বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ৪ বাকি অংশ

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X আহমদ মুসার ঠোঁটে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। বলল ড. মাহজুন মাজহারের দিকে চেয়ে, ‘স্যার, আপনাদের মিউজিয়ামের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা মিউজিয়ামের কতটা কভার করে?’ ‘মিউজিয়ামের সবটা কভার করে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। এমনকি কম্পাউন্ডের ভেতর যে কয়জন স্টাফ বাস করেন, তাদের এলাকাও ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার চোখের আওতায় রয়েছে।’ বলল ড. মাহজুন মাজহার। ‘ধন্যবাদ, আপনার অফিস কক্ষ ও মিউজিয়ামের মাউন্ট আরারাত সেকশনের বাইরের দরজা এলাকা এবং ভেতরের অবস্থান কি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার চোখে রয়েছে?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা। ‘জ্বি, সবটাই ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার আওতায়।’ বলল ড. মাহজুন মাজহার। ‘ধন্যবাদ স্যার’ বলে আহমদ মুসা তাকাল ডিজিপি মাহির হারুনের দিকে। বলল, ‘আমি বলছি, শুনুন প্লিজ। ভ্যান মিউজিয়ামের রেক্টর ড. মাহজুন মাজহার প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে তার তর্জনী দিয়ে ডিজিটাল কী’তে নক করে দরজা খোলেন এবং প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে একইভাবে ডিজিটাল লকের কী’তে তর্জনী দিয়ে নক করে দরজা বন্ধ করেন। প্রতিদিনই ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার চোখ নিখুঁতভাবে প্রত্যক্ষ করে এবং সে নিখুঁত ছবিটি পাঠিয়ে দেয় সিকিউরিটি কক্ষের স্ক্রীনে। যারা সেখানে বসেন, তারা এটা প্রত্যক্ষ করেন এবং ছবিগুলো সিরিয়াসলি সংরক্ষিত হয় ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার আর্কাইভ ফাইলে। সিকিউরিটি রুমে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ডিসপ্লে স্ক্রীন যারা দেখেন, তারা ইচ্ছা করলে ড. মাহজুন মাজহার তর্জনী দিয়ে অফিস কক্ষ ও মাউন্ট আরারাত সেকশনের ডিজিটাল লকের যে নব বা কীগুলোতে নক করেন, তা মুখস্থ করে ফেলতে পারে। আবার প্রতিদিনের যে ছবিগুলো ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার আর্কাইভে জমা হয়, তা থেকেও ইচ্ছা করলে কেউ সংশ্লিষ্ট ছবিগুলো সংগ্রহের মাধ্যমে ড. মাহজুন মাজহারের অফিস কক্ষ ও মাউন্ট আরারাত সেকশনের ডিজিটাল লকের ওপেনিং ও ক্লোজিং কোড নাম্বার করায়ত্ত্ব করতে পারে। যারা পরিকল্পনা করে ভ্যান মিউজিয়ামে রক্তাক্ত হানা দেয়ার কাজ করেছে, তারা এই দুই উৎস থেকে ডিজিটাল লক দু’টোর ওপেনিং ও ক্লোজিং কোড নাম্বার জোগাড় করতে অবশ্যই পারে। সিকিউরিটি সিস্টেমে এই লুক হোলস থাকার পর ড. মাহজুন মাজহারকে দোষ দেবার কোন সুযোগ নেই।’ থামল আহমদ মুসা। ডিজিপি মাহির হারুন দুই চোখ ছানাবড়া করে তাকিয়ে আছে আহমদ মুসার দিকে। তার মনে তোলপাড়। সত্যি তো, এ দিকটা তো তারা বিবেচনা করে দেখেনি। ডিজিটাল লক দু’টির সিক্রেট কোড এই দুই পথে ফাঁস হওয়া যতটা সহজ, ড. মাহজুন মাজহারকে দোষী বানানো ততটাই কঠিন। তার মন খুশি হয়ে গেল। সে বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘স্যার, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনি চিন্তার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ খুলে দিয়েছেন। সত্যি বলেছেন, সিকিউরিটি সিস্টেমে এই লুক হোলস থাকার পর ড. মাহজুন মাজহারকে কিছুতেই দায়ী করার সুযোগ নেই।’ বলেই ডিজিপি মাহির হারুন পেছন ফিরে ভ্যান শহরের ডাইরেক্টর অব পুলিশ (ডিপি) আফেনদি আফেটকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তুমি ভ্যান মিউজিয়ামের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার মনিটরিং কক্ষসহ গোটা সিকিউরিটি অফিসে গত ছয় মাসে সিভিলিয়ান যারা প্রবেশ করেছেন, তার সব ফিল্ম সিজ করো। আর ক্লোজ সার্কিট নেটওয়ার্কের ফিল্ম আর্কাইভও তুমি বাজেয়াপ্ত করো। তারপর সিরিয়াসলি পরীক্ষা করে দেখ, কোন অংশ খোয়া গেছে কিনা, খোয়া গেলে খোয়া যাওয়া অংশটা কি?’ কথা শেষ করে ঘুরে বসল ডিজিপি মাহির হারুন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে ড. মাহজুন মাজহারকে লক্ষ্য করে বলল, ‘আমাদের মাফ করুন স্যার। আপনাকে এভাবে হয়রানি করার জন্যে দুঃখিত আমরা। এই সাথে আমরা শুকরিয়া আদায় করছি আমাদের সম্মানিত অতিথি খালেদ খাকানকে। তিনি আমাদের যে সহযোগিতা করেছেন তা অমূল্য। আর তিনি শুধু আমাদের কেন, সমগ্র তুরস্কের সম্মানিত বন্ধু। খোদ আমাদের প্রেসিডেন্ট তাকে অভিনন্দিত ও সম্মানিত করেছেন। আমরা আনন্দিত যে, আল্লাহ তাকে এখানে এনেছেন। আমাদের আশা, তার সবরকম সাহায্য-সহযোগিতা আমরা পাব।’ থামল ডিজিপি মাহির হারুন। ‘ধন্যবাদ অফিসার, এটা কোন হয়রানি নয়। আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন। রক্তাক্ত ও রহস্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে আমার প্রতিষ্ঠানে। আপনারা যা করেছেন, করছেন সবই আমাদের প্রতিষ্ঠান ও দেশকে সাহায্যের জন্যেই। আমার সম্মানিত অতিথি আবু আহমদ আব্দুল্লাহকে ধন্যবাদ দেবার কোন ভাষা আমার জানা নেই। প্রেসিডেন্ট যাকে অভিনন্দিত করেন, যার প্রশংসা করেন, তার ব্যাপারে আমি আর কি বলব। তিনি আমাকে বিস্মিত, অভিভূত করেছেন। আমি ধন্যবাদ দিচ্ছি ড. সাহাব নুরী ও ড. আজদাকে। তারাই এই সম্মানিত মেহমানকে এখানে এনেছিলেন। আমি মনে করি, এই রক্তাক্ত ঘটনার ব্যাপারে তার যে দূরদৃষ্টি ও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ দেখলাম, তাতে আমি নই, পুরো দেশই উপকৃত হবে। আল্লাহ তাকে এবং আমাদের সবাইকে সাহায্য করুন।’ থামল ড. মাহজুন মাজহার। ড. সাহাব নুরী ও ড. আজদার চোখে-মুখে গর্ব ও আনন্দের মিশ্রণ। আর তরূণী সাহিবা সাবিতের সুন্দর মুখ অপার মুগ্ধতায় আরও অপরুপ হয়ে উঠেছে। অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা তার মুগ্ধ দৃষ্টি থেকে শ্রদ্ধা, সম্মানের যেন বন্যা ছুটছে আহমদ মুসার প্রতি। উজাড় করে দিচ্ছে যেন তার হৃদয়কে। নির্বাক সে। ‘দুঃখিত, ঘটনা যা নয় তা বলা সুবিচার নয়, বিব্রতকর। আমি যদি উল্লেখযোগ্য কিছু করে থাকি, বলে থাকি, তার সব কৃতিত্বই আল্লাহর, আমার স্রষ্টার। আমাদের জ্ঞান, বুদ্ধি, মেধা, শক্তি যাকে আমাদের বলি, তা আমাদের নয়, আল্লাহর দেয়া। সুতরাং প্রশংসা আমাদের তাঁরই করা উচিত।’ বলল আহমদ মুসা। ‘ধন্যবাদ স্যার, এটাও আমাদের জন্যে বড় শিক্ষা। মনে রাখব স্যার। আমরা উঠি।’ বলে উঠে দাঁড়াল ডিজিপি মাহির হারুন। তারপর আহমদ মুসার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে হ্যান্ডশেইক করতে করতে বলল, ‘স্যার, আমার অফিসে, আমার বাড়িতে আপনাকে ওয়েলকাম। আর আপনার সাথে যোগাযোগ রাখার অনুমতি দিন স্যার।’ ‘ধন্যবাদ অফিসার! ড. আজদার কাছে আমার টেলিফোন নাম্বার পাবেন। আর আমার চেয়ে আপনাকেই আমার বেশি দরকার হতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘সে হবে আমার সৌভাগ্য স্যার।’ বলে সালাম দিয়ে ডিজিপি মাহির হারুন ঘুরে দাঁড়াল যাবার জন্যে। ড. আজদা তাড়াতাড়ি উঠে এসে আহমদ মুসার টেলিফোন নাম্বার লেখা একটা স্লীপ ডিজিপি মাহির হারুনের হাতে তুলে দিল। ধন্যবাদ ড. আজদা।’ কাগজটি হাতে নিয়ে বলল ডিজিপি মাহির হারুন। পুলিশ অফিসাররা বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। ‘সাহাব, আজদা তোমাদের নাস্তা করা হয়নি নিশ্চয়? তোমরা তো খুব সকালে বেরিয়েছ।’ পুলিশ অফিসাররা বেরিয়ে যেতেই বলল ড. মাহজুন মাজহার। ‘ঠিক, নাস্তার কথা আমাদের খেয়ালই হয়নি। তবে এ নিয়ে ব্যস্ত হবেন না।’ বলল ড. সাহাব নুরী সপ্রতিভ কণ্ঠে। ‘আমরাও নাস্তা করিনি। ঠিক আছে, চল ওপরে যাই।’ বলল ড. মাহজুন মাজহার। ‘নাস্তা তৈরি হচ্ছে বাবা। আমি একবার ওপরে গিয়ে দেখে এসেছি।’ বলল সাহিবা সাবিত। আহমদ মুসা বলল, ‘নাস্তার তুর্কি সময় এখনও হয়নি। ৯টা বাজতে এখনও অনেক সময় বাকি। আমি কাগজ পড়া শেষ করতে পারিনি।’ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ড. মাহজুন মাজহার বলল, ‘হ্যাঁ, ঠিক তাই। ৯টা বাজতে এখনও আধা ঘণ্টা বাকি।’ থামল একটু, আবার বল সাহিবা সাবিতের দিকে তাকিয়ে, ‘মা, ওকে স্টাডিতে নিয়ে যাও। আমরা আসছি। একসাথে নাস্তা করব।’ সাহিবা সাবিত খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে কয়েক ধাপ আহমদ মুসার দিকে এগিয়ে বলল, ‘স্যার, আসুন।’ আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। দু’জন এগোতে শুরু করেছে দু’তলায় উঠার সিঁড়ির দিকে। ড. আজদা ডাকল সাহিবা সাবিতকে। ‘এক্সকিউজ মি!’ বলে ছুটে এল সাহিবা সাবিত ড. আজদার কাছে। ড. আজদা তাকে কানে কানে কিছু বলল, ‘রাঙা’ হয়ে গেল সাহিবা সাবিতের মুখ। ‘ওকে!’ বলে ছুটেই আবার ফিরে গেল আহমদ মুসার কাছে। দু’জনে আবার হাঁটতে লাগল সিঁড়ির দিকে। সামনে হাঁটছে সাহিবা সাবিত। ঘাড় ফিরিয়ে সাহিবা সাবিত বলল, ‘স্যার, একটা কথা বলি?’ ‘বলুন।’ বলল আহমদ মুসা। ‘বাঃ আবার আপনিতে উঠলাম! তখন স্টাডিতেই তো আমাকে তুমিতে নামিয়েছেন।’ বলল সাহিবা সাবিত। তার ‍মুখে দুষ্টুমির হাসি। ‘বলেছি নাকি! ঠিক আছে, কি বলবে বল।’ নির্বিকার কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা। ‘আমি বলতে চাচ্ছি, বিশ্ববিখ্যাত চরিত্র ‘শার্লক হোমস’, ‘রবিনহুড’ যেমন তাদের আসল নাম নয়, তেমনি ‘আবু আহমদ আব্দুল্লাহ’ ও ‘খালেদ খাকান’ কোনটাই আপনার আসল নাম নয়!’ সাহিবা সাবিত বলল। ‘‘শার্লক হোমস’ ও ‘রবিনহুড’ সেই লোকদের আসল নাম ছিল কিনা আমি জানি না। কিন্তু আমাকে তোমার সন্দেহ হওয়ার কারণ?’ বলল আহমদ মুসা। তার চোখে কিছুটা বিস্ময়। ‘ডিজিপি সাহেব আপনার নাম বললেন খালেদ খাকান, আর আমাদের কাছে আপনার নাম আবু আহমদ আব্দুল্লাহ। তার মানে, তুরস্কের ওমাথা থেকে এমাথায় এসেই আপনি নাম পাল্টেছেন তাহলে ওমাথাতেও আপনি নাম পাল্টেছেন?’ সাহিবা সাবিত বলল। ‘চমৎকার যুক্তি দিয়েছ সাহিবা সাবিত। তোমার ওকালতি পড়া দরকার ছিল।’ বলল আহমদ মুসা। তার মুখে এবার স্পষ্ট হাসি। ‘কথা অন্য দিকে ঘোরাবেন না প্লিজ স্যার, আমার কথার জবাব দিন।’ সাহিবা সাবিত বলল। ‘তুমি একটা জটিল প্রশ্ন করেছ। প্রশ্নটির ‍উত্তর দেয়া এখন সম্ভব নয়।’ বলল আহমদ মুসা। ‘জটিল প্রশ্ন? আসল নাম বলা জটিল হবে কেন? আমি এ যুক্তি মানছি না।’ সাহিবা সাবিত বলল। হালকা জেদ ফুটে উঠল সাহিবা সাবিতের কণ্ঠে। ‘জটিলতা আছে। অনেক সময় নানা কারণে নাম গোপন করতে হয়। মানে এটা তেমনই একটা সময়।’ বলল আহমদ মুসা। গম্ভীর কণ্ঠ তার। সাহিবা সাবিত পেছন দিকে ফিরে আহমদ মুসার দিকে তাকাল। আহমদ মুসাকে বোঝার চেষ্টা করছে যেন। ‘ঠিক আছে, এই সময়ের জন্যে মানলাম, সব সময়ের জন্যে নয়।’ সাহিবা সাবিত বলল। তার মুখে হাসি। তারা স্টাডি রুমে পৌঁছে গিয়েছিল। আহমদ মুসা তার আগের চেয়ারেই বসল। ‘স্যার, আপনি একটু বসুন, আমি আসছি।’ বলে ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে সাহিবা সাবিত। আহমদ মুসা ‘ভ্যান টাইম’ আগেই পড়েছিল। এবার ভ্যানের আরেকটি বড় পত্রিকা ‘ভ্যান-এক্সপ্লোরার’ টেনে নিয়ে তাতে মনোযোগ দিল। একসময় ঘরে পায়ের শব্দে মুখ তুলল আহমদ মুসা। দেখল সাহিবা সাবিতকে নতুন রূপে। পরনে হালকা সবুজ সালওয়ার এবং সেই হালকা সবুজ ফুলহাতা কামিজ। একই রঙের ওড়না মাথা ও গায়ে পেঁচানো। নতুন পোশাকের ওপর আহমদ মুসার চোখ আটকে গিয়েছিল। ‘স্যার কেমন লাগছে বলুন।’ মুখ ভরা হাসি নিয়ে বলল সাহিবা সাবিত। ‘একজন মুসলিম মেয়ের মত লাগছে।’ বলল আহমদ মুসা গম্ভীর কণ্ঠে। ‘তার মানে, আগে আমি মুসলিম মেয়ে ছিলাম না?’ বলল সাহিবা সাবিত প্রতিবাদের কণ্ঠে। ‘তুমি মুসলিম ছিলে, কিন্তু মুসলিমের মেয়ে ছিলে না।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ইসলামের কি কোন কম্পালসারি ড্রেসকোড আছে?’ জিজ্ঞাসা সাহিবা সাবিতের। সে আহমদ মুসার মুখোমুখি এসে বসেছে। ‘‘ড্রেস কোড’ বলতে অনেকটা ইউনিফর্ম ড্রেস বোঝায়। সে রকম কোন ড্রেস কোড ইসলামে নেই। ইসলাম একটা প্রিন্সিপাল বলে দিয়েছে। বলেছে, মেয়েদের তাদের সৌন্দর্যের স্থানগুলোকে ঢেকে রাখতে হবে।’ বলল আহমদ মুসা। সাহিবা সাবিতের মুখটা একটু রাঙা হয়ে উঠল। একটু ভাবল। বলল, ‘এই হুকুম ছেলেদের ওপর নেই কেন?’ ‘ছেলেদের সম্পর্কেও বলা হয়েছে। তাদের পোশাক হাঁটুর ওপরে উঠতে পারবে না। তবে ‘সৌন্দর্যের স্থানগুলো ঢাকতে হবে’-এই ধরনের নির্দেশ ছেলেদের ক্ষেত্রে নেই।’ আহমদ মুসা বলল। ‘এই নির্দেশের কথাই আমি বলছি স্যার। এমন নির্দেশ মাত্র মেয়েদের ক্ষেত্রে আসবে কেন?’ বলল সাহিবা সাবিত। ‘এর পক্ষে অনেক যুক্তি, অনেক কথা আছে। আমি মাত্র একটা সহজ যুক্তির কথা বলব সাহিবা।’ বলে একটু থেমেই আবার বলা শুরু করল, ‘সুন্দর ও মূল্যবান জিনিস আড়াল করতে হয় অন্যের নজর থেকে। কারণ, অন্যের লোভ অনর্থের সৃষ্টি করতে পারে। মেয়েরা বা মেয়েদের সৌন্দর্য তেমনি একটা বস্তু যা আড়াল করতে হয়।’ ‘যুক্তিটা বুঝলাম স্যার। কিন্তু ছেলেদের সৌন্দর্য আড়াল করতে হবে না কেন? তা কি লোভের বস্তু নয়?’ বলল সাহিবা সাবিত। ‘তোমার প্রশ্ন খুবই সংগত সাহিবা সাবিত। কিন্তু সমস্যা হলো, পুরুষরা নিজেদের রক্ষা করতে পারে, মেয়েরা তাদের রক্ষা করতে পারে না। আরেকটা বড় বিষয় হলো, মেয়েরা এই বিষয়ে পুরুষদের ওপর আক্রমণাত্মক নয়। অন্যান্য জীবজগতেও দেখবে, এটাই সত্য। প্রকৃতিগতভাবেই মেয়ে প্রজাতি এই ক্ষেত্রে নন-এ্যাগ্রেসিভ, সংরক্ষণবাদী। অন্যদিকে এক্ষেত্রে পুরুষরা একেবারেই ‍উল্টো। নারীরা, নারীদের সৌন্দর্য পুরুষদের শুধু আক্রমণ নয়, ভায়োলেন্সেরও শিকার হয়। প্রাচীন, আধুনিক সব ইতিহাস এ ধরনের ঘটনায় ভরপুর। সুতরাং নারী ও নারীর সৌন্দর্য প্রয়োজন অনুযায়ী আড়াল করা তাদের এবং সমাজের জন্যে কল্যাণকর।’ বলল আহমদ মুসা। ‘আপনার সব যুক্তি মানলাম স্যার। কিন্তু সব মানুষ খারাপ নয়, বরং বেশিরভাগই ভালো। ইতিহাস এরও সাক্ষী। তাহলে কিছু খারাপ লোকের কারণে মেয়েদের জন্যে এত আয়োজন করতে হবে কেন?’ সাহিবা সাবিত বলল। ‘নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে এমন ভালো মানুষ অনেক আছে, আবার অনেকে আছে যারা সুযোগ ও সাহসের অভাবে ভালো থাকে, কিন্তু শয়তান যেহেতু আছে, শয়তানী প্রবণতা থেকে কোন মানুষই মুক্ত নয়। এই কারণেই আল্লাহ সাবধান হওয়ার বিধানকে সাধারণ করে দিয়েছেন। এ বিধানের যৌক্তিকতার আরেকটা দৃষ্টান্ত দেখ, চোর সমাজের ক’জন, অপরাধী সমাজের ক’জন, কিন্তু দেখ, সাধারণভাবে সবার জন্যে আইন তৈরি হয়েছে। আইন সবাইকেই পাহারা দেয়। মেয়েদের সৌন্দর্য আড়ালের ব্যাপারটাও এরকমই।’ আহমদ মুসা কথা শেষ করল। কিন্তু কোন কথা এল না সাহিবা সাবিতের কাছ থেকে। ভাবছিল সে। তার চঞ্চল চোখ দু’টিতে অনেক প্রশ্ন। বলল, ‘স্যার, আপনি যা আমাকে বললেন, আমার ২৪ বছর বয়সে, আমার বাবা তা আমাকে বলেননি কেন? আমার বাবার মত লাখো বাবা তো এটা বলেন না! কেন বলেন না? জ্ঞান-শিক্ষায় তারা তো সমাজের শীর্ষে!’ ‘সাহিবা সাবিত, বিষয়টা বুঝতে সমাজ-সভ্যতার গভীরে আমাদের প্রবেশ করতে হবে। সভ্যতা-সংস্কৃতির একটা চরিত্র আছে। যে জাতি রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে যখন শীর্ষে পৌঁছে, তখন চারপাশে অন্যজাতির ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তার রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তখন আধিপত্যের অধীন জাতিগুলোর জীবনে আধিপত্যকারীদের শিক্ষা-সংস্কৃতিই প্রভাবশীল হয়ে থাকে। সেটাই হয়েছে আমাদের জীবনে, মুসলিম দেশগুলোতে। এটা আধিপত্যবাদী শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রবল স্রোত। এই স্রোতেই ভেসে যাচ্ছে সবাই। এককভাবে বাবাদের কোন দোষ নেই।’ আহমদ মুসা বলল। ‘স্রোত আপনাকে ভাসাতে পারেনি কেন?’ জিজ্ঞাসা সাহিবা সাবিতের। ‘চাইনি বলে।’ আহমদ মুসা বলল। সাহিবা কিছু বলতে যাচ্ছিল। স্টাডিতে প্রবেশ করল ড. আজদা। বলল, ‘নাস্তা রেডি। সবাই নাস্তার টেবিলে গেছে।’ ‘চলুন স্যার।’ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে সাহিবা সাবিত তাড়া দিল আহমদ মুসাকে। নাস্তার টেবিলে সবাই বসল। সাহিবা সাবিতের দিকে তাকিয়ে ড. মাহজুন মাজহার কিছুটা বিস্ময় নিয়ে বলল, ‘সাহিবা সাবিত মা, জন্মের পর এই প্রথম তোমাকে এই পোশাকে দেখলাম। হঠাৎ এই পোশাক?’ ‘বাবা, আমি মুসলিম মেয়ে হয়েছি। দেড় দু’ঘন্টায় বাবা আমি স্যারের কাছে অনেক কিছু শিখেছি। আরও শিখতে চাই বাবা।’ বলল সাহিবা সাবিত। ‘ধন্যবাদ মা। আমি ও তোমার মা একসাথে তোমাকে নিয়ে এই ধরনের কয়েক সেট পোশাক তৈরি করে দিয়েছিলাম। বোধহয় পোশাকগুলো পরাই হয়নি।’ বলল মাহজুন মাজহার। ‘হ্যাঁ, বাবা তখন পোশাক তৈরি হয়েছিল, কিন্তু মন তৈরি হয়নি।’ হেসে বলল সাহিবা সাবিত। ড. মাহজুন মাজহারের ঠোঁটেও মিষ্টি হাসি। বলল, ‘মনটা তৈরি হলো কখন মা?’ ‘আজদা কিছুক্ষণ আগে আমাকে বলল, আমাদের মেহমান এ ধরনের পোশাক পছন্দ করেন না, আর এ পোশাক পরেই তুমি তার সামনে ঘুরছ। আমি ওকে নিয়ে ওপরে এলাম। এসেই পোশাক পাল্টে ফেললাম। কিন্তু মনটা পাল্টে দিয়েছেন উনি।’ বলল সাহিবা সাবিত। তার মুখে আবেগ-রাঙা হাসি। ‘পাল্টে দিয়েছেন? মন কি দু’এক মিনিটে পাল্টাবার জিনিস?’ বলল ড. আজদা। তার ঠোঁটে দুষ্টুমির হাসি। মনে হয় ঠোঁটের পেছনে যেন আরও কথা আছে। ‘কি বল আজদা! এক পলকের দেখা, একটা কথাতেও মনে ওলট-পালট ঘটে যেতে পারে।’ সাহিবা সাবিত বলল। ড. আজদা কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল। কিন্তু তার আগেই ড. মাহজুন মাজহার বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ, এটাই হোক। মনে হচ্ছে, আমার মনের একটা অব্যক্ত চাওয়া যেন পূরণ হলো। এ চাওয়াটা আমার কাছেও যেন খুব স্পষ্ট ছিল না। আজ তোমাকে এই সুন্দর পোশাকে দেখে মনটা যখন আমার খুশিতে ভরে গেছে, তখন বুঝতে পারছি, আমার মন এটাই চাইতো।’ ‘ধন্যবাদ বাবা।’ বলল সাহিবা সাবিত। ‘ধন্যবাদ আমাকে নয় মা, কৃতজ্ঞ হও আবু আহমদ আব্দুল্লাহর কাছে। উনি যেন এক পরশমণি। ওনার পরশে ঘটনা পাল্টে যায়, মানুষও পাল্টে যায়।’ আহমদ মুসার চোখে-মুখে অস্বস্তি। বলল, ‘গরম সুন্দর নাস্তা কিন্তু আমরা নষ্ট করে ফেলছি।’ ‘স্যরি, ঠিক বলেছেন জনাব আব্দুল্লাহ। আসুন আমরা শুরু করি।’ বলেই প্লেট টেনে নিয়ে কাঁটা চামচ হাতে নিল ড. মাহজুন মাজহার। সবাই নাস্তার দিকে মনোযোগ দিল। নাস্তা শেষে সবাই কফি খাচ্ছে ড্রইং রুমে সোফায় ফিরে গিয়ে। ড. আজদা চারদিকে চাইল। দেখল, সাহিবা সাবিত নেই। কফি তো নিল সে। কোথায় গেল কফি নিয়ে? কফি হাতে নিয়েই খুঁজতে বেরুল সাহিবা সাবিতকে ড. আজদা। সাহিবা সাবিতকে পেল ড. আজদা ড্রইং রুমের পাশের একটা ঘরে। সাহিবা সাবিতের হাতে ক্যামেরা। কফিটা তার ঠাণ্ডা হচ্ছে ঘরের একটা টেবিলে। ‘তোর হাতে এ সময়ে ক্যামেরা! ক্যামেরা নিয়ে কি করছিস?’ ড. আজদা বলল। ‘তোমাদের মেহমান, বাবার পরশমণির কয়েকটা ছবি নিলাম এই জানালা দিয়ে। প্লিজ, তুমি ওকে কিছু বলো না।’ বলল সাহিবা সাবিত। জানালার দিকে এগিয়ে ড. আজদা দেখল, সত্যিই জানালা দিয়ে আহমদ মুসাকে সম্মুখ থেকে দেখা যাচ্ছে। ফিরে দাঁড়াল ড. আজদা সাহিবা সাবিতের দিকে। বিস্ময় তার চোখে। বলল, ‘কি সাহিবা, পরশমণি স্পর্শ করে ফেলল নাকি!’ ‘বিদ্রূপ করো না আজদা। এই স্পর্শ আমার মত মেয়েদের সারা জীবনের চাওয়া হতে পারে।’ বলল সাহিবা সাবিত। তার কণ্ঠ গম্ভীর, আবেগে ভারি। ড. আজদা দু’ধাপ এগিয়ে সাহিবা সাবিতের কাঁধে হাত রেখে দরদভরা কণ্ঠে বলল, ‘আমি বিদ্রূপ করিনি সাহিবা, আমার কথা তুমি বুঝেছ?’ সাহিবা সাবিত জড়িয়ে ধরল ড. আজদাকে। বলল, ‘এসব কথা থাক। চল ড্রইংয়ে যাই। আমাদের আসাটা ‘অড’ হয়ে গেছে।’ ড. আজদা ও সাহিবা চলল ড্রইংয়ের দিকে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৩১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ৭ বাকি অংশ (শেষ)
→ মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ৬ বাকি অংশ
→ মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ৫ বাকি অংশ
→ মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ৪ বাকি অংশ
→ মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ৩ বাকি অংশ
→ মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ২ বাকি অংশ
→ মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ১ বাকি অংশ

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now