বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

কুড়িয়ে পাওয়া ভালোবাসা

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান জাহিদুল ইসলাম (০ পয়েন্ট)

X শহরের প্রাণকেন্দ্রে যে ব্রিজটা দাঁড়িয়ে আছে। ওই ব্রিজের উপর দিয়ে আমি প্রতিদিন কলেজে যাওয়া আসা করি। ব্রিজটা বহু মানুষের জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন। ব্রিজের দুইপ্রান্তে বিভিন্ন হকার বসে থাকে। কেউ চিরুনি,নেইল কাটার, তালা,মানিব্যাগ বিক্রি করে। কেউ কাঁচামাল বিক্রি করে, কেউ শুটকি মাছ বিক্রি করে, আবার কেউ কম দামে বিভিন্ন ফলমূল বিক্রি করে। বিভিন্ন ধরনের হকার ছাড়াও একদল ভিক্ষুক ব্রিজের অর্ধেক জায়গা দখল করে থাকে। ভিক্ষুকদের মধ্যেও আবার শ্রেণী বিভাগ আছে। কেউ ভিক্ষা করে পেটের তাগিদে, কেউ ভিক্ষা করে অভ্যাসবশত। আবার কেউ ভিক্ষা করে দায় ঠেকে। পতিতালয়ের পতিতারা যেমন দেহ বিক্রি করে দায় ঠেকে দেহ বিক্রি করার অর্ধেক টাকা নেয়। তেমনি একদল শিশু শ্রেণীর ভিক্ষুক আছে ওরা কোন চক্রের ফাঁদে পরে দায় ঠেকে ভিক্ষা করে জীবন বাঁচায়। আমি সাধারণত ভিক্ষা দেই না যদি আমার মনে হয় মানুষটা আসলেই খুব অসহায় তখন যদি কিছু দেই। তাছাড়া আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান অনেক সময় ইচ্ছা থাকলেও উপায় হয় না। নুন আনতে যাদের পান্তা ফুরায় তারা আবার অন্যকে সাহায্য করবে কীভাবে? . সকালবেলা ব্রিজটা একটু ফাকা থাকে। লোকজনের সমাগম বেশী দেখা যায় না। কিছু কুলি মজুর চাকরিজীবী আর স্টুডেন্ট ছাড়া বেশী মানুষ সকালবেলা চলাচল করে না। সূর্য মাথার উপরে উঠার সাথে সাথে মানুষের সমাগম বেড়ে যায়। সকাল ৮টা থেকে ক্লাস শুরু হওয়ার কারণে প্রতিদিন সকাল ৭ঃ৪০ অথবা ৭ঃ৪৫য়ে আমি ব্রিজটা ক্রস করি। দুপুরে কলেজ ছুটি হলে আবার ২টার দিকে ব্রিজ পথে বাড়ি ফিরে আসি। সেদিনও কলেজ শেষ করে ব্রিজ হয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। ব্রিজের শেষ প্রান্তে এসে দেখলাম এক বৃদ্ধা মহিলা ব্রিজের উপর একটা ছেঁড়া ব্যাগ পেতে শুয়ে আছে। বৃদ্ধার গায়ে একটা ময়লাযুক্ত ছেঁড়া কাপড় চেহারা খুব মলিন। বৃদ্ধার পেট একদম পিঠের সাথে লেগেছিল মনে হচ্ছিল অনেক দিন পেট ভরে তৃপ্তিকর খাবার খায়নি। আমি বৃদ্ধাকে কিছু দিব কী দিব না ভাবতে ভাবতে ব্রিজ থেকে অনেক দূর চলে এসেছিলাম। হঠাৎ আবার কী মনে করে যেন দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম। সেদিন ফিরে এসে বৃদ্ধার ছেঁড়া ব্যাগে মানিব্যাগ থেকে ১০টাকা দিয়ে এসেছিলাম। আমার মনে আছে সেদিন বাড়ি ফেরার বাকিটা সময় আমি আনমনা ছিলাম। ভাবছিলাম ওই বৃদ্ধার কথা কতটা অসহায় হলে একটা মানুষের ওরকম পরিস্থিতি হতে পারে। আমরা মধ্যবিত্তরা না হয় কোন রকম খেয়ে পড়ে বাঁচি কিন্তু ওরা? আবার ভাবছিলাম বৃদ্ধার কী কোন ছেলে মেয়ে নাই? যদি থাকে তাহলে তারাই বা কী অকৃতজ্ঞ। যে মা দশ মাস পেটে ধরে হাজার কষ্ট দাঁত চেপে সহ্য করে, মৃত্যু যন্ত্রণা উপেক্ষা করে সন্তান জন্ম দিতে পারে। কীভাবে একজন সন্তান সেই মা কে অস্বীকার করতে পারে? . সেদিন বাড়ি এসে ভাত খেতে পারছিলাম না। প্লেটে ভাত রেখেই উঠে গিয়েছিলাম। মা জিজ্ঞাস করলে বলেছিলাম আর খেতে ইচ্ছে করছে না। ভাত মুখে দেওয়ার সময় আমার ওই বৃদ্ধার কথা মনে পরেছিল। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল। আমি কত তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছিলাম আর ওই বৃদ্ধা না জানি কতদিন না খেয়ে আছে। সমাজের সমাজপতিরা না খেতে পেরে খাবার ডাষ্টবিনে ফেলে। আর অসহায় গরীব মানুষ না পেয়ে হাহাকার করে। আসলে জগৎসংসার খুব অদ্ভুত কেউ বাড়তি মনে করে ছুড়ে ফেলে দেয় আবার কেউ না পেয়ে আফসোস করে। আচ্ছা কত খবরতো প্রতিদিন খবরের কাগজে ছাপা হয় কিন্তু জীবন পাতার দুই একটা খবর কী কখনো খবরের কাগজে জায়গা পায়? কোন অসহায় মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ কোন শিশুর বাঁধ ভাঙা চিৎকার অথবা কোন নিরীহ বাবার চোখের পানি। জানি জীবন পাতার এই খবর সংগ্রহ করতে কোন সাংবাদিক কোন দিন তাদের সময় নষ্ট করবে না। কোন ফটোগ্রাফার একটি ছবি তুলে তাদেরে ক্যামেরার অপব্যবহার করবে না। কোন মিডিয়া তাদের জীবন চিত্র তুলে ধরে মিডিয়ার চ্যানেলের মান কমাবে না। কোন কবি তার কবিতায় এদের জীবন চিত্রের স্থান দিয়ে কবিতার দুর্নাম কামাবে না। কোন লেখক তার গল্পে এদের চরিত্র তুলে ধরে ডাইরির পৃষ্ঠা শেষ করবে না। . পরেরদিন কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার সময় দেখি ওই বৃদ্ধা ঠিক আগের দিনের মতই শুয়ে আছে। আমি সেদিনও মানিব্যাগ বের করেছিলাম টাকা দেওয়ার জন্য কিন্তু সেদিন টাকা দিয়েছিলাম না। আমি সেদিন আশেপাশের মানুষের কথা না ভেবে বৃদ্ধার পাশে বসে গিয়েছিলাম। জিজ্ঞাসা করেছিলাম দাদী সকাল থেকে কিছু খেয়েছেন? বৃদ্ধা মাথা নেড়ে জানিয়েছিল কিছু খায়নি।তারপর জিজ্ঞাস করেছিলাম কিছু খাবেন? কথাটা জিজ্ঞাস করে আমি নিজে বোকা বোনে গিয়েছিলাম একজন ভুখা মানুষ কে জিজ্ঞাসা করছি সে খাবে কী না। আমার মুখ থেকে খাওয়ার কথা শুনে বৃদ্ধার মুখ উজ্জ্বল হয়ে গিয়েছিল। আবারো মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে ছিল। আমি বলেছিলাম আমার সাথে আসুন হোটেল থেকে কিছু খেয়ে নিবেন। আমার কথা শুনে বৃদ্ধা শোয়ে থেকে ধীরেধীরে উঠার চেষ্টা করছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম বৃদ্ধার গায়ে উঠে বসার মত অবশিষ্ট শক্তি নেই। আমি উনাকে টেনে তোলার জন্য উনার গায়ে হাত দিলাম। গায়ে হাত দেওয়ার পরে আমি ১২০ ভোল্টেজ শক খেয়েছিলাম মনে হয়। বৃদ্ধার গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছিল আমি বলেছিলাম একি আপনারতো অনেক জ্বর উনি কোন কথা বলছিল না। মনে হয় শুনতে পায়নি উনি আমার হাত ধরে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। খাওয়ার কথা শুনে হয়তো জ্বরের কথা ভুলে গিয়েছিল। বৃদ্ধাকে যখন টেনে তুলে বৃদ্ধার হাত ধরে হোটেলের দিকে যাচ্ছিলাম তখন একদল জনতা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিল। . হোটেলে এসে জ্বর থাকার পরে বৃদ্ধা সবজি আর ডিম দিয়ে দুই প্লেট ভাত খেয়েছিল।খাওয়া শেষ হলে বৃদ্ধাকে বলেছিলাম আপানারতো অনেক জ্বর ডাক্তার দেখান না কেন? জবাবে সে বলেছিল ডাক্তার দেখায়া ওষুধ কিনব ক্যামনে? আমি উনার কথার জবাব দিতে পারিনি। উনাকে আবার ব্রিজের কাছে রেখে দিতে যাচ্ছিলাম আর মনে সাথে যুদ্ধ করছিলাম।আমার কাছে তখন দুশত টাকা ছিল কিন্তু ওই টাকা আমি গেঞ্জি কেনার জন্য রেখে দিয়েছিলাম। অনেকদিন ধরে ভাড়ার টাকা থেকে কিছু টাকা বাঁচিয়ে তারপর দুইশ টাকা হয়েছিল। ব্রিজের কাছে আসার পর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম গেঞ্জি কেনার টাকা দিয়ে বৃদ্ধার ঔষধ কিনে দিব। শহরের কাছেই ছিল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। মেডিক্যালে ১০টাকা টিকেট কেটে এম বি বি এস ডাক্তার দেখানো যেতো। আমি বৃদ্ধাকে মেডিক্যালে নিয়ে গিয়েছিলাম। ডাক্তার যখন বৃদ্ধার চেক-আপ করছিল তখন আমার দিকে কুদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেছিল এত অসুস্থ মানুষ অথচ আজকে এনেছো ডাক্তারের কাছে? তোমার মা বাবাই বা কেমন নিজের মায়ের খেয়াল রাখতে পারে না। ডাক্তারের কথা শেষ হওয়ার পর আমি কবলেছিলাম উনি আমার কেউ না তারপর সব ঘটনা খুলে বলেছিলাম। আমার কথা শুনে ডাক্তার আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। আমি দেখতে পারছিলাম তার দৃষ্টিতে ছিল অসীম শ্রদ্ধা আর ভালবাসা। . ডাক্তার দেখানোর পর বৃদ্ধাকে তার ভাঙাচোরা বাসস্থানে রেখে এসেছিলাম। সেদিন বৃদ্ধার ঔষধ কেনার জন্য আমার টাকা খরচ করতে হয়েছিল না। ঐ ডাক্তার বাবু বৃদ্ধার সব টেস্ট লিখে দিয়ে নিজে গিয়ে সব টেস্ট করিয়ে এনেছিল তারপর পিওন দিয়ে এক মাসের ঔষধ এনে আমার হাতে দিয়েছিল। আসার আগে ডাক্তার বাবু আমাকে ডেকে নিয়ে অনেকক্ষণ বুকে জড়িয়ে রেখেছিল পাঁচশত টাকা হাতে দিয়ে বলেছিল বৃদ্ধার কিছু খাবার কিনে দিয়ে দিও। ডাক্তারের ব্যবহার দেখে সেদিন বুঝে ছিলাম পৃথিবীতে এখনো ভাল মানুষ আছে। বৃদ্ধাকে রেখে আসার পর বাড়ি এসে মায়ের কাছে বৃদ্ধার কথা বলেছিলাম। মা আমার সব কথা শুনে আমার কপালে ছোট একটা চুমু এঁকে দিয়ে বলেছিল তোর দাদী মারা যাওয়ার পর তার কিছু কাপড় ব্লাউজ এখনো আলমারিতে তুলে রেখেছিলাম। এখনো আছে বৃদ্ধাকে যখন দাদী বলে ডেকেছিস তখন কিছু দায়িত্ব পালন করতে হবে। কাল কলেজে যাওয়ার সময় দুইটা কাপড় ব্লাউজ আর পেটিকোট নিয়ে যাবি। পরেরদিন কলেজে যাওয়ার সময় মা টিফিন বক্সে কিছু খাবারের সাথে দাদীর পুরাতন কাপড় গুলো দিয়ে দিয়েছিল। . বৃদ্ধা কিছুটা সুস্থ হলে বৃদ্ধাকে একটা আশ্রমে রেখে এসেছিলাম। আশ্রমে রেখে আসার আগ পর্যন্ত প্রতিদিন সকালে মায়ের বানানো নাস্তা বৃদ্ধাকে দিয়ে আসতাম। আজ প্রায় দুই মাস হলো বৃদ্ধাকে আশ্রমে রেখে এসেছি। মাঝে মাঝে আশ্রমে গিয়ে বৃদ্ধাকে দেখতে আসতে ভুল করিনা। আমি ভুল করলেও মা ভুল করে না। মা আমাকে বৃদ্ধার কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রতিবার যাওয়ার সময় বৃদ্ধার জন্য মায়ের রান্না করা খাবার নিয়ে যাই। কাল রাতে আশ্রমের নাম্বার থেকে ফোন এসেছিল ফোন রিসিভ করার পর বলেছিল আপনার দাদী আপনাকে জরুরী তলব করেছে। মাকে রাতেই বলে রেখেছিলাম দাদী ফোন করেছে আশ্রমে যেতে হবে। কিছুক্ষণ আগে বাস থেকে নেমে দাদীর আশ্রমের দিকে যাচ্ছি আজকেও আসার সময় মা কিছু খাবার দিয়ে দিয়েছে। আশ্রমের গেটে আসতেই দেখলাম দাদী একটা লাঠি হাতে বসে আছে। আমাকে দেখেই এগিয়ে এসে বলল ভালা আছোস ভাই? আমি বললাম হ্যাঁ ভালো আছি আপনি ভালো আছেন? দাদী মাথা ঝাঁকানোর সাথে সাথে বলল ভালা আছি রে ভাই। আমি জিজ্ঞাস করলাম এতো জরুরী তলব কী জন্য দাদী? দাদী বলল আমার লগে আয়। আমি দাদীর সাথে গিয়ে উনার বিছানায় বসলাম। বিছানায় বসার পর প্রতিবারের মতো এবারেও আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল বাঁইচা থাক ভাই আল্লাহ্ তরে ম্যালা বড় করবো। মাথায় হাত বুলানো শেষ হলে দাদী বিছানার নিচ থেকে একটা বাটি বের করল। দেখলাম বাটিতে দুইটা ভাপা পিঠা আছে। বাটি বিছানায় রেখে একটা পিঠা হাতে নিয়ে বলল হা কর ভাই পিঠাখান খাইয়ানে। কাইল এক লোক আইসা সবাইরেই দুইডা কইরা পিঠা দিয়া গেছে। আমি খাই নাই তরে থুইয়া ক্যামনে খাই? দুনিয়াডায়তো আমার তুই ছাড়া আর কেউ নাই। আল্লাহ্ আমারে কোন পোলা মাইয়াও দেয় নাই। যদি দিতো তাইলে এতো দিনে তোর মত নাতি পাইতাম। আমি বুঝে গেলাম দাদী কেন আমাকে জরুরী তলব করছে। আমি ভাবতে লাগলাম একেই মনে হয় বলে মাতৃহৃদয় যে নিজে না খেয়ে অন্যকে খাওয়ায়। আমার চোখদুটো ছলছল করছে মনে হয় অনুভূতি গুলো তরল হচ্ছে। ভালবাসা গুলো মনে হয় এরকমই হয় কেউ অবহেলা করে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। আবার কেউ কুড়িয়ে নিয়ে নিজের করে নেয়।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৭৩ জন


এ জাতীয় গল্প

→ কুড়িয়ে পাওয়া ভালোবাসা
→ কুড়িয়ে পাওয়া ভালোবাসা শেষ পর্ব
→ কুড়িয়ে পাওয়া ভালোবাসা ০১

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now