বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
- ভাই আমাকে কি একটু জানালার
পাশে বসতে দিবেন?
.
আমি ছেলেটার কথা কানে না দিয়ে
উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে ঘুমানোর
ভান ধরে ট্রেনের সিটে হেলান
দিয়ে আছি। ছেলেটা আমাকে
উদ্দেশ্য করে আবার বলল।
.
- ভাই আপনি কি শুনছেন?
.
আমি এবার একটা হাই দিয়ে আবার
চোখ বন্ধ করে আগের অবস্থায় রইলাম।
ছেলেটা হয়তো ভাববে আমি ঘুমিয়ে
আছি। কিছু মুহূর্ত যাওয়ার পর ছেলেটা
আবার বলছে।
.
- ভাই একটু শুনুন না?
.
ছেলেটার পেঁনপেঁনানিতে আমি
এবার একটু রাগান্বিত হলাম। তাই আমি
রাগান্বিত চাহনিতে বললাম।
.
- আচ্ছা আপনার সমস্যাটা কি?
- না মানে আমাকে একটু জানালার
পাশে বসতে দিবেন? আমি সামনের
স্টেশন এ নেমে পড়বো।
- ভাই আমিও সামনের স্টেশনেই
নামবো।
- ভাই আমি যদি আপনাকে কিছু টাকা
দেই?
.
না এবার আমার রাগটা আরো রকেট
গতিতে বাড়তে থাকলো। আমি
ছেলেটাকে রেগে বললাম।
.
- অই মিয়া আমি কি ফাত্রা নাকি
টাকা নিব আপনার কাছ থেকে।
.
ছেলেটা আমার ধচানি খেয়ে এবার
একটু শান্ত হল। কই তার শান্ত থাকা
বেশিদূর রইলো না। ছেলেটা আবার
বলল।
.
- আসলে আমার অসুবিধা দেখেইতো
বলছি।
.
আমি একটু দুষ্টুমি করে বললাম।
.
- আপনার কি ট্রেনেও বমির অভ্যাস
আছে?
- ইয়ে মানে, না।
- আপনি কি মেয়েলোক?
- না।
.
আমি একটু হেসে বললাম।
.
- তাইলে চুপ করে থাকেন।
- আসলে আমি আসার সময় মাকে বলে
এসেছিলাম যে আমি ট্রেনে
জানালার পাসে বসে আসছি। আমি
মাকে মিথ্যা বলি না তো তাই।
আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। ছেলেটার
মুখের কথা শেষ না হওয়ার আগেই আমি
বললাম।
.
- কি বললেন, আবার বলুন তো।
.
আসলে ট্রেনে ওঠার সময় মাকে বলে
এসে ছিলাম আমি জানালার পাশে
বসে আসছি। কিন্তু আমি জানতাম না,
মা আমাকে স্টেশনে নিতে আসবে।
আমি ছেলেটার কথা মন থেকে
উপলব্ধি করলাম এবং বললাম।
.
- ভাই কাকে কথা টা বলে ছিলেন
আপনি?
- আমার মাকে।
.
আমি ভাবনাগ্রস্ত হয়ে গেলাম। মনে
মনে ভাবতে লাগলাম মা বলে কথা
তাকে তো আর মিথ্যা বলা যায় না।
ছিট টা তো ছেলেটাকে দিতেই
হচ্ছে দেখছি। আমি ছেলেটা কে
হাসি মাখা মুখে বললাম।
.
- ভাই এত না পেঁচিয়ে আমাকে বললেই
হত আপনি মাকে বলে এসেছেন
জানালার পাশে বসে আসছেন।
- আপনি তার সুযোগ দিলেন কই।
.
আমি মনে মনে ভাবলাম তাও তো ঠিক।
ধ্যাত! আমি যে কি করি না। আমি আর
কথা বাড়ালাম না সাথে সাথে
আমার জানালার পাশের সিট টা
ছেলেটা কে দিয়ে দিলাম।
ছেলেটা সিটে বসে আমাকে বলল।
.
- ধন্যবাদ ভাই।
.
কিছুক্ষণ নিরব থাকার পর আমি
ছেলেটা কে বললাম।
.
- আপনি তো দেখছি মার খুব বাধ্য।
.
ছেলেটা একটা হাসি দিয়ে আমাকে
বলতে লাগল।
.
- আসলে কি জানেন ভাই আমি ছোট
থেকে মাকে যেমন ভয় পাই তেমন
ভালবাসি। মা আমার থেকে আরো
দ্বিগুন আমাকে ভয় পায় এবং
ভালবাসে। এই যে আমি বাইরে থাকি
এর জন্য মা আমাকে ঘন্টায় না হলেও
পাচ বার ফোন দেই। তার পিছনে অবশ্য
একটা কারনও আছে। আমি বাইরে
যাওয়ার পর থেকে মাকে কোন দিন
মিথ্যা বলি নি। যখন যেটা করি
সেটাই বলি। কোন দিন শুয়ে থেকে
বলি নি মা আমি তো পড়ছি। আসলে
মায়ের দোয়া, আশির্বাদ মাথায়
থাকলে কেউ কোন দিন অসুখী হয় না।
.
আমি ছেলেটার কথা যত শুনছি তত
কল্পনা জগতে হারিয়ে যাচ্ছি। আর
আমার শুনার আগ্রহটা তিব্র থেকে
তিব্রতর হচ্ছে । হঠাৎ ছেলেটার
ফোনটা বেজে ওঠল। তাই ছেলেটা
কিছুক্ষনের জন্য ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
আর আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে কখন
ছেলেটার কাছ থেকে তার মাকে
নিয়ে আরো গল্প শুনবো।
.
কিছু মুহূর্ত বাদে ছেলেটার ফোন
ব্যস্ততা অবসান হল। আমি ছেলেটাকে
আগ্রহী দৃষ্টি তে বললাম।
.
- কে ফোন করেছিল?
- আমার মা।
.
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম।
.
- কি বলল, কি বলল।
- বলল আর কত ক্ষন লাগবে আসতে?
- আপনি কি বললেন?
- আমি ঠিক টাইম টাই বলেছি। বলেছি
যে আমার আরো ৩০- ৩৫ মিনিট লাগবে
আসতে।
- হুম ঠিক। দুই জন এক সাথেই নামা
যাবে।
- আচ্ছা।
- আপনার মাকি একাই দাড়িয়ে আছে
স্টেশনে না সাথে কেউ আছে?
- না মা একাই এসেছে।
.
আবার দুজনেই কিছুক্ষনের জন্য নিরবতা
পালন করলাম। ছেলেটা নিজে থেকে
আমাকে কিছু বলছেনা। কিন্তু আমাকে
তো বলতেই হবে। কারন ছেলেটা আর
তার মার মধ্যে হওয়া আরো ঘটনা শুনার
যে অনেক ইচ্ছা আমার। তাই আমি
বললাম।
.
- ভাই তখন আপনি যে বললেন, আপনার
মা আপনাকে ভয় পায় তার পিছনে
কারন আছে, আচ্ছা কারন টা কি
জানতে পারি।
.
ছেলেটা চোখ বন্ধ করে কি যেন
ভাবল। আমি তার দিকে অপলক দৃষ্টি তে
তাকিয়ে আছি। ছেলেটা ভাবনার
জগত থেকে বের হয়ে বলল।
.
-শুনবেন সেই কারন টা কি?
.
আমি আনন্দিত হয়ে বললাম।
.
- হুম শুনবো।
- তাহলে শুনুন।
.
তখন আমি ছোট। এই ধরুন ৮-৯ বছর বয়স
আমার। এই বয়সে জানেনি তো
ছেলেরা কেমন দুষ্টু থাকে, কিন্তু আমি
তার থেকে পাচ- ডাবল দুষ্টু ছিলাম।
সারাদিন দুষ্টামির ছলেই থাকতাম। মা
বাবার কথা ছিটেফোঁটাও শুনতাম না।
খাওয়া - দাওয়া তো একদম ঠিক ছিল
না। সকালের খাওয়া রাতে খেতাম।
আর এর জন্য আমার মা বাবা বেশি
দুশ্চিন্তাই থাকত, বিশেষ করে আমার
মা। বাবা তার ব্যবসায়িক কাজে
বেশি ব্যস্ত থাকত তাই আমার খোঁজখবর
ও বেশি নিতে পারত না। কিন্তু মা
আমার জন্য এমনও সময় গিয়েছে যে
আমার জন্য মা কেঁদেছে। আমি একদম মা
বাবার অবাধ্য ছিলাম। আর এভাবেই
আমার অবাধ্যপনা বাড়তে থাকে।
.
হঠাৎ একদিন আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি।
যখন জ্ঞান ফিরে তখন দেখি বাড়ি
ভর্তি আত্বিয়স্বজন আর ডাক্তার।
সেদিন বুঝেছিলাম মা - বাবা আমার
জন্য কতটুকু চিন্তিত। আমি যে দিন
অজ্ঞান হয়ে পড়ি সে দিন মা আমার
পাশে সারারাত বসে থেকে আমার
মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে।
সেদিনের পর থেকে আমি আর খেলতে
যেতাম না, খাওয়া- দাওয়া, কোন
কিছুই আমার ভাল লাগত না । আমি
বুঝতে পারছিলাম আমি একটু একটু করে
অসুস্থ হয়ে পড়ছি। মা আমাকে অনেক
ডাক্তার, কবিরাজ দেখিয়েছে কিন্তু
কেউ বলতে পারল না আমার কি হইছে।
ঠিক ২৪ দিনের মাথায় আমি আবার
অজ্ঞান হয়ে যখন জ্ঞান ফিরে আমি
তখন ঢাকার কোন এক স্বনামধন্য
হাসপাতালে আর আমার পাসে আমার
সব আত্বিয়স্বজন, সেদিন আমি আমার
মার চোখের দিকে একবার তাকিয়ে
ছিলাম তার দ্বিতীয় বার আমি আর
তাকায় নি, কারন যখন আমি মার
চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম তখন
মার চোখ গুলা রক্তের মত লাল ছিল
কিন্তু কোন জল ছিল না। আমি বুঝতে
পেরেছিলাম মার চোখের পানি
বোধহয় শেষ হয়ে গেছে কাদতে
কাঁদতে।
.
জ্ঞান ফিরার পর থেকেই আমি বমি
করতে থাকি। বড় বড় ডাক্তার আমাকে
পরিক্ষা করে মা - বাবাকে
জানালেন,আমার দুটো কিডনিই
ডেমেজ হয়ে গেছে। কিডনি যদি
পুনঃনির্মাণ না হয় তবে আমাকে
বাঁচানো সম্ভব না। তখন শুরু হল মা-
বাবা আর আমার আত্বিয়স্বজন এর
কিডনি খোঁজাখুঁজি। না কোথাও
কিডনি পাওয়া গেল না। আমার মা-
বাবা যেন অতল সাগরে পড়ে গেলেন।
আর আমার মার কান্না যেন নদির
স্রোতের মত চলতেই থাকে চলতেই
থাকে, যা থামার নয়। অবশেষে এক
ডাক্তার মা- বাবাকে আশার সংবাদ
শুনান। ডাক্তার বলেন যদি আমার
আত্বিয়স্বজন এর মাঝে কেউ তার একটা
কিডনি দেন তবুও আমাকে বাঁচানো
সম্ভব। এই কথা শুনে আমার মা- বাবা
যেন দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন। তখন আমার
মা আমাকে তার একটি কিডনি দিয়ে
আমাকে নতুন জিবন দান করেন। আমি
সবাই কে বলি আমার মা আমাকে দুই
বার জন্ম দেন। তখন থেকেই আমি মাকে
ভয় পায় কারন মার একটি কিডনি নেই
আর মা আমাকে ভয় পায় আমার একটি
কিডনি নেই। তখন থেকেই আমি আর
আমার মাকে কোন প্রকার কষ্ট দিই না।
আর তার জন্যই মার কথা আমার কাছে
শিরোধার্য।
.
কথাগুলা বলে ছেলেটা একটা
নিশ্বাস নিয়ে আমাকে বলে।
.
- ভাই আপনার চোখে জল যে?
.
আমি যেন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ি ছেলেটা
আবার বলল।
.
- ভাই আপনি আপনার মাকে একটা গল্প
বলুন না।
.
এই কথা টা শুনে আরো চুপ হয়ে গেলাম।
ছেলেটা যে কথা বলেছে তার ঠিক-
ঠাক উত্তর আমার জানা নাই। ছেলেটা
আবার বলল।
.
- কি হল?
.
আমি নিচ দিকে তাকিয়ে বললাম।
.
- ভাই আমার মা- বাবা কেউ নেই।
.
ছেলেটা আমার কথা শুনে থমকে গেল
এবং বলল।
.
- সরি ভাই, আমি বুঝতে পারি নি।
- না ঠিক আছে।
.
ছেলেটা তার মাকে নিয়ে যেই
গল্পটা বলল এটা আমার ফোনে রেকর্ড
হয়ে গেছে। মাকে নিয়ে
ভালোবাসার, কষ্টের, সুখের,আনন্দের
এমন হাজারের অধিক গল্প আমার ফোনে
রেকর্ড করা আছে। আমার বন্ধুরা যখন
কানে হেড ফোন লাগিয়ে গান শুনায়
ব্যস্ত থাকে আমি তখন আমি মাকে
নিয়ে হাজারো কষ্টের,
ভালোবাসার, সুখের গল্প শুনায় ব্যস্ত
থাকি। একটা শেষ হলে আরেক টা শুনি,
আরেক টা শেষ হলে অন্য আরেক টা
শুনি। আর এর জন্য আমার বন্ধুরা আমাকে
প্রায় মা পাগল বলে ডেকে থাকে।
কেউ যখন আমাকে মা পাগল বলে তখন
আমি রাগ না বরং খুশিই হয়।
.
ট্রেনের হর্ন বেজে ওঠল। ট্রেনটা
আস্তে আস্তে স্টেশনে থেমে গেল।
বুঝতে পারছি আমাকে এই স্টেশনেই
নামতে হবে। আমি আর ছেলেটা
একইসাথে ট্রেন থেকে নামলাম। আমি
ছেলেটাকে শেষ বারে মত
বলেছিলাম।
.
- ভাই আপনার সাথে তো পরিচয় টাই হল
না।
.
ছেলেটা আমাকে বলল।
.
- আমি আরিফ। আপনি?
- জয়।
.
ছেলেটা আমার সাথে হ্যান্ডসেক
করে তার মার কাছে চলে গেল।
গিয়েই তার মাকে জরিয়ে ধরল। আর
তার মা তার মাথায় কিছুক্ষনের জন্য
হাত বুলিয়ে দিল এবং তারা আস্তে
আস্তে যেতে লাগল আমি ছেলেটা
আর তার মার হেটে যাওয়াটা
দেখছিলাম। হঠাৎ তারা আমার দৃষ্টির
অগোচরে চলে গেল। আমিও একাকি
হাটা দিলাম একটা বড় নিশ্বাস
ফেলে।
.
আমি জয়। ছোট খাটো একটা প্রাইভেট
সেক্টরে জব করি। সেই ১৪ মাস বয়স
থেকে মাকে হারাই আর বাবাকে
হারাই ২০ মাস বয়সে । বড় হয়েছি
আনাচেকানাচে। আমার মা বেচে
থাকলে হয়তো আমাকে অনেক অনেক
ভালবাসতো। আজ যদি আমার মা বেচে
থাকত তাহলে হয়তো অন্যদের মাকে
নিয়ে নয় আমার মাকে নিয়ে
হাজারের অধিক ভালবাসার গল্প
ফোনে রেকর্ড থাকত। যার মা নেই সেই
বুঝে মা কি জিনিস।
.
কেউ আছে টাকা জন্য পাগল আবার
কেউ মেয়েলি বিষয়ে পাগল, কেউ
নিশা করায় পাগল, কেউ হয়তো বা
বাস্তবেই পাগল।
কিন্তু আমি, আমি 'মা পাগল'।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now