বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
১
আহমদ মুসা ও সাতজন কমান্ডো এক এক করে অ্যান্টেনার খোলা বেজ মুখ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।
প্রথমেই পাথুরে সিঁড়ি।
সিঁড়ির সাত-আটটা ধাপ পেরুতেই একটা দরজার ল্যান্ডিং-এ গিয়ে তারা পৌঁছল।
দেখেই বোঝা গেল, সিঁড়িটা লিফটের আরেকটা দরজা।
দরজাটা পাথরের।
দরজা খোলার চিন্তায় আহমদ মুসা দরজা ও দরজার চারপাশের চৌকাঠের মতো প্রান্তের ওপর চোখ বোলাতে লাগল।
ডান ও বাম পাশের দুই চৌকাঠে ভার্টিক্যালি লম্বা দু’টি করে বাটন দেখতে পেল আহমদ মুসা।
দু’পাশের দু’বাটনেই হিব্রু ভাষায় ওপেন ক্লোজ লেখা। কিন্তু দু’পাশের বাটনের লেখা এক রকমের নয়।
বাঁ পাশের চৌকাঠের লেখা সোজা মানে ওপেন শব্দ ডান দিক থেকে লেখা এবং ক্লোজ শব্দ বাঁ দিক থেকে লেখা, কিন্তু ডান দিকের চৌকাঠে শব্দ দু’টি বাঁ দিক থেকে লেখা।
পেছনে দাঁড়ানো কমান্ডো নেতা মুরাদ আনোয়ারের দিকে ফিরে তাকিয়ে আহমদ মুসা বলল, ‘মনে হচ্ছে মুরাদ আনোয়ার, একটা ধাঁধা না ভাঙতে পারলে আমরা দরজা খুলতে পারবো না।’
মুরাদ এগিয়ে এল।
দেখল দুই চৌকাঠের চারটি বাটনকে ও বাটনের লেখাগুলোকে।
ভাবনার ছায়া নামল মুরাদ আনোয়ারের মুখে। ভাবছিল আহমদ মুসাও।
কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দে কাটল।
‘কিছু ভেবে পেলে মুরাদ আনোয়ার?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘ধাঁধায় ফেলার জন্যে ‘ওপেন’ শব্দ সোজা আর উল্টো করে দু’বার লিখেছে। আমার মনে হয়, দুই ‘ওপেন’ বাটনের একটা চাপলেই আমাদের চাওয়াটা পেয়ে যাব মানে দরজা খুলে যাবে।’
‘চাপ দাও, মুরাদ আনোয়ার।’ বলল আহমদ মুসা।
মুরাদ আনোয়ার দুই ওপেন বাটনই পরপর নানাভাবে চাপল, কিন্তু পাথরের দরজা যেমন ছিল, তেমনি থাকল।
মুরাদ আনোয়ারের চোখে-মুখে হতাশা ফুটে উঠল। বলল, ‘তার মানে ধাঁধার অর্থ এটা নয়। নিশ্চয় আরও জটিল কিছু আছে।’ বলেই হঠাৎ থেমে গেল মুরাদ আনোয়ার। তার চোখে-মুখে নতুন ভাবনার আলো। বলল, ‘দু’পাশের দুই ‘ওপেন’-এ চাপ দেয়ার পর গোপন আরও একটা কমান্ড নিশ্চয় আছে। সেটা খুঁজে বের করতে হবে।’
আহমদ মুসা ভাবছিল।
হঠাৎ তার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দু’পাশের চৌকাঠের বাটন চারটির ওপর আরও একবার দ্রুত চোখ বুলিয়ে বলল, ‘না, মুরাদ আনোয়ার, তার মনে হয় দরকার হবে না। খুব সহজ একটা গাণিতিক নিয়ম রয়েছে ধাঁধার পেছনে। দেখ, ‘ক্লোজ’ শব্দ দু’টিই মাইনাস পজিশনে রয়েছে। মাইনাসে মাইনাসে প্লাস। তার মানে, ক্লোজ শব্দের বাটন দু’টি একসাথে চাপলেই দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। আর দেখ, ‘ওপেন’ বাটন দু’টির একটি প্লাস, অন্যটি মাইনাস পজিশনে। প্লাসে-মাইনাসে মাইনাস। অতএব, ‘ওপেন’ বাটন দু’টি একসাথে চাপলেই আমি মনে করি দরজা খুলে যাবে। চেষ্টা কর মুরাদ আনোয়ার।’
বলে আহমদ মুসা রিভলভার ধরা ডান হাতটা প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে পেছনে দাঁড়ানো কমান্ডোদের দিকে একবার তাকাল।
বাটন দু’টি পুশ করতে এগিয়ে গেছে মুরাদ আনোয়ার।
লম্বা একটা ‘হিস’ শব্দ শুনে ঘুরে দাঁড়াতেই সামনের দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল সে। দেখল, দরজাটা হাওয়া। ওপার থেকে অর্ধডজন স্টেনগান হাঁ করে আছে তাদের দিকে। সবচেয়ে সংগীন অবস্থা মুরাদ আনোয়ারের। তার বুকে রিভলভার চেপে ধরে আছে একজন।
আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াতেই সে চিৎকার করে উঠল, ‘সবাই হাত ওপরে তোল। না হলে সবাই একসাথে লাশ হয়ে...।’
মুরাদ আনোয়ার আহমদ মুসার বাম দিকে চল্লিশ ডিগ্রী কোণে দাঁড়িয়েছিল। ফলে মুরাদ আনোয়ারের বুকে যে রিভলভার তাক করেছিল, তার বাম পাশ গোটাই আহমদ মুসার সামনে অবারিত।
লোকটি যখন হাত ওপরে তোলার নির্দেশ দিচ্ছিল, তখন পকেটের ভেতরে থাকা আহমদ মুসার রিভলভার উঠে এসেছিল লোকটির মাথা লক্ষ্যে।
কথা শেষ হবার আগেই আহমদ মুসার রিভলভারের গুলি লোকটির বাম কানের পাশ দিয়ে ঢুকে গেল তার মাথায়।
গুলিটা করেই আহমদ মুসা চিৎকার করে উঠল, ‘কমান্ডোজ, গেট চেঞ্জড।’
আহমদ মুসাও কাত হয়ে আছড়ে পড়েছিল মেঝেতে।
আহমদ মুসার আশংকাই সত্য হলো। আহমদ মুসার গুলি লোকটিকে হিট করার সাথে সাথেই ওদের ছয়টি স্টেনগান গর্জন করে উঠেছে।
আহমদ মুসার কমান্ড ছাড়াও ওদের স্টেনগান তাদের টার্গেট করা টের পেয়েছিল আহমদ মুসার সাথী কমান্ডোরা। আত্মরক্ষার জন্যে তারাও শুয়ে পড়েছিল। কিন্তু দেরি হয়ে গিয়েছিল। কমান্ডো নেতা মুরাদ আনোয়ারসহ কয়েকজনের দেহ ঝাঁঝরা হয়ে গেল। কাঁধে, পাঁজরে লেগে কয়েকজন আহত হলো।
মাটিতে শুয়ে পড়ার আগেই আহমদ মুসা পকেট থেকে রিভলভার বের করে নিয়েছিল এবং ওদের ছয়জনকে টার্গেট করে গুলি করাও শুরু করেছিল।
দু’জন কমান্ডো কাঁধে ও পাঁজরে গুলি খেলেও দুর্ধর্ষ কমান্ডোদের দু’জন মোহাম্মদ পাশা ও সোলেমান পাল্টা আঘাত হানতে মুহূর্ত দেরি করেনি। তার ফলেই শেষ রক্ষা হয়েছিল।
ওদের চারজনকে গুলি করতে করতেই আহমদ মুসার গুলি শেষ হয়ে গিয়েছিল। শেষ দু’জনকে হত্যা করেছিল মোহাম্মদ পাশা ও সোলেমান। তা না হলে নির্ঘাত ব্রাশফায়ারের মুখে পড়ে যেত আহমদ মুসা।
ওদের স্টেনগানধারী ছয়জনের রক্তের স্রোতের মধ্যে থেকে একজন মাথা তুলল। সে হাতের স্টেনগানটির ব্যারেল মরিয়া হয়ে একবার ওপরে তোলার চেষ্টা করল। পারল না। হাত থেকে খসে পড়ে গেল স্টেনগান। সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে সে বলল, ‘শয়তান, তোরা আমাদের নেতা, আমাদের বিজ্ঞানীদের ধরেছিস। কিন্তু তোদের উদ্দেশ্য সফল হবে না। আমাদের ‘নীরব’ ধ্বংসের দৈত্য ‘ডাবল ডি’ এবং আমাদের গবেষণা তোরা হাত করতে পারবি না। দেখ, আমাদের সুইসাইড স্কোয়াডের নেতা মাথায় গুলি খেয়ে মরলেও তার হাত তার গলায় ঝোলানো রিমোটের রেড বাটনকে প্রাণপণে চেপে ধরেছিল। মরে গেলেও দেখ চেপে ধরেই আছে। এখনি ডাবল ডি’র সবকিছুসহ গোটা গবেষণাগার ও এই কমপ্লেক্স ধূলো হয়ে যাবে। তার সাথে তোদেরও কবর হবে।’
শেষ কথার সাথে সাথে লোকটির মাথাটি নেতিয়ে পড়ল মেঝের ওপর।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়েছিল। দ্রুত কণ্ঠে বলল, ‘মোহাম্মদ, সোলেমান, কুইক, আমাদের এখনি বেরুতে হবে এখান থেকে। তবে আমাদের ভাইদের লাশ কি করে রেখে যাই! তোমরা দু’জন দু’জনকে টেনে নিতে পারবে কিনা? আমি দু’জনকে নিচ্ছি।’
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা দু’জনকে দুই কাঁধে তুলে নিয়ে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল।
পেছনে মোহাম্মদ পাশা ও সোলেমান দুই সাথীর লাশ টেনে নিয়ে উঠতে লাগল।
সুড়ঙ্গ-সিঁড়ির মুখ কমিউনিকেশন অ্যান্টেনার পথে আহমদ মুসা বেরিয়ে এল।
আহমদ মুসা সাহায্য করল আহত দু’কমান্ডো ভাইকে তাদের সাথীদের লাশ নিয়ে বেরিয়ে আসতে।
আহত দু’সাথী দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
‘দম নেবার সময় নেই প্রিয় কমান্ডো ভাইরা। যতটা দ্রুত সম্ভব, আমাদেরকে পাহাড়ের ওপরে উঠে যেতে হবে। এস।’
বলেই আহমদ মুসা দু’সাথীর লাশ আবার কাঁধে তুলে নিয়ে পাহাড়ের ওপরে এগোতে লাগল।
‘ভাববেন না ভাই, আমরা পারব আপনাকে ফলো করতে। চলুন।’ বলল মোহাম্মদ পাশা ও সোলেমান একসাথেই।
সুড়ঙ্গের সিঁড়ি মুখ থেকে বিশ গজের মতো এগিয়েছে আহমদ মুসারা।
সুড়ঙ্গের মুখ থেকে পনের গজ ওপরে একটা টিলার দেয়াল। সে দেয়াল পার হয়ে আহমদ মুসারা মাত্র পাঁচ গজ এগিয়েছিল। এই সময়ই প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ হলো। ভূমিকম্পের প্রবল ধাক্কা খাওয়ার মতো পাহাড়টাও প্রচণ্ডভাবে কেঁপে উঠল।
বড় কিছুর আশংকায় আহমদ মুসাদের চোখ আপনাতেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
মুহূর্তে কয়েকবার চিৎকার করে মোহাম্মদ পাশা বলল, ‘আল্লাহ আমাদের রক্ষা করেছেন খালেদ খাকান ভাই। আল্লাহর হাজার শুকরিয়া।’
‘আলহামদুলিল্লাহ!’ বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। ওদিকের অবস্থা দেখার জন্যে কয়েক ধাপ সামনে এগিয়ে টিলাটার ওপর দিয়ে ওদিকে নজর ফেলতেই চমকে উঠল। টিলাটার ওপারে পাহাড়ের অবশিষ্ট অংশসহ সবকিছু হারিয়ে গেছে। প্রশস্ত গভীর অন্ধকার খাদ শুধু সামনে।
পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মোহাম্মদ পাশা এবং সোলেমানও।
‘মনে হয়, রিমোটের এ্যাকশন ডাইরেক্ট ছিল না। রিমোটকে এক বা একাধিক ম্যাকানিজমের চেইন্ড রিএ্যাকশনকে অ্যাকটিভেট করতে হয়েছিল। তার জন্যে কমপক্ষে বেশ কয়েক মিনিট বরাদ্দ ছিল। সেই সময়টুকুতেই আল্লাহ আমাদের বাঁচিয়েছেন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, হঠাৎ এভাবে ওরা সবকিছু ধ্বংস করল কেন?’ বলল মোহাম্মদ পাশা।
‘নিশ্চয় ওদের কাছে নির্দেশ এসেছিল। ওদের নেতা ও বিজ্ঞানী যাদের আমরা ধরেছি, তাদের কাছ থেকে কিংবা অন্যদিক থেকে তারা চূড়ান্ত নির্দেশ পেয়েছিল। তার ফলেই আমরা ব্যর্থ হলাম ওদের ধ্বংসের দৈত্য ও গবেষণাগার হাত করতে।’
আহমদ মুসার মোবাইল বেজে উঠল।
ওপার থেকে জেনারেল মোস্তফার উদ্বিগ্ন কণ্ঠ শোনা গেল, ‘মি. খালেদ খাকান, আপনারা কোথায়? ভালো আছেন আপনারা?’ আর্ত-চিৎকারের মতো শোনাল জেনারেল মোস্তফার কণ্ঠ।
‘ভয় নেই জেনারেল, আমরা নিরাপদ আছি। ঠিক সময়ে আমরা বেরিয়ে আসতে পেরেছি। ভেতরের ওরা বাইরে থেকে মেসেজ পেয়েছে। আমরা যাদের ধরেছি, তারা কি কোন মেসেজ পাঠিয়েছে?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।
‘স্যরি মি. খালেদ খাকান। ওদের শীর্ষ বিজ্ঞানী আব্দুর রহমান আরিয়েহের গোপন দ্বিতীয় মোবাইলটা তার কাছে রয়েই গিয়েছিল। সেই মোবাইলেই উনি ওদের কাছে মেসেজ পাঠিয়েছিলেন। বিস্ফোরণের পর উনিই চিৎকার করে বিষয়টি আমাদের জানিয়েছেন। হেসে বলেছেন, ‘অন্তত, আমাদের নীরব ধ্বংসের দৈত্য এবং আমাদের গবেষণা আমরা তোমাদের হাতে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারলাম।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘বললেন না ওকে যে, আপনাদের নীরব ধ্বংসের দৈত্যকে আপনারা ধ্বংস করে ভালো করেছেন। ওর কোন প্রয়োজন আমাদের নেই। আমরা মানবতাকে ধ্বংস নয়, রক্ষা করতে চাই। সেই রক্ষার অস্ত্রই হলো আমাদের ‘সেভিয়ার অব ওয়ার্ল্ড র্যাশনাল ডোমেইন (সোর্ড)’। আমরা আমাদের ‘সোর্ড’কে রক্ষা করতে পেরেছি। দানবের বিরুদ্ধে মানবতার জয় হয়েছে।’
‘বলব মি. খালেদ খাকান! আপনারা আসুন।’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘স্যরি জেনারেল। আপনাকে বলা হয়নি। আমরা কমান্ডো নেতা মুরাদ আনোয়ারসহ চারজনকে হারিয়েছি। কমান্ডো মোহাম্মদ পাশা ও সোলেমান মারাত্মক আহত। আমি ওদের নিয়ে পাহাড়ের ওপরে আছি। চার ভাইয়ের লাশও আমাদের সাথে আছে। প্লিজ একটা হেলিকপ্টার পাঠান।’ বলল আহমদ মুসা।
‘ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। বড় দুঃসংবাদ মি. খালেদ খাকান। আল্লাহর অশেষ প্রশংসা, আরও ক্ষতির হাত থেকে আল্লাহ আমাদের রক্ষা করেছেন। আমি হেলিকপ্টার নিয়ে আসছি মি. খালেদ খাকান।’
কথা শেষ করেই জেনারেল মোস্তফা বলল, ‘একটু ওয়েট প্লিজ মি. খালেদ খাকান, প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোন এসেছে।’
দু’মিনিটেই জেনারেল মোস্তফা টেলিফোনে ফিরে এলেন। বললেন, ‘মি. খালেদ খাকান, প্রধানমন্ত্রী তার এবং প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে আপনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তারা আপনার সাথে দেখা করতে চান। সব শুনতে চান আপনার মুখ থেকে।’
‘তাদের ধন্যবাদ। আমি তাদের সাথে দেখা করার জন্যে উদগ্রীব। তাহলে আসুন জেনারেল মোস্তফা।’
আহমদ মুসা সালাম দিয়ে কল অফ করল।
আহমদ মুসা ডিনার শেষে গোল্ড রিজর্টের দক্ষিণ বারান্দায় এসে বসল।
গা এলিয়ে দিল ইজি চেয়ারে।
মর্মর সাগরের স্নিগ্ধ বাতাস সেখানে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে।
আহমদ মুসার দৃষ্টি তোপকাপি প্রাসাদের প্রান্ত পেরিয়ে মর্মর সাগরের ওপর নিবদ্ধ। মর্মর সাগরের কালো বুকের ওপর দিয়ে বসফরাসের আলোকোজ্জ্বল ব্রীজের একটা অংশ দেখতে পাচ্ছে।
এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে গিয়ে মুহূর্তে কয়েকশত বছর আগে ছুটে গেল তার মন। জীবন্ত রূপ নিয়ে এলো তুরস্কের বিশ্ব কাঁপানো সুলতানদের স্মৃতি। তুরস্কের মহান সুলতান বায়েজিদ, সুলতান দ্বিতীয় মোহাম্মদ, সুলতান সোলেমান দি ম্যাগনিফিসেন্টরাও মর্মর সাগর আর বসফরাসকে এভাবেই দেখতেন। সেই মর্মর সাগর আছে, বসফরাস আছে, তোপকাপি প্রাসাদ আছে, কিন্তু নেই তারা, নেই সেই সময়, নেই তুরস্কের সেই দিন। ইউরোপের অর্ধেক এবং ভূমধ্যসাগর জুড়েও ওড়ে না আর ইসলামের অর্ধচন্দ্র পতাকা।
ভাবতে গিয়ে একটা আবেগ আচ্ছন্ন করে ফেলল আহমদ মুসাকে। দু’চোখের কোণ তার ভারী হয়ে উঠল অশ্রুতে।
জোসেফাইন এসে বসল তার পাশের ইজি চেয়ারে।
আহমদ মুসা চিন্তায় মগ্ন থাকায় তা টের পেল না।
জোসেফাইন ধীরে ধীরে হাত রাখল আহমদ মুসার কাঁধে। বলল আস্তে আস্তে, ‘এত বড় কাজের পর কোন ভাবনায় আবার নিজেকে এমন হারিয়ে ফেলেছ?’
ধীরে ধীরে আহমদ মুসা মুখ ঘোরাল জোসেফাইনের দিকে। কাঁধ থেকে জোসেফাইনের হাত নিজের দু’হাতের মুঠোয় ধরে ওপরে তুলে নিয়ে একটা চুম্বন এঁকে দিয়ে বলল, ‘ভাবনায় নয়, অতীতের এক সুখ-স্মৃতিতে হারিয়ে গিয়েছিলাম। ভাবছিলাম, তুরস্কের অমর বিজেতা সুলতান সোলেমান দি ম্যাগনিফিসেন্ট এবং বায়েজিদদের কথা। আলোর মেঘমালায় সাজানো মর্মর সাগর ও বসফরাসের কালো বুকের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, আমি যেন তাদের চোখেই মর্মর আর বসফরাসকে দেখছি। ভেসে উঠেছিল আমার চোখে মর্মর আর বসফরাসের সে স্বর্ণালী দৃশ্য।’
‘স্যরি, তোমাকে এক দরিদ্র বাস্তবতায় এভাবে ফিরিয়ে আনার জন্যে। তুমি যাকে সুখ-স্মৃতি বলছ, তা সুখ-স্মৃতি মাত্র নয়, আসলে এক টনিক, এক গাইড, এক পাওয়ার জেনারেটর। এ আমাদের সামনে এক ‘ভিশন’ তুলে ধরে, সামনে এগোবার ক্ষমতা দেয়।’ বলল জোসেফাইন।
‘তোমার সব কথা ঠিক জোসেফাইন। কিন্তু সুখ-স্মৃতিকে সংগ দেবার সময় আমাদের খুব কম। তুমি আমার সময় বাঁচিয়েছ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘সময় বাঁচানোর প্রশ্ন আসছে কেন? তোমাদের এখানের কাজ শেষ। আপাতত হাতে তো প্রচুর সময়।’ জোসেফাইন বলল।
‘হ্যাঁ, হঠাৎ করেই যেন শেষ হয়ে গেল। ওরা সবাই এভাবে ধরা পড়বে, তা ভাবা যায়নি। এখানে তোমার বান্ধবীর কৃতিত্ব অনেক বেশি। এই ঠিকানার সন্ধান তার কাছ থেকেই তুমি দিয়েছিলে। আমি ভাবছি তাকে একটা বড় পুরস্কার দেয়া যায়। কি দেয়া যায় বলো তো। আমি তুরস্ক সরকারকে বলব।’
হঠাৎ সোজা হয়ে বসল, মুখ গম্ভীর হলো জোসেফাইনের। তাতে বেদনার ছাপ। বলল, ‘সে সুযোগ পাবে না, সে সুযোগ সে তোমাদের দিল না।’
আহমদ মুসাও সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘বুঝলাম না জোসেফাইন। সে সুযোগ পাবো না কেন?’
‘তোমাকে বলতে ভুলে গেছি। সে আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাচ্ছে। সে আজ রাতের ফ্লাইট ধরছে।’ বলল জেসেফাইন।
‘হঠাৎ এভাবে চলে যাচ্ছেন? তুমি তো টেলিফোনে তখন কিছু বলোনি। জানতে কি আগে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘আমি জানতাম না। সেও আমাকে তখন টেলিফোনে কিছু বলেনি। সন্ধ্যায় আমি আয়েশা আরবাকানকে নিয়ে বাগানের দিকে বেরিয়েছিলাম। ফিরে এসে গেটম্যানের কাছে একটা এনভেলাপ পেলাম। চিঠিটা নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মেসেঞ্জার এসে দিয়ে গেছে। ঘরে এসে এনভেলাপ খুলে দেখি জেফি জিনার চিঠি। ওতেই পড়লাম, সে আজ চলে যাচ্ছে মায়ের অসুখের খবর পেয়ে।’
কথা শেষ করেই জোসেফাইন উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘এনভেলাপটা এখানেই ঐ শোপিসটার ওপরে রেখেছি।’
বলে জোসেফাইন গিয়ে দেয়ালের শোপিসের ওপর থেকে এনভেলাপ এনে তা থেকে চিঠি বের করে আহমদ মুসার হাতে দিল। বলল, ‘পড়ে দেখ। দুঃখজনক যে, সে তার আমেরিকার ঠিকানা চিঠিতে দেয়নি। ভুলেও যেতে পারে তাড়াহুড়োয়।’
চিঠি হাতে নিয়েই পড়তে শুরু করল আহমদ মুসা।
শুরুতেই চিঠিতে জোসেফাইনকে সম্বোধন করেছে ‘আপা’ বলে। তারপর লিখেছে, ‘বন্ধু নয়, ‘আপা’ বলেই সম্বোধন করলাম।’ এই এক বাক্য পড়তেই চিন্তার কোথায় যেন হোঁচট লাগল আহমদ মুসার। এরকম একটা বাক্য কোথায় যেন পড়েছে তার মনে হলো।
আবার পড়তে শুরু করল, ‘আপা, আম্মার অসুস্থতার খবর পেয়ে হঠাৎ আমাকে আমেরিকা ফিরতে হচ্ছে। তোমাকে টেলিফোন করেছিলাম, না পেয়ে খবরটা জানানোর জন্যে চিঠির আশ্রয় নিতে হলো। তোমাকে এভাবে ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে। তার চেয়ে বড় কষ্ট হচ্ছে ছোটমণি আহমদ আবদুল্লাহকে আর দেখতে পাবো না বলে। কারও মায়ার বাঁধন আবারো আমাকে এভাবে বাঁধবে, এটা ভাবিনি। এটা আমার একটা নতুন অভিজ্ঞতা।
বুঝেছি আপা, এটাই দুনিয়া। এই দুনিয়ায় হাসির চেয়ে কান্নাই সম্ভবত বেশি আছে। আবার ব্যাপারটা এমনও হতে পারে যে, মানুষ ‘জন্ম’র আনন্দের চেয়ে মৃত্যুর বেদনাকেই বড় করে দেখে। যেমন সুখ-স্মৃতির চেয়ে, দুঃখের স্মৃতিই মানুষের মনে থাকে বেশি। এরপরও বলব, দুনিয়ার সেরা মহাকাব্যগুলোর অধিকাংশই বিয়োগান্তক। এই বিশ্বচরাচরে হাসির বন্যার চেয়ে কান্নার প্লাবন আসলেই বড়।
স্যরি, বিদায়ের সময় এসব কথা বলা ঠিক হচ্ছে না। আমার মনে হয়, তুরস্কে তোমাদের মিশন শেষ। এরপর তুমি ঘরে ফিরবে, না নতুন কোন মিশনে, নতুন কোথাও যাবে- আমি জানি না। তবে যেখানেই থাক, যেখানেই থাকি, এক পৃথিবীতেই আমরা থাকব, এটাই সান্ত্বনা।
কোন ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকলে, সেটা অনিচ্ছাকৃত। মাফ করে দিও। আমার ছোটমণিটার জন্যে অনেক দোয়া, অনেক ভালোবাসা।’
চিঠি পড়া শেষ হলো আহমদ মুসার। চিঠির কথাগুলো তার মনে অনেক জিজ্ঞাসা জাগিয়ে তুলল। চিঠির কথায়, চিঠির ভাষায় একটা পরিচিত মনের ছোঁয়া যেন লাগছে।
চিঠির শেষে নাম স্বাক্ষরের ওপর নজর পড়ল আহমদ মুসার। স্বাক্ষরে দু’টি শব্দ ‘জেফি জিনা’। নামের অক্ষর লেখার, বিশেষ করে ‘জে’, ‘এফ,’ ‘এন’ অক্ষরগুলোর স্টাইলের ওপর নজর পড়তেই চমকে উঠল আহমদ মুসা। তার স্মৃতির দুয়ার যেন এক ধাক্কায় খুলে গেল। বিস্ময়-দৃষ্টি নিয়ে চিঠির লেখার ওপর আবার নজর বোলাল দ্রুত। জেফি জিনা নয়, সব ছাপিয়ে আরেকটা নাম যেন কথা বলে উঠল।
বিস্ময়-দৃষ্টি নিয়ে তাকাল আহমদ মুসা জোসেফাইনের দিকে। বলল, ‘জোসেফাইন, এ চিঠি কি জেফি জিনার? জেফি জিনা কে?’
আহমদ মুসার জিজ্ঞাসার সুরে জোসেফাইনের চোখেও বিস্ময় ফুটে উঠল। বলল, ‘হ্যাঁ, চিঠি তো জেফি জিনার। কেন, জেফি জিনা তো জেফি জিনাই!’ জোসেফাইন কৌতুহল উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছে।
‘কিন্তু জোসেফাইন, আমি নিশ্চিত, এই চিঠির লেখা ও ভাষা দুই-ই সারা জেফারসনের।’
‘সারা জেফারসনের!’ শব্দটা জোসেফাইনের কণ্ঠ ভেদ করে একটা প্রবল উচ্ছ্বাসের তোড়ে যেন বেরিয়ে এলো।
ছুটে এসে সে আহমদ মুসার পাশে হাঁটু গেঁড়ে বসল। চিঠিটা আহমদ মুসার হাত থেকে নিয়ে তাতে চোখ বোলাল। তারপর ছুটে ঘরের ভেতরে চলে গেল। মিনিটখানেকের মধ্যে বেরিয়ে এলো। হাতে একখণ্ড কাগজ।
আবার গিয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসল জোসেফাইন আহমদ মুসার পাশে। বলল, ‘তোমার কাছে পাঠানো সারা জেফারসনের চিঠি নিয়ে এলাম। এস তো দেখি, চিঠি দু’টি মিলিয়ে।’
চিঠি দু’টি পাশাপাশি রেখে দু’জনেই দেখল। জোসেফাইন প্রায় আর্তনাদ করে বলে উঠল, ‘ঠিক, সারা জেফারসনের লেখা এটা। তার মানে, জেফি জিনাই সারা জেফারসন।’
বলেই জোসেফাইন আহমদ মুসার উরুতে মুখ গুঁজল।
কয়েক মুহূর্ত পরে মুখ তুলল।
অশ্রুতে ধুয়ে গেছে তার মুখ। বলল, ‘এত ঘনিষ্ঠ, এত আপন হয়েও সে পরিচয় গোপন করল? আমার যে কত আশা ছিল তার দেখা পাওয়ার, তার সাথে কথা বলার! আমাকে বড় বোন ডেকে আবার এতটা নিষ্ঠুর হলো সে!’
কথা বলার সাথে সাথে তার দু’চোখ থেকে দু’গণ্ড বেয়ে নেমে এল অশ্রুর ধারা।
আহমদ মুসা তাকে কাছে টেনে নিল। বাম বাহুর মধ্যে তাকে জড়িয়ে রেখে বলল, ‘তোমার আবেগ, তোমার কথা ঠিক আছে। আমিও দারুণ বিস্মিত হয়েছি এভাবে তার পরিচয় গোপনে। আমার বিস্ময়ও ঠিক আছে। কিন্তু তার দিকটা ভাব। সে তার দিক থেকে ঠিকই করেছে। তার সেই চিঠিটা আবার পড়ে দেখ।’
জোসেফাইন মুখ তুলে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। তার চোখে-মুখে প্রতিবাদের চিহ্ন। বলল, ‘না, সে ঠিক করেনি, তার চিঠি আমার মুখস্থ। ভালোবাসা পাপ নয় যে সে অপরাধীর মত পালিয়ে বেড়াবে। কেন সে নিজেকে অপরাধী ভাববে? অপরাধী নয় সে।’
কান্নায় রুদ্ধ হয়ে গেল জোসেফাইনের শেষ কথাগুলো।
ম্লান হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘তোমার কথা নীতিগত দিক দিয়ে ঠিক জোসেফাইন। কিন্তু তুমি একবার তার জায়গায় নিজেকে দাঁড় করিয়ে দেখ, তুমি যা সহজ মনে করছ তা সহজ নয়। তার জন্যে বিষয়টি কষ্টকর আর আমাদের জন্যে বিব্রতকর। সে এটাই এড়াতে চেয়েছে।’
কোন উত্তর দিল না জোসেফাইন। চোখ মুছে মাথা নিচু করল।
একটু পর মাথা নিচু রেখেই স্বগতঃকণ্ঠে বলল জোসেফাইন, ‘সে পরিচয় দিয়েই দেখতো, আমাদের বিব্রতভাব ও তার কষ্ট দূর করতে পারতাম কিনা!’
বলে মুখ তুলল জোসেফাইন। বলল, ‘আমাকে একটা অনুমতি দেবে?’
আহমদ মুসা তাকাল জোসেফাইনের দিকে। বলল, ‘অনুমতির প্রশ্ন কেন? তোমার ইচ্ছাই যথেষ্ট। বল?’
‘আমি আমেরিকা যাব।’ বলল জোসেফাইন আহমদ মুসার দিকে চোখ তুলে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now