বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মানিব্যাগে থাকা কচকচে একশ টাকার নোটটা পকেটে পুরে মেস থেকে বের হলো রাসু। এই একশ টাকার নোটটা তার শেষ সম্বল। এ মাসের প্রথমদিকেই তার অনেকগুলো টাকা খরচ হয়ে গেছে। আজ মাসের সতেরো তারিখ। এখনো এ মাসের তেরটা দিন বাকি আছে। কিন্তু রাসুর হাতে এই একশ টাকার নোটটা ছাড়া অবশিষ্ট কোনো টাকা নেই। সে বুঝতে পারছেনা বাকি দিনগুলোর মেসের 'মিল' এর টাকা সে কিভাবে দেবে।
.
মেস থেকে বেরিয়ে মেইন রোডের বাঁ দিক ধরে হাঁটতে থাকে রাসু। তাকে তিন
কিঃমিঃ দূরে যেতে হবে। সেখানে এক অফিসে তার বন্ধু আজাদ চাকরি করে।
তিন কিঃমিঃ পথ হাঁটা রাসুর পক্ষে অসম্ভব কিছুনা। তার অভ্যাস হয়ে গেছে। আগে প্রতিটা দিন সে মেস থেকে হেঁটে ভার্সিটি যেত।
.
সময়টা দুপুর পেরিয়ে বিকেল ছুঁই ছুঁই। হালকা রোদে রাসু হাঁটছে। তার চোখে মুখে একটা উত্তেজনা বিরাজ করছে। এরকম উত্তেজনা সাধারণত আনন্দের কোনো কিছুতে থাকে।প্রথমে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হয় চোখে। চোখ বলে দেয়, সে কতটা আনন্দে আছে। কতটা ভালো আছে।
.
বন্ধুর অফিসের কাছে আসতেই রাসুর ফোনে বাড়ি থেকে মায়ের কল আসে। রাসু পকেট থেকে ফোন বের করেই বলে,
.
-আস্সালামু আলাইকুম আম্মা।
-অলাইকুমুস্সালাম।
-হ্যাঁ, আম্মা বলেন।
-বাবা রাসু, কেমন আছিস তুই।
-ভালো আছি, আম্মা। আপনারা সবাই
কেমন আছেন?
-হ্যাঁ, আমরাও ভালো। দুপুরে খেয়েছিস?
-হ্যাঁ, আম্মা। আপনি খেয়েছেন? রিমা
খেয়েছে?
-হ্যাঁ। একটা কথা বলার ছিলো।
-বলেন।
-রিমার পরীক্ষা চলে আসছে, ওর ফরম
পূরণ করতে টাকা লাগবে।
-কবে লাগবে?
-আগামী এক সপ্তাহের মাঝেই।
-আচ্ছা, আমি টাকা পাঠায় দিবো।
-আচ্ছা। ভালো মত থাকিস। নিজের
খেয়াল রাখিস বাবা।
-আচ্ছা, আম্মা। রাখি। আল্লাহ্ হাফেজ।
.
ফোনটা রেখে দিতেই একরাশ দুঃখ এসে
রাসুর মনের ভেতরটায় ভীড় করে। এই
দুঃখ আজকের না। এই দুঃখ কয়েক বছর
থেকে তাকে কষ্টে জর্জড়িত করছে। তার
এই দুঃখ দেখার কেউ নেই। সে একা। এত
মানুষের ভীড়েও সে একা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে
বন্ধুর অফিসে প্রবেশ করে রাসু।
.
রাসু আজাদের অফিসের রুমে প্রবেশ
করতেই আজাদ আনন্দিত গলায় বলে ওঠে,
.
-আরে বন্ধু! কি খবর?
-ভালো রে। তোর কি অবস্থা?
-আর বলিসনা, তোর ভাবির সাথে একটু
ঝগড়া হইছে। ওর মন খারাপ তাই
আমারও একটু মন খারাপ।
-ঝগড়া আবার কেনো হলো?
-থাক সেসব কথা। তোর কাজটা হয়ে
যাবে বুঝেছিস। এ মাসের পঁচিশ তারিখে
আরেকবার আসবি।
-আচ্ছা। এখন তাহলে যাই।
-আরে বস, চা খেয়ে যা। নাহলে চল তোকে
মালাই চা খাইয়ে নিয়ে আসি।
-না রে। আজ না।
-চল তো।
.
এক প্রকার জোর করেই আজাদ রাসুকে চা খাওয়াতে নিয়ে গেল। আজাদ বন্ধু হিসেবে খুব একটা খারাপ না। রাসুকে সে যথেষ্ট সাহায্য করে। এখনকার দিনে এধরণের সাহায্য কেউ কাউকে করেনা। তবে রাসুর ধারণা, আজাদ অনেক ভালো।আর ভালো ছেলেদের কিছু গুণ থাকে যা আজাদের মধ্যে আছে।
.
চা খেতে খেতে দু বন্ধু অনেক গল্প করে। নিজেদের প্রতিদিনের জীবনের গল্প, সবার আড়ালে থাকা কিছু না জানা গল্প। যে গল্পগুলোতে কেবল যন্ত্রণা থাকে, হাহাকার থাকে, থাকে কঠিন দুঃখ। যেগুলো কেউ শুনতে চায়না।শোনার মত কেউ থাকেনা। রাসুর মুখ থেকে তার কষ্টের গল্পগুলো শুনতেই আজাদের দুচোখ ভীজে উঠলো। আজাদ রাসুর হাতে বন্ধুত্বের বিশ্বাস আর ভালোবাসা নিয়ে আলতো করে চাপ দেয়। আজাদ চোখ মুছে, মুখে হাসি টেনে এনে
বলে,
.
-আমি আছিরে বন্ধু। তোর পাশে আমি আছি।
.
আজাদের কথায় রাসু আশ্বাস পায়। সে ও আজাদের হাতটা শক্ত করে ধরে। রাসুর চোখের কোন বেয়ে বন্ধুর জন্য ভালোবাসার জল গড়িয়ে পড়ে।
.
মেসের দু-মাসের ভাড়া বাকি পড়ে আছে। মেসের মালিক সোবহান ভাই খুব ভালো লোক। তিনি রাসুকে অনেক স্নেহ করেন বলেই ভাড়ার জন্য তেমন একটা চাপ দেন না। পান চিবোতে চিবোতে মুচকি হেসে
রাসুকে বলেন,
.
-রাসু, কোনো সমস্যা নাই। তোমার কাছে যহন ট্যাকা আইব আমারে দিয়া দিবা।
আরে ভাই আমিও তো মানুষ নাকি?
বুঝার ক্ষমতা আল্লাহপাক আমারে দিছেন।
.
রাসু বুঝে উঠতে পারেনা তার আশেপাশের মানুষগুলো এত ভালো কেনো। এই সব ভালো মানুষের জন্যই বুঝি আল্লাহপাক পৃথিবীটাকে এখনো ঠিক রেখেছেন। রাসু মনে মনে আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করে।
.
আজ পঁচিশ তারিখ। রাসু ঠিক সময়ে তার বন্ধু আজাদের অফিসে উপস্থিত হয়।
সব কাজ শেষ করার পর আজাদ রাসুকে তার বসের চেম্বারে নিয়ে যায়। বসের
চেম্বারে প্রবেশ করার আগে আজাদ রাসুকে অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়। আজাদ তার বসের দরজা ঠেলে বলে,
.
-মে আই কাম ইন, স্যার?
-ও আজাদ! আফকোর্স, কাম ইন।
.
রাসু আজাদের বসকে সালাম দেয়। আজাদের বস সালাম নিয়ে দুজনকেই
বসতে বলে। আজাদের বস কিছুক্ষণ তার সামনে রাখা ফাইলটা মনযোগ দিয়ে দেখে আজাদকে বলে,
.
-হুম, তোমার বন্ধু কোথায়?
.
আজাদ রাসুকে দেখিয়ে বলে এ ই আমার বন্ধু। আজাদের বস রাসুকে লক্ষ্য করে
বলেন,
.
-তুমি তাহলে রাসু?
-জ্বি স্যার।
-তোমার বায়োডাটা, সার্টিফিকেট সব দেখলাম। ইউ আর সো ইন্টেলিজেন্ট।
এরকম মেধা থাকা স্বত্বেও কোথাও চাকরি কেনো পাওনি?
-স্যার, অনেক জায়গায় চাকরির ভাইভা দিয়েছি। আমার কনফিডেন্স ছিলো চাকরি হয়ে যাবে। কিন্তু হয়নি।
-বাট হোয়াই?
-দূর্নীতি, স্যার। টাকা চেয়েছিলো দিতে পারিনি তাই হয়নি।
-ওহ্।
.
আজাদের বস আজাদকে লক্ষ্য করে বলেন,
.
-আজাদ তোমরা এখন আসো। আমার একটা কাজ আছে। আমি তোমাকে পরে
ডেকে নেব।
.
আজাদ কিছুটা হতভম্বিত। সে কিছু বুঝতে পারছেনা। তার বস বলেছিলো রাসুর
কোয়ালিফিকেশন ভালো। সে চাকরি পাওয়ার যোগ্য। বাট, বস কিছুই বলল
না। আজাদ রাসুকে কোনো চিন্তা করতে না বলে মেসে চলে যেতে বলে।
.
রাসু আজাদের অফিস থেকে বের হয়ে মেসের উদ্দেশ্যে হাঁটতে থাকে। রাসুর মনে হতাশার বাতাশ বয়ে যাচ্ছে। নিজেকে সামলে নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ধীর পায়ে হাঁটছে সে। পকেটে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠলো। ফোনটা বের করে দেখে তার স্টুডেন্ট মিলির কল।
.
-হ্যাঁ মিলি বলো।
-স্যার, আমি আর আগামী মাস থেকে
পড়বনা। আমরা চট্টগ্রাম চলে যাচ্ছি।
আপনি এসে টাকাটা নিয়ে যাবেন।
-আচ্ছা।
.
মিলি ফোন কেটে দিলো। রাসু দীর্ঘশ্বাস
ফেলে আবার হাঁটতে শুরু করে। ফোনটা
পকেটে ঢুকানোর আগেই আরেকবার
ফোনটা বেঁজে ওঠে। আজাদের কল।
.
-হ্যাঁ, বন্ধু বল।
-কংগ্রাচুলেশন বন্ধু। মিষ্টি কবে খাওয়াবি?
-মিষ্টি! কিসের মিষ্টি?
-আরে, তোর চাকরি হয়ে গেছে।
-সত্যি বলছিস?
-হ্যাঁ বন্ধু।
-থ্যাংকস বন্ধু।
-হাহা। ওয়েলকাম। আর শোন আগামী
মাসেই জয়েনিং। ওকে বাই।
-বাই।
.
রাসুর মনের মাঝে প্রশান্তি আসে।সে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে আবারো আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা ও শুকরিয়া জ্ঞাপন করে। রাসু হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে থাকে, সে তার চাকরির প্রথম মাইনে পেয়েই মাকে নতুন একটা শাড়ী কিনে দিবে। আর ছোট্ট বোনটাকে একটা বোরখা বানিয়ে দিবে। সোবহান ভাই ও আজাদকে পেট ভড়িয়ে মিষ্টি খাওয়াবে। এসব ভাবতেই রাসুর চোখে জল চলে এলো। এই জল আনন্দের। এই জলকে বাঁধা না দিয়ে সে হাঁটতে থাকে।
.
.
লেখা - সাঈদ আহমেদ
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now