বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মা হারা
মূলঃ আলী তানতাবি
অনুবাদঃ আবু তালহা
রাশেদ লক্ষ করল, তার সামনে খোলা বইয়ের কালো কালো হরফগুলোই শুধু চোখে পড়ছে, মাথায় কিছুই ঢুকছেনা৷ পড়ালেখায় একদমই মনোযোগ দিতে পারছেনা সে৷ তার মাথায় কেবল নিজের দুর্দশার কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে৷ সে ভাবছে, কিভাবে তাদের দুই ভাইবোনের জীবন দুর্বিসহ হয়ে গেল, কিভাবে তাদের জীবন পরিণত হল জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে৷
ভাবতে ভাবতেই পরীক্ষার রুটিনটা দেখে নেয় রাশেদ৷ আর মাত্র একসপ্তাহ পরেই ফাইনাল পরীক্ষা৷ সে আপন মনে বলে, ‘এখন নাক-মুখ গুঁজে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়া ছাড়া কোন উপায় নেই৷ হাহ! পরীক্ষার প্রস্তুতি! সেই স্থিরতা, সেই মনযোগ এ বাড়িতে পেলে তো! এই মহিলা কি আমাকে একদন্ড শান্তিতে থাকতে দেয়৷ আর আমি নাহয় কোনরকমে স্বস্তি পেলাম, কিন্তু আমার ছোট বোনটাকে কি আর ছেড়ে দিবে?’ ক্লাসের ফার্স্টবয় রাশেদ রেজাল্ট খারাপ হওয়ার কথা কল্পনাও করতে পারেনা৷
বাইরে দমকা হাওয়া বইছে৷ রাশেদ ভাবে, দমকা হাওয়াও বুঝি এই মহিলার চেয়ে দয়ালু, তার হৃদয়টাই মনে হয় বেশি কোমল৷ সে আর কিইবা করে? দু’একটা গাছের ডালই হয়ত ভাঙে৷ কিন্তু তারপর মুষলধারে বৃষ্টি হয়; ভাঙা ডালেই নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটে৷ আর বাড়ির ঝড়; সে তো বয়ে চলে বিরামহীন৷ ভেঙে চলে তার ছয় বছরের ছোট বোনটির কোমল মন৷ ভাঙা মন কি আর জোড়া লাগে? এই মহিলা ডাইনী বৈ কিছু নয়৷
রাশেদ প্রায়ই শোনে, ডাইনীটা তার বোনকে বকছে৷
মারধরের শব্দও শুনতে পায় মাঝেমধ্যে৷ রাশেদ চুপ করে বসে থাকতে পারেনা৷ আবার বাবার ভয়ে কিছু বলতেও পারেনা৷ “বাবা!” এই লোকটাকে কী বাবা বলা যায়? যে লোক তার ছোট্ট মেয়েকে জীবনের অর্থ বোঝার আগেই জীবনের তিক্ততা আস্বাদন করানোর জন্য নতুন স্ত্রীর সাথে হাত মেলায় সে আবার কেমন বাবা?
রাশেদের আর পড়তে ভাল লাগেনা৷ পড়ার টেবিল ছেড়ে জানালায় এসে দাঁড়ায় সে৷ দেখতে পায়, বোনটি তার দেয়ালে মুখ গুঁজে কাঁদছে৷ মলিন মুখখানি শুকিয়ে এতটুকুন। পরনে রংচটা জামা৷ তার পাশেই ছোট সৎবোনটা খেলছে৷ তার মুখটা বড় ফুটফুটে৷ গায়ের জামাটাও নতুন৷ রাশেদের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে৷ কী অপরাধ তার বোনটির? একসময় সেই তো ছিল বাবার হাসি-আনন্দ, সবচেয়ে প্রিয়মুখ৷ অথচ আজ সে-ই অবহেলিত৷ গালমন্দ ছাড়া আর কিছু তার কপালে জোটেনা৷ আজ সে কাজের মেয়ে; বরং কাজের মেয়়ের চেয়েও অধম৷ কাজের মেয়ের কপালও কখনও ভাল হয়৷ হৃদয়বান মুনিবের সন্তানসম আদর সেও পায়৷ অথচ নিজের ঔরসজাত মেয়ের প্রতি কাজের মেয়ের আচরণ করার মত হৃদয়ও বাবার নেই৷ হতভাগীর কপালে অদৃষ্টের লিখন এমনই; মা মরে গেলে মা-হারা হবে আর বাবার হৃদয় মরে গেলে হবে বাবার স্নেহবঞ্চিত৷
রাশেদ সৎমায়ের কণ্ঠ শুনতে পায় ____
“এই পোড়ামুখী কুত্তি!”... তার কাছে মেয়েটির নাম কুত্তি৷ বিকেলে বাবা বাসায় ফিরলে অবশ্য তার নাম পাল্টে যায়৷ তখন সে "মা" কিংবা সোনামনি-যাদুমনি৷ রাশেদ শুনতে পায়-
“তোর বোন কাঁদছে শুনিস না। গিয়ে জিজ্ঞেস কর, কেন কাঁদছে৷ কীরে! বোবা-কালা হয়ে গেলি নাকি? কোন সাড়াশব্দ নেই দেখি৷ গিয়ে দ্যাখ কী চায়”
“ও কেক চায়।”
“তাহলে কুমড়ার মত দাঁড়িয়ে আছিস কেন, কেক দে।”
হতভাগী ভেবে পায়না কীভাবে বলবে, কেকের টুকরোটা তার৷ গতকাল রাতে বাবা বেশ বড়সড় একটা কেক এনেছিল৷ পুরো কেকটাই দিয়েছিল তার ছোটমেয়েকে৷ সে তখন তাকিয়ে তাকিয়ে তার খাওয়া দেখছিল৷ হঠাৎ কী মনে করে যেন সৎবোনের দিকে একটুকরো কেক ছুঁড়ে দিয়েছিল৷ হতভাগী কেকের সেই টুকরোটা পেয়েই খুশী৷ কেকের টুকরোটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল সে৷ তারপর ছোট্ট একটা কামড় দিয়ে বাকিটা রেখে দিয়েছিল পরে খাবে বলে৷ ছোট সৎবোন এখন সেই কেকটুকুই চাইছে৷ রাশেদ তার সৎমায়ের গলা শুনতে পায়,
“কীরে পোড়ামুখী! কেক কোথায়?”
উত্তরে সে চুপ করে রইল।
সৎবোনটা বলল, “আম্মু! ওর কাছেই আছে৷ শয়তানটা আমার কাছ থেকে নিয়ে লুকিয়ে রেখেছে।”
ডাইনীটা মেয়েটাকে চোরের মত টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলল তার ঘরের দিকে৷ বাধ্য হয়ে কেকটুকু বের করা মাত্রই তার ওপর গালির বান বয়ে গেল৷
“চোর! পোড়ামুখী কুত্তি! তোর মা বুঝি তোকে এই শিক্ষাই দিয়েছে; তোর কাছে যেটা নেই সেটা চুরি করে নিবি...”
রাশেদ সব সহ্য করলেও তার মৃত মায়ের ব্যাপারে কোন কটুকথা সহ্য করতে পারেনা৷ তার মায়ের ব্যপারে এমন অপবাদ শুনে সে চেঁচিয়ে উঠল৷
“আমার মায়ের ব্যপারে কোন কথা বলার অধিকার আপনার নেই।”
ডাইনীটা এতদিন এই সুযোগের অপেক্ষায়ই ছিল৷ অনেক অত্যাচার-অপমান করেও রাশেদের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে পারেনি সে৷ মনে মনে ভেবেছে, বদমাশটা মুখে এমন কুলুপ এঁটে থাকে কিভাবে? মনের ঝাল মেটানোর কোন রাস্তাই যখন পায়না তখন তার মেজাজ আরো খারাপ হয়৷ রাগে গজগজ করতে করতে ভাবে, শয়তানটাকে কীভাবে শিক্ষা দেয়া যায়৷ কিন্তু এই মূহুর্তে ডাইনীটার মন আনন্দে নেচে উঠল৷ আজ ঠিক মোক্ষম হাতিয়ারটাই সে পেয়েছে৷
“কী বললি! আমার কিছু বলার অধিকার নেই! তোর জন্য খাটতে খাটতে হাড় কয়লা বানিয়ে ফেললাম৷ তারপরও আমি কিছু বলতে পারবনা! ওই কালো খাতায় আজেবাজে লেখা ছাড়া আমার কোন উপকারে এসেছিস? আমার সব কষ্ট মাটি হয়েছে৷ অবশ্য এতে আমি তেমন আশ্চর্য বোধ করিনা৷ কারণ তুই তো তোর মায়েরই ছেলে।”
“আমি আপনাকে বলেছি, আমার মায়ের ব্যাপারে কোন মন্তব্য করবেন না৷ আমার কথায় কাজ না হলে কী করে আপনার মুখ বন্ধ করতে হবে তা আমার জানা আছে৷”
ডাইনীটা দৌড়ে রাশেদের কাছে গিয়ে বিলাপ জুড়ে দিল৷ প্রতিবেশীদেরকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতে লাগল- “কী! এতবড় কথা! তুই আমার গায়ে হাত তুলতে চাস! অকৃতজ্ঞ! বিশ্বাসঘাতক! হা কপাল! আমার মরণ হয়না কেন...”
ইতোমধ্যে কয়েকজন প্রতিবেশী এসে জটলা বাঁধিয়েছে৷ ডাইনীটার বিলাপ যখন উচ্চ স্কেলে বাজতে লাগল প্রতিবেশীরা তখন রাশেদকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে তার ঘর পাঠিয়ে দিল, আর ডাইনীটাকে বলল, “তুমি আর ওর মুখই দর্শন করোনা৷”
**********
বিকেলে বাবা বাসায় ফিরলেন গোমড়া মুখে৷ তিনি বড় ছেলেমেয়ের সামনে হাসেন না৷ কারণ তার আশংকা, ওদের সামনে হাসলে ওরা লাই পেয়ে মাথায় উঠবে৷ অবশ্য আগে তিনি এমন ছিলেন না৷ ডাইনীটা এবাড়িতে এসে যেদিন বাবাকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে, সতীনের ছেলেমেয়ে দুটো বখে গেছে; তিনি কঠোর না হলে তারা সোজা হবেনা, সেদিন থেকেই তিনি এমন হয়ে গেছেন৷
ডাইনীটা এগিয়ে গিয়ে স্বামীর হাত ধরে ঘরে নিয়ে আসে৷ গায়ের শার্টটা নিজ হাতে খুলে দেয়৷ তারপর মুখটা কালো করে দুপুরের ঘটনা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে শোনায় স্বামীকে৷ ধরা গলায় বলে, “দেখেছ! তোমার ছেলেমেয়ে কেমন বিগড়ে গেছে।”
বাবার মাথায় রক্ত চড়ে যায়৷ তিনি হুংকার ছেড়ে মেয়েকে ডাকেন৷ মেয়েটা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বাবার সামনে এসে দাঁড়ায়৷ বাবা উঁচু আসনে সমাসীন হয়ে বিচারকের দায়িত্ব পালন করতে বসেছেন৷ প্রথমে মেয়েকে তিরষ্কার করলেন, তারপর মেয়েকে বোঝালেন, “চুরি”(!) করা কত জঘন্যতম অপরাধ৷ মেয়ের বিচার শেষ হলে রাশেদের অপেক্ষায় রইলেন৷ রাশেদ এসে বাবাকে তার বোনের ব্যাপারটা বোঝাতে গিয়ে নিজের ওপর বিপদ ডেকে আনল৷ বাবা তখন রেগে অগ্নিশর্মা৷ চেঁচিয়ে বলতে লাগলেন,
“বেয়াদব! নির্লজ্জ! বখাটে! মায়ের গায়ে হাত তুলতে চাস! পনেরো বছর না পেরোতেই মরদ হয়ে গেছিস৷ আজ তোর হাতই ভেঙে দিব...।
-বাবা আসলে আম্মা যেরকম বলছেন ব্যপারটা সেরকম নয়...
-আবার বেয়াদবি! তোর কি একটুও লজ্জা নেই! তোর মাকে মিথ্যেবাদী বলিস৷
-আমি তাকে মিথ্যেবাদী বলছি না, বলছি, তিনি যা বলছেন তা ঠিক নয়৷
বাবা আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না৷ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে অমানুষিকভাবে মারতে থাকেন রাশেদকে৷ মেরেও যখন তার রাগ মিটেনা তখন রাশেদের কালো নোটখাতাটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে বাইরে ফেলে দেন৷ তারপর ঘোষণা করেন, “আজ রাতে তোদের খাবার নেই৷ এটাই তোদের উপযুক্ত শাস্তি।”
************
স্বামী-স্ত্রী আর তাদের ছোট মেয়ে রাতের খাবার খেয়ে নিয়েছে৷ রাশেদ হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে আছে তার শতছিন্ন নোটখাতার দিকে৷ নাওয়া খাওয়া ভুলে রাতদিন চেষ্টা করে পরীক্ষার জন্য নোটগুলো তৈরি করেছিল সে৷ তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নোটগুলোর ওপর৷ খাতার টুকরোগুলো জোড়া দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে রাশেদ৷ সে নিশ্চিত হয়, এই ফাইনাল পরীক্ষায় ফেল করা তার জন্য অনিবার্য৷ রাশেদ আর কিছু ভাবতে পারেনা৷ তার পায়ের তলায় মাটি যেন দুলছে৷ ধপ করে বসে পড়ে সে৷ তার সামনে বিগত রঙিন দিনগুলো সিনেমার মত দৃশ্যমান হয়ে ভাসতে থাকে৷ তার সামনে ভেসে ওঠে সেই স্নেহময়ী মুখ; তার মায়ের মুখ৷ যার হাসি পৃথিবীর সকল ব্যথা ভুলিয়ে দেয়, যার বুক বিপদে হয় নিরাপদ আশ্রয়৷ রাশেদ দেখে এক আনন্দমুখর বাড়ি৷ মায়া-ভালবাসার প্রাচুর্য উপচে পড়ছে সে বাড়িতে৷ আর আছে বাবা; একজন প্রকৃত বাবা৷ যার আদর-স্নেহে সিক্ত ছোট রাশেদ আর তার ছোট্ট বোনটি৷
স্মৃতির ফিল্ম ঘুরে চলেছে৷ রাশেদ দেখতে পায় তার অসুস্থ মায়ের ছবি৷ বাবা মনে করছেন, এ কোন সাধারণ রোগ; দুদিন বাদেই সেরে যাবে৷ তারপর রাশেদ দেখতে পায় বাড়িতে অনেক আত্নীয়-স্বজন৷ সবাই কেমন যেন বিমর্ষ৷ রাশেদকে এড়িয়ে চলছে সবাই, যেন কিছু লুকোচ্ছে তার থেকে৷ কিন্তু রাশেদ ঠিকই বুঝতে পারে, তার মা আর নেই৷ মৃত্যু তাকে নিয়ে গেছে না ফেরার দেশে৷ “মৃত্যু!” রাশেদ শব্দটা এর আগেও শুনেছে, বইয়েও পড়েছে কয়েকবার৷ কিন্তু মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখেনি৷ সময়ের আবর্তন তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে মৃত্যু কী৷ পরদিন সকালে যখন রাশেদের ছোট্ট বোনটির কান্না কেউ থামাতে পারছিল না তখন রাশেদ তার মাকে খুঁজতে বের হল৷ ড্রয়িংরুমে গিয়ে সে দেখল, বাবা নীরবে অশ্রুপাত করছেন৷ তার মনে পড়ল মা আর নেই৷ ছোট রাশেদ তখন বুঝতে পারল মৃত্যু কী৷ রাশেদের মা মারা যাওয়ার পর থেকে যখন আর কেউ স্কুল ব্যাগ গুছিয়ে দেয়নি, স্কুলের ড্রেসটা পরিয়ে দেয়নি, কেউ বলেনি, “আব্বু! কারো সাথে ঝগড়া করবে না, রাস্তায় খেলবেনা,” কিংবা গেইটে দাঁড়িয়ে চুমু খেয়ে কেউ বিদায় দেয়নি তখন রাশেদ উপলব্ধি করেছে মৃত্যু কী৷
স্মৃতির ফিল্ম ঘুরেই চলেছে। রাশেদ দেখতে পায়, বাবা তাদের দুই ভাইবোনের মায়ের অভাব দুর করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। কিন্তু এই বাবাই এক অশুভ দিনে হঠাৎ পাল্টে গেলেন। সেই দিনটি দেখতে পায় রাশেদ, তার বাবা বলছেন,
“রাশেদ! আজ তোমার নতুন মা আসবে।”
“নতুন মা! নতুন মায়ের কথাতো কোনদিন শুনিনি”
সেদিনকার ছোট্ট রাশেদ কৌতুহলী হয়ে নতুন মায়ের আগমনের অপেক্ষায় রইল৷ অবশেষে নতুন মা এলো৷ নতুন মায়ের মুখটা বেশ মিষ্টি, গালে যেন আবির মাখা৷ ঠোঁট দুটো টকটকে লাল, ঠিক মানুষের ঠোঁটের মত নয়৷ গায়ের শাড়িটাও সুন্দর৷ কিন্তু তবুও রাশেদের নতুন মাকে ভালো লাগেনি৷
এমনকি কয়েকদিন সে নতুন মায়ের কাছেই যায়নি৷ শুরুর দিকে নতুন মা ভালোই ছিল৷ যেদিন তারও একটি মেয়ে হল সেদিন থেকেই নতুন মা সুন্দরী ডাইনীতে রুপান্তরিত হল৷
মধুর স্মৃতিগুলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে৷ মধুর স্মৃতি, আশার আলো সবকিছু ছাপিয়ে শুধু সুন্দরী ডাইনীটার কুৎসিত চেহারাই চোখে পড়ছে।
*****************
ডাইনীটার খিলখিল হাসির শব্দে বাস্তবে ফিরে রাশেদ৷ বাবার হাসিও শুনতে পায় সে৷ তাদের হাসি রাশেদের মনে শেলের মত বিঁধতে থাকে৷
রাত গভীর হচ্ছে৷ রাতের নীরবতা বিঘ্নিত হচ্ছে একঘেয়ে কান্নার শব্দে৷ রাশেদের ক্ষুধা অনুভূত হল৷ মনে পড়ল, বোনটিও না খেয়ে আছে৷ হয়ত সে দুপুরেও খায়নি৷ ডাইনীটা সারাদিন তাকে কাজ করায়৷ খাবারের সময় হলে এক টুকরো রুটি দিয়ে রান্নাঘর তালা মেরে রাখে৷ অথচ নিজের মেয়েকে লুকিয়ে লুকিয়ে খাওয়ায়৷ বাবা বাড়িতে এলে ভালো মানুষ সেজে বলে,
“দ্যাখো মেয়ের কী অবস্থা! একেবারেই খেতে চায়না৷ শরীরের কী ছিরি দেখেছ! ওকে ডাক্তার দেখানো উচিত৷ আর ডাক্তার দেখিয়েই বা কী হবে? আমার কোন কথাই শোনেনা৷ আমি খেতে ডাকলে আমায় পাত্তাই দেয়না৷ এই অবাধ্যতাই ওর কাল হবে৷
বাবা তখন ধমক দিয়ে বলেন, “এই বেয়াদব! মায়ের কথা শুনিসনা কেন? খা! তাড়াতাড়ি খা! মেরে একেবারে মাথা ফাটিয়ে দিব।” বাবার ধমক শুনে যখন সে খেতে বসে ডাইনীটা তখন বাবার পেছন থেকে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে থাকে৷ হতভাগী ভয়ে আর খেতে পারেনা৷
ডাইনীটা তখন বলে, “তোমাকে বলিনি, ও কথা শোনেনা৷ ওকে শিক্ষা দেয়া দরকার৷”
বাবা বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ে৷ তারপর চড়-থাপ্পড়, কানমলা দিয়ে কিংবা ঘর থেকে বের করে দিয়ে তাকে শিক্ষা দেয়৷ প্রায়ই হতভাগীর রাতের খাবার এভাবেই শেষ হয়৷
রাশেদ বোনের কাছে গিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে- “কাঁদিস না বোন”
“ক্ষুধা পেয়েছে ভাইয়া”
“ক্ষুধা পেয়েছে? দাঁড়া দেখছি।”
সৌভাগ্যবশত রান্নাঘর খোলা পায় রাশেদ৷ টেবিলে তখনও রাতের খাবারের উচ্ছিষ্ট রয়ে গেছে৷ রাশেদ তাই এনে বোনকে খেতে দেয়৷ সেই উচ্ছিষ্ট খাবারটুকু পেয়ে বোনটা কী খুশী৷ যেন তার কোন কষ্টই নেই৷ এই খাবারটুকু পেয়ে বোনকে এমন খুশী হতে দেখে রাশেদের মনটা হাহাকার করে ওঠে৷ আবার স্মৃতির ঘোর তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে৷ অতীত-বর্তমান সব ঝাপসা হয়ে যায় রাশেদের কাছে৷ রাশেদ শুনতে পায়, দূর থেকে একটি কণ্ঠ ডাকছে রাশেদকে৷ অবহেলিত বোনটিকে তার মনে হয় এক ফুটফুটে শিশু, যার রয়েছে স্নেহময়ী মা৷
রাশেদ সব ভুলে গেল৷ ভুলে গেল তার শতচ্ছিন্ন খাতার কথা, অনিশ্চিত ভবিষৎ ও তিক্ত জীবনের কথা৷ তার কানে ভেসে আসছে এক মধুর কণ্ঠের ডাক, তার মায়ের ডাক।
“ছোট! ওঠ! শুনছিস না মা ডাকছে? চল, মায়ের কাছে যাই।”
ছোট্ট মেয়েটা ভয়ে কেঁপে ওঠে৷ সে তো শুধু ডাইনীটাকেই মা বলে জানে৷
“চল! তোকে ভাল মায়ের কাছে নিয়ে যাব, তোর আপন মায়ের কাছে৷ মা অনেক সুন্দর জায়গায় থাকে, জান্নাতে৷ শুনছিসনা তোকে ডাকছে।”
রাশেদ তার বোনকে কোলে তুলে নেয়৷ সম্মোহিতের মত বেরিয়ে পড়ে বাড়ি থেকে৷ একটা মিষ্টি কণ্ঠ গুঞ্জরিত হচ্ছে তার কানে৷
**************
পরদিন সকালে পত্রিকার একটা সংবাদ শহরবাসীর মাঝে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে৷ পত্রিকায় এসেছে;
#কবরস্থানে এক মেয়েশিশু ও এক কিশোর উদ্ধার#
গতরাতে নাইটগার্ড কবরস্থানে ছয় বছর বয়সী এক মুমূর্ষু মেয়ে ও চৌদ্দ বছর বয়সী জ্বরে আক্রান্ত এক কিশোরকে উদ্ধার করে সিটি হসপিটালে ভর্তি করে৷
ডাক্তার বলছেন, উদ্ধারকৃত মেয়েটি দীর্ঘদিন ক্ষুধা, ঠান্ডা এবং অতিরিক্ত ভয় পাওয়ায় এ অবস্থা হয়েছে৷ তার অবস্থা আশঙ্কাজনক৷ শুধুমাত্র ভাগ্যের জোরেই সে বেঁচে যেতে পারে৷ এদিকে উদ্ধারকৃত কিশোরটি জ্বরের তীব্রতায় শুধু প্রলাপ বকছে৷ দায়িত্বে থাকা নার্স আমাদেরকে জানিয়েছে যে, ছেলেটি জ্বরের ঘোরে পরীক্ষা, কালো খাতা এবং এক ডাইনী মহিলার কথা বলছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now