বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"কাউন্ট ড্রাকুলা"
লেখক : ব্রাম স্টোকার
অনুবাদক : তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
---------------------------
পর্ব ১২ ও শেষতম পর্ব
হেলসিংয়ের দিনলিপি
৪ ঠা নভেম্বর।।
বিশেষ কারণে আজ আমাকেই ডায়েরী লিখতে হচ্ছে। প্রথমত, শারীরিক ও মানসিক দূর্বলতার জন্য মীনা আজ ডায়েরী লিখতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, ডাঃ সিউয়ার্ডের সঙ্গে যদি আর দেখা না হয়!
গত সন্ধ্যায় আমরা নির্বিঘ্নে বারগো গিরিপথে পৌঁছেছি। পথ চিনতে খুব একটা অসুবিধে হয় নি। মীনা পথ দেখায়, " এই দিকে চলুন"।
মীনা এও বলে, " জোনাথনের ডায়েরিতে এই পথের বিস্তৃত বিবরণ আছে। "
আমার বিস্ময় কাটল। জোনাথন যেসব পথঘাটের বর্ণনা করেছিল ক্রমে ক্রমে সেগুলো চিনতে পারলাম।
মীনাকে বললাম, " আমাদের এখন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। তুমি বরং একটু ঘুমিয়ে নাও।" তাকে দেখে আনন্দ হয়, সে সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাভাবিক।
ঘোড়া দুইটির ক্লান্তি নেই, পাথর আর নুড়ি বিছোন পথে অবিশ্রান্ত গতিতে ছুটে চলেছে। অন্ধকার গভীর হল। কোনওকিছুই আর দেখা যাচ্ছে না। গাড়ি থামিয়ে নিচে নেমে আগুন জ্বাললাম। মীনাকে ডাকলাম। খাওয়া দাওয়া সেরে ঘোড়া দুটির বাঁধন খুলে দিলাম। ঘাসের ওপর কম্বল পেতে আমাদের বিশ্রাম নিতে হবে। এতক্ষণ গাড়ি চালিয়েছি....এবার রাত জেগে পাহারা দেবার পালা।
সকাল হয়ে গেছে। গতরাতে যে আগুন জ্বালিয়েছিলাম, কাঠ গুঁজে গুঁজে এখনো পর্যন্ত তা জ্বালিয়ে রেখেছি। মীনা নিদ্রিত। তাকে জাগাব কি?
৫ নভেম্বর, সকাল।।
গতকাল আমাদের সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়েছে।
অসমতল এবং পরিত্যক্ত পথ দিয়ে ঘোড়া দুটি স্বচ্ছন্দ গতিতে ছুটে চলেছে। পথে পড়ছে একের পর এক পাহাড়, ঘন বন, বন্ধ্যাভূমি। আপন মনে বয়ে চলেছে নাম না জানা কত ঝরনা।
গোধূলির আলোয় কাউন্টের প্রাসাদের চূড়া এখন স্পষ্টই চোখে পড়ছে। নির্জন পাহাড়ে অভিশপ্ত সেই বাড়ি চিনতে আমার ভুল হয়নি। গা ছমছম করছিল। ভয়ের মাঝে আনন্দ হচ্ছিল এই ভেবে যে লক্ষ্যে পৌঁছতে আর দেরী নেই।
গোধূলির আলো মিলিয়ে গিয়ে প্রকৃতির বুকে শুরু হল আলো আঁধারির খেলা।
লক্ষ্য করছি, ড্রাকুলার প্রাসাদ দূর্গের দিকে গাড়ি যত এগিয়ে চলেছে, মীনার মধ্যে কেমন একটা অস্থিরতা ভর করছে।
সস্নেহে বললাম, " মীনা, কি হয়েছে? কষ্ট হচ্ছে? কিছু খাবে?"
মীনা আধো ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল। একবার আমার দিকে চোখ মেলে তাকিয়েই পরক্ষনেই চোখ বুজে ফেলল। লক্ষ্য করলাম, তার চোখের তারায় ভর করেছে জমাট বাঁধা আতঙ্ক আর ভয় ভীতি।
গাড়ির বাইরে এখন আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ঘন অন্ধকারে ছেয়ে গেছে চারদিক। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলেও অন্ধকারের মাঝে শুধু জোনাকির ব্যস্ত হয়ে উড়ে বেড়ানো ছাড়া আর কিছুই নজরে পড়ছে না।
আচমকা ঘোড়া দুটো ' চিঁহিহিঁ' করে বার দুই ডেকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
কি হল ব্যাপারটা? আমি গাড়ির ভেতর থেকে ফের বাইরে উঁকি দিলাম কিন্তু অন্ধকারে কোথাও কিছু নজরে পড়ল না। কিন্তু বুঝতে পারলাম, অশুভ শক্তি পিছু নিয়েছে আমাদের।
গাড়ি থেকে নেমে লণ্ঠন জ্বাললাম। ঘোড়াদুটো পথশ্রমে ক্লান্ত, তাদের খাদ্য আর জল দিলাম।
মীনাকে সম্মোহিত করে নতুন কোনও তথ্য জানা যেত কিন্তু সময় গেছে পেরিয়ে। মীনাকে ঘুম থেকে জাগালাম। প্রচণ্ড শীত। আগুন জ্বালালাম। মোটা একটা কম্বল গায়ে চাপিয়ে মীনা আগুনের পাশে বসল। আমাদের সঙ্গে রাঁধা খাবার ছিল।
আমি খেলাম, মীনা খেল না।
মীনার চারপাশে অনেকটা জায়গা দিয়ে গোল করে গন্ডি কাটলাম। মীনা সেই গন্ডির মাঝে স্থির হয়ে বসে রইল। মুখ তার বরফের মতো সাদা। ভয়ে সে কাঁপছে। তাকে সাহস দিয়ে বললাম, " যতক্ষণ গন্ডির ভেতর থাকবে, কেউ তোমায় ছুঁতেও পারবে না।"
অকস্মাৎ মীনা চঞ্চল হয়ে উঠল। ঘন অন্ধকারে ক্ষীণ একটা রশ্মিকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। ছায়ার মতো ওরা কারা? গন্ডির বাইরে আগুন নিবু নিবু হয়ে এসেছিল, আরও কাঠ ফেলার জন্য বেরোচ্ছিলাম, হঠাৎ নিজেরই মনে হল, নিরাপদ বৃত্ত ছেড়ে যাবার দরকার নেই। বিপদ ঘটতে পারে, আগুন নিভে যাক।
প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় উঠল। বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ প্রলয়ের পূর্বাভাষ যেন। সুতীব্র যন্ত্রণায় ঘোড়াদুটি আর্তনাদ করে উঠল। আগুন নিভে গেল।
ওদিকে রহস্যময় সেই রশ্মি ক্রমে ক্রমে প্রখর হল। সাদা সাদা সেই ছায়াগুলো এগিয়ে আসছিল। গন্ডির বাইরে তারা দাঁড়িয়ে রইল।
এইভাবে কতক্ষণ কেটেছে, বলতে পারব না। একসময় তারা মানবীয় রূপ ধরে। তিন তিনটে নারীমূর্তি। তাদের গায়ের রঙ গোলাপি, চঞ্চল তাদের চোখের মনি। তারা হাসছে। ঝকঝক করছে তাদের উজ্জ্বল যৌবন। জোনাথনের ডায়েরিতে এদের কথাই সম্ভবত লেখা ছিল। প্রাসাদের একটি ঘরে একাকী জোনাথনের ওপর আক্রমণ করতে গিয়ে পিছিয়ে এসেছিল কাউন্টের আদেশে।
নারীমূর্তিগুলি মীনাকে ডাকে, " এস বোন, আমাদের কাছে এস।"
এদিকে তাদের ডাকে সাড়া দিতে মীনার মধ্যেও দেখা দিল নিদারুণ অস্থিরতা। আমি একহাতে ক্রুশ আর অন্য হাতে শক্ত করে মীনার হাত চেপে ধরে রাখলাম।
ওদিকে নারীমূর্তিগুলো বলছে, " এসো বোন, এসো, আমরা তোমায় অনেক সুখ দেব, আনন্দ দেব। এসো, আমাদের সাথে। আমাদের সঙ্গে এলে তুমি চিরকাল অমর হয়ে থাকবে। এসো, বোন এসো। "
ক্রুশটা সামনের দিকে বাগিয়ে ধরে শক্ত করে চেপে ধরে রইলাম মীনাকে। একদিকে গন্ডির বাইরে নারীমূর্তিগুলোর ছোঁকছোঁকানি, আর একদিকে মীনার, আমার হাত ছাড়িয়ে বেরিয়ে যাবার নিদারুণ আকুলতা উন্মাদনা। কোনওরকমে ক্রুশটা নারীমূর্তিগুলোর দিকে বাগিয়ে ধরে মীনাকে একহাতে জাপটে ধরে রইলাম। একবার মীনা যদি হাত ছাড়িয়ে বেরিয়ে যায় তো পরিস্থিতি যে কি ভয়ঙ্কর হবে, কল্পনা করলেও শিউরে উঠতে হয়।
সারারাত ধরে নারীমূর্তিগুলো গন্ডির বাইরে মীনাকে বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য অনুনয় বিনয়, প্রলোভন, ভয় প্রদর্শন করে চলল। একসময় পূবের আকাশে রক্তিম ছটা দেখা দিল। লক্ষ্য করলাম, তাদের চোখে মুখে ফুটে উঠেছে হতাশার চিহ্ন। অত:পর পূব আকাশ ফর্সা হতেই হতাশ জর্জরিত তিন নারী কুয়াশার আড়ালে গা ঢাকা দিল।
ওরা বিদায় নিতে মীনার অচেতন শরীরটা লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আমার সময়। এর ভেতর আজ আমায় অনেক কাজ করতে হবে। প্রাতঃরাশ সেরে বেরিয়ে পড়লাম। ঈশ্বর, মীনাকে রক্ষা কর।
৫ ই নভেম্বর, বিকেল।।
ঈশ্বরকে ধন্যবাদ এখনো মানসিক ভারসাম্য হারাইনি। মীনা গন্ডির মাঝে নির্ভয়েই থাকতে পারবে, একমাত্র নেকড়ের আক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে।
দ্রুতগতিতে কাউন্টের প্রাসাদের দিকে চললাম। ভারেস্টি থেকে আনা হাতুড়িটা বেশ কাজে লাগল। প্রাসাদের দরজা বন্ধ। মরচে ধরা কবজাগুলো ভেঙে ফেললাম। বলা যায় না, যদি কেউ বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়। এখানে গুমোট গরম। দূর্বলতায় কান ভোঁ ভোঁ করছে। দূর থেকে কি নেকড়ের ডাক ভেসে আসছে?
চারটি সমাধি আমায় খুঁজতে হবে। এইমাত্র একটির সন্ধান পেলাম। চিত্রিত শ্বেতপাথরের শয্যায় রূপসী মেয়েটি পাশ ফিরে শুয়ে আছে। গত রাতের দেখা সেই সুন্দরী মেয়ে তিনটির একটি। সে যেন রূপকথার সেই রাজকুমারী.... ছবিতেও এত সুন্দরীর দেখা মেলে না। আমি প্রফেসর আব্রাহাম ভ্যান হেলসিং কর্তব্য ভুলে দাঁড়িয়ে রইলাম। শত বছর আগে হয়ত কোনও বীরপুরুষ এই ঘরে প্রবেশ করেছিল। বিস্মিত চোখে মেয়েটির রূপ দেখেছিল সে। কতক্ষণ কেটেছিল এইভাবে! সূর্য একসময় পশ্চিমে ঢলে পড়েছিল।
মেয়েটি চোখ মেলে চেয়েছিল....ধীরে
ধীরে একটা গোলাপ যেন ফুটে উঠেছিল। তারপর সেই বীরপুরুষের শেষ রক্তবিন্দুটুকু শুষে পরম তৃপ্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিল মেয়েটি। যুবকের নিষ্প্রাণ দেহটি পড়ে রইল মাটিতে।
মীনার কথা মনে পড়ল। না, আর দেরী করা চলে না। কিছু দূরে আর একটি মেয়ের সন্ধান পেলাম। এ মেয়েটি অপেক্ষাকৃত কালো। শয্যায় তার ধূলো জমেছে। একটা আঁশটে গন্ধ বেরোচ্ছে তার গা থেকে। তরুণীটি ঘুমিয়ে আছে।
আরও কিছুটা এগিয়ে তৃতীয় মেয়েটির সন্ধান পেলাম। সে-ও সুন্দরী। তার পোশাক থেকে ল্যাভেন্ডারের সুগন্ধ বেরোচ্ছে।
মীনাকে অসহায় অবস্থায় ফেলে এসেছি। যতই নির্মম হোক, যতই ভয়ঙ্কর হোক, এবার আমায় আমার কর্তব্য সম্পাদন করতে হবে। নইলে সন্ধ্যের অন্ধকারে এই তিন তরুনী প্রাণ ফিরে পেয়ে আবার আমাদের আক্রমণ করবে। ঘরের কোণে আর একটি সজ্জিত ও চিত্রিত সমাধি রয়েছে। এগিয়ে গিয়ে দেখি, প্রস্তর ফলকে বড় বড় অক্ষরে লেখা-
' ড্রাকুলা'
কসাইয়ের মতো নিষ্ঠুর হতে হবে আমায়। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমার স্নায়ু এখনো ঠিকভাবেই কাজ করছে। আমার হাত বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। ঐ তিন সুন্দরীর হৃদপিন্ড ছুরি দিয়ে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিলাম। কমলা রঙের ফেনা উপচে পড়ল কফিনগুলিতে। নিষ্ঠুর এই কাজ করতে গিয়ে যে দু:খ জাগল না মনে, তা নয়, কিন্তু আমি জানি আমি কোনও অন্যায় করিনি। ঐ তিন সুন্দরীকে আজ আমি মুক্তি দিলাম। আজ তাদের প্রকৃত মৃত্যু হল। দিনের বেলা এরা কাউন্টের মতোই কফিনের ভেতর আধমরা হয়ে পড়ে থাকত, রাতে রক্তের নেশায় প্রাণ ফিরে পেয়ে জেগে উঠত।
কাউন্টের প্রাসাদ ছেড়ে যাবার আগে প্রবেশদ্বার রুদ্ধ করে সেখানে একটি ক্রুশ ঝুলিয়ে দিলাম।
মীনার কাছে ফিরে এলাম। সে আমায় দেখে কেঁদে উঠল।
আমি বললাম, " কাঁদছ কেন? "
সে বলল, " এই ভয়ঙ্কর পরিবেশে আর এক মূহুর্তও কাটাতে চাই না। চলুন, আমরা জোনাথনের খোঁজ করি।"
মীনাকে অসম্ভব রোগা দেখাচ্ছে কিন্তু তার চোখগুলো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল।
আবার আমাদের চলা শুরু হল।
জোনাথনের ডায়েরি
৪ ঠা নভেম্বর, সন্ধ্যা।।
লঞ্চের যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিয়েছে। বাধ্য হয়েই তাই নৌকোয় চলেছি। জানি না, হেলসিং আর মীনা কোথায়! এখন হয়ত তারা কাউন্টপুরীর কাছাকাছি!
এবার আমাদের স্থলপথে চলতে হবে। কাজেই ভালো দুটি ঘোড়া কিনতে হবে। ডাঃ সিউয়ার্ড আর মরিস এই সময় যদি আমাদের সঙ্গে থাকতেন তাহলে বেশ ভাল হতো। কি জানি, এই হয়ত আমার শেষ লেখা!
এইমাত্র যা ছিল সম্মুখপানে, মূহুর্তেই তা পেছনে ফেলে টগবগ করে এগিয়ে চলেছে ডাঃ সিউয়ার্ড আর মরিসের ঘোড়াদুটি। একটু হেসে ডাঃ সিউয়ার্ড বললেন, " মরিস, মৃত্যুকে বরণ করবার জন্যেই যেন এগিয়ে চলেছি আমরা। একমাত্র ঈশ্বরই জানেন কখন কার হাতে, কিভাবে কখন আমাদের মরতে হবে!"
মরিস বলল, " একেই তো এডভেঞ্চার বলে। আমার কিন্তু বেশ ভালোই লাগছে।"
দেখতে দেখতে কেমন সুন্দর এগিয়ে চলেছে সময়। আজ ৫ ই নভেম্বর!
ডাঃ সিউয়ার্ড লক্ষ্য করেন, দূর থেকে কারা যেন এদিকে এগিয়ে আসছে। বেশ দ্রুত গতিতে। মরিস বলল, " ওরা বেদে।"
অল্প অল্প বরফ পড়ছে। বাতাসে বারুদের গন্ধ। দূরে নেকড়ের মিলিত গর্জন শোনা যাচ্ছে। পাহাড়ের ওপর বরফ পড়ায় সম্ভবত সেগুলি নিচে নেমে আসছে।
মীনার ডায়েরী
৬ ই নভেম্বর।।
জোনাথনের উদ্দেশ্যে আমি আর প্রফেসর হেলসিং এগিয়ে চলেছি। ভারী পোশাকের জন্য তাড়াতাড়ি চলতে পারছি না। পথ খুব একটা অসমতল নয়। তুষারপাতের ফলে কোথাও এতটুকু ঘাস জন্মাতে পারে নি। প্রায় এক মাইল হেঁটেই আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি।
উঁচু একটা ঢিবিতে বসে ফেলে আসা পথটিকে দেখছিলাম। কাউন্টের প্রাসাদ এখান থেকে স্পষ্টই চোখে পড়ে। স্থাপত্য এবং ভাস্কর্যের এমন উজ্জ্বল সমারোহ খুব কমই দেখা যায়। সেইসব শিল্পীদের মনে পড়ে যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে এই মনোরম সৌধটি নির্মাণ করেছিল।
হেলসিং পাহাড়ের গায়ে অদ্ভুত একটা গুহা আবিষ্কার করেন। খুশি হয়ে তিনি বলেন, " এখান থেকে আমরা সব কিছু লক্ষ্য রাখতে পারব; কিন্তু কেউ আমাদের দেখতে পাবে না। নেকড়ের পাল এদিকে এলে অতি সহজেই তাদের বধ করতে পারব। "
গুহার মেঝেতে রাপার বিছিয়ে, জিনিসপত্র গুছিয়ে, বিপদের মাঝে মূহুর্তের সংসার পাতলাম।
হেলসিংয়ের অনুরোধে খাবার চেষ্টা করলাম কিন্তু ভাল লাগল না। দূরবীন চোখে তিনি দিগন্তের দিকে চেয়ে আছেন। হঠাৎ তিনি চেঁচিয়ে ওঠেন, " মীনা, এদিকে এসো, সন্ধান পেয়েছি।"
আমি তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার হাতে তিনি দূরবীনটি দিলেন এবং আঙুল দিয়ে বিশেষ একটি জায়গা নির্দেশ করলেন। বিকেলের ক্ষীণ আলোয় সঙ্কীর্ণ একটি পথ আর নদীর রেখা চোখে পড়ল। একদল লোককে স্পষ্টই দেখা যায়। তারা বেশ দ্রুতগতিতে একটি ঘোড়ার গাড়িকে পাহারা দিয়ে নিয়ে আসছে। গাড়িতে রয়েছে বিশেষ সেই বাক্সটি, তাই এত সতর্ক প্রহরা। সন্ধ্যায় সম্ভবত ঝড় উঠবে। তুষারপাতেরও আশঙ্কা রয়েছে। বাক্সের মাঝে আটকে থাকা অসহায় কাউন্ট এ সময় প্রাণ পাবে। দুশ্চিন্তা আর দূর্ভাবনা জেগেছে আমার। হেলসিং বুঝিবা আমার মনোভাব বুঝলেন। স্বান্তনা দিয়ে তিনি বললেন, " ভয় নেই। জয় আমাদের অবশ্যম্ভাবী। "
আমার হাত থেকে দূরবীন নিয়ে তিনি এদিকে সেদিকে সন্ধানী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে একটু চিন্তিত হলেন। সূর্য অস্ত যাবার উপক্রম করছে। এদিকে তুষারপাত শুরু হওয়ায় মূহুর্তের জন্য কোনও কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। আবার আলো ফুটে উঠল। সহসা হেলসিং বলে ওঠেন, " দু'জন অশ্বারোহী লোকগুলির অনুসরণ করছে। ওরা নিশ্চয়ই সিউয়ার্ড আর মরিস। জোনাথন, আর্থারকে দেখা যাচ্ছে।"
নেকড়েগুলো আমাদের কাছে এসে গেছে। তাদের হাত থেকে বাঁচার অস্ত্র আমাদের আছে। তাই চিন্তার কোনও কারণ নেই। প্রতিটি মূহুর্তই এখন আমাদের কাছে এক একেকটি যুগের মতো মনে হচ্ছে। রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছি....পরমূহুর্তে কি ঘটবে কে জানে! আমাদের সাহসী সেই চারজন বীর...জোনাথন, সিউয়ার্ড, মরিস এবং আর্থারকে এখন দূরবীন ছাড়াই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আমাদের থেকে তারা খুব একটা দূরে নেই। নির্জনতা ভঙ্গ করে জোনাথনের কণ্ঠস্বর ভেসে এল, " থাম। আর এক পা এগিয়ো না।"
এখন আর বুঝতে বাকি নেই যে লোকগুলো ড্রাকুলার অনুচর বেদের দল।
বেদের সর্দারকে দেখলে মনে হয়, সে যেন প্রাচীন গ্রীক গল্পের সেই জীব, যার অর্ধেকটা মানুষের আর বাকি অর্ধেকটা ঘোড়ার। জোনাথনের ভাষা, বেদ সর্দার হয়ত বুঝতে পারেনি কিন্তু হাবে ভাবে বুঝতে পেরেছে নিশ্চয়, জোনাথন কি বলতে চায়। তার আদেশ উপেক্ষা করে সর্দার এগিয়ে যাবার চেষ্টা করতেই মরিস উইনচেস্টার রাইফেল উঁচিয়ে ধরল।
বেদেদের সর্দার প্রথমটায় হতভম্ব হয়ে পড়ে। পরে আকাশের দিকে চেয়ে তাদের ভাষায় সঙ্গীদের কি যেন নির্দেশ দিল। তারপরেই সেই বেদের দল ছুরি আর বর্শা নিয়ে আক্রমণ করল জোনাথনদের।
মরিস আর আর্থার লাফিয়ে গাড়ির ওপর উঠল আর সর্বশক্তি প্রয়োগ করে বাক্সটা ঠেলে ফেলে দিল মাটিতে। পাথুরে রাস্তায় পড়ে বাক্সটার ডালা ভেঙে গেল।
ভাঙা বাক্সটার ভেতর সবার নজর পড়তেই সকলের চক্ষুস্থির! ভেতরে কাউন্ট ড্রাকুলার দেহ।
তখন প্রকৃতির বুকে আলো আঁধারির খেলা চললেও পুরোপুরি সন্ধ্যা নামে নি। কাউন্ট তখন সবে ঘুম ভেঙে চোখের পাতাদুটো খুলে তাকিয়েছে।
আর্থার হাতের রিভলভার থেকে একটা গুলি ছুঁড়ল, কাউন্টের বুক লক্ষ্য করে।
গুলির আঘাতে হিংস্র গর্জন করে ড্রাকুলা উঠে বসল।
জোনাথন জানে, রিভলবারের গুলি ড্রাকুলার কোনও ক্ষতিই করতে পারে না। তাই একহাতে একটা সূঁচালো মুখ লম্বা পেরেক আর এক হাতে হাতুড়িটা নিয়ে লাফিয়ে এল কাউন্টের কফিনের সামনে। পেরেকটা কাউন্টের হৃদপিন্ড বরাবর ধরে হাতুড়িটা দিয়ে সজোরে বাড়ি মারতে লাগল। পেরেকটা হাতুড়ির বাড়ি খেতে খেতে, কাউন্টের হৃদপিন্ড ভেদ করে একেবারে কফিনের কাঠ পর্যন্ত পৌঁছে গেল।
লুটিয়ে পড়ল কাউন্ট কফিনটার ভেতরে। আমাদের চোখের সামনে তার বিশাল দেহটা ধীরে ধীরে ধূলিকণায় পরিণত হল।
উপত্যকায় দিন শেষের ছায়া ঘনায়। ড্রাকুলার প্রাসাদে আর কোনও ভয় নেই। বন্দুকের ভয়ে বেদেরা আগেই একে একে সরে পড়েছিল। আমি আর হেলসিং উপস্থিত হয়ে সকলের সঙ্গে মিলিত হলাম। মরিসের দিকে এতক্ষণ কারোর তাকাবার সময় হয় নি। মরিস যখন সেই সময় বাক্স নামাচ্ছিল তখন একটা বেদে তার পিঠে ছুরি বসিয়ে দিয়েছিল।
ক্ষীণ কন্ঠে মরিস বলল, " ঈশ্বর, তোমায় অশেষ ধন্যবাদ। আমাদের অভিযান ব্যর্থ হয় নি। ড্রাকুলা আর নেই, মীনা আজ কলঙ্কমুক্ত। কিন্তু সকলে মিলে যখন আনন্দ করবার সময় এল তখনই আমায় বিদায় নিতে হচ্ছে।"
মরিস আর নেই। নির্জন অনাত্মীয় এই পরিবেশে আমরা আমাদের প্রিয় বন্ধুকে সমাধিস্থ করলাম। চোখ আমাদের জলে ভরে ওঠে। সমাধিতে ছড়িয়ে দিলাম বনফুল। আমরা সকলে মরিসের অমর আত্মার চিরশান্তি কামনা করি।
|| পরিশিষ্ট ||
কাল বসে থাকে নি। সাতটি বছর কেটে গেছে। সম্প্রতি আমরা ট্রানসিলভ্যানিয়
া থেকে ঘুরে এসেছি। এখন আর সেখানে কোনও ভয় নেই। মাথা উঁচু করে আজও দাঁড়িয়ে আছে কাউন্টের প্রাসাদ। একদিন আমরা অনেক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম। সেইসব অভিজ্ঞতার বিবরণ আমাদের দিনলিপি লেখা ডায়েরীতে পাওয়া যাবে।
মরিসের সমাধিতে আমরা পুষ্পস্তবক অর্পণ করলাম। প্রফেসর হেলসিং বাইবেল পড়লেন। আমরা প্রার্থনা করলাম।
মরিসের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমি আর জোনাথন আমাদের তিন বছরের ছোট্ট ছেলেটির নাম রেখেছি মরিস। শিশুটা সেই বিশেষ দিনে জন্মেছে, যেদিন মরিস চিরবিদায় নিয়েছিল। আমাদের তাই দৃঢ় বিশ্বাস, আমাদের এই শিশুটি মরিস ছাড়া আর কেউ নয়।
আর্থার এবং ডাঃ সিউয়ার্ড দুজনেই বিয়ে করেছেন। তাঁরা বেশ সুখেই আছেন। অধ্যাপক হেলসিং আমাদের কাছেই থাকেন। আমাদের ডায়েরী পড়ে অনেকের হয়ত মনে হবে অবিশ্বাস্য গালগল্প। কিন্তু আমরা জানি আমাদের দিনলিপির একটি বর্ণও মিথ্যে নয়। সেইসব দিনের কথা মনে পড়লে আজও ভয় হয়।
( সমাপ্ত)
----------------
।। একাকী কন্যা ।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now