বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আহমদ মুসার চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ড. আজদা, সাহিবা সাবিত ও সাহাব নুরীদের বাঁচানোর একটা বিকল্প তার সামনে এসেছে। কিন্তু এ বিষয়ের দিকে না গিয়ে সে বলল, ‘তোমরা কে জানি না, কিন্তু তোমাদের ঐ রকেট লাঞ্চার দিয়ে আমাদের ধ্বংস করার ভয় দেখিও না। তোমাদের হাতে যে রকেট লাঞ্চার দেখছি, তার ডেস্ট্রাকশন রেডিয়াস হল ৪০ বর্গফুট। সুতরাং আমাদের গাড়ি ধ্বংস করতে চাইলে তোমাদের তিন গাড়ি এবং তোমরাও ধ্বংস হয়ে যাবে। হ্যাঁ, তোমরা বন্দুকধারী, দশটি মিনি মেশিনগানের গুলি চালিয়ে আমাদের চারজনকে হত্যা করতে পার, কিন্তু শুনে রাখ, আমাদের চারজনকে মারতে হলে তোমাদের কমপক্ষে চারজনকে মরতে হবে। তবে আমার দুই হাতের রিভলভার আরও বেশি মারতে পারে, কারণ, আমার হাত তোমাদের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষিপ্র এবং আমার গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। সুতরাং তোমাদের প্রস্তাব নয়, আমার প্রস্তাবে তোমাদের রাজি হতে হবে।’ থামল আহমদ মুসা।
ওদিক থেকে সংগে সংগেই উত্তর এল না।
এদিকে ড. সাহাব নুরী, ড. আজদা ও সাহিবা সাবিত আতংকে একেবারে চুপসে গেছে। ড. আজদা ও সাহিবা সাবিত দু’জনেই কাঁপছে। আর ড. সাহাব নুরী তার বুকের কাঁপুনি থামাতেই পারছে না।
কিন্তু তারা সকলেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছে আহমদ মুসার নির্ভয় ও স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর শুনে। তার চেয়ে বড় বিষয় হলো, তারা যে ভয় দেখিয়েছিল, সে ভয় আহমদ মুসা তাদের দিকে ফিরিয়ে দিয়েছে এবং তার প্রস্তাব ওদেরকে গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়ে কার্যত সিচুয়েশনের কমান্ড প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু আবু আহমদ আব্দুল্লাহর প্রস্তাবটি কি, এ বিষয়টি বিরাট কৌতুহলেরও সৃষ্টি করেছে তাদের মধ্যে।
আহমদ মুসা কথা শেষ করার পর ওদের তরফ থেকে কোন কথা এল না। বেশ কিছুক্ষণ নীরবতার পর ওদিক থেকে একটা ভারি কণ্ঠ বলল, ‘ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। বল, তোমার প্রস্তাব কি?’
‘আমি অনর্থক ভয় দেখাই না। আমি যা বলেছি, তাই ঘটবে। সে যাক, ড. আজদার কোন দোষ নেই। তাকে কিডন্যাপ করার জন্যে তোমাদের লোক যারা কয়েকবার গিয়েছিল, তাদের আমিই হত্যা করেছি। আমার প্রস্তাব হলো, ড. আজদা, ড. সাহাব নুরী ও সাহিবা সাবিত অর্থাৎ আমি ছাড়া গাড়িতে যারা আছেন, সবাই এ গাড়ি নিয়ে চলে যাবেন। আমি একাই আপনাদের হাতে থেকে যাব। এটাই আমার প্রস্তাব।’
আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই ‘না’ বলে আর্তনাদ করে উঠল সাহিবা সাবিত। বলল, ‘এ প্রস্তাব চলবে না। যা ঘটার একসাথে ঘটবে। মরলে একসাথে মরব।’ আবেগরুদ্ধ কণ্ঠ সাহিবা সাবিতের।
আহমদ মুসার প্রস্তাবে বিস্ময়ে বিস্ফারিত হয়ে উঠেছে ড. আজদা ও ড. সাহাব নুরীর চোখ। এতো আত্মঘাতী প্রস্তাব আবু আহমদের! বিচ্ছিন্নভাবে চিন্তা করার কথা তো ভাবেনি! যা ঘটবে একসাথেই তাদের ওপর ঘটবে, এটাই তো তারা ভাবছিল। এসব চিন্তাই এসে ঘিরে ধরেছে ড. সাহাব নুরী ও ড. আজদাকে। তাদের কথাই ভাষা পেয়েছে সাহিবা সাবিতের আর্তনাদ ও কথার মধ্যে।
আহমদ মুসার প্রস্তাবের উত্তর এল ওপার থেকে। বলল আবার সেই ভারি কণ্ঠ, ‘তোমার প্রস্তাব মেনে নিচ্ছি আমরা দুই শর্তে। এক. তোমার হাতের দু’টি রিভলভার তোমার গাড়ির ভাঙা উইন্ডস্ক্রীন দিয়ে এদিকে ফেলে দিতে হবে। দুই. রিভলভার দু’টি ফেলে দেয়ার পর তুমি দু’হাত তুলে বেরিয়ে আসবে। তুমি এসে আমাদের লোকদের সামনে হাত তুলে দাঁড়াবার পর ড. আজদারা গাড়ি নিয়ে চলে যেতে পারবে।’
‘আমাকে হাতে পাওয়ার পর এদেরকে নিরাপদে যেতে দেবে, তার গ্যারান্টি তোমাদের শর্তে নেই। ইচ্ছে করলে তোমরা আমাদের সবাইকে একসাথে মেরে ফেলতে পার। এই ব্যাপারে আমার শর্ত হলো, অস্ত্র আগে ছাড়ব না। অস্ত্র হাতে নিয়েই বের হবো এবং তোমাদের লোকদের সামনে দাঁড়াব। এরপর ড. আজদারা চলে যাবে। তারা নিরাপদ দূরত্বে চলে যাওয়ার পর আমি অস্ত্র ত্যাগ করব।’ থামল আহমদ মুসা।
‘আমরা বিরোধিতা করছি স্যার। আপনি এই প্রস্তাব থেকে সরে আসুন। যা ঘটে ঘটুক, একসাথেই আমাদের ওপরে ঘটুক।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল সাহিবা সাবিত।
‘আমারও কথা এটাই ভাইয়া। আপনি প্লিজ এমন কিছু করবেন না।’ বলল ড. আজদা। তারও কণ্ঠ কান্নায় ভেঙে পড়ল।
ওদিক থেকে সেই কণ্ঠ আবার ধ্বনিত হলো। বলল, ‘ঠিক আছে আবু আহমদ। তোমার কথা মেনে নিলাম। তুমি অস্ত্র নিয়েই বেরিয়ে এস। ড. আজদাদের গাড়ি কিছু দূরে চলে যাবার পর যখন আমরা বলব, তখন অস্ত্র ত্যাগ করে হাত তুলে দাঁড়াতে হবে।’
‘ঠিক আছে। আমি বেরুচ্ছি।’ বলে আহমদ মুসা তাকাল ড. সাহাব নুরীর দিকে।
ড. সাহাব নুরীর মুখ বেদনায় দীর্ণ। তার চোখ দিয়ে গড়াচ্ছে অশ্রু।
‘আমি যাচ্ছি। আপনি ড্রাইভিং সীটে এসে তাড়াতাড়ি গাড়ি নিয়ে চলে যাবেন।’ বলল আহমদ মুসা। আহমদ মুসা তার বাঁ হাত ড. সাহাব নুরীর কাঁধে রেখে তাকে সান্ত্বনা দিল।
ড. সাহাব নুরী কিছু বলতে গিয়েও পারল না। কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল তার।
একসাথে কেঁদে উঠেছে সাহিবা সাবিত ও ড. আজদা।
আহমদ মুসা তার হাতটা ড. সাহাব নুরীর কাঁধ থেকে নামিয়ে তাকাল পেছন দিকে। একটু উচ্চকণ্ঠে ডাকল ড. আজদা ও সাহিবা সাবিতকে।
তারা মুখ তুলে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। দু’জনেই মুখ খুলেছিল কিছু বলার জন্যে।
আহমদ মুসা তাদের বাঁধা দিয়ে বলল, ‘এখন কোন কথা নয়। এভাবে ভেঙে পড়া ঠিক নয়। আল্লাহর ওপর ভরসা কর এবং কিছু চাইলে, শুধু তাঁর কাছেই চাও। বিপদ দেবার ক্ষমতা তাঁরই, বিপদ থেকে বাঁচানোর ক্ষমতাও তাঁর। স্মরণ কর, আল্লাহ বলেছেন, ‘ফা-ইন্নামাআল উসরে ইয়োসরা, ইন্নামাআল উসরে ইয়োসরা (সংকটের সাথে সমাধান থাকে, নিশ্চয় সমাধান থাকে সংকটের সাথে)। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের এ অমোঘ কথার ওপর ভরসা রাখো। কেঁদো না কেউ।’
বলে আহমদ মুসা তাদের কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত গাড়ি থেকে নিচে নেমে গেল।
অসহায় কান্নায় ভেঙে পড়ল ড. আজদা ও সাহিবা সাবিত।
ড. সাহাব নুরী ড্রাইভিং সীটে এসে বসল এবং গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে ফিরতি যাত্রা শুরু করল।
গাড়ি থেকে নেমে আহমদ মুসা ঠিক গাড়ির সামনে দাঁড়াল। তার দু’হাতের রিভলভার উদ্যত সামনের আট দুষ্কৃতিকারীর দিকে।
ড. সাহাব নুরী গাড়ি ঘুরিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে, তা পেছন দিকে না তাকিয়েও বুঝল আহমদ মুসা।
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে হলো, পেছন থেকে পায়ের চারটি শব্দ এগিয়ে আসছে। আহমদ মুসা ভাবল, নিশ্চয় পেছনের গাড়ির লোক হবে তারা। কেন আসছে তারা? কি তাদের উদ্দেশ্য? গুলি করার ইচ্ছা থাকলে পেছন থেকে এতক্ষণে গুলি করতে পারতো।
পেছন থেকে পদশব্দ দ্রুত হয়েছে।
আরও কিছু ভাবার আগেই পেছন থেকে দু’জন তার দু’হাতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দু’টো রিভলভারই তার হাত থেকে ছুটে গেল।
রিভলভার দু’টি পেছন থেকে আসা দু’জনে তুলে নিয়েছে।
হো হো করে হেসে উঠল গাড়ির ভেতর থেকে সেই কণ্ঠ। বলল, ‘আবু আহমদ, হাত ওপরে তোল।’
আহমদ মুসা হাত ওপরে তুলল।
আবার হেসে উঠল সেই কণ্ঠ। বলল, ‘আবু আহমদ, প্রতিশ্রুতি আমরা রক্ষা করতে পারলাম না। কোন শিকার হাতের মুঠোয় আসার পর তাকে ছেড়ে দেয়া আমাদের নীতি নয়।’
আহমদ মুসা দেখল, একটি রকেট লাঞ্চার ওপরে উঠছে।
বুঝতে পারল আহমদ মুসা, ড. আজদাদের গাড়ি লক্ষ্যেই রকেট লাঞ্চার ওপরে উঠছে।
এই বিশ্বাসঘাতকতায় আহমদ মুসার সর্বাঙ্গে যেন আগুন ধরে গেল। ভাবল, এবার তার রুখে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। তার দু’হাত উঠে আছে কান পর্যন্ত। সে হাতের কয়েক ইঞ্চি পেছনে জ্যাকেটে রাখা আছে যাদুকরী মিনি মেশিন রিভলভার। ট্রিগার টিপে ধরলেই এ রিভলভার থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ২৪টি গুলির মিছিল বেরিয়ে আসে। গুলিগুলো আকারে ছোট, কিন্তু প্রত্যেকটি একটি বোমার মত ভয়ংকর।
আহমদ মুসা তাকাল চারদিকে রকেট লাঞ্চারধারীদের দিকে। আহমদ মুসা নিরস্ত্র হবার পর ওরা এখন নিশ্চিন্ত। ওদের ভয়ংকর গানগুলোর ব্যারেল নিচে নামানো।
তখনও রকেট লাঞ্চারের সুঁচালো মাথা ওপরে ওঠা শেষ হয়নি।
আহমদ মুসার ডান হাত বিদ্যুৎ গতিতে ঢুকে গেল ঘাড়ের নিচে জ্যাকেটের পকেটে। হাতটি চোখের পলকে বেরিয়ে এল, তর্জনী রিভলভারের ট্রিগারে।
হাত বেরিয়ে আসার সাথে সাথেই আহমদ মুসা গুলিবর্ষণ শুরু করেছে। গুলি অব্যাহত রেখেই সে বসে পড়ল এবং পাল্টা গুলি থেকে বাঁচার জন্যে শুয়ে পড়ল। গুলিবর্ষণ তার থামেনি।
পাল্টা গুলিও চলছিল।
কিন্তু আহমদ মুসার রিভলভার এতই ক্ষিপ্রতার সাথে চারদিক ঘুরে এল এবং তার গুলি এতই পয়েন্টেড হলো যে, পাল্টা আঘাতের চেষ্টা যারা করছিল, তারাও গুলি খেয়ে ঢলে পড়ল মুহূর্তে। আহমদ মুসা দ্রুত তার অবস্থানের পরিবর্তন করায় পাল্টা যে গুলি হয়েছিল তা কাজে আসেনি।
গুলি করতে করতেই আহমদ মুসা দ্রুত গড়িয়ে সরে এসেছিল পাশাপাশি দাঁড়ানো দুই মাইক্রোর মাঝখানে আড়াল নেয়ার জন্যে। গড়িয়ে সরে আসার সময় আহমদ মুসা একটা মিনি মেশিনগানও কুড়িয়ে এনেছিল।
আহমদ মুসাদের গাড়ির পেছনে ওদের যে গাড়িটি দাঁড়িয়েছিল, তার দু’জন লোক শুরুতেই আহমদ মুসার গুলিতে মারা পড়েছিল। অবশিষ্ট দু’জনও ঘটনার আকস্মিকতার ধাক্কা সামলে গুলি করতে শুরু করেছিল।
আহমদ মুসা মাইক্রোর আড়াল নেয়ার পর কুড়িয়ে পাওয়া মিনি মেশিনগান দিয়ে ওদের লক্ষ্যে গুলি করা শুরু করে।
ওরা ফাঁকা রাস্তার ওপর দাঁড়িয়েছিল। তারা তাদের গাড়ির আড়াল নেবে, এমন আত্মরক্ষামূলক চিন্তা আগে করেনি। আহমদ মুসার গুলি শুরু হলে তারা এটা বুঝল এবং পেছন দিকে ছুটল গাড়ির আড়াল নেবার জন্যে। কিন্তু যাওয়া তাদের শেষ হলো না। ওদের গাড়ির সামনেই ওরা গুলি খেয়ে ঢলে পড়ল।
হঠাৎ আহমদ মুসার খেয়াল হলো, পাশের মাইক্রো থেকে যে লোকটি তার সাথে কথা বলেছে এবং শেষ সময়ে যে রকেট লাঞ্চার তাক করছিল ড. আজদাদের গাড়ি লক্ষ্যে, সে লোকটি কোথায়?
এই কথা মনে হবার সাথে সাথে আহমদ মুসা তার মিনি মেশিনগান ধরা হাত পাশের মাইক্রোর দিকে ঘুরিয়ে নিল অব্যাহত গুলির একটা দেয়াল সৃষ্টি করে।
এভাবে বাঁ দিকে ঘুরতে গিয়েই আহমদ মুসা দেখল, পাশের মাইক্রোর ওপাশ থেকে একজন লোক ছুটে গিয়ে মাইক্রোর সামনে পড়ে থাকা নিহত একজনের মিনি মেশিনগান হাতে তুলে নিচ্ছে। কিন্তু মিনি মেশিনগান হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াবার আগেই আহমদ মুসার গুলির দেয়ালের মধ্যে পড়ে ঝাঁঝরা দেহ নিয়ে একজন সাথীর মৃতদেহের ওপর আছড়ে পড়ল।
আহমদ মুসা দেখতে পেল, এই লোকটি অন্যদের চেয়ে আলাদা। এর পরনে আপাদমস্তক কালো পোশাক নেই। তার বদলে রয়েছে কুর্দিশ মৌলভির পোশাক।
এর এই পোশাক কেন? সংগে সংগেই এ প্রশ্ন জাগল আহমদ মুসার মনে। এটা কি উল্কিওয়ালাদের এক ক্যামোফ্লেজ? এটাও হতে পারে মানুষকে প্রতারণা করার জন্যে, নিজের প্রশ্নের জবাব নিজেই দিল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসা বুঝল, মাইক্রো থেকে এই লোকটিই তার সাথে কথা বলেছিল এবং এর হাতেই ছিল রকেট লাঞ্চার। আর তার হাতে মিনি মেশিনগান ছিল না। ছিল না বলেই সে আক্রমণে আসতে পারেনি। অবশেষে একটা মিনি মেশিনগান কুড়িয়ে আনতে গিয়েই তাকে শেষ হতে হলো।
আহমদ মুসা চারদিকে চোখ বোলাল। দেখল, তেরটি লাশ তার সামনে। এরা শুধু আমাকে নয়, আমাদের সবাইকেই মারতে চেয়েছিল, সবাইকে মারতে গিয়েই এরা সবাই লাশ হয়ে গেল, হিসেব করল আহমদ মুসা। আল্লাহর অসীম অনু্গ্রহের কথা স্মরণ করে তাঁর প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতায় বিনত হলো আহমদ মুসার হৃদয়-মন-মাথা সবই। নিজের জীবন দিয়ে হলেও তিনজন নিরপরাধ মজলুমকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম বলে আল্লাহ আমাকেও বাঁচিয়ে দিলেন! আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার অশ্রুতে সজল হয়ে উঠল আহমদ মুসার দু’চোখ।
গাড়ি সামনের দিকে চলছিল। কিন্তু সাহিবা সাবিত ও ড. আজদা দু’জনেই আকুল চোখে তাকিয়েছিল পেছনে। অবিরাম অশ্রু ঝরছিল তাদের চোখ দিয়ে।
সাহিবা সাবিত ও ড. আজদা দু’জনেরই চোখ নিবদ্ধ ছিল আহমদ মুসা যেখানে ঘেরাও হয়েছেন, সেই ঘটনাস্থলের দিকে।
হঠাৎ তারা গুলি-গোলার অব্যাহত শব্দ শুনতে পেল।
খোলা ছিল তাদের গাড়ির সবগুলো জানালাই।
ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল তারা দু’জনেই। তাহলে কি সব শেষ হয়ে গেল! বুকটা থরথর করে কেঁপে উঠল সাহিবা সাবিতের। পেছনে তাকিয়ে সে চিৎকার করে বলল, ‘গাড়ি থামান মামা। ওখানে গুলি-গোলা হচ্ছে। দেখা দরকার ওর কি হলো। থামান মামা গাড়ি।’
‘না সাহিবা সাবিত, ওর নির্দেশ, আমাদের নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে হবে। তোমাদের, আমাদের বাঁচানোর জন্যেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তোমাদের কোন বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারি না।’ বলল ড. সাহাব নুরী।
‘না, ওর কথা আমি মানি না। উনি নিজের ওপর অবিচার করেছেন, আমাদের প্রতি অবিচার করেছেন। আমি যাব সেখানে।’
বলে ড্রাইভিং সীটের দিকে এগোলো সাহিবা সাবিত। বলল, ‘মামা, হয় আপনি সেখানে চলুন, না হয় ড্রাইভিং আমাকে দিন। আমি সেখানে যাব।’
‘তুমি পাগল সাহিবা। সেখানে গিয়ে তুমি, আমি, আমরা কি করব। এই চিন্তা করেই তো তিনি আমাদের চলে আসতে বাধ্য করেছেন। ঠিক আছে, চল আমরা এক জায়গায় গিয়ে গাড়ি পার্ক করি। ওরা চলে গেলে আমরা সেখানে গিয়ে খোঁজ নেব।’ বলল ড. সাহাব নুরী।
‘সেখানে প্রচণ্ড গুলি-গোলার শব্দ শোনার পর আমি ফিরতে পারবো না। আপনারা আমাকে নামিয়ে দিন, হেঁটেই আমি সেখানে যাব।’ সাহিবা সাবিত বলল। স্থির সিদ্ধান্ত তার কণ্ঠে।
‘সাহিবা একটু বুঝতে চেষ্টা কর, আমরা সেখানে গিয়ে কি করব, কি করতে পারব?’ বলল ড. সাহাব নুরী। কণ্ঠ তার নরম।
‘ওর সাথে মরতে তো পারব!’ সাহিবা সাবিত বলল কান্নাজড়িত কণ্ঠে।
ড. সাহাব নুরী তাকাল ড. আজদার দিকে।
ড. আজদা বলল, ‘সাহিবা সাবিত যা বলেছে সেটাই আমার মত। উনি যদি না থাকেন, তাহলে আমরা পালিয়েও বাঁচতে পারবো না। মরতে যদি হয়, তাহলে তার সাথে মরাই ভালো।’ কান্নায় ভেঙে পড়া ড. আজদার কণ্ঠ।
‘ঠিক আছে, আল্লাহ ভরসা।’ বলে গাড়ি ঘুরিয়ে নিল ড. সাহাব নুরী।
ছুটে চলল গাড়ি ফেলে আসা সেই ঘটনাস্থলের দিকে।
আহমদ মুসা সার্চ করছিল লাশগুলো উল্কিওয়ালা বলে তার কাছে পরিচিত এই গ্রুপটির ঠিকানা কিংবা এদের আরও পরিচয় পাওয়া যায় কিনা এজন্যে।
আপাদমস্তক কালো ইউনিফর্ম পরা লাশগুলো ওদের বিশেষ কমান্ডো বলে তার মনে হলো। এর আগে এই গ্রুপের আরও যাদের লাশ দেখেছে, তারা এই ধরনের ইউনিফর্ম পরা ছিল না।
এদের সার্চ করে কিছু পেল না আহমদ মুসা।
সব শেষে আহমদ মুসা সবার পরে নিহত হওয়া কুর্দিশ মৌলভীর পোশাক পরা লোকটির কাছে এল। এই লোকটিকেই দলনেতা মনে হয়েছে আহমদ মুসার।
তার পকেটে পেল একটা মানিব্যাগ। মানিব্যাগ খুলতেই চোখে পড়ল কিছু আর্মেনীয় ও টার্কিশ টাকা এবং আইডি কার্ড। দ্রুত আইডি কার্ডটাই দেখল আহমদ মুসা। কার্ডটিতে লোকটির একটি কুর্দিশ নাম আছে। পরিচয় লেখা হয়েছে একটি কুর্দি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে।
আইডি দেখেই আহমদ মুসা বুঝল, এটা ভুয়া। তুর্কি পুলিশকে বোকা বানানোর জন্যেই এই পরিচয় নেয়া হয়েছে।
মানিব্যাগটা আরও ভালো করে সার্চ করতে গিয়ে মানিব্যাগের একটা কেবিনে পেল চার ভাঁজ করা ছোট্ট এক টুকরো কাগজ। গুরুত্বপূর্ণ হবে কিছু, এটা মনে করে কাগজটা তাড়াতাড়ি খুলে দেখল, ওটা একদমই সাদা একটা চিরকুট। হতাশ হয়েও আহমদ মুসা ভাবল, একটা সাদা কাগজকে এভাবে সযত্নে ভাঁজ করে মানিব্যাগের গোপন পকেটে রাখা হবে কেন? একটা রহস্যের গন্ধ পেল আহমদ মুসা।
কাগজটি পকেটে পুরল আহমদ মুসা।
হঠাৎ পেছনে গাড়ির শব্দ পেয়ে ‘ডিজিপি মি. মাহির হারুন এত তাড়াতাড়ি এসে পড়লেন’-এই বিস্ময় নিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখল, ড. সাহাব নুরীর গাড়ি। গাড়িটি এসে দাঁড়িয়ে গেছে পেছনের সেই গাড়িটার কাছে।
গাড়ি থেকে নেমেছে ড. সাহাব নুরী ও ড. আজদা। যন্ত্রচালিতের মত তারা আসছে আহমদ মুসার দিকে। আনন্দ-বিস্ময় যেন ফেটে পড়ছে তাদের চোখ–মুখ দিয়ে।
ওরা এসে গেছে।
কোন কথা না বলে আহমদ মুসাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল ড. সাহাব নুরী।
আর পাশে দাঁড়ানো ড. আজদার দু’চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিল। আর ঠোঁটে ছিল হাসি।
আহমদ মুসা ড. সাহাব নুরীকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘খুশির সময় এ কান্না কেন?
‘কান্না এটা নয়, অপার বিস্ময় ও সীমাহীন আনন্দের গলিত রূপ এটা।’ বলল ড. সাহাব নুরী।
‘আল্লাহর জন্যেই এ কৃতজ্ঞতার অশ্রু ভাইয়া। আপনি জীবিত আছেন, জীবন্ত আপনাকে দেখতে পাব, এটা ছিল সব হিসেব, সব কল্পনার অতীত।’ চোখ মুছে বলল ড. আজদা।
‘কিন্তু তোমরা গাড়ি নিয়ে ফিরে এলে কেন, কোন হিসেব থেকে? এমনটা তো হবার কথাই নয়?’ বলল আহমদ মুসা। তার কণ্ঠে বিস্ময়।
হাসল একটু ড. আজদা। বলল, ‘আমি উত্তর দিচ্ছি। আমার সাথে একটু আসুন ভাইয়া, প্লিজ!’
বলে পেছন ফিরে তাদের গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল ড. আজদা।
ড. সাহাব নুরীর দিকে একবার তাকিয়ে ড. আজদার পেছনে হাঁটতে শুরু করল আহমদ মুসা।
ড. সাহাব নুরীও হাঁটতে লাগল আহমদ মুসার পেছনে।
গাড়ির পাশে গিয়ে দাঁড়াল আহমদ মুসা ও ড. আজদা। তাদের পেছনে ড. সাহাব নুরী।
গাড়ির জানালা খোলা।
গাড়ির সীটে বসে দু’হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদছে সাহিবা সাবিত। কান্নার বেগে কাঁপছে তার শরীর। নীরব কান্না।
আহমদ মুসা তাকাল ড. আজদার দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে।
‘সাহিবাই আমাদের এখানে ফিরে আসতে বাধ্য করেছে ভাইয়া। গোলা-গুলির শব্দ শোনার সাথে সাথে সে গাড়ি ঘুরিয়ে এখানে আসতে বলে। আপনার নির্দেশের কথা বলে মামা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সাহিবা বলে, গাড়ি যদি ফিরিয়ে না আনা হয়, তাহলে সে হেঁটে হলেও এখানে আসবে। এখানে এসে আমরা কি করব, এর উত্তরে সে বলে, কিছু না পারলে আমরা তার সাথে মরতে তো পারব। আমিও তার কথায় একমত হই এবং আমরা ফিরে আসি। ফিরে আসার সময় সে শক্ত ছিল। কিন্তু এখানে এসে আপনাকে নিরাপদে দেখে সে এভাবে কান্নায় ভেঙে পড়েছে। এটা সুখের কান্না, স্বস্তির কান্না ভাইয়া।’ বলল ড. আজদা। তার মুখে হাসি।
কিন্তু আহমদ মুসার মুখে অস্বস্তির একটা ছায়া খেলে গেল। নিছক আনন্দের কান্না এত দীর্ঘ হয় না, এত গভীর হয় না। গোলা-গুলিতে সে নিশ্চয় আহমদ মুসাকে মৃত ভেবেছিল। তাই মরার জন্যেই সে এসেছিল এখানে। কিন্তু আহমদ মুসাকে নিরাপদ দেখে আকস্মিকভাবে কল্পনাতীত কোন প্রাপ্তি পাওয়ার আনন্দের বাঁধভাঙা জোয়ার নিয়ে হৃদয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, যা তার বুক ধারণ করতে পারছে না। সে আনন্দময় এক বেদনা। সে বেদনারই কান্না এটা। মনে মনে উদ্বিগ্ন হলো আহমদ মুসা। এ কান্না শুধু সাহিবা সাবিতের নয়, এ কান্না নতুনভাবে প্রস্ফুটিত এক হৃদয়ের কান্না, যার পরিচয় সাহিবা নিজেও হয়তো জানে না। মনটা কেঁপে উঠল আহমদ মুসার। ভাবল, বাঁচাতে হবে সাহিবা সাবিতকে।
ড. আজদার কথা শেষ হলে ড. আজদার হাসির সাথে আহমদ মুসাও হাসল। বলল একটু উচ্চকণ্ঠে, ‘ছোট বোনরা বড় ভাইয়াদের সব সময় একটু বেশি ভালোবাসে। সাহিবা সাবিত এটাই প্রমাণ করেছে ড. আজদা। আজ সকালেই আমি আমার স্ত্রীকে বলেছি, ড. আজদার পর আরও একটা মিষ্টি ছোট বোন পেয়েছি আমি।’
বলে আহমদ মুসা টান দিয়ে গাড়ির দরজা খুলে ফেলল। বলল, ‘সাহিবা বোন, এস। বাইরে এস।’
ধীরে ধীরে মুখ তুলল সাহিবা সাবিত।
অশ্রু ধোয়া তার কোমল, সুন্দর মুখটি।
চোখ তুলে তাকিয়েছে সে আহমদ মুসার দিকে। কিন্তু তার চোখে আহমদ মুসার সম্বোধনের প্রতি কোন সাড়া নেই। চোখ দু’টিতে তার তীরবিদ্ধ হরিণীর মত বিস্ময় ও বেদনার বিস্ফোরণ।
চোখ দু’টি তার কিছুক্ষণ পলকহীন স্থির থাকার পর আস্তে বুজে গেল। মুখ ঘুরে গেল। মাথাটি আবার ঝুলে গেল তার দু’হাঁটুর ওপর।
আবার তার সেই কান্না।
ফুলে ফুলে উঠছে তার দেহ কান্নার বেগে।
ওর কাঁদা উচিত, ভাবল আহমদ মুসা। কিন্তু বিব্রত হয়ে পড়েছিল আহমদ মুসা এখন কি বলবে সে এই ভেবে।
গাড়ির শব্দ শোনা গেল। সেই সাথে পুলিশের গাড়ির সাইরেন।
একাধিক গাড়ির জমাট একটা শব্দ।
‘পুলিশ এসে গেছে ভাইয়া। কেমন করে খবর পেল ওরা?’ বলল ড. আজদা।
বিব্রতকর অবস্থা কেটে গেল আহমদ মুসার। ফিরে দাঁড়াল সে। বলল, ‘পুলিশের ডিজিপি মাহির হারুনকে আমি টেলিফোন করেছিলাম।’
‘চল দেখি কে আসলেন?’ বলে হাঁটতে লাগল আহমদ মুসা।
সবাই এগোলো তার সাথে।
পুলিশ বহরের সামনের জীপেই ছিল ডিজিপি মাহির হারুন।
পুলিশের গাড়ি থামতেই নেমে পড়েছে ডিজিপি মাহির হারুন। আহমদ মুসাকে দেখতে পেয়েই দ্রুত হাঁটতে শুরু করেছে আহমদ মুসার দিকে।
‘স্যার, আসসালামু আলাইকুম। স্যার, টেলিফোনে সব কথা শুনে সংগে সংগেই রওয়ানা দিয়েছি। একটা বড় খবর আছে স্যার।’ উচ্চকণ্ঠে এই কথাগুলো বলে মুহূর্তের জন্যে থামল ডিজিপি মাহির হারুন।
মুহূর্ত পরেই আবার বলে উঠল, ‘আংকারা থেকে আমাদের হেডস্যার পুলিশ প্রধান আমাকে টেলিফোন করেছিলেন। স্যার, তিনি নির্দেশ দিয়েছেন আপনার নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার জন্যে এবং আরও বলেছেন, আপনাকে সবরকম সহায়তা দেয়ার জন্যে।’
একনাগাড়ে তার কথা বলা শেষ হলে চোখ তুলে তাকিয়েছে সে আহমদ মুসার দিকে। কিন্তু আহমদ মুসা তার মুখোমুখি হয়ে সালাম নিয়ে হ্যান্ডশেইক করে বলল, ‘আপনাদের পুলিশ প্রধানকে ধন্যবাদ। কিন্তু প্লিজ অফিসার, এ কথাগুলো আপনি গোপন রাখুন। শত্রুপক্ষ এসব না জানলে আমাদের কাজের সুবিধা হবে।’
পুলিশ অফিসার ডিজিপি মাহির হারুনের উৎসাহের আগুনে পানি ছিটানোর মত ব্যাপার ঘটল। অনেকটাই চুপসে গেল ডিজিপি মাহির হারুন। বলল, ‘বুঝেছি স্যার! এখনও কাউকে এসব কথা আমি বলিনি।’
‘ধন্যবাদ অফিসার। টেলিফোনে সব কথা সংক্ষেপে আপনাকে বলেছি। রেকর্ডের জন্যে লিখিত চাইলে, সেটাও আমি দেব। আপনি এদিকটা দেখুন। আমাকে ফিরতে হবে এখনি। এদের ওপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘অবশ্যই স্যার। আপনি ওদের নিয়ে যান। পুলিশের একটা গাড়ি আপনাদের সাথে পাঠাচ্ছি আপনার নিরাপত্তার জন্যে।’ ডিজিপি মাহির হারুন বলল।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘ধন্যবাদ অফিসার। পুলিশ প্রটেকশন দরকার নেই। সাথে আমাদের আল্লাহর প্রটেকশন আছে। চলি।’
আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে ড. সাহাব নুরীদের বলল, ‘আসুন আমরা চলি।’
নতুন বিস্ময়ের ধাক্কা তখন ড. আজদা ও ড. সাহাব নুরীর চোখে। ডিজিপির কথা তারা শুনেছে। তুরস্কের পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন তাদের আবু আহমদ আব্দুল্লাহর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে! আসলেই কে তাদের এই আবু আহমদ আব্দুল্লাহ!
আহমদ মুসার আহ্বান পেয়ে আহমদ মুসার পেছনে হাঁটতে শুরু করেছে তারা।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now