বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মানিকের পতাকা
-হৃদয়
.
গরম চাকু দিয়ে গুলিটা বের করতেই
গলগলিয়ে রক্ত পরতে শুরু করলো সজীবের
পা দিয়ে। দাঁতে দাঁত চেপে যন্ত্রনা
সহ্য করার চেষ্টা করছে সজীব। খলিল
খানিকটা হলুদ লাগিয়ে দিলো
ক্ষতটাতে। তীব্র যন্ত্রনার তোড়ে আর
দাঁতে দাঁত চেপে রাখতে পারলো না
সজীব।
মাগো----- অস্ফুট আওয়াজ বেরিয়ে
এলো ওর মুখ থেকে। রক্ত পরা থেমে
গেছে। কিন্তু ব্যথায় পা নড়াচড়া
করতে পারছে না সজীব। গায়ে অনেক
জ্বরও এসেছে। একটা কলাপাতায় মুঠো
খানেক চাল ভাজা আর দুটো ওষুধ দিয়ে
খলিল বললো-
এই কয়ডা চাবাইয়া বড়ি দুইডা
খাইয়ালন ভাইজান। ব্যতা কুইম্মা
যাইবো।
সজীব কলাপাতা থেকে বড়ি দুটো
খেয়ে আবার খড়ের বিছানাতে শুয়ে
পরলো।
সজীবের বাড়ি ফরিদপুর জেলার
সোনাপুর গ্রামে। বাড়িতে আছে
বিধবা মা আর সুখি। সুখি সজীবের
নববিবাহিত স্ত্রী। এগারো মাস আগে
সুখিকে বিয়ে করে সজীব। বিয়ের মাস
খানেক পরে ঘরে নতুন অতিথি আসার
সংবাদ জানায় সুখি। এই সংবাদে ঘর
জুড়ে আনন্দের বান ভাসলো। সজীব ওর
মাকে বললো-
মা আমার এক বাজান আমারে থুইয়া
গেছে আরেক বাজান আইতাছে। হে
হে হে-----
- তোর বাজান আইবো না তোর মায়ের
সতীন আইবো ক্যামনে বুঝলি?
- না মা, আমার বাজান আইবো বাজান!
কিন্তু এই খুশিটা বেশিক্ষন স্থায়ী
হলোনা। দেশের পরিস্থিতি খুবই
খারাপ। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। সজীবের
যুদ্ধে যাবার কথা শুনতেই সুখির মাথায়
আকাশ ভেঙে পরলো। কিন্তু সজীব
সিদ্ধান্তে অটল।
সজীবের মা কান্নায় ভেঙে পরলেন।
- বাজান তুই যাইসনা। ঘরে একটা
পোয়াতি বউ, এই সময় তোর ওর কাছে
থাকোন দরকার।
- মা আমিতো এক্কেরে চইল্লা
যাইতাছি না। যুদ্ধ থেইকা আমার
মানিকের জইন্যে পতাকা নিয়াসুম।
আমার মানিক বড় হইয়া যদি জানে,
আমার দ্যাশের বিপদে আমি কাপুরুষের
নাহান ঘরে বইয়া রইছি আমার মানিক
আমারে ঘেন্না করবো মা।
- মায়ের চোখের জল মুছে দিয়ে বলল
সজীব।
- মা তুমি আর আমারে বাঁধা দিওনা।
আমারে দোয়া কইরা দাও, আমি যানি
আমার মানিকের জইন্যে পতাকা
লইয়াইতে পারি।
- মা কিছু বলতে পারেনা আর। মুখে
আচঁল চেপে পাশের ঘরে চলে যায়।
- সুখি সাবধানে থাইকো। তোমার
বাজান নিতে আইলে, মায়রেও
তোমার লগে নিয়া যাইয়ো। আরে-----
পাগলিডাও দেহি কান্দে। এমন
কইরোনা, আমারে হাসি মুখে বিদায়
দাও।
-আফনে কবে আইবেন?
-জানিনা! তয় আমার মানিকের জইন্যে
পতাকা না নিয়া আসুমনা। সুখি
আমারে ক্ষমা কইরা দিও। আমি যদি
নাও আইতে পারি আমার মানিকেরে
কইও- আমি ওর জইন্যে পতাকা আনতে
গিয়া হারাইয়া গেছি।
- একসাথে কথাগুলো বললো সজীব।
সুখি হুঁহুঁ করে কেঁদে উঠলো।
- এইবারে কাইন্দোনা সুখি। আমারে
হাসি মুখে বিদায় দাও। আকাশ
পরিষ্কার হইয়া যাইতাছে।
সুখি চোখ মুছে বললো-
যান, আফনের মানিকের জইন্যে
তাড়াতাড়ি পতাকা নিয়াইসেন।
আর দেরি করেনা সজীব। ওর মাকে
সালাম করে, হাতে একটা টর্চ লাইট
নিয়ে বেড়িয়ে পরে।
বিধবা মা আর সুখি দুজনে মুখে আঁচল
চেপে সজীবের দিকে চেয়ে থাকে।
এক সময় টর্চের আলোটা দূরে মিলিয়ে
যায়।
সজীব নয় নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করে। আট
মাস প্রায় শেষ, এখনো যুদ্ধ চলছে। সবকটা
অপারেশনেই ওদের টিম জয়ী হয়। যদিও
এখন টিমের সদস্য সংখ্যা সাতাশ
থেকে কমে এগারোতে দাড়িয়েছে।
শেষের অপারেশনে ওদের টিম
কোনঠাসা হয়ে পরলে, সজীব জীবন
বাজি রেখে সামনে এগিয়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি সৈন্যদের
হটিয়ে দিতে পারলেও দুটি গুলি
লেগে যায় ওর গায়ে। একটা হাটুর
ওপরে অন্যটি ওর পাঁজর ছিঁড়ে বেড়িয়ে
যায়। সজীব জ্ঞান হারালে ওর দুজন
সহযোদ্ধা ওকে শিবিরে নিয়ে আসে।
রাতে সজীবের জ্বর আরো বাড়লো।
প্রলাপ বকছে সজীব। মুখ দিয়ে শুধু একটি
কথাই বেরোচ্ছে-
আমি পতাকা নিয়া আইতাছি মানিক,
আমি পতাকা নিয়া আইতাছি।
সকালে টিম কমান্ডার এসে খলিলকে
জিজ্ঞেস করলো-
সজীবের কি অবস্থা?
-ভালা না স্যার। পোলাডার অনেক
জ্বর। হারারাইত জ্বরের ঘোরে আবল-
তাবল কইছে। সজীব বাড়ি যাইতে চায়
স্যার।
- এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে খলিল।
কমান্ডার ঘরের ভিতরে গিয়ে
সজীবের কপালে হাত দেয়। জ্বরে
শরীর পুরে যাচ্ছে। কমান্ডার সজীবকে
ডাকলো-
- সজীব? সজীব?
-এ্যাঁ, আমরা স্বাধীন হইছি স্যার?
ছেলেটার দেশপ্রেম দেখে থমকে যায়
কমান্ডার। ওর বাড়ির খবরও কমান্ডারের
জানা। অপারেশন শেষ করে এসে
রাতে গল্প করত সবাই মিলে। তখনই ওর
বাড়ির খবর নিয়েছে কমান্ডার।
দেশকে কতটা ভালবাসলে, সন্তান
সম্ভবা স্ত্রীকে রেখে যুদ্ধে যেতে
পারে একজন মানুষ। কামান্ডারের মনে
পরে যায় নিজের স্ত্রীর কথা।
কিছুক্ষণের জন্যে একটা ঘোরের মধ্যে
চলে যায় কমান্ডার।
- স্যার কইলেন না? আমরা স্বাধীন
হইছি?
ঘোর কাটে কমান্ডারের।
- না, দু-চারদিনের মধ্যে হয়ে যাব।
রেডিওতে শুনলাম, দেশের অনেকটাই
মুক্ত হয়েছে।
-বাড়ি যাবে সজীব?
সজীব মাথা নেড়ে বলে, সুখির কথা খুব
মনে পরতাছে স্যার।
-আচ্ছা আজকেই তোর যাবার ব্যবস্থা
করা হবে।
ঘর থেকে বেড়িয়ে যাচ্ছিলেন
কমান্ডার।
-স্যার আমারে একটা জিনিস দিবেন?
-কি?
-একটা পতাকা দিবেন? মানিকের
জইন্যে নিয়া যাইতাম।
-আচ্ছা নিস।
বাইরে এসে কমান্ডার খলিলকে
বললেন-
সজীবের বাড়ির ঠিকানা জানো?
- জানি স্যার।
-সজীবকে বাড়ি দিয়ে আসো। ওকে
বাড়ি পৌঁছে তুমিও বাড়ি যেও।
-আইচ্ছা স্যার।
হেসে উত্তর দেয় খলিল।
শিবিরের সবাইকে বিদায় জানিয়ে
গরুর গাড়িতে ওঠে খলিল ও সজীব।
সজীব দাঁড়াতেই পারেনা। ওকে শুইয়ে
দেয়া হলো। কমান্ডার এসে সজীবের
কপালে একটা পতাকা বেঁধে দিলেন।
সজীবের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরছে
সাথে কমান্ডারেরও।
গরুর গাড়ি এগিয়ে চলল।
তিনদিন পরে সজীবের বাড়ি পৌঁছে
গাড়ি। কিন্তু বাড়িতে কেউ নেই।
খলিল একজন লোককে জিজ্ঞেস করে
জানতে পারলো, সুখির বাবা সুখিকে
নিয়ে গেছে। ওর মা সেখানে
যাননি। সজীবের যুদ্ধে যাবার দায়ে
মাস খানেক আগে ওর মাকে আগুনে
পুড়িয়ে মেরেছে রাজাকার তসলিম।
সুখিদের বাড়ি এখনো অনেকদূর। যেতে
প্রায় চার ঘন্টা লাগবে। সজীবের
অবস্থাও বেশি ভাল না। কাল রাত
থেকে চার-পাঁচ বার বমি করেছে।
গায়ে জ্বরও আছে অনেক। খলিল
লোকটার কাছ থেকে সুখিদের বাড়ির
ঠিকানা নিল। সজীব গাড়িতে
ঘুমিয়ে আছে। সজীবের মায়ের মৃত্যুর
সংবাদটা সজীবকে না জানিয়েই
গাড়ি নিয়ে সুখিদের বাড়ির দিকে
চলল খলিল।
সুখির বাবাকে নিয়ে সজীবকে গাড়ি
থেকে নামানো হলো। হুঁস নেই
ছেলেটার। অন্যদিকে সুখির প্রসব
বেদনা চলছে কাল রাত থেকে। খলিল
সজীবের পাশে বসে তার চার
ব্যাটারির রেডিওটা ছাড়লো।
রেডিওতে খবর শুনেই খলিল হতচকিয়ে
উঠলো। তার চোখমুখ দিয়ে ছড়িয়ে
পরছে খুশির আভা। খলিল সজীবকে
ডাকলো-
সজীব ভাই? সজীব ভাই?
-হুঁ
-ভাই দ্যাশ স্বাধীন হইছে। আমরা বিজয়
পাইছি। সকালে পাক বাহিনীরা
রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পন করছে।
সজীবের চোখ মুখ বড় হয়ে গেল। যেন সে
সম্পূর্ণ সুস্থ।
সজীব কি যেন বলতে চাইছিলো তখনই,
আজানের শব্দ শুনলো। খলিল চেঁচিয়ে
বললো-
ভাই তোমার পোলা হইছে।
সজীবের মুখে উচ্চারিত হলো- আল
হামদুলিল্লাহ্!
-খলিল ভাই মায়রে একটু ডাইকা লইয়াও।
খলিল চুপ চাপ বসে রইলো।
- কি হইলো খলিল ভাই? মায়রে একটু
ডাক দাও।
-কোন হান দিয়া ডাইকা আনমু? হেয়
আমাগো থুইয়া অনেকদূরে গেছে গা!
- ও--- মায় নাই? মায় আমারে থুইয়া
গেছে গা!
ও মা------ মাগো---
- সজীব জ্ঞান হারায়।
কিছুক্ষণ পরে জ্ঞান ফেরে সজীবের।
আবারো দুবার বমি করেছে সজীব।
শেষবার বমি করেই ওর শ্বশুড়কে বললো-
আব্বা আমার মানিকেরে লইয়াসেন।
আমি একটু ওর চাঁদমুখ খান দেহি। দেরি
কইরেন না আব্বা। আমার ক্যামন জানি
লাগতাছে। আমার সময় শেষ হইয়া
আইতাছে আব্বা।
সজীবের ছেলেকে নিয়ে আসা হলো
সাথে সুখিও আসলো। সজীবকে দেখেই
কাঁদতে শুরু করলো সুখি। সুখি কাঁদছে,
সেদিকে খেয়াল নেই সজীবের।
ছেলেকে কোলে নিয়ে সেকি খুশি
সজীবের। এগালে চুমো, ওগালে চুমো,
কপালে চুমো। যেন আকাশের চাঁদ
হাতে পেয়েছে সজীব। নিজের কপাল
থেকে পতাকা খুলে ছেলেকে
জরিয়ে নিল পতাকাটা দিয়ে।
ছেলেকে কোলে নিয়ে শুয়ে রইলো
সজীব।
সবাই চুপচাপ। নিরবতা ভাঙতে খলিল
ডাকলো সজীবকে-
সজীব ভাই! সজীব ভাই!
কিন্তু সজীবের কোন সারা নেই। কি
ঘটেছে তা বুঝতে পেরে খলিল
চিৎকার দিলো-
সজীব ভা------ই!
সুখি ঠোঁটে আঙুল চেপে বলল-
স---- চুপ! উনি ঘুমাইছে!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now