বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মাসুদ রানা—অন্ধকারের বন্ধু (পর্ব ৩)

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X ৪৭ চারদিকে চোখ বুলিয়ে বালি ছাড়া কিছু দেখলাম না। দালান- কোঠা, রাস্তাঘাট, রকেট-ফকেট সবই নিশ্চয় আছে, তবে অনেক দূরে কোথাও।’ রানার দিকে ফিরে সুরাইয়া বলল, ‘মনে হচ্ছে টানেল থেকে বেরিয়েও অনেকটা পথ হাঁটতে হবে। আমাল্ডে বোধহয় বেশি দেরি করা ঠিক হবে না।’ দেরি রানাও করতে চায় না, কারণ খেয়াযান জুবিলি যদি সাপ−াই নিয়ে রওনা হয়ে যায়, ক্ষতি করবার সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে যাবে। কিন্তু এদিকে একটা সমস্যাও আছে। ‘দিনের বেলা মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটা পেরুব? হঠাৎ যদি একটা...’ রানার কথা শেষ হলো না, কাছাকাছি আকাশ থেকে একটা কিছুর ভটভটভটভট আওয়াজ ভেসে এল। কারুরই বুঝতে অসুবিধে হলো না যে ওটা ভারী একটা হেলিকপ্টার; নিশ্চয়ই রকেট লঞ্চার আর মেশিন গান সজ্জিত। সাবধানতার মার নেই, দ্রুত পিছিয়ে গুহার আরও ভিতর দিকে সরে এল ওরা। তবে একটু পরেই মিলিয়ে গেল কপ্টারের আওয়াজ। ‘এই পরিস্থিতিতে দিনের বেলা ফাঁকা জায়গায় বেরুনো আর আত্মহত্যা করা, একই কথা,’ বলল সর্দার। ‘তারচেয়ে খেয়েদেয়ে লম্বা একটা ঘুম দিলে, আখেরে সেটা কাজে লাগবে।’ অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজি হলো সুরাইয়া। এক ঘণ্টা পরই উপলব্ধি করল সে, রানা আর সর্দারের কথা মেনে নিয়ে নিজের কত বড় উপকার করেছে। সকাল ছ’টায় পুরোদমে শুরু হলো ঝাঁকের পর ঝাঁক হেলিকপ্টারের তল−াশি অভিযান। স্পেস সেন্টারের আশপাশের মরুভূমির প্রতিটি ইঞ্চির উপর চোখ বুলাচ্ছে ইজরায়েলিরা। বেলা যত বাড়ল, কপ্টারের আসা-যাওয়াও তত বেড়ে গেল। রানা ভয় পেল, আর্মারড্ ভেহিকেল নিয়ে আর্মিও চলে আসতে পারে পাহাড়ের গুহাগুলো সার্চ করতে। সর্দারের সঙ্গে পরামর্শ করে একটা ডিফেন্স টিম গঠন করা হলো। যদি কোন হেলিকপ্টার নামে বা ট্রুপস ক্যারিয়ারে চড়ে সৈনশুা চলে আসে, কাকে কী করতে হবে সব ভালভাবে বুঝিয়ে ত্থেয়া হলো বেদুইন তরুণল্ডে। বিকেল চারটে। আকস্মিক বালু ঝড়ে ঢাকা পড়ে গেল চারদিক। কপ্টারের ঝাঁক ফিরে গেল ঘাঁটিতে। ইতিমধ্যে পাঁচ ঘণ্টা একটানা ঘুমিয়ে খাওয়াদাওয়া সেরেছে রানা আর সুরাইয়া। নিñিদ্র, মোটা পলিথিন দিয়ে তৈরি দুটো ব্যাগ ত্থেয়া হয়েছে ওল্ডেÑস্রোত ধরে এগোবার সময় ওগুলোয় অস্ত্র, বিস্ফোরক, কাগজ-পত্র আর কাপড়-চোপড় রাখবে। ঝড়ের মধ্যেই বেরিয়ে পড়ল ওরা। কারণ জানে ঝড় থামবার সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসবে কপ্টারগুলো। ওল্ডে প্রতিবাদ কানে না তুলে পথ দেখাবার জন্য সঙ্গে আসছে সর্দার। ঝরণার মুখ পর্যন্ত ওল্ডেকে পৌঁছে দেবে সে। দুই দফায় সব মিলিয়ে চার কি সাড়ে চার মাইল হাঁটতে হলো ওল্ডেকে। প্রথম বার ডানদিকের পাহাড়টার ঢালে পৌঁছে থামল। টানেলের মুখ এখানে একটা ছাতা আকৃতির ঝুল-পাথরের নীচে। মুখটা মোটেও বড় নয়, হামাগুড়ি দিয়ে ভিতরে ঢুকবার সময় ছাল্ডে ঘষা লাগল পিঠে। ওল্ডেকে এগোতে হলো স্রোতের উল্টোদিকে। বেদুইন সর্দার বাহাউদ্দিনের কাছে ঋণী হয়ে থাকল ওরা। ওল্ডে লাগবে ভেবে টিনের হেলমেট থেকে শুরু করে টর্চ পর্যন্ত কত কী-ই না যোগাড় করে রেখেছিল সে। দ্বিতীয় শাখাটা ছোট, পৌঁছাতে মাত্র বিশ মিনিট লাগল ওল্ডে। এরপর পানির স্রোত ওল্ডে অনুকূলে, ফলে এগোবার জন্য জোর খাটাতে হচ্ছে না। ৪৮ মাঝখানে দু’বার বিশ্রাম নিতে হলো ওল্ডেকে। আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল, কাজেই অক্সিজেনের অভাব হতে বাধ্য। বিশেষ পরিশ্রম করেনি, অথচ হাঁপাচ্ছে। অবশেষে একটা চওড়া ফাটলের ভিতর থেকে নালার গায়ে বেরিয়ে এল ওরা। ঝড় থেমে গেছে। সময়টা গোধূলি। নালার ভিতর থেকে আকাশ যতটুকু দেখা যায়Ñখালি। ইঞ্জিনের কোন আওয়াজও শুনতে পাচ্ছে না রানা। এই মুহূর্তে দুজনেই খুব ব্যস্ত। ব্যাগ থেকে যে-যার পোশাক বের করে পরে নিচ্ছে। দেখে নিচ্ছে যে পকেটে যেটা যাবার কথা সেটা ঠিক সেখানেই গেছে কিনা। তারপর উঁকি দিয়ে নালার উপর কী আছে দেখল রানা। আশপাশে সত্যি কিছু নেই। তবে সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসায় স্পটলাইটের উজ্জ্বল আলোয় ঝলমল করতে দেখা গেল একটা রকেটকেÑবিস্ফোরণ ঘটিয়ে মহাশূনেশুওনা হওয়ার জন্য সম্পূর্ণ তৈরি। কাছাকাছি কোথাও নয়, কম করেও ছয় মাইল দূরে সেটা। এই রকেটের কথাই বোধহয় বলেছিল বারাইদি; সাপ−াই নিয়ে স্পেস স্টেশন অ্যাবিতে যাবে। সময় মত ওখানে পৌঁছে ওটার রওনা হওয়া রানা হয়তো ঠেকাতে পারবে না, তবে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, অ্যাবির অ্যাস্ট্রনটরা এরপর আর যাতে কোন সাপ−াই না পায় সেটা নিশ্চিত করেই ইজরায়েল ত্যাগ করবে ও। ম্যাগনিফাইং গ−াসটার একটা বল্টস্থা করতে হবে। যে-কোন মূল্যে। এই মাত্র সন্ধ্যে নামছে। সামনে পড়ে আছে দীর্ঘ রাত। সুরাইয়াকে নিয়ে ছুটতে শুরু করল রানা। মাইল খানেক পার হয়েছে ওরা, কপ্টারের আওয়াজ ভেসে এল পিছন থেকে। ইতিমধ্যে বেশ গাঢ় হয়ে উঠেছে চারদিক। কপ্টার নয়, ওটার স্পটলাইটের আলো দেখতে পেল ওরাÑকাঁটাতারের বেড়ার বাইরে, প্রায় তিন মাইল পিছনে, ওল্ডে ফেলে আসা পাহাড়ের উপর স্থির হয়ে স্ফাড়িয়ে আছে। বেদুইনরা ওখানে এখন নেই। সর্দার বাহাউদ্দিন ওল্ডেকে বলে গেছে, বালুঝড়ের মধ্যেই তার লোকজন ঘোড়া নিয়ে উত্তর দিকে রওনা হবে। ও দিকের ছোট এক শহরে তাল্ডে সঙ্গে মিলিত হবে সে। আবার ছুটতে শুরু করল ওরা। অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না, ওল্ডে সামনে দিয়ে একটা পাকা রাস্তা চলে গেছে। রাস্তাটা বৃত্তাকার, স্পেস সেন্টারের লঞ্চ ফ্যাসিলিটিকে চার মাইল দূর থেকে ঘিরে রেখেছে। আর্মারড্ ভেহিকেল নিয়ে সারাক্ষণ টহল দিচ্ছে সৈনশুা। টহল পার্টি না বলে কনভয় বললেই বেশি মানায়। সামনে পিছনে একটা করে আর্মারড্ ট্রুপস ক্যারিয়ার রয়েছে, মাঝখানে দুটো ট্যাঙ্ক, তিনটে খোলা জিপ, একজোড়া মেশিন গান আর রকেট লঞ্চার নিয়ে দুটো কার্গো ক্যারিয়ার। ট্যাঙ্কগুলোর কারণেই টহল পার্টির গতি মন্থর। বালিতে উপুড় হয়ে শুয়ে ইজরায়েলি সিকিউরিটি ফোর্স-এর চলে যাওয়া দেখল ওরা। তারপর আবার দৌড়। সুরাইয়া রানার চেয়ে কম যায় না, সমানে পাল−া দিয়ে ছুটছে। মেয়েটা যেন ক্লান্ত হতে জানে না, প্রয়োজনে সারা রাত ছুটতে পারবে। ‘এবার আমার বিশ্রাম না নিলেই নয়!’ অসম্ভব হাঁপাচ্ছে সুরাইয়া, কোমরের কাছে ভাঁজ হয়ে গেল শরীর, দুই হাত দুই হাঁটুর উপর। ‘তোমার কাছে সুপারম্যানও কিছু না। একটা মানুষ এত কী করে দৌড়ায়? আমি কখনও এ রকম দেখিনি।’ ৪৯ ‘শরীরটাকে ফিট রেখেছি, ব্যস, এর মধেঞ্জন্য কোন জাদু নেই,’ বলল রানা। কম ক্লান্ত নয় ও, তবে সুরাইয়ার মত শেষ সীমায় পৌঁছে যায়নি। আরেকবার কথাটা ভাবল, সুরাইয়াকে সঙ্গে নিয়ে স্পেস সেন্টারে ঢোকাটা বোকামি হয়ে যায়নি তো? দালান-কোঠার ছোট একটা ঝাঁকের চারদিকে চোখ বুলাল রানা। এখানে ওরা সাময়িক আশ্রয় বা আড়াল নিয়েছে। বড় একটা একচালার ভিতর কম্বল, ফার্নিচার ইত্যাদি পাওয়া গেল। পাশেরটা খাবারদাবার। বোঝাই যায়, এ-সব গ্রাউন্ড ক্রুল্ডে জন্য। বাকি একচালা বা দু’চালায় ঢুকে সময় নষ্ট করল না রানা, জানে ওগুলোয় কী ধরনের জিনিস থাকতে পারে। ও যা খুঁজছে, সেটা আর সব জিনিসের কাছ থেকে যথেষ্ট দূরে থাকবে, যাতে আগুন লাগলে বা বিস্ফোরণ ঘটলে ক্ষতির পরিমাণ সীমিত পর্যায়ে থাকে। কেমিক্যাল স্টোরেজ ডিপো। ‘ওদিকে,’ বলল রানা, হাত তুলে বেশ কয়েক গজ দূরের সামানঞ্জালোকিত একটা ভবন দেখাল সুরাইয়াকে। ‘আমরা কি ওটাই খুঁজছি?’ ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল সুরাইয়া, দালানটার মাথায় হিব্র“ ভাষায় লেখা সাইনবোর্ডটা পড়বার চেষ্টা করল। ‘সতর্ক করা হয়েছে। শুধু ‘‘বিপজ্জনক’’ লেখাটা পড়া যাচ্ছে। বাকিটা অস্পষ্ট, পড়তে পারছি না।’ ‘ওতেই হবে। চলো।’ এক ছায়া থেকে আরেক ছায়ায় ছুটছে রানা; একদল পদাতিক সৈনন্ধহল দিতে আসছে দেখে স্যাঁৎ করে সরে এসে লুকিয়ে পড়ল কয়েকটা ড্রামের পিছনে। পনেরো ফুট দূর থেকে পাশ কাটাল টহল পার্টি, ওর উপস্থিতি টের পায়নি। বুট জুতোর আওয়াজ দূরে মিলিয়ে গেল। সুরাইয়াকে নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না, তল−াশির কাজে ব্যস্ত রানা। একটা ভবনে বিপজ্জনক শব্দটা লেখা থাকলে ধরে নিতে হবে ভিতরে নিশ্চয়ই মারাত্মক কিছু আছে। এই তালাটা বাকিগুলোর মত সহজে খোলা গেল না। কাছাকাছি কোন টহলদারি নেই, কাজেই সময় নিয়ে চেষ্টা করছে রানা। শার্টের সিম থেকে সরু একটা ইস্পাতের পিকলক বের করল ও, লক টাম্বলারগুলোয় ঢোকাল স্টিলের পাতলা ¯িপ্রঙ ¯ি−ভারটা, তারপর এক এক করে ওগুলোকে স্থানচ্যুত করবার কষ্টসাধ্য কাজ শুরু করল। সবগুলোকে জায়গামত সরিয়ে আনবার পর পিকটাকে ঘোরাল, হুক আকৃতির শেষ প্রান্তটাকে বল্টহার করল মোচড়ানোর ভঙ্গিতে। ভারী প্যাডলক খুলে গেল। ‘পাকা চোর অতিশয়,’ আরবীতে ফিসফিস করল সুরাইয়া। রানার মুচকি হাসি অন্ধকারে দেখা গেল না। কবাট খুলে নিঃশব্দে দালানটার ভিতর ঢুকে পড়ল ও। বড় একটা কামরায় ঢুকেছে ওরা। সম্পূর্ণ খালি। ‘এক্সপে−াসিভ কেমিক্যালস,’ পড়ল সুরাইয়া, একটা ল্ডজার কবাটে লাল হরফে লেখা রয়েছে। ল্ডজার নীচের ফাঁক দিয়ে একটা কটু গন্ধ ভেসে আসছে। এই তালাটা সহজেই খোলা গেল। কামরার ভিতর, মেঝে থেকে সিলিং পর্যন্ত, কার্ডবোর্ড ক্যানিস্টার সাজানো। ভিতরে কাঁচের বড় বড় জার-এ রাখা হয়েছে তরল বিস্ফোরক। এই বিস্ফোরকের শক্তি জেলিগনাইটের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। একটা জার ফাটাবার বল্টস্থা করা গেলে বাকিগুলো সিমপ্যাথেটিক রিয়্যাকশনে ফাটবে। রানার কাছে টাইমার আর ডেটোনেটিং মেকানিজম সহ জেলিগনাইটের স্টিক আছে বেশ কয়েকটা। কাজ শুরু করবার আগে সুরাইয়াকে বলল, ‘এগুলো আরও অনেক জায়গায় ফিট করব, বিশেষ করে যেখানে ফুয়েল আছে। আমি চাই চারদিকটা ৫০ ঘুরে কোথায় কী হচ্ছে দেখে এসো তুমি। কে কী বলে কান পেতে শুনবে। তবে সাবধান, কিছু করতে যেয়ো না। ধরাও পোড়ো না, ঠিক আছে?’ কাঁধ ঝাঁকাল সুরাইয়া। ‘এত সাবধান না করলেও পারো,’ বলল সে। ‘আমি অনভিজ্ঞ বা বোকা নই।’ ‘আমি আশপাশেই কোথাও থাকব। তুমি ফিরবে এক ঘণ্টা পর।’ ‘আর আমি যদি না ফিরি, আমাকে ছাড়াই বেরিয়ে যাবে তুমি। গুডবাই, রানা।’ রানাকে কিছু বলবার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত অন্ধকারে মিলিয়ে গেল সুরাইয়া। নয় এক্সপে−াসিভ কেমিক্যাল ভর্তি কামরায় একটা জেলিগনাইট স্টিক ফিট করে দালানটা থেকে বেরিয়ে এল রানা। অন্ধকারে স্থির স্ফাড়িয়ে স্কাইলাইন-এর উপর চোখ বুলাচ্ছে, মনে আশা, ফুটন্ত তরল অক্সিজেনের অস্তিত্ব ফাঁস করে দেয় এমন ক্ষীণ ধোঁয়া দেখতে পাবে। ঠাণ্ডা রাতে রুপালি মরীচিকার মত ধরা পড়ল ওগুলো। দ্রুত সেদিকে এগোল রানা। কাছাকাছি এসে দেখল এটা একটা কমপ্রেসার প−ান্ট। নাসার স্পেস স্টেশনে এরকম প−ান্ট আগেও রানার দেখা আছে। সেটার সঙ্গে এটার মিল সহজেই চোখে পড়ল। সম্ভবত একই ডিজাইন থেকে তৈরি। ক্যাটওয়াকে উঠে এল রানা। কিছুক্ষণ নড়াচড়া না করে নিশ্চিত হয়ে নিল, কেউ ওকে দেখতে পাচ্ছে না। তারপর ধীরে ধীরে এগোল। ওর গন্তব্য দৈত্যাকার কমপ্রেসার-এর নীচের একটা জায়গা। কমপ্রেসারটা অ্যাটমসফিয়ার থেকে অক্সিজেন আর নাইট্রোজেন শুষছে, গ্যাসগুলোকে ঘন করছে তরল পর্যায় পর্যন্ত, তারপর পাইপের সাহায্যে পাঠিয়ে দিচ্ছে নিচু তাপমাত্রার স্টোরেজ ট্যাংকে। জেলিগনাইটের স্টিক ফিট করবার জন্য তরল অক্সিজেন পাইপ বেছে নিল রানা। গোটা প−ান্টের আরও তিন জায়গায় এরকম বিস্ফোরক বসাল। সবশেষ টাইমারের কাঁটা অ্যাডজাস্ট করল। প্রতিটি বিস্ফোরণ এখন থেকে এক ঘণ্টা পর ঘটবে। কমপ্রেসার প−ান্ট থেকে সরে এল রানা। খানিকটা হাঁটবার পর গ্যাসলিন ভর্তি একটা ট্যাংকার দেখতে পেল, রকেট ইঞ্জিন অ্যাসেম্বলি এলাকার কাছাকাছি। এই ট্যাংকারে-ও বিস্ফোরকের একটা টুকরো ফিট করল। এখন ল্ডকার ভাগেশু সহায়তা। আশা করা যায় বিস্ফোরণগুলো ঘড়ির কাঁটা ধরে সময়মতই ঘটবে। আগুনও দ্রুত সব কিছু গ্রাস করে নেবে। স্পেস স্টেশনে সাপ−াই পাঠাবার জন্য ক্যাপসুল আর রকেট তৈরি করে রাখা হয়েছে, তবে আগুনের সেই গ্রাস থেকে ওগুলো বাঁচবে না। বারাইল্ডি ত্থেয়া তথঞ্জনুসারে স্পেস স্টেশন অ্যাবিতে সাপ−াই পাঠানো হয় প্রতি চারমাসে একবার। অর্থাৎ পরবর্তী চারমাস না খেয়ে থাকতে হবে ইজরায়েলি অ্যাস্ট্রনটল্ডে। শুধু খাবার নয়, অক্সিজেন আর পানিও পাবে না তারা। আতসী কাঁচ দিয়ে তৈরি অস্ত্রটাকে অপারেট কববার জনঞ্জভিজ্ঞ লোক ল্ডকার। খাদল্টা অক্সিজেনের অভাবে অ্যাবির ৫১ সবাই মারা যাওয়ার পর কী ঘটবে? পেটের ভিতর বোমা নিয়ে রানার এই প্রশ্নেরও জবাব দিয়েছে বারাইদি। ম্যাগনিফাইং গ−াস-এর পজিশন খানিক পর পর অ্যাডজাস্ট করবার প্রয়োজন হয়। তা না হলে সৌর বাতাস ঘুরিয়ে অন্যদিকে সরিয়ে দেবে ওটার মুখ। ব্যস, বিপদ কেটে যাবে। কেমিক্যাল স্টোরেজ এলাকায় ফিরে এল রানা। এসে দেখে ওর জনঞ্জপেক্ষা করছে সুরাইয়া। ছায়ার ভিতর তার চেহারা আবছা দেখাচ্ছে, তবে থমথমে গম্ভীর ভাবটা ঠিকই রানার চোখে ধরা পড়ল। ‘কিছু ঘটেছে,’ বলল ও। ‘কেউ দেখে ফেলেছে তোমাকে?’ দ্রুত চিন্তা করছে রানা। কল্পনার চোখে আগেই দেখে রেখেছে ওÑ ছ’মাইল হেঁটে নালার কাছে প্রায় পৌঁছে গেছে ওরা, এই সময় বিস্ফোরণ ঘটল, গোটা লঞ্চ ফ্যাসিলিটিতে ছড়িয়ে পড়ল আগুন। এই পরিস্থিতিতে প্রাণ নিয়ে কেটে পড়া পানির মত সহজ। কিন্তু বোমা ফাটবার আগেই যদি তল−াশি শুরু হয়ে যায়, ওরা ভয়ঙ্কর একটা ফাঁজ্ঝোটকা পড়ে যাবে। সুরাইয়াকে যদি সত্যি তারা দেখে ফেলে থাকে, গুরুত্বপূর্ণ স্টোরেজ এরিয়া অবশ্যই সার্চ করবে। স্টিকগুলো দেখে ফেলবে তারা। টাইমার আর ডেটোনেটর খুলে নিলে একটাও ফাটবে না। ‘তোমার প−্যান কোন কাজে আসবে না,’ রুদ্ধশ্বাসে বলল সুরাইয়া। ‘কেন, ওরা কি এরই মধ্যে জেলিগনাইট দেখে ফেলেছে?’ ‘না, রানা, তা নয়। মেজর এবরান বারাইদিকে দেখলাম...’ ‘সে কী! কোথায়? কী করছে?’ ‘ওটায় চড়ে যারা মহাশূন্যে যাবে,’ হাত তুলে লঞ্চ প্যাডের দিকটা দেখাল সুরাইয়া, ‘তাল্ডেকে ব্রিফ করছিল।’ ‘তার অবস্থা কেমন দেখলে?’ পকেটে হাত ভরে রিমোটটার স্পর্শ নিল রানা। ‘পেটের বোমাটা অপারেশন করে বের করে ফেলেছে কি না...’ ‘ও-সব বুঝব কীভাবে!’ ‘তা হলে কী বুঝেছ তাই বলো।’ ‘তার কথা শুনে বুঝলাম, স্পেস স্টেশন অ্যাবিতে যারা আছে, আগামী ছ’মাস সাপ−াই না পেলেও চলবে তাল্ডে। এমনকী এক বছরও চলতে পারবে, যদি এখন থেকেই রেশনিং শুরু করে।’ ‘কিন্তু আমি যতটুকু জানি, ছ’মাস চলবার মত অত অক্সিজেন স্পেস স্টেশনে থাকে না,’ এই তথ্য কিছু দিন আগে বিশেষজ্ঞল্ডে কাছ থেকে জেনেছে রানা। ‘ওরা একটা রিসাইক্লিং সিস্টেম বল্টহার করছে। ওল্ডেকে এখন তুমি স্বয়ংসম্পূর্ণ বলতে পারো।’ ‘রিসাইক্লিঙের মাধ্যমে অক্সিজেন পাচ্ছে?’ রানার কণ্ঠস্বরে অবিশ্বাস। ‘প্রযুক্তিটা রাশিয়ার, ইজরায়েলিরা চুরি করে নিজেল্ডে কাজে লাগাচ্ছে। মস্কো ইউনিভার্সিটির গবেষকরা নতুন এক ধরনের শেওলা আবিষ্কার করেছেন, বদ্ধ জায়গাতেও বেঁচে থাকতে পারে। এই শেওলাই অক্সিজেন তৈরি করছে।’ চিন্তার গতি আরও বাড়ল রানার। আর চলি−শ মিনিট পর বিস্ফোরণ। ক্ষয় ক্ষতি হবে মারাত্মক, কিন্তু গোটা ফ্যাসিলিটিকে আবার কাজের উপযোগী করতে তিন থেকে চার মাসের বেশি সময় লাগবে না। অর্থাৎ, স্পেস স্টেশন অ্যাবির টেকনিশিয়ান আর অপারেটররা কোনও সমস্যায় পড়ছে না। ম্যাগনিফাইং গ−াসও অক্ষত থাকছে। সোজা কথায়, রানার মিশন ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। মুখের ভিতরটা হঠাৎ তেতো হয়ে গেল ওর। ‘ওখানে নিয়ে ৫২ চলো আমাকে, যেখানে ব্রিফিং হচ্ছে,’ বলল ও। ‘ওল্ডে আরও কথা শোনা ল্ডকার...’ ‘কিন্তু জেলিগনাইট?’ আঁতকে উঠে জিজ্ঞেস করল সুরাইয়া। ‘খানিক পরই তো ওগুলো ফাটতে শুরু করবে।’ ‘কথা বোলো না, থামো তো! ভেবেছ ভুলে গেছি আমি?’ চাপা স্বরে ধমক দিল রানা। ‘ওগুলোর এখন আর কোন গুরুত্ব নেই। আমি মিশনটা সফল করার উপায় খুঁজছি। হিসেবে ভুল হয়ে গেছেÑএখন বুঝতে পারছি, স্পেস সেন্টার ধ্বংস করে কোন লাভ নেই, তারপরও আসমানের ওই কাঁচ অপারেট করা যাবে। তাই নতুন কোন বুদ্ধি ল্ডকার। ওরা কী বলে শুনতে চাই।’ ‘এদিকে,’ নিঃশব্দ পায়ে গাঢ় ছায়ার ভিতর ঢুকল সুরাইয়া। সুরাইয়ার পিছু নিয়ে সাবধানে হাঁটছে রানা। তিন মিনিট পর ফিসফিস করল সুরাইয়া, ‘এইখানে। জানালা দিয়ে ভিতরে তাকাও।’ সুরাইয়ার ঠিক পিছনে থামল রানা, তার কাঁধের উপর দিয়ে তাকাবার সময় সরু কোমরটা জড়িয়ে ধরল দু’হাতে। আধ খোলা জানালা, পর্দাটা একপাশে সরানো। ঘরের ভিতর যথেষ্ট আলো, তবে কামরাটা মোটেও পরিচ্ছন্ন বা সাজানো নয়। একটা স্পেস স্টেশনের ব্রিফিং রুম কেমন হয় জানা আছে রানার, তাই মেলাতে পারল না। কাঠের দুটো পুরানো চেয়ারে দু’জন অ্যাস্ট্রনট বসে আছে। কেউই স্পেস সুট পরেনি। হাতে সাদা চক নিয়ে ব−্যাকবোর্ডের সামনে স্ফাড়িয়ে কী যেন বোঝাচ্ছে তাল্ডে মেজর বারাইদি। সামনের দিকে আরেকটু ঝুঁকে কান পাতল রানা। ‘...আমরা, ইহুল্ডিা, কখনও নিঃশেষ হয়ে যাই না। মরতে মরতে আবার বেঁচে উঠি। বাঁচিও বাঁচবার মত, দুশমনকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে, নরকের স্বাদ পাইয়ে দিয়ে। ‘তবে আমরা অনেক ভুগেছি। জার্মানরা আমাল্ডে মেরেছে। এখন আরবরা আত্মঘাতী হয়ে মারছে। গোটা ইসলামী বিশ্ব আমাল্ডে বিরুদ্ধে। ‘এখন সময় হয়েছে ওল্ডেকে ভোগাবার, শায়েস্তা করার। এই দেখো, মুসলিম বিশ্বের ম্যাপ।’ গোল পাকানো একটা মানচিত্র খুলে বোর্ডের গায়ে ঝুলিয়ে দিল বারাইদি। ‘লক্ষ করো, দুনিয়ার প্রায় সব মুসলমান জড়ো হয়ে আছে এশিয়া আর আফ্রিকায়। সব মিলিয়ে এক-ষ্ণেশো কোটি হবে। সংখ্যাটি বড় কথা নয়, বড় কথা শত্র“তা। ‘ওরা, মুসলমানরা, চায় দুনিয়ার বুক থেকে ইহুল্ডিা চিরকালের জন্য নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক। কিন্তু ঈশ্বর তো আমাল্ডে পক্ষে। সেজন্যেই তো বড় বড় সব বিজ্ঞানী ইহুল্ডি ঘরেই জন্মায়। ‘আমরা নই, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে মুসলমানরা। ওরা মৌলবাদী, গোঁড়া, আধুনিক বিশ্বে পুরোপুরি বেমানান। ‘হ্যাঁ, আমরাই ওল্ডেকে নিশ্চিহ্ন করব। অথচ, মজার কথা হলো, ওরা টেরটিও পাবে না কে বা কারা ওল্ডেকে মেরে ফেলছে। ‘ইচ্ছে করলে আমরা রাতারাতি ওল্ডেকে পুড়িয়ে মারতে পারি। তবে সেটা বিশ্ব পরিবেশের জন্যে ক্ষতিকর হয়ে দেখা দিতে পারে। ‘আমরা ওল্ডে নদ-নদী, পুকুর-ডোবা, লেক, বিল ইত্যাদি জলাশয়ের সমস্ত পানি বাষ্পে পরিণত করব। প্রথমে ধরা হবে বাংলাদেশকে, কারণ ফকিরনীল্ডে ওই দেশ থেকে প্রায়ই হামাস আর ইয়াসির আরাফাতকে সাহায্য করার জন্যে স্পাই আসে। ‘এবারও সেরকম একজন এসেছে। লোকটাকে আমি আমার পরম শত্র“ বলে মনে করি। তার নির্দেশে হামাস জঙ্গীরা আমার পেটে বিস্ফোরক ভর্তি ক্যাপসুল ঢুকিয়ে দিয়েছিল, তুফার মিলিটারি হাসপাতালে গিয়ে অপারেশন করে সেটা বের করতে ৫৩ হয়েছে।’ রানার কাঁধ দুটো সামান্য ঝুলে পড়ল। ‘...প্রথমে পানি কেড়ে নেব, তারপর জ্বালিয়ে èে ফসল। এক-ষ্ণেশো কোটি মানুষের মুখের খাবার কেড়ে নেয়ার ক্ষমতা আমাল্ডে আছে। ‘এবার অন্য একটা প্রসঙ্গ। রাশিয়া বা চীন মহাশূনেঞ্জামাল্ডে সামরিক তৎপরতায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে, তাই স্পেস স্টেশনে পৌঁছে মিলিটারি কমপে−ক্সে অপটিক্যাল অবজারভেশন ইকুইপমেন্ট ফিট করবে তোমরা, আমাল্ডে রেইডারে যাতে ওল্ডে মিসাইলের গতিবিধি ধরা পড়ে।’ হাতঘড়ি দেখল বারাইদি। ‘সময় হয়ে এসেছে, কাজেই তোমাল্ডেকে আর বেশিক্ষণ আটকে রাখব...’ বারাইল্ডি কথা শুনতে শুনতে চিন্তা করছিল রানা। আইডিয়াটা হঠাৎ ঢুকল মাথায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে একটাই কাজ করবার আছে। সুরাইয়ার কনুই ধরে টান দিল রানা, জানালার পাশ থেকে সরিয়ে আনল গাঢ় ছায়ার ভিতর। ‘মন দিয়ে শোনো,’ ফিসফিস করে বলল ও। ‘দু’বার বলার সময় না-ও পেতে পারি। অ্যাস্ট্রনটরা একটু পরেই রওনা হবে। তুমি জানো কোথায় ওরা সুট পরে? মানে, কোন দালানটায়?’ ‘এটার পাশের দালানে,’ বলে রানার পিছন দিকের একটা একতলা ভবন দেখাল সুরাইয়া। ‘গুড। শোনো, ওল্ডে একটা সুট পরে অ্যাস্ট্রনট সাজব আমি...’ ‘পাবে কোথায়?’ ‘ওরা যখন পরার জনেঞ্জাসবে, একটা সুট বাগিয়ে নেব আমি,’ বগলের কাছাকাছি হাতের ভিতর দিকে স্ট্র্যাপ দিয়ে আটকানো ছুরিটা ইঙ্গিতে দেখাল রানা। বোঝাতে চাইল ছুরি মেরে কাবু করবে একজন অ্যাস্ট্রনটকে, তারপর তার কাছ থেকে সুটটা কেড়ে নেবে। ‘তারপর?’ জানতে চাইল সুরাইয়া। ‘তারপর খেয়াযান জুবিলিতে চড়ে স্পেস স্টেশন অ্যাবিতে উঠে যাব।’ মাথা নাড়ল সুরাইয়া। ‘এতে কাজ হবে না,’ বলল সে। ‘তোমার প−্যান মোটেও সুচিন্তিত নয়।’ ‘কী বলতে চাও?’ ‘বলতে চাই এই যে অ্যাস্ট্রনট একজন নয়, দু’জন। আর তুমি যদি খেয়াল করে না থাকো তো বলিÑদু’জনের মধ্যে একজন মেয়ে। এর মানে হলো, তুমি শুধু লোকটার জায়গা দখল করতে পারবে। অর্থাৎ দু’জনের কাজ একা করতে হবে তোমাকে।’ দু’জনের একজন যে মেয়ে, ব্যাপারটা রানা সত্যি খেয়াল করেনি। এর কারণ সম্ভবত দু’জনেই প্যান্ট-শার্ট পরে ছিল, মেয়েটার চুলও পুরুষল্ডে মত ছোট করে কাটা। ‘তা ছাড়া, তোমার কি অ্যাস্ট্রনট ট্রেনিং নেয়া আছে? লঞ্চ কাউন্টডাউন শুরু হলে তুমি কোন ভুল করবে না, এরকম নিশ্চয়তা দিতে পারো?’ রানা স্বীকার করল, আনুষ্ঠানিক ট্রেনিং নেয়নি কখনও। তবে যুক্তি দেখাল, ‘অ্যাস্ট্রনটল্ডে আসলে প্রায় প্যাসেঞ্জারই বলা যায়। তা ছাড়া, গ্রাউন্ড থেকে রিমোটের সাহায্যে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করা হয়। হ্যাঁ, আমাকে হয়তো অভিনয় করতে হতে পারে।’ ‘তোমার ভাষাই, অর্থাৎ বাচনভঙ্গি, তোমাকে ধরিয়ে দেবে।’ ‘না হয় তোতলাব। শোনো, সুরাইয়া, তোমার কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু আমার সামনে অন্য কোন উপায় নেই। আমাকে স্পেস স্টেশন অ্যাবিতে পৌঁছাতেই হবে। ওটাকে আমি ধ্বংস করব অরবিট-এ।’ ‘তুমি মারা যাবে।’ ৫৪ ‘সম্ভাবনা আছে,’ গম্ভীর সুরে স্বীকার করল রানা। ‘তবে এ রকম ঝুঁকি নেয়াটা আমার পেশার অঙ্গ।’ ‘তোমার প−্যানে একটা মেয়ের প্রয়োজনÑআমাকে,’ সুরাইয়ার কণ্ঠ¯ল্ফ আশ্চর্য দৃঢ় শোনাল। দশ সেকেন্ড চিন্তা করল রানা। ‘বেশ।’ রানার একটা হাত ধরে মৃদু চাপ দিল সুরাইয়া। ‘ধনল্টাদ।’ লেকচার হল সংলগ্ন রেডি-রুমে ঢুকবার সময় ফাঁকা করিডর ধরে পা টিপে হাঁটল ওরা, অন্য একটা জানালা দিয়ে দেখল এখনও অ্যাস্ট্রনট দু’জনকে নির্দেশ দিচ্ছে মেজর বারাইদি। রেডি-রুমে ঢুকেই প্রেশার সুট রাখবার র‌্যাকগুলো দেখতে পেল রানা। ওগুলোর সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পরীক্ষা করে দেখছে ওর কাঠামোয় কোন্টা ফিট করবে। যে যার সাইজ খুঁজে নিয়ে সুট পরে নিল ওরা। ‘হেলমেট আটকাতে সাহায্য লাগবে,’ সুরাইয়াকে বলল রানা। পরস্পরকে হেলমেট পরাল ওরা। ‘আর পনেরো মিনিট পর লঞ্চ,’ অ্যাড্রেস সিস্টেম থেকে ঘোষণা প্রচারিত হলো। ‘অ্যাস্ট্রনট ক্রুরা শাটল্ জুবিলিতে চলে যান।’ মুখ তুলে লাউডস্পিকারের দিকে তাকাল রানা, তারপর হাতঘড়ি দেখল। এখন থেকে ঠিক ত্রিশ মিনিট পর বিস্ফোরণ ঘটবে। ‘আমি আমার বসকে একটা মেসেজ পাঠাই,’ বলে শার্টের বুক পকেট থেকে একটা ফাউন্টেন পেন টেনে নিয়ে খুলল রানা। নিবের মাথা ধরে টান দিতে সরু তার বেরুল, ইঞ্চি দেড়েক লম্বা। ওটা আসলে এরিয়াল। কলমের নীচের অংশটা ধরে দু’বার মোচড়াল, ইলেকট্রিক পাওয়ার তৈরি হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে নিবের পাশ থেকে আগুনের একটা ফুলকি ছুটল। টেলিগ্রাফ কী বল্টহার করে কোডেড মেসেজ পাঠাল রানা বিসিআই হেডকোয়ার্টার ঢাকায়। বলে রাখল, মহাশূন্য থেকে উত্তর কোরিয়ার স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করবে। এই বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সি যদি মনিটর করা হয়, ইজরায়েলি রেডিও টেকনিশিয়ানরা জেনে ফেলবে যে এখান থেকে কেউ একটা মেসেজ পাঠিয়েছে। তবে কে পাঠিয়েছে জানতে সময় লাগবে। ততক্ষণে মাটির বুক থেকে একশো বিশ মাইল উপরে থাকবে রানা। যাচ্ছে মহাশূন্যে, সেখানে জেলিগনাইট বা পিস্তলের হয়তো কোন কাজ নেই, তবু ওগুলো রানা ফেলে যাচ্ছে না। রেডি-রুম থেকে বেরুতে যাবে ওরা, এই সময় আঁতকে উঠল সুরাইয়া, খপ্ করে রানার একটা হাত ধরে বাধা দিল এগোতে। ‘ওরা এদিকে আসছে!’ ফিসফিস করল সে, ভয়ে ভেঙে গেছে কণ্ঠ¯ল্ফ। ইঙ্গিতে বাইরের করিডরটা দেখাল। ‘কিছু একটা করো!’ সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি করল রানা, ওর প−্যানটা কাজে লাগল না। শাটলে চড়ে স্পেস স্টেশন অ্যাবিতে যাওয়া এখন আর সম্ভব নয়। অ্যাস্ট্রনট দু’জনের সঙ্গে মেজর বারাইত্থি আসছে। ওল্ডে পাশে রয়েছে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত ছ’জন গার্ড, হাতে বাগিয়ে ধরা সাবমেশিন গান। কামরার চারদিকে তাকিয়ে পালাবার পথ আছে কিনা দেখল রানা। নেই। সুরাইয়াকে নিয়ে ঘরটার ভিতর আটকা পড়ে গেছে ও। সশস্ত্র গার্ড যেভাবে ট্রিগারে আঙুল পেঁচিয়ে রেখেছে, কল্পনার চোখে এই মুহূর্তে নিজেল্ডে লাশ ছাড়া আর কিছু দেখতে পাচ্ছে না রানা। ৫৫ দশ ‘রানা, ওরা...’ আতঙ্কে সুরাইয়ার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরুচ্ছে না। আড়ষ্ট ভঙ্গিতে তাকে ধরে ঝাঁকাতে চেষ্টা করল রানা। হাতে ভারী আর মোটা গ−াভস, পরনে কষ্টকর বোঝার মত চেপে আছে স্পেস সুট, নড়াচড়ায় বাধা পাচ্ছে ওÑসুরাইয়াকে শুধু র‌্যাকের গায়ে চেপে ধরতে পারল। তবে এই নড়াচড়া ওকে আত্মরক্ষার একটা উপায় দেখিয়ে দিল, অনেকটা যেন চোখে আঙুল দিয়েই। দৌড়ে বা পালিয়ে নয়, সেটা হবে আত্মহত্যার সামিল; বাঁচতে হলে নিজেল্ডেকে একজোড়া খালি স্পেস সুট হিসাবে চালাতে হবে, যেন ঝুলে আছে র‌্যাকে। ‘চুপ!’ হিসহিস করল রানা। ‘সুটটা যে খোপ থেকে নিয়েছ সেটার ভেতর ঢুকে পড়ো। নড়বে না। এমনকী নিঃশ্বাসও ফেলো না, কারণ ফেসপে−টে বাষ্প জমতে পারে। ভান করো তুমি একটা খালি সুট।’ আর কিছু বলবার বা করবার সময় পাওয়া গেল না। দুই অ্যাস্ট্রনটকে নিয়ে রেডি-রুমে ঢুকতে যাচ্ছে বারাইদি। ওল্ডে দু’পাশে সশস্ত্র গার্ডরা মারমুখো ভঙ্গিতে চারদিকে চোখ বুলাচ্ছে। দ্রুত ঘুরল রানা, চওড়া কাঁধ দুটো র‌্যাকের সরু খোপে ঢোকাল, তারপর চেষ্টা করল নি®প্রাণ জড়পদার্থ হতে। চেষ্টাটা নিশ্চয় সফল হচ্ছে, কারণ কেউ তারা ওর দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে না। হেলমেটে লাগানো ব−াস্ট ভাইজার নামিয়ে দিয়েছে রানা, ফলে মুখটা সম্পূর্ণ চাপা পড়ে আছে। তবে পাতলা প−াস্টিকের ভিতর থেকে ওল্ডে কথাবার্তা প্রায় সবই স্পষ্টভাবে শুনতে পাচ্ছে। ‘ফিরে এলে সামরিক এবং রাষ্ট্রীয় মেডেল পাবে তোমরা,’ বলল বারাইদি। হাসি হাসি মুখ করে পুরুষ অ্যাস্ট্রনট কাপড় ছাড়ছে। মেয়েটা প্যান্ট-শার্টের উপরই পরছে স্পেস সুট। ‘ক্যাপসুলে টার্গেটিং কমপিউটার তোলা হয়েছে তো, মেজর?’ জানতে চাইল সে। এই সময় তীক্ষè একটা আওয়াজ শুনল রানা, যেন ওর পাশেই কোথাও খুদে একটা পটকা ফেটেছে। শব্দটা মুহূর্তের জন্য বিমূঢ় করে তুলল ওকে। তারপর উপলব্ধি করল, আসলে কী ঘটেছে আর কোথায় ঘটেছে। সুটের পজিশন না বদলে হেলমেটের ভিতর মাথাটা ঘোরাল রানা, দেখল সুরাইয়ার স্পেস সুট কাঁপছে। সে হাঁচি দিয়েছে। ‘কীসের শব্দ হলো?’ জিজ্ঞেস করল বারাইদি। চট করে একবার গার্ডল্ডে উপর চোখ বুলাল। তারা মারমুখো ভাব নিয়ে কামরার চারদিকে তাকাচ্ছে, হাতের মেশিন গান তৈরি। ‘ও কিছু না,’ মেয়েটা বলল। ‘এগুলো কী?’ রানা আর সুরাইয়ার পরিত্যক্ত কাপড়চোপড়ে স্পেস-বুট পরা পা দিয়ে খোঁচা মারল সে। ‘এ-সব তো আমাল্ডে কারও নয়।’ ‘গাÑ’ শুরু করল বারাইদি। দ্রুত তাকে চুপ করাল রানা। পরনে বিদঘুটে স্পেস সুট না ৫৬ থাকলে পরপারেই পাঠিয়ে দিত, তার বদলে প্রচণ্ড এক ঘুসি মেরে অজ্ঞান করল। মেঝেতে ঢলে পড়ল সে। অকস্মাৎ একটা স্পেস সুট জ্যান্ত হয়ে ওঠায় মুহূর্তের জন্য হলেও একটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হলো, আর সেটাই বাঁচিয়ে দিল রানাকে। গার্ডরা ওর দিকে অস্ত্র ঘোরাবার আগেই নিজের ওয়ালথার বের করে ট্রিগার টিপতে শুরু করেছে ও। দ্রুত চারটে গুলি করায় বাকি গার্ডরা কামরা ছেড়ে পালাল। একটা সাবমেশিন গানের এক পশলা গুলি বর্ষণে মারা গেল অ্যাস্ট্রনটল্ডে একজনÑমেয়েটা। গার্ড কমান্ডার হুংকার ছেড়ে ফায়ারিং বন্ধ করতে বলল, সে চাইছে না মেজর বারাইজ্ঝিার অবশিষ্ট অ্যাস্ট্রনটও মারা যাক। ‘জলদি, সুরাইয়া! এখান থেকে বেরুতে হবে!’ ‘কী ভাবে, রানা?’ ‘প্রথমে বাধাগুলো সরাই,’ বলে ওয়ালথার সরিয়ে রেখে মেঝে থেকে একটা সাবমেশিন গান তুলে নিল রানা। পুরুষ অ্যাস্ট্রনট এই মাত্র একটা মেশিন গান তুলে নিয়ে ওল্ডে দিকে ঘোরাচ্ছে। সেটা সে অর্ধেকও ঘোরাতে পারেনি, তার বুক ঝাঁঝরা করে দিল রানা। ঘুরল ও, এবার বারাইল্ডি পালা। কিন্তু গার্ড কমান্ডার ইতিমধেশুানার ভূমিকা টের পেয়ে গেছে। ওকে লক্ষ্য করে ছুটল সে। দু’জন একসঙ্গে গুলি করল। তবে, স্পেস সুট পরা অবস্থায়ও, রানার লক্ষঞ্জব্যর্থ। ‘রেডিওতে মেসেজ পাঠিয়ে আরও সৈনঞ্জানাবে ওরা,’ বলল সুরাইয়া, একটা ঢোক গিলে নিজেকে শান্ত রাখবার চেষ্টা করল। গার্ড কমান্ডারের মেশিন গানটা মেঝে থেকে তুলে নিয়ে পিছু হটে জানালার পাশের দেয়ালে পিঠ ঠেকাল। চট করে একবার চোখ বুলাল বাইরে। আপাতত ওরা এখানে নিরাপদ। বারাইদিকে শেষ করবার জনঞ্জারেকবার অস্ত্র তুলল রানা, কিন্তু হঠাৎ করে খোলা ল্ডজা দিয়ে ঝাঁক ঝাঁক বুলেট ঢুকতে দেখে প্রাণ হাতে করে পালাবার পথ খুঁজতে হলো। খুলবার সময় নেই, বন্ধ জানালা লক্ষ্য করে ডাইভ দিল ও। পানির মত সহজেই ভাঙল কাঁচগুলো, তবে পাতলা প−াস্টিকের হেলমেট হওয়ায় মাথায় বেশ জোরাল একটা ধাক্কা লাগল। রানার পিছু নিয়ে হুড়মুড় করে জানালার নীচে পড়ল সুরাইয়া, সঙ্গে মেশিন গান থাকায় ভঙ্গিটা আড়ষ্ট। চোখ বুলিয়ে বাইরের দৃশন্ধা দেখে নিল রানা। এরই মধ্যে স্পটলাইটগুলো জ্বলে উঠেছে। মাথার উপর স্থির হয়ে রয়েছে একজোড়া হেলিকপ্টার গানশিপ, ওগুলোর ২০ এমএম কামান নিঃসন্দেহে মারাত্মক একটা হুমকি। রুপালি স্পেস সুট পরে থাকায় পাইলটরা ওল্ডেকে পরিষ্কার চিনতে পারছে। ‘ট্রাক, রানা!’ হাত তুলে দেখাল সুরাইয়া। ‘লঞ্চ প্যাডের ওদিকেই যাচ্ছে।’ স্পেস সুট দেখে সরল বিশ্বাসে ট্রাক থামাল ড্রাইভার। থুতনির নীচে মেশিন গানের মাজল চেপে ধরে তাকে নীচে নামাল রানা। হুমকি শুনে এক সেকেন্ডও দেরি করল না, উল্টো দিকে দৌড় দিল সে। ড্রাইভিং সিটে উঠে বসে ট্রাক ছেড়ে দিল রানা। ‘আমরা ভুল পথে যাচ্ছি,’ দু’মিনিটও হয়নি, ওর পাশ থেকে বলল সুরাইয়া। ‘সরাসরি রকেটটার কাছে যাওয়া সম্ভব নয়। সামনে তাকাও।’ সামনেই তাকিয়ে আছে রানা, কী ঘটছে দেখতেও পাচ্ছে। এরই মধ্যে লঞ্চ প্যাডের দিকে যাওয়ার প্রতিটি রাস্তায় সৈনশুা ব্যারিকেড দিতে শুরু করেছে। ট্রাক দিয়ে ব্যারিকেড ভাঙবার কথা ভাবল ও। চিন্তাটা সঙ্গে সঙ্গে বাতিলও করে দিল। ঝাঁক ঝাঁক গুলি করে চাকা বলে কিছু রাখবে না সৈনশুা। ৫৭ ওল্ডে আরও ভারী, আরও মজবুত কিছু ল্ডকার। আর্মারড্ কিছুÑযেটা গায়ের জোরে ব্যারিকেড গুঁড়িয়ে দিয়ে এগোবে। সে রকম একটা দেখতেও পেল রানা। ওল্ডে পিছু পিছু আসছে একটা আর্মারড্ হাফ-ট্রাক। দেরি না করে ইউটার্ন নিল রানা, ফুল ট্রাক সোজা তুলে দিল আর্মারড্ হাফ-ট্রাকের গায়ে। সংঘর্ষের মুহূর্তে চিৎকার দিল সুরাইয়া, তবে লাফ দিয়ে নীচে নেমে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে সে-ই আগে ছুটছে। আরেক ল্ডজা দিয়ে রানাও নামল, সংঘর্ষের সময় ড্যাশবোর্ডের সঙ্গে হেলমেটটা ঠুকে যাওয়ায় কিছুটা আচ্ছন্ন বোধ করছে। এক পশলা বুলেট বর্ষণে সুরাইয়ার হাতে মারা পড়ল হাফ- ট্রাকে যে-ক’জন সৈনিক ছিল। ‘পিছনে ওঠো,’ নির্দেশ দিল রানা। ‘পিছু নিয়ে কেউ এলেই গুলি করবে। তবে সাবধান, মাথাটা বেশি ওপরে তুলো না।’ যেন মনে হলো কোন øাইপার ওর কথা শুনতে পেয়েছে, অকস্মাৎ একটা জোরালো ধাক্কা অনুভব করল হেলমেটে। সামান্য ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে বুলেটটা। হোঁচট খেয়ে দুই কদম সামনে বাড়ল রানা, তারপর ভারসাম্য ফিরে পেয়ে স্থির হলো। ট্রিগারের পেঁচানো আঙুলটায় টান পড়ল, চারদিকে কয়েক পশলা গুলি করল রানা। মেশিন গান নিঃশেষ হয়ে যেতে ছুঁড়ে ফেলে দিল, লাফ দিয়ে উঠে বসল হাফ-ট্রাকে। স্টার্ট ত্থেয়াই ছিল, ভারী আর্মারড্ ভেহিকেল ব্যারিকেড লক্ষ্য করে ছুটল। স্পীড ঘণ্টায় ত্রিশ কিলোমিটার। গায়ে স্পেস সুট আর মাথায় হেলমেট থাকা সত্ত্বেও সরাসরি সংঘর্ষে শরীরের সমস্ত হাড় যেন পরস্পরের সঙ্গে ঠুকে গেল। সামনের চাকা বাধা পেয়ে উপরে উঠল, বাধা উতরে এল, তারপর অ্যাসফ্যাল্ট টারমাকে কামড় বসাল ট্র্যাক। খুদে একটা রকেটের মত হাফ-ট্রাকের নাক উঁচু হলো, পরমুহূর্তে তীরবেগে ছুটল। প্রচণ্ড ঝাঁকি খেল ওরা, ইঞ্জিনকে আবার খেপিয়ে তুলল রানা। ওদিকে পিছন থেকে ধাওয়া করছে সৈনশুা। অবশ্য সুরাইয়ার মেশিন গান দূরে সরিয়ে রেখেছে তাল্ডে। আর যাই হোক, গুলি করে সৈনশুা পিছনের টায়ার ফুটো করতে পারবে নাÑযেহেতু চাকার কোন অস্তিত্বই নেই। ট্র্যাকের ধাতব স্ফাত পাকা রাস্তা কামড়ে ছুটছে, সামনের চাকা ফেটে চ্যাপ্টা হয়ে গেলেও কোন সমস্যা হচ্ছে না। ‘বুলেট শেষ!’ সুরাইয়ার চিৎকার শুনল রানা। এখন আর কিছু আসে যায় না। রকেটের কাছাকাছি চলে এসেছে ওরা। মনে মনে রানা প্রার্থনা করছে অটোমেটিক সিকোয়েন্স যেন ইন্টারনেট-এ যেমন দেখেছে সে রকমই হয়Ñকাউন্টডাউন একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছালে, লঞ্চ প্রক্রিয়া সচলই থাকবে, কোন অবস্থাতেই বন্ধ হবে না। কোথাও যদি কোন বিচ্যুতি ঘটে, গোটা রকেট ধ্বংস হয়ে যাবে। ধ্বংস! শব্দটা কী যেন মনে করিয়ে দিতে চাইল রানাকে। কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই ওর। পরে দেখা যাবে। ‘কী ঘটছে, সাÑ?’ রকেটের গোড়ায় স্ফাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল একজন গ্রাউন্ড ক্রু। কথাটা তাকে শেষ করতে দিল না রানা। ফ্লাইং কিক মারল ও। ছিটকে পড়ল লোকটা, রক্ত আর ভাঙা স্ফাত বেরুল মুখ থেকে। সুরাইয়াকে ধরে প্রায় ছুটিয়ে নিয়ে এল রানা। রকেটের গোড়ার কাছাকাছি এটা একটা ইস্পাতের ল্ডজা। ঢুকে দেখে ভাগ্য সুপ্রসন্ন। কামরাটা অ্যাস্ট্রনটল্ডে জন্য তৈরি করা একটা স্টেজিং এরিয়া। এখান থেকে একটা ধাতব খাঁচা সরাসরি রকেটের কাছে ৫৮ পৌঁছেছে। আসলে ওটা একটা এলিভেটর, অ্যাস্ট্রনটল্ডে ক্যাপসুলে তুলে দেয়। ক্যাপসুলটা তিন প্রস্থ বুস্টার রকেটের মাথার দিকে। ‘কে আপনি?’ কামরার ভিতর পা রাখতেই চ্যালেঞ্জের সুরে জানতে চাইল এক লোক। তার ওভারঅলের কলার খামচে ধরে টান মারল রানা, তারপর ছেড়ে দিল। ধাতব দেয়ালে বাড়ি খেল সে, তারপর নেতিয়ে পড়ল মেঝেতে। গোটা দুয়েক লাথি মেরে খোলা ল্ডজা দিয়ে বাইরে ফেলে দিল রানা তাকে। ছুটে আসা সৈন্যল্ডে ছোঁড়া একটা বুলেট ওর কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। ইস্পাতের ভারী ল্ডজা বন্ধ করছে, লোকটা কাতর কণ্ঠে বলল, ‘আর মাত্র দশ মিনিট পর লঞ্চ। পি−জ...’ বাকিটা রানার শুনবার ধৈর্য হলো না, ল্ডজা বন্ধ করে বোল্ট টেনে দিল। ‘সুরাইয়া, খাঁচাটা নীচে নামাও!’ লাল একটা বোতামে ঝাপটা মারল সুরাইয়া। সঙ্গে সঙ্গে ইলেকট্রিক মোটর স্টার্ট নেওয়ার গুঞ্জন শোনা গেল। এলিভেটর নীচে নামছে। এলিভেটরের ভিতরে চড়ে রানার জনঞ্জপেক্ষা করছে সুরাইয়া। ‘কী হলো, রানা?’ ডাকল সে। ল্ডজার গায়ে জেলিগনাইটের শেষ স্টিকটা বসাচ্ছে রানা, জবাব দিল না। ঠিক বাইরেই জড়ো হয়েছে সৈনশুা, ল্ডজাটা কী ভাবে খোলা বা ভাঙা যায় পরামর্শ করছে। তাই মাত্র দশ সেকেন্ড পর বিস্ফোরণ ঘটাবার বল্টস্থা করল ও। এক ছুটে এলিভেটরে ঢুকল রানা। ঢুকবার মুহূর্তে শক ওয়েভের ধাক্কা খেল পিঠে। সুরাইয়ার বাড়ানো দু’হাতের মাঝখানে পৌঁছে গেল ও। ‘খাঁচা উপরে তোলো!’ বিস্ফোরণে ইস্পাতের ল্ডজা উড়ে গেছে, মারা গেছে কম করেও দশজন ইজরায়েলি সৈন্য। আহতল্ডে সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার কথা। অক্ষত সৈনশুা তাল্ডেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠল। স্টেজিং এরিয়ায় ঢুকতে সাহস পাচ্ছে না কেউ। তবে কয়েক ঝাঁক বুলেট ছুটে এল। খাঁচার পাশে লেগে এদিক সেদিক ছিটকে গেল সেগুলো, জাল ফুটো করে একটাও ঢুকল না ভিতরে। রকেটটা বিশতলা বাড়ির সমান উঁচু, ধীরগতি এলিভেটর পৌঁছাতে প্রচুর সময় নিল। এমনকী ল্ডজাটাও যন্ত্রণাদায়ক মন্থরতার সঙ্গে খুলছে। তবে রানার শক্ত করা একটা মুঠো বিদ্যুৎবেগে ছুটল। জুত মত লাগায় টেকনিশিয়ান লোকটার চোয়াল ভেঙে গেল। পড়ে যাচ্ছে, ধরে তাকে খাঁচায় বের করে আনল রানা। ‘আর কেউ আছে এখানে?’ গলা চড়িয়ে জিজ্ঞেস করল রানা। ক্যাপসুলের চারদিকটা দেখে নিয়ে সুরাইয়া নিশ্চিত করল, আর কেউ নেই। খেয়াযান জুবিলির হ্যাচ ক্ষুধার্ত গণ্ডারের মুখের মত ফাঁক হলো। ভিতরে তাকিয়ে বহুরঙা ইন্ডিকেটর লাইট জ্বলতে নিভতে দেখল রানা। সুরাইয়ার পিছু নিয়ে ভিতরে ঢুকল ও। পাইলটের সিটে বসল ও। হ্যাচ বন্ধ করে ওর পাশের সিটে চলে এল সুরাইয়া। কন্ট্রোল প্যানেলের একটা টাইমারে কাউন্টডাউন-এর স্টেটাস দেখা যাচ্ছে। আর তিন মিনিট পর টেক-অফ। ৫৯ এগারো ধ্বংস! আবার সেই অস্বস্তিকর চিন্তাটা উদয় হলো রানার মাথায়। কী যেন মনে পড়তে চাইছে। এবার তাগাদাটা খুব জোরালো। তারপর, অবশেষে, মনে পড়ল। গড়গড় করে অনেক কথা বলে গেছে বারাইদি, তার ভিড়ে চাপা পড়ে গিয়েছিল তথন্ধা। ইজরায়েলিল্ডে খেয়াযান বিদেশে তৈরি। কোন কারণে ওটা যদি পথ হারিয়ে অন্য কোনও দিকে ছোটে, তা হলে বিপদ। যে দেশে গিয়ে পড়বে সে দেশের সরকার জেনে ফেলবে ইজরায়েলকে কারা রকেট বা স্পেস ক্যাপসুল সরবরাহ করেছে। সেজন্য প্রতিটি মহাশূন্যযানের ভিতর বোমা ফিট করেছে তারা। যদি দেখে ওগুলো বিপথে চলে যাচ্ছে, রিমোটের সাহায্যে গ্রাউন্ড থেকেই ফাটিয়ে দিতে পারবে। বারাইদি বেঁচে আছে। সৈনশুা আছে খেপে। রিমোট বল্টহার করে বোমাটা না ফাটাবার কোন কারণ নেই। ফাটলে রানা আর সুরাইয়াকে দুনিয়ার বুক থেকে বিদায় নিতে হবে। কন্ট্রোল প্যানেলে চোখ বুলাবার সময় নিজেকে বোকা বোকা লাগল রানার। এর আগেও রকেটে চড়েছে, কিন্তু সেগুলোর সঙ্গে এটার কন্ট্রোল প্যানেলের কোনই মিল খুঁজে পাচ্ছে না। শুধু যে নতুন তা নয়, অত্যন্ত জটিলও লাগছে। সঠিক নিয়ম ধরে, সাবধানে কন্ট্রোল প্যানেল অপারেট করতে হবে। সামান্য একটু ভুলের পরিণতিতে এত বড় খেয়াযান স্রেফ এক রাশ ধোঁয়া হয়ে যেতে পারে। ‘আমরা কী করব বলো তো? অ্যাস্ট্রনটল্ডে কাজ নিশ্চয়ই হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়?’ জিজ্ঞেস করল সুরাইয়া। ‘না। কিন্তু কী করব বুঝতে পারছি না। এরকম কন্ট্রোল প্যানেল আগে কখনও দেখিনি আমি।’ ‘তুমি আমাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছ,’ বলল সুরাইয়া, সিরিয়াস। প্রথম কাজ বেঁচে থাকবার বল্টস্থা করা, ভাবল রানা। ‘বাতাস! আমাল্ডে অক্সিজেন ল্ডকার। হোস খোঁজো, সেগুলো আমাল্ডে সুটে আটকাতে হবে।’ মোটা গদি লাগানো কাউচ-এর কাছাকাছি, নাগালের মধ্যে ডুয়েল অক্সিজেন ফিড আর এগজস্ট টিউব পাওয়া গেল। এয়ার সিস্টেমের সঙ্গে পরস্পরকে সংযুক্ত করল ওরা। হিলিয়াম-অক্সিজেনের মিকশ্চার সুটের ভিতর ছড়িয়ে পড়তে গরম ভাবটা দূর হলো। ‘এরপর কী?’ আবার জানতে চাইল সুরাইয়া। কন্ট্রোল প্যানেলের মিটমিটে আলোগুলোর উপর চোখ বুলাচ্ছে রানা। একটা ঘড়ি ওর দৃষ্টি কাড়ল। আন্দাজ করল, এটাই কাউন্টডাউন ক্লক। আর পুরো দু’মিনিটও বাকি নেই। ‘প্যানেলে কোন লাল আলো জ্বলে কি না খেয়াল রাখো,’ সুরাইয়াকে বলল রানা। ‘লাল মানেই যেহেতু বিপদ, দেখামাত্র নেভাবার বল্টস্থা করবে।’ ওর চোখেই সেরকম, অর্থাৎ লাল, একটা আলো ধরা পড়লÑঘন ঘন জ্বলছে আর নিভছে। ওটার নীচের বোতামটায় হাত দিয়ে ঝাপটা মারল রানা। মিট মিট করা বন্ধ হলো, তবে যেন কোন দৈতেশু চোখের মত নিষ্পলক তাকিয়ে আছেÑনিভছে না। তারপর হঠাৎ সবুজ হয়ে গেল। কন্ট্রোল প্যানেল জটিল তো বটেই, মার্কিং আর রাইটিংগুলোও ইংরেজি বা হিব্র“তে লেখা হয়নি, লেখা হয়েছে সাংকেতিক ভাষায়। ৬০ প্রথম কাজ প্রাণ বাঁচানো। ‘সেফটি হারনেস!’ বলল রানা। ‘হারনেস! জলদি!’ সময় আছে মাত্র এক মিনিট চার সেকেন্ড। দু’জনেই ওরা ব্যস্ত হাতে সেফটি হারনেস পরছে। কাজটা শেষ হওয়ার পর আবার ঘড়িটার দিকে তাকাল রানা। ওরা মহাশূন্যে নিক্ষিপ্ত হবে এখন থেকে ঠিক আটান্ন সেকেন্ড... সাতান্ন সেকেন্ড... ছাপ্পান্ন সেকেন্ড পর। ‘মেজর এবরান বারাইèিলছি,’ রেডিও থেকে ভেসে এল মোসাদ এজেন্টের কণ্ঠ¯ল্ফÑএত কর্কশ, কেউ যেন কংক্রিটের উপর কোদাল ঘষছে। ‘স্পাই দু’জনকে নির্দেশ দিচ্ছি, তোমরা যারা আমাল্ডে খেয়াযান জুবিলির ভেতর লুকিয়েছ। সময় থাকতে আত্মসমর্পণ করো, তা না হলে মারা পড়বে। আমরা অপেক্ষা করছি, ক্যাপসুল থেকে বেরিয়ে এসো।’ ‘রানা!’ হাত বাড়িয়ে রানার কনুই ধরল সুরাইয়া। ‘শান্ত হও। ওর কথায় কান দিয়ো না। একটা নির্দিষ্ট পয়েন্টে পৌঁছানোর পর এ-সব আপনা থেকেই ফায়ার হয়। জুবিলিকে এখন ওরা ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।’ ‘আঙুল চোষো, বারাইদি,’ হেলমেট মাইক্রোফোনে বলল রানা। ‘ও, আচ্ছা, তা হলে যা সন্দেহ করেছি তাইÑতুমি রানা!’ ‘এটা কী সন্দেহ করার মত কিছু? আমিই তো, এখানে আমারই তো থাকার কথা।’ একটু থেমে আবার বলল রানা, ‘সিকোয়েন্সিং ক্লক বলছে, আর ত্রিশ সেকেন্ড সময় আছে।’ ‘তুমি বাঁচবে না, রানা। এটা একেবারে ধ্র“ব সত্য। যদি না এখনই ধরা দাও।’ ‘তুমি বরং তোমার সৈন্যল্ডে সরিয়ে নাও। রকেট ওয়াশ ওল্ডেকে বিশ সেকেন্ডের মধ্যে গলিয়ে প্রোটোপ−্যাজম বানিয়ে ছাড়বে।’ ‘তুমি ভাবছ, আমি মিথ্যে ভয় দেখাচ্ছি?’ জিজ্ঞেস করল বারাইদি, কণ্ঠ¯ল্ফ আরও কর্কশ। ‘না কি তুমি এতই বোকা যে মরতে ভয় পাচ্ছ না?’ ‘আর মাত্র পাঁচ সেকেন্ড, রানা!’ রুদ্ধশ্বাসে বলল সুরাইয়া। রকেট ইঞ্জিন জ্যান্ত হতে চলেছে। এক মিনিট হলো একটা ফুয়েল পাম্প কাজ শুরু করেছে, ফায়ারিং চেম্বারে সাপ−াই দিচ্ছে লিকুইড অক্সিজেন আর হাইড্রোজেন। সুরাইয়া যখন মুখ খুলল, তখনই ইগনিশান ঘটলÑঅর্থাৎ আগুন ধরল ফুয়েলে। রানা অনুভব করল ওর নীচে প্রচণ্ড শক্তি তৈরি হচ্ছে। ক্লক ফ্ল্যাশ করছে: জিরো-জিরো-জিরো... রানা অনুভব করল, ওর বুকে কেউ ঝাঁপ দিয়েছে। প্রথমে চাপটা সহনীয় লাগল। পাঁচ সেকেন্ডেরও কম সময়ের মধ্যে সহ্য করবার মত থাকল না। নাজাফি স্পেস স্টেশন ছেড়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠছে রকেট। লেজটা তীব্র আগুনের তৈরি, কংক্রিট আর ইস্পাত গলিয়ে ফেলছে। এই সময় বারাইল্ডি কথাটা শুনতে পেল রানা। সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক পীড়ন তুচ্ছ হয়ে গেল। বারাইল্ডি সম্ভবত মনে নেই যে কন্ট্রোল বাঙ্কারের মাইক্রোফোনটা বন্ধ করা হয়নি। ‘...চলি−শ সেকেন্ডে ডেটোনেট। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলা হবে, যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে টেক অফ করার একটু পরই আকাশে বিধ্বস্ত হয়েছে।’ শরীরটা কাউচ বা সিটের সঙ্গে এমন ভাবে সেঁটে আছে, রানা প্রায় অসহায়, নড়াচড়ার শক্তি পর্যন্ত পাচ্ছে না। অথচ এখন থেকে ঠিক চলি−শ সেকেন্ড পর একটা বোমা ফাটবে ক্যাপসুলের ভিতর। সেই বোমাটা কোথায় লুকানো আছে তাও ওর জানা নেই। উন্মত্ত একটা ভাব চলে এল রানার চেহারায়। কোন সূত্র পাওয়ার আশায় কন্ট্রোল প্যানেলে চোখ বুলাল। ৬১ পেল না কিছু। ক্লকটা এখন অন্য মেসেজ দিচ্ছে। ফ্লাইট শুরু হবার পর থেকে বয়ে যাওয়া সময় জানাচ্ছে: পাঁচ সেকেন্ড। রানার হাতে সময় আছে পঁয়ত্রিশ সেকেন্ড। এর মধ্যে বোমাটা খুঁজে নিয়ে অকেজো করতে হবে। কিন্তু কী ভাবে? সুরাইয়াকে কিছু বুঝতে দিয়ো না! হায় খোদা! রকেটের প্রবল গতি সিটের সঙ্গে চেপে রেখেছে ওকে, বোমাটা কীভাবে খুঁজবে ও? ইজরায়েলি বিজ্ঞানীরা নিশ্চয়ই সেটা অ্যাস্ট্রনটল্ডে নাগালের মধেশুাখেনি। ইহুজ্ঝ্যিাস্ট্রনটরা এত বোকা নয় যে তারা বিল, মাইক আর ব্যারির মত মরতে চাইবে। এই তিনজন আমেরিকান অ্যাস্ট্রনটের নাম রানার মনের পরদায় কী কারণে কে জানে জ্বলজ্বল করছে। লোকগুলো অনেক বছর আগে ট্রেনিং নেওয়ার সময় গ্রাউন্ডে মারা যায়। মৃতুশু কারণ ছিল নির্ভেজাল অক্সিজেন বল্টহারে অসতর্কতা। পিওর অক্সিজেনে আগুনের একটা ফুলকি পড়ায় চোখের পলকে সর্বগ্রাসী আগুন জ্বলে ওঠে। আর এই ঘটনা ইজরায়েলিল্ডে না জানবার কোন কারণ নেই। বিদ্যুচ্চমকের মত ঝট্ করে সূত্রটা পেয়ে গেল রানা। স্পেস ক্যাপসুলে, ওর নাগালের মধ্যে কোথাও যদি বোমাটা থেকে থাকে, সেটাকে অবশ্যই থাকতে হবে অক্সিজেন বটলগুলোর কাছে। ‘সুরাইয়া, হেলপ মি!’ প্রায় গর্জে উঠল রানা। কিন্তু পরক্ষণে হতাশায় ছেয়ে গেল ওর মন। রকেটের গতি আরও বেড়ে যাওয়ায় সিটের সঙ্গে সুরাইয়া এমনভাবে সেঁটে আছে, প্রাণটা শুধু যেন বেরিয়ে যাওয়া বাকি। যা করবার একার চেষ্টায় করতে হবে রানাকে। বারাইদি চলি−শ সেকেন্ডে ডেটোনেট করবে। ক্লক সময় দিচ্ছে: তেইশ। লোহার মত ভারী হাতটা তুলে অক্সিজেন হোস ধরল রানা। হোসের নীচের দিকে নামছে হাত। যতটা কঠিন ভেবেছিল, কাজটা তত কঠিন লাগছে না। ঠাণ্ডা মেটাল ফিটিংস-এর স্পর্শ পেল। সঙ্গে আরও কিছু একটা। কী হতে পারে? ইমার্জেন্সি মেডিকেল কিট। ফুড স্টোরেজ। কিংবা সূত্র নির্ভুল হয়ে থাকলেÑঅক্সিজেন বটলের পাশে একটা বোমা। নিশ্চয়ই তাই। হ্যাঁ, তাই। আঙুলের ছোঁয়া দিয়েই আকৃতিটা চিনতে পারল রানা। এটা ব্রিটিশ ল্যান্ডমাইন, ইজরায়েলি সেনাবাহিনী অনেক দিন থেকে বল্টহার করে আসছে। এই ল্যান্ড মাইনের সঙ্গে রানার পরিচয় আছে। স্মরণ করবার চেষ্টা করছে, কীভাবে ফিউজ করতে হয়। ক্লক সময় দিচ্ছে: একত্রিশ সেকেন্ড। জীবন-মরণ সঙ্কট হাত আর আঙুলকে অতিরিক্ত শক্তি যোগাল। মাইন-এর মাথার সামান্য ফোলা অংশটা আঙুল দিয়ে অনুভব করল রানা। যত জোরে পারা যায় মোচড়াচ্ছে ওটা। তেত্রিশ সেকেন্ড। রানার কাঁধের পেশী ছিঁড়ে যাবে বলে মনে হলো, মনে হলো ফুসফুসের বাতাস বিস্ফোরিত হতে যাচ্ছে। তারপরও মাইনের মাথা মোচড়াচ্ছে। অনুভব করল, চোখের সামনেটা অন্ধকার হয়ে আসছে, যে কোন মুহূর্তে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। না! মনে মনে, নিঃশব্দে, গর্জে উঠল। এখন জ্ঞান হারালে মারা যাবে ও! হাতের কাজটা শেষ না করে মরলে দুনিয়ার শান্তিপ্রিয় কয়েকশো কোটি ৬২ মানুষ ইজরায়েলের হাতে জিম্মি হয়ে পড়বে। পঁয়ত্রিশ সেকেন্ড। হাতে আর আঙুলে আরও জোর খাটাল রানা। মনে হচ্ছে, কাঁধের পেশী এই বিচ্ছিন্ন হলো বলে। ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠল ও, কিন্তু গতিজনিত প্রচণ্ড চাপ সেই চিৎকার গলার ভিতরই আটকে রাখল। আঙুল আরও শক্ত হলো। আরও আধ পাক ঘুরল জিনিসটা। এটাই ডেটোনেটর। আর বোধহয় আধ পাক ঘোরালেই কাজ হবে। কিন্তু সময় পাওয়া যাবে না। আটত্রিশ সেকেন্ড। জিনিসটা আর ঘুরছে না। রানার গলা চিরে তীক্ষè চিৎকার বেরিয়ে এল। ফুসফুস যেন জ্বলছে। বুকটা মনে হলো ভিতর দিকে ডেবে গেছে। পাথরে পরিণত হয়েছে হাত। থেঁতলে রক্তাক্ত হয়ে গেছে আঙুলগুলো। পচা তরমুজের মত ফেটে যেতে চাইছে মাথা। আরও জোরে, রানার গলা দিয়ে যেন একটা দানবের আর্তচিৎকার বেরুচ্ছে। চলি−শ সেকেন্ড। ডেটোনেটর মুক্ত হয়ে বেরিয়ে এল। পেশীতে ঢিল দিল রানা। বোমা বিস্ফোরণে মৃতুশু ভয় দূর হয়েছে। হঠাৎ খেয়াল করল, তীব্র গতির ফলে এখন আর কোন চাপ অনুভব করছে না। মেইন বুস্টার তার সমস্ত ফুয়েল খরচ করে ফেলেছে, ফলে বুস্টার ইঞ্জিনের কাজ শেষ। যাত্রার দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছে খেয়াযান জুবিলির। চোখের কোণ দিয়ে সুরাইয়াকে নড়তে দেখে তাকাল রানা। ‘সত্যি তুমি বেঁচে আছ?’ সকৌতুকে জিজ্ঞেস করল ও। ‘স্রেফ ভাগ্যগুণে,’ বলল সুরাইয়া। ‘জানো, সারা শরীর ব্যথায় টনটন করছে।’ ডেটোনেটরটা রানা ফেলে দিয়েছিল। কাজল কালো চোখ দিয়ে সেটার দিকে তাকাল সুরাইয়াÑশূন্যে, তার আর রানার মাঝখানে, ভেসে রয়েছে ওটা। হাত বাড়িয়ে ধরতে গেল সে। ‘থামো।’ ‘কিন্তু কিছু একটা খুলে এসেছে। বিপদ ডেকে আনতে পারে।’ ‘বিপদ, না?’ হেসে উঠল রানা। ‘না, সুরাইয়া, আপাতত কোন বিপল্ডে ভয় নেই।’ ডেটোনেটরটা ধরে সুটের পকেটে রেখে দিল। কাউচে হেলান দিল ও। কয়েক সেকেন্ড পরই ঘুম চলে এল চোখে। বারো ওজন না থাকবার ব্যাপারটা উপভোগ করছে রানা। হারনেস খুলে সামান্য একটু নড়তেই শূন্যে উঠে এসে ভেসে থাকল। ওজনের কোন অনুভূতিই হলো না। তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন ও। অ্যাবি স্পেস স্টেশন পৃথিবীর যেদিকটায় আছে, ওরা রয়েছে ঠিক তার উল্টোদিকে। পঁয়তালি−শ মিনিট বা আরও কম সময়ের মধ্যে ইজরায়েলিল্ডে ওই স্পেস স্টেশনে ভিড়বে ওল্ডে এই রকেট, যদি সমস্ত অটোমেটিক ইকুইপমেন্ট আর প্রি-প্রোগ্রামড্ অনবোর্ড কমপিউটার ঠিকঠাক মত কাজ করে। ৬৩ ওই স্পেস স্টেশনে ইহুজ্ঝ্যিাস্ট্রনটরা আছে। হয়তো আছে ইজরায়েলি সামরিক বাহিনীর লোকজনও। পিস্তলের স্পর্শ নিল রানা। ডেটোনেটরটাও পকেটে আছে। এ-সব কী বল্টহার করা সম্ভব হবে? কিংবা বল্টহার করবার সুযোগ পাওয়া যাবে? স্পেস সেন্টারের লোকজন ওল্ডে কোন ক্ষতি করতে না পারলেও, একটা মেসেজ পাঠিয়ে স্পেস স্টেশনের লোকজনকে নিশ্চয়ই সাবধান করে দিয়েছে। স্টেশনের অ্যাস্ট্রনট আর সৈনশুা ওল্ডে জনঞ্জপেক্ষা করছে। কী ভাবে পৌঁছালে ভাল হয় ভাবছে রানা। ফ্রেমে আটকানো ম্যাগনিফাইং গ−াস ধ্বংস করবার একটা উপায় বেরুত, ও যল্ডিকেটটাকে নিয়ন্ত্রণ করবার কলা-কৌশল শিখে নিতে পারত। স্টেশনে না ভিড়ে, রকেট ফায়ার করে গ−াসে গুঁতো মারা যেত। কিংবা স্পেস স্টেশনে গুঁতো মেরে খুন করতে পারত যে-ক’জন আছে ওখানে। ইতিমধেঞ্জাবার নিজের কাউচে ফিরে এসেছে রানা, হারনেস আটকে তাকিয়ে আছে সুরাইয়ার দিকে। সুরাইয়া চেঁচিয়ে উঠল: ‘রানা, দেখো!’ তার দৃষ্টি অনুসরণ করে রেইডারে তাকাল রানা। স্ক্রিনে সবুজ আলোর ধীরগতি সরু রেখাটা খুদে একটা বিন্দুকে ছুঁয়ে যাবার সময় বিপ-বিপ আওয়াজ করছে। বিন্দুটা যত কাছে চলে আসছে, আলোর রেখাটাও তত জোরে শব্দ করছে। ‘এ নিশ্চয়ই স্পেস স্টেশন অ্যাবি,’ বলল রানা। ট্র্যান্সপারেন্ট কোয়ার্টজ পোর্ট দিয়ে বাইরে তাকাল ও। তবে কিছু দেখতে পেল না। দূরত্ব এখনও খুব বেশি। তবে উজ্জ্বল একটা ঝলক দেখতে পেল। ওটা নিশ্চয়ই ইজরায়েলিল্ডে সেই অস্ত্র, রানা যেটাকে ধ্বংস করতে চাইছেÑম্যাগনিফাইং গ−াসÑরোদ থেকে সংগ্রহ করা তাপ কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ গুণ বাড়িয়ে ঢেলে দিচ্ছে নীচের পৃথিবীতে। এই মুহূর্তে ওটা কি বাংলাদেশের খেত-খামার আর ফসল পোড়াচ্ছে? নাকি মুসলিম বিশ্বের কোন দেশের নদী-নালা শুকিয়ে খটখটে করে ফেলছে? ‘আমি দেখতে পাচ্ছি, রানা। তবে রেইডার রিটার্ন বড় অদ্ভুত।’ ‘অদ্ভুত মানে?’ ‘স্টেশনের যে বিশাল আকার, তার তুলনায় রেইডার ইমেজ খুবই ছোট।’ সুরাইয়ার চোখে ছোট একটা টেলিস্কোপ, ক্যাপসুলের কোন কেবিনেট থেকে পেয়েছে। তার হাত থেকে সেটা নিল রানা, ভেসে খানিকটা উপরে উঠল, তারপর জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। যেন লাফ দিয়ে সামনে চলে এল অ্যাবি স্পেস স্টেশন। ঠিক পিছনেই রয়েছে সোলার গ−াস। টেলিস্কোপে ওটাকেই আসলে দেখেছে সুরাইয়া। এখন রানা বুঝতে পারছে রেইডার বি−প-এর আকার যেমনটি হওয়ার কথা তেমনটি কেন হয়নি। রেইডারে স্পেস স্টেশনেরই ইমেজ ধরা পড়েছে। সেটা তত বড় নয়। বড় হলো সোলার গ−াসটা। ম্যাগনিফাইং গ−াস নিরেট নয়। একটাও নয়। বিশাল মাকড়সার জালের মত দেখতে, জালের অসংখল্টাহুতে আটকে আছে অগুনতি চ্যাপ্টা আতসী কাঁচ। জালের বাহু আসলে তারÑপিয়ানো ওয়য়্যার। ওই তার দিয়েই গোটা কাঠামোটা তৈরি করা হয়েছেÑআকৃতিটা গোল, পাতিলের ঢাকনি বা ডিশ অ্যান্টেনার মত ভিতর দিকে ঢালু। হাজার হাজার ম্যাগনিফাইং গ−াসের সাহায্যে সূর্যের আলো পৃথিবীর দিকে ফোকাস করতে এই আকৃতিই বোধ হয় ল্ডকার। বারাইল্ডি মুখে শুনে এ-সব রানা ৬৪ পুরোপুরি সতিল্টলে বিশ^াস করেনি। এখন দেখছে, লোকটা কিছু বাড়িয়ে বলেনি। ‘ওরা বড় একটা ম্যাগনিফাইং গ−াস লঞ্চ করেনি,’ ফিসফিস করল রানা। ‘ছোট আকারের কাঁচ এনে, একটা একটা করে তারের সঙ্গে বেঁধেছে। ওল্ডেকে কাজ করতে হয়েছে কক্ষপথে ভাসমান অবস্থায়। অবিশ্বাস্য।’ ‘কন্ট্রোল, রানা!’ হঠাৎ আঁতকে উঠল সুরাইয়া। ‘কন্ট্রোল আপনাআপনি কাজ করছে।’ ঝট করে তাকাতে রানা দেখল সুরাইয়া ঠিক কথাই বলছে। আলোর জ্বলা-নেভা এখন সম্পূর্ণ নতুন একটা প্যাটার্ন ধরে ঘটছে। তবে এর জন্য গ্রাউন্ড কন্ট্রোল দায়ী হতে পারে না, নাজাফি স্পেস স্টেশন এই মুহূর্তে দুনিয়ার উল্টো পিঠে। হয় অ্যাবির অ্যাস্ট্রনটরা জুবিলির কন্ট্রোল নিজেল্ডে হাতে তুলে নিয়েছে, নয়তো পূর্ব-নির্ধারিত একটা রুট অনুসরণ করছে ক্যাপসুল। রানার মনে হলো, বড়শী গাঁথা মাছের মত লাইন গুটিয়ে ওল্ডেকে স্পেস স্টেশনের ভিতর টেনে নিচ্ছে ইজরায়েলি ক্রুরা। ‘কাঁচগুলো এখনই নষ্ট করতে হবে,’ সুরাইয়াকে বলল রানা। ‘এরপর হয়তো আর সময় পাব না।’ ‘কিন্তু কীভাবে? এখনও তো অনেক দূরে ওটা। তা ছাড়া, করার কী সত্যি কিছু আছে?’ ডেটোনেটরটা মুঠোয় নিয়ে রানা ভাবল, সুরাইয়া ঠিকই বলছেÑওল্ডে তেমন কিছু করবার নেই। দৈর্ঘ্য-েপ্রস্থে প্রায় তিন মাইল জিনিসটা, ছোট্ট এতটুকু বিস্ফোরক ওটার কী-ই বা ক্ষতি করতে পারবে। এমনকী এরচেয়ে অনেক বড় বিস্ফোরণেও ওটার আংশিক ক্ষতি হবে শুধু, প্রায় সবটুকুই অক্ষত থেকে যাবে। তবে চেষ্টা করে দেখতে হবে ওকে। সেটাই ওর কাজ। ‘তোমার সব ঠিক আছে তো? অক্সিজেন লাইন?’ ‘ঠিক আছে, কিন্তু তুমি কী করছ?’ হ্যাচটা মাথার উপর। ওটা খুলে ফেলল রানা। অকস্মাৎ বাতাস বেরিয়ে যাওয়ায় হারনেসটা প্রায় কামড় বসাল গায়ে। ওজনহীনতার পর ওই চাপ ভালই লাগল। মুখ তুলে আকাশে তাকাল ও, হীরার ধার নিয়ে আলোর রেখা ছড়াচ্ছে নক্ষত্রগুলো। যেন লক্ষ করছে ওকে, বিশে−ষণ করছে ওর আচরণ। ওকে সফল হতে হবে। সাবধানে হারনেস খুলে সিধে হলো রানা, মাথাটা বেরিয়ে এল ক্যাপসুল থেকে। হাতে ডেটোনেটর, এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে প্রকাণ্ড জালটার দিকে। তারপর যত জোরে পারা যায় বিস্ফোরকটা ছুঁড়ল। খুদে বিস্ফোরক প্রায় চোখের পলকে দৃষ্টিপথ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। রানা অপেক্ষা করছে। কিন্তু কিছু ঘটল না। এক সময় মনে হলো অনন্তকাল পার হয়ে যাচ্ছে। তারপর মাত্র একটা কাঁচ বিস্ফোরিত হতে দেখল ও। এটাকে আসলে কোন ক্ষতিই বলা যায় না। ম্যাগনিফাইং গ−াস দিয়ে তৈরি বিশাল ডিশটা প্রায় অক্ষতই রয়ে গেল। পকেট থেকে ওয়ালথারটা বের করল রানা। আউটার স্পেসেও নিশ্চয় পিস্তল থেকে ফায়ার হয়। লক্ষ্যস্থির করে ট্রিগার টেনে দিল রানা। ওয়ালথার লাফিয়ে উঠল ওর হাতের ভিতর। পিছন দিকে ছিটকে, দেয়ালে বাড়ি খেল শরীরটা। তবে এ-সবই ঘটল পরিপূর্ণ নীরবতার ভিতর। একের পর এক গুলি করে গেল রানা। খরচ হওয়া পিতলের খোল মহাশূন্যে ইজেক্ট হচ্ছে। হেভি নাইনএমএম প্যারাবেলাম রাউন্ড নিঃশব্দে ছুটে যাচ্ছে ম্যাগনিফাইং গ−াসগুলোকে ভেঙে চুরমার করবার জন্য। গুণে গুণে ছয়টা কাঁচ ভাঙল রানা। পাঁচটা বুলেট দিয়ে, ৬৫ একটা ডেটোনেটরের সাহায্যে। আরও হাজার হাজার অক্ষত রয়ে গেল। ‘রানা, আমরা স্টেশনে ভিড়তে যাচ্ছি।’ ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতে রানা দেখল, সত্যি তাই। বোঝাই যায় অ্যাবির এক পাশে গাঢ় অন্ধকার ফাঁকটার ডিজাইন করা হয়েছে জুবিলির সামনের অংশটা যাতে ওটার ভিতরে সেঁধোতে পারে। আর মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে স্পেস স্টেশনের ভিতর ঢুকবে ওরা। নয়তো মারা যাবে। খেয়াযান জুবিলি স্টেশনে ভিড়ল। মেকানিকজম খাপে খাপে বসেছে। এখন হ্যাচ খুলে সরাসরি একটা এয়ার লক-এ পৌঁছাতে পারবে ওরা। এয়ার লকটা অ্যাবির গায়ের এক পাশে। ‘কী করবে, রানা?’ ব্যাকুল হয়ে জানতে চাইল সুরাইয়া। ‘তুমি জানো ভেতরে কী আছে।’ ‘হ্যাঁ, জানি। কিন্তু এখানে থাকার মানে নির্ঘাত মৃত্যু। ভেতরে আলো আছে, অক্সিজেন আছে...আছে লড়াই করার সুযোগ। এখানে আমরা অসহায় শিকার মাত্র।’ একটা ঢোক গিলে ধীরে ধীরে মাথা ঝাঁকাল সুরাইয়া। হ্যাচ গলে সাবধানে স্পেস লক-এ ভেসে এল ওরা। সঙ্গে সঙ্গে ভারী আর মোটা আউটার ডোর বন্ধ হয়ে গেল, আড়ালে বসানো ভালব থেকে হিসহিস শব্দে বাতাস ঢুকছে। রানার হেলমেটে বাষ্প জমছে। সময় মত সেটা মুছে ফেলায় দেখতে পেল ইনার ডোর খুলে যাচ্ছে। তিনজন ইজরায়েলি ঘিরে ধরল ওল্ডেকে, প্রত্যেকের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। অস্ত্র নেড়ে নির্দেশ দিল তারা। বলতেই হবে যে ভাগ্য সহায়তা করছে। তা না হলে দেখামাত্র গুলি করে মেরে ফেললে কিছুই ওল্ডে করবার ছিল না। বোকামি হোক বা যাই হোক, ওয়ালথারের শেষ বুলেটটাও রানা খরচ করে ফেলেছে। আর সুরাইয়ার কাছে কোন অস্ত্রই নেই। ধীরে ধীরে এয়ার লক ত্যাগ করল ওরা। বাইরে বেরিয়ে স্পেস সুট খুলতে হলো। ভাগ্যিস নিজেল্ডে পোশাকের উপরে এগুলো পরেছিল, তা না হলে নির্দেশ মানতে গিয়ে দিগ¤ল্ফ সাজতে হত। ‘ওল্ডেকে মেরে ফেলা উচিত,’ একজন অ্যাস্ট্রনট প্রায় খেঁকিয়ে উঠবার ভঙ্গিতে বলল। তার কাঠামোটা প্রকাণ্ড। ‘আদেশ,’ আরেকজন বলল, ‘নিহান।’ এই লোকটার মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। ‘মেজর বারাইদিকে তুমি চেনো, প্রতিটি নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন না করলে ভীষণ মাইন্ড করেন।’ ‘মেজর বারাইদি মাটিতে রয়েছেন, এখানে নন। এয়ার লক থেকে ওল্ডেকে আমরা ফেলে দিতে পারি। বলব জুবিলি থেকে ট্রান্সফার হতে ব্যর্থ হয়েছে। জানছেটা কে?’ ‘উনি ঠিকই জানবেন। মনের কথা পড়তে পারেন।’ ইজরায়েলিরা ওল্ডে ভাগ্য নিয়ে তর্ক করছে, এই ফাঁকে মাথা ঘুরিয়ে স্পেস স্টেশন অ্যাবির ভিতরটা দেখছে রানা। যতটা ধারণা করেছিল, জায়গাটা তারচেয়েও বড়। ইজরায়েলিরা তাল্ডে স্পেস স্টেশনে কাঠ আর অ্যালুমিনিয়ামই বেশি বল্টহার করেছে, প−াস্টিকের বল্টহার নেই বললেই চলে। পৃথিবীর দিকে তাক করা টেলিস্কোপটা খুব দামী মনে হলো, সম্ভবত জার্মানির তৈরি। বৃত্তাকার দেয়াল জুড়ে সারি সারি কমপিউটার বসানো রয়েছে। প্রচুর ইকুইপমেন্ট দেখা গেল, বেশিরভাগই আগে কখনও দেখেনি রানা। ইজরায়েলিল্ডে দিকে চোখ ফেরাল ও। তৃতীয় লোকটা ছোটখাট, মাথার সামনের অংশে বেশ বড় টাক। ওল্ডে লিডারের নাম বেন মেনিন। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, শক্ত-সমর্থ গড়ন। স্টেশনে রানা আর সুরাইয়ার উপস্থিতিতে উদ্বিগ্ন সে। খুব বেশি দোষ ত্থেয়া যায় না তাকে। মাটির পৃথিবী থেকে একশো বিশ মাইল উপরে অনিমন্ত্রিত অতিথি কেউই আশা ৬৬ করে না। সব বুলেট খরচ করে ফেলায় আবার নিজেকে তিরস্কার করল রানা। জায়গামত একটা গুলি লাগাতে পারলে স্পেস স্টেশন ডিকমপ্রেস হয়ে যেত, ফলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মৃতুশু কোলে ঢলে পড়ত সবাই। চিন্তাটা রানার মাথায় ছুটোছুটি করছে, তবে একেবারে চলে যাচ্ছে না। ইজরায়েলিল্ডে প্রত্যেকের হাতে অস্ত্র রয়েছে। স্রেফ ভয় দেখানোর জন্য? ওরাও তো জানে স্টেশনের ভিতর গুলি হলে মৃতুঞ্জনিবার্য। অর্থাৎ আসলে ওরা গুলি করবে না। স্টেশনের দেয়াল আর মেঝের মাঝখানে পা বাধিয়ে ঠিক সময় মত লাফটা দিল রানা। প্রকাণ্ডদেহী নিহান মন্থরগতিতে ভেসে সবেমাত্র ওর ‘উপরে’ পৌঁছেছে, ঠিক তখন। লোকটার কব্জি চেপে ধরে প্রচণ্ড শক্তিতে মোচড়াল। ওজনহীনতার কারণে আচরণটা হাস্যকর হয়ে উঠল। নিজেকে অনায়াসে ছাড়িয়ে নিল নিহান, তার ধাক্কা খেয়ে নিজের উপর কোন নিয়ন্ত্রণ থাকল না রানার। নিহান কয়েক মাস ধরে এই পরিবেশে বাস করছে, কাজেই তার নড়াচড়ায় অসঙ্গতি প্রায় নেই বললেই চলে। রানাকে ধরে শূন্যে স্থির করল সে। ‘শালা মুসলমান!’ খেঁকিয়ে উঠল, হাতের আগ্নেয়াস্ত্র তাক করল সরাসরি রানার বুকে। ট্রিগার টেনে দিল নিহান। তেরো পিস্তলের গর্জন কানের পর্দা ফাটিয়ে ত্থেয়ার উপক্রম করল। সুরাইয়ার ভয়ার্ত চিৎকার যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে। সাধারণ একটা ধারণা হলো, মৃতুশু ঠিক আগের মুহূর্তে সামনে দিয়ে পার হয়ে যায় তোমার গোটা জীবন। রানার অনুভব আর উপলব্ধিতে সে-সব কিছুই ধরা পড়ল না। নিজেকে সম্পূর্ণ অসহায় লাগল ওর, জানে মৃত্যুকে ফাঁকি ত্থেয়ার জন্য কিছুই করতে পারেনি বা পারছে না। শত্র“র হাতের ট্রিগারে যখন টান পড়ছে, রানার চিন্তা-চেতনায় তখন শুধু একটা দুঃখ ছাড়া আর কিছুর অস্তিত্ব নেইÑরাহাত খান, বিসিআই আর বাংলাদেশকে হতাশ করল ও। বুলেটটা রানার ঠিক বুকের মাঝখানে লাগল। ফুসফুস খালি হওয়ার সময় ওর মুখ থেকে হু-উ-উ-উ-স্ করে একটা আওয়াজ বেরুল। শরীরটা অবিরাম ডিগবাজি খাচ্ছে শূন্যে। দেয়ালে একটা ধাক্কা খেয়ে আবার ফিরে এল কামরার মাঝখানে। ‘রাবার বুলেট,’ বলল নিহান। ‘স্টেশন ফুটো করার ঝুঁকি আমরা নিই না।’ রানা এমন হাঁপাচ্ছে যে কথা বলা কঠিন। বুকে জ্বালা অনুভব করছে ও, নিশ্চয়ই চামড়া ছিলে গেছে। ইচ্ছে হলো ওল্ডে লিডারকে জিজ্ঞেস করে আসল বুলেটগুলো কোথায় রাখা হয়। ‘নিহান,’ লিডার মেনিন বলল। ‘ওল্ডেকে তুমি স্টোরেজ কমপার্টমেন্টে রেখে এসো। ওখানে এমন কিছু নেই যে ক্ষতি করতে পারবে।’ এখনও সদ্য ডাঙায় তোলা মাছের মত খাবি খাচ্ছে রানা; ৬৭ নিহানের হাতে নিজেকে ছেড়ে দিল ও। ঠেলে, গুঁতো মেরে স্টোরেজ কমপার্টমেন্টে ঢোকানো হলো ওকে। পিঠে ধাক্কা খেয়ে সুরাইয়াও ভিতরে ঢুকল। ভারী ধাতব ল্ডজা বন্ধ হয়ে গেল ওল্ডে পিছনে। ওরা বন্দি, রায়ও হয়ে গেছে, এখন শুধু মৃত্যুদণ্ড কার্যকরী করবার অপেক্ষা। ‘এখানে আমরা দম বন্ধ হয়ে মারা যাব?’ জানতে চাইল সুরাইয়া, সাংঘাতিক নার্ভাস। বাঁকা দেয়ালের শেষ প্রান্তে, একটা সাপোর্টিং বিম ধরে ভেসে আছে সে। মুখ থেকে রক্ত নেমে গেছে, ধরে নিয়েছে এই কামরা ছেড়ে জীবিত বেরুতে পারবে না। ‘ভয় পেয়ো না, প্রচুর অক্সিজেন আসছে।’ ‘ওরা যদি সাপ−াই বন্ধ করে দেয়? চারদিকে ভালভের তো কোন অভাব নেই। তখন কী হবে?’ ‘তখন এটা অন করব,’ বলল রানা, কাছাকাছি একটা ভালভের দিকে আঙুল তুলল। সাংকেতিক ভাষায় নিশ্চয়ই ‘অক্সিজেন’ লেখা রয়েছে। সেটা পড়তে না পারলেও, বড় আকৃতির ‘ড়’ দেখে নিশ্চিত হওয়া গেল। ওটা অক্সিজেনের প্রতীকচিহ্ন। ‘এটা খুললেই হু হু করে অক্সিজেন পাব আমরা।’ ধীরে ধীরে সাহস ফিরে পাচ্ছে সুরাইয়া। রানার কাছাকাছি চলে এল। ‘নিজেল্ডে সম্পর্কে আমরা প্রায় কিছুই জানি না,’ এক সময় রানাকে বলল সে। ‘অথচ হয়তো একই কাজ করতে গিয়ে একসঙ্গে মারা যাব আমরা।’ ‘হ্যাঁ।’ ‘বাড়িতে কে কে আছে তোমার?’ ‘কেউ নেই, আমি একা।’ ‘কী আশ্চর্য! সত্যি? আরে, আমিও তো!’ সুরাইয়ার একটা হাত ধরল রানা। সুরাইয়া সেটা ছাড়িয়ে নিল না। একজনের নিঃশ্বাস আরেকজনকে স্পর্শ করছে, এত কাছে চলে এল ওরা। অনেকক্ষণ ধরে গল্প করল দু’জন। বিপল্ডে কথা ভুলে কৌতুক শুনে হাসল। কপট রাগে সুরাইয়া ঠোঁট ফোলাল তো খোঁচা খেয়ে গম্ভীর হলো রানা। এভাবে শুধু ঘনিষ্ঠতাই বাড়ল। তারপর পরস্পরকে ছুঁলো ওরা। ছোঁয়ার পর কেউ কাউকে ছাড়ল না। * তৃপ্ত এবং ক্লান্ত সুরাইয়া বেশ কিছুক্ষণ হলো রানার গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। রানার চোখে ঘুম নেই। মাথায় একটাই চিন্তাÑকীভাবে এখান থেকে বেরুনো যায়, বেরিয়ে ইজরায়েলি ষড়যন্ত্র থেকে ষ্ণেশো কোটি মানুষকে বাঁচাতে পারে। মগজের গভীর কোন প্রদেশ থেকে একটা আইডিয়া উপরে উঠে আসবার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। ব্যাপারটার সঙ্গে যেন মাধ্যাকর্ষণ শক্তির অভাব কিংবা ওজনহীনতার সম্পর্ক আছে। অবশেষে মাথা নাড়ল রানা। আইডিয়াটার তাৎপর্য যাই হোক, এখনই সেটা বেরুবে না। তবে অন্য একটা বুদ্ধি এল মাথায়। ওরা একটা স্টোররুমে আটকা পড়েছে। এবং সেই স্টোররুমে অন্তত একটা অক্সিজেন ভালভ আছে। ‘সুরাইয়া,’ ডাকল রানা, হাত ধরে ঝাঁকাল। ‘বোতলগুলোয় কী আছে বলো তো?’ সিধে হলো সুরাইয়া, হাত দিয়ে চোখ রগড়ে বোতলগুলো চেক করল। ‘কার্বন ডাইঅক্সাইড। গায়ে লেখা “ফর এক্সটার্নাল ইউজ ওনলি”।’ ‘অ্যাবির বাইরে কাজ করার সময় ঈঙ২-এর প্রবাহকে বল্টহার করে ওরা,’ বলল রানা। মাথার ভিতর ঝড় বইছে। ৬৮ গ্যাসটা বিষাক্ত নয়, তবে কৌশলে বল্টহার করতে পারলে নিজেল্ডেকে মুক্ত করা সম্ভব। ‘কী করছ তুমি, রানা?’ জবাব না দিয়ে কার্বন ডাইঅক্সাইডের একটা বোতল কামরার আরেক প্রান্তে বয়ে নিয়ে এল রানা, যেখানে অক্সিজেন ভালভটা রয়েছে। ‘চিন্তা কোরো না,’ বলল ও। ‘কিছুক্ষণের মধ্যে বেরিয়ে যাব এখান থেকে।’ গ্যাস সিলিন্ডারটা অক্সিজেন লাইনের সঙ্গে ফিট করল রানা, তারপর বটলের ভালভ পুরোপুরি খুলে দিল। হিসহিস আওয়াজ তুলে গ্যাস বেরুচ্ছে। বগলের পাশে, স্ট্র্যাপ দিয়ে হাতের সঙ্গে বাঁধা ছুরিটা রানার মুঠোয় চলে এল। জানে, ওকে অত্যন্ত সাবধানে নড়াচড়া করতে হবে। ওজন না থাকায় নিজের দ্বারা ছুরিকাহত হওয়ারও আশঙ্কা আছে। ‘ব্যাপারটা আমি বুঝছি না। ঈঙ২ বিষাক্ত নয়। এটা ওল্ডে কোন ক্ষতিই করবে না।’ ‘ভুল। শুধু একটু ধৈর্য ধরো, তারপর দেখো কী ঘটে।’ এক মিনিটও পার হয়নি, গোটা স্টেশনে অ্যালার্ম বেল বেজে উঠল। স্টোরেজ রুমে নিহানই সবার আগে মাথা গলাল। সবার আগে মরতেও হলো তাকে। রানার ছুরি তার গলা কাটল, চিবুকের নীচেটা ছুঁয়ে স্যাঁৎ করে বেরিয়ে গেল চকচকে ফলাটা। বাইরে রক্ত বেরুল অদ্ভুত এক ধরনে। তরল রক্ত দ্রুত খুদে ফোঁটায় পরিণত হলো, একরাশ লাল বেলুনের মত ভেসে থাকল মৃত অ্যাস্ট্রনটের গলার চারপাশে। লাশটা হালকাভাবে বাড়ি খেল ল্ডজার গায়ে। লাথি মেরে সেটাকে স্টেশনের মূল অংশে ফেরত পাঠাল রানা। ‘নিহান, কী ব্যাপারÑ’ মেনিন মাঝপথে থেমে গেল, রানা আর সুরাইয়াকে স্টোরেজ রুম থেকে বেরিয়ে আসতে দেখছে। ছুরির বে−ড নিঃসঙ্গ নয়, চারপাশে ছোট একটা লাল মেঘ বহন করছে। এ-সব দেখে যা বুঝবার বুঝে নিল মেনিন, সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে উঠল সে। পিস্তল বের করে লক্ষ্যস্থির করল মেনিন। তার এই রিফ্লেক্স মর্ত্যলোকে হয়তো সুফল বয়ে আনত, কিন্তু এখানে উল্টোটা ঘটল। নিজেকে কিছুর সঙ্গে না আটকে গুলি করল সে। ডিগবাজি খেয়ে পিছু হটল শরীরটা, নিতম্ব গিয়ে পড়ল একটা চায়ের কেটলিতে। রাবার বুলেটটা কামরার ভিতর খুদে একটা উল্কার মত ছুটে বেড়াচ্ছে। মেনিন আপাতত অচল, এই ফাঁকে তৃতীয় লোকটাকে খুঁজছে রানা। কপালের উপর বিরাট টাকটাকে দেখা গেল একটা থাম- এর আড়ালে। লোকটা ওখানে কুণ্ডলী পাকিয়ে রয়েছে, অস্ত্রটা ঘুরিয়ে এদিকে তাক করতে যাচ্ছে। ঝট করে ছুঁড়ে দিলে ছুরিটা তাকে কাবু করতে পারবে কি না ভাবল রানা। চিন্তাটা সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করে দিল। ছুটে যাওয়ার সময় মাধ্যাকর্ষণের অভাবে ঠিকমত ওটা ডিগবাজি খাবে না। এ- ধরনের লড়াইয়ে এখনও রানা নবাগত। পা দুটো সবেগে ছুঁড়ে, বিরাট কমন রুমের উপর দিয়ে রকেটের মত উড়ে এল রানা, ছুরি ধরা হাতটা নিজের সামনে লম্বা করে রেখেছে। এটাই ওর হামলাÑনিজেকে বর্শা বানিয়ে ফেলেছে। টেকো আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। সময়ের আগে তার হাতে ঝাঁকি খেল পিস্তলটা। থামের সঙ্গে শক্তভাবেই নিজেকে আটকে রেখেছিল সে, কিন্তু পিস্তল ধরা মুঠোটা নিশ্চয়ই কিছুটা আলগা ছিলÑহাত থেকে বেরিয়ে কমন রুমের আরেক দিকে ছুটে গেল সেটা। বর্শার ডগা সরাসরি বাম বুকে গ্রহণ করল লোকটা। ‘রানা, আরেক বেজন্মা!’ চেঁচিয়ে সতর্ক করল সুরাইয়া। এতক্ষণ হাতের কাছে আলগা যা পেয়েছে তাই মেনিনকে লক্ষ্য ৬৯ করে ছুঁড়েছে সে, কোন লাভ হয়নি। মোশান বা গতি সম্পর্কে নিউটনের সেকেন্ড ল বিভ্রান্ডির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে তাকে। সে এখনও উপলব্ধি করতে পারছে না যে এক দিকে সামান্যতম নড়াচড়ার ফলে উল্টোদিকেও সমান রিয়্যাকশন হবে। যেমনÑ সুরাইয়া যখন ভারী একটা বই ছুঁড়ল, একই গতিতে সে নিজেও পিছিয়ে গেল। কামরার মাঝখানে মেনিন আর রানা মুখোমুখি হয়েছে। মুখে ক্ষীণ হাসির অর্থ, মেনিন ভাবছে সে-ই জিতবে। রানাকে প্রমাণ করতে হবে তার ধারণা ভুল। সময় কিন্তু রানার বিরুদ্ধে। লড়াইটা যত দীর্ঘ হবে, ওজনশূন্য পরিবেশ সম্পর্কে অনভিজ্ঞতা তত বেশি ভুল করাবে ওকে দিয়ে। রানার মাথাকে পাশ কাটাচ্ছে একটা পেনসিল। খপ করে ধরল সেটা, খুèের্শার মত করে ছুঁড়ে দিল মেনিনের দিকে। বাঁ চোখের মণি বাঁচাবার জন্য মাথাটা দ্রুত একপাশে সরিয়ে নিল মেনিন, ধাতব থামে ঠকাস করে ঠুকে গেল খুলিটা। শূন্যে উঠে গেল সে। রানা যেন ঠিক এই সুযোগটার অপেক্ষাতেই ছিল। পা দুটো তুলে আঙটা বানাল, পেঁচিয়ে ধরল মেনিনের গলা। ভালভাবে আটকে নিয়ে টান দিল, মেনিনের শরীর অ্যাবির গায়ে প্রচণ্ড বেগে বাড়ি খেল। এক আছাড়েই অজ্ঞান। ‘ওকে তুমি স্টোরেজ রুমে ঢোকাও,’ সুরাইয়াকে নির্দেশ দিল রানা। এগিয়ে এসে টেকোকে পরীক্ষা করল ও। না, লোকটা বেঁচে নেই। কামরার মাঝখানে এসে থামল রানা। ইজরায়েলিল্ডে স্পেস স্টেশন অ্যাবি এখন ওর দখলে। মিশন সফল করবার সময় এখন: কাঁচের ডিশটা ধ্বংস করতে হবে। ‘বাইরে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু ম্যাগনিফাইং গ−াসের অতবড় ডিশটা কী ধ্বংস করা সম্ভব? কী দিয়ে?’ রানার তাগাদা পেয়ে স্পেস সুট পরবার সময় জিজ্ঞেস করল সুরাইয়া। ‘ওটা আগে কাছ থেকে পরীক্ষা করতে হবে, তারপর বলতে পারব। আমার কাছে কয়েকটা জেলিগনাইটের স্টিক আছে। কিন্তু ওগুলো দিয়ে তিন মাইল ডিশের সিকি মাইলেরও ক্ষতি করা যাবে না।’ ‘যাই করি, খুব সাবধানে কিন্তু,’ সতর্ক করল সুরাইয়া। ‘একটু ভুল হলেই মহাশূন্যে ভেসে যাব।’ হঠাৎ স্থির হয়ে গেল সে। ‘বাইরে বেরিয়ে আমরা আসা-যাওয়া করব কী ভাবে?’ ‘ ঈঙ২-র জেট বল্টহার করব, ইজরায়েলিরা যেমন করত। চলো, এয়ার লক-এ ঢুকি।’ ছোট্ট লকের ভিতর ঢুকে সাইক্লিং শুরু করল ওরাÑপাম্প করে অ্যাটমসফিয়ার বের করা হচ্ছে। প্রেশার যথেষ্ট কমে যাওয়ার আগে আউটার ডোর খুলল না। বাইরে বেরুবার সঙ্গে সঙ্গে অনন্ত আর অসীমের সর্বশেষ ধাপে পৌঁছানোর অনুভূতি গ্রাস করল রানাকে। যতক্ষণ স্পেস স্টেশন অ্যাবি চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছিল ওকে, দূরত্ব আর বিশালত্ব সম্পর্কে ওর কোন ধারণাই ছিল না। এখন হলো। ওর নীচে ঝুলে আছে পৃথিবী, উজ্জ্বল নীল আর চকলেট রঙের একটা বল, মোম লাগানো কাগজের মত মেঘে মেঘে ঢাকা। আর মাথার উপর ধূলি ঝড়; প্রতিটি ধূলিকণা একেকটা নক্ষত্র। এত উজ্জ্বল তারা আগে কখনও দেখেনি রানা। কাছাকাছি একটা রিঙ-এ সেফটি লাইন আটকে এয়ার লক থেকে বেরিয়ে এল ও। এই প্রথম, এত কাছ থেকে, জিনিসটাকে দেখল। সোলার গ−াস। জাল বা ডিশটা বড়, জানত রানা। তবে এবারই সবটুকু (চলবে...)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ মাসুদ রানা—অন্ধকারের বন্ধু (পর্ব ৩)
→ মাসুদ রানা—অন্ধকারের বন্ধু পর্ব ২

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now