বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
(লেখাঃ- আহমেদ ওসমান)
১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৩১।
জাবালে আখজার।
শত বাধা-বিপত্তির মাঝেও মুজাহিদরা লিবিয়ার এই শহরটি ইতালীয়দের হাত থেকে মুক্ত রেখেছিল। এখানে ছিলো মুজাহিদদের শাসনব্যবস্থা। শরিয়াহ কোর্ট, সমঝোতা কোর্ট ও অর্থবিভাগ এই সব মিলিয়ে ছিলো জাবালে আখজারের প্রশাসনিক ব্যবস্থা। এখান থেকেই আগ্রাসী ইতালীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে লিবিয়ার সানুসি মুজাহিদগণ যুদ্ধ পরিচালনা করতেন। মুজাহিদদের উপর বিপদের পাহাড় ভেঙ্গে পড়লেও তারা জাবালে আখজারের অবস্থানস্থল থেকে চুল পরিমাণ নড়তেন না। সানুসি মুজাহিদ বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন সত্তরোর্ধ একজন বৃদ্ধ। যুদ্ধ করতে করতে হাতে পায়ের হাড়গোড় ভেঙ্গে গিয়েছে। তবুও এই বার্ধক্য তাকে কওমের কল্যাণে জিহাদ থেকে নিবৃত করতে পারেনি।
তিনি প্রতিবছর নিজ অবস্থানস্থল থেকে বের হয়ে আশেপাশের সেনা ছাউনি পরিদর্শন করতেন। মুজাহিদদের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে যুদ্ধের পরিকল্পনা গ্রহণ করতেন। রীতিমতো এবারও শতাধিক সেনা নিয়ে জাবালে আখজার থেকে মুজাহিদদের অন্যান্য সেনা ছাউনির উদ্দেশ্যে পথ ধরেন। কি মনে করে তিনি ফিরে আসেন এবং ৪০ জন সেনাকে রেখে ৬০ জনকে নিয়ে আবার রওনা হন।
জাবালে আখজারে মুজাহিদদের যাতায়াত পথে একটি উপত্যকা পড়ে। খুবই দুর্গম। উপত্যকা জুড়ে রয়েছে ঘন ঝোপঝাড়ের জঙ্গল। বিকল্পহীন একমাত্র পথ হওয়ায় এই পথই বেছে নিতে হয়। সেখানে একরাত অবস্থান করেন। ইতালীয়দের গুপ্তচর তখন চতুর্দিকে ওৎপেতে ছিলো। এরই মধ্যে তারা মুজাহিদদের অবস্থান টের পেয়ে যায়। তৎক্ষনাত তারা উপত্যকাটি ঘিরে ফেলে। মুজাহিদরা কোনকিছু বুঝার পূর্বেই অবরূদ্ধ হয়ে যান। এই বিপদ সংকুল সময়ে সেই সাহসী বৃদ্ধ সেনাপতি জীবন কিংবা শাহাদাতের পথ বেছে নেন। তিনি সাথীদের নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। যখন তারা বের হয়ে ঘোড়া নিয়ে ছুটে যাচ্ছিলেন তখন ইতালীয় বাহিনী একযোগে গুলি নিক্ষেপ করা শুরু করে। ইতিমধ্যে তার বহু সৈন্য শাহাদাতের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে জান্নাতে পাড়ি জমায়।
তিনি ঘোড়া নিয়ে যেদিকেই ছুটে যাচ্ছিলেন সেদিকেই ইতালীয় বাহিনী অবরোধ করে রেখেছিল। তাদের ছোড়া গুলিতে তার ঘোড়া আহত হয়ে পড়ে যায় এবং তিনিও ঘোড়া থেকে নিচে পড়ে হাতে প্রচন্ড ব্যথা পান। আহত হাত দিয়ে তাদের প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। কিন্তু সক্ষম হননি। সাথে সাথেই তাকে বন্দি করতে ইতালীয় সৈন্যরা ছুটে আসে । তারা তাকে চিনত না। কিন্তু উপস্থিত এক গাদ্দার তার পরিচয় বলে দিলে তারা তাকে সনাক্ত করে। এই বৃদ্ধই হচ্ছে তাদের ত্রাশ মরু সিংহ উমর আল-মুখতার। ইতালীয়দের যমদূত। যে দীর্ঘ ২০ বছর ইতালীয়দের যুদ্ধের ময়দানে কঠিনভাবে নাকানি চুবানি খাওয়াচ্ছিলেন। হাজারবার বন্দি ও মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন। আজ সেই সিংহ তাদের খাচায় বন্দি।
এই সিংহের জন্ম হয় ১৮৬২ (মতান্তরে ১৮৫৮) সালে। পৃথিবীব্যাপি ঔপনিবেশিক শাসন তখন দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে। এক শক্তির স্থলে অন্যশক্তির প্রত্যাবর্তনে বিশ্ব ক্ষমতার আসন ঘুরপাক খাচ্ছিলো। এদিকে এককালে ইউরোপকে নাস্তানাবুদ করা ইস্তাম্বুলের সালতানাত ই উসমানিয়্যাহ যৌবণের সব জৌলুশ হারিয়ে বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছে। এমন সময়েই উসমানীয় খিলাফতের অধীনস্ত লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের একটি ছোট শহরে এক সম্ভ্রান্ত ও দ্বীনি পরিবারে উমর মুখতারের জন্ম হয়। পরিবারটি ছিলো উন্নত চরিত্র, অনুপম আদর্শ ও উত্তম গুণাবলির মূর্তপ্রতীক। ১৬ বছর বয়স হতেই উমর মুখতারের বাবা হজ করতে গিয়ে মারা গেলে, বাবার ইচ্ছানুযায়ী স্থানীয় সানুসি শায়খ শরিফ আল গারিয়ানি তাকে নিজের তত্ত্বাবধানে নিয়ে আসেন।
এরপর তাকে উত্তম মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার নিমিত্তে সানুসি খানকাহর কুরআনিয়া মাদ্রাসায় পড়তে দেওয়া হয়। এখান থেকেই কুরআনে হিফজ সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে উচ্চতর ইলম অর্জনের জন্য সানুসিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রীত স্থানীয় প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠান জাগবুবি মাদ্রাসায় ভর্তি হন। এই সময়ই ধীরে ধীরে তিনি এমন একটি জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে— রাতে মাত্র ৩ ঘণ্টা ঘুমাতেন। রাতের শেষ ভাগে উঠে প্রভুর সান্নিধ্যে সালাতে দাঁড়াতেন। ফজরের পূর্বের বাকি সময়টুকু কাটিয়ে দিতেন কুরআন তিলাওয়াতে। প্রতি সাতদিনে একবার সম্পূর্ণ কুরআন পড়ে শেষ করতেন। পরবর্তীতে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শত বাধা-বিপত্তির মাঝেও এই অভ্যাস তিনি ত্যাগ করেননি।
তিনি ছিলেন সানুসি আন্দোলনের এক অনুগত ও একনিষ্ঠ অনুসারী। তখন উত্তর আফ্রিকায় এই আন্দোলনের যথেষ্ট প্রভাব ছিলো। বিশেষ করে লিবিয়া, সুদান, মরক্কো প্রভৃতি দেশগুলোতে। এই আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয় ১৮৩৭ সালে মক্কায় শায়খ মুহাম্মাদ বিন আলি আস-সানুসির মাধ্যমে। সানুসি আন্দোলন মূলত সালাফি ও সূফির মাঝামাঝি একটি ধর্মীয় আন্দোলন ছিল। উমর মুখতার এদের হাতে গড়া এক মুজাহিদ ছিলেন।
বীরত্ব ও সাহসিকতার মতো অনুপম গুণে উমর মুখতারের যৌবন মৌবন ছিল সুশোভিত। একবার ১৮৯৪ সালে এক কাফেলার সাথে সুদান যাওয়ার পথে একটি ঘটনায় তার সাহসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়।
পথে মরুভূমির একটি সরু রাস্তায় সবসময় একটি হিংস্র সিংহ অপেক্ষা করে থাকে। পথ থেকে সিংহটিকে সরানোর জন্য প্রত্যেক কাফেলাই একটা করে উট দিয়ে থাকে। রীতিমতো এবারও এই সংকীর্ণ পথ রোধ করে সে সিংহটি। কাফেলার সবাই আতংকিত হয়ে ছুটোছুটি করতে থাকে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে সকলেই। সবাই মিলে পূর্বের মতো ঠিক করলো যে, সিংহটিকে একটি উট দেয়া হবে; যাতে উটটি নিয়ে সে তাদের পথ ছেড়ে চলে যায়। এই অবস্থায় তিনি সকলের চেয়ে ভিন্ন অবস্থান নেন। তিনি তার শট গানটি নিয়ে ঘোড়ার উপর চড়ে বসলেন এবং সিংহটির দিকে এগিয়ে গেলেন। সবার চোখ কপালে উঠে গেল, কিছুক্ষণ পর তিনি সিংহটির মাথা নিয়ে ফিরে এলেন! তার সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে লোকেরা তাকে উপাধি দেয় “সিয়েরানিকার সিংহ”।
তার চরিত্র গঠনে সাহস এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। তরুণ বয়সেই তিনি বেশ বিচক্ষণ ও পরিপক্ক হয়ে ওঠেন। ফলে সানুসি প্রধান শায়খ মুহাম্মাদ আল মাহদি তাকে উবাইদ নামক একটি গো্ত্রের নিকটে আল-কুসুর খানকা্র দায়িত্বে নিযুক্ত করেন। তিনি তার দাওয়াহ ও বুদ্ধিমত্তার ফলে গোত্রটিকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম হন। গোত্রের নানা সমস্যা সমাধানে তার ডাক পড়তো। লোকেরা তার কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতো এবং গ্রামের অভ্যন্তরীণ সমস্যাই হোক কিংবা ধর্মীয়, তার পরামর্শ সবাই সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিতো। তার শিষ্টাচার ছিল সুবিদিত। তার ভাষার প্রাঞ্জলতা সহজেই সবার মনোযোগ কেড়ে নিতো।
তার বয়স যখন চল্লিশের কোঠা অতিক্রম করছে, তখনই পৃথিবীজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর ঔপনিবেশিকতার রোগ মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। একের পর এক দেশ যখন ইউরোপিয়ানদের হাতে দখল হচ্ছিল। তখন আফ্রিকার চাদে ফরাসি বাহিনি তাদের যুলুমের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে। সানুসি আন্দোলন চাদে ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলে। কারণ তারা এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করতে চেয়েছিল। ফরাসিদের বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য যেকজন দক্ষ কমান্ডার নির্বাচন করা হয় উমর মুখতার ছিলেন এদের অন্যতম একজন।
সানুসি প্রধান শায়খ মুহাম্মাদ আল মাহদির নির্দেশে চাদে সানুসি আন্দোলনের মুজাহিদদের নিয়ে দখলদার ফরাসি বাহিনীর বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন। বিচক্ষণ নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতা দিয়ে তিনি বীরদর্পে ফরাসি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকেন। সানুসি শায়খ তার ব্যপারে মন্তব্য করেন, যদি আমাদের কাছে উমর মুখতারের মতো ১০ জন থাকতো তাহলে ফ্রেঞ্চদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট হতো।
দুবছর যুদ্ধ শেষে সানুসি প্রধান শায়খ তাকে আল-কুসুর খানকায় ফিরে যাবার নির্দেশ দেন। কিন্তু বেশিদিন অবস্থান করা হয়নি। সানুসি মুজাহিদ বাহিনী ও ব্রিটিশ বাহিনীর মধ্যে লিবিয়া-মিশরের সীমান্তবর্তী অঞ্চল আল-বারদি, মাসাইদ ও সালুমে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। তিনি ছুটে যান সেদিকে। ১৯০৮ সালের এই লড়াইয়ে তিনি জীবনবাজি রেখে লড়াই করেন। এসময় তার অবদানের স্বীকৃতি অনুযায়ী উসমানীয় খলিফার পক্ষ থেকে প্রশংসাপত্র অর্জন করেন। তার নাম ছড়িয়ে পড়ে চতুর্দিকে। যুদ্ধশেষে উসমানীয়দের উপর ব্রিটেনের চাপে সালুম অঞ্চল সংযুক্ত হয় মিশরের সাথে। তিনি আবার ফিরে আসেন আল-কুসুর খানকায়।
কিছুদিন পর ১৯১১ সালের দিকে ইউরোপিয়ানদের দৃষ্টিতে অনুন্নত জাতিগুলোকে নিজেদের উপনিবেশে পরিণত করার এই প্রতিযোগিতায় ইতালিও যোগ দেয়। উত্তর আফ্রিকায় তারা অভিযান শুরু করে। কিন্তু লিবিয়া দখলের যাত্রাপথেই পঞ্চাশ বছর বয়স্ক এই মানুষটি তাদের সামনে পাহাড়ের মত বাধা হয়ে দাঁড়ান। প্রথমে উসমানীয় সৈন্যরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেন। উসমানীয়দের সাথে যোগ দেয় সানুসি সৈন্যরা। তিনি খবর পেয়ে আল-আবিদ গোত্রের সক্ষম পুরুষদের জিহাদে উদ্বুদ্ধ করে তাদের নিয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন।
এক বছর ধরে চলমান এ যুদ্ধে ইতালিয়ানদের বিশাল বাহিনী তুলনামূলকভাবে অনেক কমসংখ্যক বেদুইন আরব এবং তুর্কি যোদ্ধাদের অল্পস্বল্প অস্ত্রশস্ত্রের কাছে বারবার নাস্তানাবুদ হতে থাকে। এক বছর পরেও সমুদ্র উপকূলের অল্প কিছু স্থান ছাড়া লিবিয়ার বিশাল এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হওয়ায় ইতালিয়ানরা অটোমান সাম্রাজ্যের সাথে চুক্তি করে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইতালিয়ানরা লিবিয়ার বাইরের কিছু এলাকা এবং দ্বীপের দখল ছেড়ে দেয়, বিনিময়ে অটোমান সৈন্যরা লিবিয়া ছেড়ে চলে যায়। অটোমানরা চলে যাওয়ার পর অধিকাংশ মুজাহিদরা জিহাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এমনকি সানুসি প্রধাণ শাইখ ইদ্রিস সানুসিও। প্রথমে যুদ্ধ করলেও কিছুদিন পর তিনিও বিভিন্ন সমঝোতা ও ব্রিটিশদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলেন। তিনি সমঝোতা করে বারকার কতৃত্ব নিজ হাতে নেন।
এসব চুক্তিতে পরবর্তীতে কোন লাভ হয়নি। ১৯২০ সালে ইতালীতে ক্ষমতায় আসে ফ্যাসিস্ট মুসোলিনি। সে এসেই সকল চুক্তি বাতিল করে দেয়। নতুন করে তারা অভিযান শুরু করে। লিবিয়ায় ইতালীয় সৈন্যের সংখ্যা দিগুণ বৃদ্ধি পায়। চতুর্দিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
১৯২৩ সাল।
ততদিনে সানুসি আন্দোলনের প্রধান শায়খ ও বুজুর্গগণ আশাহত হয়ে মিশর হিজরত করে চলে যান। মিশর থেকে সানুসি শায়খদের দ্বারা লিবিয়ায় থাকা মুজাহিদদের গোপন পথ দিয়ে খাদ্য ও অস্ত্র সরঞ্জাম পাঠানো হতো। তিনি মিশর সফরে যান। সাথে ছিলেন আলী পাশা উবায়দি। কিছুদিন থাকার পর লিবিয়ায় মুজাহিদদের ঘাটি বারকায় ফিরে আসার উদ্দেশ্যে মিশর থেকে রওয়ানা হন, তখন সানুসি আন্দোলনের শায়খ ও বুজুর্গ ব্যক্তিগণ তার সাথে সাক্ষাৎ করে। তারা তার দৃড় সংকল্পের প্রশংসা করে বলেন, "আপনি এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। এখন আপনার জন্য নিরবিচ্ছিন্ন বিশ্রাম প্রয়োজন। এটাই এখন খুব জরুরি। বারকায় জিহাদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমরা আপনি ছাড়া অন্য কাউকে দায়িত্ব দিতে পারি"।
একথা শুনে তিনি ক্রুদ্ধকন্ঠে জবাব দেন, যারাই আমাকে একথা বলছে ,তারা মোটেও আমার কল্যাণকামী নয়। তিনি দখলদার ইতালীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে যে জিহাদ চালিয়ে যাচ্ছেন, তা তিনি ফরজে আইন মনে করতেন। এজন্য জিহাদের প্রতিটি কাজ ও পদক্ষেপে তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ। তিনি প্রায়ই বলতেন, হে আল্লাহ এ পবিত্র ও মোবারক রাস্তায় আমার মরণ দাও। উমর মুখতার জিহাদের ভূমি লিবিয়া ছেড়ে কখনোই যেতে চাইতেন না। তাকে হিজরত করে মক্কায় হজ করার জন্য বলা হলে তিনি তা এ বলে প্রত্যাখ্যান করেন, "শাহাদাৎ আসার আগ পর্যন্ত আমি এ ভূমি ত্যাগ করবো না। ইমান ও আক্বিদা এবং মুসলিম ভূমি হেফাজতের জন্য জিহাদের সাওয়াবের চেয়ে হজের সাওয়াব বেশি হতে পারে না"। তিনি বলেন, প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জিহাদ ফরজ। জিহাদ ছাড়া মুক্তি আসতে পারে না। এজন্যই উমর মুখতার কখনো যুদ্ধ স্থগিত কিংবা হিজরত করে চলে যাবার চিন্তা ভুল করেও করতেন না।
মিশর থেকে মুজাহিদদের জন্য সরঞ্জাম নিয়ে ফিরে এসে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিতে থাকেন। একের পর এক যুদ্ধ সংগঠিত হয়। প্রথমেই টানা তিনটা যুদ্ধ হয়। প্রথম দুটি হয় ১৯২৩ সালে বিরে বিলাল ও বারকায়। বিরে বিলাল যুদ্ধে মুজাহিদরা কামান্ডার আব্দুল্লাহ সুদানির নেতৃত্বে জয়লাভ করেন। এই যুদ্ধের চারদিন পর সংগঠিত হয় বারকাহর যুদ্ধ। এই যুদ্ধেও মুজাহিদগণ জয়লাভ করেন। এই বিজয়গুলো সত্ত্বেও মুজাহিদদের সীমাবদ্ধতার কারণে ইতালিয়রা কয়েকটি গ্রাম দখল করে নেয়।
তৃতীয় যুদ্ধটি হয় বিরে আলগাবিতে। একদিন সকালে মুজাহিদদের নিয়ে উমর মুখতার আলোচনা করছিলেন ঠিক তখনই ইতালি বাহিনী সাতটি গাড়ি নিয়ে উপস্থীত হয়। মুজাহিদদের সংখ্যা ছিলো মাত্র পঞ্চাশ জন। ইতালিয়ান বাহিনী এসেই গাড়িসহ সুবিধামতো পজিশন নিয়ে মুজাহিদদের উপর আক্রমণ শুরু করে। উমর মুখতার, আলি পাশা উবায়দি ও তার সাথীরা তৎক্ষনাত বন্দুক নিয়ে গুলি শুরু করেন। দুদিক থেকেই আক্রমণ চলতে থাকে। কিছুক্ষণ পরেই তাদের কিছু সৈন্যের লাশ ফেলে পরাজয় বরণ করে পালিয়ে যায়।
তাকে কোনভাবেই দমাতে পারছে না ইতালীয়রা। সংঘর্ষ এড়াতে ইতালিয়ানরা তাকে উচ্চ পদ এবং সম্পদের লোভ দেখায়। বিনিময়ে তাকে আত্মসমর্পণ করে তাদের আনুগত্য মেনে নেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়। এর জবাবে তিনি তার বিখ্যাত উক্তিটি করেন, “আমি কোন মজাদার খাবার নই যে, কেউ চাইলেই আমাকে গিলে ফেলবে। তারা আমার আদর্শ-বিশ্বাসকে টলাতে যতই অপচেষ্টা করুক, আল্লাহ তাদের পরাজিত করেই ছাড়বেন।” তারা হাল ছেড়ে দিয়ে ফিরে যায়। দখলদার ইতালিয়ান বাহিনী এটা খুব ভালো করেই জানতো, উমর মুখতারকে কোনভাবে কোনঠাষা করতে পারলেই লিবিয়ার যুদ্ধে বিজয় তাদের জন্য শুধু সময়ের ব্যপার। কারণ তিনি ছিলেন লিবিয়ার জিহাদের হৃদপিণ্ড।
উমর মুখতার ইতালিয়ানদের দূর্বল জায়গাগুলো খুঁজে বের করে তাতে আঘাত হানতে শুরু করেন। যারা ভেবেছিল, মুসলিম দেশগুলো দখল করতে কোন বেগই পেতে হবে না, তারা এবার প্রচণ্ড ধাক্কা খেল। জালু মরুভূমি থেকে আসা আবু কারায়্যিম নামের আরেকজন সাহসী মানুষকেও তিনি এই লড়াইয়ে পাশে পেয়েছিলেন। তার বয়স হয়েছিল নব্বই বছর! কিন্তু ক্ষুধা আর বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে তার বাহিনীর অনেকের মৃত্যু ঘটে।
ইতালিয়ানরা একের পর এক গ্রাম লুট করে জ্বালিয়ে দিতে থাকে। নারী, শিশু আর বৃদ্ধদেরও তারা ছাড় দেয়নি। কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলোতে বন্দির সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকে। তারা গোত্রের মানুষের উপর হামলা করতে থাকে, যাতে তার মুজাহিদদের সাহায্য ও সহযোগিতা থেকে হাত গুটিয়ে নেয়।
১৯২৪ ও ২৫ সালে বেশ কটি খন্ড যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এসময় মুজাহিদরা জাবালে আখজারে তাদের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি করে তোলেন। বারকায় ইতালীয় বাহিনীর নেতৃত্বের পরিবর্তন আসে। ত্রিপলি থেকে জেনারেল গ্রাজিয়ানি আগমন করে। তারা মুজাহিদদের সাথে একের পর এক যুদ্ধে জড়িয়ে যায়। ১৯২৭ সালে সানুসি জিহাদি আন্দোলনের প্রধাণ পৃষ্টপোষক সায়্যিদ রেজা মাহদি আস সানুসি চক্রান্তের ফাঁদে পড়ে গ্রেফতার হয়ে যান। ফলে বারকা, আল হামরা, বারকা আল বাইদা এলাকাগুলো ধিরে ধিরে মুজাহিদদের হাতছাড়া হয়ে যায়।
১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইতালীয় বাহিনী এক বিশাল সৈন্যবহর নিয়ে জাবালে আখজারে দিকে আসে। গ্রাজিয়ানি ছিলো এর নেতৃত্বে। এই বাহিনীর সাথে মুজাহিদদের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংগঠিত হয়। যা ধারাবাহিক পাঁচদিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এতে ইতালীয় বাহিনী অত্যন্ত সোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে। রণক্ষেত্রে তারা অনেক অস্ত্র, গোলাবারুদ, গাড়ি ও রসদপত্র রেখে প্রাণ নিয়ে কোনরকম পালাতে সমর্থ হয়।
১৯৩০ সালের অক্টোবরে মুজাহিদদের সাথে ইতালীয়দের একটি বিরাট যুদ্ধ সংগঠিত হয়। যুদ্ধ শেষে ইতালীয়রা উমর মুখতারের চশমা খুঁজে পায়। এতে তাদের আত্নবিশ্বাস দৃড় হয়। জেনারেল গ্রাজিয়ানি বলে, আজ আমরা উমর মুখতারের চশমা পেতে সক্ষম হয়েছি, কাল তার মাথা আনতে সক্ষম হবো। ১৯৩১ সালে জুন মাসে কয়েকটি যুদ্ধ হয়, এতে মুজাহিদরা পরাজিত হয়। ফলস্বরূপ ইতালীয়রা কয়েকটি গ্রাম দখল করে নেয়। এর কয়েকমাস পরেই উমর মুখতার আল-জুরাইব উপত্যকার পাদদেশে বন্দি হয়ে যান। সাথে তার মুজাহিদ বাহিনী শহীদ হয়ে যায়। ফলস্বরূপ লিবিয়ার প্রতিরোধ আন্দোলন অনেকটা শিথিল হয়ে যায়।
-
বন্দি করার পর তাকে জাবালে আখজার থেকে সমুদ্রপথে বেনগাজি নিয়ে আসা হয়। বন্দি উমরকে সশস্ত্র সৈনিকদের কড়া প্রহরায় গোলাবারুদসমৃদ্ধ প্রিজনভ্যানে তাকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। কারাগারে তাকে অন্যসকল বন্দি থেলে আলদা করে বিশেষ একটি সেলে রাখা হয়। তার মধ্যে কোন হতাশা নেই, ভয় নেই, যেনো এর জন্যই তিনি অপেক্ষা করছিলেন।
সাহসিকতা এবং অকুতোভয় মানসিকতার কারণে শত্রুরাও তাকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতো। যে অফিসার জেনারেল গ্রাজিয়ানি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলো সে বলে, “তাকে যখন আমার অফিসে হাজির করা হয়, তাকে অন্য সব মরুযোদ্ধাদের মতোই ভেবেছিলাম। তার হাত ছিলো শিকলবদ্ধ। অবিরাম যুদ্ধ করতে করতে তার শরীরের অনেক হাড়গোড়ই ভেঙ্গে গিয়েছিল। একারণে তার হাঁটতেও খুব কষ্ট হচ্ছিলো। কিন্তু এত কিছুর পরও তাকে কোন সাধারণ সৈনিকের মত লাগছিলো না। তিনি সোজা হয়ে দাঁড়ালেন এবং ধীর শান্ত কণ্ঠে প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন। তার চেহারায় সূর্যের মত দ্যুতি আমার মনে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। কথোপকথনের শেষ ভাগে আমার ঠোঁট কাঁপতে শুরু করে। আমি তাড়াতাড়ি জেরা শেষ করে তাকে পরের দিন কোর্টে হাজির করার নির্দেশ দিই।”
তিনি ছিলেন একজন কিংবদন্তী। তার দেশের শাসকরা যখন ইতালিয়ানদের কাছে আত্মসমর্পণ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলো, তিনি তার ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। সানুসী আন্দোলনের অনেক আলিমরা একটা সময় পর্যন্ত যুদ্ধ করলেও এক সময় এসে তাদের কেউবা সামান্য সুযোগ সুবিধার বিনিময়ে আপোষ করে ফেলে। কেউ হিজরত করে মিশর পাড়ি জমায়। এমনকি বিপদের সময় তারা তার পাশে এসে দাঁড়ায়নি। বরং তারা ইতালিয়ানদের হাতে মুসলিম ভূমিকে ছেড়ে দিয়েছিল।
তাদের সম্পর্কে উমর মুখতার বলেন, "তাদেরকে আল্লাহ এমন অন্তর দান করেননি, যে অন্তর দিয়ে তারা মুসলিম জাতির আর্তচিতকার শুনতে পাবেন। আল্লাহ আমাকে সেই অন্তর দান করেছেন।" তিনি আল্লাহর কুরআন হাতে তুলে নেন এবং আল্লাহর কাছে ওয়াদা করেন যে, প্রয়োজন হলে তিনি একাই জালিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন, যতক্ষণ বিজয় কিংবা শাহাদাতের যে কোনো একটি লাভ না করেন। তার জীবনের শেষ বিশ বছরে তিনি এক হাজারেরও বেশি যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
ইতালিয়ান জেনারেলরা তাকে শেষ বারের মত নতি স্বীকার করার প্রস্তাব দেয়, কিন্তু তার জবাব ছিল, “যতক্ষণ না পর্যন্ত তোমরা এই দেশ ত্যাগ করবে অথবা আমি আমার দেহ ত্যাগ করবো, ততক্ষণ আমি লড়াই চালিয়ে যাবো। মানুষের অন্তরের গোপন কথাও যার অগোচরে নয় তার শপথ, যদি এই মূহুর্তে আমার দুই হাত বাঁধা না থাকতো আমি খালি হাতেই তোমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তাম... ...।” কথা শেষ হওয়ার আগেই জেনারেলরা সাজানো ট্রাইব্যুনালে তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে।
এমনকি বিচার শুরু হওয়ার আগে থেকেই কোর্টের বাইরে ফাঁসির দড়ি প্রস্তুত রাখা হয়েছিল! ১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর জনসম্মুখে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। আল্লাহ যেন জান্নাতে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। তার রেখে যাওয়া আদর্শ কিয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকবে। তিনি নিজের রক্ত দিয়ে বিজয়ের গল্প লিখে গিয়েছেন, তিনি কিংবদন্তীদের কিংবদন্তী এবং যারা অবমাননাকর সময়ে মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চায় তাদের জন্য একজন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।
তথ্যসূত্র: উমর মুখতার, আলী সাল্লাবি।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now