাতোলিয়ান অঞ্চলের ভবিষ্যত রাজনীতি নিয়ে কথা। এ ব্যাপারেও তোমার একটা ব্রীফ চাই আমি।’
‘দুটোই খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথম বিষয় সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভংগির কথা বলতে পারি। আমি কুর্দি সম্প্রদায়ের সচেতন সদস্য হিসেবে বলছি, তুরস্ক, ইরাক, ইরান, আজারবাইজান, আর্মেনিয়াসহ এই গ্রন্থিতে কুর্দি সম্প্রদায়কে নিয়ে যে রাজনীতি হচ্ছে, সে রাজনীতি কুর্দিদের সৃষ্টি নয়। যেভাবে ইসলামী খিলাফত বা ইসলামী সাম্রাজ্য ভেঙে তুর্কি, ইরাকি, সিরীয়, লেবাননী, জর্দানি ইত্যাদি জাতির উদ্ভব ঘটানো হয়েছে, সেভাবেই কুর্দিদের দাঁড় করানো হয়েছে মুসলিম ভূ-খণ্ডগুলোকে আরও খণ্ড-বিখণ্ড করার জন্যে। কুর্দিরা পশ্চিমী পুঁজিবাদী ও কমিউনিস্টদের মধ্যকার পৌনে এক শতাব্দী কালের ঠাণ্ডা যুদ্ধেরও শিকার হয়েছে। এ সবের কোনটিই কুর্দিদের স্বার্থে হয়নি, হয়েছে সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থে। সাম্রাজ্যবাদী এই ষড়যন্ত্রই তুরস্কে তুর্কিদের সাথে কুর্দিদের বিরোধ বাঁধিয়েছে। তুরস্কের সমাজে, রাষ্ট্রে, অর্থনীতিতে তুর্কি ও কুর্দি বলে কোন বিভেদ ছিল না। তুরস্কের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট ইসমত ইনোনু একজন কুর্দি ছিলেন। আবার অষ্টম প্রেসিডেন্ট তুরগুত ওজালও একজন কুর্দি ছিলেন। তুরস্কের প্রশাসন ও ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তুর্কি-কুর্দি কোন বিভেদ নেই। এই ঐক্য ও সংহতিকে মূল দৃষ্টি হিসেবে সামনে আনলে তুমি সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্রটা দেখতে পাবে এবং বাঞ্ছিত উপসংহারে পৌঁছতে পারবে।’
বলে থামল ড. আজদা। কথা শুরু করল আবার, ‘তোমার দ্বিতীয় বিষয়টার ওপর আমি কিছু বলতে পারবো না সাহিবা। তবে একজনের নাম বলতে পারি। তিনি খুব স্বচ্ছ দৃষ্টি রাখেন।’
‘কে তিনি?’ জিজ্ঞাসা সাহিবা সাবিতের।
‘তিনি আবু আহমদ আব্দুল্লাহ।’ বলল ড. আজদা।
সাহিবা সাবিতের সারা মুখে রক্তের এক আবির রঙ খেলে গেল।
সে মুহূর্তের জন্যে মুখ নিচু করে আবার স্বাভাবিক হয়ে বলল, ‘তুমি ঠিকই বলেছ আজদা। কিন্তু আমি ওর সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলতে পারবো না।’ সাহিবা সাবিত বলল। তার সারা মুখে সেই বিষণ্ণভাব আবার ফিরে এসেছে।
ড. আজদা তাকাল সাহিবা সাবিতের দিকে। বলল, ‘তুমি ওকে ভুল বোঝ না সাহিবা। ওর বিবেচনাকে আমাদের শ্রদ্ধা করা উচিত।’
‘আমি ওকে ভুল বুঝিনি আজদা। আমি ভুল করেছিলাম, সেটাই আমি নিজেকে বোঝাবার চেষ্টা করছি। কিন্তু আজদা, তিনি ঐভাবে একটা হৃদয়কে সরাসরি গুলি করে বধ না করলেও পারতেন। তার কথা অন্যভাবে জানান দেয়া যেত। ব্যাপারটা একটা হৃদয়কে পয়েন্ট ব্ল্যাংক গুলি করার মত হয়েছে।’ বলল সাহিবা সাবিত। তার কণ্ঠ আবেগে কাঁপছিল।
‘তোমার দিক দিয়ে তুমি ঠিকই বলেছ সাহিবা। স্পর্শকাতর এ বিষয়টাকে অন্যভাবেও ম্যানেজ করতে পারতেন। কিন্তু তার দিকটাও ভাব সাহিবা। আমার মতে তিনি তোমাকে সাহায্য করতে চেয়েছেন। তোমার মধ্যে বিভ্রান্তি যেন এক মুহূর্তও আর না থাকে, কষ্ট যাতে আরও গভীর হবার সুযোগ না হয়, এ জন্যেই তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বিভ্রান্তির নিরসনে এসেছেন।’ বলল ড. আজদা।
‘পেরেছেন কি তিনি কষ্টের হাত থেকে বাঁচাতে? পারেননি। যখন তিনি এ চেষ্টা করেছেন, তখন তো একটা জীবনের কুরবানী হয়ে গেছে। মরাকে কি আর বাঁচানো যায় আজদা!’ বলল সাহিবা সাবিত। তার কণ্ঠ কাঁপছে। দু’চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু।
ড. আজদা উঠে গিয়ে সাহিবা সাবিতের পাশে বসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
সাহিবা সাবিতের মাথাটি ঢলে পড়ল ড. আজদার কাঁধে। নীরব কান্নায় ভেঙে পড়ল সে।
কান্নায় বাঁধা দিল না ড. আজদা। শুধু বড় বোনের মত তার পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিল।
সাহিবা সাবিত একটু শান্ত হলে ড. আজদা বলল, ‘তুমি এ ভুলটা কেন করলে সাহিবা? তুমি জানতে তিনি বিবাহিত।’
‘সব ভুলে গিয়েছিলাম, সব ভেসে গিয়েছিল বোধহয় সামনে থেকে। সেই সাথে আমি কখন অথৈ সাগরে ডুবে গেছি বুঝতে পারিনি। অন্যায় হয়তো হয়েছে, কিন্তু অন্যায় কিভাবে হলো আমি বুঝতে পারিনি।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল সাহিবা সাবিত।
‘সব ঠিক হয়ে যাবে সাহিবা। একটু শক্ত হও। তবে মনে কোন অপরাধবোধ আনা ঠিক হবে না। যা ঘটেছে তা অন্যায় নয়।’ বলল ড. আজদা।
ড. আজদার কাঁধ থেকে মাথা তুলল সাহিবা সাবিত। চোখ মুছে বলল, ‘না আজদা, আমার মধ্যে অন্যায় বোধ নেই। থাকবে কেন? আমি এখনও আমার অধিকারের মধ্যে রয়েছি, কারও অধিকার আমি লংঘন করিনি। আমার ভালো লাগা, ভালোবাসা কারও ক্ষতি করেনি, ওরও নয়।’
‘সাহিবা, এভাবে না ভেবে তোমার সব ভুলে যাওয়া উচিত।’ বলল ড. আজদা।
‘এটা আমি বলতে পারবো না, তবে তোমাকে এ কথা দিতে পারি যে, ওকে বিব্রত করবো না, উনি নতুন সাহিবাকে দেখবেন।’ বলল সাহিবা ধীর কণ্ঠে।
বলেই সোজা হয়ে বসল সাহিবা। বলল, ‘এসব কথা থাক আজদা, এস আমরা আমাদের কাজের কথায় ফিরে যাই। আমার জিজ্ঞাসার দ্বিতীয় বিষয়ের ব্যাপারে।’
‘সেটাই তো বলছিলাম, এ বিষয়ে আবু আহমদ ভাইয়া তোমাকে সাহায্য করতে পারেন। এ বিষয়টি নিয়ে ওর সাথে আমার একদিন আলোচনা হয়েছিল। দেখলাম, উনি এ বিষয়ে একটা তথ্যের ভাণ্ডার।’ বলল ড. আজদা।
সাহিবা সাবিতের চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই সেখানে নামল বিষণ্ণতা। বলল, ‘ওর কাছে কয়দিন আমি যাব না।’
‘কেন?’ বলল ড. আজদা।
‘ঐ যে তুমি শক্ত হতে বললে। সেটাই। মনটাকে আমার আগে শক্ত করতে হবে, যাতে ওর সংস্পর্শে ভেঙে পড়ে কোন নতুন অনর্থ না ঘটায়।’ সাহিবা বলল। ভারি কণ্ঠ তার।
‘ঠিক চিন্তা করেছ সাহিবা। মনটাকে তোমার শক্ত করা দরকার।’
বলে একটু থেমে আবার কথা শুরু করল ড. আজদা। বলল, ‘ছেলেমেয়েদের মেলামেশার ক্ষেত্রে ইসলাম যে সীমার নির্দেশ করেছে, সুস্থ সম্পর্ক রাখার ক্ষেত্রে তা মানার কোন বিকল্প নেই। তোমার ক্ষেত্রে, আমার ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, অবাধ মেলামেশার সুযোগ না থাকলে তা ঘটতো না।’
‘আমারটা তো বুঝলাম। তোমার ক্ষেত্রে কি ঘটেছে?’ বলল সাহিবা। তার চোখে বিস্ময়।
‘ছোট্ট একটা ঘটনা ঘটেছে। সকালে যেদিন দুষ্কৃতিকারীরা আমাদের বাড়িতে হামলা করেছিল। সেদিন ভীতিকর এক পরিবেশে তার পাশে দাঁড়ানো অবস্থায় আমি ওকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। এটা ছিল ওর কাছে আমার আশ্রয় খোঁজা। তিনিও নিশ্চয় এটা বুঝেছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও অন্যকিছু ভাববার সুযোগ বন্ধ করার জন্যেই তিনি সংগে সংগেই আমাকে বোন বলে সম্বোধন করেছিলেন।’ ড. আজদা বলল।
‘এটা কি তুমি ড. বারজেনজো ভাইয়াকে বলেছ?’ একটু মিষ্টি হেসে বলল সাহিবা সাবিত।
ড. আজদার মুখ লাল হয়ে উঠল। বলল, ‘এটা ওকে বলার মত কোন গুরুত্বপূর্ণ কথা নয়।’
‘গুরুত্বপূর্ণ নয় বলছ কেন? টার্নিং পয়েন্টের মত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারতো। যেমন আকস্মিক ঝড় পুরানো স্থাপনা ভেঙে নতুন স্থাপনার দুয়ার উন্মুক্ত করে, তেমনি মুহূর্তের ঘটনা চিরজীবনের হয়ে দাঁড়াতে পারে।’ বলল সাহিবা সাবিত গম্ভীর কণ্ঠে।
‘ঠিকই বলেছ সাহিবা। এটাই অবাধ মেলামেশার কুফল। যার অসহায় শিকার আমাদের পশ্চিমী সমাজ। এখানে ঘরে-বাইরে আজ সম্পর্কের অস্থিরতা, দাম্পত্য-জীবনে অব্যাহত ভাঙন, পরিবার ব্যবস্থায় বিপর্যয়।’ ড. আজদা বলল।
‘হ্যাঁ আজদা, তিনি পাথর বলেই তিনি যেমন বাঁচলেন, তুমি বাঁচলে, আমার পথও বন্ধ করা হলো। কিন্তু সবাই তো তার মত বিকর্ষণকারী পাথর নয়, সবাই আকর্ষণ করে। বহুমুখী এই আকর্ষণ থেকেই বহুমুখী বিপর্যয় এসেছে আমাদের পশ্চিমী সমাজে। কিন্তু আমরা বাঁচবো কি করে? ছোটবেলা থেকে ছেলেমেয়ের অবাধ মেলামেশাই তো আমাদের লাইফস্টাইল।’ বলল সাহিবা সাবিত।
‘এ লাইফস্টাইল স্বাভাবিক নয়, সুস্থ নয়, তাই ইসলামীও নয়। আবু আহমদ ভাইয়া স্বাভাবিক ও সুস্থ ইসলামী লাইফস্টাইল অনুসরণ করেন বলেই তিনি বাঁচতে পারেন। আমাদেরও বাঁচিয়েছেন। তিনি একটা জীবন্ত মডেল আমাদের কাছে।’ ড. আজদা বলল।
সাহিবা সাবিত আকস্মিকভাবে ড. আজদার কাছ থেকে একটু সরে বসল। বলল, ‘দেখ আজদা, তুমি এভাবে ওর প্রশংসা করো না, মনকে কিন্তু শক্ত করতে পারবো না, বিগড়ে যাবে কিন্তু মন।’ মুখে হাসি নিয়ে বলল সাহিবা সাবিত।
কথা শুনে ড. আজদাও হেসে উঠল। একটু উঠে সাহিবা সাবিতকে ধরে তার পিঠে কয়েকটি স্নেহের থাপ্পড় মেরে বলল, ‘কানে তালা লাগিয়ে বুঝি মনটাকে ঠিক করবে! মনকে ঠিক করতে হবে বাস্তবতা দিয়ে, বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে।’
সাহিবা সাবিত জড়িয়ে ধরল ড. আজদাকে। হাসতে হাসতে বলল, ‘ভয় পেয়ো না আজদা। ওকে বিব্রত করবো না। বলেছি তো, উনি নতুন সাহিবাকে দেখবেন।’
সাহিবার মুখে হাসি, কিন্তু চোখে অশ্রু।
‘ধন্যবাদ সাহিবা।’ বলল ড. আজদা। সেও জড়িয়ে ধরল সাহিবাকে।
সাহিবার চোখের অশ্রু তার দু’গণ্ডে গড়িয়ে পড়ল।
ভ্যান ক্যালিস প্রাসাদ মিউজিয়ামের ডিজি ড. মাহজুন মাজহারের অফিস।
ড. মাহজুন মাজহার একটা সোফায় বসে। তার সামনের সোফায় পাশাপাশি বসে ভ্যান পুলিশ প্রধান ডিজিপি মাহির হারুন এবং ভ্যানের গোয়েন্দা প্রধান এরফান এফেন্দী।
কথা বলছিল পুলিশ প্রধান মাহির হারুন। বলল, ‘স্যার, তদন্তের ব্যাপারে সব আপনাকে বললাম। আমাদের তদন্তে খুঁত নেই। আবু আহমদ আব্দুল্লাহ যে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, সেভাবেই কাজ হয়েছে। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার গত ছয় মাসের ভিডিও ক্লিপ থেকে বাইরের তিনজন সন্দেহজনক লোককে চিহ্নিত করা হয়েছে। মিউজিয়ামের গণসংযোগ বিভাগের ডাইরেক্টর মিসেস অ্যানোশ আব্দুল্লাহ গাজেন পাস ইস্যু করে প্র্থমে তাদের ভেতরে ঢুকিয়েছে। পরে এই তিনজনই সাংবাদিক পরিচয়ে মিসেস অ্যানোশ আব্দুল্লাহর পাশে মিউজিয়ামের যত্রতত্র ঘুরে বেড়িয়েছে। এই তিনজনই আমাদের প্রাইম সাসপেক্ট। দুঃখের বিষয়, এদের তিনজনকেই লেক ড্রাইভে এক ভয়ংকর অপারেশনে অস্ত্রধারী কমান্ডো হিসেবে মৃত পাওয়া গেছে। এদের সহযোগিতাকারী হিসেবে মিসেস অ্যানোশ গাজেনের নাম এসেছে। এখন তো আমাদের এ্যাকশনে যেতে হয়।’ থামল ডিজিপি মাহির হারুন।
ড. মাহজুন মাজহার বলল, ‘মিসেস অ্যানোশ আব্দুল্লাহ গাজেন একজন পুরানো, অভিজ্ঞ অফিসার। মিউজিয়ামের সকলের কাছে সে সম্মানিতও। তার ব্যাপারটা একটু কেয়ারফুলি ডীল করুন, আমার অনুরোধ। আপনারা কি তার সাথে এ নিয়ে কথা বলেছেন?’
‘জ্বি হ্যাঁ, তার সাথে আমরা কথা বলেছি। উনি বলেছেন, একটা রেস্টুরেন্টে ঐ তিনজনের সাথে তার পরিচয়। ওরা নিজেদের ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক বলে পরিচয় দিয়েছিল। পরে অবশ্য সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছে এমন পরিচয়পত্র দেখিয়েছিল। মিউজিয়াম সম্পর্কে সেদিন তারা তাদের গভীর আগ্রহের কথা বলে এবং জানায় যে, তারা মিউজিয়ামের ওপর ধারাবাহিক গবেষণামূলক ফিচার প্রকাশ করতে চায়। এজন্যে তারা মাঝে মাঝে মিউজিয়ামে যেতে চায়। তারা আমার সাহায্য কামনা করে। যতটা সম্ভব তিনি তাদের সহযোগিতা করেন। এই ছিল তার বক্তব্যের সার কথা।’
‘ভেতরে কি আছে জানি না কিন্তু এই কথাগুলোকে আমার কাছে নির্দোষ বলেই মনে হয়।’ বলল ড. মাহজুন মাজহার।
‘তার কথাগুলোকে নির্দোষ মনে হচ্ছে স্যার। কিন্তু তিনজন যে পরিচয় দেয় তা দোষযুক্ত। ভ্যানের ফ্রিল্যান্স কিংবা পেশাদার কোন সাংবাদিকই এদের চেনে না। নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে যে পত্রিকার আইডেনটিটি কার্ড তারা দেখিয়েছিল, ঐ নামের কোন সংবাদপত্র এখন ভ্যানে চালু নেই। কিন্তু মিসেস অ্যানোশ গাজেন এসব কোন কিছু খোঁজ না নিয়েই ওদেরকে মিউজিয়ামে ঢোকার অবাধ সুযোগ দিয়েছেন। এটা তার বোকামী, না অন্য কিছু, সেটাই আমরা বুঝতে পারছি না।’
এই সময় ড. মাহজুন মাজহারের পিএস আহমদ মুসাকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল।
ড. মাহজুন মাজহারসহ সকলেই উঠে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসাকে স্বাগত জানাল।
ড. মাহজুন মাজহার আহমদ মুসাকে তার পাশের সোফায় নিয়ে বসাল।
‘আপনি কষ্ট করে এসেছেন, এজন্যে আপনাকে ধন্যবাদ স্যার। স্যার, আমি আপনাকে আমাদের মিউজিয়ামের ডাইরেক্টর পাবলিক রিলেশন্স সম্পর্কে একটা ইংগিত দিয়েছিলাম। এতক্ষণ ঐ তিনজন ও তার বিষয় নিয়েই আলোচনা করছিলাম।’
বলে ডিজিপি মাহির হারুন মিসেস অ্যানোশ আব্দুল্লাহ গাজেন সম্পর্কে এতক্ষণ যে আলোচনা হয়েছে তা সংক্ষেপে আহমদ মুসাকে জানিয়ে বলল, ‘ঐ তিনজন মূল কালপ্রিটের মৃত্যুর পর একমাত্র মিসেস অ্যানোশ আব্দুল্লাহ গাজেনই আছেন যার সাথে মিউজিয়ামের ভয়াবহ ঘটনার একটা লিংক আছে। এখন আমরা কি করব, সেটাই আলোচনার বিষয়।’
‘আমার মতে আশু করণীয় হলো, মিসেস অ্যানোশ গাজেনকে সার্বক্ষণিক পাহারায় রাখা। উল্কিওয়ালারা যারা মিউজিয়ামে ডাকাতি করেছে, তারা মিসেস অ্যানোশ গাজেনকে হত্যা করতে পারে। কারণ, আমাদের সামনে একমাত্র সেই আছে যার মাধ্যমে ঘটনা ফাঁস হতে পারে।’ বলল আহমদ মুসা।
ডিজিপি, গোয়েন্দা অফিসার এরফান এফেন্দী এবং ড. মাহজুন মাজহারের চোখে-মুখে বিস্ময়। ডিজিপি মাহির হারুন ও গোয়েন্দা এরফান এফেন্দী ভাবল, এই সহজ কথাটা আমাদের মনে হয়নি কেন? এটাই তো স্বাভাবিক।
‘ঠিক আছে স্যার, আমি নির্দেশ দিচ্ছি, পুলিশের একটা দল সব সময় অলক্ষ্যে তার পাহারায় থাকবে। আরও আমাদের কি করণীয় স্যার?’ ডিজিপি মাহির হারুন পকেট থেকে ওয়্যারলেস বের করে পুলিশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে বলল, ‘মিসেস অ্যানোশ গাজেনের বাড়িতে এখনি সাদা পোশাকে পুলিশের প্রহরা বসাও। এখন তিনি বাড়িতে থাকার কথা।’
‘ধন্যবাদ অফিসার। মিসেস অ্যানোশ গাজেন সম্পর্কে গভীর অনুসন্ধান প্রয়োজন। তার বর্তমান পরিচয়ের আড়ালে আর কোন পরিচয় আছে কিনা।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কেন এ কথা বলছেন স্যার? আপনি কি অন্য কিছু সন্দেহ করছেন?’ বলল ডিজিপি মাহির হারুন। তার ভ্রূকুঞ্চিত।
‘আচ্ছা, মিসেস অ্যানোশ আব্দুল্লাহ গাজেনের নামের অ্যানোশ ও গাজেন শব্দ দু’টি কি টার্কিশ?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘শব্দ দুটি তুরস্ক, আর্মেনিয়া, আজারবাইজানে কিছু কিছু ভিন্ন উচ্চারণে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়।’ বলল ড. মাহজুন মাজহার।
‘আচ্ছা, অ্যানোশ’ শব্দ কারও নামের অংশ হতে পারে, কিন্তু ‘গাজেন’ শব্দ কি তুরস্কে নাম হিসেবে মুসলমানরা ব্যবহার করে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
ভ্রুকুঞ্চিত হলো ড. মাহজুন মাজহারের। বলল, ‘গাজেন’-এর টার্কিশ সমতুল্য শব্দ হলো ‘গায়িন’। এই ‘গায়িন’ শব্দ ছেলেদের নামের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয় তুরস্কে। কিন্তু ‘গাজেন’ নাম তুরস্কে ব্যবহার হয় না, এটা আর্মেনীয় শব্দ।’
‘শুধু এটা আর্মেনীয় নামবাচক শব্দই নয়। এর পেছনে একটা ইতিহাস আছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কি ইতিহাস?’ জিজ্ঞাসা ড. মাহজুন মাজহার ও ডিজিপি মাহির হারুন দু’জনেরই।
‘ধর্মের জন্যে, আর্মেনীয় জাতির জন্যে জীবনদানকারী একজন খৃস্টান সন্ন্যাসিনীর নাম ‘গাজেন’। তার এই নামে আর্মেনিয়ার একটি চার্চেরও ‘গাজেন’ নামকরণ করা হয়েছে।’
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now