বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
পলিটিক্যাল থ্রিলার,কন্সপিরেসি
(পর্ব-২)
আসাদ কায়সার এখন তার মনোনীত
প্রার্থীর সমর্থনে নির্বাচনী
প্রচারনা চালাচ্ছেন।ছুটে যাচ্ছেন
দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক
প্রান্ত।প্রতিটা সমাবেশ লোকে
লোকারণ্য।যখন তার বক্তৃতা শেষ
হয় তখন উপস্থিত জনতা আরো
একবার উপলব্ধি করতে পারে এই
মানুষটার উপর নির্ভর করে তারা
কোনো ভুল করেনি।
আজ তিনি রাজধানীর একটি ব্যাস্ত
এলাকায় নির্বাচনী প্রচারনা
চালাচ্ছেন।যথারীতি এখানেও লোকে
লোকারণ্য।
উত্তরার একটি স্পোর্টিং ক্লাবের
মাঠে সমাবেশের আয়োজন করা
হয়েছে।মাঠ অনেক আগেই ভরে
গেছে। লোকজন রাস্তা পর্যন্ত
পৌঁছে গেছে।রাস্তার পাশের ফুটপাত
দখল করে আছে উৎসুক জনতা।তবে
রাস্তায় নামতে সাহস পাচ্ছেনা কেউ।
ড.আসাদ কায়সারের স্বভাব তাদের
জানা আছে।রাস্তা দখল করে
সমাবেশ করা তার একেবারেই
অপছন্দ।কিছুদিন আগে এক জায়গায়
বক্তৃতা দেবার সময় বুঝতে পারলেন
সমাবেশস্থলের পাশের রাস্তা ব্লক
হয়ে গেছে প্রচন্ড ভীড়ের কারনে।
সাথে সাথে বক্তৃতা বন্ধ করে স্টেজ
থেকে নেমে পড়েন ড.আসাদ
কায়সার।সমাবেশ সেখানেই সমাপ্ত।
এরপর থেকে মানুষ রাস্তা দখল করে
তার বক্তৃতা শোনার সাহস দেখায়
না।
আসাদ কায়সারের কন্ঠস্বর ভরাট।
কথা বলার সময় আশ্চর্য দৃঢ়তা ফুটে
ওঠে। প্রতিটি বাক্যে ঝরে পড়ে
অদ্ভুত এক সম্মোহনী জাদু।তন্ময়
হয়ে শুনতে হয়।
এইমাত্র কথাগুলো বলে শেষ করার
সাথে সাথেই তুমুল হাততালিতে ফেঁটে
পড়ল গোটা সমাবেশস্থল।উপস্থিত
জনতার অনেকের চোখেই টলমল
করছে অশ্রু।আসাদ কায়সারের ঠিক
পেছনে দাঁড়ানো বয়স্ক মানুষটা
রুমালে চোখ মুছলেন।আসাদ
কায়সারের রাজনীতিতে আসার
পেছনে এই মানুষটার অবদান
অনস্বীকার্য। সারাদেশের মানুষের
প্রস্তাব যখন আসাদ কায়সার
একের পর এক ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন
তখন এই মানুষটা দিনরাত লেগে
রইলেন আসাদ কায়সারের পেছনে।
তাকে বোঝাতে লাগলেন দেশের
স্বার্থেই তার এখন হাল ধরা উচিত।
অবশেষে বরফ গলল।আসাদ কায়সার
রাজনীতিতে এলেন আর আশরাফ
জামান হলেন জনবন্ধু পার্টির
সেকেন্ড ইন কমান্ড।
আশরাফ জামানের সংক্ষিপ্ত
পরিচয় তিনি একজন নামকরা
ব্যাবসায়ী।বেশ ধনী মানুষ। প্রথম
দিকে তিনিই জনবন্ধু পার্টির সব
খরচ বহন করতেন তবে এখন আর
তার প্রয়োজন পড়েনা।প্রচুর
ডোনেশন পাচ্ছে জনবন্ধু।তবে চোখ
বুজে যার তার ডোনেশন নেয়াতেও
ঘোর আপত্তি আসাদ কায়সারের।
দাতার ব্যাপারে যথাসম্ভব খোঁজ
খবর করেই ডোনেশন গ্রহন করেন
তিনি।
আশরাফ জামানের আরো একটা
পরিচয় আছে।তিনি একজন
মুক্তিযোদ্ধা।মুক্তিযুদ্ধের সময়
তিনি বিশ বছরের টগবগে যুবক।খুব
অল্পদিনেই পাক বাহিনীর আতঙ্কের
অন্য নাম হয়ে দাঁড়ায় আশরাফ
বাহিনী। এই গ্রুপটার লিডার
ছিলেন,বলাই বাহুল্য,আশরাফ
জামান। দশজনের এই গ্রুপটা মূলত
অতর্কিত গেরিলা হামলা চালাত।
দলের সবাই ছিল বীর যোদ্ধা।সেই
সাথে আশরাফ হায়দারের যোগ্য
নেতৃত্ব গেরিলা ইউনিটটাকে
অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছিল।
যুদ্ধের শেষের দিকে অবশ্য একটা
গেরিলা অপারেশনে গিয়ে আশরাফ
জামানসহ আরো দুজন ধরা পড়ে যায়
পাক বাহিনীর হাতে।একসপ্তাহ পর
কিভাবে তিনি শত্রু ঘাটি থেকে
পালিয়ে আসেন সেটা আরেক কাহিনী।
সৎ ব্যাবসায়ী হিসেবে নামডাক আছে
আশরাফ জামানের।আসাদ
কায়সারের বাবার বাল্যবন্ধু তিনি।
যুদ্ধের শেষের দিকে তার সাথে যে
দুজন ধরা পড়ে তার মধ্যে একজন
ছিলেন কায়সার,আসাদ কায়সারের
বাবা।তবে মৃত্যুর মুখ থেকে শুধু তিনিই
ফিরে আসতে পেরেছিলেন।কায়সার
আর তার আরেক সঙ্গী পাক বাহিনীর
হাতে শহীদ হন।
স্বাধীনতার কয়েকমাস পরই আসাদ
কায়সারের জন্ম।তাকে জন্ম দিতে
গিয়ে তার মা মারা যান।আসাদ
কায়সারের বাবা ছিলেন বেশ ধনী
মানুষ।সেজন্য তার এবং তার স্ত্রীর
মৃত্যুর পর এতিম এই ছেলেটাকে চুষে
খাবার জন্য হঠাৎ করেই চারপাশে
শকুনদের আনাগোনা শুরু হল।সে
সময় আশরাফ জামান নতুন বিয়ে
করেছেন।গ্রামের সমস্ত সম্পত্তি
বিক্রি করে ঢাকায় চলে আসতে
চাচ্ছিলেন।কারন গ্রামে পড়ে থাকবার
মত কোনো পিছুটান তার অবশিষ্ট
ছিলনা।পাক বাহিনীর হাতে তার
পরিবার যুদ্ধের সময়ই নিহত হন।
আসাদ কায়সার তখন ছয়মাসের শিশু।
পালিত হচ্ছিলেন দুঃসম্পর্কের এক
মামীর কাছে।আশরাফ জামান বুঝতে
পারলেন এই বাচ্চাটাকে এখানে রেখে
গেলে বেঘোরে মরবে।সম্পত্তির
ভাগ বাটোয়ারা হয়ে গেলেই
বাচ্চাটাকে ছুড়ে ফেলবে তার
আত্মীয়রা।তিনি তখন নিজের
সম্পত্তির সাথে সাথে কায়সারের
সম্পত্তিও বিক্রি করে দিলেন
আত্মীয়দের প্রবল আপত্তির মুখে।
এরপর ছয়মাসের আসাদকে নিয়ে
চলে এলেন ঢাকায়।কায়সারের সব
টাকা পয়সা ব্যাংকে রেখে নিজের
পুঁজি দিয়ে শুরু করলেন ব্যাবসা।
সততা এবং ব্যাবসায়ীক বুদ্ধির
জোরে খুব অল্প দিনেই দাঁড়িয়ে গেল
ব্যাবসাটা।
পরবর্তীতে নিজের একটা ছেলে আর
একটা মেয়ে জন্ম নিলেও আসাদ
কায়সারকে কখনো ছেলে ভিন্ন কিছু
ভাবেননি।আসাদ কায়সার নিজের
পায়ে দাঁড়ানোর আগ পর্যন্ত তার
সমস্ত খরচ হাসিমুখে বরণ করে
গেছেন আশরাফ জামান।
নিজে ইনকাম শুরু করলেও পিতৃতুল্য
আশরাফ সাহেবকে ছেড়ে দুরে যেতে
পারেননি আসাদ কায়সার।পাশাপাশি
ফ্ল্যাটেই থাকেন দুজন।আসাদ
কায়সারের নিজের পরিবার নেই।বিয়ে
করেননি তিনি।তার পরিবার বলতে
আশরাফ জামানের পরিবারই।
আশরাফ জামানকে চাচা ডাকলেও
তার স্ত্রীকে মা বলে ডাকেন আসাদ
কায়সার।যে নারী ছয়মাস বয়স থাকে
তাকে কোলে পিঠে করে মানুষ
করেছেন তাকে মা ছাড়া আর কিইবা
ডাকা যায়?
আশরাফ সাহেবের ছেলে শামীম,মেয়ে
সাদিয়া,শামীমের স্ত্রী,পুত্র এরাই
আসাদ কায়সারের ভাই,বোন
পরিবার।
একজন মানুষের জন্য ফ্ল্যাট না
কিনে তাদের সাথেই থাকার জন্য
সবাই অনুরোধ করলেও সেটা রাখতে
পারেননি আসাদ কায়সার। মুচকি
হেসে বলেছেন,'একা দোকা হতে
কতক্ষন?'
পিতৃতুল্য আশরাফ জামানের
অনুরোধেই শেষপর্যন্ত রাজনীতিতে
আসতে সম্মত হয়েছেন আসাদ
কায়সার।আশরাফ সাহেব নিজেও
অত্যন্ত রাজনীতি সচেতন মানুষ।
প্রতক্ষ্যভাবে নিজে বেশ কয়েকবার
রাজনীতিতে জড়াতে চেয়েছিলেন।
নির্বাচনে দাঁড়ালে খুব সহজেই
নির্বাচিত হতে পারতেন।সমাজসেবক
হিসেবে তার পরিচিতি সর্বজন
বিদিত।তবে দেশের রাজনৈতিক
সিস্টেমের উপরই তার ভরসা ছিলনা।
এজন্য ইচ্ছেটাকে বাস্তবে রুপ দেয়া
হয়ে ওঠেনি।তবে আসাদ কায়সার
রাজনীতিতে জড়িত হবার পর আর
দ্বিধা করেননি তিনি।তার এলাকা
থেকে এবার নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন।
***
পেশাদার খুনী বলতে যা বোঝানো
হয় সালাম মোটেও তা নয়।মাঝ বয়সী
এই লোকটা একজন নিঃসঙ্গ
মানুষ,সেই সঙ্গে ব্যার্থও বটে।তবে
একটা গুন নিঃসন্দেহে তার আছে।
সালামের হাতের টিপ অব্যার্থ।তরুণ
বয়সে আন্তঃজেলা শুটিং
কম্পিটিশনে প্রথম হয়েছিল।সুযোগ
পেলে হয়ত বড় ধরনের কিছু একটা
করে ফেলতে পারত।কিন্তু ওই যে
ব্যার্থতা,যেটা কখনই তার পিছু
ছাড়েনি।
কয়েক বছর আগে একবার একটা
আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্রুপ তার ব্যাপারে
খোঁজ খবর নেয়।লক্ষ্যভেদে
সালামের দক্ষতার কথা শুনে তাকে
একজন মানুষকে খুন করার প্রস্তাব
দেয়।সালাম জানত সে রাজি না হলে
দুনিয়ার আলো বাতাস দেখার সুযোগ
খুব শিঘ্রই ফুরিয়ে আসবে।তাছাড়া
সে সময় খুবই আর্থিক দৈন্যতার
ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল সে।সবচাইতে
বড় কথা এই সন্ত্রাসী গ্রুপটাকে
সন্তুষ্ট করতে পারলে তাকে আর
টাকা পয়সা নিয়ে চিন্তা করতে
হবেনা।রাজি হয়ে যায় সে।
তবে সমস্যা হল,কেউ শুটিং
চ্যাম্পিয়ন হলেই যে অবলীলায়
সত্যিকারের পিস্তল চালাতে পারবে
বিষয়টা তা নয়।সে জন্য তাকে
সত্যিকারের পিস্তলে ট্রেনিং দেয়া
হল।খুব দ্রুত শিখে নিল সালাম।
এরপর বাকি কাজটাও সহজেই করতে
পারল। কিন্তু সালামের দুর্ভাগ্য,এই
ঘটনার পরই সেই সন্ত্রাসী গ্রুপটা
ভেঙ্গে গেল।দলের অন্যান্য
সদস্যদের মত সালামও ছিটকে গেল
একদিকে।সাথে রয়ে গেল শুধু একটা
পিস্তল আর একজন মানুষ খুন করার
অভিজ্ঞতা।
ভেবেছিল খুন করাকেই পেশা হিসেবে
নেবে।কিন্তু ব্যার্থতা এখানেও
সালামের সামনে মুখ ব্যাদান করে
থাকল।উপযুক্ত কন্ট্রাক্ট না থাকায়
এপর্যন্ত মাত্র তিনটা কাজ পেয়েছে
সে।তার উপর সালাম কোনো
প্রফেশনালও না।কঠিন কাজ দিলে
পারবে কিনা সেটাও বিবেচনার বিষয়।
এটাও কাজ না পাবার অন্যতম বড়
কারন।
সালাম নিজেও স্বীকার করবে এর
আগের তিনটা কাজই খুব সহজ ছিল।
তবে আজকের কাজটা কঠিন না সহজ
বুঝতে পারছেনা সালাম।
এর আগে কখনো আজকের মত
প্রকাশ্যে মানুষ খুন করেনি সে।তবে
আপাত দৃষ্টিতে আজকের কাজটা
কঠিন মনে হলেও তাকে বলা হয়েছে
আজকের কাজটা আরো সহজ।
স্টেজের কাছাকাছি গিয়ে ভিকটিমের
উদ্দেশ্য গুলি ছোড়ার সাথে সাথেই
গুলির শব্দে উপস্থিত হাজার হাজার
জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে।শুরু হবে
চুড়ান্ত বিশৃঙ্খলা। এরই মধ্যে সে
পালিয়ে যেতে পারবে।শর্ত একটাই
প্রথম সুযোগেই লক্ষ্যভেদ করতে
হবে।দ্বিতীয় কোনো সুযোগ সে
পাচ্ছেনা।সেটা নিয়ে তার দুঃশ্চিন্তাও
নেই। প্রথমবারেই লক্ষ্যভেদ
করবার মত আত্মবিশ্বাস সালামের
আছে।
তাকে আরো বলা হয়েছে এখানে
সিকিউরিটি বলতে শুধু কিছু পুলিশ।
এদের থাকা না থাকায় বিশেষ কিছু
আসবে যাবেনা।সবচাইতে বড় ব্যাপার
একাজটায় প্রচুর টাকা পাচ্ছে সে।
চাইলেই এটাকায় নিজের ছোটখাট
একটা ব্যাবসা দাঁড় করাতে পারবে।
সেটাই করবে বলে ঠিক করেছে।
অগ্রীম কিছু টাকাও দিয়েছে পার্টি।
বাকিটা আজ সন্ধ্যায় কাজ শেষে
পেতে চলেছে।
তবে সে যদি প্রফেশনাল হত তাহলে
একটু খোঁজখবর করলেই জানতে
পারত তাকে আসলে খুব সহজেই
দাবার গুটি বানানো হয়েছে।
আসাদ কায়সারকে খুন করতে
পারলেও এখান থেকে সালামের
অক্ষত বেরিয়ে যাবার সম্ভবনা
একেবারে শুন্যের কোঠায়।
কারন পুরো সমাবেশস্থলের
সিকিউরিটির দায়িত্বে আছে
প্রাইভেট ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি
সিক্রেট শ্যাডোর ছয়জন এজেন্ট।
আগেই বলা হয়েছে আসাদ
কায়সারকে ঘিরে শুরু হয়ে গেছে
ষড়যন্ত্র।তার উপর এপর্যন্ত
তিনবার হত্যা চেষ্টা চালানো হয়েছে।
দুবার তার সমাবেশস্থল থেকে মেলে
টাইম বোম্ব।আর শেষবার আসাদ
কায়সারের গাড়ি লক্ষ্য করে
গুলিবর্ষন করা হয়।সেবার আসাদ
কায়সারের এক সফর সঙ্গি গুরুতর
আহত হয়।ভাগ্যগুনে অক্ষত থাকেন
আসাদ কায়সার।এরপর অত্যন্ত
ব্যায়বহুল ও আসাদ কায়সারের শত
আপত্তি সত্বেও তার নিরাপত্তার
দায়িত্ব দেয়া হয় প্রাইভেট
ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি সিক্রেট
শ্যাডোর উপর। এমনিতে সিকিউরিটি
দেয়া সিক্রেট শ্যাডোর
কার্যক্রমের মধ্যে না পড়লেও
দেশের স্বার্থ এবং আশরাফ
জামানের অনুরোধে কাজটা করতে
রাজী হয় সিক্রেট শ্যাডো।গত এক
সপ্তাহ ধরে তারা আসাদ কায়সারের
সমস্ত সিকিউরিটির ভার নিজেদের
হাতে নিয়ে নিয়েছে।গত একসপ্তাহ
কেটে গেছে কোনো ধরনের অঘটন
ছাড়াই।অত্যন্ত প্রফেশনাল এদের
কাজ কর্ম।প্রতিটা সমাবেশে
সার্বক্ষণিকভাবে ছয়জন এজেন্টের
একটা টিম সমাবেশ স্থলের
নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। শুধু দিনে
নয়,রাতেও দুজন এজেন্ট আসাদ
কায়সারের নিরাপত্তার জন্য তার
সাথে থাকছে।
এই মুহুর্তে আসাদ কায়সারে একটু
পেছনে দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে মাসুদ
আর এই টিমের লিডার জাহিদ।
নাজমুল,কামাল,শরীফ আর নোমান
চক্কর দিচ্ছে পুরো সমাবেশ স্থল।
সতর্ক নজর বুলাচ্ছে চারিদিকে।
এছাড়া কোনো উপায়ও নেই।জনে
জনে সবাইকে চেক করে সমাবেশে
ঢোকানো স্রেফ অসম্ভব।
এমনিতে সিক্রেট শ্যাডোর
অফিশিয়াল ড্রেস কালো স্যুট
হলেও এই মুহুর্তে এরা প্রত্যেকেই
সাধারন পোষাক পড়ে আছে।আগ
বাড়িয়ে শত্রুর সামনে নিজেদের
প্রকাশ করে দেবার প্রশ্নই আসেনা।
তবে অভিজ্ঞ কেউ দেখলে বলে
দিতে পারবে এরা প্রত্যেকেই
অস্ত্র বহন করছে।
***
সালাম একটা ঢিলে ঢালা গেঞ্জি
পড়েছে।কোমরে গোজা পিস্তলটাকে
আড়াল করবার প্রয়াস।
তার প্ল্যানটা খুবই সাদামাঠা।
উপস্থিত লোকজনের মধ্যে দিয়ে
স্টেজের একেবারে সামনে চলে
আসবে সে।আগেই লক্ষ্য করে
দেখেছে স্টেজে ওঠার সিড়ির মুখে
দুজন মাত্র কনস্টেবল দাঁড়িয়ে
আছে।আর বাকি ক'জন পুলিশ এদিক
সেদিক ছড়িয়ে রয়েছে।সংখ্যায় তারা
নিতান্তই অপ্রতুল,অন্তত আসাদ
কায়সারের মত একজনের
নিরাপত্তার দিকটা লক্ষ্য করলে।
এই ব্যাবস্থাটুকুও সরকার নিতান্তই
অনিচ্ছা সত্বেও নিয়েছে।এর কারনও
আছে।যে লোকটা ক'দিন পরই তাদের
ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে যাচ্ছে তার
নিরাপত্তার দিকে কার খেয়াল
থাকবে?
সাধারন সভা সমাবেশে যে কজন
পুলিশ নিরাপত্তার জন্য থাকে
এখানেও তার চাইতে বাড়তি কিছু
নেই।
স্টেজে যাদের দেখা যাচ্ছে এরা
পার্টির নেতা কর্মী।তাদের নিয়ে
দুঃশ্চিন্তা মোটেও করছেনা সালাম।
গুলি শুরু হলে এরাই আগে খিঁচে দৌড়
দেবে!
সালাম প্রচন্ড ভীড়ের মধ্য দিয়ে
সামনে এগোতে চাইছে।কিন্তু কার
এত ঠেকা পড়েছে নিজে সরে গিয়ে
তাকে জায়গা করে দেবে?এজন্য
মাঝে মধ্যেই জোর খাটাতে হচ্ছে
তাকে। প্রায় পৌঁছে গেছে স্টেজের
কাছে।আরেকটু এগোতে পারলেই
স্টেজের দশ গজের মধ্যে চলে যেতে
পারবে সালাম।আর তাহলেই...।
তবে সে ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারল
না,কেউ একজন গভীরভাবে
পর্যবেক্ষন করছে তাকে।
***
সিক্রেট শ্যাডোর এজেন্ট চব্বিশ
বছর বয়সী কামাল খানিকটা অস্থির
স্বভাবের মানুষ।সবসময়
উত্তেজনার খোঁজে থাকে।স্টেজে
ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার চাইতে পুরো
সমাবেশ স্থল নজরে রাখাটাই তার
বেশি পছন্দের।সে কাজটাই করছে
এই মুহুর্তে।ও সহ আরো তিনজন এ
কাজে আছে। নিজেদের মধ্যে এরিয়া
ভাগ করে নিয়েছে।কামালের দায়িত্বে
আছে সমাবেশের পেছন দিকটা।
অর্থাৎ স্টেজের মুখোমুখি
একেবারে সমাবেশের শেষ পর্যন্ত।
বাকিরা অন্য দিকগুলো কাভার
করছে।
এতক্ষন স্টেজের দিকে মুখ করে
তাকিয়ে ছিল।দেখলে মনে হতে পারে
গভীর মনোযোগে আসাদ কায়সারের
বক্তৃতা শুনছে।আসল ব্যাপার
হল,আশেপাশের খুঁটিনাটি
বিষয়গুলোও তার চোখ এড়াচ্ছেনা।
একটু আগে এমনই একটা ব্যাপার
চোখে পড়েছে তার।সেটা নিয়েই
চিন্তা করছে।
এক লোককে স্টেজের সামনের
দিকে যেতে দেখছে কামাল।লোকটা
বেশ লম্বা,শক্তপোক্ত।নিঃসন্দেহে
শরীরে যথেষ্ঠ শক্তি রাখে।স্টেজের
সামনের দিকে যাবার মধ্যে তেমন
অস্বাভাবিকতা নেই।হয়ত লোকটা
আসাদ কায়সারের মাত্রাতিরিক্ত
ভক্ত।তবে সমস্যাটা হল লোকটার
মধ্যে একটা বেপরোয়া ভাব দেখা
যাচ্ছে।যেন স্টেজের সামনের দিকে
যাবার মধ্যেই তার জীবন মরন
নির্ভর করছে।লোকটার এই
ব্যাতিব্যাস্ততা দেখে যখন তার
দিকে কামাল মনোযোগ দিয়েছে
তখন আরো একটা বিষয় নজরে
এসেছে।এটাও ছোট্ট বিষয় কিন্তু
ওর মন কেন যেন খুত খুত করতে
লাগল।
ট্রেনিং এ কামাল শিখেছে এধরনের
পরিস্থিতিতে প্রথমেই একটা জিনিস
লক্ষ্য করতে হবে।যার উপর সন্দেহ
হয় তার দেহের কোথাও অস্ত্র
লুকাবার মত জায়গা আছে কিনা।
কোট,চাদর কিংবা ঢোলা জামা।
প্রফেশনালদের উপর কৌশলটা
কাজে না লাগলেও অ্যামেচারদের
উপর যথেষ্ঠ কার্যকরী।এই
লোকটাও একটা ঢোলা জামা পরে
আছে।হয়ত কিছুই না,এরপরও খতিয়ে
দেখার মনস্থির করল কামাল।
লোকটার পিছু নিল।
***
সালাম পৌছেঁ গেছে স্টেজের
একেবারে সামনে।স্টেজের সামনের
প্রায় দশ গজের মত জায়গা বাঁশ
দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে।যেন অতি
উত্তেজিত কেউ স্টেজে উঠে পড়তে
না পারে।ঘেরা জায়গাটাতে পার্টির
দুয়েকজন লোক ঘোরা ফেরা করছে।
ইতস্তত এদিক সেদিকে দৃষ্টি
নিক্ষেপ করছে।এদের চোখ এড়িয়ে
গুলি করাটা কিছুটা মুশকিল।তবে
ভরসার কথা এই লোকগুলোর
মনোযোগ অন্যদিকেই থাকছে বেশি।
কোমরের কাছ থেকে গুলি হয়ত করা
যেত কিন্তু সমস্যা হল বক্তৃতারত
আসাদ কায়সারের সামনে একটা
ডায়াস আছে।কোমর থেকে গুলি
ছুড়লে তার দেশি পিস্তলের গুলি
ঠেকিয়ে দেবার সামর্থ্য আছে
মজবুত কাঠের।সেক্ষেত্রে হাত উঁচু
করে গুলিটা করতে হবে।একেবারে
মাথায়।কোনো সুযোগই পাবেনা
ভিকটিম।
এই সাহস তার আছে।সালাম হিসেব
করে দেখেছে কোমর থেকে পিস্তল
বের করে ভিকটিমের দিকে তাক করে
ট্রিগার টিপতে বড়জোর দশ
সেকেন্ড লাগবে। আশা করতে দোষ
নেই এই দশ সেকেন্ড কেউ তার
দিকে মনোযোগ দেবেনা।আর গুলি
করতে দেখে ফেললেও বাধা দেবার
সম্ভবনা খুবই কম।এদেশে মানুষকে
তার চেনা আছে।চোখের সামনে
নিরস্ত্র ছিনতাইকারী কর্তৃক
কাউকে লুট হতে দেখলেও বাঙালিরা
হাই তুলে আরেকদিকে তাকায়।
সেখানে পিস্তল বের করে কাউকে
গুলি করতে দেখলে প্রথম দশ
সেকেন্ড স্ট্যাচু হয়েই থাকবে যে
কেউ।আর একবার গুলি করা হয়ে
গেলে কোনো চিন্তাই নেই।দিশেহারা
হাজার হাজার জনতার ভীড়ে সে
সহজেই হারিয়ে যেতে পারবে।
শর্তটাও তার মনে আছে। প্রথম
সুযোগেই লক্ষ্যভেদ করতে হবে।
লক্ষ্যভেদের লক্ষ্যে কোমর থেকে
পিস্তল বের করল সালাম।
লক্ষ্যস্থির করল।
***
কিছুদুর এগোতেই কামাল উপলব্ধি
করল সে লোকটাকে হারিয়ে
ফেলেছে।যতই ভাবছে ততই ওর মনে
হচ্ছে কিছু একটা ঘাপলা আছে এই
লোকের মধ্যে।
ও কখনো মরুভূমিতে যায়নি।তবে
পরিষ্কার উপলব্ধি করতে পারছে
মরীচিকা দেখার অনুভূতি কেমন হতে
পারে। চারপাশে যেদিকে তাকাচ্ছে
সেদিকেই লোকটার দেখা পাচ্ছে
কামাল।কিন্তু সাথে সাথেই ভ্রান্তি
কেটে যাচ্ছে।
বাকিদের সতর্ক করে দেবার মত
সময়ও নেই।ওর ধারনা যদি সত্যি হয়
তাহলে এই মুহুর্তে স্টেজের সামনে
চলে গেছে লোকটা। এখন একটা
কাজই করার মত আছে।ওর নিজেরও
স্টেজের সামনের দিকে চলে যেতে
হবে।
কিছুক্ষন পর যখন কামাল স্টেজের
সামনের দিকে আসতে সক্ষম হল
ততক্ষনে একেবারে কালঘাম ছুটে
গেছে ওর।এখানে পৌঁছেও যে
সমস্যার সমাধান হল তা কিন্তু নয়।
স্টেজের সামনে ঠিকই সে এসেছে
কিন্তু ওই লোক যে তার পাশেই
থাকবে তা তো না।হতে পারে লোকটা
স্টেজ বরাবরই আসেনি।কোন এক
পাশে গিয়ে অবস্থান নিয়েছে।
সতর্ক দৃষ্টি ফেলতে লাগল যতদুর
চোখ যায়।ওর ডানে,বামে,পেছনে
মানুষ একেবারে গিজ গিজ করছে।
এরমধ্যে আততায়ী কোথায় ঘাপটি
মেরে আছে কে বলতে পারে? তাছাড়া
সে সত্যি সত্যিই আততায়ী কিনা
সেটা নিয়েও তো সন্দেহ
আছে...নাহ,আর কোনো সন্দেহ নেই।
কামাল ওর ডানে তাকাতেই দেখতে
পেল একটা হাত স্টেজের দিকে তাক
করা।সে হাতে অস্ত্র!
কামাল এত দুর থেকেও অনুভব
করতে পারল ট্রিগারে লোকটার
আঙ্গুল চেপে বসেছে।গুলি ছুটে যাবে
যখন তখন।
কিচ্ছু করার নেই কামালের।চিৎকার
করলেও সেটা মাইকের আওয়াজের
নীচে চাপা পড়ে যাবে।বরং তাতে
আরো হিতে বিপরীত হবার জোর
সম্ভবনা আছে।মারাত্মক
বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে।আর গুলি
ছোড়ার আগে ভীড় ঠেলে
কোনওমতেই আততায়ীর কাছে
যাওয়া সম্ভব নয়।
হঠাৎ করেই অসহায় বোধ করল
কামাল।ভয়ংকর অসহায়।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now