বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সাত.
“তারমানে বলতে চাইছিস, হোটেল আভাটিয়ার ম্যাস মার্ডারারটা তুই ছিলি?” তৃতীয়বারের মত প্রশ্ন করল তামিম ইকবাল।
“আরে বাল, তোর কি আমাকে তোতা পাখি লাগতেছে? একটা কথা হাজারবার জিজ্ঞাসা করিস না।”
তরুণ সাইকিয়াট্রিস্ট তামিম ইকবালের চেম্বারে বসে আছে সাব্বির। হোটেলের সেই হত্যাযজ্ঞের তিন মাসে পেরিয়ে গেছে। সব কথা প্রথমবারের মত কাওকে খুলে বলেছে সে। তার আগে অবশ্যই, রেকর্ডার অফ করে নিতে বাধ্য করেছে বন্ধুকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল তামিম। চমৎকার রেজাল্ট করে বের হয়েছিল মনোবিজ্ঞান থেকে। তার সাথে কথা বলতে আসার পেছনে একাধিক কারণ আছে। তার মধ্যে একটা কারণ, তামিম সাব্বিরের বন্ধু। একদম স্কুলজীবনের বন্ধু।
“ফাইন। তারমানে, তুই কাজটা করেছিলি তোর প্যারালাল ইউনিভার্স ভার্সনের কথা অনুযায়ী?” হেসে উঠল না তামিম। সাব্বিরকে একজন পেশেন্ট হিসেবেই নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে, “তাহলে খবরে তোর নাম কেউ লিখল না কেন? তোর প্রিন্ট ছিল এমন অনেক কিছুই ছিল তোর রুমে। সবচেয়ে বড় কথা নিজের ল্যাপটপটা ফেলে এসেছিলি সেখানে। এতবড় প্রমাণ পেলে পুলিশ ডিপার্টমেন্টের জন্য আনসলভড কেস হয়ে থাকার কিছু তো ছিল না এটা।”
“বাবার কানে গেছিল খবরটা। কলকাঠি নেড়েছিলেন। পুলিশ আমাকে খুঁজেছিল হয়ত, তবে মিডিয়াতে আসতে দেয়নি সে খবর। খবরের কাগজগুলো কি বলেছিল মনে আছে তোর?”
“মব হিট। ওখানে দুইজন মারা যায়। দুইজনই ডন রাবেকের লোক ছিল। ঢাকার সব শপিং কমপ্লেক্সগুলো নিয়ন্ত্রণ করে মাফিয়া। তাদের লোক ছিল তারা। ধারণা করেছে আন্ডারওয়ার্ল্ডে কোন ঝামেলা হয়েছিল। ফলাফল, ঢাঁচিয়া। তুই কি আন্ডারওয়ার্ল্ডে ঢুকেছিস নাকি?”
“ঠাট্টা করিস না।” বিরক্ত মুখে বলল সাব্বির, “আমাকে তোর পাগল বলে মনে হচ্ছে?”
“ঠিক তা না। তবে এটা কি জানিস, প্যারালাল ইউনিভার্স থিওরি প্রমাণ করা যায়নি। এটা শুধুমাত্র একটা থিওরি। কেউ চাইলে বিশ্বাস করতে পারে। কেউ চাইলে এটাকে গালগল্প বলে উড়িয়ে দিতে পারে।”
“বিশ্বাস অবিশ্বাস চুলোতে যাক। আই হ্যাড বিন গন থ্রু ইট।”
“তুই কি শিওর?”
“কি শিওর?” প্রায় গর্জে উঠল সাব্বির, “আমি রাতটা পার করেছি। ফোনের ওপাশের ভয়েস ঋতুর কথা জানত। এটার কথা আর কারও জানার কথা না।”
“একজনের জানার কথা। ঋতুর। অ্যাসিড মারার পর থেকে ঋতু তোর জন্য নিশ্চয় পাগলপারা না? তারমানে, সে এই কথাগুলো কাওকে লিক করতেই পারে। খুনগুলো কেন করতে হয়েছে তোকে বলেছে তোর প্যারালাল ভার্সন?”
“শিওর। প্যারালাল ইউনিভার্সের আমি যাদের হয়ে কাজ করছি, তাদের বলা হয় প্যারালাল সেভার এজেন্সি। আমাদের এদিকেও একটা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমেরিকান জঙ্গী গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিচ্ছিল একজন বাংলাদেশী খ্রিস্টান। স্টুয়ার্ট প্যাটেল। তার ডানহাত রোজি। দুইজনই অস্পৃশ্য ওদের ওয়ার্ল্ডে। চাইলেই কি আর ওসামা-বিন-লাদেনকে ধরতে পারবি তুই?”
“না। তা পারব না। তবে থিওরিটা কি? তুই কি টেররিজম ঠেকালি মাত্র? ইন্টারন্যাশনাল টেররিজন? দুইজন মাফিয়া মেম্বারকে খুন করে?”
“এই ওয়ার্ল্ডে তারা শুধুই মাফিয়া মেম্বার। কিন্তু ওই ওয়ার্ল্ডে তা না। ওখানে তারা একটা ক্রাইম অর্গানাইজেশনের হেড।”
“এখানে তাদের খুন করার পর কি হয়েছে ওদের ওয়ার্ল্ডে?”
“পরদিন ফোন করেছিল আমাকে ওই ওয়ার্ল্ডের ... আমি। বলল, ওদের ইনসাইড সোর্স জানিয়েছে, কার ক্র্যাশে মারা গেছে ওদের দুই লিডার। নিছকই দুর্ঘটনা। জঙ্গিগোষ্ঠী শোকাহত। কেউ কেউ কন্সপিরেসি থিওরিও দাঁড় করিয়েছে। এইসব হাবিজাবি। বুঝতে পারছিস, কত বড় ঝামেলা কত সহজে সরিয়ে দেওয়া হয় এভাবে?”
“ওই নাম্বারে কল ব্যাক করার চেষ্টা করেছিস?”
“কলব্যাক করলে ওই প্যারালালের আমিই ফোন ধরি। যতক্ষণ পর্যন্ত মডিউলটা আমার কাছে আছে, এটা করতে পারব আমি।”
“আমাকে দেখা।” চ্যালেঞ্জ করল তামিম।
“ওই ফোন সাথে নিয়ে বের হইনি। সেফ জায়গাতে রেখে এসেছি।”
“তাই তো করবি!” তিক্ত কণ্ঠে বলল সাইকিয়াট্রিস্ট।
“আমার ভয়েস। আমার মত থিংকিং। তুই বলতে চাস এগুলো আমার পাগলামী? পিস্তলটা এলো কোথা থেকে? খুনগুলো তো হয়েছে সত্যি। লাশগুলো পুলিশ পেয়েছে। এগুলো সব আমার কল্পনা?”
“মোটেও তা বলছি না আমি। আমার সাজেশন আলাদা রকমের। তাতে তুই পাগল না, আবার প্যারালাল ইউনিভার্সের বাল-ছালও সত্য না।”
বিভ্রান্ত দেখালো সাব্বিরকে, “কিভাবে সেটা?”
থমথমে মুখে বলল তামিম, “প্যাসিভ ক্রাইম।”
“প্যাসিভ ... হাউ!”
“রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করি। ব্যাখ্যা পেয়ে যাবি। বের হওয়ার সাথে সাথে লোকাল তিন ছেলের সাথে ঝামেলা লেগে গেল তোর। তাদের কেউ আলগোছে মেগানের হাতব্যাগে আধ-খসন্ত ভাবে রেখে দিল মেমরি কার্ড। গার্লফ্রেন্ডের দিকে তোর শকুনি চোখের ব্যাপারে খ্যাতি আছে। জানত, ব্যাগ থেকে একটা সুতো খসে পড়লেও চোখে পড়বে তোর। তাই ঘটল।”
কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল সাব্বির, তাকে এক হাত তুলে থামিয়ে দিল তামিম, “বলতে দে আগে। জানি, তুই কি বলবি। ওই তিনজন এই ইউনিভার্সের তিন মডিউলার। কানেকশনটা প্রথমে এরাই করতে পেরেছিল। তোর মতে, ওই প্যারালালে নিক্সন যে সূত্রটা আবিষ্কার করেছিল সেটাই আবিষ্কার করেছিল এরা। পরবর্তীতে প্রথমবারের মত প্যারালাল মডিউল ব্যবহার করে ওই দিকের সাথে তারা যোগাযোগ করে। তাদের সাথে পরিচয় হয় আরবোটের। প্যারালাল এজেন্সির পক্ষ থেকে তুই, মানে ওই ইউনিভার্সের সাব্বির নিয়ন্ত্রণ করে কে কখন খুন হবে। অ্যাসাসিন ডিপার্টমেন্টের নাম আর-বোট। তাই তো? ওই ইউনিভার্সের তুই এই তিনজনকে ব্যবহার করে তোর কাছে পৌঁছে দিলি মডিউল। এটা হল তোর স্টোরি। আমাকে বলতে পারিস, কেন নিজের সাথেই যোগাযোগ করল ওই ইউনিভার্সের সাব্বির? আরও যোগ্য লোক ছিল না এই কাজটা করার জন্য? তুই একজন সিভিলিয়ান।”
“ট্রাস্ট ইস্যু। এরকম একটা সিরিয়াস কাজ আমাকে দিয়েই করিয়েছি আমি। জানি, নিজেকে বিশ্বাস করতে হবে।”
“বালটা তোমার। মাফিয়ার সদস্য ছিল খুন হয়ে যাওয়া দুইজনই। তাদের বিরুদ্ধে কেউ লেগেছিল এটা আমি বাজি ধরে বলতে পারি। তাদের পরিচয় হয়ত ডন রাবেকের অজানা নয়। সেজন্যই প্যাসিভ ক্রাইমের মাধ্যমে ডন রাবেকের কাছের কেউই হয়ত ব্যক্তিগত স্বার্থে সরিয়েছে তাদের। ব্যবহার করেছে তোকে। মেমরি কার্ডে বাগ বসিয়েছে। ছোট্ট কোন ভাইরাস হয়ত। তোর গার্লফ্রেন্ডের ব্যাগে সেঁধিয়েছে সেটা। তারপর তুই মোবাইলে ঢুকিয়েই দেখলি আর-বোট আর-বোট বলে চেঁচাচ্ছে সেটা। মেগান গোসলে গেল। বাথরুমেই উধাও হয়ে গেল সে। এটা কিভাবে করা হল, আমাকে বোঝা।”
“মডিউল যেখানে থাকে তার পঞ্চাশ ফিট রেডিয়াসে একটা উইন্ডো হয়ে যায়। দুই ওয়ার্ল্ডের মধ্যে ফিজিক্যাল ট্রান্সফার সম্ভব তখন। আমার ফোনে মডিউল অ্যাক্টিভেট করার সাথে সাথে বাথরুমের দরজাটাকে ট্রান্সফার করেছে ওখানকার সাব্বির। নাথিং এলস। দরজা খুলে বের হয়ে আমাকেই পেয়েছে সেখানে মেগান। সন্দেহ করেইনি। একইভাবে আবার মেগানকে ফিরিয়ে দেয় ওরা। আমার থেকে ল্যাম্পপোস্টটা মোটেও পঞ্চাশ ফিট দূরে ছিল না। তবে মানুষ আনা-নেওয়া করলে বহিত্বঃকের ক্ষতি হয়। রেডিয়েশনের মত। মেগানেরও হয়েছে। দুই মাস হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল ওকে।”
মাথা নাড়ল তামিম, “তুই একটা ইডিয়েট! মনিটর দেখার জন্য কাছে গেছিলি যখন, তোকে অটোসাজেশনে আটকে ফেলেছিল স্ক্রিন। তুই দেখেছিলি কারেন্ট চলে গেছে। আসলেই গেছিল বলে আমার বিশ্বাস। তবে মাঝে তোকে মিনিট দুয়েক মোহাবিষ্ট করে রেখেছিল স্ক্রিনের অটোসাজেশন। এটা পসিবল। হিপনোটিজমের কাছাকাছি একটা ব্যাপার। কিছু প্যাটার্ন কাজে লাগিয়ে চোখে ধাঁধা দিলে তুই এমনভাবে আবিষ্ট হয়ে যাবি, তোকে থাপ্পড় দিলেও নড়বি না। আমেরিকার ডিফেন্স সাইটে আছে এমন কিছু ডিজাইন। টেম্পরারি হিপনোটিজমও বলা হয় এটাকে। সাইকোলজির ব্যাপার এটা। সেজন্য আমাদের পড়তে হয়েছে এই প্রযুক্তি নিয়ে।”
“ফাইন। আমি নাহয় টেম্পরারি হিপনোটাইজড হলাম। প্যাসিভ ক্রাইম অনুযায়ী কেউ আমাকে হিপনোটাইজ করেছে নিজেদের সুবিধার্থে। তাই না? তারপর মেগানকে সরালো কি করে?”
“ইজি। বলেছিলি বাথরুমের দরজা না লাগিয়ে ঢুকেছিল মেগান। বয়ফ্রেন্ডের সাথে হোটেলে থাকলে কোন মেয়ে তালা লাগানোর ঝামেলাতে যায়ও না। এটা তাদেরও জানা থাকার কথা। আর প্রতিটা রুমেই ডুপ্লিকেট কী থাকে। কাজেই, অনায়াসে ডুপ্লিকেট কী দিয়ে তোর রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে ওরা। তারপর বাথরুমে ঢুকে মেগানের মুখে ক্লোরোফর্ম চেপে ধরে। একবার চেঁচিয়ে উঠেছিল মেয়েটা। তোর কানে এসেছিল সেটা। তবে মোহাবিষ্টতা কেটে যাওয়ার আগে ব্রেন কাজই করেনি। দুই মিনিট অনেক সময়। মেয়েটাকে অজ্ঞান করে আশেপাশের কোন ঘরে সরিয়ে ফেলেছিল তারা। তোর নাইটস্ট্যান্ডে রেখেছিল পিস্তল আর এক্সট্রা ম্যাগাজিন। তুই চটকা ভাঙ্গতেই দেখলি ফোন বাজছে। সেটা রিসিভ করে দেখা গেল কলার তোর নিজেরই কণ্ঠের কেউ। সে বলল মেগান নেই। তোকে যা বলবে তাই করতে হবে। পর পর এরকম ঘটনাপ্রবাহ অনেক শক্ত মনকেও নড়বড়ে করে দিবে। বাধ্য হলি তুই পিস্তল নিয়ে বের হতে। গলার স্বর নকল করা কোন ব্যাপার না। অসংখ্য সফটওয়ার আছে। তোকে নিয়ে কেউ ভালো মত স্টাডি করেছে এটা শিওর থাক। ভাল কথা, রুম সার্ভিসকে খুন করতে বলল কেন? এই লোকটা ওদের ইউনিভার্সের কে?”
“বাংলাদেশের স্বৈরাচারী সরকার প্রধান। একঢিলে তিন পাখি মারার মত গুরুÍ¡পূর্ণ কাজ ছিল এটা। আমাদের ইউনিভার্সের একই হোটেলে তিনজনকে পেয়ে গেছিল ওরা। আমার নিজেকে এই অ্যাসাইনমেন্টে পাঠানোর এই একটাই ব্যাখ্যা। মানে, ওই ইউনিভার্স থেকে। আর-বোটের জন্য এতটা গুরুÍ¡পূর্ণ মিশন আগে কখনও আসেনি।”
“বালের থিওরি না কপচায়ে আগে আমারটা শোন।” ক্ষেপে উঠল তামিম ইকবাল।
বাধা দিল সাব্বির। “দুই সেকেন্ড। আগে তোর থিওরি অনুযায়ী আমাকে বোঝা, মেগানকে যদি প্যারালাল ইউনিভার্সের থিওরি দিয়ে এই ভাবে বের করেও নেয়, টেম্পরারিলি হিপনোটিজমের প্রোগ্রাম তারা পেল কি করে?”
“এটাও ইজি। পোড়খাওয়া কোন হ্যাকারের কাজ। এটা টাকা দিয়েও পাওয়া যায়। মানে, টাকা দিয়ে হ্যাকার হায়ার করতে হবে জাস্ট। যা করার ওরাই করে দেবে।”
“গুড। তারপর, তোর থিওরিটা শেষ কর।” তামিককে উৎসাহই দিল সাব্বির।
“তুই গুলি করে দুনিয়া কাঁপিয়ে দিলি। উসাইন বোল্টের রেকর্ড ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে দৌড়ালি সামনের দিকে। গুলির শব্দ শুনেই মাফিয়া সদস্য রোজি যা বোঝার বুঝে নিয়েছিল। অস্ত্র নিয়ে করিডোরে বের হয়ে আসে সে। রোজি-ই যেহেতু তোকে নিয়ে খেলানো লোকটার টার্গেট, জীবন বিপন্ন হতে পারে এটুকু তার বোঝার কথা। কিন্তু অ্যামেচার মানুষ না চেনার মত নয় রোজি। তোকে আশা করেনি সে। মানে, তোর মত অ্যামেচার কাওকে। তবে তোর হাত দেখে পিস্তলের ব্যাপারটা টের পেয়ে যায় সে, শুট করে। জন্মের কপাল তোর, একটা বুলেট নিয়ে সরে পড়লি তুই। দ্বিতীয়জন অবস্থা খারাপ দেখে দ্রুত বের হয়ে দেখতে চেয়েছিল পরিস্থিতি। তাকে সে সুযোগ না দিয়ে গলাতে গুলি করেছিলি। তারপর ঢুকে গেছিলি লিফটে। কত অল্প সময় লেগেছিল বুঝতে পারছিস? প্রথম গুলিটা থেকে হিসেব করলে ষাট সেকেন্ডেরও কম সময়ে তিনটা মার্ডার করে লিফট বেয়ে লুকিয়ে বের হয়ে গেছিলি তুই।”
“সাবাশ শার্লক হোমস! এবার বল আমার প্রতিটা স্টেপ দেখতে পাচ্ছিল কিভাবে সে?”
“হোটেল আভাটিয়াতে প্রত্যেকের ঘরে ঘরে পর্যন্ত সিক্রেট ক্যামেরা আছে। তোর জানা নেই হয়ত। তবে ম্যাস মার্ডার কেসটার পর থেকে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সেরাতের একটা ভিডিও-ও পাওয়া যায়নি। সব ডিলেট করে দিয়েছিল কেউ।”
“কারেন্ট ছিল না। ভিডিও আসবে কোথা থেকে?”
“ইনফ্রারেড ক্যামেরা এগুলো। কারেন্ট গেলে ব্যাকআপে চলে। কোন উপায়ই নেই ফীড মিস করার। অথচ সব ডিলেটেড। মানে তো বুঝতে পারছিস? কেউ একজন সশরীরে অথবা, কাস্টম সার্ভার বানিয়ে দূর থেকে দেখছিল ওদের ক্যামেরাতে। নিয়ন্ত্রণ করছিল। তোর প্রত্যেক মুভমেন্টকে ফলো করা কঠিন কিছু না তেমন। বের হওয়ার পর তো আরও সহজ হয়ে গেল কাজটা। খোলা আকাশের নিচে যে কাওকে ফলো করা যায়।”
“বলতে চাইছিস, এই পক্ষটা আমাকে ক্যামেরাতে দেখে দেখে ডিরেকশন দিচ্ছিল? পুরো হোটেলের কারেন্ট চলে যাওয়ার পেছনেও আছে এদের হাত?”
“অবশ্যই।”
“তাহলে কিভাবে মেগানকে আমার পঞ্চাশ ফিটের মধ্যেই ছেড়ে দিল ওরা? মেগান কিছু মনে রাখতে পারল না কেন?”
“সাম কাইন্ড অফ সাজেশন অবশ্যই। আর একটা গাড়িতে করে এনে রাস্তার পাশে নামিয়ে দেওয়া কঠিন কিছু না। কেউ লক্ষ্য করবে না সেটা। ইভেন তুইও না। রাস্তার অন্যপাশে যদি নামিয়ে দেয়, গাড়িটার আড়ালেই ঢাকা পড়ে যাবে তোর দৃষ্টি। এমন হতে পারে, তোর সাথে ফোনে যে ছিল সে ওই গাড়িতে বসেই কথা বলছিল। গাড়িটা যখন ওখান থেকে সরে যাচ্ছে, জানত ঠিক কোথায় আছিস তুই, কখন ডানে তাকাতে হবে তোকে। একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে নির্দেশ দিয়েছে তোকে ডানে তাকাতে। তুই নিশ্চয় মেগানকে রেখে সামনের দিকে ছুটতে থাকা রাস্তার কোন গাড়ির দিকে নজর দিবি না। তোর পুরো মনোযোগ পাবে মেয়েটা। এই সুযোগই নিয়েছে সে।”
কোমর থেকে একটা পিস্তল বের করে তামিমের সামনে রাখল সাব্বির। নাক-বোঁচা, জঘন্য চেহারার একটা পিস্তল। এক নজর দেখেই যে কেউ বলে দেবে দশ হাজার টাকার বেশি হবে না এটার দাম। অসম্ভব সস্তা।
“এই ফকিরা পিস্তলটা দিয়েছিল তোকে প্যারালাল ইউনিভার্সের সাব্বির?” এবার হেসেই ফেলল তামিম, “কাম অন, ওরা হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছে। তোর জন্য ছুরি রেখে দিতে পারে, পিস্তল রেখে দিতে পারে, আর একটা ভালো মানের পিস্তল দিতে পারল না? এই অস্ত্রটার দাম তো মনে হয় সাত হাজার টাকাও না।”
“ইউজার ফ্রেন্ডলি এটা। প্রথমবার পিস্তল চালিয়েছি, মনে পড়ে?” ক্লান্তভঙ্গিতে হেলান দিল সাব্বির, “তোর কাছে এসবই প্যাসিভ ক্রাইম বলে মনে হচ্ছে?”
“নিশ্চয়। তোর কয়েকটা দিন নিশ্চয় খুব রাফ গেছে? মনের ওপর প্রচুর চাপ ফেলার কথা এসব ঘটনাপ্রবাহ। সাইকোলজিকাল ট্রমাকে এদেশের লোকজন গুরুÍ¡ দেয় না। এটা একটা অশিক্ষা। ফিজিকাল ট্রমা, যেমন ইঞ্জুরির মতই গুরুÍ¡পূর্ণ একটা ইস্যু হওয়া উচিত সাইকোলজিকাল ট্রমা। তোর আসলে এখন হেল্প দরকার। আমার সাথে থেরাপি সেশন শুরু করতে পারিস।”
“আমি পাগল না।”
“আমি বলিনি যে তুই পাগল। বলেছি, তোর সাথে খেলেছে ওরা। তোর মনকে বিভ্রান্ত করেছে। এ থেকে বের হওয়ার জন্য প্রফেশনাল হেল্প দরকার। আমি সেটা দিতে পারব। কেউ জানবে না, স¤পূর্ণ গোপন থাকবে ব্যাপারটা। আর তোর থেকে টাকাও আমি নেব না। জাস্ট আমার থেকে থেরাপি নে।”
“আমি এখন যাবো।” পিস্তলটা টেবিল থেকে তুলে নিতে নিতে বলল সাব্বির।
“শুধু তোর গল্পটা বলতেই এসেছিস আমাকে? আমার মতামত শুনতে এসেছিলি এখানে তুই, রাইট?” উঠে দাঁড়াল তামিম, “প্যাসিভ ক্রাইম থিওরিতে বিশ্বাস করে থাকলে তোর উচিত ঋতুকে খুঁজে বের করে চেপে ধরা।”
“আমি প্যাসিভ ক্রাইম থিওরি শোনার জন্য তোর কাছে আসিনি। অনেকদিন কথা হয় না, তাই এসেছিলাম।”
সাব্বিরের ঠা-া চোখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল তামিম। ধীরে ধীরে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল তার কাছে। ধপ করে আবারও বসে পড়ল চেয়ারে। হঠাৎ যেন বয়েস বেড়ে গেছে দশ বছর।
“প্যারালাল ইউনিভার্সে আমি কি ভূমিকা পালন করছি বলে তোকে বলা হয়েছে?”
পিস্তলটা আলগোছে ধরে আছে সাব্বির। তামিমের দিকে তাক করেনি। “সুইসাইড বম্বার। আজ রাতেই অ্যাটাক করতে যাচ্ছিস পিলখানা সিটিতে। আমাদের বসুন্ধরা সিটির নাম ওখানে এটাই। তোর হোয়্যারঅ্যাবাউটস জানে না ওদের কেউ। তবে ইনসাইড সোর্স এতটুকু বের করতে পেরেছে, আজকের বম্বার তুই।”
“তোর কথা সত্য হলে, আমার বেঁচে থাকা শত মানুষের মৃত্যুর কারণ হবে?”
“হাজার। পুরো বিল্ডিংটা উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে তোদের। টেররিজম খুব ভয়ঙ্কর একটি বিষয়। যত উন্নত বিশ্ব, ততই ভয়ঙ্করভাবে ছড়িয়ে পড়ে এটা। আমেরিকাতে টেররিস্ট অ্যাটাক বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। আমাদের ওয়ার্ল্ডের চেয়ে ওদের ওয়ার্ল্ডে অ্যাটাক একারণেই বেশি হয়।”
“আমাকে যেতে হবে সেজন্য।” মন্তব্য করার ভঙ্গিতে বলল তামিম।
“ইয়েপ। সরি, দোস্ত। তোর সাথে পার্সোনাল কোন সমস্যা আমার নেই। ভাবছিস, এতক্ষণ কেন কথা বললাম? এটাই আমাদের শেষবার দেখা হওয়া। অনেকদিন কথা হয়নি তোর সাথে, দিনগুলো মিস করছিলাম।”
সাব্বিরের পিস্তল ধরা হাতটা উঠে যাচ্ছিল, হঠাৎ নড়ে উঠল তামিম। এক লাথিতে সামনের ডেস্কটা উল্টে দিয়েছে। তারপর ছুটতে শুরু করেছে জানালার দিকে। গ্রিল নেই ওখানে। নিজের অফিসের জানালা বন্ধনমুক্ত হবে এমনটা চেয়েছিল সে। এজন্য জানালা গরাদবিহীন। তিন তলা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়লে বেঁচে যাওয়ার একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা থেকে যায়। ঠিক নিচেই এক হকার ছাউনি ফেলে বসত না? তাতে লাফিয়ে পড়লে উচ্চতা কমে আসবে বিশ ফিটে। কোনভাবে বেঁচে যেতেই পারে তামিম!
মনোবিজ্ঞানী তামিম ইকবালের জীবনের ওটাই ছিল শেষ চিন্তা। জানালার কাছে শরীরটা পৌঁছানোর আগেই হাত তুলেছে সাব্বির। দুইবার গুলির শব্দ হয়েছে শুধু ঘরে। হুড়মুড় করে জানালার সামনেই পড়ে গেল ছোটবেলার বন্ধু। মেঝেতে রক্ত ছড়িয়ে যাচ্ছে ধীরে-ধীরে।
দেহটার কাছে এসে দাঁড়াল সাব্বির। হাতের আঙুল সামান্য নড়ছে এখন শরীরটার। কানের একটু নিচ দিয়ে একটা গুলি ঢুকেছে। পাশ থেকে। বুলেটগুলো হলোপয়েন্ট নয়। ডানহাতের আঙুল দুটো নড়ছে এখনও। প্যারালাল ওয়ার্ল্ডের সুইসাইড বম্বারের জন্য এটা বোলতার কামড়ও হতে পারে। কারণ, বেঁচে আছে তামিম। ভরের নিত্যতার সূত্র মেনে ওপাশের তামিমও বেঁচে থাকবে।
শরীরটা থেকে মাত্র ছয় ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়ে আরও দুইবার গুলি করল সাব্বির।
পরিশিষ্ট
কোন তাড়াহুড়ো নেই। ঠা-া একটা ভঙ্গিতে এসে গাড়িতে ঢুকল সাব্বির। ড্রাইভিং সীটে বসে ছিল মেগান। সাব্বির উঠে বসতেই ওর দিকে এগিয়ে এসে চুমু খেল মেয়েটা। সে রাতের পর থেকে এই কাজে একসাথেই আছে ওরা। গাড়ি ছেড়ে দিল মেগান।
“ঠিকমত শেষ হয়েছে সব কিছু?” জানতে চাইল সে।
“হুঁ।”
“তোমাকে বিষণ্ণ মনে হচ্ছে।”
“হওয়াটা স্বাভাবিক না? তামিম আমার পুরোনো বন্ধু ছিল।”
“ওটা ছাড়াও আর কিছু ভাবাচ্ছে তোমাকে।” পাশ ফিরে তাকাল মেগান, “মন থেকে বের করে দাও তো। খুলে বল আমাকে। অযথা ভেতরে জমিয়ে রাখার কিছু নাই। পর না আমি তোমার।”
একটা সিগারেট ধরিয়েছে সাব্বির। জোরে জোরে টানছে শলাকাটা। তীব্র কটু গন্ধে ভরে গেছে গাড়ির ভেতরটা।
“ওই ইউনিভার্সের সাব্বির আমাকে ভাবাচ্ছে।”
এক হাতে স্টিয়ারিং হুইল ধরে গাল চুলকালো মেগান। “কেমন ভাবাচ্ছে?”
“আমি খুব একটা নীতিবাদী মানুষ না। তোমাকে সবকিছু খুলে বলেছি। ছোটতেও অন্যায় করেছি আমি। আমার বাবার চরিত্রও খুব একটা সুবিধের না। আমার মনে হয়, ভবিষ্যতেও অন্যায় করতে পারি আমি। এই নেশাটা খুবই খারাপ। দুর্নীতির নেশা। আমার মধ্যে আছে বিষয়টা। এর অর্থ, ওই প্যারালালের সাব্বিরকেও ধরতে পারে সেটা।”
“তুমি এখন আগের মত নেই, সাব্বির। নিজেকে ন্যায়ের সৈনিক ভেবেই কাজগুলো করছ। এটা অবশ্যই তোমার ভালো একটা গুণ। আমি বলব, আগে যাই থেকে থাকো না কেন, দিন দিন ইম্প্রুভ হচ্ছে তোমার। ওই জগতের সাব্বিরের ক্ষেত্রেও হয়েছে নিশ্চয়?”
“তাও। ধরা যাক, ওই ইউনিভার্সের সাব্বিরকে দুর্নীতি গ্রাস করে নিল। তাহলে কি দাঁড়াবে ব্যাপারটা বুঝতে পারছ তো? নিজের মন মত টার্গেট দেবে সে। মনগড়া কাহিনী বানিয়ে শোনাবে। আমি সেটাই বিশ্বাস করব। পরীক্ষা করে দেখার তো উপায় নেই আমার। তার কথামত খুন করব মানুষগুলোকে। এই ফাঁকে নিজের আখের গোছাবে ওই ইউনিভার্সের সাব্বির।”
“সেটা যে হবেই, তা তুমি জানো না।” নরম কণ্ঠে বলল মেগান, “অযথা প্যারানয়েডের মত আচরণ করছ। একজন আর-বোটের দায়িত্ব এত সহজ না। চারিত্রিক গুণ না থাকলে তাকে আর-বোট বানানো হত না।”
“সেটাও আমি নিশ্চিত করে জানি না।”
ওর কাঁধে আলতো ঘুষি মারল মেগান। “বাদ দাও। যখনকারটা তখন দেখা যাবে। এখন কোথায় যাচ্ছি আমরা? লাঞ্চ করবে না? সামনে একটা কেএফসি আছে।”
বাইরের দিকে তাকাল সাব্বির। আরেকটা ভয়ঙ্কর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে হঠাৎ করেই। মেগানকে বলল, “মগবাজার চলো।”
“মগবাজার?”
“ঋতুরা থাকে ওখানে। মেয়েটার সাথে কথা আছে আমার।”
অবাক হলেও আর কোন প্রশ্ন করল না মেগান। এই ছেলেটাকে বিশ্বাস করে সে। তার যে কোন কথা বিনা প্রশ্নে মেনে নিতে মেগানের আপত্তি নেই।
(সমাপ্ত)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now