বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

লেখক হয়ে ওঠার গল্প

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মাজহারুল মোর্শেদ (০ পয়েন্ট)

X লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ গল্পের নাম- লেখক হয়ে ওঠার গল্প পড়ন্ত বিকেল বেলা প্রকৃতিতে বসন্তের হাওয়া। শেষ বিকেলে গাছের পাতায় পাতায় সোনালি রোদের ঝিলিক। সমস্ত বাগানজুড়ে মধুমালতি, হাসনাহেনা আর থোকায় থোকায় ফুটে আছে জুঁই-চামেলী। সদ্য ফোটা কয়েকটি টকটকে লাল গোলাপের সুবাসে ভরে গেছে গোটা বাগান। প্রতিদিন ফুলের গাছে পানি দেওয়ার কাজটা বরাবরই আমার ভাগে। তাই প্রতিটি গাছের গোড়ায় একটু একটু করে পানি ঢালি আর এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখছি খেলার সাথিরা কখন আসে। হঠাৎ চোখে পড়ে হাসনাহেনার ঝোপের আড়ালে একটি পাখির বাসা। একেতো ছেলে বেলার অনুসন্ধিৎসুক মন তার ওপর পাখির বাসা বলতে কথা। পানির পাত্রটা ফেলে দিয়ে একদৌড় দিয়ে যেয়ে তার সঙ্গী-সাথিদের ডেকে নিয়ে আসলাম। বাসার কাছে অতি উৎসুক বালকদের একটু বেশি সোরগোল পড়ে যাওয়ায় মা পাখিটা ফুড়–ত করে উড়ে যায়। এর ফাঁকে একটা টুলের উপর উঠে উঁকি মেরে দেখে পাখির বাসাটিতে দু’টো ডিম আছে। মা পাখিটা একটু দূরে গাছের ডালে বসে আমরা কি করছে সেটা বেশ উদ্দিগ্ন হয়েই দেখছে আর মাঝে মাঝে তার প্রতিবাদি ভাষায় ট্যা-ট্যা করে চিৎকার দিয়ে উঠছে। সে ডিম থেকে ছানা বেরোবার অপেক্ষায় থেকে আমরাও সরে পড়লাম বাসার কাছ থেকে। বাসার খুব বেশি দূরে নয়, মাত্র কয়েক হাত ব্যবধানে আড়াল হতে না হতেই মা পাখিটা সকল ভয়কে তুচ্ছ করে তার বাসায় এসে ডিমের উপর বসে তা দেয়া শুরু করলো। এদিকে বেলা পড়ে যাওয়ায় খেলার সময়ও দ্রæত চলে যাচ্ছে। তাই সবাই মিলে তাড়াহুড়ো করে গাছে পানি দিতে শুরু করলো। হঠাৎ পিছন থেকে আমার নাম ধরে ডাকার শব্দ কানে আসলো। আমি পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি সতীষ কাকা, বাগানের গোলাপের দিকে তাকিয়ে আছে। আদাব দেয়ার আগেই তিনি বললেন- মুন্সিরবেটা (আমার বাবা মসজিদে ঈমাম ছিলেন) খুব বাজে একটা ঝামেলার মধ্যে পড়ে আছি। হঠাৎ তোর কথা মনে হলো বাবা, তাই চলে এলাম। কিশের ঝামেলা কাকা? আমি তো ছোট্ট একটা ছেলে আমাকে বলে কি হবে? বাবা ধ্রæব? তোকে বিজয়ের (তার ভাতিজা) সাথে দেখে আমি বুঝতে পেরেছি যে, তোর দ্বারাই হবে। কি সেটা কাকা? তুই কি দোতরা বাজাতে পারিস? হ্যাঁ কাকা, একটু আধটু বাজাতে পারি। আমার দোতরা বাজানোর খুব শখ। তাই বিজয় দার কাছে শিখছি। বেশ ভালো বাবা, তাড়াতাড়ি শিখে ফেল। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি মানুষের মনকে প্রফুল্ল রাখে, সবসময় জীবিত রাখে। জীবনকে সহজ করতে সাহায্য করে। একজন সংস্কৃতমনা মানুষ কখনো অন্যকে কষ্ট দিতে পারে না, যদি সে শিল্প-সংস্কৃতিকে বুকে ধারণ করে, বুকে লালন করে। যাক বাবা ধ্রæব, আসল কথা হলো- আগামী সপ্তাহে দেবীর ডাঙ্গায় যাত্রা গানের বিরাট আয়োজন হচ্ছে। পশ্চিমরঙ্গের কুচবিহার থেকে নামকরা “লোকনাট্য অপেরা” যাত্রা পালার শিল্পিরা আসবে। এখানে তারা দশ-পনেরো দিন থাকবে, এমনকি মাসখানেকও থাকতে পারে যদি দর্শকেরা চায়। তবে ওরা যে দিন আসবে সে রাতেইতো আর পালা করতে পারবে না, রিহারসেলের একটা ব্যাপার-স্যাপার তো আছেই। কাজেই সে রাতে আমাদেরকে একটা বই করতে হবে। আর সেটা হবে ‘রূপবানের পালা’। এখন কথা হলো রূপবানের পালাতে ‘রহিম বাদশা’র ছোটবেলার বালক চরিত্রে বিজয় অভিনয় করতো, কিন্ত সে তার মায়ের সাথে ভারতের মাথাভাঙ্গা গেছে বেড়াতে কবে ফিরবে ঠিক ঠিকানা নাই। বাবা, এ চরিত্রটা যে তোকে করতে হবে। কাকা, আমি হইলাম মুন্সির ছেলে। আব্বা শুনলে আমাকে মেরে ফেলবে। আরে বাবা, দাদার ব্যাপারটা তুই আমার উপর ছেড়েদে। দাদাকে কিভাবে বুঝা লাগে আমি সেটা বুঝাবো। আমার মনে হয় ঠাকুরদা আমার কথা ফেলবে না। (আমার বাবাকে তারা ঠাকুরদা বলে ডাকতো) না কাকা, আপনি আগে আব্বার সাথে কথা বলেন, আমার মনে হয়না যে, আব্বা রাজি হবে। যাক, আব্বাকে যতীষ কাকা কিভাবে রাজি করিয়েছেন জানি না। পরের দিন বিকেলে সতীষ কাকা আমাকে নিয়ে গেলো রিহার্সেলে। গোট পালা জুড়ে আমার মাত্র কয়েকটা ডায়ালক। হাতে লেখা স্ক্রিপটি এনে আমি প্রথমেবানান করে উচ্চারণ করতে চেষ্টা করলাম। দু’চারটা শব্দ কঠিন মনে হওয়ায় সেগুলো কাকার কাছে উচ্চারণ করিয়ে নিলাম তারপর পুরো ডায়ালকগুলো গড় গড় করে মুখস্ত করে ফেললাম। দু’দিন পরেই আমি মঞ্চে উঠে গেলাম। হাজার হাজার মানুষের সামনে অভিনয় করা, শুরুতে ভয়ে আমার হাত-পা কাঁপছিলো কিন্তু বইমাস্টার খুব রশিক মানুষ ছিলেন। আমার ডায়ালকগুলো উনি এতোটাই জোরে শব্দ করে পড়ছিলেন যে, আমি প্রচণ্ড ভয়ে ভুলে যাওয়া ডায়ালক গুলোও তার কাছে শুনে বলতে পাচ্ছি। এরপর আমার বেশ সাহস হয়ে গেলো। এখন আমার হাত-পা কাঁপছে না, আমি নিজেই যেন বালক রহিম বাদশা হয়ে গেলাম। বনের ভেতর কেবলি রূপবান আর আমি। ভালো মন্দ যাই হোক মঞ্চে উঠে মুখস্ত করা কয়েকটা ডায়ালক বলা তেমন কঠিন কাজ নয়। যা হোক কয়েক দিনের মাথায় আমি শিশু শিল্পী হিসেবে অভিনয় করে বেশ নাম-ডাক পেয়ে গেলাম। ঠিক দু’দিন পর অন্য একটি সামাজিক পালায় আমাকে আবার শিশু চরিত্রে অভিনয় করতে হলো। যতোদূর মনে পড়ে পালাটির নাম ছিলো “ গুণাই বিবি”। প্রচণ্ড শীতের রাত, তারউপরে খোলা মাঠ। শীত একেবারে জেকে বসেছে। আমি ঠাণ্ডায় রীতিমত কাঁপতে ছিলাম। পালায় প্রথম ভাগের পাঠ হয়ে গেলে, দ্বিতীয় ভাগে আমাকে মঞ্চে ওঠা লাগে মধ্যরাতে। আমি এ সুযেগে গ্রিন রুমের পাশে যেয়ে পোঁয়াল খড়ের পালায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মধ্যরাতে আমার আবার পাঠ শুরু হবে তার খানিক আগে আমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সতীষ কাকারতো মাথা খারাপ, এখন কি হবে? ওদের ধারণা আমি পালিয়ে গেছি। সেটা অস্বাভাবিকও নয় কারণ আমিতো অনেক ছোট মানুষ, এসবের কিছুই বুঝি না। চারিদিকে তুমুল খোঁজা খুঁজি শুরু হলো নীরবে, নিভৃতে এমনকি অনেকে চুপি চুপি দর্শক সারিতে যেয়েও আমাকে খুঁজতে লাগলো। তবে উষা দিদি, আমার বারো বছরের বড় বোউ রূপবান (পালার চরিত্রে, অবশ্য এই পালায় তার অন্য চরিত্র) উনি দেখেছিলেন যে আমি গ্রিন রুমের পিছনের দিকটায় গিয়েছি। উনি হয়তো ভেবেছিলেন যে, আমি প্রস্রাব করার জন্য যাচ্ছি। কিন্ত না আমি তো গিয়েছিলাম ঘুমোতে। যা হোক উষা দিদি (রূপবান) সতীষ কাকাকে নিয়ে গ্রিন রুমের পিছনের দিকটায় যায়। তারা সেখানে যেয়ে দেখে যে, আমি পোঁয়াল খড়ের ভেতরে ঘুমিয়ে পড়েছি। আমি জানি না, আমাকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে সতীষ কাকার ক্রোধের পরিমানটা ঠিক কোথায় যেয়ে পৌছে। ঘুম থেকে জেগে দেখি প্রচণ্ড শীতের মাঝেও কাকা শুধু ঘামছে আর ডান হাতের আঙ্গুল দিয়ে তার কপালের ঘাম মুছে ফেলছে। উষা দিদি আমার হাতটা ধরে টেনে তুলছে আর হাসতে হাসতে মনে হয় মাটিতে গড়িয়ে পড়ছে। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাকে মঞ্চে উঠতে হলো। ভালো করে মুখটাও ধোয়ার সময় পেলাম না। পরপর দু’দিন অন্য পালা (যাত্রা পালা) থাকায় আমাকে যেতে হলো না। তৃতীয় দিনে আমি সেখানে উপস্থিত হলে সবাই আমাকে কোলে নিয়ে একরকম তামাসা শুরু করে দিয়েছিল, কেউ কেউ হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছিল। কুচবিহারের সেই নামকরা লোকনাট্য অপেরার প্রধান চনিত্র ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায় এবং অদীতি রায়ের অভিয় দেখে গ্রাম থেকে সবাই ছুটে আসত যাত্রা পালা দেখার জন্য। চায়ের দোকান থেকে অন্দরমহল পর্যন্ত সর্বত্রই চলত তার আলোচনা। কখনও কখনও ভিড়ের চোটে যাত্রার প্যান্ডেলও খুলে দিতে হয়েছে। মূলত মহিলারাই যাত্রার প্রধান দর্শক ছিলেন যৌথ পরিবারের বয়স্ক পিসিমা, জ্যেঠিমা, কাকিমাদের হাত ধরে কচিকাঁচারাও ভিড় জমাত যাত্রা মঞ্চে, তাঁদের পাহারা দিয়ে নিয়ে যেতেন একাধিক পুরুষ। এঁরাই ছিলেন যাত্রার দর্শক মোদ্দা কথা হলো- এ যাত্রা পালায় অভিনয় থেকেই আমার এ লেখা-লেখির জগতে পা দেয়া। কারণ আমার মুখস্ত করা ডায়ালকগুলোতে আমি সাহিত্যের ছোঁয়া খুঁজে পেয়েছি। ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের প্রতিটি ডায়ালক যেন মানুষ্য জীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্নার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। আর যারা এ বাস্তব চরিত্রগুলো বুকে লালন করে অভিনয়ের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে তারা সত্যি ঐ চরিত্রের সাথে মিশে যায়। অভিনয় শিল্পীদের মাঝে আমি দেখেছি তাদের সরলতা, মানবীয় গুণাবলীর প্রচুর্যতা। সত্যিকারের মানুষ হিসেবে মানুষের প্রতি তাদের ভালোবাসা। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা আমার ছোট্ট মনকে অনেক দূরে পৌছে দেয়। আমিও সেই মুখস্ত করা ডায়ালকগুলো থেকে লেখার উপাদান খুঁজে পাই।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৮৬ জন


এ জাতীয় গল্প

→ লেখক হয়ে ওঠার গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now