বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
কুয়াশার কারনে দশহাত দূরের জিনিসটাও দেখা যাচ্ছেনা। চুলার উপর থেকে নামানো সদ্য গরম চায়ের কাপে ফুঁ না দিয়েই চা শেষ করে দেয়া যায় এমন শীত। বাইরে বেরুলে শীতের কারনে হাত পা যেন অসাড় হতে শুরু করে।
শিখা ছোট বাচ্চাদের মতো হাত পা জড়ো করে শুয়ে আছে। ঘুমে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে কিন্তু ঘুমানো নিষেধ। ঘুম তাড়ানোর জন্য বিছানার পাশের জানালাটা খুলে রেখেছে কিন্তু তাতেও কাজ হচ্ছেনা। চোখের পাতা খুলে রাখাই দায়।
.
ঘুম তাড়ানোর জন্য শিখা ছোটবেলার স্মৃতিচারন করে। এরকম শীতে বাসায় পিঠা বানানো হতো, রাত জেগে সবাই চাল গুড়ো করতো আর গীত গাইতো। খড়ের গাদা দিয়ে আগুন জ্বালানো হতো, বয়স্ক আর ছোটরা সবাই আগুনের চারপাশে পিড়ি পেতে বসতো। ঘুমে চোখ ঢুলুঢুলু করতো কিন্তু কেউ ঘুমাতোনা। আনন্দের একটা উৎসব চলতো। ভোরের আলো ফোটার আগেই গরম গরম পিঠা বানানো হতো।
আহা কি সুন্দর দিন ছিলো,
শিখার মায়ের কথা খুব করে মনে পড়ে, লম্বাটে ফর্সা মুখ, মাথার চুল কোমড় ছাড়িয়ে, টানাটানা চোখ। শীতের রাতে শিখাকে নিজের বুকে করে রাখতেন, খাওয়ানোর জন্য সারাবাড়ি পেছন পেছন ঘুরতেন।
.
মা শব্দটা শিখার কাছে যতোটা না প্রিয় ততোটাই ভয়ের।
শিখার বয়স যখন আট তখন মা মারা গেলেন অসুখে। মাস না পেরুতেই বাবা নতুন মা নিয়ে আসলেন। নতুন মা কেন যেন শিখাকে সহ্য করতে পারতেন না। খাওয়ার কষ্ট দিতেন, গায়ে হাত তুলতেন, বাসার কাজ করাতেন।
.
নাহ্ শিখার এসব ভাবতে ইচ্ছে করছেনা। অন্যকিছু ভাবতে হবে। শিখা সবসময় ভাবতো কেউ একজন আসবে তাকে এই কষ্টের সংসার থেকে নিয়ে যাবে। সেই একজনের কথা ভেবে শিখা কতো রাত যে নির্ঘুম কাটিয়েছে। সেই একজনের সাথে সুখের সংসার হবে শিখার। যে তাকে অনেক ভালোবাসবে। যে খুব সকালে উঠার সময় হাতটা ধরে বলবে এখন উঠতে হবে বাইরে খুব শীত আরো কিছুক্ষন ঘুমাও। রান্নায় লবন বেশি হলে বলবে, তেমন বেশি হয়নি সমান্য বেশি হয়েছি, খেতে তো খারাপ লাগছেনা। খেতে বসলে এক লোকমা মুখের সামনে নিয়ে বলবে, নাও খাও। যার সাথে রাত জেগে ফিসফিস করে গল্প করবে। অসুখের সময় যে মাথাটা বুকে নিয়ে বলবে, ধূর পাগলি কিচ্ছু হবেনা আমি আছি তো।
.
দরজার মধ্যে খটখট শব্দ শুনে শিখা ধড়মড় করে বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলে দিলো। সাদেকের শরির থেকে সেই চেনা গন্ধটা আসছে। সাদেক সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বললোঃ
.
--ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি, দরজা খুলতে এতো সময় লাগে। আর জানালা খুলে রেখেছো কেন, ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে ঘরে। কান্ডজ্ঞান কবে যে হবে তোমার। রান্নাঘরে গিয়ে মাছটা ভেজে নিয়ে আসো তো।
.
সাদেক বিছানায় বসে টিভিটা অন করে হিন্দি গান ছেড়ে দিলো। শিখা রান্না ঘরে মাছ কাটছে, তার বুকটা দুরুদুরু করছে। মানুষটাকে বড্ড ভয় পায় সে। মানুষটার মেজাজ বুঝা দায়, একটুতে রেগে যায়। সাদেক খেতে বসেছে।
.
--তুমি খাবেনা।
.
-না।
.
সাদেক আর কোন প্রশ্ন করলোনা, কেন খাবেনা, বা খেয়েছে কি না। শিখার শরিরটা আজ বেশ খারাপ। জ্বর এসেছে মনে হচ্ছে। খাওয়া শেষে সাদেক বিছানায় বসে সিগারেট ধরালো। শিখা কুন্ডুলি পাকিয়ে শুয়ে আছে। সাদেক বললোঃ
.
--ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?
.
শিখা চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর ভান করছে। সাদেক শিখার কোমড়ে হাত রাখা মাত্র শিখার পুরো শরির যেন শিহরে উঠলো। তারপর শিখার প্রতিটা মুহূর্ত যেন মহাকাল মনে হতে লাগলো। মানুষটা এখন পাশে ঘুমাচ্ছে। শিখার মনে বারবার একটা প্রশ্ন আসছে,
আচ্ছা মানুষটা কি বুঝতে পারেনি যে তার আজ শরির খারাপ। নাকি বুঝেও বুঝতে চায়নি।
এটাই কি জীবন?
মানিয়ে নেয়ার মানেই কি জীবন?
.
বেশ কিছুদিন যাবদ শিখার মন খুব বেশি ভালো। সকালে গোসলের পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাজগোজ করে। তারপর বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। জামিলের সাথে রোজ দেখা হয় তার। জামিল শিখার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। শিখাকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছিলো কিন্তু শিখার সৎ মা না করে দিয়েছে। ছেলে খুবই গরিব পরিবারের, পড়ালেখা করেছে কিন্তু বেকার। এমন অযোগ্য ছেলের কাছে মেয়ে বিয়ে দেয়া মানে মেয়েকে জলে ভাসিয়ে দেয়া। তারচেয়ে সাদেক অনেক ভালো। বয়স একটু বেশি কিন্তু বাজারে দোকান আছে, চার রুমের পাকা ঘর দিয়েছে, জমিজমাও আছে। মেয়ে সেখানে রাজরানি হবে।
.
ভালো থাকার জন্য অর্থের প্রয়োজনকে অস্বীকার করার ক্ষমতা করো নেই। ভালো থাকতে টাকা লাগবেই, যদি একমত হও তবে তুমি বাস্তববাদি যদি একমত না হও তবে তুমি দুনিয়া দেখোনি।
.
কিন্তু একটা মেয়ের সুখে থাকার জন্য কি শুধু প্রতিষ্ঠিত বা টাকাওয়ালা স্বামী প্রয়োজন?
নাকি এমন একজন মানুষ প্রয়োজন যে তাকে বুঝবে, তাকে সন্মান করবে, ভালোবাসবে। তাকে ভোগ করার মাংসপিন্ড না ভেবে মানুষ ভাববে। তার ইচ্ছা অনিচ্ছা ভালোলাগাকে প্রধান্য দিবে।
অন্যরা কি চায় শিখা তো এমন একজন মানুষকে চেয়েছিলো।
.
জামিল রোজ অফিস যাওয়ার সময় শিখার বাসার সামনে দিয়ে যায়, এই রাস্তা দিয়ে গেলে অধঘন্টা বেশি সময় লাগে কিন্তু জামিল এদিক দিয়েই যায় শুধুমাত্র শিখাকে দেখার জন্য। চার বছর পেড়িয়েছি জামিল এখনো শিখাকে ভুলতে পারেনি। নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে স্বচ্ছল হয়েছে কিন্তু শিখার অভাবটা পূরণ হয়নি। ভালোবাসার অভাব কি অন্যকিছু দিয়ে পূরণ হয়?
.
সেদিন বিকেলে ফেরার পথে শিখার বাসার সামনে থমকে দাঁড়ায় জামিল। তার পা যেন সামনে যেতে পারছেনা, রাগে হাত কাঁপছে। শিখার বাসা থেকে শিখার কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। জামিলের ইচ্ছে করছে ছুটে যেতে কিন্তু অদৃশ্য এক শেকলে তার পা বাঁধা। জামিলের চোখ বেয়ে কয়েকফোঁটা পানি ঝড়ে পড়লো।
.
শিখা দুদিন ধরে বারান্দায় আসছেনা, মারের কারনে চোখের নিচে কালচে দাগ পড়েছে। শিখা জামিলের সামনে এভাবে যেতে পারবেনা। শিখা জানে জামিল অনেক কষ্ট পাবে। বিয়ের আগে একবার হাত পুড়ে গেছে শুনে জামিল বাসা এসে উপস্থিত হয়েছিলো। মা তাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছিলো। শিখা জানালা দিয়ে মানুষটার মুখটা দেখেছিলো। একটা মেয়ে পুরুষের চোখ দেখে ভালোবাসা পরিমাপ করতে পারে।
.
শিখা আঙিনায় ভেজা কাপড় শুকাতে দিচ্ছিলো। পেছন ফিরে দেখে জামিল দাঁড়িয়ে আছে। তাড়াতাড়ি মাথায় কাপড় দিলো সে।
.
-আপনি এখানে।
.
--কেমন আছো শিখা?
.
-আপনি চলে যান কেউ দেখলে সমস্যা হবে।
.
--তুমি সুখে আছো শিখা।
.
-দেখুন আপনি যান।
.
-তুমি যাবে আমার সাথে?
.
--আমি একজনের স্ত্রী। আর আপনার সাথে আমি যাবো কেন? কে হন আপনি আমার?
.
-নিজেকে জিজ্ঞাসা করো উত্তর পেয়ে যাবে। শিখা তুমি যদি সুখে থাকতে তবে কখনো তোমার চোখের সামনে আসতাম না। কিন্তু তুমি সুখে নেই, তোমাকে এই নরকে আমি থাকতে দিবোনা। চলো আমরা পালিয়ে যাই।
.
-এটা অন্যায়, পাপ। সমাজ মেনে নিবেনা। তা হয়না, আপনি চলে যান।
.
--তুমি যখন নিরবে চোখের জল ফেলো তখন সমাজ কোথায় থাকে?
.
-আমি কোন কথা বলতে চাইনা, আপনি যান।
.
শিখা ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো।
.
গভীর রাত,
সাদেক শিখার পায়ের উপর পা তুলে কোমড়ে হাত রেখে ঘুমাচ্ছে। শিখার গা ঘিনঘিন করছে। শেষ রাতে প্রচন্ড শীতে শিখা গোসল করে নতুন শাড়ি পড়লো। ঠান্ডায় শরির কাঁপছে। শিখা বাসার গেট খুলে বেড়িয়ে পড়লো। জীবনে মানিয়ে নেয়া অনেক হয়েছে, আর নয়। অপ্রাপ্তি, দুঃখ, কষ্টের সাথে মানিয়ে নিলে প্রাপ্তি, সুখ, আনন্দ ধরা দিতে চায়না। জীবনে মাঝে মাঝে বড় সিদ্ধান্ত নিতে হয় সমাজ কি বলবে তা না ভেবেই।
সমাজ যদি বলে পরকিয়া অপরাধ তবে সে অপরাধে সমাজ অপরাধি। মাঝে মাঝে অসুস্থ্য সম্পর্কগুলোর মৃত্যুই শ্রেয়।
.
শিখা জামিলের হাত ধরে বহুদূর চলে যাবে, যেখানে কেউ তাদের চিনবেনা। নতুন করে শুরু করবে সবকিছু। জীবন যখন সুখ দিতে এতোই কৃপণতা করে তখন তার থেকে সুখ চুরি করে নেয়া অন্যায় হতে পারেনা।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now