বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

কেপলার টুটুবি {2}

"সাইন্স ফিকশন" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান ☠Sajib Babu⚠ (০ পয়েন্ট)

X 》》মুহম্মদ জাফর ইকবাল《《 তোমার নাম কী? টুরান। টুরান, তুমি মাত্র বাইশ বছরের একজন যুবক। তুমি কেন পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশের অনিশ্চিত জীবনে ঝাঁপ দিতে চাও? তুমি কোথায় বসতি স্থাপন করবে কিংবা আদৌ কোথাও বসতি স্থাপন করতে পারবে কী না সেটি কেউ জানে না। তুমি কেন এই প্রশ্ন করছ? টুরান, এখানে প্রশ্ন করব আমি, তুমি উত্তর দেবে। তুমি প্রশ্ন করতে পারবে। বল, তুমি কেন পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে চাইছ? তুমি যে উত্তর শুনলে খুশি হবে সেটি দেব নাকি সত্যি উত্তর দেব? (হাসি) প্রথমে আমাকে খুশি করার জন্যে উত্তরটি দাও। খুব শৈশব থেকে আমার মহাকাশ নিয়ে কৌতূহল। জন্মের পর থেকে আমার স্বপ্ন ছিল মহাকাশচারী হওয়ার। আমি সেভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছি। আমি নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে ঘুরে বেড়াতে চাই। আমি অজানাকে জানতে চাই। চমৎকার টুরান। এবারে সত্যি কারণটি বল। এই পৃথিবী নিয়ে আমার ঘেন্না ধরে গেছে। আমি এই দূষিত গ্রহ থেকে পালাতে চাই। কেন? আমার সম্পর্কে সব তথ্য তোমার কাছে আছে। তুমি জান। টুরান। তোমাকে আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। বল, কেন? তোমরা নিশ্চয়ই আমার সম্পর্কে সব তথ্য জান। কেন আমার কাছে আবার জানতে চাইছ? আমি তোমাকে বলেছি তুমি প্রশ্ন দিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না। বল। কেন? আমার ভালোবাসার মেয়েটি আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। একটা মেয়ের জন্যে তুমি আস্ত পৃথিবীটাকে পরিত্যাগ করতে চাইছ। হ্যাঁ। তোমার নাম কী মেয়ে? ইহিতা। সুন্দর, একটি নাম। ইহিতা। তুমিও খুব ভালো করে জান আমিও খুব ভালো করে জানি এটি মোটেও সুন্দর একটি নাম নয়। কাজেই কাজের কথায় চলে আসি। ঠিক আছে ইহিতা। তুমি কেন পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশের একটা অনিশ্চিত যাত্রায় যেতে চাইছ? এটি মোটেও অনিশ্চিত যাত্রা নয়। পৃথিবী থেকে যখন একটা মহাকাশযান মহাকাশে পাড়ি দেয় সেটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট যাত্রা। এর প্রতিটি মুহূর্ত অসংখ্যবার সঠিকভাবে যাচাই করে দেখা হয়। সেটি সত্যি ইহিতা। কিন্তু তুমি জান এর গন্তব্য অনিশ্চিত। এটি যেখানে যাবে সেখানে পৃথিবীর মানুষ আগে কখনো যায় নি। বলতে পার সেটি আমার মূল আকর্ষণ। কেন? গত কিছুদিনে আমার জীবনের খুব কষ্টের সময় গিয়েছে। আমি সেগুলো ভুলে থাকতে চাই কিন্তু ভুলে থাকতে পারি না। সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পরিবেশে গেলে হয়তো ভুলে থাকতে পারব। স্মৃতি ভুলে থাকা কোনো কঠিন কিছু নয়। নিউরন থেকে স্মৃতি মুছে দিলেই হয়। আমি মানুষ। আমি রবোমানব নই যে নিউরনের স্মৃতি পুনর্বিন্যাস করব। তুমি কষ্ট করবে? মানুষ হলেই কষ্ট পেতে হয়। কষ্ট করতে হয়। চেষ্টা করতে হয় কষ্টকে ভুলে থাকতে। তোমার কষ্টের কথাটা কী বলবে? আমার ভালোবাসার মানুষটি একটি দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আমরা বিয়ে করার দিন ঠিক করেছিলাম। আমি দুঃখিত ইহিতা। শুনে আমি খুব দুঃখ পেলাম। শুনে তুমি আসলে খুব দুঃখ পাও নি। এটি ভদ্রতার কথা। তুমি কেন বলছ শুনে আমি দুঃখ পাই নি? কারণ নেটওয়ার্কে আমার সব তথ্য আছে। তুমি আমার সম্পর্কে সবকিছু জান। তুমি কেন আমার সাথে কথা বলছ আমি সেটাও বুঝতে পারছি না। এটি নিয়ম। আমাদের প্রত্যেকের সাথে কথা বলতে হয়। তোমার নাম কী? টর। টর, তুমি কেন পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশের অনিশ্চিত জীবন বেছে নিতে চাইছ? আমার বয়স চল্লিশ। আমি পৃথিবীর জীবন মোটামুটি দেখেছি। জীবনটা আমার কাছে একঘেয়ে মনে হচ্ছে। আমি নতুন কিছু চাই, নতুন উত্তেজনা চাই। তোমার পরিরার? আমার পরিরার নেই। আমার স্ত্রী আমাকে ছেড়ে চলে গেছে অনেকদিন আগে। টর, মহাকাশযান যদি তোমার একঘেয়ে মনে হয়? সে আশংকাটুকু আছে। কিন্তু আমি সেখানেও উত্তেজনা খুঁজে নিতে পারব। তাহলে পৃথিবীতে উত্তেজনা কেন খুঁজে নিচ্ছ না টর? চেষ্টা করেছি। আমাকে দেবার মতো উত্তেজনা পৃথিবীতে নেই। তুমি কি মনে কর পৃথিবী থেকে মহাকাশে অভিযান করার জন্যে যে বিশাল মহাকাশযানটি প্রস্তুত করা হয়েছে সেটি শুধুমাত্র তোমাকে উত্তেজনা দেবার জন্যে? না। কিন্তু আমি যদি উত্তেজনা পাই ক্ষতি কী? উত্তেজনার খোঁজে তুমি যদি দায়িত্বহীন হয়ে যাও? উল্টোটাও তো হতে পারে। উল্টো কি হতে পারে টর? মহাকাশযানের ভয়ংকর কোনো বিপর্যয়ে অন্য সবাই যখন পিছিয়ে যাবে তখন ভয়ংকর ঝুঁকি নিয়ে আমি এগিয়ে যাব। সবাইকে রক্ষা করব। তুমি এটা বিশ্বাস কর, টর? হ্যাঁ, বিশ্বাস করি। আমার ধারণা তুমিও বিশ্বাস কর। তুমি কেন এ কথা বলছ? কারণ নেটওয়ার্কে আমার সব তথ্য আছে। তুমি নিশ্চয়ই আমার সবকিছু জান। আমি যেগুলো জানি না তুমি সেগুলোও জান। আমি কী ঠিক বলেছি? হ্যাঁ তুমি ঠিক বলেছ। তোমার নাম কী? নুট। তোমার বয়স কত? আঠারো। তোমার বয়স মাত্র আঠারো। তুমি কেন পৃথিবীর নিরাপদ জীবন ছেড়ে মহাকাশের অনিশ্চিত জীবন বেছে নিতে চাইছ? মহাকাশ নিয়ে আমার একটি আকর্ষণ আছে। সেটাই কী একমাত্র কারণ? হ্যাঁ। সেটাই একমাত্র কারণ। নুট। বল। আমি যদি বলি সেটা একমাত্র কারণ না। (নিরুত্তর) নুট। বল। আমার কথার উত্তর দাও। তুমি নিশ্চয়ই জান আমাদের নেটওয়ার্কে তোমার সব তথ্য আছে? তুমি মাত্র আঠারো বছরের একজন তরুণ। কিন্তু এর মাঝে তুমি তোমার ঘরে ভয়ংকর ভিরবিয়াস ড্রাগ তৈরি করে বিক্রি করার চেষ্টা করেছ। পৃথিবীতে থাকলে তোমাকে দীর্ঘ সময় শুদ্ধকরণ প্রতিষ্ঠানে কাটাতে হবে। সেজন্যে তুমি মহাকাশে পালিয়ে যেতে চাইছ। (নিরুত্তর) আমার কথার উত্তর দাও নুট। (নিরুত্তর) নুট। বল। আমার কথার উত্তর দাও। (নিরুত্তর) তোমার নাম কী? আমার নাম নীহা। নীহা, তোমার বয়স কত? ষোল। নীহা। বল। নীহা, তুমি মাত্র ষোল বছরের একটি মেয়ে। তুমি কেন পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে চাইছ? আমি তোমার প্রশ্নটি ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি পৃথিবীতে থাকি আর মহাকাশযানে থাকি আর বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অন্য কোনো গ্রহতেই থাকি, এর মাঝে পার্থক্য কী? কোনো পার্থক্য নেই? না। কেন নেই, নীহা? আমি গণিত ছাড়া আর কোনো কিছু বুঝি না। আমি প্রতিমুহূর্তে আমার মস্তিষ্কে গণিতের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করি। আমি যখন তোমার সাথে কথা বলছি তখন গণিত নিয়ে চিন্তা করতে করতে কথা বলছি। সত্যি কথা বলতে কী আমি রূপাকভ সমীকরণ নিয়ে চিন্তা করছিলাম। এই মাত্র তার একটি সমাধান পেয়ে গেছি। তোমাকে অভিনন্দন নীহা। এটি মোটেও অভিনন্দন পাওয়ার মতো কাজ নয়। খুবই সহজ কাজ। নীহা। তুমি কিন্তু এখনো আমার প্রশ্নের উত্তর দাও নি। কেন পৃথিবী আর মহাকাশযানে কিংবা অন্য কোনো গ্রহে থাকা একই ব্যাপার? তার কারণ আমার চারপাশে কী আছে তাতে আমার কিছু আসে যায় না। আমার প্রয়োজন ছোট একটা ডেস্ক, ভাবনা করার জন্য নিরিবিলি একটু জায়গা। পৃথিবীর কী নিরবিলি জায়গা নেই নীহা? আছে। তাহলে কেন মহাকাশযানের অনিশ্চিত জীবন বেছে নিতে চাইছ? তার কারণ পৃথিবীতে থাকলে আমার চারপাশের সমাজ আমাকে সুনির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব পালন করতে বলবে। আমাকে নিরিবিলি বসে থাকতে দিবে না। মহাকাশযানে তোমাকে নিরিবিলি বসে থাকতে দেবে? দেবে। সেখানে মানুষের কোনো দায়িত্ব নেই। মহাকাশযান চালানোর জন্যে শক্তিশালী কম্পিউটার থাকে। তাছাড়া– তাছাড়া কী, নীহা? মহাকাশযানে ওঠার পর আমাদের শীতল ঘরে দীর্ঘদিনের জন্যে ঘুম পাড়িয়ে দেবে। আমার এই ব্যাপারটা নিয়ে আগ্রহ আছে। কী ধরনের আগ্রহ? তাপমাত্রা কমিয়ে শরীরের সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল করে রাখলেও মস্তিষ্কের কোনো একটি ধাপ সচল থাকে বলে আমার ধারণা। আমি দীর্ঘ যাত্রায় মস্তিষ্কের সেই সচল অংশটুকু ব্যবহার করে দেখতে চাই। নীহা। বল। তুমি কী জান তুমি খুব অদ্ভুত একটি মেয়ে। (নিরুত্তর) নীহা। বল। তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। এটি আরেকটি কারণ। কোনটি আরেকটি কারণ নীহা? জন্মের পর থেকে আমি শুনে আসছি যে আমি অদ্ভুত একটি মেয়ে। তাই আমি এমন একটা জায়গায় যেতে চাই সেখানে পৃথিবীর কেউ নেই। কেউ যেন আমাকে না বলে আমি অদ্ভুত একটি মেয়ে। নীহা। বল। আমার ধারণা বহুদূর কোনো গ্রহেও তোমাকে বলা হবে তুমি অদ্ভুত একটি মেয়ে। (নিরুত্তর) তুমি কী তবুও মহাকাশযান করে যেতে চাও? হ্যাঁ। যেতে চাই। তোমার নাম কী? আমার নাম সুহা। তোমার সাথে যে শিশুটি আছে তার নাম কী? ক্লদ। সে তোমার কী হয়? ক্লদ আমার ছেলে। আমি তার মা। সুহা, তোমার বয়স কতো? আমার বয়স ছাব্বিশ। ক্লদের বয়স কত? চার। তুমি তোমার চার বছরের সন্তানকে নিয়ে মহাকাশযানে করে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতে রওনা দিতে চাও? আমি ব্যাপারটি সেভাবে দেখছি না। তুমি ব্যাপারটি কীভাবে দেখছ? আমি মনে করি আমার চার বছরের ছেলেকে নিয়ে এই মহাকাশযানে করে দূর মহাকাশে রওনা দিতে পারলে আমি আমার সন্তানের জীবন নিশ্চিত করতে পারব।। তুমি কেন এই কথা বলছ? কারণ আমি জানি রবোমানবেরা পৃথিবী দখল করে নেবে। তখন তারা কোনো মানুষকে রাখবে না। যদিবা রাখে তাদেরকে রবোমানবের আজ্ঞাবহ নিচু শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে থাকতে হবে। আমি আমার সন্তানের জন্যে সেই ধরনের জীবন চাই না। আমি তাকে মানুষের সম্মানিত জীবন দিতে চাই। তুমি কেন বলছ এই পৃথিবী রবোমানবেরা দখল করে নেবে। তার কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি তারা প্রায় দখল করে ফেলছে। তুমি কীভাবে সেটা জান সুহা? সংবাদ মাধ্যমে আগে রবোমানব খুঁজে পাওয়ার খবর দেয়া হতো। এখন দেয়া হয় না। যার অর্থ রবোমানবদের আর খুঁজে বের করা সম্ভব হচ্ছে না। কিংবা– কিংবা কী? কিংবা শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীতে রবোমানবেরা ঢুকে গেছে যেটি আরো বিপজ্জনক। তুমি কী মানুষের কর্মদক্ষতাকে বিশ্বাস কর না? করি। কিন্তু— কিন্তু কী সুহা? রবোমানবেরাও এক ধরনের মানুষ। আমাদের যা আছে তাদেরও তার সবকিছু আছে। তাদের একটা বাড়তি জিনিস আছে, সেটা হচ্ছে থ্যালামাসে ইমপ্ল্যান্ট করে দেয়া নিউরন স্টিমুলেটর। সেটা তাদের মস্তিষ্ককে অনেক বেশি দক্ষ করে তুলেছে। আমি নিশ্চিতভাবে জানি এই রবোমানবেরা খুব তাড়াতাড়ি পৃথিবী দখল করে নেবে। আমি তার আগে পৃথিবী ত্যাগ করতে চাই। তোমার চার বছরের ছেলে ক্লদ? সেও কী যেতে চায়? ক্লদকে এখনো স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে দেয়া হয় না। ক্লদের বাবা? আমি তার সম্পর্কে কথা বলতে চাই না। কেন? কারণ আমি তার সম্পর্কে একটি ভালো কথাও বলতে পারব না। আমি ক্লদের সামনে কিছু বলতে চাই না। ঠিক আছে। আমি কী ক্লদের সাথে একটু কথা বলতে পারি? পার। ক্লদ। উঁ। তুমি কী জান তুমি কোথায় যাচ্ছ। জানি। কোথায়? আকাশে। আকাশে কোথায়? রাত্রিবেলা যে তারাগুলো মিটমিট করে সেখানে। সেখানে গিয়ে তুমি কী করবে? আমি তারাগুলো ধরে একটা কাচের বোতলে রাখব। রাত্রিবেলা সেগুলো বোতলের ভেতর মিটমিট করবে। চমৎকার ক্লদ। তোমাকে আরেকটা জিনিস জিজ্ঞেস করতে পারি? পার। তুমি তোমার মাকে কতটুকু ভালোবাস? অনেকটুকু। এই ঘরের সমান। আরো বেশি। চমৎকার ক্লদ। চমৎকার। ঘরটি ছোট, ঘরের ছাদ বেশ নিচু, ইচ্ছে করলে হাত দিয়ে স্পর্শ করা যায়। ঘরটির মাঝে একটি ধাতব টেবিল, টেবিল ঘিরে তেরোজন নারী-পুরুষ বসে আছে। ঘরটির ভেতর নিরানন্দ পরিবেশ কিন্তু ঠিক কেন সেটি নিরানন্দ হঠাৎ করে বোঝা যায় না। ধাতব টেবিলের একপাশে যে বসে আছে তার চেহারায় এক ধরনের কাঠিন্য লুকিয়ে আছে। সে টেবিলে থাবা দিতেই টেবিলের চারপাশে বসে থাকা নারী ও পুরুষগুলো ঘুরে তার দিকে তাকাল। মানুষটি সুনির্দিষ্ট কারো দিকে না তাকিয়ে বলল, বিজ্ঞান আকাদেমী কী নিয়ে তাদের গোপন সভা করেছে সেটা কি জানা গেছে? কমবয়সী একটা মেয়ে খিলখিল করে হেসে বলল, আমাদের নিয়ে! অবশ্যি আমাদের নিয়ে? কিন্তু আমাদের কোন বিষয়টা নিয়ে সেটা জানা গেছে? মাঝবয়সী একজন মানুষ বলল, মোটামুটি অনুমান করতে পারি। ঠিক আছে অনুমান কর। মানুষটি বলল, আমরা রবোমানবেরা নেটওয়ার্ক দখলের দিকে আরো এক ধাপ এগিয়ে গেছি। সমাজের সব জায়গায় আমাদের রবোমানবেরা আছে—তারা গোপনে কাজ করে যাচ্ছে। আগে যেরকম প্রতিদিন মানুষেরা কিছু রবোমানব ধরে ফেলতো-আজকাল সেটা পারছে না। তার প্রধান কারণ– কঠিন চেহারার মানুষটি বিরক্তির সুরে বলল, আমরা সবাই এগুলো জানি। আমি তোমাকে যেটা জিজ্ঞেস করছি সেটা বল। বিজ্ঞান আকাদেমী কী নিয়ে সভা করেছে? তারা একটা মহাকাশযান পাঠাবে। মহাকাশযান? হ্যাঁ। তুমি কেমন করে সেটা জান? বিজ্ঞান আকাদেমীর সভা ছিল গোপন। বিজ্ঞান আকাদেমীর কোনো সদস্যের মাঝে আমরা কোনো রবোমানব ঢুকাতে পারি নি। মধ্যবয়স্ক মানুষটি তার গাল চুলকাতে চুলকাতে বলল, বিজ্ঞান আকাদেমীর সভা শেষ হওয়ার সাথে সাথে পৃথিবীর অনেক জায়গায় অনেক রকম কাজ শুরু হয়ে গেছে। সব কাজগুলো হচ্ছে একটা মহাকাশযানকে নিয়ে। আমরা তাই অনুমান করছি একটি মহাকাশযান পাঠানো হবে। মহাকাশযানে কী পাঠানো হবে? কমবয়সী মেয়েটি খিলখিল করে হেসে বলল, মানুষ। মানুষের ফিটাস। মানুষের জিনোম। কঠিন চেহারার মানুষটি কিছুক্ষণ ভুরু কুঁচকে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল, জিজ্ঞেস করল, সত্যি? হ্যাঁ। নেটওয়ার্কের তথ্য আমরা আজকাল যখন খুশি পরীক্ষা করতে পারি। আমি নিশ্চিতভাবে জানি অসংখ্য মানুষ, মানুষের ফিটাস আর জিনোম প্রস্তুত করা হচ্ছে! কঠিন চেহারার মানুষটির মুখে বিচিত্র একধরনের হাসি ফুটে ওঠে, সে দুলে দুলে হাসতে হাসতে বলল, মানুষ তাহলে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছে! নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্যে মহাকাশযানে করে কিছু মানুষ বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। পৃথিবীতে না থাকলেও অন্য কোথাও যেন মানুষেরা বেঁচে থাকে? হ্যাঁ। মধ্যবয়স্ক মানুষটি বলল, সবকিছু দেখে আমাদের তাই মনে হচ্ছে। কঠিন চেহারার মানুষটি তরল গলায় বলল, আমার ঘনিষ্ঠ রবোমানবেরা, তোমাদের অভিনন্দন। সেই দিনটি আর খুব বেশি দূরে নয় যখন আমরা পৃথিবীর দায়িত্ব নেব। সবাই মাথা নাড়ল, শুধু মধ্যবয়স্ক মানুষটি গম্ভীর গলায় বলল, এখন আমাদের অনেক কাজ। পৃথিবীর দায়িত্ব নেবার আগে আমাদের নিজেদের কিছু প্রস্তুতি নিতে হবে। কঠিন চেহারার মানুষটি বলল, আমরা কি প্রস্তুতি নেইনি? নিয়েছি। বেশ কিছু প্রস্তুতি নিয়েছি। নেটওয়ার্কটি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার সাথে সাথে আমাদের কাজে লেগে যেতে হবে। তুমি ঠিকই বলেছ। কঠিন চেহারার মানুষটি হঠাৎ একটু অন্যমনস্ক হয়ে যায়, নিজের হাতের আঙুলগুলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমার ঘনিষ্ঠ রবোমানবেরা, তোমাদের মাঝে যারা খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছ আমি তাদের পুরস্কার দিতে চাই! ধাতব টেবিল ঘিরে বসে থাকা সবাই একটু নড়েচড়ে বসে তার দিকে তাকাল। কঠিন চেহারার মানুষটি বলল, তোমরা সবাই জান মানুষ রোমানব খুঁজে বের করার একটা পদ্ধতি বের করেছিল। যে ছেলেটি সেটা বের করেছিল তার অসাধারণ গাণিতিক প্রতিভা থাকলেও মানুষ হিসেবে সে ছিল অতি নির্বোধ। আমাদের একজন এজেন্ট তার করোটি কেটে মস্তিষ্কটা বের করে নিয়ে এসেছে! সেই মস্তিষ্ক থেকে আমরা সব তথ্য বের করে এনেছি, বলতে পার এই ঘটনাটি রবোমানবের জীবনের বিশাল বড় একটি সাফল্য। যে এজেন্ট সেই কাজটি করেছে সেও আমাদের মাঝে আছে–আমি এখন তাকে পুরস্কৃত করতে চাই। কঠিন চেহারার মানুষটি টেবিলের অন্য মাথায় বসে থাকা লাল চুলের কমবয়সী হাসিখুশি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, বল, তুমি কী পুরস্কার চাও? লাল চুলের মেয়েটি হাসি হাসি মুখে বলল, আমি এখন কোনো পুরস্কার চাই না। আমরা রবোমানবেরা যখন নেটওয়ার্ক দখল করে পৃথিবীর দায়িত্ব নিয়ে নেব তখন আমাকে পুরস্কার দিও! আমি তখন তোমার কাছে একটা পুরস্কার চাইব। তখনো তুমি পুরস্কার পাবে। এখন তুমি কী পুরস্কার চাও বল। লাল চুলের মেয়েটা রহস্যের ভঙ্গি করে বলল, সত্যি বলব? বল। আমি যে মস্তিষ্কটা কেটে এনেছি সেটাকে একটা ইন্টারফেস দিয়ে কমিউনিকেশন মডিউলের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে। যার অর্থ সেই মানুষটার সাথে আমি এখন কথা বলতে পারি। আমি কমিউনিকেশন মডিউল ব্যবহার করে আমার পরিচিত এই ছেলেটার সাথে মাঝে মাঝে কথা বলতে চাই। তাই তুমি পুরস্কার হিসেবে আমাকে এই মস্তিষ্কটা দিতে পার। কঠিন চেহারার মানুষটি দুলে দুলে হাসতে হাসতে বলল, আমি ভেবেছিলাম রবোমানবের ভেতর থেকে মায়া-মমতা ভালোবাসা সরিয়ে দেয়া হয়েছে। লাল চুলের মেয়েটি হাসল, বলল, এটি মায়া মমতা ভালোবাসা না–এটা হচ্ছে একটা বিনোদন। যে মানুষের কোনো দেহ নেই, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নেই তার সাথে কথা বলার বিষয়টা প্রায় রূপকল্পের মতো। মানুষটি একটা শব্দহীন আলোহীন অস্তিত্বহীন জগতে অনন্ত জীবনের জন্য আটকা পড়ে আছে তার ভেতরে যে অমানুষিক আতংক আর হতাশা সেটি বিনোদনের জন্যে অসাধারণ। কঠিন চেহারার মানুষটি লাল চুলের মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, তথাস্তু। তোমার প্রিয় মানুষটির মস্তিষ্ক নিয়ে খেলা করার জন্যে সেটা তোমাকে দিয়ে দেয়া হল। লাল চুলের মেয়েটি বলল, ধন্যবাদ। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। মধ্যবয়স্ক মানুষটি বলল, আমার মনে হচ্ছে আমরা আমাদের কাজে ঠিকভাবে গুরুত্ব দিচ্ছি না। যেটি করা দরকার সেটি না করে অন্যান্য ছেলেমানুষী কাজে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলছি। কঠিন চেহারার মানুষটির মুখের মাংসপেশি একটু শিথিল হয়ে সেখানে একটা হাসির আভাস পাওয়া গেল। সে বলল, তুমি ঠিকই বলেছ। আমরা সত্যিকারের কাজ না করে আনুষঙ্গিক কাজ বেশি করছি। কিন্তু আমি সেটা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত না। কেন জান? কেন? তার কারণ তুমি গোপনে সত্যিকারের কাজ করে যাচ্ছ? মধ্যবয়স্ক মানুষটির মুখ হঠাৎ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। কঠিন চেহারার মানুষটি হাসি হাসি মুখে বলল, আমাদের ভেতর থেকে মায়া মমতা ভালোবাসা এই ধরনের অপ্রয়োজনীয় অনুভূতিগুলো সরিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ভয়ের অনুভূতিটি সরানো হয় নি। নিরাপত্তার জন্যে ভয়ের অনুভূতি দরকার। আমরা এখনো ভয় পাই। তুমি যেরকম ভয় পাচ্ছ। কঠিন চেহারার মানুষের মুখের হাসিটি আস্তে আস্তে সরে গিয়ে সেখানে আবার কাঠিন্যটি ফিরে আসে, সে শীতল গলায় বলল, তুমি কেন ভয় পাচ্ছ বলবে? মধ্যবয়স্ক মানুষটি আমতা আমতা করে বলল, না–আমি ভয় পাচ্ছি না। আমি- না পেলে ক্ষতি নেই। যখন প্রয়োজন হবে তখন ভয় পেলেই হবে। কঠিন চেহারার মানুষটি বলল, আমি বলেছি যে তোমাদের সবার কাজের জন্যে একটা পুরস্কার দেব। একজনকে দিয়েছি। তোমাকেও দেব। আমাকে? আ-আমাকে? হ্যাঁ। ছোট একা সীসার টুকরো। তোমার কপালে, শব্দের চেয়ে তিনগুণ গতিতে সেটা ঢুকে যাবে। সীসা নরম ধাতু, সেটা টুকরো টুকরো হয়ে তোমার মস্তিষ্ককে ছিন্নভিন্ন করে দেবে। তুমি কিছু বোঝার আগেই তোমার সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। কঠিন চেহারার মানুষটি তার ড্রয়ার থেকে একটা পুরানো ধাঁচের রিভলবার বের করে আনে। সেটির দিকে তাকিয়ে মধ্যবয়স্ক মানুষটির মুখ রক্তশূন্য হয়ে যায়, অবর্ণনীয় আতংকে সেটি কদর্য হয়ে ওঠে। মানুষটি কাঁপা গলায় বলল, তু–তুমি কী বলছ? আমি কী বলেছি তুমি শুনেছ। রবোমানবদের এই বিস্ময়কর সাফল্যের কারণ হচ্ছে শৃঙ্খলা। কারণ হচ্ছে নেতৃত্ব। এই নেতৃত্বকে তুমি গোপনে চ্যালেঞ্জ করতে চাইছ? তোমার এতো বড় দুঃসাহস? কঠিন চেহারার মানুষটি তার চেপে রাখা রিভলবারটি মধ্যবয়স্ক মানুষের কপালের দিকে তাক করে। মধ্যবয়স্ক মানুষটি ভাঙা গলায় বলল, আমি দুঃখিত। আমি খুবই দুঃখিত– মিথ্যা কথা বলো না। রবোমানবেরা কখনো দুঃখিত হয় না। লাল চুলের মেয়েটি হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে বলল, দাঁড়াও! দাঁড়াও। কঠিন চেহারার মানুষটা মাথা ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? আমি কী একটু অন্যপাশে সরে বসতে পারি? কেন? দৃশ্যটা যেন একটু ভালো করে দেখতে পারি। গুলি খাবার পর যখন একজন ছটফট করতে থাকে সেই দৃশ্যটি দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। কঠিন চেহারার মানুষটি লালচুলের মেয়েটিকে অন্যপাশে বসার সময় দিয়ে ট্রিগার টেনে ধরে। (চলবে)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৪২ জন


এ জাতীয় গল্প

→ কেপলার টুটুবি {2}

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now